আজকের দিনটা বেশ ভালোই কর্মব্যস্ততার মাঝে কটাচ্ছে মোহিনীর। বেশি ব্যস্ততার মাঝে কাটার কারণ অফিসে নতুন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের ইন্টারভিউ আছে আজ। সেই ইন্টারভিউ বোর্ডেই মোহিনী আছে। সকাল থেকে অনেকের ইন্টারভিউ নিয়ে আর একটানা এত প্রশ্ন করে এখন বিরক্ত হয়ে গেছে।
পাঁচ মিনিটের বিরতি নিয়েছিলো। মোহিনীর সাথে আরো দুজন আছে, মুহসিন আর রেজা। রেজা চেয়ারের সাথে গা এলিয়ে দিয়ে বিরক্তি ভরা কন্ঠে মোহিনী কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আর এত চাপ নেওয়া যাচ্ছে না মোহিনী। বউয়ের মুখ দেখতে ইচ্ছে করছে।”
মোহিনী শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“তো বাড়ি চলে যান।”
“কাজ শেষ না করে বাড়ি গেলে কি আর বেতন পাব!”
“তাহলে চুপচাপ বসে থাকুন। নাহলে ভাবির সাথে ফোনে একটু কথা বলে নিন।”
রেজা সোজা হয়ে বসে বলল,
“ভালো কথা মনে করেছো। দাঁড়াও দুই মিনিট বউয়ের সাথে কথা বলে আসি। নতুন বিয়ে করেছি। এর মাঝে কি এত কাজ ভালো লাগে বলো? কেউ বোঝে না কষ্ট।”
কথাটা বলে রেজা উঠে গেল। মোহিনী শুধু হাসলো। মোহিনী তখন পরের ক্যান্ডিডেটের ফাইলটা সবে মাত্র হাতে নিতে ধরেছে এর মাঝেই পাশ থেকে মুহসিনের কন্ঠস্বর ভেসে এলো।
“এই ছেলে কেন এই পোষ্টের জন্য এপ্লাই করেছে বুঝলাম না তো ঠিক।”
মোহিনী ঘাড় ঘুরিয়ে মুহসিনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কেন কি হয়েছে?”
“আরে এতো ওভার কোয়ালিফাইড। বেশ ভালো কোম্পানিতে, ভালো পোস্টে চাকরির অভিজ্ঞতাও আছে। আর এখন আগের থেকে অনেক নিচু পদের জন্য এপ্লাই করেছে। এই ছেলে কেন এখানে এলো আমি তো বুঝলাম না। যে কোন জায়গায় ভালো চাকরি খুব সহজে পেয়ে যাবে। রেকমেন্ড করার মতন কেউ থাকলে তো কথাই নেই।”
মোহিনীর খুব কৌতুহল হলো জানার জন্য যে কোন পাগল এমন পাগলামি করেছে। ফাইলটা হাতে নিয়ে খোলার আগেই রেজা আবার এসে ধপ কর পাশের চেয়ারে বসে পড়ে বলল,
“কপালটাই খারাপ গো মোহিনী। বউ কল রিসিভ করলো না।”
মোহিনী কন্ঠে একটু দুঃখ প্রকাশ করে বলল,
“আসলেই আপনার কপাল খারাপ।”
রেজা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“কি আর করার। যাই হোক পরবর্তী ক্যান্ডিডেট কে ডাকি।”
মোহিনী ক্যান্ডিডেটের ফাইলটা হাতে নিল। ফাইলটা খোলার সাথে সাথে নাম আর ছবিটা দেখেই চমকে উঠলো। প্রথমে ভাবলো বোধহয় ভুল দেখছে। চোখটা একবার ডলে আবার তাকালো। কিন্তু না, সব তো ঠিক আছে। নিবিড়কেই তো দেখা যাচ্ছে। নামও তো নিবিড়েরই। নিবিড় এখানে কেন আসবে? ওতো চাকরি করে। তাহলে আবার এখানে ইন্টারভিউ দিতে আসবে কেন?
মোহিনীর এসব ভাবনার মাঝেই ওর কানে নিবিড়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো নিবিড় হাস্যজ্জ্বল মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে আসার জন্য অনুমতি চাইছে। নিবিড় যে মোহিনীর হাজব্যান্ড সেটা মুহসিন না জানলেও রেজা খুব ভালো করেই জানে। মুহসিন অনুমতি দিলো ভেতরে আসার জন্য। নিবিড় ভেতরে এসে চেয়ারে বসলো।
রেজা নিশ্চিত হওয়ার জন্য মোহিনীর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“মোহিনী, আমি কি ঠিক ভাবছি?”
রেজাকে মোহিনীর এতো কাছাকাছি যেতে দেখে ভ্রুঁ কুঁচকে ফেলল নিবিড়। হালকা একটু রাগও হলো। তবে ভদ্রতার খাতিরে এখন কিছু বলল না।
মোহিনী তখনও অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিবিড়ের দিকে। রেজার কণ্ঠস্বরটা কানে ভেসে আসতেই ধ্যান ভাঙলো। গম্ভীর গলায় বলল,
“হুম।”
রেজা খুবই আন্তরিক মানুষ। মানুষের সাথে পরিচিত হতে, কথা বলতে ভীষণ ভালোবাসে। তার উপরে যদি সেই মানুষটা পরিচিত হয় তাহলে তো কোন কথাই নেই। সঙ্গে সঙ্গে করমর্দনের জন্য নিবিড়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আরে আমাদের দুলাভাই এসেছে যে। কেমন আছেন মিস্টার নিবিড়?”
নিবিড় পাল্টা হেসে রেজার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“জ্বি ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?”
“এইতো আপনাকে দেখে এখন ভালো লাগছে। অনেকক্ষণ থেকে অপরিচিত মানুষদের দেখতে দেখতে হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম। পরিচিত কাউকে দেখে ভালো লাগছে।”
এদিকে ওদের মাঝে এত কথোপকথন দেখে মুহসিনের জানার ইচ্ছে হলো যে নিবিড়কে রেজা ঠিক কিভাবে চেনে। রেজা কে জিজ্ঞেস করলো পরিচয়টা। রেজা পাশে বসা মোহিনীকে দেখিয়ে বলল,
“আরে ইনি তো আমাদের মোহিনীর হাসবেন্ড। অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ। আগে আমি আর মোহিনী যখন পাশাপাশি ডেস্কে কাজ করতাম এই মানুষটা দশ মিনিট পর পর বউয়ের খোঁজ নিত কল করে। বাকি রইল মোহিনী। ওর মুখ থেকে তো নিজের স্বামীর প্রশংসার সরতোই না। প্রত্যেকটা বিষয়ে সবসময় নিজের স্বামীর উদাহরণ দিত। আরে নিবিড় হলেন পিওর জেন্টালম্যান।”
রেজার কথাগুলো শুনে নিবিড়ের যেমন ভালো লাগলো তেমন আবার একটু অস্বস্তিও হলো। এই লোকটা তার মানে নিশ্চয়ই জানেনা যে ওদের সম্পর্কের বর্তমানে ঠিক কি বারোটা বেজে আছে। নয়ত নিবিড় কে নিয়ে এত ভালো ভালো কথা বলতো না।
নিবিড়ের পরিচয়টা পেতেই মুহসিনও ওর সঙ্গে পরিচিত হলো। তারপরে মোহিনী কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মোহিনী, তোমার হাজবেন্ডের ইন্টারভিউ কিন্তু আমরা দুজনে নেব। তোমাকে কিন্তু একটা প্রশ্নও জিজ্ঞেস করতে দেব না ওনাকে।”
মোহিনী জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,
“তাই ভালো হবে।”
মুহসিন আর রেজা ঠিকঠাক হয়ে বসলো। মজা বাদ দিয়ে এবার একটু গুরুতর মুখ ভঙ্গি করলো। মুহসিনই আগে প্রশ্ন করলো।
“মিস্টার নিবিড়, আগের অফিসে তো বেশ ভালো পদে চাকরি করতেন। কিন্তু চাকরিটা হারালেন কি করে?”
“হারাইনি। ছেড়ে দিয়েছি। অফিসের পরিবেশটা বিষাক্ত হয়ে গেছিল তাই। এখন বিষাক্ত কেন হয়ে গেছিল সেটা প্লিজ জিজ্ঞেস করবেন না।”
মুহসিন নিজের ভদ্রতা বজায় রেখে সেই বিষয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। সর্বপ্রথম নিবিড় কে নিয়ে যেই প্রশ্নটা মনে এসেছিল সেটাই করলো।
“ওকে ফাইন। কিন্তু আমার আরেকটা প্রশ্ন হলো আপনার কোয়ালিফিকেশন তো অনেক ভালো। ইভেন এই পোষ্টের জন্য আপনি ওভার কোয়ালিফাইড। সেই সাথে আপনার এক্সপিরিয়েন্সও আছে। তাও কেন এই পোষ্টের জন্য এপ্লাই করলেন?”
নিবিড়ের মনে হলো সত্যিটাই বলা দরকার। কারণ মিথ্যল যে বলবে তেমন কোনো অজুহাতও বানিয়ে আনেনি।
“আসলে আমার ওয়াইফ এই অফিসে জব করে। আমি অন্য অফিসে জব করতাম আগে। তবে দুজন আলাদা আলাদা জায়গায় কাজ করার জন্য নিজেদের মাঝে দেখা-সাক্ষাৎ, কথাবার্তা খুবই কমে গিয়েছিল। সেজন্য এখন একটু বেশিরভাগ সময় কাছাকাছি থাকতে চাইছি। মূলত আমার ওয়াইফের সাথে সময় কাটাতে চাই।”
“অফিসে তো মানুষ নিশ্চয়ই কাজ করতে আসে, ওয়াইফের সাথে সময় কাটাতে না।”
“আমি কাজ করতে করতে সময় কাটাতে চাই। এতোটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি কাজ ফেলে রেখে তাই বলে ওয়াইফের সাথে সময় কাটাবো না। আমরা এর আগেও একসঙ্গে চাকরি করেছি। আমি এর আগে যে অফিসে চাকরি করতাম ওখানেই ছিলাম দুজনে একসঙ্গে। যদি কাজ ফেলে রেখে দুজনে একসঙ্গে সময় কাটতাম তাহলে নিশ্চয়ই এত বছর ওই অফিসে চাকরি করতে পারতাম না।”
নিবিড়ের কথায় যুক্তি খুঁজে পেল দুজনেই। রেজার মাঝে এবার একটা জটিল প্রশ্ন এলো। ভাবলো একটু খোঁচানো যাক। পরীক্ষা করা যাক যে নিবিড় আসলেও কতটা ভালো। এমনিতেও নিবিড় খুব সহজেই চাকরিটা পেয়ে যাবে। খুব বেশি প্রশ্ন করার প্রয়োজন নেই। তাই ভাবলো একটু সময় কাটানো যাক।
“আচ্ছা নিবিড়, একটা প্রশ্ন করি আপনাকে। প্রশ্নটা যদিও কাজের সাথে সম্পর্কিত না, তার পরেও করছি। আপনি যে পোষ্টের জন্য এপ্লাই করেছেন ধরুন সেই পোস্টে চাকরি পেয়ে গেলেন। তাহলে কিন্তু আপনার ওয়াইফ আপনার থেকে অনেক উঁচু পোস্টে থাকবে। ওনাকে ম্যাডাম বলে ডাকতে হবে। ওয়াইফের আন্ডারে কাজ করতে, ওনার কথায় উঠতে বসতে আবার ইগোতে লাগবে না তো? না মানে আমি বলতে চাইছিলাম অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রবলেমটা হয়।”
রেজার এই প্রশ্নটায় মোহিনী কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলো। ওরা না হয় জানেনা নিবিড় কেমন। তাই বলে এভাবে আজেবাজে কথা বলে অপমান করার কি আছে। কিন্তু কিছু বলতেও পারলো না। কেননা এটা ওদের কাজের জায়গা।
তবে নিবিড় মোটেই রাগলো না রেজার প্রশ্নে। আলতো হেসে বলল,
“কাজের বাইরে যখন প্রশ্ন করলেন তাহলে কাজের বাইরে গিয়েই উত্তর দেই। লাভ ম্যারেজ ছিল আমাদের দুজনের। বিয়ের পর পরিবার থেকে মেনে নেয়নি। বয়স তখন দুজনেরই অল্প। দুজনেরই পড়াশোনা চলছে। পরিবার যেহেতু মেনে নেয়নি কোন দিক থেকেই আর্থিক সহায়তাও পাইনি। নিজে কষ্ট করে ছোটখাটো চাকরি করে যেমন নিজে পড়াশোনা করেছি, ওকেও পড়াশোনা করিয়েছি। আমার থেকে ভালো কলেজে ওকে পড়িয়েছি। ওকে কোচিং এ ভর্তি করিয়ে দিয়েছি, নিজে ভর্তি হইনি। ও কোচিং এ পড়ে এসে রাতে আমাকে পড়িয়েছে। ইগোতে লাগার হলে তখনই লাগতো, তাই না?”
নিবিড় কথাটা শেষ করতেই কৌতুকুল বসত পাশ থেকে এবারে মুহসিন বলে উঠলো,
“আচ্ছা এবার আমি একটা প্রশ্ন করি। যেহেতু আপনার ওয়াইফ আপনার থেকে বড় পোস্টে আছেন। উনি কিন্তু অনেকটাই বড় পোস্টে আছেন। সেহেতু সবার সামনে যদি আপনাকে ওনার হাজবেন্ড বলে পরিচয় দিতে লজ্জা হয়?”
মোহিনী এবার বিরক্ত হলো না। কেননা জানার জন্য কৌতুহল হলো যে নিবিড় কি উত্তর দেয়। নিবিড় আড়চোখে একবার মোহিনীর দিকে তাকালো। দৃষ্টি ঘুরিয়ে আবার মুহসিন এর দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে বলল,
“ওই যে বললাম না পরিবার থেকে আর্থিক সহায়তা না পাওয়ার জন্য আমি নিজেই টুকটাক চাকরি-বাকরি করেছি। ওকে তো অনেক বড় কলেজে পড়িয়েছি। একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে একটা দোকানের সামনে ও আমাকে দেখে আমি গাড়ি পরিষ্কার করছি। জামা কাপড়ে তখন আমার ধুলো ময়লা লেগে ছিল, ঘামে ভিজে গেছিলাম, মুখ চোখের অবস্থা ঠিক নেই, রোদে পুড়ে গায়ের চামড়াও কালো হয়ে গেছে। ওর সাথে তখন ওর অনেক বন্ধুবান্ধব ছিল। উচ্চবিত্ত পরিবারের তারা সবাই। মোহিনী নিজেও অনেক বড় পরিবারের মেয়ে। কিন্তু সেই সবকিছু ভুলে একটা বেকার মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের হাত ধরেছিল। আর ও আমাকে ওই নোংরা অবস্থায় দেখেই সবার সামনে কান্না করে আমায় জড়িয়ে ধরেছিল। ও কেঁদেছিল তার কারণ ও জানতো না যে আমি এসব কাজ করি। আমি তখন লজ্জায় পড়ে গিয়েছিলাম ওর বান্ধবীদেরকে দেখে। আমি ছাড়তে বলেছিলাম ওকে। ওর বান্ধবীরাও জানতে চাইছিলো আমি কে। ও আমাকে ছেড়ে দিয়ে বান্ধবীদেরকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বলেছিল যে আমি ওর স্বামী। আমি গাড়ি ধোঁয়ার কাজ করি, ভিক্ষে করি, কিংবা বড় কোন অফিসে চাকরি করি তারপরও ওর কখনো লজ্জা হবে না আমাকে নিজের স্বামী হিসেবে পরিচয় দিতে। ঠিক তেমনি ভাবে আমারও কখনো লজ্জা হবে না আমার থেকে উঁচু পোস্টে আমার বউকে দেখতে। বরং আমি গর্বের সাথে সবাইকে বলি যে আমার বউ কত বড় চাকরি করে।”
মোহিনীর দুচোখ ছল ছল করে উঠলো। উপস্থিত রেজা আর মুহসিন তাজ্জব বনে গেছে নিবিড়ের কথা শুনে। কি অসম্ভব সুন্দর এদের দুজনের ভালোবাসা! কি দারুন বোঝা পড়া! দুজনে নিবিড় কে প্রচন্ড বাহবা দিল। ভীষণ প্রশংসা করলো। সেই সাথে নিবিড়কে আশ্বস্ত করলো যে চাকরিটা অনায়াসে হয়ে যাবে।
আরো টুকটাক কিছু কথাবার্তা শেষে নিবিড় বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে। নিবিড় বেরিয়ে যেতেই রেজা মোহিনী কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মোহিনী, ওনার চাকরি তো এমনিতেই কনফার্ম হয়ে যাবে। সবকিছুই ঠিকঠাক আছে। বরং প্রয়োজনের থেকে একটু বেশিই আছে। আমি বলি কি তুমি বড় কোন পোস্টে ওনার নামটা রেকমেন্ড করো। ইজিলি চাকরি হয়ে যাবে।”
রেজার কথায় মোহিনী আপত্তি জানিয়ে বলল,
“কখনোই না।”
“কিন্তু কেন?”
“আমি ওকে চিনি রেজা ভাই। ওর বউয়ের আন্ডারে কাজ করতে আত্মসম্মানে লাগবে না। কিন্তু যদি আমি কিংবা অন্যকেউ ওর নাম রেকমেন্ড করে তাহলে ওর আত্মসম্মানে লাগবে। আমি জানি আমার স্বামীর যোগ্যতা আছে। ও নিজের যোগ্যতায় খুব তাড়াতাড়ি প্রমোশন পেয়ে যাবে। আমি চাই না ও কখনো এটা অনুভব করুক যে আমার জন্য ও চাকরি পেয়েছে। ও আত্মনির্ভরশীল ছেলে। আমার ভরসা আছে নিবিড়ের ওপর। ও ঠিক নিজের জায়গাটা নিজে অর্জন করে নেবে।”
___________
মোহিনীকে কোন আগাম বার্তা না দিয়ে হঠাৎ করে নিবিড় এসে হাজির হয়েছে। দরজা খুলে নিবিড়ের মুখটা দেখে মোহিনী ভীষণ চমকালো। আজ ছুটির দিন। কারোরই অফিস ছিল না। কিন্তু এই সকাল সকাল নিবিড় কেন এলো বুঝে উঠতে পারছে না।
“এত সকালে এখানে কেন এসেছো? আরে সকাল দুপুর বাদ দাও, এসেইছো কেন?”
নিবিড় কাতর গলায় বলল,
“ছেলেমেয়ে দুটোকে একবার দেখতে দাও মোহিনী। তুমি চলে এসেছো আজ দশ দিন হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু একটা দিন ওদের সাথে কথা হয়েছে। চোখের দেখা একবারের জন্যও দেখতে পারিনি। মাঝে আমি অবহেলা করেছিলাম তাই বলে কি এতটা অবহেলা করেছিলাম যে ওদের দেখতেও পাবো না? আরে আমি তো ওদের বাবা। ভালো তো বাসতাম। আমার কি মন পোড়ে না ওদের জন্য! একটু তো আমার দিকটা বোঝার চেষ্টা করো।”
মোহিনী আসলেও একটু নরম হয়ে গেল। নিবিড়ের কথাগুলো একদমই ভুল না। সত্যি দশ দিন হয়ে যাচ্ছে একবারের জন্য দেখতে পারেনি ছেলেমেয়েকে। বাবা যেহেতু কষ্ট তো হবেই। দরজার সামনে থেকে সরে দাড়িয়ে বলল,
“ভিতরে এসো। ওরা খাচ্ছে।”
নিবিড় আর এক সেকেন্ডও বাইরে দাঁড়ালো না। মোহিনী দরজার সামনে থেকে সরে যেতেই ভিতরে চলে গেল। ছেলে মেয়ে তখন দুজনেই খাচ্ছে। নিবিড় গিয়ে আগে ওর মেয়েকে ডাকলো।
“আম্মা।”
ডাকটা কানে যেতেই নিশাত খাওয়া ছেড়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। যা ভেবেছিল তাই। ওর বাবা দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার থেকে নেমে ছুটে এলো নিবিড়ের দিকে। নিবিড় হাঁটু গেড়ে বসে দু হাতে মেয়েকে আগলে দিল। নিশাতের হাত তরকারির ঝোল দিয়ে তখন মাখা ছিল। কিচ্ছু মানলো না সেসব। এঁটো হাতেই জড়িয়ে ধরল নিবিড়ের গলা। নিবিড়ও একবারের জন্যও বাধা দিল না। দু'হাতের আঁজলায় মেয়ের মুখ নিয়ে গালে, কপালে অজস্র চুমু খেলো।
মেয়েকে আদর করা শেষে দেখলো ছেলে এসে পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। বরাবরের মতন শুধু হালকা একটু হাসি ফুটিয়ে রেখেছে ঠোঁটে। ওই হাসিটুকু দিয়েই বোঝাতে চাইছে মাহি খুব খুশি ওর বাবাকে দেখে। নিবিড় এবারে মেয়েকে ছেড়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে ছেলেকেও আদর করলো। তারপরে দুজনকে একসঙ্গে জড়িয়ে ধরলো।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে মোহিনী শুধু দেখছে। এই অবস্থাতেই তো মোহিনী নিবিড় কে দেখতে চেয়েছিল। এতটা অস্থিরতার মাঝে, এতটা উদ্বিগ্নতার মাঝেই দেখতে চেয়েছিলে। ছেলেমেয়েদের জন্য পাগলামি করতেই দেখতে চেয়েছিল। ওদের সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে অস্থির করে তুলতে চেয়েছিল নিবিড়কে। আর আজ পেরেছে মোহিনী সেটা করতে।
প্রায় দেড় ঘন্টার মতন নিবিড় ছেলেমেয়েদের সাথে কাটালো। ওরা তিনজনে এক ঘরের মধ্যে। মোহিনী একবারের জন্যও আসেনি সেখানে এতক্ষণ পর্যন্ত। তবে এবার এলো। দুই হাত বুকে গুঁজে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় নিবিড়কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“অনেক সময় দিয়েছি। এবার আসতে পারো।”
নিবিড় অসহায় দৃষ্টিতে মোহিনীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আর একটু থাকি?”
“আবার এক সপ্তাহ পর এসো।”
নিবিড় কিছু বলে উঠতে ধরলে মোহিনী হাত উঠিয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আমাকে কঠোর হতে বাধ্য করো না। চলে যেতে বলেছি। যাও।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিবিড়। যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেই নিশাত বলে উঠলো,
“বাবা, একটু দাঁড়াও। আমি এক্ষুনি আসছি।”
কথাটা বলে নিশাত দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিবিড় এখন মনে মনে চাইছে যেন নিশাত আসতে একটু দেরি করে। কেননা তাহলে নিবিড়ের কাছে একটা অজুহাত থাকবে এখানে থাকার।
তবে তেমনটা হলো না। কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই নিশাত এলো। কাঁধে ওর স্কুল ব্যাগ। শুধু কাঁধে নিজের স্কুলব্যাগই না। এক হাতে ভাইয়ের স্কুল ব্যাগ, অন্য হাতে মায়ের ব্যাগ। নিশাত যার ব্যাগ তার হাতে দিয়ে নিজে গিয়ে নিবিড়ের হাতটা ধরে বলল,
“চলো বাবা। আমরা আর এখানে থাকবো না। সাদিয়া আন্টি পঁচা। শুধু আমার সাথে ঝগড়া করে।”
নিবিড় এক হাতে মেয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে মাহি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“বাবা, তুমি যাবে না আমার সাথে?”
মাহি আগেই কোন উত্তর দিল না। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো মোহিনীর দিকে। নিবিড় ফের জিজ্ঞেস করলো,
“কি হলো যাবেনা?”
মাহি পিল পিল পায়ে মোহিনীর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“আম্মু যাব?”
মোহিনী বুঝলো ছেলেরও যাওয়ার ইচ্ছে আছে বাবার সাথে। শুধু মোহিনীর জন্য বলতে পারছে না। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি তো আবার ফিরে যাওয়া ঠিক হবেনা। মাত্র দশ দিন হয়েছে। এই দশ দিনে এত কিছু উপলব্ধি হওয়া সম্ভব না। নিবিড় হয়তো আবার বদলে যেতে পারে। মোহিনীরও হয়ত আরেকটু উপলব্ধি হওয়ার দরকার আছে।
মোহিনীর এসব ভাবনার মাঝেই ওর কানে ভেসে এলো নিশাতের কণ্ঠস্বর।
“আমি আর এখানে থাকবো না বাবা। চলো আমরা চলে যাই। চলো এক্ষুনি যাব। আর একটুও থাকবো না এখানে।”
নিবিড় মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“ঠিক আছে মা। আমরা থাকবো না এখানে। এক্ষুনি চলে যাব।”
নিবিড় কথাটা বলতেই মোহিনী ওর কথার বিরোধিতা জানিয়ে বলল,
“না। ও যাবে না। আমরা কেউই আপাতত যাবো না। তুমি যেমন একা এসেছিলে একাই চলে যাও। নিশাত, আমার কাছে এসো।”
নিশাত মোটেই নামলো না নিবিড়ের কোল থেকে। বরং দুহাতে আবারো নিবিড়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“না। আমি বাবার সাথেই যাব। এখানে থাকবোই না।”
মোহিনী আবারো কিছু বলে উঠতে ধরলে নিবিড় ইশারায় ওকে থামিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“রাতে দিয়ে যাব। সারাদিন আমার সাথে থাক। আজ তো আমারও ছুটি। ওদেরকে নিয়ে একটু ঘুরি।”
নিবিড়ের কথায় যে মোহিনী অসম্মতি জানাবে সেটা বুঝতে পেরে নিবিড় আগেই বলে উঠলো,
“এতটা কঠোর হওয়াও ঠিক হবেনা তোমার মোহিনী। সব বিষয়ে যদি তুমি এখন অতিরিক্ত কঠোরতা দেখাও তাহলে আমি যা উপলব্ধি করছি সেগুলোও কিন্তু নষ্ট হয়ে যাবে। আমার অসহায়ত্বগুলো কিন্তু রাগ আর জেদে পরিণত হয়ে যাবে। যার ফলে যে সম্পর্কটা আমি ঠিক করতে চাইছি মন থেকে, সেটা এবারে সত্যি নষ্ট হয়ে যাবে। যদি তুমি মন থেকে এটাই চাও যে আমাদের সম্পর্কটা আবার স্বাভাবিক হয়ে যাক। তাহলে ওদেরকে যেতে দাও আমার সাথে। রাতে দিয়ে যাব আমি।”
নিবিড়ের কথার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারলো মোহিনী। নিবিড় বোধহয় ঠিক বলেছে। বোধহয় একটু বেশি কঠোরতা দেখিয়ে ফেলছে মোহিনী। মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই নিবিড় এবারে ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
“মা তো অনুমতি দিয়েছে বাবা। এবার চলো। আমরা সারাদিন আজ ঘুরবো। অনেক আনন্দ করবো। তোমরা যেখানে যেতে চাইবে সেখানেই নিয়ে যাব।”
মায়ের থেকে অনুমতি পাওয়ার পরেও মাহি কেন যেন রাজি হতে পারল না বাবার প্রস্তাবে। মোহিনীর ওড়নার কোনাটা ধরে বলল,
“আমি যাব না। তুমি নিশাতকে নিয়ে যাও।
আমি আম্মুর সাথে থাকি। আমরা তিনজনে চলে গেলে আম্মু তো একা হয়ে যাবে।”
মাহি মানা কারো সত্ত্বেও নিবিড় ওকে আরো বেশ কয়েকবার জোর করলো। মোহিনীও জোর করলো যেতে। কিন্তু মাহিকে কেউই রাজি করাতে পারলো না। শেষে বাধ্য হয়ে নিবিড় মেয়েকে নিয়েই চলে গেল।