মাঝে আবার একটা সপ্তাহ বেশ ভালো মতোই কাটল নিবিড় মোহিনীর। ভালোমতোই গেছে বলতে ঝগড়াঝাটি ছাড়া গেছে। নয়তো দুজন দুজনের সাথে কথাবার্তা তেমন একটা বলেনি। একজনের খুব প্রয়োজন হলে অন্যজনকে গিয়ে কিছু বললে বিপরীত পাশ থেকে শুধু হ্যাঁ কিংবা না তে উত্তর দিয়েছে। কথা বাড়ানোর কোন ইচ্ছে হয়নি। কেননা আজকাল কথা বাড়ানোর চেষ্টা করলেই ঝগড়া হয়। আর এমনিতেই বাচ্চাদের উপর ওদের ঝগড়ার খারাপ প্রভাব পড়ছে। তাই আর কথাই বাড়াতে চায়নি।
একটা অফিসিয়াল কাজে মোহিনী আজ নিবিড়ের অফিসে এসেছে। মিটিং শেষে ভাবলো একটু নিবিড়ের সাথে দেখা করা যাক। যদিও দেখা করলে বলার মতন কোন কথা খুঁজে পাবে না। কিন্তু তারপরও মনে হলো একবার চোখের দেখা দেখে যাওয়াই যায়।
নিবিড়ের ডেস্কের সামনে গিয়ে দেখলো ও নেই। এই অফিসে অনেকেই মোহিনীর পরিচিত। শুরুর দিকে দুজনে একসঙ্গে এই অফিসেই চাকরি করতো। পরে মোহিনী অন্য অফিসে চলে গিয়েছে। কিন্তু নিবিড় এখানেই থেকে গেছে। যার কারণে অনেকেই পরিচিত রয়েছে মোহিনীর। সেই পরিচিতদের মধ্যে থেকেই একজনকে গিয়ে নিবিড়ের কথা জিজ্ঞেস করলো। ছেলেটা বলল নিবিড় নাকি কফি খেতে গেছে।
ছেলেটার দেখিয়ে দেওয়া দিকে মোহিনী গেল। নিবিড় কে দেখতে পেল দূর থেকে। হাতে একটা কফির মগ। কফি খাচ্ছে আর হাসছে। পাশে ফারিনকেও দেখতে পেল মোহিনী। এমনটা না যে শুধু নিবিড়ের পাশে ফারিনই দাঁড়িয়ে আছে। ওরা একসঙ্গে অনেকেই দাঁড়িয়ে থেকে কফি খাচ্ছে আর আড্ডা দিচ্ছে। তবে মহিনীর চোখ বাকি কারো উপরে পড়ল না। শুধু গিয়ে পড়লো ফারিনের ওপর যে নিবিড়ের খুবই কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে।
মুহূর্তের মাঝে মেজাজটা চটে গেল মোহিনীর। তার মানে আজকাল নিবিড় পুরোটা সময় এই মেয়েটার সাথেই থাকে। একটা মুহূর্তও ওকে ছাড়া থাকা যায় না। বেশ, ঠিক আছে। নিবিড় তবে ওই মেয়েটার সাথেই সময় কাটাক। মোহিনীকে তো কোন প্রয়োজন নেই। আর কথাই বলার ইচ্ছে হলো না মোহিনীর নিবিড়ের সাথে। যেহেতু কাজ শেষ তাই চলে গেল।
কফি খাওয়া শেষে নিবিড় আবার কাজের জন্য নিজের ডেস্কে এসে বসতেই ওর পাশের ছেলেটা বলে উঠলো,
“ভাবির সাথে দেখা হয়েছিল তোমার?”
নিবিড় ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“ভাবি? কার ভাবি? কোন ভাবি?”
“আরে আমাদের ভাবি। আর তোমার বউ। ভাবি তো এসেছিলেন। কাজ ছিল এখানে। মিটিং শেষে তোমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। কিন্তু এখানে তুমি ছিলে না। তাই আমি বললাম তুমি কফি খেতে গেছো। সেদিকেই তো গিয়েছিলো ভাবি। সত্যি দেখা হয়নি?”
নিবিড় আহাম্মকের মতন ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কই না তো। ও তো আসেনি।”
“ওহ্। তাহলে বোধহয় ভাবি খুঁজে না পেয়ে চলে গেছে। কিন্তু খুঁজে না পেলে ফোন তো ছিল। কল করলো না কেন?”
নিবিড় নিজেও একটু ভাবনার মাঝে ডুবে গেল। ঠিকই তো কল করলো না কেন। ভাবলো হয়তো কোনো জরুরী কাজ পড়ে গিয়েছিল। সেজন্য বোধহয় তাড়াতাড়ি চলে গেছে।
এই নিয়ে আর বেশি কিছু ভাবলো না আপাতত নিবিড়। চুপচাপ আবার নিজের কাজে মনোযোগ দিল।
___________
মোহিনী অফিস থেকে বেরিয়ে আজ গিয়েছিলো ওদের বসের ম্যারেজ অ্যানিভার্সারির পার্টিতে। আসার ইচ্ছে ছিল না মোহিনীর। একপ্রকার বাধ্য হয়েই এসেছে। আপাতত ওনারা কেক কাটছে। মোহিনী এক পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে দৃশ্যটা উপভোগ করছে। এর মাঝে ওর ফোনটা বেজে উঠলো। ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে দেখলো নিবিড় কল করেছে।
মোহিনী নিবিড়ের নাম্বারটা দেখে ভীষণ অবাক হলো। যেখানে সামনাসামনিই ওদের আজকাল কথা হয় না, সেখানে ফোনে কথা হবে সেটা তো ভাবাও ভুল।
যাইহোক, আপাতত এত কিছু ভাবনাচিন্তা না করে মোহিনী কলটা রিসিভ করে কানে ধরে গম্ভীর গলায় বলল,
“শুনছি।”
মোহিনীর গম্ভীর কণ্ঠস্বরটা শুনে অপর পাশ থেকে নিবিড়ের কণ্ঠস্বরটাও গম্ভীর হলো।
“বাইরে থেকে ডিনার করে আসব আমি। খেয়ে নিতে পারো।”
“আজ হঠাৎ জানানোর প্রয়োজন মনে করলে যে?”
“জানালেও দোষ, না জানালেও দোষ। তাহলে করবোটা কি তুমি বলে দাও।”
মোহিনী একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবারো গম্ভীর গলায় বলল,
“কখন ফিরবে?”
“একটু দেরি হবে।”
“দেরি হবে বলতে কি বোঝাতে চাইছো, ভোর হয়ে যাবে? অন্যান্য দিনেই তো বাড়ি ফিরতে বারোটা বেজে যায়। তাহলে আজকে দেরি মানে নিশ্চয়ই ভোর। তাহলে বাড়ি ফেরার দরকার নেই। একটু পর তো আবার অফিসেই যেতে হবে।”
অপর পাশ থেকে নিবিড় খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“তুমি এখনো বাড়ি ফিরেছো যে আমাকে বাড়ি ফেরা নিয়ে এত কথা শোনাচ্ছো?”
“এখন ঘড়িতে বাজে আটটা। আমি নয়টার আগে ঠিক বাড়ি পৌঁছে যাব। সে খেয়াল আমার আছে। তুমি কি নয়টার মাঝে ফিরতে পারবে?”
নিবিড় একটু আমতা করে বলল,
“না হবে না। আরেকটু দেরি হবে।”
“যা ইচ্ছে তাই করো। যখন ইচ্ছে বাড়ি এসো। তোমার তো আবার আজকাল বেশি রাত হয়ে গেলে গাড়ি-ঘোড়া পাবে কিনা সেসবের চিন্তাও নেই। বড় গাড়িতে করে রেখে যাওয়ার মানুষ আছে।”
কথাটা বলে মোহিনী ফোনটা কেটে দিলো।
পার্টি থেকে বেরোতে বেরোতেই মোহিনীর সাড়ে নয়টার মতন বাজলো। স্কুল থেকে ফেরার পর বাচ্চাদের দেখাশোনা করার জন্য একজন লোক রাখা হয়েছে। সেই মহিলা আবার প্রতিদিন নয়টার মাঝে নিয়ম করে চলে যায়। তবে আজ মোহিনীর জোড়াজুড়িতে থেকে গেছে। তবে সেই মহিলা এখন সমানে কল করে যাচ্ছে যেন তাড়াতাড়ি মোহিনী চলে আসে। বাড়িতে নাকি আবার ওনার ছেলেমেয়েরাও একা।
এই তাড়াহুড়োর মাঝে আরেক বিপত্তি বাঁধলো। গাড়ি পাচ্ছে না মোহিনী। এখনো তো খুব বেশি রাত হয়নি। তাও কোন ফাঁকা গাড়ি পাচ্ছে না। ভাবলো একটু হেঁটে এগিয়ে যাবে। সঙ্গে আরেক কলিগ সাদিয়াও আছে। মোহিনী এতো দ্রুত পায়ে হাঁটছে যে সাদিয়া ওর সাথে তাল মেলাতে পারছে না। সাদিয়া কে এত ধীরগতিতে হাঁটতে দেখে মোহিনী বিরক্তিকর গলায় বলল,
“একটু তাড়াতাড়ি হাঁটবি তুই। তোর না হয় বাড়িতে বাচ্চাকাচ্চা নেই, আমার তো আছে।”
“আরে বাবা জোরে হাঁটতে পারছি না আমি। তোর শরীর দেখ আর আমার শরীর দেখ। এই শরীরে এত জোরে হাঁটা যায়!”
“তাহলে তুই থাক। আমি গেলাম।”
কথাটা বলে মোহিনী হাঁটার গতি আরো বাড়ালো আর বিড়বিড় করে সাদিয়াকে গালি দিলো। মোহিনীর বিড়বিড় করার মাঝেই হঠাৎ করে পিছন থেকে সাদিয়া চেঁচিয়ে উঠলো ওর নাম ধরে। মোহিনী খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“কি হয়েছে?”
সাদিয়া দৌড়ে এসে মোহিনীর হাত টেনে ধরে আঙুলের ইশারায় রাস্তার অপর পাশে দেখিয়ে বলল,
“এই দেখ, ওটা ভাইয়া না?”
“কার ভাইয়া?”
“আরে ভাইয়া মানে তোর বর। নিবিড় ভাইয়া না ওটা? ওই যে দেখ একটা মেয়ের সাথে।”
নিবিড়ের সাথে একটা মেয়ে কথাটা কানে যেতেই মোহিনীর বুকটা ধ্বক করে উঠলো। আর পা উঠতে চাইলো না। বাধ্য হলো থামতে। রাস্তার অপর পাশে তাকাতেই দেখলো সত্যি নিবিড় দাঁড়িয়ে আছে। ওর বিপরীত পাশে দাঁড়িয়ে আছে ফারিন। একটা রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুজন। কি সব যেন কথা বলছে দুজন, এত দূর থেকে তো শোনা সম্ভব না।
মোহিনীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো ওদের দুজনকে একসঙ্গে দেখে। তার মানে আজকেও নিবিড় ফারিনের সঙ্গেই রাতে খেয়ে যাবে। এতটা সময় তার মানে ফারিনের সাথেই কাটাচ্ছে। এরপরেও নিবিড় বলবে যে ব্যাপারটা স্বাভাবিক? এরপরও নিবিড় বলবে যে ওর চরিত্রের কোন দোষ নেই?
মোহিনীর এসব ভাবনার মাঝেই পাশ থেকে সাদিয়া বলে উঠলো,
“ওই মেয়েটা কে রে?”
“ওর কলিগ।”
“তাহলে এর সাথে ডিনারে এসেছে। তুই চিনিস ওই মেয়েটা কে? তুই আসতে দিয়েছিস কেন? তোদের সম্পর্ক ঠিক যাচ্ছে না। তার মাঝে আবার এসব কি? তুই আজকেই গিয়ে নিষেধ করে দিবি ভাইয়া কে বুঝেছিস?”
“উঁহু। করবো না আমি নিষেধ। ওর বিবেক ওকে যা করতে বলেছে তাই করেছে। এত বছর সংসারের পর যদি তৃতীয় পক্ষের কারণে আমাদের মাঝে দূরত্ব তৈরি হয় তাহলে আমার সত্যি কিছু বলার নেই। ও যা করছে ওকে করতে দে।”
মোহিনী ভেবেছিল চুপচাপ চলে যাবে সেখান থেকে। তবে তার আগেই একটা ভয়ানক ঘটনা ঘটে গেল। যাতে মহিনীর চোখ দুটো একেবারে ঝাপসা হয়ে গেলো। রাস্তার মাঝে হঠাৎ করে মেয়েটা জড়িয়ে ধরলো নিবিড় কে। নিবিড় চুপচাপ মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে আছে। ও মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরেনি কিন্তু চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তারমানে ওদের সম্পর্কটা বেশ ভালোই দূর এগিয়ে গেছে! দুজন দুজনকে এভাবে কাছাকাছি পেতে চাইছে!
বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না মোহিনী ওদের দিকে। কয়েক সেকেন্ড মতন তাকিয়ে থাকার পর নিজের চোখটা ঘুরিয়ে নিল। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো জল। সাদিয়া রাগান্বিত গলায় বলল,
“এইজন্য তাহলে তোর বরের এত অবনতি হয়েছে। চলতো আমার সঙ্গে। আজ রাস্তাতেই তোর বরের একটা ব্যবস্থা করে রেখে যাবো।”
মোহিনী সাদিয়ার হাত ধরে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“প্রয়োজন নেই। দুই বাচ্চার বাপ হওয়ার পরও যদি ওর এতোটুকু আক্কেল না হয় তাহলে আমি আর নতুন করে ওর আক্কেল তৈরি করার চেষ্টাও করতে চাই না। এই বয়সে যখন ওর পরকীয়া করার ইচ্ছে হয়েছে, তাহলে তাই করুক।”
মোহিনীর ভাগ্যটা হঠাৎ করেই প্রসন্ন হলো। একটা রিকশা পেয়ে গেল। কোন কিছু না বলে রিকশাতে উঠে পড়লো। সাদিয়াকে নিলোও না সঙ্গে করে। মোহিনী সেখান থেকে চলে যেতেই সাদিয়া রাস্তা পার হয়ে গেল নিবিড়ের কাছে। রাস্তাটা ফাঁকাই ছিল। সময় লাগলো না পার হতে। সাদিয়া নিবিড় এর কাছে যেতে যেতে আবার আরেক কান্ড ঘটলো। নিবিড় হঠাৎ করেই ফারিনকে নিজের থেকে এমন ভাবে ছাড়িয়ে দূরে সরিয়ে দিল যে ফারিন হুমড়ি খেয়ে পিচ ঢালা রাস্তার উপরে পড়ে গেল।
এই দৃশ্যটা দেখে অন্তত একটু হলেও শান্তি পেল সাদিয়া। তবে তারপরও মাথায় তো আগুনটা দাউ দাউ করে জ্বলছেই৷ নিবিড় ফারিন কে উদ্দেশ্য করে কিছু বলতেই যাচ্ছিল। তবে তার আগে সাদিয়া এসে সামনে দাঁড়ালো। সাদিয়া পরিচিত নিবিড়ের জন্য। খুব ভালো করেই চেনে। সেই সাথে সাদিয়াকে দেখতেই এটাও বুঝে গেল যে আশে পাশে মোহিনীও আছে। কেননা অফিস থেকে দুজনে একসঙ্গেই বাড়ি ফেরে। সঙ্গে সঙ্গে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো নিবিড়ের। আতঙ্কিত গলায় সাদিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মোহিনী কোথায়?”
সাদিয়া রাগান্বিত গলায় বলল,
“ম'র'তে গেছে।”
“কিইই? কোথায় গেছে?”
“বললাম না ম'র'তে গেছে। আপনার মতন বর যে মেয়ের আছে তার কি না ম'রে কোন উপায় আছে। কি জন্য বেঁচে থাকবে? স্বামীর পরকীয়া দেখার জন্য নাকি যেখানে সেখানে অন্য একটা মেয়ে এসে তার স্বামীকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকবে সে সব দেখার জন্য বেঁচে থাকবে? লজ্জা নেই আপনার তাই না? বাড়িতে দুটো ফুটফুটে বাচ্চা, মোহিনীর মতন এত সুন্দরী, গুনী বউ থাকতে রাস্তাঘাটে মেয়েদের সাথে প্রেম করে বেড়াচ্ছেন। ছিঃ! আপনাকে আমি ভালো ভেবেছিলাম। কিন্তু আপনি হলেন একটা মাকাল ফল। বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর, কিন্তু ভেতরটা একেবারে দূর্গন্ধময়।”
নিবিড় ধমকের সুরে সাদিয়া কে বলল,
“শাট আপ। কি যা তা কথা বলছেন? আমাকে আপনি চেনেন কতটুকু যে আমার সম্বন্ধে এ ধরনের আজেবাজে কথা বলছেন?”
“আলাদা করে চেনার কি প্রয়োজন আছে? রাস্তাঘাটে যেসব করে বেড়াচ্ছেন যে কেউ বুঝে যাবে আপনি কেমন। ছি ছি ছি। আপনার মতন একজন লোকের মোহিনী এত প্রশংসা করতো আমাদের কাছে! আপনার মতন পুরুষ মানুষকে বিয়ে করার থেকে সারা জীবন অবিবাহিত থেকে যাওয়া ভালো। এর থেকে বিধবা হয়ে যাওয়া ভালো কিংবা নিজে ম'রে যাওয়া ভালো।”
“দেখুন, এখন আমার আপনার আজেবাজে কথা শোনার সময় নেই। মোহিনী কোথায়?”
“বললাম না ম'র'তে গেছে।”
“বাজে কথা বন্ধ করবেন? প্লিজ বলুন মোহিনী কোথায়? রিকুয়েস্ট করছি।”
“আপনার রঙ্গ তামাশা দেখে চলে গেছে। এখন কোথায় গেছে জানিনা। যে অবস্থায় ছিল বলা যায়না ভুলভাল কোন কাজ করেও ফেলতে পারে। যদি আপনার রাস্তায় দাঁড়িয়ে নষ্টামি করা শেষ হয়ে থাকে দয়া করে এবার একটু বউকে খুঁজতে যান। আর একটা কথা মনে রাখবেন, যদি মোহিনী উল্টোপাল্টা কিছু করে ফেলেছে আপনি কিন্তু শেষ। আমি কিন্তু আপনার পরকীয়ার সাক্ষী হয়ে থেকে গেলাম।”
নিবিড় আর আগে পিছে কোন কিছু শোনার প্রয়োজন মনে করলো না। দৌড়ে সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে ফারিন উঠে আবার ওর হাত টেনে ধরল। নিবিড় এক ঝটকায় ফারিনের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে শাসিয়ে বলল,
“বাড়াবাড়ি করবেন না। আমি একটু মিষ্টি করে দুটো কথা বলেছি আর আপনার তো দেখছি ডায়াবেটিস ধরে গেছে। শুধুমাত্র বন্ধু হিসেবে দু'চারটা স্বাভাবিক কথা বলেছি বলে, দু একদিন ডিনারে এসেছি বলে ভালোবেসে ফেলিনি আপনাকে।”
ফারিন অসহায় গলায় বলল,
“আমার তো তোমাকে দেখে মনে হয়েছিল নিবিড় যে তুমি আমায় পছন্দ করো। আমি শুনেছিলাম তোমার ওয়াইফের সাথে তোমার রিলেশনটা ভালো যাচ্ছে না। কিন্তু তুমি আমার সাথে অনেকটা সময় কাটাতে, ভালোভাবে কথা বলতে। আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো আমার সাথে জড়িয়ে পড়েছো। আমি জড়িয়ে পড়েছি তোমার সাথে। আই রিয়েলি লাভ ইউ।”
“রাখুন তো আপনার ভালোবাসা। ভুলটা আসলে আমারই হয়েছে। আসলে আমি ভুল করেছি। আমার ঢিল দেওয়াটাই উচিত হয়নি। যেই না একটু ঢিল দিয়েছে আপনি একেবারে টান দিয়ে জড়িয়েই ধরেছেন। যাই হোক, মাফ চাই আপনার কাছে। দয়া করে আমার আশেপাশে আর কখনো আসবেন না। কোন ভালোবাসা নেই আপনার প্রতি আমার।”
_________
নিবিড় বাড়িতে গিয়ে দেখলো দরজাটা খোলাই আছে। তারমানে মোহিনী বাড়িতে এসেছে। দরজাটা খুলে জুতো পড়েই ভেতরে ঢুকে গেল। মোহিনীর নাম ধরে ডাকলো। তবে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না মোহিনীর। সোজা নিজেদের ঘরে গেল। ঘরে লাইট জ্বলছে কিন্তু মোহিনী কোথাও নেই। রান্না ঘরে গিয়ে দেখল সেখানেও নেই। বাচ্চাদের ঘরে গেল। অবাক করার বিষয় হলো এই ঘরে না মোহিনী আছে, না বাচ্চারা আছে। গেল কোথায় তিনজন?
বাধ্য হয়ে নিবিড় আবার গ্যারেজে গেল দেখতেে যে গাড়িটা আছে কিনা। গাড়িটা আছে। তার মানে গাড়ি নিয়ে যায়নি। নিবিড় এবার দারোয়ানের কাছে গিয়ে হাঁপানো গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“চাচা, আমি তিন তলায় থাকি। আমার স্ত্রী আর বাচ্চা কে তো চেনেন? ওরা কি বাইরে গেছে?”
লোকটা একটু মনে করার চেষ্টা করে বলল,
“হ। একটু আগেই তো বাইরে গেল। তোমার বউ কানতাছিল। মনে হয় কিছু হইছে তাই না?”
“বাচ্চাদের সঙ্গে করে নিয়ে গেছে?’
“হ।”
“কিসে গেছে? মানে কেউ কি এসেছিল ওদের নিতে যাদের এর আগে আপনি আমাদের বাড়িতে আসতে দেখেছেন?”
“না তো। সিএনজি ডাইকা উইঠা পড়ছিলো।”
নিবিড় এক হাতে মাথার চুল টেনে ধরলো। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। গাড়ির চাবিটা নিয়ে এসে গাড়ি নিয়ে বের করলো। দারোয়ানের কথা অনুযায়ী একটু আগে বেরিয়ে ছিল। তাহলে খুব বেশি দূর হয়তো যেতে পারেনি। সিএনজিতে উঠেছিল। কিন্তু শহরে তো আর কম সিএনজি নেই। কোন রাস্তায় গেছে সেটাও তো জানে না। মোহিনীর তো যাওয়ার জায়গার অভাব নেই। কত বন্ধু বান্ধব, চেনা পরিচিত, আত্মীয়-স্বজন।
সম্ভাব্য সব জায়গাতেই খোঁজ করলো নিবিড়। তবে এখন অব্দি মোহিনী কারো বাড়িতে যায়নি। নিবিড় সবাইকে বলে রাখলো যেন মোহিনী গেলে ওকে একবার কল করে জানায়। অনেকে যেমন কারণটা বুঝতে না পেরে চিন্তিত হলো, অনেকে তেমনই আবার কারণটা বুঝতে পেরে নিবিড় কে গালিগালাজও করলো। সবাই ভাবলো যে নিবিড়ের সঙ্গে নিশ্চয়ই ঝগড়া করে মোহিনী চলে গেছে। কিন্তু আসল কারণটা কেউই জানে না। নিবিড় কাউকে বলতেও পারলো না আসল কারণটা। হন্যে হয়ে শুধু খুঁজতে লাগল মোহিনী কে। কে জানে কোথায় চলে গেল!