বাড়ি ফিরে এসেছে নিবিড়। হাজার চেষ্টা করেও মোহিনী কে রাজি করাতে পারেনি। মোহিনী সেই একই জেদ ধরে বসে ছিল যে এখন ফিরবে না। কিছুদিন আগে দূরত্ব বজায় রাখবে। তারপরে যদি মনে হয় যে থাকতে পারবে না নিবিড় কে ছেড়ে, নিবিড়েরও যদি মনে হয় যে মোহিনী কে ছাড়া সত্যিই চলবে না তাহলে আবার ফিরবে। নয়তো কখনোই আর ফিরবে না।
নিবিড় বাচ্চাদের অন্তত আনতে চেয়েছিল নিজের সাথে। কিন্তু মোহিনী রাজি হয়নি। নিবিড় বলেছিল অন্তত যেকোনো একজনকে নিয়ে আসবে নিজের সাথে। আরেকজন নাহয় মোহিনীর কাছে থাকুক। কিন্তু মোহিনী তাতেও রাজি হয়নি। ওখানেও আবার নিবিড়ের ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়েছে। বাচ্চাদের প্রতি নিবিড়ের অবহেলা ধরিয়ে দিয়েছে।
আজ সত্যি নিবিড় নিজের সবগুলো ভুলই খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছে। সেজন্য জোর করার মতন কোনো ভাষাই খুঁজে পায়নি। সত্যিই তো নিবিড় অবহেলা করেছে নিজের পরিবারের প্রতি। এজন্যই তো আজ শূন্য হাতে ফিরে আসতে হলো।
দরজা খুলে ঘরে পা রাখতেই বুকটা খা খা করে উঠলো নিবিড়ের। অন্যান্য দিন যদি বিকেলে নিবিড় বাড়ি ফিরতো মেয়েটা ছুটে এসে গলা জড়িয়ে ধরতো। ছেলের অবশ্য তেমন স্বভাব নেই। দূরে দাঁড়িয়ে থেকেই নিবিড়কে দেখে একগাল হাসতো। দূরে দাঁড়িয়ে থেকে নিবিড়কে বোঝানোর চেষ্টা করতো যে ওর বাবা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরায় খুব খুশি মাহি। যখন মোহিনীর সাথে সম্পর্কটা ভালো ছিল তখন বাড়ি ফিরে তিনজনকে একসঙ্গে জড়িয়ে ধরতো। একে একে তিনজনের কপালে একটা করে চুমু দিতো।
তবে মাঝে অনেকগুলো দিন হলো নিবিড়ের সেই সব অভ্যাস কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সবকিছুর প্রতি যে কি অবহেলা জন্মেছিল তা বলে বোঝাতে পারবে না। কেন যে এত অবহেলা জন্মেছিল সেটাও জানে না। সবকিছুই কেমন যেন বিরক্তিকর লাগতো। যাকে দেখত তাকেই বিরক্ত লাগতো। মোহিনী কিছু বললেই রাগ উঠে যেত। তবে আজ নিবিড়ের কেন যেন নিজের সেইসব আচরণের জন্য খুব আফসোস হলো। মনে হলো এতটা অবহেলা না করলেও পারতো নিজের পরিবারের প্রতি। অন্তত তাহলে আজ এক বুক শূন্যতা নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করতে হতো না।
বুক চিরে আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো নিবিড়ের। দরজাটা বন্ধ করে ঘরে গিয়ে হাত মুখ ধুঁয়ে নিলো। গতকাল রাত থেকে কিছু খায়নি। আর এখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। এতটাই বেশি ক্ষুধা লেগেছে যে এখন মাথা ঘুরছে। চোখের সামনে অন্ধকার দেখছে ।
নিবিড় তাড়াতাড়ি রান্না ঘরে গেল দেখার জন্য যে খাবার দাবার কিছু আছে কিনা। গতকাল রাতের ভাত তরকারি রয়ে গিয়েছে। তবে সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আর খাওয়া যাবে না। নিবিড় এবার ফ্রিজে গিয়ে দেখলো যে ফ্রিজে কিছু আছে কিনা। অন্তত যদি ফলমূল থাকে সেটা একটু খেয়ে পেটটাকে আপাতত শান্ত রাখত। তবে কিচ্ছু নেই। নিবিড় তো ভুলেই গিয়েছিল এই মাসের বাজারে শেষ হয়ে গেছে। বাজার করতে বলেছিলো মোহিনী। কিন্তু নিবিড় বেমালুম ভুলেই বসে ছিল।
ফ্রিজে শুধু একটা ডিম পেল। কিচ্ছু করার নেই। নিজেকেই এখন রান্না করে খেতে হবে। বাড়িতে তো আর মোহিনী এখন নেই যে ওকে আরাম করে বসিয়ে নিজে কষ্ট করে হাত পুড়িয়ে রান্না করে খাওয়াবে।
ভাত রান্না করে একটা ডিম ভেজে খেয়ে নিল নিবিড়। শুকনো ভাত গলা দিয়ে নামতে চাইলো না। কিন্তু নামাতে হলো। পানি দিয়ে গিলে খেলো। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে প্লেটগুলো অমনি রেখে শুধু হাতটা ধুঁয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। আগে একটু ঘুমোনো দরকার।
_____________
আজকের দিনটা মোহিনী আনিকার বাড়িতেই কাটালো। গতকাল নতুন ফ্ল্যাটে শিফট করবে। নতুন ফ্ল্যাট বলতে সাদিয়া যেখানে থাকে ওখানে উঠবে। সাদিয়া একাই থাকে, ওর বোনের বাড়িতে। সাদিয়া নিজেই মোহিনী কে বলেছে যেন ওর সঙ্গেই থাকে। এমনি তো একা একা থাকতো সাদিয়া। এখন মোহিনী যদি বাচ্চাদের নিয়ে থাকে ওর ভালো লাগবে। মোহিনীও তাই রাজি হয়ে গেছে। নয়তো এখন নতুন একটা জায়গায় গিয়ে সমস্ত কিছু কেনাকাটা করা, গোছগাছ করা একার পক্ষে খুবই কষ্টকর হয়ে যাবে। তাই ভেবেছে আপাতত সাদিয়ার ওখানেই থাকবে। আস্তে-ধীরে পরে অন্য জায়গায় ব্যবস্থা করে নেবে।
রাতের দিকে মোহিনী নিজের ফোনটা অন করলো। ফোনটা অন করার সঙ্গে সঙ্গেই ওর শাশুড়ির নাম্বার থেকে কল এলো। মোহিনী কিঞ্চিৎ বিরক্তই হলো নিজের উপর। ভাবলো কেন যে অন করতে গেল ফোনটা। বন্ধই ভালো ছিল। কিন্তু এখন তো রিসিভ না করে থাকা যায় না। ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে সালাম দিতেই অপর পাশ থেকে সাজেদা বেগুমের উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“কোথায় আছিস তুই মা? আমার নাতি নাতনি ওরা ঠিক আছে তো, তুই ঠিক আছিস তো? এভাবে কেউ বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। আমাদেরকে তো একবার অন্তত জানাতে পারতি। আমি কি কখনো আমার ছেলের দোষ না দিয়ে তোর দোষ দিয়েছি যে ভরসা করতে পারলি না? চিন্তায় চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছি আমরা। তোরা একটুও ভাববি না আমাদের কথা তাই না?”
মোহিনী অপরাধী গলায়,
“ক্ষমা করে দিও মা। আসলে আমি চাইনি তোমাদের চিন্তার মাঝে ফেলতে। কিন্তু কি করবো বলো কোন উপায় ছিল না। এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম যে ঠিক ভুল বিচার বিবেচনা বোধ হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
“কি হয়েছে বল তো? কি করেছিল বেয়াদবটা যার কারণে তুই বাড়ি ছেড়ে চলে গেলি? ও তো কিছুই বলল না। নাঈম জানে কিন্তু ও আমাকে কিছু বলল না। এখন তুই আমায় বলতো কি হয়েছে। তারপর আমি দেখছি।”
যে কারণে মোহিনী বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিল সেই কারণটা মোহিনী ওর কিংবা নিবিড়ের বাবা মাকে জানাতে চায় না। ও তো নাঈম কেও জানাতো না। কিন্তু নিবিড় নিজেই জানিয়ে দিয়েছে। অন্তত মোহিনীর বাবা-মা যদি এই কথাগুলো জানে তাহলে তাদের চোখে নিবিড় অনেকটাই ছোট হয়ে যাবে। আর নিবিড় তো সব সত্যি জানিয়ে দিয়েছে মোহিনীকে। নিবিড় যেমন একদিক দিয়ে দোষী আবার দেখতে গেলে নির্দোষও বলা যায়। সেই জন্য মোহিনী আপাতত চাইছে না যে ব্যাপারটা অন্য কেউ জেনে নিবিড় কে অপমান করার সুযোগ পাক।
“ওই যা হয় মা। ঝগড়া হয়েছিল।”
“সে তো এতদিনও ঝগড়া হয়েছে। কিন্তু কখনো তো তুই বাড়ি ছেড়ে চলে যাসনি। তোর গায়ে হাত তোলেনি তো নিবিড়?”
মোহিনী তড়িঘড়ি করে বলল,
“না না মা। কি বলছো। গায়ে হাত তোলার স্বভাব নিবিড়ের নেই। ও শুধু মানসিক অত্যাচারই করে, শারীরিক অত্যাচার করে না।”
“তাহলে কেন চলে গেলি মা? আবার বাড়ি ফিরেও যাসনি ওর সাথে। দূরে থাকলে তো সম্পর্কে দূরত্ব আরো বাড়বে। সঙ্গে থেকে যে সমস্যার সমাধান করতে পারলি না দূরে থেকে সেই সমস্যার কি সমাধান করবি বল তো আমায়?”
“দূরে থেকেই সমাধান করা সম্ভব মা। আসলে আমরা দুজনে একসঙ্গে থাকতে থাকতে দুজনে দুজনের গুরুত্বটা বুঝতে পারছিলাম না। খুব সহজে দুজন দুজনকে পেয়ে যাচ্ছিলাম। সেজন্যই ধীরে ধীরে আমরা একে অপরের গুরুত্বটাই হারিয়ে ফেলেছি। এখন দূরে থাকলে যখন সহজে একজন আরেকজনকে কাছে পাবো না ঠিক নিজেদের গুরুত্ব বুঝবো। একটু দূরে থাকা খুব প্রয়োজন ছিলো মা।”
সাজেদা বেগম আর কিছু বলতে পারলেন না মোহিনী কে। তার আগেই পাশ থেকে মোহিনীর মা নার্গিস খানম ফোনটা কেড়ে নিয়ে কানে ধরে মেয়েকে উদ্দেশ্য করে রাগান্বিত গলায় বললেন,
“বেশি বড় হয়ে গিয়েছিস তুই? মাথা দিয়ে শিং গজিয়েছে? কি এমন অশান্তি হয়েছে যে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিস? কই নিবিড় তো গেল না? সব সময় সবকিছু তোরই কেন আগে আগে করতে হয়? তোরই কেন সবসময় আগে আগে মনে হয় যে ডিভোর্স প্রয়োজন, আলাদা থাকা প্রয়োজন। নিবিড়ের তো কখনো মনে হয় না।”
নার্গিস খানমের কথাগুলো শুনতেই মোহিনীর মন মেজাজ বিগড়ে গেল। কিন্তু তবুও নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ রাখে রাখার চেষ্টা করে বলল,
“মা, আমি এখন এইসব নিয়ে আর কোন কথা বলতে চাই না। আমার সংসারে কি হচ্ছে সেটা নিশ্চয়ই আমি জানি। আমি কোন পরিস্থিতিতে আছি সেটা তো তুমি বুঝবে না।”
“তো বোঝা। বোঝা তুই কি এমন পরিস্থিতিতে আছিস? নিবিড়কে কতটা খারাপ বলতে চাইছিস? তুইই সব বল। আমরা খারাপ বললে তো তোরই সমস্যা হবে।”
“আমি তো তোমাকে বলতে চাইনি যে নিবিড় খারাপ। আর আমি যদি বলিও তুমি তো বিশ্বাস করবে না। কেননা তুমি এমন মানসিকতার মানুষ যে মানসিকতায় কখনো এই কথাটা ধরেই না যে ছেলেরা কোন অপরাধ করতে পারে। আর যদিও বা সেটা তোমার কাছে প্রমাণ হয়ে যায় তুমি শেষে আমাকেই বোঝাবে যেন আমি মানিয়ে নিয়ে থাকি তাই না? আমি আগে শুধু ভাবতাম নিম্নবিত্ত পরিবারে যেসব মেয়েদের যাওয়ার জায়গা নেই, অসহায় তারাই বোধহয় শুধু তাদের মায়ের কাছ থেকে এই ধরনের কথাগুলো শোনো। তবে আমি নিজে এই পরিস্থিতিতে পরার পর বুঝলাম কোন মেয়ে যতই উচ্চবিত্ত পরিবারের হোক না কেন, সে যতই নিজে উপার্জন করুক না কেন। সব মেয়েকে তাদের মায়েদের থেকে এই ধরনের কথাই শুনতে হয়। আর আমি আপাতত তোমার থেকে এই কথাগুলো শোনার মতন পরিস্থিতিতে নেই। রাখছি।”
কথাটা বলে মোহিনী কলটা কেটে দিল। নার্গিস খানম কান থেকে ফোনটা নামিয়ে বিস্ময় ভরা গলায় পাশে বসা সাজেদা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“দেখেছেন আপা, এই মেয়ের বেয়াদবি গুলো দেখেছেন?”
সাজেদা বেগম ওনাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
“বাদ দিন আপা এখন এইসব। আসলে মোহিনী কথাটা ভুল বলেনি। ওদের মাঝে কি নিয়ে ঝামেলা হয়েছে সেটা তো আমরা জানিনা।”
“তাই বলে এভাবে সংসারটা ভাঙবে? ছেলেমেয়ে দুটোর কথা ভাববে না, পরিবারের মান সম্মানের কথা ভাববে না?”
“সংসারটা এখনো ভাঙেনি। আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চিন্তা করবেন না। দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে। আমারও এখন মনে হচ্ছে ওরা দুজন কিছু দিন আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ঠিক করেছে। কারণ আমার বিশ্বাস ওরা থাকতে পারবে না খুব বেশিদিন একে অপরকে ছাড়া। দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।”
___________
অফিসে গিয়ে আজ নিবিড়কে বসের কাছে বেশ ঝাড়ি খেতে হলো। বস মানে তুহিন। তুহিন যে কেন নিবিড়কে এত ঝাড়ি দিলো সেটা নিবিড় বেশ ভালোই বুঝতে পারলো। তবে নিবিড়ের কিছু করার নেই। চুপচাপ ঝাড়িগুলো মুখ বুজে সহ্য করে নিতে হবে। কেননা তুহিন তো কাজের অজুহাতেই নিবিড় কে ঝারি গুলো দিচ্ছে। গতকাল কেন নিবিড় কল রিসিভ করেনি, কেন ক্লায়েন্টের সাথে মিটিংয়ে আসেনি এইসব বলে ঝারি দিছি।
সকালে বাড়ি থেকে খেয়ে আসেনি নিবিড়। ঘুম থেকে উঠতেই তো দেরি হয়ে গেছিল। রান্নাবান্না করার সময় পায়নি। খেয়ে আসবেই বা কি করে। এদিকে অফিসে এসে তো বসের ঝারি খেয়ে পেট ভরে গিয়েছিল। তবে এখন ধীরে ধীরে আবার পেটটা ফাঁকা হয়ে গেছে। লাঞ্চ ব্রেক এর সময় হতে এখনো আধাঘন্টা বাকি। এই তিরিশ মিনিট যে নিবিড় কি করে কাটাবে বুঝে উঠতে পারছে না।
এদিকে কাজও মনোযোগ দিতে পারছে না। কেন যেন বারবার শুধু মোহিনী আর ছেলেমেয়ে দুটোর কথা মনে পড়ছে। অন্যান্য দিন তো এমন হয় না। বেশ মনোযোগ দিয়ে কাজ করে নিবিড়। কখনো কাজের মাঝে বউ বাচ্চার কথা মনে হয় না। কিন্তু আজ কেন যেন বারবার মনে পড়ছে।
কাজটা কয়েক মিনিটের জন্য বন্ধ রেখে পকেট থেকে ফোনটা বের করে ওদের চারজনের একসাথে তোলা একটা ছবি বের করল। ছবিটা অনেক পুরনো। যেদিন নিশাত জন্মায় সেদিন হাসপাতালে একসঙ্গে তোলা ওদের চারজনের ছবিটা। নিশাত মোহিনীর কোলে। আর ওর পাশে নিবিড়ের কোলে বসে আছে ছোট্ট মাহি। কি সুন্দর লাগছে দেখতে ওদের চারজনকে একসঙ্গে। মোহিনীকে দেখতে কি মিষ্টি লাগছে।
আপনা আপনি নিবিড়ের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। মুহূর্তের মাঝে মেজাজটা ভালো হয়ে গেল। তবে আরেক বিপত্তি বাঁধলো। ওদের তিনজনকে দেখতে ইচ্ছে করছে। এক ধরনের অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি হলো নিবিড়ের মাঝে। মনে হলো এখনই দেখতে হবে। না দেখলে থাকতেই পারবেনা।
অস্থিরতা কমাতে না পেরে আবারো তুহিনের কেবিনে গেল ছুটি চাইতে। অন্যান্য দিন হলে তুহিন ঠিক ছুটি দিয়ে দিতো। হ্যাঁ হয়তো দু একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতো, একটু আমতা আমতা করতো। কিন্তু শেষে ছুটি অবশ্যই দিতো নিবিড়কে। কেননা নিবিড় অতিরিক্ত কোন জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ছুটি এমনিতেই নেয় না। কাজের প্রতি ভিষণ দায়িত্বশীল। তবে আজ তুহিন নিবিড় কে ছুটি দিল না। মুখের উপরে নিষেধ করে দিল।
নিবিড় কেন যেন এবারে আর নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। কেবিনে তখন তুহিন আর নিবিড়িই রয়েছে। যেহেতু আর কেউ নেই তাই নিবিড় ভাবলো এবারে কথাটা বলে দেওয়াই যায়। গম্ভীর গলায় বলল,
“ব্যক্তিগত শত্রুতা অফিসে টেনে আনছেন কেন? এতদিন তো আমি আর মোহিনী দুজনে খুব প্রিয় ছিলাম। হঠাৎ করে এত অপ্রিয় হয়ে ওঠার কারণটা কি জানতে পারি? নাকি অপমানের বদলা নিচ্ছেন?”
তুহিন খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“একদম আজেবাজে কথা বলবে না নিবিড়। আমি কোন ব্যক্তিগত আক্রোশ কাজের জায়গায় টেনে আনছি না। তোমাকে ছুটি দেওয়া যাবে না এটাই আমার শেষ কথা। আমার অনুমতি ছাড়া তুমি অফিসের বাইরে যেতে পারবে না। আর গেলে আমায় ব্যবস্থা নিতে হবে।”
নিবিড়ের মাথাটা তুমুল গরম হয়ে গেল।ধৈর্যের সমস্ত বাঁধ ভেঙ্গে গেল। চেয়ারের পায়ায় বেশ জোরেশোরে একটা লা'থি মে'রে রাগান্বিত গলায় বলল,
“যা ব্যবস্থা নেওয়ার নিন। আমিও দেখি আপনি কতদূর কি করতে পারেন। পাল্টা ব্যবস্থা আমিও নেব প্রয়োজনে। তবে অফিসে তো এখন আমি আর থাকবোই না। আমিও দেখতে চাই আপনি কতদূর কি করতে পারেন।”
বিস্ময়ে তুহিন এর মুখ হা হয়ে গেল। নিবিড় কখনও ওর সাথে এভাবে কথা বলেনি। সব সময় যথেষ্ট সম্মান করেছে ছেলেটা। নিবিড় যে এভাবে কথা বলতে পারে সেই বিষয়ে আন্দাজই ছিলো না তুহিনের। ফলস্বরূপ হা করে নিবিড়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
নিবিড় চলে যেতে ধরে কি ভেবে যেন আবার থেমে গেল। পূর্বের জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে ফের রাগান্বিত গলায় তুহিন কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনি আর আপনার শালির মতন আজব মানুষ আমি এই দুনিয়ায় দেখিনি। পাগল নাকি আপনারা যে একটা বিবাহিত ছেলের পিছনে লেগে আছেন। আপনার শালির না হয় মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আপনার সমস্যা কি? আপনি কেন আমার পিছনে ওকে লাগানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে গেছেন? আপনার কি স্বার্থ এতে? পুরো পাগলের গুষ্টি কোথাকার।”
এবারে নিবিড় আর সোখানে দাঁড়ালো না। বেরিয়ে এলো অফিস থেকে। গাড়ি নিয়ে এসেছিল আজ সঙ্গে করে। সেই গাড়িতে উঠে রওনা দিল আনিকার বাড়ির উদ্দেশ্যে।
তবে আনিকার বাড়িতে গিয়ে পেল না মোহিনীকে। আনিকার থেকে জানতে পারলো মোহিনী নাকি ওর কোন কলিগের বাড়িতে উঠেছে। শুধু এতোটুকুর মাঝে ব্যাপারটা থেমে থাকলে ভালো হতো। তবে তা হলো না। প্রায় আধঘন্টা যাবত নিবিড় আনিকার কাছে ঝাড়ি খেলো।
বয়সে আনিকা বড় নিবিড়ের থেকে। মুখে মুখে তর্ক করতেও পারলো না। বলা যায় না তর্ক করলে হয়তো আবার একটা চড় লাগিয়ে দিতে পারে। আনিকা মেয়েটা যথেষ্ট রাগি। ছোটবেলায় দু চারবার চড় খেয়েওছে নিবিড় ওর হাতে। সেই জন্য এখনো আনিকার সাথে কথা বলার সময় ভেবে চিন্তে কথা বলতে হয়।
প্রায় আধঘন্টা যাবত নিবিড় কে গালাগালি করে অবশেষে আনিকা নিবিড় কে মুক্তি দিলো। নিচে নেমে গাড়িতে এসে বসে ফোনটা বের করে মোহিনীর নাম্বারে কল দিল। মোহিনী কলটা রিসিভ করল না। নিবিড় আবার কল দিল। এবারও ফোনটা রিসিভ করলো না মোহিনী।
নিবিড় এবারে বেশ ভালোভাবে বুঝতে পারছে যে মোহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে কলটা রিসিভ করছে না। বেশ ঠিক আছে। কল রিসিভ করবে না তো, ভালো। নিবিড়ের কাছে কি আর কোন উপায় নেই নাকি ওর সাথে দেখা করার। সোজা অফিসে চলে যাবে।