--" আপনাকে বাঁধার জন্য, আমাকে ক্ষমা করবেন ফারিস। আমি ও আপনাকে ভালোবাসি। তবে আপনার এমন পাপিষ্ঠ মন মানসিকতা নিয়ে আমি আপনার সাথে থাকতে পারবো না। আমাদের সন্তান এমন পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারবে না ফারিস। তার জন্য এই পরিবেশ সঠিক নয়।"
ইসরাহ উঠে দাঁড়াল। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক তাড়নায় কাঁপছে। এগিয়ে এসে আগেই গুছিয়ে রাখা পাসপোর্ট আর ভিসা ভরা পার্সটা সেন্টার টেবিল থেকে তুলে নিল সে। মুহূর্ত খানেক থেমে ফারিসের দিকে তাকালো অচঞ্চল দৃষ্টিতে। ইসরাহর সেই দৃষ্টি ভর্তি ছিলো অভিমান আর অনিশ্চয়তা। আর এক মুহূর্ত ও নষ্ট করল না সে। দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজাটা বাইরে থেকে টেনে দিল। নীরবতা কে ছাপিয়ে ছিটকিনির ক্ষীণ শব্দে কেঁপে উঠল মেয়েটা।
নিজেকে সামলে নিয়ে ফোনের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালালো ইসরাহ। সাদা আলোটা অন্ধকার বারান্দায় সরু আলোর পথ সৃষ্টি করলো। সেই আলোর রেখা অনুসরণ করেই দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো ইসরাহ। ড্রয়িং রুমের নীরবতায় তার পায়ের শব্দ ঘুরে এসে তার কানে বাজলো।
দ্রুত হাতে সদর দরজায় লক প্রেস করে। বাইরে এসে দাঁড়াল ইসরাহ। রাতের নীরবতায় চারপাশ যেন আর ও ঘন জঙ্গল হয়ে উঠেছে। এক মুহূর্ত থেমে সে শেষ বারের মতো ফিরে তাকাল — মাঝারি আকৃতির কালো মার্বেল পাথরে গড়া প্যালেসটার দিকে। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাসাদটা ভারী এক স্মৃতির ন্যায় তার পানে তাকিয়ে। তার আর ফারিসের ছোট্ট সংসারের সাক্ষী এই প্যালেস। বুকের ভেতর এক সূক্ষ্ম টান অনুভব করলে ও, সময় তাকে থামতে দিল না। নিঃশব্দে গেট পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো সে।
ইসরাহ প্যালেসের গেট পেরিয়ে বাইরে পা রাখতেই; ফারিস চোখ জোড়া মেলল। অগ্নি স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠল তার অক্ষি যুগল। স্থির দৃষ্টিতে রুমের দরজার দিকে তাকিয়ে রইল সে। তার দৃষ্টির ধার এতটাই তীক্ষ্ণ, যেন বন্ধ দরজার ওপারটা ও ভেদ করে দেখতে পাচ্ছে। পরের মুহূর্তেই হেঁচকা টানে হাতের বাঁধন খুলে ফেলল ফারিস।
শক্ত পোক্ত রশিটা তার শক্তির কাছে তুচ্ছ হয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল। ফারিসের গম্ভীর চোয়ালে অদ্ভুত এক দম্ভের রেখা ফুটে উঠল। টান টান বুকে উঠে বসল সে বিছানার ওপর। নিঃশব্দে পায়ের বাঁধনটা ও খুলে ফেলল ফারিস। অতঃপর, বিছানা থেকে নেমে এসে চোখ দুটো বন্ধ করে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। যেন নিজের ভেতরের আগুনটাকে সামলে নিচ্ছে, কিংবা পরের পদক্ষেপের হিসাব কষছে।
নিশ্চুপতাকে ম্লান করে ভেসে উঠলো ফারিসের গম্ভীর শীতল কণ্ঠ।
--" বড্ড ডানা ঝাপ্টাচ্ছো, লিটল কুইন।"
থামলো সে, আড়মোড়া ভেঙে ভারী স্বরে পুনরায় বলে উঠলো ফারিস।
-- “তোমার ডানা দুটো এবার ছাঁটতেই হচ্ছে তো, লিটল বার্ড।"
___________
প্যালেসের উঁচু দেওয়াল ঘেঁষে থাকা ঝোপ ঝাড়ের ভেতর হঠাৎ কিছুর নড়াচড়া টের পেল ইসরাহ।
ঠিক পর মুহূর্তেই অন্ধকার মাড়িয়ে ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলো রওনাফ। এতক্ষণ সে ওখানেই লুকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ইসরাহ কে দেখতেই দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো সে। কালো ওভার কোট পরিহিত রওনাফ কে চোখে পড়তেই ইসরাহর বুকের ভেতর জমে থাকা অজানা চাপ টা খানিকটা হালকা হয়ে গেল। অজান্তেই তার ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো।
মুচকি হেসে ইসরাহর দিকে তাকালো রওনাফ। নেভি ব্লু লং গাউন পরিহিত ইসরাহর গলার ওড়না দিয়ে মাথা সুদ্ধু মুখ ঢাকা। অন্ধকারের মাঝে ইসরাহর ডাগর অক্ষিযুগল ও অস্পষ্ট। গলা ঝেরে নিচু স্বরে রওনাফ বললো।
--" আর একটু দেরি হলে মশারা আমাকে শহিদ করে দিতো। তখন স্রেফ আমার হাড় গোড় পেতে। সরি সরি, তাও পেতে কি-না সন্দেহ। কোন মাংসাশী প্রাণীর হাতে পড়লে ভবলীলা সাংঙ্গ হতো।"
ইসরাহ মলিন হাসলো। সেই হাসি সেকেন্ড ও গড়ালো না। আবার মিলিয়ে গেলো।
--" তবে যাওয়া যাক।"
ইসরাহর কথায় নিজের কব্জিতে পরা স্মার্ট ওয়াচটাতে ক্লিক করলো রওনাফ। রাত তিনটে বেজে পনেরো মিনিট। ফ্লাইটের আর ঘন্টা খানেক সময় বাকি। এখন বের হওয়াটাই ভালো।
--" হ্যাঁ চলো, সামনের রাস্তায় ক্যাব দাঁড় করিয়ে এসেছি।"
--" ফ্লাইট কয়টায়?"
--" সাড়ে চারটায়। ভিসা, আর পার্সপোট এনেছো?"
--" হু,"
রাতের গা ছমছমে নিস্তব্ধ পাহাড়ি রাস্তার আকা বাঁকা পথের বরফ মাড়িয়ে, পিচ ঢালা রাস্তায় এসে থামলো রওনাফ, ইসরাহ। দুজনে চোখের আড়াল হতেই ফারিসের রুমের জানলার কাছ থেকে বলিষ্ঠ এক ছায়া সরে দাঁড়ালো। জানলার পাশে রাখা রকিং চেয়ার বসলো ফারিস। কাঁটা হাত টা হিংস্র ভাবে মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো সে।
--" কতো দূর যাবে লিটল গার্ল? তুমি মাটির নিচে চলে গেলে ও। আমি তোমাকে মাটি খুঁড়ে বের করে নিয়ে আসবো। সেখানে বাংলাদেশ কোনো ব্যপার ই না।"
ক্যাবের পেছনের দরজাটা খুলে ধরলো রওনাফ। বিনাবাক্যে গাড়িতে উঠে বসলো ইসরাহ। পর পরই দরজাটা টেনে বন্ধ করে ইসরাহর পাশে বসে পড়লো রওনাফ। দু’জনের বসা মাত্রই ড্রাইভার ধীরে গাড়ি ছেড়ে দিলো। ইসরাহ ইচ্ছে করেই রওনাফের থেকে খানিকটা দূরত্ব রেখে বসল। যেন অদৃশ্য এক সীমারেখা টেনে দিয়েছে দু’জনের মাঝে। কিন্তু বাইরের দূরত্বের চেয়ে ও ভেতরের অস্থিরতাই তাকে বেশি গ্রাস করে আছে। মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ইসরাহর। ফারিস, যদি বাঁধনটা খুলতে না পারে? তবে কি হবে?
রিজভি তো কিছুই জানে না। এই জঙ্গলে কারো আনাগোনা ও নেই। অন্ধকার রুমটাতে কতক্ষণ এভাবে বন্দি হয়ে থাকবে ফারিস? চিন্তা গুলো যেন ধারালো কাঁটার মতো বিঁধে যাচ্ছিল ইসরাহর মস্তিষ্কে। আর ভাবতে পারলো না সে। চোখ দুটো আলগোছে বন্ধ করে মাথাটা সিটে ঠেকিয়ে দিলো। শীতের ফিনফিনে বাতাস জানালার ফাঁক গলে এসে তার গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে। অথচ সেই ঠান্ডা হাওয়া তার মাথার ভেতরের চাপটুকু লাঘব করতে ব্যর্থ। বরং, চাপা যন্ত্রণায় কপালের শিরা গুলো টনটন করছে।
আড়চোখে ইসরাহর দিকে তাকালো রওনাফ। ওড়নার আড়ালে অর্ধেক লুকিয়ে থাকা তার মুখ। দৃষ্টি স্থির জানালার বাইরে। ঠিক তখনই বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসা গাড়ির হেড লাইটের তীব্র আলো, এক মুহূর্তের জন্য ইসরাহর চোখে এসে পড়লো। লালচে আলোয় রাঙা দু’চোখ হঠাৎ করেই আলোকিত হয়ে উঠলো।
রওনাফের দৃষ্টি আটকে গেলো সেখানে। চোখ সরাতে পারলো না সে।
সময়ের পরোয়া করলো না রওনাফ। তৃষ্ণার্ত পথিকের অনুরূপ নিষেমেশ তাকিয়ে রইলো তার পাশে বসা রমণীর পানে। বুকের ভেতর বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা পরিত্যক্ত অনুভূতি গুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। ঘোরের মতো আবেশে ঠোঁট নড়ে উঠলো তার। খুব নিচু স্বরে, নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বললো রওনাফ:-
-- “প্রহর শেষে আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস, তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।”
কয়েক মুহূর্ত থেমে রইলো সে। গলার স্বর আর ও ভারী হয়ে এলো, রওনাফের। ধরা গলায় ফের আওড়ালো সে;-
--" আজ আবার ও বলতে বাধ্য হচ্ছি, মুনতাসীর। সত্যিই অসম্ভবের প্রতি আমাদের অদ্ভুত এক টান আছে। আর সেই টান থেকেই হয়তো স্বীকার করছি। আমি এখনো তোমাকে ভালোবাসি।”
রওনাফের সেই স্বীকারোক্তির তার কাঙ্ক্ষিত প্রেয়সী শুনলো না। বুকের চাপা ব্যথা বুকে নিয়েই পুনরায় সামনে তাকালো সে।
___________
বহুদিন পর সিগারেটের আগায় আগুন ধরালো ফারিস।
ক্ষীণ শিখাটা এক মুহূর্ত দপ করে জ্বলে উঠতেই আবছা আলো-আঁধারিতে ডুবে থাকা রুমটা যেন আর ও নিঃসঙ্গ হয়ে উঠলো। ধোঁয়ার সরু রেখা গুলো ধীরে ধীরে বাতাসে ভেসে উঠছে। পাক খেতে খেতে আবার নেমে আসছে। সেই ধোঁয়াই আবার ফারিসের শ্বাসনালী বেয়ে বুকের গভীরে মিশে যাচ্ছে। তবু প্রশান্তি নেই আজ তার। শত চেষ্টা করে ও আজ নিজেকে সামলাতে পারছে না ফারিস। বুকের ভেতর এক অদৃশ্য দহন জ্বলছে — মনের করুণ পীড়ায় দগ্ধ হয়ে উঠেছে তার অন্তর।
আর সেই দহনের আগুনে আরো এক কড়া ঘি ঢেলে দিয়েছে তার প্রিয় নারী।
যাকে নিজের পৃথিবীর কেন্দ্র ভেবেছিল, সেই নারীই আজ তাকে বেঁধে রেখে নির্দ্বিধায় পর পুরুষের সাথে দেশে ফিরে গেছে। অন্ধকারে বসে থাকা ফারিসের ঠোঁটের কোণে কেবল একরাশ নিঃশব্দ তিক্ততা জমে উঠলো। সিগারেটের আগুনটা নিভে যেতে যেতে লালচে অঙ্গারের মতো জ্বলতে লাগলো — ঠিক তার বুকের দহনের ন্যায়।
হন্তদন্ত পায়ে রুমে প্রবেশ করলো রিজভি। ছুটে এসে ফারিসের সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো সে। ব্যস্ত গলায় রিজভি জিজ্ঞেস করলো;-
--" এতো রাতে ডাকলেন যে বস? কিছু হয়েছে? ম্যাম ঠিক আছেন তো?"
রক্তিম আভায় ছেয়ে যাওয়া চোখ জোড়া মেঝেতে থেকে তুলে রিজভির দিকে দৃষ্টিপাত করলো ফারিস। পর পর পাশে থাকা আলকোহলের গ্লাস টা তুলে এক ঢোকে সম্পূর্ণ গ্লাস ফাঁকা করে ফেললো সে। রিজভি অবাক চোখে তা দেখলো। ভয় আর চিন্তায় এক প্রকার জোরেই বলে উঠলো সে;-
--" বস আপনি ড্রিংকস করছেন? বস আপনি সত্যিই আমার বস?"
রিজভির বোকা বোকা প্রশ্নে বেশ বিরক্ত হলো ফারিস।
--" উল্টো পাল্টা বকবি না রিজভি। একটা লাথি দিবো।"
শুকনো ঢোক গিললো রিজভি। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থেকে ইতস্তত ভঙ্গিতে তাকালো ফারিসের দিকে। গলার স্বরটা কেমন যেন শুকনো শোনালো তার:—
--" বস… আমি কি এক পেগ খেতে পারি? আপনি অনুমতি দিলে,,,"
কথাটা বলেই আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিলো রিজভি। যেন অনুমতি পাওয়ার আগে ফারিসের মনের অবস্থা বুঝতে চাইছে।