বরফের আস্তরণে ঢাকা পড়া আলাস্কার ফাঁকা রাস্তা দিয়ে দৌড়াচ্ছে ইসরাহ।
তার পেছনে ফারিস তাকে ধাওয়া করছে। দৌড়ানোর পাশা পাশি গলা ছেড়ে তাকে ডাকছে ফারিস।
--“ লিটল গার্ল, প্লিজ থামো। আই ওয়ার্ন ইউ, টেম্পারেচার মাইনাস ডিগ্রিতে। এই ঠান্ডায় বেবির সমস্যা হতে পারে।"
ইসরাহ যেনো শুনে ও শুনলো না। নিজের জেদে অটল থেকে সে পায়ের গতি বাড়ালো। ফারিস ও ধমলো না। দৌড়ানোর এক পর্যায়ে ফারিস অদৃশ্য হয়ে গেলো। ফারিস কে না দেখে থমকে দাঁড়ালো ইসরাহ। চারপাশে এলো মেলো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ফারিস কে খুঁজলো সে।
পুরো রাস্তা খালি। মানুষ দূর, মশা মাছির ও অস্তিত্ব সংকট এখানে। বক্ষ তল্লাটে ভয়েরা হানা দিলো। আশে পাশে জনমানব শূন্য; বহু দূরে দূরে বাড়ি হওয়ায় এদিকটা ধূ ধূ ফাঁকা। রাস্তার নিয়ণ সোনালী আলোতে বড় বড় গাছ গুলোর ছায়া ভয়ংকর রুপ ধারণ করেছে।
সাদা বরফের বুকে কালো ছায়া গুলো লেপ্টে আছে। ইসরাহর পা দুটো হঠাৎ করে অবশ হয়ে এলো। ঠান্ডার তোপে নিশ্বাস আটকে আসতে লাগলো। তবুও থামলো না সে। ভাঙা দমে আবার দৌড় দিলো সামনে, কেবল ফারিসের হাত থেকে বাঁচার নিমিত্তে।
দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ ইসরাহ এসে পড়লো একটা গাড়ির সামনে। মুহূর্তের জন্য পৃথিবী টলে উঠলো তার চোখের সামনে। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে নিলো ইসরাহর। আরেকটু হলে গাড়ির ধাক্কা লাগতো উদরে। হুট করে গাড়ির পেছনের দরজা টা খুলে গেলো। গমগমে অপরিচিত কন্ঠে ভেসে এলো কিছু বাক্যে।
--" উঠে এসে মেয়ে।"
ইসরাহ ঠাহর করতে পারলো না কন্ঠ টা। শীতে তার কানে তালা লাগার দশা। সাত-পাঁচ কিছু ভাবার অবকাশ পেলো না সে। এক ঝটকায় গাড়ির ভেতর ঢুকে দরজা টা বন্ধ করে দিলো ইসরাহ। সিটে বসে চোখ বন্ধ করে নিলো। বুকের ভেতর উন্মত্ত হৃদস্পন্দন ছুটছে। ধীরে ধীরে সময় পাঁচ থেকে দশ মিনিটে পৌঁছালো। সময় নিয়ে স্থির হলো ইসরাহ। গাড়ির ভেতরের উষ্ণতা পেয়ে হাত পায়ের বোধ ফিরে আসতে শুরু করলো। ওভাবে থেকেই ইসরাহর সুধালো;-
--" আ...মাকে বাঁচানোর জন্য, আপনাকে ধ..ধন্যবাদ।"
--" বর কে ধন্যবাদ দিতে নেই লিটল জান। তুমি আর বেবিই তো আমার সব।"
ফারিসের কন্ঠ শ্রুতিগহ্বর ভেদ করে মস্তিষ্কে পৌঁছাতে চমকে পাশে তাকিয়ে সে থমকে গেলো। তার পাশের সিটে ফারিস বসে। সামনের সিটে, স্টিয়ারিং ধরে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে গাড়ি চালাচ্ছে রিজভি। ঘটনার গভীরতা বুঝতেই চেঁচিয়ে উঠলো ইসরাহ।
--" ফারিস!"
ইসরাহর চিৎকারে কানে হাত চাপলো ফারিস। লুকিং গ্লাসে তা দেখে মুচকি হাসলো রিজভি। তার বস কাউকে ভয় পাচ্ছে। তা দেখতে বেশ ভালো লাগছে তার।
--" আমি কালা না লিটল কুইন। একটু আস্তে কথা বললে ও হয়। আর আমাকে ডাকছো যেহেতু। একটু মিষ্টি করেই ডাকো।"
ফারিস শেষের কথা গুলো বেশ মায়া মায়া স্বরে বললো। ইসরাহর তাতে তোয়াক্কা করলো না।
--" ছলনা করেছেন?"
ইসরাহর প্রশ্নে ভ্রু দ্বয় কুঁচকে নিলো ফারিস। ঘুরে বসলো তার দিকে। অবুঝের ন্যায় চোখ ছোটো করে ফারিস বললো।
--" কখন?"
ফারিসের প্রশ্নে বিদ্রুপের হাসি ফুটল ইসরাহর অধরে। ফারিসের ভিন্ন ভিন্ন রূপে সে বার বার অবাক হচ্ছে।
--" মাত্র!"
--" প্রমাণ কি জান?"
--" আপনার ঠোঁটের ওই ছলনার হাসি ফারিস। একটা মানুষের এতো রূপ হয় কিভাবে?"
--" আমি সাধারণ মানুষ তোমাকে তা কে বললো?"
--" তো আপনি জন্তু নাকি?"
--" নিয়ম মাফিক তোমাকে আমি কুইন ডাকি। প্যালেসে ও রাখি। তার মানে আমি কিং।"
--" জন্তু কোথাকার।"
ইসরাহর অপমানাত্নক কথায় ফারিস ওষ্ঠ সংকুচিত করে নিলো। ইসরাহর হঠাৎ হাসি পেলো। প্রেগন্যান্সির মুড সুইং বটে। সে হেসে কুটি কুটি হয়ে গেলো। ফারিস ভড়কালো ইসরাহর অবস্থা দেখে। দুজনের দূরত্ব মিটিয়ে ইসরাহ কে জড়িয়ে নিলো বাহুতে। অলগোছে হাত রাখলো কপালে। পর পর গলায়। ইসরাহর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনার একটু ঠান্ডা। পরোখ করা শেষে চিন্তিত কন্ঠে ফারিস প্রশ্ন করলো;-
--" শরীর খারাপ করছে লিটল গার্ল?"
ইসরাহ নীরবে মাথা নেড়ে না বোঝালো। তবু ফারিসের বুকের ভেতরের উৎকণ্ঠা এক চুল ও প্রশমিত হলো না। তার মনে হচ্ছে, বর্তমানে একবার ডাক্তারের চেকাপ করা যেতো। তবে হয়তো দুশ্চিন্তার ভার হালকা হতো। দীর্ঘ সময় ধরে বাইরে ছুটোছুটি করেছে মেয়ে টা।
তার উপর বাংলাদেশের পরিচিত উষ্ণতা ছেড়ে হঠাৎ এমন ভিন্ন তাপমাত্রা। ইসরাহর শরীর যে এতে মানিয়ে নিতে পারবে, সে নিশ্চয়তা ফারিসের মনে জাগছে না। তাকে আরেক দফা অবাক করতে ইসরাহ বলে উঠলো।
--" ফারিস আমি কিছু কিউট কিউট গালি শিখেছি।"
--" কি গালি লিটল গার্ল?"
--" আপনাকে দিবো?"
--" এমা আমাকে কেন দিবে? আমার শক্রদের গালি দাও জান। তুমি শুরু করো। আমি শুনছি লিটল কুইন।"
ইসরাহ মুখ কুঁচকে নিলো। ফারিসের বুকের দিকে শার্টে খাবলা বসিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো;-
--" কিন্তু আপনার শক্র তো আপনি নিজে। তাহলে বিসমিল্লাহ বলে গালি গুলো আপনাকেই দেই।"
--" ব্রিলিয়ান্ট! এইবার চুপ করে বসো।"
ইসরাহ থামলো। পরমুহূর্তে তার মত পাল্টে গেলো। ছিটকে সরে এলো ফারিসের বাহু থেকে।
--" গাড়ি থামান ফারিস। আমি যাবো না আপনার সাথে। আমি ভালো না।"
ফারিস কপালে আঙুল চেপে ধরলো। দীর্ঘ শ্বাস চেপে পকেট থেকে ছোট একটা শিশি বের করে। তার থেকে কিছু টা তরল রুমালে ঢেলে ইসরাহর নাকে চেপে ধরলো। মূহুর্তে শরীর ছেড়ে দিয়ে নিস্তেজ হয়ে গেলো ইসরাহ। ফারিস ঠোঁট কামড়ে বিস্তর হাসলো।
--" অনেক চেষ্টা করেছিলাম তোমাকে আটকানোর বউ। কিন্তু তুমি তো থামছো না! এতোদিন যা হয়েছে সেটা তোমার ইচ্ছে হয়েছিলো। এবার যা হবে তা আমার ইচ্ছে হবে।"
ইসরাহর নিস্তেজ দেহ বলিষ্ঠ বক্ষ বিভাজনের টেনে নিলো ফারিস।
------------------
বিশাল চিলেকোঠার রুমটির মাঝ বরাবর একটা অল্প আলোর বাতি জ্বলছে। ঘড়ির কাঁটায় টিক টিক শব্দ করে সময় বারোটার ঘরে পৌঁছালো। পানির ঝাপটায় হুঁশ ফিরলো ইসরাহ। পিটপিট চোখ মেলে, মাথায় চিন চিন ব্যথা নিয়ে সোজা হয়ে বসতে চাইলো সে। পারলো না, ঘাড়ের রগে টান লাগতেই মৃদ্যু আর্তনাদ করে উঠলো সে। ফারিসের টনক নড়ে।
--" কিস ওর হাগ লিটল গার্ল?"
অন্ধকার রুমে ফারিস কথা গুলো ঝনঝন করে উঠলো। ঘাড়ের ব্যথা ভুলে; ইসরাহ থমকালো, চমকালো। অতঃপর ছাড়া পেতে ধস্তাধস্তি শুরু করলো সে।
--" দূরে যান ফারিস।"
--" নো ওয়ে লিটল গার্ল।"
--" আমি কিন্তু আঘাত করবো।"
--" আই উইল ম্যানেজ হ্যান্ডকাফ বেইব।"
চেঁচিয়ে উঠলো ইসরাহ।
--" প্রার্থনা করছি ফারিস জাওয়ান! আপনার সাথে এই দেখাই আমার শেষ দেখা হোক।"
ফারিস বক্র হাসলো। খানিক ঝুঁকে ঠোঁট ছোঁয়ালো ইসরাহর কপালে।
--" এক জীবনে কতো ইচ্ছে পূরণ করতে চাও? যখন একা ছিলে, তখন আমাকে ফাঁকি দিতে পারোনি। তবে আমার সন্তান গর্ভে নিয়ে পালাবে কিভাবে?"