তোমার নামেই গল্প হোক

পর্ব - ১৫

🟢

মোহিনীর সাথে সব মান অভিমান মিটিয়ে, সব রাগারাগি শেষ করে ওষুধ খেয়ে একটু ঘুমিয়ে ছিলো নিবিড়। নিবিড়ের ঘুম ভাঙলো সন্ধ্যা নাগাদ। চোখ মেলে পাশে তাকাতেই দেখলো না মোহিনী আছে, না নিশাত আছে।

নিবিড়ের জ্বরটা কমেছে। শরীরটাও এখন একটু ভালো লাগছে। উঠে সারা বাড়িতে খুঁজলো মোহিনী আর নিশাতকে। কিন্তু পেলনা। নিবিড় ভাবলো মনেহয় ছাদে গেছে। এতক্ষণে তো নিশ্চয়ই মাহিও স্কুল থেকে চলে এসেছে। তার মানে তিনজনকে নিশ্চয়ই উপরেই পাবে।

সেই ভেবে নিবিড় ছাদেই গেল। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো ছাদে গিয়েও কাউকেই পেল না। তাহলে এরা গেল কোথায়? ফ্ল্যাটের অন্য কারো বাড়িতে তো মোহিনী কখনো যায়না। ঘরেও নেই। ঘুরতে গেল ছেলেমেয়েকে নিয়ে? কিন্তু মোহিনী তো এমন না যে নিশাতের অসুস্থ শরীর নিয়ে ওকে ঘুরতে নিয়ে যাবে।

নিবিড় নিচে নেমে এলো আবার। মোহিনী সঙ্গে করে যে ব্যাগ নিয়ে এসেছিল সেই ব্যাগটা পেল না। মোহিনীর ফোনও নেই। দরজার কাছে কারো জুতোও ছিল না। তার মানে বাইরে গিয়েছি। কিন্তু কোথায় গেল হঠাৎ করে?

নিবিড়ের আবার কেমন যেন ভয় করছে। এতোটুকু সময়ের মাঝে আবার কি হয়ে গেল কে জানে। সব তো ঠিকই ছিল। ঝগড়া মিটমাট করেই তো ঘুমিয়ে ছিলো।

তাড়াহুড়ো করে মোহিনীর নাম্বারে কল করলো নিবিড়। অদ্ভুত ব্যাপার হলো মোহিনীর নাম্বারটা বন্ধ। ভয়ে নিবিড়ের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। তাহলে কি নিবিড় যা ভাবছে সেটাই ঠিক? মোহিনী কি আবার কোন অজানা কারণে রেগে মেগে চলে গিয়েছে? তাই হবে।

এর আগের দিন নিবিড় বুদ্ধি করে সাদিয়ার নাম্বারটাও নিয়ে রেখেছিল। কোন উপায় না পেয়ে সাদিয়ার সেই নাম্বারেই আবার কল করলো। একবার রিং হতেই সাদিয়া ফোনটা রিসিভ করে গম্ভীর গলায় বলল,

“কি চাই?”

নিবিড় উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,

“মোহিনী কি ওখানে আছে?”

“এখানে থাকবে সেটাই কি স্বাভাবিক না?”

“বাচ্চারাও আছে?”

“ও মা। তো ওরা আবার কোথায় যাবে?”

“কিন্তু ওদের তো ওখানে থাকার কথা না। মোহিনীর তো আমার সাথে থাকার কথা ছিল। সব তো মিটমাট হয়ে গিয়েছিল।”

সাদিয়া কপাল কুঁচকে বলল,

“কখন মিটমাট হলো? মোহিনী তো কিছু বলেনি। স্বপ্ন দেখছেন নাকি। ধুর, ফোন রাখুন।”

কথাটা বলে সাদিয়া কলটা কেটে দিল। নিবিড়ের মাথাটা ভনভন করে এখন ঘুরছে। কি থেকে কি হয়ে গেল কিছুই তো বুঝলো না। এখন তো নিজের ঘুমের ওপরে রাগ হচ্ছে। কেন ঘুমোতে গিয়েছিল। এইটুকু সময়ের মাঝেই নিশ্চয়ই মোহিনীর মাথাটা কোন কারণে গরম হয়ে গিয়েছিল। সেজন্য চলে গেল।

আপাতত কোন কিছু ভাবতে চাইলো না আর নিবিড়। তাড়াহুড়ো করে কাপড় বদলে বেরিয়ে পড়লো সাদিয়ার বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কি হয়েছে সেটা তো আগে পরিষ্কার করে জানতে হবে।

____________

দরজা খুলে সামনে নিবিড়ের মুখটা দেখে একটুও অবাক হলো না মোহিনী। এই রাতের বেলা কলিংবেলের আওয়াজ পেতেই মোহিনী বুঝেছিল যে নিবিড়ই এসেছে। ঘুম থেকে উঠে কাউকে না পেয়ে যে নিবিড় এখানেই ছুটে আসবে সেটা জানতো মোহিনী।

মোহিনীকে দেখার সাথে সাথে নিবিড় উৎকন্ঠিত গলায় বলল,

“তুমি চলে এসেছ কেন? তুমি না বলেছিলে আমরা একসঙ্গে থাকবো।”

“মত বদলে ফেলেছি।”

“আরে এত তাড়াতাড়ি কি করে মত বদলে ফেললে? চলে যে এসেছো একবার জানিয়ে আসতে পারতে। আমি চিন্তা করছিলাম।”

“প্রয়োজন মনে করিনি।”

নিবিড় এবার বিরক্তিকর গলায় বলল,

“এসব কি ত্যাড়ামো হচ্ছে মোহিনী? সোজাসুজি বলোতো কি হয়েছে? আমি ঘুমিয়েই তো ছিলাম। ঘুমের মাঝে আবার কি বলে ফেলেছি?”

মোহিনী একবার ঘাড় ঘুটিয়ে পিছনে তাকালো দেখার জন্য যে বাচ্চারা কেউ এসেছে কিনা। নিশাত তো ঘুম। জেগে আছে মাহি। মোহিনী জানে ও যখন একবার মাহিকে নিষেধ করেছে আসতে তখন ছেলেটা আর আসবে না।

মোহিনী ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়ে নিবিড় কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“নিচে চলো। এখানে চেঁচামেচি করলে বাচ্চারা শুনতে পাবে।”

কথাটা বলে মোহিনী আগে আগে নিচে নামলো। নিবিড় বাধ্য ছেলের মতন ওর পিছন পিছন গেল।

“নেমেছি নিচে। এবার বল কি হয়েছে? কেন চলে এসেছো?”

মোহিনী নিবিড়ের হাতে থাকা ফোনটা ইশারায় দেখিয়ে বলল,

“মেসেজ চেক করেছিলে?”

“কার মেসেজ? তুমি মেসেজ দিয়েছিলে? আমি খেয়াল করিনি।”

মোহিনী দুই হাত বুকে গুঁজে দাঁড়িয়ে বলল,

“আমি মেসেজ দেইনি। তোমাকে ছাড়া যার গোটা দুনিয়া ওলটপালট হয়ে গেছে। যার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। যার বাঁচার ইচ্ছে ম'@রে গেছে সে মেসেজ দিয়েছে। দেখা করতে চায় তোমার সাথে। কোন যেন একটা ক্যাফেতে তোমরা প্রথম কফি খেতে গিয়েছিলে। ওই মুহূর্তটা নাকি আজও ওনাকে ঘুমোতে দেয় না। সেই মুহূর্তগুলো ভীষণ মনে পড়ে ওনার। সেজন্য দেখা করতে চায়। তোমার এখানে আসার প্রয়োজন ছিল না নিবিড়। ফারিনের সাথে দেখা করতে গেলেই পারতে।”

নিবিড় বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে মোহিনীর বলা কথাগুলো শুনলো। তারপরে নিজের ফোনের লকটা খুলে মেসেজ অপশন এ গিয়ে ফারিনের মেসেজটা পড়ল। মেয়েটা আচ্ছা ছ্যাঁচড়া। নিবিড় সব জায়গা থেকে ওর নাম্বার ব্লক করে দিয়েছিল। এটা আবার নতুন নাম্বার থেকে মেসেজ পাঠিয়েছে। মানে এই মেয়েটা পণ করেছে যে নিবিড়ের সংসার ভেঙেই ছাড়বে।

মেসেজটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিবিড় ব্যস্ত ভঙ্গিতে মোহিনী কে বোঝানোর উদ্দেশ্যে বলল,

“দেখো মোহিনী, আমি জানিনা কেন ও আবার আমাকে মেসেজ দিয়েছে। আমি ওকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে দিয়েছি। ও নতুন নাম্বার থেকে আমাকে মেসেজ দিয়েছে। এখন আমি কি করবো বলো?”

মোহিনী সঙ্গে সঙ্গে রাগান্বিত গলায় বলল,

“কিভাবে বল যে ওর কানে কথা ঢোকে না? কিভাবে বোঝাও যে বোঝেনা? আদৌ বোঝানোর মতন বোঝাও? নাকি ওখানে গিয়েও মায়া দেখিয়ে রেখে আসো? নাকি ভালোবেসে বোঝাও, যার জন্য বোঝার বদলে আরো বিগড়ে যায়? কেমন ভাবে কথা বলো যে ওনার অনুভূতিগুলো আরো বেড়ে যায়?”

নিবিড় রাগলো না। শান্ত গলায় মোহিনীকে বোঝানোর চেষ্টা করে বলল,

“দেখো মোহিনী, আমার মনে হয় ওনার সমস্যা আছে। মানসিকভাবে অসুস্থও হতে পারে। আমার ওনাকে একদিন বোঝানোর ছিল বুঝিয়েছি। তারপরে সব জায়গা থেকে ব্লক করে দিয়েছি। সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছি। চাকরিটা অব্দি ছেড়েছি যেন ওনার আশেপাশে থাকতে না হয়। আমি আরো কিভাবে বোঝাবো বলো?”

“সেভাবে বোঝাবে যেভাবে বোঝালে কাজ হবে। আমার বলতে খুবই খারাপ লাগছে নিবিড় এই কথাটা। তবে তাও আমি বলছি। তোমার প্রতি বিশ্বাসটা ঠুনকো হয়ে যেতে তুমি আমায় বাধ্য করছো। কোন ক্যাফে তে ওর সাথে বসে কফি খেয়েছো? কি এমন কথা বলেছো, কি এমন স্মৃতি যেটা ভুলতে পারছে না? কি করেছো তোমরা? আর ওর সাথে কদিনই বা এরকম ক্যাফেতে গিয়ে বসেছো? কেনই বা বসেছো? তুমি আমাকে পাগল করে দিচ্ছো নিবিড়। তুমি আমাকে সন্দেহ করতে বাধ্য করছো। কোন স্ত্রী এই ধরনের মেসেজ দেখে চুপ করে থাকতে পারবে না।”

কথাটা বলে মোহিনী অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়ালো। মোহিনীর এখন কান্না পাচ্ছে। ডুকরে কান্না পাচ্ছে। বারবার সেই সন্দেহ গুলোই মোহিনীর মনে উঁকি দিচ্ছে যেগুলো মোহিনী কখনো করতে চায়নি। আজও করতে চাইছে না। তবে তারপরও করতে বাধ্য হচ্ছে।

নিবিড়কে যত বিশ্বাস করতে চাইছে তত ওর সামনে নিবিড় কে অবিশ্বাস করার কারণ এসে দাঁড়াচ্ছে। মোহিনী এখন বুঝতেই পারছে না যে ওর কি করা উচিত, কি করা উচিত না। নিবিড়কে কতটুকু বিশ্বাস করবে সেটাও বুঝে উঠতে পারছে না। ঘুরেফিরে সেই একই কথা মাথায় আসছে যে, ফারিনকে কিভাবে বোঝায় নিবিড় যে ও বোঝেনা। ঠিকমতো অপমান তো করতে হবে মেয়েটাকে। সাবধান করে দিতে হবে যেন নিবিড়ের আশে পাশে না আসে৷ সেভাবে অপমান করলে তো আর আসার কথা না নিবিড়ের আশেপাশে।

মোহিনীর এসব ভাবনার মাঝেই ওর কানে নিবিড়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

বিজ্ঞাপন

“ফারিন বলছেন?”

নামটা শুনতেই মোহিনী তড়িৎ গতিতে পিছন ফিরে তাকালো। নিবিড় ফোনটা কানে ধরে আছে। বোধ হয় ফারিনের নাম্বারে কল করেছে। কিন্তু কেন কল করলো ফারিনার নাম্বারে? কেন ফারিনের ডাকে সাড়া দিচ্ছে নিবিড়?

মোহিনীর এসব ভাবনার মাঝেই নিবিড় আবারো ফোনের অপর পাশে থাকে ফারিন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আধা ঘন্টা সময় দিলাম। আমাদের অফিসের সামনে যে ক্যাফেটা ছিল ওখানে আসুন। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আছে। আধা ঘন্টা সময় কিন্তু আছে আপনার হাতে।”

কথাটা বলে নিবিড় ফোনটা কেটে দিতেই মোহিনী অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে বলল,

“তাহলে সত্যি যাচ্ছো ওর সাথে দেখা করতে? বেশ যাও। তবে আর যেন কখনো এখানে এসো না। ওকে দেখানো মুখটা আর আমাকে দেখাতে এসো না।”

কথাটা বলে মোহিনী সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে নিবিড় ওর হাত টেনে ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“তুমি কোথায় যাচ্ছো? চলো আমার সঙ্গে। আজ যা কথা হওয়ার তোমার সামনেই হবে। আমি তো বোঝাতে পারি না। বেশ, আজ তুমি বুঝিও। আজ একটা চূড়ান্ত ফয়সালা করব তারপর আমি শান্ত হবো। হয় আজ তোমাদের কে নিয়ে বাড়ি ফিরব, নয়তো এই সংসার ছেড়ে সন্নাসী হবো আমি।”

নিবিড় আর মোহিনীকে কিছু বলার সুযোগই দিল না। হাত ধরে টেনেই নিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসালো। মোহিনী ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করলো তবে নিবিড় ছাড়লো না। ভীষণ জোর চালালো। গাড়িতে বসানোর পর মোহিনীও তেমন বাঁধা দিল না। ভাবলো যাওয়াই যাক না, দেখাই করা যাক ঐ নির্লজ্জ মেয়ের সাথে। একটা মেয়ে কতটা নির্লজ্জ হতে পারে সেটা নাহয় মোহিনী আজ নিজ চোখে দেখবে।

__________

নিবিড় যে সঙ্গে করে মোহিনীকে নিয়ে আসবে এই ব্যাপারে বিন্দুমাত্র কোন ধারণা ছিল না ফারিনের। নয়তো কখনোই আসতো না। কিন্তু এখানে আসার পর ব্যাপারটা জানতে পেরেছে। ফারিন তো মোহিনী কে চিনতোও না। কখনো দেখেওনি। শুধু নিবিড়ের থেকে নাম শুনেছিল কয়েকবার।

এখন কেন যেন একটু হলেও অস্বস্তি হচ্ছে ফারিনের। ফারিন তো জানে ও যেটা করতে চাইছিল সেটা ঠিক না। কিন্তু তারপরও নিজের মনকে রাজি করাতে পারেনি। মনে হয়েছিল নিবিড়ের মতন একজন জীবনসঙ্গী পেলে আর কিছুর প্রয়োজন হবে না। তারমধ্যে যখন আবার জানতে পেরেছিল যে নিবিড়ের নিজের স্ত্রীর সাথে সম্পর্কটা খারাপ চলছে। তখন তো একটা দারুণ সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল।

নিবিড় মনমরা হয়ে বসে আছে। কোনোদিকে খেয়াল নেই। শুধু ভাবছে যে ওর জীবনের উপর দিয়ে কি ভয়ংকর দুর্যোগটাই না বয়ে যাচ্ছে। আর মোহিনী। সে তো কটমটে দৃষ্টিতে শুধু ফারিনের দিকে তাকিয়ে আছে। পারছে না শুধু যেন ফারিনকে খু’ন করতে।

তিনজনে ভিন্ন অনুভূতি নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকলো। অনেকটা সময় পর নীরবতা ভেঙে ফারিনই অস্বস্তি জড়ানো গলায় নিবিড় কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমার ওয়াইফের সাথে সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে নিবিড়?”

নিবিড় উত্তর দেওয়ার আগেই পাশ থেকে মোহিনী ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলে উঠলো,

“কেন? ঠিক না হলে আপনি ঢুকে পড়বেন ভেতরে?”

ফারিন একটু তেজ দেখিয়ে বলল,

“মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ। দেখুন আমি আপনাকে চিনি না, আপনার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। তাই আমি আপনার সাথে কথাও বলতে চাই না।”

“বলতে হবে আপনাকে আমার সাথে কথা। কেননা যে মানুষটার পিছনে হাত ধুঁয়ে পড়ে আছেন সে আমারই স্বামী, আমার সন্তানদের বাবা। বিন্দুমাত্র কোন আত্মসম্মান বোধ নেই আপনার? চোখ লজ্জা বলতে কিছু নেই তাই না? না হলে কি আর এভাবে অন্যের স্বামীর পেছনে পড়ে থাকতে পারতেন।”

একটু থতমত খেল ফারিন। কিছু বলে উঠতে চেয়েও যেন পারল না। আসলে কি বলা উচিত, কি বললে ঠিক হবে বুঝে উঠতে পারছে না। এই কথাটা তো একদমই ঠিক যে ফারিন অন্যের স্বামীর পিছনে পড়ে আছে।

ফারিন কে চুপ করে যেতে দেখে মোহিনী আবারো কিছু বলে উঠতে চাইলো। তবে নিবিড় ওর হাতটা ধরে ইশারায় থামতে বলল। এতক্ষণ তো মনমরা হয়ে বসে ছিলো। এবার একটু ঠিকঠাক হয়ে বসলো। ফারিন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আচ্ছা ফারিন, অফিসের বাইরে আমার কতটুকু কথা হয়েছে আপনার সাথে? কি ব্যাপারে কথা হয়েছে? আশা করছি মিথ্যে বলবেন না। যতটুকু উপকার আপনার করেছি তার কৃতজ্ঞতা বোধ থেকে হলেও সত্যি বলবেন।”

ফারিন আসলেও মিথ্যে বলতে চাইলো না। কেননা ও নিবিড়ের চোখে খারাপ হতে চায় না।

“হয়নি তেমন একটা কথা। দু একবার হয়েছে আমার ডিভোর্সের ব্যাপারে নয়ত অফিসের কাজের ব্যাপারে।”

“আপনি যখন প্রয়োজন ব্যতীত আমাকে একের পর এক মেসেজ করতেন। যদিও সেই প্রশ্নগুলো নিতান্তই স্বাভাবিক ছিল। কেমন আছি, কি করছি, খেয়েছি কিনা এই সবই ছিল। কিন্তু তারপরেও আপনার দশটা প্রশ্নের প্রেক্ষিতে আমি ছোট্ট করে একটা জবাব দিয়েছি। পাল্টা আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসাও করিনি। নাকি ঘন্টার পর ঘন্টা আপনার সাথে গল্প করেছি?”

"না করেননি। বরং আপনার নিস্পৃহতা সব সময় আমাকে কষ্ট দিয়েছে।”

“আচ্ছা খুবই ভালো কথা। আপনার সাথে আমি কয়দিন কোন কোন ক্যাফেতে গিয়েছি কফি খেতে? একা কদিন গিয়েছি, কলিগদের সাথে কদিন গিয়েছি?”

খুব কষ্ট করতে হলো না ফারিন কে কথাটা মনে করার জন্য। বরং খুব চটজলদি বলল,

“একদিন এসেছিলাম। এই ক্যাফেতেই। আমার আপনাকে ট্রিট দেওয়ার কথা ছিল কিন্তু আপনি আমাকে ট্রিট দিয়েছিলেন। আর একদিন গিয়েছিলাম অফিসের সবার সাথে অন্য জায়গায়।”

নিবিড় এবারও সন্তুষ্ট হলো ফারিন এর উপর। কেননা মেয়েটা সত্যি কথা বলেছে। এবারে পরবর্তী প্রশ্নটা করল নিবিড়,

“আমার আর আমার স্ত্রীর মাঝে সম্পর্কটা ভালো চলছে না খারাপ চলছে, আমার স্ত্রী ভালো না, আমি ওর সাথে সুখী না, আমি ওর সাথে থাকতে চাই না। এই ধরনের কোন কথা কখনো আমার মুখ দিয়ে বেরিয়েছে? আমি কখনো কাজের বাইরে হাবিজাবি বিষয় নিয়ে আপনার সাথে আলোচনা করেছি? কখনো আপনাকে আমার জীবনের দুঃখ বলেছি? আমি কি বলেছি যে আমার জীবনে আমি প্রচন্ড অসুখী, আমার ভালো থাকার জন্য আপনাকে প্রয়োজন? আমি কি কখনো আপনার সাহারা চেয়েছি? আমার কোন আচরণে কি কখনো আপনি অনুভব করতে পেরেছেন যে আমি আপনাকে ভালোবাসি?”

ফারিন এবারে কেমন যেন অসহায় গলায় বলল,

“না নিবিড়। কিন্তু আমার মনে হয়েছে যে আপনি আমার সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করেন। আপনি সব সময় খুব ভালোভাবে কথা বলেছেন আমার সাথে।”

“খারাপ ভাবে কথা বলার মতন কি কোন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কখনো? আমাকে কি আপনার পাগল মনে হয় যে কোন কারণ ছাড়া অযথা আপনার সাথে রাগারাগি করব নাকি অভদ্র মনে হয় যে আপনাকে বিনা কারণে গালাগালি করব? রাস্তার মানুষদের সাথেও তো প্রয়োজনে আমরা হেসে হেসে কথা বলি। তারমানে কি সে ধরে নেবে যে তাকে আমি ভালোবাসি? এটা কোন যুক্তি হলো? মানে এই যে আপনি আমার জীবনটা ধ্বংসের পেছনে লেগেছেন এর আসলে কারণটা কি? কেউ কি আপনাকে টাকা দিচ্ছে এর জন্য? কেউ কি প্ররোচনা দিচ্ছে? কোন কি লাভ আছে আপনার এতে?”

ফারিন এবারেও অসহায় গলায় বলল,

“আমি আপনার জীবন ধ্বংস করছি না নিবিড়। আমি শুনেছিলাম আপনার ওয়াইফের সাথে সম্পর্কটা ঠিক যাচ্ছে না। আমি তাই ভেবেছিলাম......।”

ফারিন নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই নিবিড় টেবিলে সজোরে একটা আঘাত করে রাগান্বিত গলায় চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“ভাবার একটা সীমা নেই? একটা আক্কেল নেই ভাবনার? আমার বউয়ের সাথে ঝগড়া হয়েছে জন্য আমি আপনার পেছনে লেগে যাব? ছ্যাঁচড়া মনে হয় আমাকে? কখনো কোন দিন বাজে কোনো ইঙ্গিত দিলাম না, প্রশ্রয় দিলাম না, যতটুকু সম্ভব উপকার করে গেলাম তার এই দাম দিচ্ছেন? আপনার জন্য আমার বউ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে বাচ্চাদেরকে নিয়ে। আমার দুনিয়াটা একেবারে ওলটপালট করে ছেড়েছেন। বুকে ব্যথা তুলে ছেড়েছেন আপনি আমার। এমন আলগা ঝামেলায় আমি আমার বাপের জন্ম পড়িনি। শালা দুদিন কি না কি একটু সাহায্য করেছি তার জন্য একেবারে ভালোবেসে ফেলেছেন। ভালোবাসার গুষ্টি কিলাই আমি। আসলে মেয়ে মানুষের সাথে ভদ্রতা দেখাতে নেই। একটু ভদ্রতা দেখালেই ওরা একেবারে গলে যায়। আরে বাবা একটু তো লক্ষণ টের পেতে হয় ভালোবাসার। ইস! জীবনটা ছারখার করে দিলেন আপনি আমার। সবদিক থেকে বাঁশ দিচ্ছেন। এত বাঁশ জীবনে খাইনি আমি।”

কথাটা বলে নিবিড় নিজেই দুহাতে নিজের মাথার চুল খামচে ধরল। ফারিন খেয়াল করল নিবিড়ের চেঁচামেচিতে আশেপাশের টেবিলে বসা অনেকের দৃষ্টি ওদের উপরে পড়েছে। ফারিন খুব অপমানিত বোধ করলো। সেই সাথে নিবিড় এভাবে কথা বলায় কষ্ট পেল। দুচোখ ছাপিয়ে জল বেড়িয়ে এলো। ফারিন খুব তাড়াতাড়ি নিজের চোখের জল মুছে নিয়ে নিবিড় কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমি আপনার খারাপ চাইনা নিবিড়। ভুল বুঝছেন আপনি আমায়।”

নিবিড় মাথায় চুল ছেড়ে দিয়ে দুই হাত জোর করে অনুনয়ের স্বরে ফারিনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ছেড়ে দিন আমার পিছু। আপনি একজন স্বাবলম্বী মেয়ে। একাও নিজের জীবনটা কাটিয়ে দেওয়ার মতন অবস্থা আছে আপনার। আর যদি কারো সঙ্গ ছাড়া আপনার নাই চলে তাহলে আমার থেকেও অনেক ভালো ছেলে পেয়ে যাবেন। আপনি অবিবাহিত ছেলেও পেয়ে যেতে পারেন। দয়া করে বিবাহিত দুই বাচ্চার বাপের পিছু ছেড়ে দিন। বিশ্বাস করুন, আমি মানুষটা খুবই খারাপ। আমাকে সামলানোর ক্ষমতা কেবল মোহিনীরই আছে। আমার রাগী রূপ যদি একবার দেখেন না বাপ বাপ করে পালাবেন। আমার মতন ত্যাড়া, বদ মেজাজী, বেয়াদব, অসভ্য ছেলে এই পৃথিবীতে দুটো নেই। যাকে কেবল মাত্র মোহিনীই সামলাতে পারে। আমার সমস্ত কোমলতা কেবলমাত্র আমার স্ত্রী আর সন্তানদের প্রতি থাকে। তাই বলছি দয়া করে ছেড়ে দিন আমার পিছু। আমার সংসারে অশান্তি করা বাদ দিন। দরকার পড়লে আমায় বলুন আমি আপনার জন্য পাত্র খুঁজবো। আমি নিজে টাকা খরচ করে আপনার বিয়েও দিয়ে দেব। তবুও আমার পিছু ছাড়ুন।”

অপমানে ফারিনের মুখটা ফাটা বেলুনের মতন চুপসে গেল। এতটা অপমানিত বোধ করত না ফারিন যদি না নিবিড় মোহিনীর সামনে ওকে এই কথাগুলো বলতো। মোহিনীর সামনে কথাগুলো বলাতে যেমন বেশি কষ্ট পেয়েছে তেমনি বেশি অপমানিতও হয়েছে।

সেখানে এক মুহূর্ত বসে থাকতে পারলো না। ব্যাগটা নিয়ে উঠে চলে যেতে ধরলে মোহিনী ডেকে উঠলো ওকে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও থেমে গেল ফারিন। পিছন ফিরে তাকাতেই মোহিনী বলল,

“আপনি কিন্তু নিজের মুখে আমার সামনে শিকার করেছেন সবটা। আপনি নিজেই খুব ভালো করে আপনার কথার দ্বারা বুঝিয়ে দিয়েছেন নিবিড় আপনাকে কখনো কোন জায়গাতেই প্রশ্রয় দেয়নি। আপনি নিজেই নিজেকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। আমার স্বামীর অন্যায় থাকলে আমি ওকেও ছেড়ে দিতাম না। ঠিক তেমনি পরবর্তীতে আপনি যদি বাড়াবাড়ি করেন আপনাকেও কিন্তু ছেড়ে দেব না। তাই বলছি দূরে থাকুন আমার স্বামীর থেকে। নিজের ভালো চাইলে দূরে থাকুন। আপনাকে ভালোভাবে বোঝানোর কিন্তু দিন শেষ। এবারে পদক্ষেপ নেব। এখন আসতে পারেন।”

এবারে আর দাঁড়ালো না ফারিন। গটগট পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সেখান থেকে চলে গেল। মোহিনী পাশে তাকাতেই দেখল নিবিড় চেয়ারের সাথে গা এলিয়ে দিয়েছে। আজ মোহিনী একেবারে নিশ্চিত হয়ে গেছে সবটা। আজ পরিপূর্ণভাবে আবারও নিবিড় এর ওপরে বিশ্বাসটা ফিরে এলো।

মোহিনী নিবিড়ের কপালে হাত রাখলো দেখার জন্য যে জ্বর এসেছে কিনা। সঙ্গে সঙ্গে নিবিড় হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল,

“এত ভালোবাসা দেখানো লাগবে না। যেখানে বিশ্বাস হালকা হয়ে যায় সেখানে ভালোবাসাও হালকা হয়ে যায়। এখন বাড়ি চলো। আর এখনো যদি তোমার বাড়ি ফিরতে অসুবিধা হয় তাহলে কিন্তু এবার তুমি যেখানে আছো আমি সেখানে গিয়ে উঠবো। সাদিয়াকে বের করে দেব ওর বাড়ি থেকে মাথায় রেখো।”

বিজ্ঞাপন
তোমার নামেই গল্প হোক গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাংসারিক ও রোমান্টিক গল্প