আনিকা সম্পর্কে মোহিনীর ফুপাতো ননদ। মোহিনী জানতো যদি এখানে আসে তাহলে নিবিড় আন্দাজও করতে পারবেনা। কেননা নিবিড় তো জানেই না যে আনিকা দেশে আছে। আনিকা এক সপ্তাহ আগেই দেশে ফিরেছিল। ওদের ঝামেলার কথাগুলো শুনে আর নিবিড়ের সাথে যোগাযোগ করেনি। মোহিনীর সাথে যোগাযোগ করেছিল। ব্যস্ততার কারণে ওদের বাড়িতে যেতেও পারেনি। নয়তো গিয়ে দুজনকে আচ্ছা মত ঝাড়ি দিয়ে আসতো।
মোহিনী তখন বাড়িতে একা। আনিকার আজ একটা জায়গায় যাওয়ার ছিল। কিন্তু মোহিমী কে রেখে যেতে চাইছিলো না। পরে মোহিনীই জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছে। আনিকা সাথে আবার মাহি আর নিশাতকেও নিয়ে গেছে। আনিকা ওদের কাছে অপরিচিত না। প্রায়ই ফোনে কথা হতো। ভীষণ আদর করে বাচ্চাদেরকে। সেজন্য বাচ্চারাও আর যেতে কোন আপত্তি করেনি।
গতকাল আসার পর থেকে কিছু মুখে দেয়নি মোহিনী। এখন একটু ক্ষুধা লেগেছে। সেজন্য রান্না ঘরে গেল। খাবার দাবার সব রাখাই ছিল। সেগুলো প্লেটে নিয়ে টেবিলে এসে বসতে ধরলে বেল বেজে উঠলো। প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা আগে আনিকারা বাইরে গেছে। ফলস্বরূপ মোহিনী ভাবলো বোধহয় ওরাই এসেছে। প্লেটটা অমনি টেবিলের উপরে রেখে গেল দরজা খুলতে। দরজা খুলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো এক অগোছালো, বিধ্বস্ত নিবিড় কে।
মোহিনী যেমন অবাক হলো তেমনই আবার অবাক হলোও না। মোহিনী জানতোই যে নাঈম নিবিড়কে না জানিয়ে থাকবে না। কেননা ওরা তো সবাই চায় যেন ওদের সম্পর্কটা স্বাভাবিক হয়ে যায়। সেজন্য একবার ভেবেছিল ওদের কাউকেই জানাবে না। কিন্তু আবার না জানিয়েও পারলো না।
এদিকে নিবিড় কে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও বেশ স্বাভাবিক দেখাচ্ছে মোহিনী কে। তবে নিবিড় মোটেই স্বাভাবিক থাকতে পারলো না। একেই তো গতকাল রাত থেকে ঘুমোয়নি। গতকাল রাত থেকে পেটে কিচ্ছু পড়েনি। রাস্তা দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে জামা কাপড়েও যেন ধুলা ময়লা লেগে গেছে। চুলগুলো উসকোখুসকো হয়ে আছে। চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে আছে। এক রাতের মাঝে চোখের নিচে কালিও জমেছে।
মোহিনী কে সুস্থ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিবিড় যে ঠিক কতটা শান্তি অনুভব করলো সেটা নিবিড় বলে বোঝাতে পারবে না। নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে মোহিনীকে জড়িয়ে ধরার জন্য হাত বাড়িয়ে ওর দিকে এগিয়ে গেল। তবে জড়িয়ে ধরতে আর পারলো না। নিবিড় জড়িয়ে ধরার আগেই মোহিনীর দিকে দু কদম পিছিয়ে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“এখানে কেন এসেছো?”
মোহিনীর দিকে নিজের বাড়িয়ে দেওয়া হাত দুটো নিবিড় গুটিয়ে নিল। অসহায় গলায় বলল,
“কেন এভাবে না বলে চলে এসেছো মোহিনী? আমি মানছি আমি ভুল করেছি। তুমি আমাকে যে পরিস্থিতিতে দেখেছো সেটা উচিত হয়নি। আমি মানছি আমি অপরাধী। কিন্তু তাই বলে একটাবার আমাকে পরিস্থিতিটা বিশ্লেষণ করার সুযোগ দিতে পারতে। একটাবার আমরা সামনাসামনি কথা বলতাম এই ব্যাপারটা নিয়ে। আমাকে একটাবার সত্যিটা জানাতে দিতে। তা না করে কেন চলে এলে আমাকে কিছু না জানিয়ে?”
“আমি তো আর কোন কিছু জানতে চাই না তোমার থেকে। না আমি তোমাকে বলতে চাই যে তুমি কেমন ভাবে তোমার জীবনে চলবে। তুমি যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে আজ থেকে তোমার জীবনটা কাটাতে পারো নিবিড়। আমি জানি আমি তোমার জীবনে অশান্তি সৃষ্টির জন্য দায়ী। সেই জন্যই আমি মুক্তি দিয়ে তোমায় চলে এসেছি। তুমি ভালো থাকো। তুমি বরং আমাকে ছাড়াই ভালো থাকো।”
মোহিনীর কথাটা শুনে নিবিড় তড়িৎ গতিতে বলে উঠলো,
“অসম্ভব। কিভাবে তোমায় ছাড়া ভালো থাকবো? তোমাকে ছাড়া পারবো না ভালো থাকতে।”
মোহিনী ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“তাই নাকি? তুমিই তো বলেছিলে আমি নাকি তোমাকে পাগল করে দেবো। দুদিন আগে অবধি তুমি বলছিলে আমার সাথে থাকলে নাকি তুমি ভালো থাকতে পারবেনা।”
“হ্যাঁ বলেছিলাম সেসব কিন্তু রাগের মাথায়। আমার ভালো খারাপ সব কিছু তোমার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। দেখো আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি আর কখনো এমন হবে না। আমার আর ফারিনের মাঝে তেমন কোন সম্পর্ক নেই তুমি যেমনটা ভাবছো। ওর মাথায় ভুত চেপেছিল সেজন্য ওই কাজটা করে ফেলেছে।”
“ও অনেকটা সময় তোমায় জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল নিবিড়। তোমাদের দুজনের মাঝে একটুও দূরত্ব ছিল না। ও দুহাতে তোমায় জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়েছিলো। ও তোমার বুকে মাথা রেখেছিল। আর তুমি চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলে। তুমি একবারও আমার কথাটা ভাবলে না? আমাকে নিজের চোখে দেখতে হয়েছে যে অন্য কোন মেয়ে আমার নিবিড় কে জড়িয়ে ধরেছে। তুমি কি আন্দাজ করতে পারছো এটা আমার জন্য কতটা কষ্টের, কথাটা যন্ত্রণার? আমি বেঁচে থেকেও মৃ'ত্যুর স্বাদ উপভোগ করে নিয়েছি। আমি মৃ'ত্যুর আগেই মৃ'ত্যু যন্ত্রণা উপভোগ করে নিয়েছি নিবিড়। দয়া করে আর কষ্ট দিও না আমায়। চলে যাও এখান থেকে।”
কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেললো মোহিনী। খুব তাড়াতাড়ি আবার নিজের চোখের জল মুছেও নিল। মোহিনী কে কাঁদতে দেখে নিবিড় ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তাড়াহুড়ো করে ওর দিকে এগিয়ে এসে নিজেই মোহিনীর চোখের জল মুছে দিতে চাইলো। তবে মোহিনী ওকে সেই সুযোগ না দিয়ে এক ঝটকায় নিবিড়ের হাতটা সরিয়ে দিয়ে আঙ্গুল উঁচিয়ে শাসিয়ে বলল,
“ভুলেও আর সেই হাত দিয়ে আমায় স্পর্শ করার চেষ্টা করবে না যে হাত দিয়ে তুমি অন্য নারীকে ছুঁয়েছো।”
নিবিড় মানলাে না মোহিনীর কথা। ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে দুহাতে মোহিনীর বাহু চেপে ধরে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“বিশ্বাস করো, আমি ওকে একবারের জন্য ছুঁইনি। হ্যাঁ ও যখন আমায় জড়িয়ে ধরেছিল তখন আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। তার কারণ কি জানো?”
মোহিনী নিবিড়ের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য মোচড়ামুচড়ি করতে করতে বলল,
“জানতে চাই না আমি।”
“জানতে হবে। বিশ্বাস করো আমি কল্পনাও করিনি যে উনি আমায় এভাবে জড়িয়ে ধরবে। মাঝ রাস্তায় হঠাৎ করে এভাবে জড়িয়ে ধারায় আমি কেমন যেন থ মেরে গিয়েছিলাম। আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না। আমার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। আমি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম মোহিনী। বিশ্বাস করো আমি প্রচন্ড ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। তার কারণ আমি অনেকক্ষণ থেকে ওনাকে বোঝাচ্ছিলাম যে উনি যা চান তা সম্ভব না।”
মোহিনী রাগান্বিত গলায়,
“ওকে এতো ভালোভাবে বোঝানোর কি প্রয়োজন ছিল? একটা চ'ড় মা'র'তে পারোনি? ও জানে না তুমি বিবাহিত, তোমার স্ত্রীর সন্তান আছে?”
“চ'ড় মা'রিনি ঠিকই কিন্তু পরে ওকে ধাক্কা দিয়ে আমার থেকে সরিয়ে দিয়েছিলাম। ও একেবারে রাস্তার উপরে গিয়ে পড়েছিল। বিশ্বাস না হলে তোমার বান্ধবী সাদিয়াকে জিজ্ঞেস করো। ও দেখেছে।”
মোহিনী এবারে কোন উত্তর দিলােনা। নিবিড়ের থেকে এখনো ছাড়া পাওয়ার জন্য খুব চেষ্টা করছে। নিবিড় এবারে মোহিনীর ইচ্ছে-অনিচ্ছে কিংবা রাগ কোন কিছুরই তোয়াক্কা করলো না। ছোটাছুটি করতে থাকা মোহিনীকে দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরলো নিজের সাথে।
“বিশ্বাস করো মোহিনী, আমার ফারিনের সাথে কোন অবৈধ সম্পর্ক নেই। হ্যাঁ একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। ছোটাছুটি না করে আমাকে বোঝানোর জন্য একটু সময় দাও। আমি শুরু থেকে তোমাকে সবটা বলছি। প্লিজ ছোটাছুটি করো না, চুপচাপ থাকো।’
মোহিনী সত্যিই একটু হলেও শান্ত হয়ে গেল। নিবিড় জড়িয়ে ধরার পরে তো অনেকটাই শান্ত হয়ে গিয়েছিল। শুধু ডুকরে কান্না আসছিল। এবারে সত্যিই শান্ত হলো। তবে কন্ঠে রাগ প্রকাশ করেই বলল,
“ঠিক আছে পাঁচ মিনিট সময় দিলাম। কোন নতুন নাটক করবে করো।”
নিবিড় মোহিনীর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“তুহিন ভাই কে তো চেনো?”
“তোমার বস? ওনার এর সাথে কি সম্পর্ক?”
“বলছি। ফারিন আমাদের অফিসে জয়েন করার পরে কেউই জানতাম না যে ফারিন তুহিন ভাইয়ের শালী। আমিও জানতাম না। নতুন জয়েনিং এর জন্য ফারিনকে আমার আন্ডারে দেওয়া হয়। কাজের সূত্র ধরে ওর সাথে আমার কথাবার্তা হত। তো কিছুদিন যাবার পর হঠাৎ করে মেয়েটা অফিসে আসা বন্ধ করে দিল। এদিকে তখন আমরা দুজনে একটি ইম্পরট্যান্ট প্রজেক্ট এর দায়িত্বে ছিলাম। তো বাধ্য হয়ে আমি ওকে কল করলাম। তারপরে এভাবে আরও নানা কথাবার্তা হতে হতে আমি জানতে পারলাম ও একটা সমস্যার মাঝে আছে।”
“কি সমস্যা?”
“সমস্যা বলতে ও ওর হাজবেন্ডের থেকে ডিভোর্স চাইছিলো। কিন্তু ওর হাজবেন্ড ডিভোর্স দিতে চাইছিল না। খুব ঝামেলা করছিল। তো একটা ভালো লয়েরের সন্ধান করছিল ফারিন। আমি তখন ওর সাথে নুসরাতের পরিচয় করাই। যদি তোমার আমার কথা বিশ্বাস নাহয় নুসরাত কে জিজ্ঞেস করো। নুসরাতই ওর ডিভোর্স কেসটা দেখেছে। ওদের ডিভোর্সটা হয়েও যায়। তো তারপর থেকেই ওর আমার প্রতি একটা কৃতজ্ঞতা ছিল। আমার দেখে যতটুকু মনে হয়েছে আর কি। তো ডিভোর্সের কিছুদিন পরে হঠাৎ করে ওর মা মা'রা যায়। মেয়েটা খুব ভেঙে পড়ে।”
“আর তুমি সেজন্য ওকে সাহারা দিতে চলে গেছো? অবশ্য যাবেই তো। ওর হাজবেন্ড নেই, তোমারো তো বউ থেকেও নেই। তোমাদের দুজনের মতন অসহায় তো এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। খুব ভালো করেছো।”
নিবিড় তাড়াহুড়ো করে বলল,
“আরে না না। আমি ওকে সাহারা দিতে যাইনি। মানে তখন কি হতো ও কাজে খুব একটা মনোযোগ দিতে পারতো না। ওর অংশের কাজটুকু সেজন্য আমি করে দিতাম। এজন্য আমার বেশিরভাগ দিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে দেরি হতো মোহিনী।”
মোহিনী নিবিড়ের বুক থেকে মাথা তুলে ওর দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“বললেই হলো। এতদিন তো তুমি আমায় এই কথাটা বলোনি। আজ হঠাৎ করে তুমি বলে ফেললে কাজ করতে তুমি এত রাত অব্দি অফিসে আর আমি বিশ্বাস করলাম। পাগল পেয়েছ আমায়?”
নিবিড় অসহায় গলায় বলল,
“না রে মোহিনী। তখন তো তোমার সাথে ঝগড়া চলছিল। কোন কিছুর জবাবদিহিই করতে ইচ্ছে করতো না সেজন্য বলিনি। কিন্তু এখন সত্যি বলছি।”
মোহিনী অনেক কষ্টে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
“তারপর বলো।”
“আচ্ছা বলছি। হ্যাঁ আমি ফারিনের সাথে ভালো ব্যবহার করেছি। আমি অফিসের আর পাঁচটা মেয়ে কলিগের সাথে যেমন ব্যবহার করি ওর সাথেও তেমন ব্যবহার করেছি। তবে পার্থক্য এতোটুকুই ফারিনের অনুরোধে শুধু দুদিন ওর সাথে ডিনারে গিয়েছিলাম। আর একটা পার্থক্য হচ্ছে অন্য কোন মেয়ে আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েনি।”
“দুর্বল হলো কি করে? এমনি এমনি একটা মেয়ে দুর্বল হয়েছে? তোমার কোন দোষ ছিল না?”
নিবিড় ফের একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“ছিল। নিশ্চয়ই আমার দোষ ছিল। হয়তো আমি একটু বেশি ভালো ব্যবহার করে ফেলেছিলাম ওর সাথে। তবে তার মানে কখনো এটা ছিল না যে আমি তোমাকে সরিয়ে ওকে আমার জীবনে জায়গা দিতে চাই। তোমার সাথে আমার সম্পর্ক খারাপ চলছিল বলে ওর উপর নির্ভরশীল হয়ে যেতে চেয়েছি তেমনটা কখনোই না মোহিনী। শুধুমাত্র আমার ওকে অসহায় মনে হতো। মনে হতো মেয়েটার জীবনে অনেক ঝড়ঝাপটা গেছে। সেজন্য একটু ওর সাথে ভালো ব্যবহার করতাম। ওর সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতাম এতোটুকুই।”
মোহিনী ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“ওহ আচ্ছা। আজ জানলাম যে বন্ধুরা যেখানে সেখানে বিবাহিত বন্ধুদের রাস্তার মাঝে জড়িয়ে ধরে। আবার নিজের বউ বাচ্চার খবর না রেখে সে মেয়ে বন্ধুর সাথে ডিনারেও যায় তাই না? শোনো নিবিড়, নিজেকে সাধু দেখানোর চেষ্টা করো না। তুমি যদি এতই ভালো মানুষ হতে কয়েকদিন আগে যেখানে ওই মেয়েটাকে নিয়ে আমাদের মাঝে এত বড় একটা অশান্তি হলো তারপরেও তুমি ওর সাথে ডিনারে যেতে পারতে না।”
“যাইনি তো আমি ওর সাথে ডিনারে। ঐদিন রাতে ফারিন এর সাথে তোমায় নিয়ে ঝামেলা হওয়ার পর থেকে আমি অফিসে গিয়ে ফারিনের সাথে কথাবার্তা খুবই কমিয়ে দিয়েছিলাম।”
মোহিমী আবারও ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“তাই নাকি? সেই জন্য ওর সাথে দাঁড়িয়ে থেকে হেসে হেসে কফি খাচ্ছিলে অফিসে? আমি কিছু বুঝিনা।”
“আসলেও কিছু বোঝো না। আমি ওখানে ফাহাদ আর ইসমাইলের সাথে দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছিলাম। ফারিন বোধহয় বুঝতে পেরেছিলো যে আমি ওকে একটু এড়িয়ে চলছি। একটু পর সেজন্য ও আরো কয়েকজনের সাথে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। এখন আমি যদি হঠাৎ করে ওখান থেকে চলে আসতাম ব্যাপারটা খুব খারাপ হয়ে যেত মোহিনী। আমি শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে কফি খাচ্ছিলাম। আর কিচ্ছু করিনি। এখন ও আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আমি কি লা'থি দিয়ে ওকে সরিয়ে দিতে পারি।”
মোহিনী দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,
“উচিত ছিল।”
নিবিড় আবারো একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“ঠিক আছে। ভুল হয়ে গেছে।”
কথাটা বলে নিবিড় চুপ করে গেল। মোহিনী ভ্রুঁ কুঁচকে নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“থেমে গেলে কেন? কথা সম্পূর্ণ করো।”
নিবিড় জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“আজ লাঞ্চ ব্রেকেই ফারিন আমাকে বলেছিল যে ও আমাকে পছন্দ করে। ও নাকি আমার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আরো অনেক কিছু বলেছিল।”
নিবিড় কথাটা বলার সাথে সাথে মোহিনী ওকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,
“ফাজিল ছেলে কোথাকার। এতকিছুর পরেও তুই আবার ওর সাথে রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলি আর আমাকে এসে এখানে নিজের সাধু হওয়ার গল্প শোনাচ্ছিস! চরিত্রহীন কোথাকার। তোর মুখও আমি দেখতে চাই না। তোর এই মুখে গিয়ে তোর প্রেমিকাকে দেখা। আমার সামনে যদি আর কখনো এসেছিস জুতাে দিয়ে পি'টি'য়ে তোকে সোজা করে ছাড়বো।”
নিবিড় আবারও মোহিনীর দিকে এগিয়ে গিয়ে পূর্বের মতনই দুহাতে ওকে জড়িয়ে ধরলো। আর মোহিনী এবারও নিবিড়ের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য ভীষণ চেষ্টা চালালো। শুধুমাত্র মোচড়ামুচড়ি করেই থেমে থাকলো না। নিবিড়ের বুকে কয়েকটা কিল ঘুষিও লাগালো। নিবিড় ব্যথা পেল ঠিকই তবে মুখ ফুটে একবারও থামতে বলল না। বরং মোহিনীর লাফালাফির মাঝেই বলল,
“আমি ওকে সরাসরি না করে দিয়েছিলাম। অনেক উল্টোপাল্টা কথাও শুনিয়েছিলাম। আমি ওকে বলেছিলাম যে আমার তোমাকে ছাড়া চলবে না। বিশ্বাস কর মোহিনী আমি ওকে একটুও ছাড় দেইনি। আমি জানি আমি হয়তো নিজে ওকে এই কথাগুলো বলার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছি। আমি মানছি আমি অপরাধী। আমি অনেক বড় অপরাধী। আমাকে ক্ষমা করা উচিত না কিন্তু তাও ক্ষমা করে দাও। আমি ফারিন কে পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছিলাম যে ও যেটা চাইছে সেটা কখনো সম্ভব না। আমি ম'রে গেলেও কখনো তুমি ছাড়া কাউকে নিজের জীবনে জায়গা দেবো না।”
মোহিনী তেঁতে উঠে বলল,
“তাহলে ওর সাথে রেস্টুরেন্টের বাইরে কি করছিলি?”
“আরে আমি গিয়েছিলাম তুহিন ভাই, ফাহাদ আর ইসমাইলের সাথে। শুধুমাত্র ফাহাদ জানতো আমার আর তোমার মাঝে অশান্তির কথা। ও গিয়ে তুহিন ভাইকে বলেছে। তুহিন ভাই তাই আমার মন খারাপ দেখে মন ভালো করার জন্য বলল বাইরে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাবে। অথচ আমি ওনাকে বলতে পারছিলাম না যে আমার মন মেজাজ কেন খারাপ ছিল। রেস্টুরেন্টে যাওয়ার একটু পর দেখি ফারিনও সেখানে আছে। তখন আমি জানতে পারি যে ফারিন তুহিন ভাইয়ের শালী। ওরা ষড়যন্ত্র করেছিলো মোহিনী। ওরা ভেবেছিল আমার আর তোমার মাঝে এই ঝামেলার চক্করে ফারিন কে আমার পেছনে লাগিয়ে দেবে।”
মোহিনী হঠাৎ করে কেমন যেন শান্ত হয়ে গেল। অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“তুহিন ভাই এমন করেছে? তুহিন ভাই তো চেনে আমাদের দুজনকে। কত ভালো সম্পর্ক আমার তুহিন ভাইয়ের সাথে। তুহিন ভাই এমনটা করলো আমার সাথে!”
“আরে রাখো তো তোমার তুহিন ভাই। কে কেমন সেটা আমার বোঝা হয়ে গেছে। আসলে এখানেও ভুলটা আমার। ফাহাদের সাথে আমার যত ভালো সম্পর্কই হোক না কেন, যত দিনের পরিচয়ই হোক না কেন তাও আমার ওকে আমাদের দুজনের মাঝে চলা অশান্তির কথাগুলো বলা উচিত হয়নি। এখানেও আমি ভুল করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো ফারিন কে ওখানে দেখার পর আমি দুই মিনিটও ওখানে বসিনি। ওদের সঙ্গে রাগারাগি করে কোন কিছু না খেয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। আমার পিছন পিছন ওই মেয়েটাও আসে। আমি চাইছিলাম না মোহিনী যে এই ঘটনাটা তোমার কান অব্দি পৌঁছাক। আমি সেজন্য ওই ঘটনাটা ওখানেই শেষ করতে চেয়েছিলাম। সেই জন্য ফারিনের সাথে দাঁড়িয়ে থেকে শান্ত গলায় ওকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম। এর মাঝে তুমি কোত্থেকে দেখে ফেললে।”
“আর ও যে তোমায় জড়িয়ে ধরেছিল এটার ব্যাখ্যা কিভাবে দেবে তুমি?”
“এটার দেওয়ার মতন আমার কাছে কোন ব্যাখ্যা নেই। কেননা ব্যাপারটা আমার নিজের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। আমি তোমাকে আগেও বলেছি মোহিনী হঠাৎ করে এভাবে জড়িয়ে ধরায় আমি থতমত খেয়ে গেছিলাম। ব্যাপারটা আমার মাথাটা পুরো ঘুরিয়ে দিয়েছিল। বিশ্বাস করো আমি থমকে গিয়েছিলাম। তার কারণ আমার মাথায় তোমার কথাটাই ঘুরছিল। আমি ভয় পাচ্ছিলাম।”
মোহিনী একটু শান্ত হলো। মোহিনীকে শান্ত হতে দেখে নিবিড় ওকে ছেড়ে দিলো। মোহিনী গিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়লো। নিবিড় বুঝলো মোহিনী এখনও ওকে ক্ষমা করেনি। মোহিনীর মাথার ভেতর এখনো একই কথাগুলো চলছে। নিবিড় এই ব্যাপারটাকে মোটেও অস্বাভাবিক বলবে না। যদি নিবিড় ঐ অবস্থায় মোহিনীকে দেখতো তাহলে নিবিড়ও ওকে ভুল বুঝতো। কখনোই হয়তো এটা ভুলতে পারত না।
নিবিড় এগিয়ে গিয়ে মোহনীর পায়ের কাছে বসে পড়লো। মোহিনী খেয়াল করলো কেউ ওর পা জড়িয়ে ধরেছে। চোখ খুলে তাকাতেই দেখলো নিবিড় ওর দুই পা ধরে বসে পড়েছে। মোহিনী রাগান্বিত গলায় বলল,
“আরে কি করছো। ছাড়ো পা।”
নিবিড় আরো শক্ত করে মোহিনীর দুই পা জড়িয়ে ধরে বলল,
“ভুল করেছি মোহিনী। কখনো নিজের ভুল স্বীকার করিনি। কিন্তু আজ করছি। আমি তোমায় বলছি ফারিন এত দূর এগোতে পেরেছে হয়তো আমার জন্যই। আমি ওকে বাকিদের থেকে একটু বেশি ছাড় দিয়েছিলাম। সেজন্য আর কেউ কখনো যা করতে পারেনি ও সেটা করে দেখিয়েছে। আমার ওর প্রতি কোনো অনুভূতি নেই। আমাকে তোমার ক্ষমা করতেই হবে। যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে। কিন্তু আমার তোমাকে ছাড়া চলবে না। বাড়ি ফিরে চল। দরকার হলে বাড়িতে গিয়ে আবার ঝগড়াই করব। কিন্তু এখানে আর থাকবো না। মা'রা'মা'রি, কা'টা'কা'টি, ভালোবাসা যা করার সব বাড়িতে গিয়ে করব। তোমার সাথেই করবো। একসঙ্গে থেকেই করবো “
নিবিড়ের কথাগুলো শুনে মোহিনী কেঁদে ফেলল। নরম হলো ঠিকই কিন্তু সেটা বুঝতে দিতে চাইলো না। ঠিক করেছে এবার নরম হতে চাইলেও নিজেকে নরম হতে দেবে না।
“না নিবিড়। আমরা একসঙ্গে থেকে আর কিছু করবোনা। আমাদের একসঙ্গে থাকাটাই ঠিক না। দেখো, আমরা দুজন কিছু সময়ের জন্য আলাদা ছিলাম বলেই হঠাৎ করে তুমি এতটা ভালো হয়ে গেলে। তুমি নিজের মুখে বলছো বাড়ি গিয়ে দরকার হলে আবার ঝগড়া করবে। তার মানে তোমার মানসিকতা এখনো তেমনি আছে। শুধু এখানে এটা প্রমাণ করতে এসেছো তুমি ভালো। তুমি আমার টানে ছুটে আসোনি।”
নিবিড় হালকা একটু চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“আজগুবি এক কথা বললেই হলো। ভূতের টানে তাহলে আমি সারারাত রাস্তা দিয়ে ঘুরলাম?”
“অপরাধবোধের জন্য ঘুরেছো। যদি তোমার অপরাধ ছাড়া আমি বাড়ি ছেড়ে চলে আসতাম তুমি আমায় খুঁজতে না। তুমি তোমার ইগো নিয়ে বসে থাকতে। আমি যখন বাড়ি ছেড়ে একা গিয়েছি আমি একাই আবার বাড়ি ফিরব। তুমি আমাকে ফিরিয়ে আনতে না। তোমাকে আমি চিনি নিবিড়। তুমি নিজেকে যতটা না চেনো তার থেকে হাজার গুণ বেশি আমি তোমাকে চিনি। আমাদের সম্পর্কের মাঝে এখন সব থেকে বড় সমস্যাটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে ইগো। আমরা কেউ আর কারো কাছে ছোট হতে চাই না। কেউ কারো কাছে নিজেদের ভুলগুলো স্বীকার করতে চাই না।”
নিবিড় আবারো নিজেকে শান্ত করলো। অসহায় গলায় বলল,
“আমি করলাম তো আমার ভুল স্বীকার।”
“সে তো ঠ্যালায় পড়েছো বলে। যাই হোক তুমি আদৌ অপরাধী নাকি অপরাধী না সেই হিসেবে আমি এখন যেতে চাই না নিবিড়। আমি এখনই ডিভোর্সের সিদ্ধান্তটাও নিতে চাই না। তবে আমি শুধু তোমায় এখন এতোটুকু বলতে চাই আমাদের একটু আলাদা থাকা প্রয়োজন। আমি তোমার একার দোষ দিচ্ছি না। হয়তো আমারও দোষ আছে। আমারও দরকার তোমার গুরুত্বটা বোঝা। সেজন্য আমি তোমায় বলছি আমাদের দুজনের আলাদা থাকা প্রয়োজন। কিছুদিন আলাদা থাকার পর যদি আমাদের মনে হয় যে না আমাদের দুজনেরই দুজনকে দরকার বাঁচার জন্য তবে আবার এক হবো। নয়তো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা এবারে নিয়েই নেব। তবে একসঙ্গে থেকে রোজ রোজ এই অশান্তিটা আর আমি করতে পারবো না।”
নিবিড় এবার মোহনীর পায়ের কাছ থেকে উঠে দুই হাঁটুর উপর ভর দিয়ে বসে আবারো মোহিনীর গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“এমন করো না মোহিনী। বাড়ি ফিরে চলো। আমার তো কয়েক ঘণ্টায়ও তোমায় ছাড়া চলছিলো না। দেখো স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে ঝগড়া তো হবেই তাই না! আর আমাদের ঝগড়াগুলো তো হয় অদ্ভুত কারণ নিয়ে।”
মোহিনীর গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। কিন্তু পাল্টা নিবিড়কে মোটেই জড়িয়ে ধরলো না। বরং নিজেকে নিবিড়ের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কঠিন গলায় বলল,
“আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি নিবিড়। এবার তখনই আবার একসঙ্গে থাকবো যখন দুজন দুজনের মূল্য বুঝবো। তুমি বাড়ি ফিরে যাও। আর আমার বাড়ি ফেরার আশা ত্যাগ করো। আদৌ আর কখনো ফিরব কিনা সেটাও আমি জানিনা। তবে এতোটুকু জানি এখন আমরা একসঙ্গে থাকবো না। অনেক কিছু বোঝা দরকার আমাদের। দশ বছর সংসার করেও আমরা এখনো নিজেদের গুরুত্বই ঠিক করে বুঝে উঠতে পারিনি। এবার সেটাই বোঝা দরকার।”