--" বস আপনি দিন দিন আমাকে এভোয়েড করছেন!"
নীরবতা মাড়িয়ে হঠাৎ, রিজভির মাতাল কণ্ঠ ভেসে এলো। ভাঙা, জড়ানো, স্বরের কথা গুলো বেশ কানে বিঁধলো ফারিসের। বিরক্তি নিয়ে ফারিস ধীরে ধীরে চোখ তুললো। লালাভ দুই চোখে মাতাল ভাব নেই। রাগ আর বিরক্তিতে ফারিস কে আজ আলকোহল ও কাবু করতে পারছে না। সামনে বসে থাকা রিজভির মুখটা অন্ধকারে স্পষ্ট দেখলো না সে। স্পষ্ট করে দেখার চেষ্টা ও করলো না ফারিস। যেন মানুষটা গুরুত্বপূর্ণই নয় তার কাছে। নিজের হাতে ধরা গ্লাসটা কাত করে ছুঁড়ে মারলো সামনে। ফারিসের নিশানা ভুল হলো না। শেষটুকু অ্যালকোহল সরাসরি গিয়ে পড়লো রিজভির মুখে।
--" তোকে পাত্তা দিবো কেন? তুই আমার লিটল গার্ল নাকি?"
হতাশ হলো রিজভি। মুখে পড়া আলকোহল টুকু হাতের সাহায্যে মুছে। মাটিতে ছেচড় কেটে ফারিসের পায়ের কাছে এগিয়ে এলো সে। ফারিসের স্লিপার পরা পা টা টেনে নিলো নিজের কোলে।
--" তাতে কি? ম্যামের আগ থেকে আমি আপনার সাথে থাকছি বস।"
--" রিজভি! একদম সতিনের মতো আমার লিটল গার্ল কে হিংসা করবি না। লিটল গার্ল ছাড়া আমার জীবনের সব কিছুই মিথ্যা। আমাদের একসাথে দেখলেই তুই মাশাল্লাহ পড়বি।"
কথা শেষ হতেই ফারিস এক টানে নিজের পা ছাড়িয়ে নিলো রিজভির হাত থেকে। হঠাৎ টান পড়ায় রিজভি ফ্যাচ ফ্যাচ করে কেঁদে উঠলো। কিন্তু ফারিস সেদিকে একটু ও তাকালো না। মন্থর ভাবে উঠে দাঁড়ালো সে। দাঁড়াতে গিয়ে পায়ের কাছে পড়ে থাকা ম*দের খালি কাঁচের বোতলে হোঁচট খেলো। একটু দুলে উঠলে ও পড়ে গেলো না, নিজেকে সামলে নিলো ফারিস। তারপর স্লিপার পায়েই বিছানায় উঠে পড়লো।
দু-এক পা এগিয়ে দেয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। দেয়ালে টাঙানো ইসরাহর ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলো। এরপর ঝুঁকে এসে ছবিটায় হালকা করে চুমু খেলো সে। চুমু খাওয়ার পরই তার মুখের ভাবটা বদলে গেলো। আগের শক্ত ভাবটা আর রইলো না। চোখ দুটো নরম হয়ে এলো, মুখ সরল হয়ে উঠলো।
--" রিজভি রে, আমার লিটল গার্ল আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখন আমি কি করবো।"
--" আপনি ও চলে যান বস।"
ঘোরের মধ্যে ফারিসের কথা বোঝার চেষ্টা করলো না রিজভি। হুট করে জবাব দিয়ে দিলো সে। ফারিস তা শুনে ও ভ্রু-ক্ষেপ করলো না। দেয়ালে টানানো ইসরাহর পেন্টিং টা খুলে নিলো সে। বিছানার ওপর আলতো করে রেখে, ঠিক তার পাশেই বসে পড়লো ফারিস। ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়লো ছবিটার ওপর— নিখুঁত মুখশ্রীর মেয়েটির পানে তার দৃষ্টি যেন আটকে গেলো। চোখ জুড়ে ভীড় করলো এক অদ্ভুত নিবিষ্টতা, যেন ছবির ভেতরেই হারিয়ে যেতে চাইছে সে।
সহসা চেতনা ফিরে এলো তার। সোজা হয়ে বসল ফারিস। বালিশের পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে দু’হাতে মুখ ডলে নিলো— নিজেকে টেনে তুলতে চাইলো ঘোর লাগা অবস্থা থেকে। স্ক্রিনে কিছুক্ষণ মনস্ক ভাবে স্ক্রল করা শেষে, বিরক্তি মিশ্রিত এক ঝটকায় ফোনটা ছুঁড়ে ফেললো দূরে। এক মুহূর্ত ও দেরি না করে উঠে দাঁড়ালো সে। দ্রুত পায়ে হেঁটে ঢুকে পড়লো ওয়াশরুমে। পাক্কা ঘন্টা খানেক সময় খুইয়ে শাওয়ার শেষ করলো সে।
কোমরে সাদা তোয়ালে জড়িয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বেরিয়ে এলো ফারিস। ঘরের ভেতরটায় অদ্ভুত এক স্থিরতা— যেন সময় থমকে আছে এই ঘরে। রিজভি এখনো ডিভানের সাথে পিঠ এলিয়ে বসে আছে, নিঃশ্বাসের ওঠা নামা ছাড়া তার মধ্যে জীবনের আর কোনো লক্ষণ নেই। ঘুমিয়ে আছে, নাকি নেশার ঘোরে ডুবে তাও বোঝার উপায় নেই। ফারিস তোয়ালে বদলানোর প্রয়োজন অনুভব করলো না। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো রিজভির দিকে। সেন্টার টেবিলের উপর রাখা জগটা তুলে নিলো। কাঁচের গায়ে জমে থাকা ঠান্ডা পানির শিশির বিন্দু গুলো নড়া খেয়ে পানির সাথে মিশে গেলো। ক্ষণ মাত্র সময় বিলম্ব না করে পুরো জগ ভর্তি বরফ শীতল পানি ঢেলে দিলো রিজভির মাথার উপর।
হঠাৎ, বজ্রাঘাতের মতো চমকে উঠলো রিজভি। শ্বাস আটকে এলো তার, চোখ জোড়া মেলে ফারিসের দিকে তাকালো বিস্ময় আর আতঙ্কে। পানির ঝাপ্টায় তার ভেজা চুল কপালে লেপ্টে গেছে। পানি গড়িয়ে পড়ছে চোখ, মুখ বেয়ে। ফারিস ইতি মধ্যেই সরে এসেছে সেখান থেকে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সে, আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি, তার হাসিতে ঝলকে পড়ছে মস্তিষ্কে দমিয়ে রাখা ঝড়ের আভাস।
যেন কিছুই ঘটেনি এইমাত্র। যে বিশৃঙ্খল মুহূর্তটা তৈরি করলো ফারিস, তা তার কাছে নিছকই তুচ্ছ। ঘরের নিস্তব্ধতা আবার ধীরে ধীরে ফিরে এলো। শুধু টুপটাপ করে মেঝেতে পড়তে থাকা পানির শব্দ আর রিজভির ভারী, অস্থির শ্বাস সেই নীরবতাকে ভেঙে দিয়েছে। গম্ভীর কন্ঠে ফারিস সুধালো;-
--" মাতলামো ছেড়ে গিয়ে শাওয়ার নিয়ে আয়।"
--" কেনো বস?"
--" তোকে বিয়ে করাতে যাবো।"
অবাক হলো রিজভি, তেমন গুরুত্ব না দিয়ে সে বললো;-
--" বস, ম্যাম তো পালিয়েছে। এখন আপনি কি করবেন?"
চুলে হাত চালিয়ে ড্রায়ার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চুল শুকানোতে মনোনিবেশ করলো ফারিস।
--" কিচেন থেকে দুটো ভাঙা স্টিলের প্লেট নিয়ে আয়। দু'জন মিলে ভিক্ষা করবো।"
বিস্মিত নয়নে রিজভি ফারিসের দিকে তাকালো। আজ যেনো তার অবাক হওয়ার দিন। সে টলতে টলতে মেঝে থেকে উঠে এলো ফারিসের নিকট।
--" কিন্তু বস! আলাস্কায় তো কেউ কাউকে ভিক্ষা দেয় না। আর আমাদের দেখতে ভিক্ষুক ও মনে হচ্ছে না।"
--" ভিক্ষা যেহেতু করা যাবে না। চল এক কাজ করি। তোকে আবার সুন্নতে খাৎনা করিয়ে দেই।"
তড়িৎ বেগে, ট্রাউজারের উপর দিয়েই নিজের গোপন স্থান চেপে ধরলো রিজভি। মাতাল ভাব সরে গিয়ে চোখ বড় বড় হয়ে উঠেছে। কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে রিজভি বলে উঠলো;-
--" আমার আব্বা দুটো খাসি জবাই দিয়ে সুন্নতে খাৎনা করিয়ে ছিলেন। খুব ব্যথা পেয়েছিলাম বস। আমার এখনো মনে পড়ছে। ছোটো ভাই লুঙ্গি ধরে টান দেওয়াতে ইয়েতে খুব ব্যথা পাইছিলাম। পাক্কা দেড় ঘন্টা কেঁদে ছিলাম আমি। আল্লাহ্ গো, ওই কথা ভাবলে এখনো ইয়ে নড়ে ওঠে।"
ফারিস বেশ মজা পেলো রিজভির ভয়ার্ত মুখ দেখে।
--" রিজভি,"
--" প্লিজ বস, ওমন আবদার আর করবেন না।"
--" রেডি হয়ে নে। দেশে ফিরবো।"
_____________
বিকেল নামার আগেই আকাশে নেমে এসেছে একরাশ অকাল গোধূলি। সূর্যের আলো অভিমান করে মুছে গেছে, চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে ধূসর আবছায়া।
বৈশাখ এখন ও দোর গোড়ায় পা রাখেনি, অথচ তার আগমনী বার্তা হয়ে কালবৈশাখী ঝাঁপিয়ে পড়েছে ধরনীর বুকে। দূর আকাশে মেঘের গর্জন, হাওয়ার তীব্র দোল। প্রকৃতি যেন নিজের ভেতরের অস্থিরতা উজাড় করে দিচ্ছে পৃথিবীতে। বারান্দার এক কোণে নিঃশব্দে বসে আছেন আসফা বেগম। হাতে খোলা বই, কিন্তু তার চোখ বইয়ের অক্ষরের উপর নিবদ্ধ নেই। দূর আকাশে মেঘের পানে চেয়ে আছেন তিনি। পাতা উল্টানোর প্রয়োজন বোধ করলেন না আসফা। শব্দ গুলো তার কাছে আজ বড্ড অনুভূতি হীন।
আরহাম সিকদার এখন ও অফিস থেকে ফেরেননি। সময় গুলো ধীরে ধীরে জমে উঠেছে অপেক্ষার ভারে। আসফার মনটা আজ বেশ উদাস। কোনো কিছুতেই আজ, কাল টান খুঁজে পান না তিনি। ইসরাহ চলে যাওয়ার পর থেকে এই বিশাল বাড়িটা যেন প্রাণ হারিয়েছে। আগে যেখানে হাসির শব্দ প্রতিধ্বনি তুলতো, এখন সেখানে নিস্তব্ধতার বাস। দেয়াল গুলো ও যেন কেমন মন মরা হয়ে আছে। মাত্র দু’জন মানুষের বসবাস— তবুও এই বাড়িতে মানুষ আছে বলে মনে হয় না। দূর থেকে দেখলে শূন্যতার বিস্তীর্ণ আবাস মনে হয় বাড়িটিকে।
আচমকা কলিং বেল বাজতেই ধ্যান ভাঙলো আসফা বেগমের। আরহাম সিকদার এসেছে ভেবে অলস শরীরে উপর তলা থেকে নেমে এলেন তিনি। এর মধ্যে আরেকবার বেল বেজে উঠলো।
--" আসছি,"
দরজা খুলে ইসরাহ কে দেখে কপাল সংকুচিত হয়ে এলো আসফা বেগমের। এমন ভর, সন্ধ্যায় মেয়েকে দেখে অবাক ই হলেন তিনি। ইসরাহ যদি আশপাশে বা দেশে থাকতো। তবে এতোটা অবাক হতেন না তিনি। মাকে দেখে নিজেকে সামলাতে পারলো না ইসরাহ। ছুটে এসে মায়ের বুকে আছড়ে পড়লো সে। মেয়ে বুকে আছড়ে পড়তে ধ্যান ভাঙলো আসফা বেগমের।
--" ইস....ইসরাহ? মা তুই?"
কান্নার ধমকে ইসরাহ জবাব দিতে পারলো না। আসফা বেগম মেয়ের পিঠ আঁকড়ে ধরলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে ঘাড় থেকে মুখ তুললেন তার।
--" তুই একা এসেছিস আম্মু? ওই ছেলে... মানে ফারিস আসেনি?"
--" না "
--" কি বলছিস? ওতো দূর থেকে একা এলি কীভাবে? সে তোকে আটকায় নি? খুব তো জোর করে নিয়ে গিয়েছিল আমার কাছ থেকে। এখন একা ছাড়লো কেন?"
প্রায় ত্রিশ ঘন্টা বিমানের ফ্লাইট, পাঁচ/ছয় ঘন্টা জার্নিতে ক্লান্ত ইসরাহর তনু মন। মায়ের প্রশ্ন গুলো বেশ অসহ্যকর ঠেকলো তার নিকট। নিভে আসা গলায় ইসরাহ বললো;-
--" ভেতরে এসো আম্মু। আমার শরীর আর চলছে না।"
মেয়ের কথায় আসফা বেগমের মনে পড়লো ওনার ছোট্ট মেয়েটি সন্তান সম্ভবা। এই শরীরে এতোটা জার্নিতে মেয়ের শরীরের উপর দিয়ে বেশ ধকল গেছে।
--" আয়, আয়। তুই রুমে গিয়ে শাওয়ার নিয়ে নে। আমি খাবার গরম করে নিচ্ছি।"
--" আচ্ছা।"
শরীরের শেষ শক্তিটুকু খুইয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো ইসরাহ। নিজের রুমের সামনে এসে থামলো সে। ঘাড় ঘুরিয়ে ফারিসের রুমের দরজার দিকে তাকালো সে। বরাবরের মতোই দরজা টা বন্ধ। দীর্ঘ শ্বাস চাপলো সে। নিজের রুমে ফিরে ফ্যান ছেড়ে দিয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলো। ঘেমে যুবুথুবু হয়ে উঠেছে ইসরাহর পরণের জামাটি। বাংলাদেশে গরম পড়তে শুরু করেছে। অথচ আলাস্কায় এখনো তুষার পাত হয়।
বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে। সঙ্গে পোশাক না নিয়ে আসাতে, কার্বাড থেকে বেছে বেছে সবচেয়ে ঢিলে জামাটা বের করলো সে। আগের থেকে উদোরের অংশ অনেকটা ফুলে ফেঁপে উঠেছে। শরীরে ও মাংস বেড়েছে। শুকনো গাল দুটো গুলুমুলু হয়ে উঠেছে। ফারিস সুযোগ পেলেই তার উদোরে চুমু খেতো। ভাবনার মাঝেই ইসরাহর ডান হাত উদোরের উপর চলে এলো। আনমনে হেসে উঠলো সে।
--" তুমি ছেলে হও বা মেয়ে। তোমাকে মাম্মা খুব ভালোবাসে পাপা।"