তোমার নামেই গল্প হোক

পর্ব - ৬

🟢

সকালের দিকে মোহিনীর অফিসে যাওয়ার তাড়াহুড়ো থাকলেও শেষে আজ আর যাওয়াই হয়নি। ছুটি নিয়েছিল। ওদের বাড়ির লোকজনও সবাই চলে গিয়েছে। সবাই আশাহত। যেখানে ওরা দুজনে একেবারে মনস্থির করেই ফেলেছে সেখানে ওনারা আর কিইবা করতে পারেন। বরং এই ঘটনার মাঝে যদি ওনারা থাকেন তাহলে হয়তো ব্যাপারটা আরো গোলমেলে হয়ে যাবে। ওদের দুজনের কথা বলা দরকার। সময় কাটানো দরকার। সেইজন্য অনেক কিছু ভাবনা চিন্তা করেই ওনারা সবাই চলে গিয়েছেন।

নিবিড় তখন বাড়িতে ছিল না। বাচ্চারা স্কুলে চলে গিয়েছিল। দুপুরের দিকে সবাই চলে গিয়েছেন। যাওয়ার আগে মোহিনীর বাবা-মা কিংবা ওর বোন কেউই ওর সাথে কথা বলেনি। তিনজন মানুষই ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। তবে শ্বশুর শাশুড়ি আর দেবর কথা বলেছে মোহিনীর সাথে। ওনাদের পক্ষে যতটা সম্ভব ততটা মোহিনীকে বুঝিয়েছেন ওনারা। একবারের জন্য মোহিনীকে দোষারোপ করেননি। ওনারা নিজেদের বাড়ির ছেলেরই দোষ দিয়েছেন। শুধু মোহিনী কে অনুরোধ করেছেন যেন নিবিড়ের ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে একটু কষ্ট করে থেকে যায়। নিবিড় কে যেন শোধরানোর চেষ্টা করে। বাচ্চা দুটোর কথা ভেবে হলেও যেন নিজেদের মাঝে তৈরি হওয়া রাগারাগিটা মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।

মোহিনী শুধু চুপচাপ শুনে গিয়েছিল ওনাদের কথাগুলো। ওনারা না জানলেও মোহিনী তো জানে যে এই ঝামেলা মোহিনী অনেক বার শোধরানোর করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ভবিষ্যতেও হয়তো আর সম্ভব হবে না। ওদের দুজনের পথচলা বোধহয় এত দূর অব্দিই ছিল।

_______

আজ মোহিনী কে অবাক করে দিয়ে বিকেলের দিকে নিবিড় বাড়ি এলো। এখন তো ওর অফিস ছুটি হওয়ার কথা না। এত তাড়াতাড়ি কেন এলো নিবিড় সেটা বুঝে উঠতে পারল না। তবে নিবিড় কে আর কোন কিছু জিজ্ঞেস করার ইচ্ছেও হলো না। কেন না জানে জিজ্ঞেস করলে ঝামেলা তৈরি হতে পারে। হয়ত নিবিড় পছন্দ করবে না মোহিনীকে জবাবদিহি করতে। হয়তো এটাও ভাবতে পারে যে নিবিড়ের তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসাটা মোহিনীর পছন্দ হয়নি।

দরজাটা খুলে দিয়ে মোহিনী চুপচাপ আবার ঘরের দিকে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে নিবিড়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। একটু অন্যরকম শোনালো নিবিড়ের কন্ঠটা। কোন রাগ, তেজ কিচ্ছু নেই। একটু নরম শোনালো।

মোহিনী পিছন ফিরে তাকিয়ে বলল,

“কি?”

নিবিড় কেমন যেন আমতা আমতা করছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা বলতে চাইছে কিন্তু বলতে পারছে না। মোহিনীর কপালে গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো। আজকাল তো নিবিড় কোন কিছু বলার আগে এত ভাবে না। তাহলে এখন আবার কি এমন বলবে যে এত ভাবতে হচ্ছে। তাহলে কথাটা কি খুবই বেশি জঘন্য? তাহলে কি নিবিড় ডিভোর্সের ব্যবস্থা একেবারে করেই এলো?

“কি হয়েছে? আমতা আমতা করছো কেন?”

“এক জায়গায় বেরোতে হবে আমাদের।”

“কোথায়?”

“যেতে যেতে বলছি। বাচ্চারা কোথায়? ওদেরকে যাওয়ার সময় সুমাইয়ার বাড়িতে রেখে যাব।”

মোহিনী এবার কিঞ্চিত বিরক্তির স্বরে বলল,

“কিন্তু কোথায় যাবে সেটা তো আমায় বলতে হবে। বাচ্চাদেরকে আবার ওখানে রেখে যাব কেন? ওরা সাথে গেলে সমস্যা কি?”

নিবিড় একটুও বিরক্ত হলো না। একটু রেগেও গেল না। বরং আবারও শান্ত গলায় মোহিনী কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“সমস্যা আছে। পরে বলছি তোমায়। একটু তাড়াতাড়ি চলো প্লিজ।”

মোহিনী বুঝলো এই ছেলেকে জিজ্ঞেস করে লাভ হবে না। তাড়াহুড়ো করে বাচ্চাদের কে নিয়ে নিচে নামলো। ওদের নিজস্ব গাড়ি আছে৷ দুজনেরই ভীষণ শখ ছিল একটা নিজের গাড়ি কেনার। মোহিনীর বাবা অবশ্য ওদেরকে একটা গাড়ি উপহার দিতে চেয়েছিল। তবে সেই উপহার না নিবিড় গ্রহণ করতে রাজি ছিল আর না মোহিনী।

কেননা মোহিনী জানত সেই উপহারটা নিলে নিবিড়ের আত্মসম্মানে আঘাত করা হতো। ওদের সম্পর্ক কে অপমান করা হতো। মোহিনী তো সাহস করে একটা মধ্যবিত্ত বাড়ির বেকার ছেলের হাত ধরেছিল। মোহিনী নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিল যে একদিন ওরা দুজন মিলে অনেক বড় হবে। ওরা দুজন মিলে ওদের সংসারটা খুব সুন্দর করে সাজাবে। নিজেদের সব শখ পূরণ করবে। সেখানে এত বড় একটা শখ কি করে অন্য কাউকে পূরণ করতে দিত! নিবিড় কষ্ট পেত তো।

সুমাইয়া হলো ওদের দুজনেরই কলেজ ফ্রেন্ড। ওদের ফ্রেন্ড সার্কেলের অন্যতম চঞ্চল একটা মেয়ে। সুমাইয়ার আবার ওদের বন্ধু রেজার সাথেই বিয়ে হয়েছে। ওদের বাচ্চাদের সাথে নিশাত আর মাহির আবার বেশ ভাব। ওদের ওখানে রেখে গেলে কোন সমস্যা হয় না। মাঝে মাঝেই যদি চাকরির সূত্রে শহরের বাইরে যাওয়ার হয় তাহলে সুমাইয়াদের বাড়িতেই রেখে যায় বাচ্চাদের। মাঝে মাঝে স্কুল থেকেও সুমাইয়া ওদেরকে নিজের বাড়িতে নিয়ে চলে আসে। দুজনের ছেলে মেয়ে একই স্কুলে পড়ে সেজন্য সুবিধাও হয়েছে।

বাচ্চাদের সুমাইয়ার বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে এসে নিবিড় আবার গাড়িতে উঠলো। গাড়ি ছাড়তেই মোহিনী এবারে নিজের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারলো না। এখন তো একটু একটু চিন্তা হচ্ছে। আবারো জিজ্ঞেস করলো নিবিড় কে,

“কোথায় যাচ্ছি প্লিজ বলবে আমায়? আমার কিন্তু এবার চিন্তা হচ্ছে নিবিড়।”

নিবিড়েরও মনে হলো এবার একটু কিছু বলা দরকার। নয়তো একেবারে ঘটনাটা একটু বেশি ধাক্কা দিতে পারে। একহাত স্টিয়ারিং এ রেখে অন্য হাতে মোহিনীর হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বলল,

“শোনো, প্যানিক করার কিছু নেই। একদম ভয় পাবে না। অস্থির হবে না। কান্নাকাটি তো মোটেই করবে না।”

মোহিনী আতঙ্কিত গলায় বলল,

“কি হয়েছে? সব ঠিক আছে তো?”

“বাবা হার্ট এটাক করেছে।”

একবারে মোহিনী এই কথাটা ঠিক মেনে নিতে পারল না। নিবিড় আসলে কার বাবার কথা বলছে সেটাও বুঝতে পারল না। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কার কথা বলছো? কার বাবা?”

“তোমার বাবা। যাওয়ার সময় রাস্তার মাঝেই ওনার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। ওনাদের গাড়িতে নাঈম আর মিতালীও ছিল। নাঈমই কল করে আমায় জানিয়েছে। বাবা কে হসপিটালে এডমিট করা হয়েছে।”

মোহিনী তৎক্ষণাৎ কোন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারলো না। কিছুক্ষণের জন্য যেন জ্ঞান বুদ্ধি হারিয়ে গেল। থমকে গেল। ভাবনা চিন্তা করতে, কথা বলতে ভুলে গেল। মোহিনীর থেকে এতক্ষণেও কোন উত্তর না পেয়ে নিবিড়ের চিন্তা বাড়লো।

“চুপ করে আছো কেন মোহিনী? কিছু বলো। চিন্তা করো না বাবা ঠিক আছে।”

হঠাৎ করে মোহিনী ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,

“আমার জন্য বাবার এমন হয়েছে। আমার জন্য বাবা অসুস্থ হয়ে গেছে নিবিড়। আমি দায়ী বাবার এই অবস্থার জন্য।”

বিজ্ঞাপন

নিবিড় তাড়াহুড়ো করে গাড়িটা থামালো। সিট বেল্টটা খুলে মোহিনীর দিকে ঘুরে বসে ওর হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে বলল,

“তোমার জন্য কিচ্ছু হয়নি। আর তুমি কান্নাকাটি করছো কেন? বললাম না বাবা ঠিক আছে। নাঈমের সাথে আমার একটু আগেও কথা হয়েছে। প্লিজ কান্নাকাটি করো না।”

মোহিনী মানতে পারল না নিবিড়ের কথা। কাঁদতে কাঁদতেই ফের বলল,

“না নিবিড়। বাবার এই অবস্থার জন্য আমি দায়ী। আমি সবসময় বাবা-মাকে কষ্ট দিয়েছি। আমি কখনো বাবা-মায়ের ভালো সন্তান হয়ে উঠতে পারিনি। আমি সব সময় শুধু আমার বাবা-মায়ের সম্মান ডুবিয়েছে। আমি কখনো ওদের গর্বের কারণ হতে পারলাম না। আজ দেখো আমার জন্য আমার বাবার শরীরের অবস্থা এই পর্যায়ে চলে এলো। আমি খুব খারাপ মেয়ে নিবিড়।”

__________

আকরাম চৌধুরীর অবস্থা এখন একটু ভালো। মোহিনীর মা বোন কেউই ওর সঙ্গে কথা বলছে না। বরং হাসপাতালে মোহিনী আসার পর ওর মায়ের কাছে বেশ কথা শুনতে হয়েছে। নার্গিস খানমও মোহিনীকেই দায়ী করেছেন ওনার স্বামীর এই অবস্থার জন্য। মোহিনীর কাছে তখন বলার মতন কিছুই ছিল না। চুপচাপ শুধু শুনে গেছে সবার বলা কথাগুলো। আর চোখ দিয়ে পানি ফেলেছে।

ওনারা তো কেউ ভুল বলছেনা। সত্যি মোহিনীই দায়ী ওর বাবার এই অবস্থার জন্য। মোহিনীর কথা চিন্তা করতে গিয়েই তো মানুষটা অসুস্থ হয়ে গেছে। যদি মোহিনী আজ ওর বাবাকে এতটা চাপ না দিয়ে এই পরিস্থিতিতে না ফেলত তাহলে হয়ত উনি অসুস্থই হতেন না।

আকরাম চৌধুরীর সাথে একে একে সবাই দেখা করে এলেন। তবে সাহস হলো না মোহিনীর ভিতরে যাওয়ার। আকরাম চৌধুরী অবশ্য একবারও মোহিনীর সঙ্গে দেখা করতে চাননি। তিনি খোঁজও নেননি যে মোহিনী এসেছে কিনা। নিবিড় বলল দেখা করতে যেতে তবে মোহিনী এখন যেতে আপত্তি জানালো। বলল যখন উনি ঘুমোবে তখন গিয়ে একবারে চুপিসারে দেখে আসবে। নয়তো ওর বাবার মুখোমুখি হওয়ার সাহস কিংবা ওনার চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস নেই মোহিনীর।

বাধ্য হয়ে শেষে নিবিড় একাই গেলো ওর শ্বশুরের সঙ্গে দেখা করার জন্য। কেবিনে গিয়ে একটা স্টুল টেনে ওনার পাশে বসে একবার ধীর গলায় ডাকলো বাবা বলে। আকরাম চৌধুরী চোখ মেলে তাকালেন।

“এখন ঠিক আছেন বাবা? কোন অসুবিধা হচ্ছে?”

আকরাম চৌধুরী দুর্বল গলায় বললেন,

“না। ঠিক আছে আমি।”

“কি দরকার ছিল বলুন তো অযথা এতো দুশ্চিন্তা করার। আমাদের ভাগ্যে যেটা ছিল সেটাই হত। কেন আজেবাজে চিন্তা গুলো করে নিজের শরীরটা খারাপ করলেন বলুন তো? যদি আজ আপনার কিছু একটা হয়ে যেত তাহলে মোহিনী সারা জীবন নিজের কাছে অপরাধী হয়ে থেকে যেত বাবা। মা, মিতালি কারো চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারত না। সবাই ওকে দোষারোপ করতো। ও তো অপরাধবোধে এখনও আপনার সঙ্গে এসে দেখা করতে পারছে না।”

আকরাম চৌধুরী আলতো একটু হেসে বললেন,

“তুমি তো নিজেও বাবা হয়েছো। তোমার নিজেরও দুটো ছেলে মেয়ে আছে। তাদের জীবনে যদি কোন অসুবিধা হয়, কোন সমস্যা তৈরি হয় তুমি কি বাবা হয়ে চিন্তা করবে না? তুমি কি নিশ্চিন্ত হয়ে হাসি খুশি মনে থাকতে পারবে?”

নিবিড় কোন উত্তর দিল না। চুপচাপ শুনে গেল আকরাম চৌধুরীর কথাগুলো। আকরাম চৌধুরী ফের বলে উঠলেন,

“ছেলে মেয়ে যতই বড় হয়ে যাক না কেন বাবা-মার কাছে তারা সব সময় ছোট থাকে। তোমার মনে আছে নিবিড় তোমার আর মোহিনীর বিয়েতে আমি ঠিক কতটা আপত্তি করেছিলাম। তোমাদের বিয়ের পর দুই বছর যাবৎ আমি তোমাদের সঙ্গে কোন কথাবার্তা বলিনি। প্রথম তোমাদেরকে মেনে নিয়েছিলাম মাহির মুখটা দেখে।”

“মনে আছে বাবা। এগুলো কি আর ভোলার মতন কথা।”

“হ্যাঁ। আমাদের মত ছিল না জন্য তোমরা দুজনে পালিয়ে বিয়ে করেছিলে। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। আসলে তোমরা ছেলেমেয়েরা কখনো বাবা-মার কষ্ট বুঝবে না। আমি কেন তোমাদের বিয়েতে আপত্তি করেছিলাম জানো? তার কারণ ছোটবেলা থেকে আমি আমার মেয়েকে যে পরিবেশে, যে আয়েশে বড় করেছি আমার মনে হয়েছিল তুমি সেটা দিতে পারবে না। আমার মনে হয়েছিল আমার মেয়ে একটা মধ্যবিত্ত পরিবার গিয়ে একটা বেকার ছেলের সাথে সংসার করতে পারবে না।”

নিবিড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“জানি বাবা। আপনার সেসব ভাবনা একদমই ভুল ছিল না। বাবা হিসেবে আপনি ঠিক ভেবেছিলেন।”

আকরাম চৌধুরী নিবিড়ের কথায় অসম্মতি জানিয়ে বলল,

“উহু। ভুল ভেবেছিলাম আমি। আমি শুধু টাকা পয়সাটাই দেখেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম এত বিত্ত-বৈভব, ঐশ্বর্যের মাঝে থেকে একটা মধ্যবিত্ত পরিবারে গিয়ে আমার মেয়ে মানিয়ে নিতে পারবে না। তোমাকে আমি চিনতে ভুল করেছিলাম। শেষে দেখো তোমাকে এতটাই ভালোবেসে ফেললাম, তোমার প্রতি এতটা নির্ভরশীল হয়ে গেলাম, তোমার পরিবারকে এতটা বিশ্বাস করলাম যে আমি নিজ ইচ্ছেয় আমার ছোট মেয়ের বিয়ে তোমার ভাইয়ের সঙ্গে দিলাম। নাঈম তোমার ভাই জন্য বিশ্বাস করে আমি মিতালির বিয়েটা দিয়েছিলাম। বুঝতে পারছো বাবা তোমাকে আমি ঠিক কতটা বিশ্বাস করি?”

নিবিড় আলতো হেসে বলল,

“জানি বাবা। আপনার একজন ছেলে থাকলে আপনি তাকে যতটা ভরসা করতেন আমাকে হয়তো তার থেকেও বেশি ভরসা করেন। আমিও আপনাকে আমার বাবার মতনই শ্রদ্ধা করি।”

“সব তো ঠিকই ছিল বাবা। তাহলে হঠাৎ করে দুজনে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্তটা কেন নিলে? যখন আমরা পরিবার মানলাম না তখন তোমরা একে অপরকে ভরসা করে দুজনের হাত শক্ত করে ধরেছিলে। আর আজ যখন আমরা দুই পরিবার তোমাদেরকে মেনে নিয়েছি, এত ভালো আছি আমরা দুই পরিবার মিলে তখন কেন তোমরা দুজনের প্রতি ভরসা রাখতে পারছো না?”

নিবিড়ের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। কোন উত্তর দিতে পারলো না। চেষ্টা করলো উত্তর দেওয়ার। ভাবলো মনে মনে যে কি উত্তর দেয়া যায়। তবে বলার মতন কিছু খুঁজেই পেল না।

আকরাম সাহেব নিবিড়ের দিকে হাত বাড়ালেন। ওনার হাতটা কাঁপছে। নিবিড় তড়িঘড়ি করে ওনার হাতটা ধরলো। আকরাম সাহেব নিবিড়ের হাত খামচে ধরে বললেন,

“যদি আমার মেয়ের কোন ভুল হয়ে থাকে তার জন্য আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। তুমি ওকে ক্ষমা করে দাও। আমি জানি ও তোমায় ছাড়া ভালো থাকবে না। তোমার মতন ছেলে এই যুগে পাওয়াই যায় না। তোমরা দুজনেই একটা ঝোকের বশে আছো। ভুল সিদ্ধান্তটা নিও না বাবা। আরেকবার ভেবে দেখো। নিজেদেরকে আরেকটা সুযোগ দাও। যদি মনে হয় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তাহলে সেখান থেকেই আরেকবার নতুন করে সবটা শুরু করার চেষ্টা করো। পেছানোর জায়গা না থাকলে সামনে এগোনোর জায়গা তো আছে। তোমরা বরং দুজনে সামনে এগিয়ে যাও। বাচ্চা দুটোর কি হবে ভাবো তো একবার?”

নিবিড় চোখ মুখে অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলে বলল,

“শুধুমাত্র ওদের কথা চিন্তা করেই তাে এতগুলো দিন একসঙ্গে আছি বাবা। জানেন আজকাল কি হয়? আমি আর মোহিনী যখন কারণে অকারনে ঝগড়া করি বাচ্চাদের সামনে, তখন কোন সময় ওদের কাছে বাবা খারাপ হয়ে যায় তো কোন সময় ওদের কাছে মা খারাপ হয়ে যায়। একেক সময় ওদের চোখে একেক জনের জন্য ঘৃণা দেখতে পাই। এত সামলানোর চেষ্টা করি নিজেদের তারপরেও পারি না। রোজ রোজ একসঙ্গে থেকে ঝগড়াঝাঁটি করার জন্য ছেলেমেয়েদের চোখে আমরা খারাপ হয়ে যাচ্ছি। ওরা ওদের মা-বাবাকে ঘৃণা করতে শিখছে বাবা।”

“তাহলে নিজেদেরকে পরিবর্তন করো। মানুষ চেষ্টা করলে সব পারে। তোমরা কেন পারবে না?”

আরো অনেক কিছু বোঝালেন আকরাম চৌধুরী নিবিড় কে। নিবিড় শুধু চুপচাপ শুনে গেল। মনে মনে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো, ওরা কি পারবে আরেকবার শুরু করতে সবটা?

বিজ্ঞাপন
তোমার নামেই গল্প হোক গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাংসারিক ও রোমান্টিক গল্প