ফারিস নিজেই মুঠো ভর্তি করে হলুদ নিয়ে মেখে দিলো ইসরাহর মেদহীন উদোরে। ইসরাহর কোমল হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে হলুদের প্যাকেট থেকে হলুদ নিয়ে নিজের গালে মাখলো ফারিস। ফের সে মুখ ডুবালো ইসরাহর উদোরে। ঘোর লাগা কন্ঠে বলতে লাগলো ফারিস।
--" এইবার ঠিক আছে, বর - বউ দুজনের শরীরেই হলুদ ছোঁয়া লেগেছে। আমার ছোঁয়ানো হলুদ লেগেছে আমার লিটল গার্লের শরীরে। তুমি আমার, কেবল ই আমার ইসরাহ। বারো বছরে কেউ কেড়ে নিতে পারেনি! বাকি চল্লিশ বছরেও পারবে না। ইটস মাই প্রমিস বেইব। জীবন দিয়ে আগলে রাখবো; সুইট হার্ট। ভালোবাসি তোমাকে, লিটল গার্ল।"
পরম আবেশে নাক টেনে ইসরাহর শরীরের সুভাষ নিজের ভেতরে টেনে নিলো ফারিস। না না, শুধু ফারিস জাওয়ান না! প্রেমিক ফারিস জাওয়ান। ইসরাহর পাগল বর।
ফারিস বসা থেকে উঠতে নিতেই তার হাত ঘড়ির সাথে ইসরাহর হাতের কিছু একটা বেঁধে গেলো।
ফোনটা নিয়ে সাইড বাটনে প্রেস করে নিজের ঘড়ির উপর আলো ফেললো সে। মূহূর্তেই চকচক করে উঠলো ফারিসের চোখ। মুখ জুড়ে দেখা দিলো হাসির রেশ। তার লিটল গার্ল তার দেওয়া ব্রেসলেট টা পরেছে? ফ্ল্যাশ টা অন করে ইসরাহর ব্রেসলেটের হুক থেকে নিজের ঘড়ি টা খুলে, ইসরাহর হাতটা টেনে নিলো নিজের কাছে। লাল খয়েরি রঙের, ঠোঁট জোড়া বাড়িয়ে ছোটো ছোটো চুমুতে ভরিয়ে দিলো ইসরাহ কব্জিখানা। পর পর কঠিন হৃদয়ের অধিকারী ফারিস জাওয়ান দরদ মাখা কন্ঠে বললো;-
--" দ্যাট'স মাই গার্ল! সুইট হার্ট আর ইউ ওয়্যারিং দ্য ব্রেসলেট? রিয়েলি ওয়্যার? হু সেজ, ইফ দ্য আইজ আর হিডেন, পিপল আর হিডেন ফ্রম দ্য মাইন্ড? এইতো আমার রক্তের ফোঁটা গুলো তোমার কব্জি জুড়ে বাঁধা। আর তুমি পুরোটাই আমার হৃদয় জুড়ে গাঁথা।"
থামলো ফারিস। ফের শব্দ করে হেসে দৃঢ় কন্ঠে সুধালো সে;-
--" দূরে থেকেই আমার জন্য এতো ভালোবাসা তোমার মনে। কাছে থাকলে তোমার মা কি করে আমার থেকে আলাদা করবে তোমাকে সুইট হার্ট? উপপসস, আমার যাদু বিদ্যা।"
ঘড়ির কাঁটায় শব্দ করে তিন টা বাজতেই ধ্যান ভাঙলো ফারিসের। সোজা হয়ে বসলো সে। পকেট থেকে একটা টিস্যুর প্যাকেট বের করে; ইসরাহর শরীরের মেখে দেওয়া হলুদ গুলো মুছে নিলো সে। ভালো ভাবে হলুদ গুলো মুছে উঠে দাঁড়ালো ফারিস। কালো রুমাল টা বেড থেকে তুলে মুখে বেঁধে নিলো সে। অবশেষে বারান্দার দরজার দিকে এগোতে নিয়ে ও থেমে গেলো ফারিস জাওয়ান।
ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো সোফার দিকে। রওনাফের কেনা বিয়ের বেনারসিটার বক্স টা সোফার উপর রাখা। তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো ফারিসের অধর যুগল জুড়ে। কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিমায় এগিয়ে গেলো ড্রেসিং টেবিলের দিকে। আলতার শিশিটা তুলে নিলো নিজের হাতে। বেনারসির বক্স টা খুলে শিশিটার মুখ খুলে শিশির সম্পূর্ণ র*ক্ত টা ঢেলে দিলো শাড়িতে। নিজের কাজ শেষ হতেই , শেষ বার ইসরাহর দিকে তাকিয়ে বির বির করে বললো ফারিস;-
--" মিসেস আরহাম সিকদার! বারো বছর আগে আপনি আমার বৈধ ওয়াইফ কে কেড়ে নিয়ে ছিলেন আমার থেকে। তখন আমার শক্তি ছিলো না আমার লিটল গার্ল কে আটকানোর। ওকে নিয়ে আলাদা হওয়ার মতো। নেহাত সুইট হার্ট ছোটো ছিলো বলে টানাহ্যাঁচড়া করিনি। এইবারে আপনি বুঝবেন ফারিস জাওয়ান সিকদার কি জিনিস।"
কথা শেষ হতেই দরজা খুলে অন্ধকারের মাঝে বেরিয়ে গেলো ফারিস। যেভাবে এসে ছিলো ঠিক সেভাবেই দেওয়াল টপকে সিকদার বাড়ি থেকে আবার বেরিয়ে গেলো সে।
--------
দুপুর বারো টা বাজে। সিকদার বাড়ির সকলে হাতে ব্যস্ত কাজ করে যাচ্ছে। বাবুর্চিদের রান্না শেষ। ওনারা এখন খাবারের জায়গায় চেয়ার টেবিল ঠিক করছেন। আস্তে আস্তে অতিথিরা আসা শুরু করেছেন। গেইটে দাঁড়িয়ে নিজের বিজনেস পার্টনারদের স্বাগতম জানাচ্ছেন আরহাম সিকদার।
ইসরাহ কে সাজানোর জন্য পার্লার থেকে দুটো বিউটিসিয়ান আনা হয়ে। মেয়ে দুটো দশটার দিকে এসে হাজির হয়েছিলো। আসফা বেগম সবটা রেখে ওদের আগে ইসরাহ সাজানোর জিনিস গুলো বের করে দিয়ে ছিলো। সব বুঝিয়ে দিয়ে, তার পর আবার নিচে এসে কাজে হাত লাগিয়ে ছিলেন।
হঠাৎ হন্তদন্ত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো রিতা। নিচতলায় এসেই সে ছুটে গেলো কিচেনে অবস্থান করা আসফা বেগমের কাছে। বড় জগে করে আসফা মেহমানদের জন্য শরবত বানাচ্ছেন। তার পাশেই আলেয়া নাশতার প্লেটে বিভিন্ন পদের মিষ্টি সাজাচ্ছেন। ছেলেপক্ষ এলে মিষ্টি আর শরবত দেওয়া হবে। তার পর খাবার খেতে বসাবেন।
মা আর মামনির দিকে একবার তাকিয়ে রিতা আতঙ্কিত কন্ঠে সুধালো;-
--" মামনি ইসরাহ আপুর শাড়িটা দেখে যাও তুমি?"
--" কি হয়েছে রে রিতা?"
মেয়ের কথা বুঝতে না পেরে আলেয়া ফের জিজ্ঞেস করলেন।
--" শাড়িটার আঁচলের অংশ জুড়ে কেমন যেনো হয়ে গেছে।"
হাতের চামচ টা জগের মধ্যে রেখে রিতার সাথে ইসরাহর রুমে এলেন আসফা বেগম। পার্লারের মেয়ে দুটো শাড়ি হাতে নিয়ে কি যেনো বলছে। দুজনের কপাল জুড়ে চিন্তার ভাঁজ। ইসরাহ দু'কাপড়ের উপর অপ্রোণ টা পরে আয়নার সামনে বসে আছে। তার মুখের সাজ আর চুল বাঁধা শেষ। বাকি আছে শাড়ি আর গহনা গুলো পরানো। ইসরাহর মুখ জুড়ে অদ্ভুত বিষন্নতা লক্ষ্য করলেন আসফা। মেয়ে টা একরাতেই কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। উদাসীন চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে ইসরাহ। ভাবনা রেখে মেয়ে দুটোর কাছে এসে শাড়ি টা নিজের হাতে নিলেন আসফা। বিজ্ঞ চোখে চেয়ে বোঝার চেষ্টা করলেন; আসলে কি হয়েছে শাড়িটাতে।
--" আন্টি শাড়িটা তো নষ্ট হয়ে গেছে।তাহলে এখন ব্রাইড কে কি পরাবো?"
একটা মেয়ে প্রশ্ন করলো আসফা বেগম কে। শাড়ি থেকে চোখ তুলে মেয়েটার দিকে তাকালেন আসফা।
--" দাঁড়াও মা, আমি আসছি।"
ধীর কন্ঠে উত্তর দিয়ে, শাড়ি টা সমেত ইসরাহর রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন আসফা বেগম। যাওয়ার আগে জাইমা কে বলে গেলেন আরহাম সিকদার কে ঘরে ডেকে দিতে। মাথা নাড়িয়ে জাইমা আরহাম সিকদার কে ডাকতে নিচে চলে গেলো।
---------
তড়িঘড়ি করে ঘর্মাক্ত পাঞ্জাবী পরিহিত আরহাম সিকদার রুমে এলেন। শঙ্কিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন তিনি;-
--" কি হলো আসফা? ডাকলে কেনো, নিচে কতো কাজ পড়ে আছে।"
--" বিছানায় বসো তুমি, আমি আসছি।"
ব্যস্ত হাতে আলমারির একের পর এক শাড়ি উল্টো পাল্টা করে কিছু খুঁজছেন আসফা। এবার কিছুটা বিরক্ত হলেন আরহাম সিকদার।
--" কি খুঁজছো, বলবে আমাকে?"
কাঙ্ক্ষিত জিনিস টা পেয়ে আলমারি বন্ধ করে আরহামের সামনে এসে দাঁড়ালেন আসফা। আরহাম অবাক চোখে চাইলো আসফা বেগমের হাতের শাড়িটা। পর পর থমথমে কন্ঠে তিনি বললেন;-
--" ফারহানার বিয়ের শাড়ি বের করলে কেনো?"
ঢোক গিললেন আসফা। এটা ফারিসের মায়ের বিয়ের শাড়ি। এতো বছর ধরে যত্ন সহকারে আরহাম সিকদার শাড়ি টা আগলে রেখেছিলেন। কখনো আসফা বেগম কে ধরতে পর্যন্ত দেননি। এমনকি মাঝে মধ্যে আরহাম সিকদার শাড়ি টা বের করে রোদে শুকোতে ও দেন। শাড়িটার প্রতি যত্ন দেখে মাঝে মাঝে মন খারাপ হয় আসফার। চোখ জুড়ে দেখা দেয় একরাশ অভিমান। কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারেন না তিনি। চোখের পানি গাল গড়ানোর আগেই তা আঁচলে মুছে নিতেন আসফা। ঘরের নিস্তব্ধতা দেখে ভেজা গলায় আসফা বেগম বললেন;-
--" আপার এই শাড়ি টা আজকের জন্য ইসরাহ কে পরতে দেই?"
ফের থমথমে কন্ঠে আরহাম সুধালেন;-
--" রওনাফদের বাড়ি থেকে শাড়ি পাঠায়নি?"
--" পাঠিয়েছে কিন্তু..."
--" কিন্তু কি?"
--" শাড়ি টা কিভাবে যেনো নষ্ট হয়ে গেছে। পরার অবস্থাতে নেই।"
--" যা ভালো মনে করো, তাই করো।"
বড় বড় পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন আরহাম সিকদার। দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে শাড়ি টা কোলে নিয়ে বিছানায় বসলেন আসফা।
--" মরা মানুষের জন্য আরহামের বুকে এতো প্রেম, অথচ জলজ্যান্ত তিনি সামনে হেঁটে চলে বেড়ান তার জন্য একটুও মায়া হয় না আরহাম সিকদারের।"
এই দুঃখ কোথায় রাখবেন আসফা বেগম?