তোমার নামেই গল্প হোক

পর্ব - ১৮

🟢

এবারে প্রেগনেন্সির সময়টা খুব ধকলের মাঝে দিয়ে কাটাতে হচ্ছে মোহিনীকে। পাঁচ মাস চলছে। শরীরের অবস্থা নাজেহাল। বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিয়েছে। ডাক্তার একেবারে বেড রেস্ট দিয়ে দিয়েছে। নড়াচড়া করাও যেন নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। সেজন্য মোহিনীকে নিজের চাকরিও ছাড়তে হয়েছে। বাড়িতেও কোন ধরনের কোন কাজ করা হয় না। কাজের লোক রাখা হয়েছে। রান্নাবান্না সহ ঘরের যাবতীয় কাজ সেই করে। মিতালী এসেছে মোহিনীর দেখাশোনা করার জন্য। এর আগে ওর মা আর শাশুড়ি দুজনে এসে থেকে গেছে।

অন্যান্য দিনের তুলনায় মোহনীর শরীরটা যেন আজ আরো বেশি খারাপ করেছে। সকাল থেকে অনেকবার বমি করেছে। খাওয়া দাওয়া কিচ্ছু করেনি তেমন।

নিবিড়ের বাড়ি ফিরতে ফিরতে নয়টা বাজলো। নিবিড় সোজা ঘরে এলো। মোহিনী তখন বালিশের সাথে হেলান দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে আধশোয়া হয়ে আছে। নিবিড় ভাবলো হয়তো হয়ত ঘুমিয়েও পড়েছে। তাই ভাবলো এখন আর বিরক্ত করবে না। আগে জামা কাপড়টা বদলে আসুক। তারপরে না হয় কথা বলবে।

নিবিড় জামা কাপড় বদলে ওয়াশরুম থেকে বেরোতেই দেখল মিতালী মোহিনীকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। একটু গরম গরম ভাত রান্না করে এনেছে। মোহিনী আলু ভর্তা আর ঘি দিয়ে ভাত খেতে চেয়েছিল। সেটাই এনেছে মিতালী। নিজেই মাখিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এক লোকমার বেশি খেতে পারল না। পরের লোকমাটা মিতালী মুখে দিতে ধরলে নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“আর হবে না মিতালী। নিয়ে যা।”

“আরে বললেই হলো নাকি হবে না? সকাল থেকে শুধু বমি করে যাচ্ছিস। কিচ্ছু পেটে পড়েনি। যা চেয়েছিস সেটাইতো আনলাম। চুপচাপ খেয়ে নে। মাথা গরম করবি না একদম।”

“বলছি তো পারবো না। আর হবে না আমার দ্বারা। নিয়ে যা এগুলো। আমার এখন এই খাবারের গন্ধই সহ্য হচ্ছে না।”

মিতালী এবার ধমকে উঠে বলল,

“চুপচাপ খাবি তুই। না খেয়ে থাকলে বাঁচবি কি করে? সকাল থেকে এক দানা ভাত পেটে পড়েনি। ভেতরে বাচ্চাটা কি খাবে? তুই বড় বোন হয়ে কিন্তু এবার আমার হাতে মা'র খাবি আপু। বাঁচতে হবে না? অবুঝের মতন কথা বলিস কেন? চুপচাপ খেয়ে নে।”

মিতালী নিজের কথাটা শেষ করতে না করতেই পাশ থেকে নিবিড় ওকে ধমকে উঠে বলল,

“এই, তুই কোন সাহসে আমার বউয়ের সাথে উঁচু গলায় কথা বলছিস? ওকে ধমকাচ্ছিস কেন? এভাবে কেউ খাওয়ায়? এটা ভালোবাসা দেখানোর কোন ধরণ হলো? ভালোবাসা দেখালে ভালোবাসার মতন করে দেখা। খবরদার আমার বউ কে ধমকাবি না। ভালোবেসে তো খাওয়াতে পারিস না আবার গরম দেখাচ্ছিস। মা'রবি আমার বউ কে? আয় না। তোকে আমার হাত থেকে কে বাঁচায় সেটাও আমি দেখব।”

রাগে মিতালীর শরীরের র’ক্ত টগবগ করে ফুটে উঠলো। তবুও নিজেকে যথা সম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করে চোখমুখে বিরক্তি ভাব ফুটিয়ে তুলে নিবিড় কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তুমি একটা চুপ থাকবে। বোঝো না তো কোন কিছু অযথা চেঁচাও কেন? খাওয়াতে হবে না তোমার বউকে? না খাওয়ালে বাঁচবে? ভালোর জন্য ধমকেছি আমি।”

নিবিড় হাতে থাকে গামছাটা রেখে এগিয়ে গিয়ে মিতালীর হাত থেকে প্লেটটা কেড়ে নিয়ে বলল,

“দরকার নেই তোর এত ভালো ভাবার। আমার বউকে ধমকাবি না মিতালী। দেখি ওঠ। আমি খাইয়ে দিচ্ছে ওকে। আমাকে দেখে শেখ কি করে ভালোবেসে খাওয়াতে হয়।”

মিতালী সত্যি সত্যি উঠে দাঁড়ালো। ইচ্ছে করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল না। দেখার জন্য দাঁড়িয়ে রইল যে নিবিড় ঠিক কিভাবে ভালোবাসা দেখালে মোহিনী খায়। কেননা মিতালী খুব ভালোভাবে জানে মোহিনী খাবে না।

নিবিড় মোহিনীর পাশে বসে কিছু বলার আগেই মোহিনী অনুনয়ের স্বরে বলে উঠলো,

“প্লিজ নিবিড় জোর করো না। আমি খেতে পারব না।”

নিবিড় পাল্টা অনুনয়ের স্বরে বলল,

“একটু খেয়ে নাও প্লিজ। দেখো আমি বেশি খেতে বলবো না। একটু খাও। তারপরে আর আমি জোর করব না কথা দিচ্ছি।”

“আমার খেতে ইচ্ছে করছে না এটা কেন বুঝতে পারছো না? খেলে আবার বমি হবে। আর আমার পক্ষে এখন বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে বমি করা ঠিক কতটা কষ্টদায়ক সেটা আমি তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। দয়া করে জোর করো না।”

নিবিড় আদুরে গলায় বলল,

“একটু খেয়ে নাও পাখি। বমি হলে হবে। তোমাকে উঠে ওয়াশরুমে যেতে হবে না। তুমি মেঝেতেই বমি করো। আমি পরিষ্কার করবো সব। তোমাকে সেসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। কিন্তু একটু খেয়ে নাও। শুধু একটু। না খেলে তো আরো অসুস্থ হয়ে যাবে বলো। একটু খেয়ে নাও।”

অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো নিবিড় আরো কিছুক্ষণ পীড়াপীড়ি করতেই মোহিনী সত্যি কয়েক লোকমা ভাত মুখে তুলল। মিতালী অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে মোহিনী কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এই আপু, এখন খেলি কেন? তুই না বলছিলি গন্ধই সহ্য করতে পারছিস না।”

মোহিনী কোন উত্তর দিতে পারল না। তার আগেই নিবিড় মিতালীর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,

“দেখেছিস তো, ভালোবেসে খাওয়ালে ঠিকই খায়। তোর আক্কেল নেই খাওয়ানোর। ধমকা ধমকিতে সবসময় কাজ হয় না বুঝতে পেরেছিস? আর ভুলেও কখনো আমার বউকে ধমকাতে আসবি না। যা বেরো এখন ঘর থেকে। আমি এসে গেছি। তোর কাজ শেষ।”

নিবিড়ের কথাগুলো শুনে মোহিনী এবারে হেসে ফেলল। শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ। হাসার শক্তিটুকুও নেই। তবুও নিবিড়ের কথাটা শুনে না হেসে থাকতে পারলো না। মিতালীও আর সেখানে দাঁড়ালো না। এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপমানিত হওয়ার কোন মানেই হয় না।

মোহিনী কে খাইয়ে ওর মুখ ধুঁয়ে মুছে দিয়ে তারপরে ওকে ওষুধ খাইয়ে দিয়ে মোহিনীকে শুইয়ে দিল। মোহিনী বিশ্রাম করছে। এই ফাঁকে গিয়ে নিবিড় একটু খেয়ে এলো। রাত তো অনেক হয়েছে। ওর ও ক্ষুধা লেগে গেছে।

খাওয়া-দাওয়া করে ঘরে এসে নিবিড় ল্যাপটপ নিয়ে সোফায় বসলো কাজ করার জন্য। ঘরের লাইটটা বন্ধ করে দিল। যেন মোহিনীর কোন অসুবিধা না হয়। একটু পর খেয়াল করলো মোহিনী শুধু এপাশ-ওপাশ ফিরছে। হাত পা কেমন করে নাড়াচ্ছে। বোধহয় ব্যথা করছে আবারো পা দুটো।

নিবিড় ল্যাপটপটা রেখে উঠে গিয়ে বিছানায় মোহিনীর পায়ের কাছে বসে আলতো হাতে বেশ অনেক্ষন যাবৎ ওর পা দুটো টিপে দিলো। ফুলে গেছে মোহিনীর পা দুটো। নিবিড়ের দেখেই কেমন যেন কান্না পেল। ইশ! কত কষ্টই না জানি হচ্ছে মোহিনীর। মনে হলো একটু যদি ভাগ করে নিতে পারতো মোহিনীর কষ্টটা! ইচ্ছে করে মোহিনীর সমস্ত কষ্ট নিজে নিতে। তাও যদি মোহিনী ভালো থাকতো তাহলেই তো নিবিড় শান্তি পেত।

নিবিড়ের এসব ভাবনার মাঝেই ওর কানে মোহিনীর ডাক ভেসে এলো। তাড়াহুড়ো করে উঠে গিয়ে মোহিনীর মাথার পাশে বসে বলল,

“হ্যাঁ বল। কি হয়েছে?”

“ক্ষুধা লেগেছে। কিছু একটু খেতে দাও তো।”

মোহিনী খেতে চেয়েছে এটাই তো বিস্ময়কর ব্যাপার। নিবিড় একেবারে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। দৌড়ে গিয়ে ফ্রিজে যত ধরনের খাবার রাখা ছিল সবই নিয়ে এলো। টক, ঝাল, মিষ্টি সব ধরনের খাবারই সেখানে উপস্থিত। খাবার গুলো এনে বিছানায় মোহিনীর সামনে রেখে মোহিনীকে উঠে বসিয়ে তারপর লাইটটা জ্বালিয়ে বলল,

“কি খাবে বলো?”

মোহিনী এক এক করে প্রত্যেকটা খাবারের দিকে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“এগুলোর একটাও খাব না। ভালো লাগছে না। এগুলো দেখলেই তো কেমন লাগছে। অন্য কিছু আনো।”

“ফ্রিজে যা ছিল সবই তো নিয়ে এলাম।”

“কিন্তু আমার এগুলো খেতে ইচ্ছে করছে না। আবার ক্ষুধাও লেগেছে।”

নিবিড় উঠে গিয়ে আবারো মোহিনীর পাশে বসে এক হাতে ওকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদূরে গলায় বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে এগুলো খেতে হবে না। তোমার কি খেতে ইচ্ছে করছে আমায় বল। আমি এনে দেবো।”

মোহিনী একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো। দশটা বাজতে চলেছে।

“অনেক রাত হয়ে গেছে তো। এখন আর যাওয়ার প্রয়োজন নেই।”

“তোমাকে এত কিছু ভাবতে হবেনা। আমি যেখান থেকে পারি নিয়ে আসবো। তুমি শুধু বলো কি খেতে ইচ্ছে করছে তোমার?”

নিবিড়ের অনেক জোড়াজুড়িতে শেষে বাধ্য হয়ে মোহিনী বলল,

“একটু ছানার সন্দেশ খেতে ইচ্ছে করছে।”

“এই ব্যাপার? তুমি বসো। সামনের দোকান থেকে এনে দিচ্ছি আমি।”

“কিন্তু এত রাতে কি খোলা পাবে?”

“আরে সেসব তোমায় চিন্তা করতে হবে না। আমি নিয়ে আসছি।”

কথাটা বলে নিবিড় তাড়াহুড়ো করে উঠে গিয়ে শুধু মানিব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে যেতে ধরলে মোহিনী আবার ওকে ডেকে উঠে বলল,

বিজ্ঞাপন

“শোনো, বেশি দূর যাওয়ার দরকার নেই। সামনের দোকানে না পেলে ফিরে এসো। আর আইসক্রিম নিয়ে এসো। স্ট্রবেরি ফ্লেভারের আনবে। ঠিক আছে?”

“আচ্ছা ঠিক আছে। আর কিছু?”

মোহিনী একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,

“না। এখন আর কিছু না। আপাতত এই দুটোই আনাে তাহলেই হবে।”

নিবিড় চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে আলতো হেসে বেরিয়ে গেল।

ওদের বাড়ির সামনের দোকানটা খোলা পেলো না নিবিড়। অন্যান্য দিন কিন্তু এত তাড়াতাড়ি দোকানটা বন্ধ হয় না। কিন্তু আজকে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলস্বরুপ নিবিড় কে এখন মিষ্টির দোকানের সন্ধানে যেতে হলো। বেশ কয়েকটা মিষ্টির দোকানে গেল। তবে সমস্যা হলো সবার দোকানেই ছানার সন্দেশ শেষ।

অনেকগুলো দোকান ঘোরার পর একটা বেশ বড় দোকান খোলা পেল নিবিড়। ওর মনে হলো এই দোকানে অন্তত থাকা উচিত।

তাড়াহুড়ো করে দোকানের ভেতরে গিয়ে কর্মচারীকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ভাই, ছানার সন্দেশ আছে?”

কর্মচারী কন্ঠে কিঞ্চিত দুঃখ প্রকাশ করে বলল,

“পাঁচ মিনিট আগে আসলেই হতো ভাই। এক্ষুনি বিক্রি হয়ে গেল।”

নিবিড় আর্তনাদ করে উঠে বলল,

“সে কি? বিক্রি করে দিলেন? আমার যে দরকার ছিল খুব।”

কর্মচারীটা বিল কাউন্টারে দাঁড়ানো একটা মেয়েকে দেখিয়ে বলল,

“ওই যে ওই আপা এক্ষুনি এসে নিয়ে গেলেন। কি করবো ভাই বলুন দেরিতে এসেছেন। এত রাত অব্দি তো থাকে না।”

নিবিড় এত কিছ বুঝলো না যে মিষ্টি নেই, শেষ হয়ে গেছে। ওর একটাই কথা ওকে মিষ্টি নিয়ে যেতে হবে। মোহিনী খেতে চেয়েছে।

আগে পিছে কোন কিছু না ভেবে সেই মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল। মেয়েটা সবে মাত্র টাকা পরিশোধ করে দিয়ে চলে যেতে ধরেছে। এর মাঝে হঠাৎ করে নিবিড় সামনে এসে দাঁড়াতেই খানিকটা চমকালো। নিবিড়ের মুখটা দেখেই বুঝতে পারছে কিছু বলবে। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কিছু বলবেন?”

নিবিড় চোখে মুখে কাতরতা ফুটিয়ে তুলে বলল,

“আপু, প্লিজ একটা হেল্প করতে পারবেন?”

“কি হেল্প?”

নিবিড় মেয়েটার হাতে থাকা মিষ্টির প্যাকেটটাকে ইশারায় দেখিয়ে বলল,

“আপনি যে ছানার সন্দেশটা নিয়েছেন সেটা একটু দেওয়া যাবে আমায়? আসলে আমার ওয়াইফ প্রেগন্যান্ট। শরীরটা খুবই খারাপ, অসুস্থ। কিচ্ছু খাচ্ছে না। হঠাৎ করে মাঝরাতে আবদার করেছে একটু ছানার সন্দেশ খাবে। আমি অনেকক্ষন যাবৎ খুঁজছি কিন্তু কোন দোকানেই পাইনি। শেষে এখানে এসে শুনলাম ছিল তাও নাকি আপনি নিয়ে যাচ্ছেন। প্লিজ আপু আজকের দিনটা একটু আমার প্রেগন্যান্ট ওয়াইফের জন্য কষ্ট করে নেবেন! ও কিছু খেতে পারছে না আপু। খুব অসুস্থ। প্লিজ একটু কম্প্রোমাইজ করুন না!”

এতক্ষণে এসে নিবিড়ের ভাগ্যটা প্রসন্ন হলো। মেয়েটা অত্যন্ত ভালো মনের পরিচয় দিল। আলতো হেসে বলল,

“অবশ্যই করবো। কোন ব্যাপার না। আপনি যে আপনার ওয়াইফের জন্য এতটা ভেবেছেন, ওনার জন্য একটা অপরিচিত মেয়ের কাছে এসে রিকুয়েস্ট করছেন এটাই তো অনেক বড়। আমি আমার বাচ্চাদের জন্য নিয়ে যাচ্ছিলাম। আমিও তো মা হয়েছি, আমি বুঝি এই সময় মেয়েদের কত ধরনের সমস্যা হয়। আপনি বরং এই সন্দেশটা আপনার ওয়াইফের জন্য নিয়ে যানএখান । আমি আমার বাচ্চাদের জন্য অন্য মিষ্টি নিয়ে নিচ্ছি।”

নিবিড় উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,

“আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আপু। আমি আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না আমি আপনার প্রতি ঠিক কতটা কৃতজ্ঞ। আপনার এই ঋণ, উপকার যাই বলুন না কেন আমি কোনদিন ভুলবো না।”

“ইটস ওকে। আপনি নিয়ে যান। আপনার ওয়াইফ অপেক্ষায় আছে।”

নিবিড় তাড়াহুড়ো করে মেয়েটার হাত থেকে মিষ্টির প্যাকেটটা নিয়ে মিষ্টির টাকাটা মেয়েটাকে দিয়ে এসে একটা গাড়িতে উঠলো। ড্রাইভারকে বলল যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব ততটা তাড়াতাড়ি যেন গাড়ি চালায়। খুব বেশিক্ষণ লাগলো না বাড়ি পৌঁছাতে। গাড়ি থেকে নেমে ভাড়াটা মিটিয়ে দিয়ে দৌড়ে নিবিড় উপরে এলো। আসার পথে এক জায়গায় গাড়ি থামিয়ে আইসক্রিমও নিয়েছে।

ঘরে এসে মিষ্টির প্যাকেটটা খুলে মোহিনীর সামনে রাখলো। আইসক্রিমের বক্সটাও খুলে মোহিনীর সামনে রেখে তার মাঝে একটা চামচ দিয়ে মোহিনী কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“যতগুলো ইচ্ছে ততগুলো খাও। পেট ভরে খাও। আমি কাল আবার এনে দেব। আর কি কি খেতে ইচ্ছে করে আমায় বলো। আমি সব এনে দেবো ঠিক আছে।”

মিষ্টি আর আইসক্রিমের দিকে তাকিয়ে মোহিনীর চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। অনেকক্ষণ আগে নিবিড় বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলো। নিবিড়কে যে মিষ্টিটা আনার জন্য খুব কষ্ট করতে হয়েছে সেটা বেশ ভালোই বুঝতে পারলো মোহিনী। কিন্তু নিবিড় কষ্ট করেছে শুধুমাত্র মোহিনীর জন্য। মোহিনী খেতে চেয়েছে জন্য।

আসলে সব সম্পর্কের মাঝেই কোন না কোন এক সময় দূরত্ব চলে আসে। ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়, রাগারাগি হয়, মতের অমিল হয়। কিন্তু তার মানে যে সম্পর্ক গুলো শেষ করে দেয়া উচিত, সম্পর্কগুলো থেকে ভালোবাসা উঠে যায় তেমনটা না। শুধু একটু সময় দিতে হয়। সবটা ঠিক হওয়ার জন্য, পরিস্থিতি ঠিক হওয়ার জন্য সময় দিতে হয়। এই যেমন মোহিনী সময় দিয়েছিল। আর আজ তার ফল দেখতে পাচ্ছে।

________

দিনটা জুন মাসের ছয় তারিখ। হাসপাতালের করিডোরে নিবিড় বিরতিহীনভাবে পায়চারি করেই যাচ্ছে। চোখে মুখে তার সে কি উৎকন্ঠা!

একেই তো প্রচন্ড গরম। তার উপরে আবার মাথায় হাজারো চিন্তা। সব মিলিয়ে প্রচণ্ড ঘামছে নিবিড়। পকেট থেকে রুমালটা বের করে যে একটু নিজের ঘামগুলো মুছে নেবে সেই কথাটাও খেয়াল নেই। শুধু নিবিড় একা চিন্তায় আছে তেমনটা না। দুই পরিবারের প্রত্যেকটা মানুষই প্রচন্ড চিন্তায় আছে। এমনকি চিন্তায় আছে বাচ্চারাও।

কয়েক ঘন্টা আগে মোহিনী কে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। মোহিনীর প্রেগনেন্সিটা খুবই কমপ্লিকেটেড ছিল। এই কয়েকটা মাস যে কিভাবে কাটিয়েছে মোহিনী, সেটা মোহিনীই জানে। আর যারা ওর আশেপাশে থেকেছে তারা দেখেছে। শারীরিক জটিলতার অভাব ছিল না। আর সেই জন্যই তো ভয়টা পাচ্ছে নিবিড়। বারবার শুধু মস্তিষ্কে নানা ধরনের আজেবাজে চিন্তা উঠেছে। মনে হচ্ছে যদি কিছু হয়ে যায় মোহিনীর!

এমন অস্থির পরিবেশের মাঝেই নার্স কোলে করে একটা ছোট্ট বাচ্চাকে নিয়ে বেরিয়ে এলো সেখানে। নিবিড় খেয়াল করল নার্সের হাতে তোয়ালের মাঝে প্যাঁচানো একটা ছোট্ট বাচ্চা। যদিও এখনো মুখটা দেখা যাচ্ছে না। নিবিড় সেদিকে এগিয়ে যেতেই নার্স হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলল,

“অভিনন্দন। আপনার ছেলে হয়েছে।”

এর আগেও নিবিড় এই সংবাদটা পেয়েছে। তবে আজ তৃতীয়বারের মতন এই সংবাদটা পাওয়ার পরেও ঠিক যেন প্রথম দিনের মতোই মনে হলো। মনে হলো এটাই প্রথম। আজই প্রথম বাবা হলো নিবিড়। এর আগে কখনো এত সুন্দর সংবাদ পায়নি।

দুই হাত বাড়িয়ে তুলতুলে ছোট্ট শরীরটা নিবিড় কোলে তুলে নিল। কি ছোট্ট একটা শরীর। ছোট্ট ছোট্ট চোখ দুটো বন্ধ করে আছে। ঘুমোচ্ছে নাকি কে জানে। নড়াচড়াও তো করছে না খুব একটা। গাল দুটো লাল টকটক করছে। নিবিড় জানে না কেন কিন্তু ওর দু চোখ ছলছল ভরে উঠলো। আলতো করে ছেলের কপালে একটা চুমু খেল। কিছুক্ষণ আদর করে তারপরে মনে পড়ল মোহিনীর কথা। সঙ্গে সঙ্গে উদ্বিগ্ন গলায় নার্স কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মোহিনী, আমার স্ত্রী কেমন আছে? ও ঠিক আছে তো?”

“হ্যাঁ। উনি ঠিক আছে। চিন্তা করবেন না। একটু পরে ওনাকে কেবিনে শিফট করা হবে।”

মোহিনী ঠিক আছে কথাটা শুনতেই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল নিবিড়। এতক্ষণে যেন বুকের উপর থেকে একটা পাথর নেমে গেল।

________

“এই দেখো, মোহিনী আমার ছেলে। আমার আর তোমার ছেলে।”

মোহিনী দেখলো ছেলের মুখটা। নিজের অজান্তেই মোহনীর চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। এই ছোট্ট মুখটা দেখেই নিজের সমস্ত প্রসব বেদনা মুহূর্তের মাঝে ভুলে গেল মোহিনী। মনে হলো সমস্ত কষ্ট সার্থক। চোখের সামনে যখন এই ছোট্ট বাচ্চাটা ধীরে ধীরে বড় হবে, ওকে মা মা বলে ডাকবে তখন যে শান্তি পাবে সেই শান্তির কাছে এই কষ্ট কিচ্ছু না।

কেবিনে তখন কেবল মোহিনী নিবিড় আর ওদের সদ্য জন্মানো ছেলে ছিল। একটু পর কেবিনে দৌড়ে নিশাত আর মাহি এলো। তাদের পরিবারের নতুন অতিথিকে দেখার চেয়েও তাদের বেশি চিন্তা নিজেদের মাকে নিয়ে। দুজনে দু দিক থেকে এসে মোহিনীকে জড়িয়ে ধরলো।

মোহিনীর শরীরটা ব্যথায় টনটন করছে। নড়তে পারছে না। সেজন্য একটু বাচ্চা দুটোকে টেনে বুকের মাঝে নিতেও পারলো না। উঠে বসে একটু দুজনের গালে দুটো চুমুও দিতে পারল না। শুধু দুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। আর অন্যদিকে নিবিড় বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে অন্য হাতে মোহিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

কেবিনে ঢুকে দুই পরিবারের লোকজন এই সুন্দর দৃশ্যটা দেখল। সবারই চোখ জোড়া কেমন যেন ছলছল করে উঠলো। কয়েক মাস আগেও এই সুন্দর পরিবারটা ভাঙতে বসেছিল। এই সুন্দর সম্পর্ক গুলো শেষ হয়ে যেতে বসেছিল। ভাগ্যিস দুজনে সবটা সামলে নিয়েছিল। ভাগ্যিস নিজেদের মধ্যে সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নিয়েছিল।

পরিবেশটা স্বাভাবিক করার জন্য নাঈম পকেট থেকে ফোনটা বের করে মোহিনী আর নিবিড় কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ভাইয়া ভাবি, দেখি তোমাদের তিন বাচ্চা কে নিয়ে একটু এদিকে তাকাও তো। এই সুন্দর মুহূর্তের একটা ছবি তুলে রাখি। এত সুন্দর দৃশ্য খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়।”

মাহি আর নিশাত মোহিনীর দুপাশে বসলো। নিবিড় ওর ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে মোহিনীর মাথার কাছে বসল। অন্য হাতে এখনো মোহিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এই সুন্দর মুহূর্তটার দৃশ্য নাঈম ক্যামেরা বন্দি করলো। এই ভালোবাসার আদুরে মুহূর্তটা সারা জীবনের জন্য ছবির মাঝে বন্দী হয়ে থাকলো।

এভাবেই ভালো থাকুক সব ভালোবাসা। সবার জীবনের গল্প তাদের ভালোবাসার মানুষের নামেই হোক। নিবিড়ের জীবনের গল্পও মোহিনীর নামেই হোক।

বিজ্ঞাপন
তোমার নামেই গল্প হোক গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাংসারিক ও রোমান্টিক গল্প