আজ সারাদিন মেয়েকে নিয়ে অনেক ঘুরেছে নিবিড়। মেয়ে যেখানে যেতে চেয়েছে, সেখানেই নিয়ে গেছে। পার্কে নিয়ে গেছে, দোলনায় চড়িয়েছে, চিরিয়াখানায় নিয়ে গেছে, মেয়ে যে খেলনা কিনতে চেয়েছে সেই খেলনা কিনে দিয়েছে, যা খেতে চেয়েছে তাই খাইয়েছে। সাথে মোহিনী না থাকায় সুযোগটা বেশ ভালোই কাজে লাগিয়েছে নিশাত। ফলস্বরূপ যা যা ইচ্ছে হয়েছে তাই তাই কিনে নিয়েছে বাবার থেকে। আইসক্রিমও খেয়েছে বেশ কয়েকটা।
মোহিনীকে দেওয়া কথা অনুযায়ী ঘোরাঘুরি শেষে নিবিড় সন্ধ্যের দিকে নিশাতকে মোহিনীর কাছে দিয়ে গিয়েছিল। নিশাতকে রেখে বাড়ি ফিরে আবারো মনটা খারাপ হয়ে গেল নিবিড়ের। আবারও একা একা লাগছে। তবে একটু বিছানায় গা এলিয়ে দিতেও পারলো না। তার আগেই আবার মোহিনীর নাম্বার থেকে কল চলে এলো। এই সময় মোহিনী কল করায় নিবিড় বেশ ঘাবড়েছিলো। নিশ্চিত ছিল যে কিছু একটা ঘটেছে। কলটা রিসিভ করে কানে ধরার পর নিবিড়ের সেই সন্দেহটাই সত্যি হলো।
নিশাত বাবা বাবা বলে কান্নাকাটি করে মোহিনীর মাথাটা খারাপ করে রেখেছে। পাগলের মতন কান্নাকাটি করছে মেয়েটা। শেষে মোহিনী বাধ্য হয়ে নিবিড়কে কল করে আসতে বলেছিল।
নিবিড় এক মুহূর্ত ব্যয় না করে সঙ্গে সঙ্গে আবার রওনা দিয়েছিলো। মোহিনী তো পণ করেছে যে এত তাড়াতাড়ি কোনমতেই নিবিড়ের সঙ্গে ফিরে যাবে না। এদিকে মেয়েও আবার পণ করেছে কোনো মতেই এখানে আর থাকবে না। ওর বাবার সাথেই যাবে। শেষে রেগে মেগে নিবিড় বলেছে যে মোহিনী এখানে থাকলে থাকুক। ও নিশাতকে নিয়ে যাবে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মোহিনী কে ওর কথায় রাজি হতে হয়েছে।
নিশাত তখন মোহিনীর কোলে। ওরা বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে আছে। নিবিড় এসেছে একটু আগে। খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করবে না। মেয়েকে নিয়েই চলে যাবে। এখন আর নিশাত কাঁদছে না। বরং হাসছে।
নিবিড় গম্ভীর গলায় মোহিনী কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“যেতে হবে আমাদের। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
মোহিনী মেয়ের মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিয়ে গালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“সত্যি চলে যাবে মা আমায় ছেড়ে? থাকতে পারবে তো? রাতে কান্নাকাটি করবে না তো?”
নিশাত বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
“না আম্মু। একটুও কাঁদবো না। বাবার গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমোবো।”
মোহিনী অসহায় গলায় বলল,
“থেকে যাওনা আমার কাছে! আমি তো অনেক আদর করবো! আমার গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ো।”
মোহিনীর কথায় নিশাত আপত্তি জানিয়ে বলল,
“না। আমি বাবার সাথেই যাব। তুমিও চলো আমাদের সাথে। বাবা তো নিয়ে যাবে তোমায়।”
একটু দমে গেল মোহিনী। নিবিড় কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মোহিনীর দিকে। ভেবেছিল হয়তো মোহিনী যেতে চাইবে। তবে না, মোহিনী যেতে চাইলোই না। নিজের জেদ ধরেই বসে রইল। নিবিড়ও তাই জোর করলো না। মেয়েকে কোলে নিয়ে চলে গেল।
____________
সারাটা রাত মোহিনী ঠিক করে ঘুমোতে পারলো না। অদ্ভুত ছটফটানির মাঝে কাটলো। বারবার শুধু মনে হচ্ছিলো কে জানে মেয়েটা কি করছে। নিবিড় কি ওর যত্ন নিতে পারবে? রাতে তো খেয়েও গেল না। নিবিড় কি মেয়েকে খাওয়াতে পারবে? আচ্ছা কান্নাকাটি করলে নিবিড় আবার বিরক্ত হবে না তো? বকবে না তো?
এসব ভাবতে ভাবতেই সকাল হয়ে গেছে। এক ঘন্টাও ঠিক করে ঘুমিয়েছে কিনা সন্দেহ। তবে শান্তি শুধু এতোটুকুই ছিল যে মেয়ে কাছে না থাকলেও ছেলে ওর গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছে।
ঘড়িতে সময় যখন সকাল ছয়টা। মোহিনী তাড়াহুড়ো করে ঘুম থেকে উঠে পড়লো। উঠে ব্রেকফাস্ট বানিয়ে তারপরে এসে মাহি কে ডাকল। স্কুলে পাঠাতে হবে। নিশাতের আজকে আর স্কুলে যাওয়া হবে না। কেননা নিবিড় না নিজে ঠিক সময় উঠতে পারবে, না নিশাতকে তুলতে পারবে। আর নিশাতকে ঘুম থেকে তোলা কোন যুদ্ধের চাইতে কম না। পুরো বাপের গুণ পেয়েছে। একেবারে কুম্ভকর্ণের ঘুম। মোহিনী কে আধঘন্টা আগে থেকে মেয়েকে ডাকাডাকি করতে হয় ঘুম থেকে তোলার জন্য। স্কুলে পাঠানোর আগে যে ঠিক কতটা কষ্ট করতে হয় মোহিনীকে সেটা কেবলমাত্র মোহিনী জানে। আর যদিও বা ঘুম থেকে ঠিক সময় উঠে যায় আজ তাও স্কুলে যাওয়া হবে না। কেননা নিশাত নিজের ইউনিফর্ম নিয়ে যায়নি।
মা ছেলে খাওয়া দাওয়া করে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লো। মোহিনী মাহিকে স্কুলে ছেড়ে দিয়ে নিজের অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। পথিমধ্যেই নিবিড়ের কল এলো। এই সময় নিবিড়ের ফোন থেকে কল আসায় আপনা আপনি মোহিনীর কপালে গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো। কোন এক অজানা আতঙ্কে বুকটা ধ্বক করে উঠলো।
তাড়াহুড়ো করে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“কি হয়েছে? এত সকালে কল করলে যে? নিশাত ঠিক আছে?”
অপর পাশ থেকে নিবিড় মিনমিনে গলায় বলল,
“আসলে কাল রাত থেকে ওর অনেক জ্বর। ওষুধ খাইয়েছি। কিন্তু তাও কমেনি। মা, মা করছে। তুমি একটু আসতে পারবে?”
“কিইই? ওর রাতে জ্বর এসেছে আর তুমি আমায় এখন বলছো? আগে জানাওনি কেন?”
“আমি ভেবেছিলাম ওষুধ খাওয়ালে কমে যাবে। আর অত রাতে তোমাকে জানলে তুমি করতেই বা কি?”
“আরে আমি চলে যেতাম আমার মেয়ের কাছে। না হলে তুমি ওকে আমার কাছে নিয়ে আসতে পারতে।”
নিবিড় আবারো মিনমিনে গলায় বলল,
“রাতে তো তোমার কাছে যেতে চায়নি। সকালে যেতে চাইছে। তুমি কি একটু আসতে পারবে? আসলে আমি ওকে নিয়ে যেতাম। কিন্তু ওর তো শরীর খারাপ। এতটা পথ নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।”
“আমি এক্ষুনি আসছি।”
কথাটা বলে মোহিনী ফোনটা কেটে দিয়ে সিএনজি চালক কে ওদের বাড়ির ঠিকানা বলে সেদিকে যেতে বলল। এখন এতোটুকু পথই আর শেষ হতে চাইছে না। মনে হচ্ছে কখন বাড়ি পৌঁছাবে, কখন একটু মেয়েকে বুকের মাঝে জড়িয়ে নেবে।
__________
“কি হয়েছে মা? দেখি এসো তো আমার কাছে।”
কথাটা বলে মোহিনী নিশাতকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলো। কিছুক্ষণ মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কপালে চুমু খেল। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। মেয়েকে আদর করা শেষে নিবিড় কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ওর জ্বর মেপেছিলে?”
নিবিড় ওপর নিচ মাথা দাঁড়িয়ে বলল,
“হ্যাঁ। ১০১।”
“কি ওষুধ খাইয়েছিলে দেখি? ভুলভাল কিছু খাওয়াওনি তো?”
“আমাকে কি তোমার পাগল মনে হয়, না মূর্খ মনে হয়, না ওর সৎ বাবা মনে হয়? তুমিও না মোহিনী ভালো হলে না।”
“দরকারও নেই আমার ভালো হওয়ার। আমার প্রাণটা খুলে তোমার হাতে দিলেও তোমার কাছে ভালো হতে পারব না। কি ওষুধ খাইয়েছো সেটা দেখাও।”
নিবিড় মুখ ভেঙচিয়ে দেখালো। ঠিকঠাক ওষুধই খাইয়েছে। ওষুধটা দেখা শেষে নিবিড় কে আদেশের কন্ঠে বলল,
“একটা বাটিতে করে পানি আনো। আর একটা ছোট কাপড় আনো। জলপট্টি দিয়ে দিয়েছিলে?”
“সারারাত ওটাই করেছি।”
“যাক সুবুদ্ধি হয়েছিল তাহলে। আবার নিয়ে এসো যাও। জ্বর কমেনি।”
নিবিড় বাধ্য ছেলের মতন মোহিনী যা বলল তাই করলো। জলপট্টি দিতে দিতে মোহিনী আবার জিজ্ঞেস করে নিবিড় কে।
“রাতে কি খাইয়েছিলে?”
“আসার সময় বিরিয়ানি আর আইসক্রিম এনেছিলাম। ওটাই খাইয়েছি।”
“আবার আইসক্রিম খাইয়েছো? একদিনে কটা আইসক্রিম খাওয়াও? চারটে বোধহয় খেয়েছে তাই না?”
নিবিড় মুখে কোন উত্তর দিলো না। মাথাটা নিচু করে শুধু উপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে উত্তর জানালো। মোহিনী রাগান্বিত গলায় বলল,
“আসলেই তুমি একটা অদ্ভুত প্রাণী। তোমার কোন কমনসেন্স নেই? একটা ছোট বাচ্চাকে একদিনে ক’টা আইসক্রিম দেওয়া যায় তুমি জানোনা? ওর এমনি ঠাণ্ডার সমস্যা আছে। আমি ওকে মাসে একটা আইসক্রিম খাওয়াই না। আর তুমি সেখানে একদিনে চারটা আইসক্রিম খাইয়ে দিয়েছো!”
নিবিড় মিনমিনে গলায় বলল,
“আজ তো বাইরে অনেক গরম ছিল। ঘেঁমে যাচ্ছিলো বারবার। ও খেয়েছে, আমিও খেয়েছি। ভেবেছিলাম গরমের দিন খেলে কিছু হবে না। তবে দেখো না ওরও জ্বর এসেছে, আমারও জ্বর এসেছে। একবার আমার কপালে হাত দিয়ে দেখো। আমারও জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে।”
মোহিনী ধমক দিয়ে বলল,
“তুমি নিজের খেয়াল নিজে রাখার মতন যথেষ্ট বড় হয়েছো নিবিড়। এখন তোমার দিকে নজর দেওয়ার মতন সময় নেই আমার কাছে। আমার মেয়েটার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। শুধুমাত্র তোমার জন্য অসুস্থ হলো ও। সামলাতে যখন পারবে না কেন নিয়ে এসেছিলে? ভালো তো ছিল আমার কাছে।”
নিবিড় কোন উত্তর দিলাে না। মোহিনীর এই ব্যাপারটা নিবিড় কে ভীষণ কষ্ট দেয়। আগে এমন ছিল না। তবে আজকাল এমন হয়ে গেছে। মোহিনী বাচ্চাদের খেয়াল রাখতে গিয়ে নিবিড়ের দিকে একটুও খেয়াল দেয় না। এই যেমন নিবিড় অসুস্থ শুনেও একটুও মায়া হলো না। চিন্তিতও হলো না। অথচ একটা সময় ছিল যখন নিবিড় একটা হাঁচি ফেললেও মোহিনী অস্থির হয়ে যেত।
মোহিনী নিজে সবসময় অভিযোগ করে যে নিবিড়ের কাছে ওকে দেওয়ার মতন সময় নেই। কিন্তু কবে থেকে নিবিড় ওকে সময় দেয়না সেটা একবারও ভাবার চেষ্টা করে না। দিনের পর দিন যখন নিবিড় বাড়ি ফিরে মোহিনীর থেকে সময় চেয়েছি তখন মোহিনী ওকে সময় দেয়নি। এই কাজ, ওই কাজ, বাচ্চাদের দেখাশোনা সব সময় এসবের পিছনে লেগে থেকেছে।
মোহিনী যেন আজকাল বোঝার চেষ্টাই করে না যে নিবিড়েরও একটু ওর থেকে সময় প্রয়োজন। ওর মনোযোগ প্রয়োজন। পাত্তাই দেয় না যেন নিবিড় কে। সেই জন্যই তো নিবিড়েরও ধীরে ধীরে বাড়ি ফেরার ইচ্ছেটাই হারিয়ে গেছে। মনে হয় বাড়ি ফিরে কি হবে। সেই তো মোহিনী কে কাছে পাবেই না। তার থেকে বাইরে থাকাই ভালো। অন্তত মোহিনী কে সামনে দেখেও কাছে না পাওয়ার কষ্টটা হয় না।
নিবিড়ের এসব ভাবনার মাঝেই মোহিনী আবার বলে উঠলো,
“সকালে কি ওষুধ খাইয়েছো?”
“না। এখনো রান্না করা হয়নি কিছু। তুমি অপেক্ষা করো। আমি কিছু একটা বানিয়ে আনছি।”
কথাটা বলে নিবিড় রান্নাঘরের দিকে যেতে ধরলে মোহিনী ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“থাক যেতে হবে না। আমি যাচ্ছি। ওর জন্য ঝাল কম দিয়ে খাবার রান্না করতে হয়। এদিকে এসে মেয়ের পাশে বসো।”
নিশাতকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে মোহিনী উঠে গেল। নিবিড় এসে মেয়ের পাশে শুয়ে পড়লো। নিবিড়ের শরীরটাও খারাপ লাগছে। মোহিনী তো আর বুঝলো না ওর কষ্ট। শেষে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকলো।
___________
নিশাত কে জোর করে একটু খাবার খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে দিয়েছে মোহিনী। এখন মেয়ের পাশে শুয়ে আছে। একটু আগে ঘুমিয়েছে নিশাত। মোহিনী তখনও এঁটো হাতটা ধোঁয়নি। মেয়ে ছাড়তেই চাইছে না ওকে। তবে নিশাত ঘুমিয়ে পড়েছে। এই ফাঁকে মোহিনী ভাবল হাতটা ধুঁয়ে আসবে।
উঠে গিয়ে হাত ধুঁয়ে এলো। নিবিড় তখন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ঘুমিয়ে আছে। গায়ে কোন কাঁথা জড়ানো নেই। একেবারে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে আছে। কাঁপছে ঠান্ডায়। মোহিনী ভীষণ বিরক্ত হলো। ছেলেটা এত অবহেলা করে নিজের প্রতি বলে বোঝানোর মতন না। সামান্য কাঁথা গায়ে জড়িয়ে ঘুমোনোর মতন বয়স কি ছেলেটার হয়নি? এতোটুকু বোধ বুদ্ধি কি নেই? এতজনকে মোহিনী একা সামলাবে কি করে?
বাধ্য হয়ে মোহিনী কাঁথাটা বিছিয়ে নিবিড়ের গায়ে জড়িয়ে দিতে গিয়ে হঠাৎ করেই খেয়াল করলো নিবিড়ের গা প্রচন্ড গরম। তখনই মনে পড়লো নিবিড় বলেছিল যে ওরও নাকি জ্বর এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে মোহিনী নিবিড়ের কপালে হাত রাখলো।
এরও তো জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। নিবিড়ের গরম কপালে মোহিনীর ঠান্ডা হাতের স্পর্শ অনুভব করতেই নিবিড় একটু শিউরে উঠে চোখ মেলে তাকালো। চোখ দুটো লাল টকটক করছে। হালকা একটু চোখ মেলে মোহনীর দিকে তাকালো। হা করে শুধু তাকিয়ে রইল বোঝার জন্য যে মোহিনী কিছু বলছে কিনা ওকে।
মোহিনী নিবিড়ের পাশে বসে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“নিবিড়, তোমার তো জ্বর এসেছে। ওষুধ খাওনি?”
নিবিড় চুপচাপ শুধু দু দিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানালো।
সঙ্গে সঙ্গে মোহিনী রাগান্বিত গলায় বলল,
“এই সামান্য কাজটুকুও তুমি করতে পারো না? আমি একা মানুষ এত দিকে খেয়াল রাখব কি করে? আরে বাবা নিশাত না হয় ছোট। ওকে না হয় ওষুধ খাইয়ে দিতে হয়।তাই বলে তোমাকেও এখন খাইয়ে দিতে হবে? আমার ভালো লাগে না এসব।”
কথাটা বলে মোহিনী ওষুধ আনার জন্য উঠে যেতে ধরলে নিবিড় ওর হাত টেনে ধরে মোহিনী কে ওর পূর্বের জায়গায় বসিয়ে দিল। নিবিড় মোহিনীর কোলের উপরে নিজের মাথাটা রেখে কাত হয়ে দু হাতে মোহিনীর কোমড় জড়িয়ে ধরল।
পূর্বের তুলনায় মোহিনী কণ্ঠটা একটু নরম করে বলল,
“ছাড়ো। ওষুধ দিতে হবে তোমায়।”
“আমার ওষুধ লাগবে না মোহিনী। মনের শান্তি বড় শান্তি। এই ওষুধ না দিয়ে যদি তুমি একটু আমার সাথে ভালোভাবে কথা বলো তাহলেই আমি সুস্থ হয়ে যাব। ওষুধের থেকে যদি তুমি একটু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও তাহলে আমি বেশি আরাম পাব মোহিনী। তুমি আজকাল এই কথাগুলো আর কেন বোঝোনা? কেন বোঝোনা যে আমি তোমায় চাই? তুমি আজকাল কেন যেন আর আমায় বুঝতেই চাও না। আমায় গুরুত্ব দাও না। এতকিছু সামলে কি হবে যদি দিনশেষে আমাদের দুজনের মাঝে সম্পর্কই ঠিক না থাকে! দেখো সবকিছু সামলাতে গিয়ে আজ আমাদের সম্পর্কটা এলোমেলো হয়ে গেছে।”
মোহিনী চুপ করে গেল। কেন যেন বুঝে উঠতে পারছে না যে নিবিড় ওকে দোষারোপ করছে কিনা? মোহিনীর কাছে তো গুরুত্ব আছে নিবিড়ের। তাহলে নিবিড় এই কথাটা কেন বলল যে মোহিনী ওকে গুরুত্ব দেয় না। প্রশ্নটা মনের মাঝে দাবিয়ে রাখতে না পেরে করেই ফেলল,
“আমি তোমায় গুরুত্ব দেই না তোমার এমনটা মনে হয়?”
“হ্যাঁ। আমি তোমাকে একটু আগেও বলেছিলাম যে আমারও জ্বর এসেছে। তুমি পাত্তাই দিলে না। নিশাতের জ্বর এসেছে শুনে ওকে কত আদর করলে, বুকে আগলে নিলে। আর আমার জ্বর এসেছে শুনে তুমি একটু নরম গলাতে কথাও বলতে পারলে না আমার সাথে। কেমন খিটখিটে মেজাজের হয়ে গেছো তুমি। তোমার এই রুপ, খিটখিটে স্বভাব আমি নিতে পারি না।”
“তুমিও তো এমন ব্যবহার করো আমার সাথে।”
“আমি সহজে করিনা তোমার সাথে এমন ব্যবহার। আমি আগে করতামও না। কিন্তু ধীরে ধীরে তোমার ব্যবহারগুলো বাধ্য করেছে মোহিনী। তুমি জানো আমি কতটা ধৈর্যশীল ছিলাম। অন্তত তোমার ব্যাপারে। কিন্তু দিন শেষে যতই হোক আমিও তো মানুষ। ভেঙে গেছে ধৈর্যের বাঁধ।”
“তাহলে কি দোষটা আমার দিতে চাইছো?”
“তোমার একার দোষ দেবো না। আমারও দোষ আছে। কিন্তু তুমি নিজেকে নির্দোষ বলতে পারো না। দিনের পর দিন তোমার কাছে আমাকে দেওয়ার মতন সময় ছিল না মোহিনী। আমি বাড়িতে এসে ঘরে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকেছি তোমার অপেক্ষায় যে কখন তুমি আসবে, কখন তোমার সাথে একটু গল্প করবো। তুমি সব কাজ সামলে, সবকিছু করে আর আমাকে দেওয়ার মতন সময়ই পাওনা। তোমার শরীর ক্লান্ত লাগলেও তুমি সংসারের কাজ ঠিকই কর, বাচ্চাদের কেও সময় ঠিকই দাও। শুধু আমাকে সময় দাও না। আগে তো তুমি সব দিক সামলাতে পারতে। এখন কেন সামলাও না?”
দমে গেল মোহিনী। সত্যি কি মোহিনী সব দিক সামলাতে পারে না এখন আর? মোহিনীর এসব ভাবনার মাঝেই নিবিড় আবার বলে উঠলো,
“তোমার চাপ তো আমি কমানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু তুমি নিজে তোমার চাপ বাড়াও। কাজ করার জন্য লোক রাখলে তোমার তাদের কাজ পছন্দ হয় না। তুমি নিজেই সব কাজ করতে চাও। বাচ্চাদের দেখাশোনা করার জন্য সব সময় একটা লোক রাখতে চাই তুমি সেটাও পছন্দ করো না। বাইরের মানুষের কথা বাদ দিলাম তুমি তো আমাকেও কোন কাজে সাহায্য করতে দাও না। আমার কাজ নাকি তোমার পছন্দ হয় না। সারাদিন পর ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে আসার পর আমারও একটু আমার স্ত্রীর যত্ন পেতে ইচ্ছে করে, একটু ভালোবাসা পেতে ইচ্ছপ করে। তুমি আর এখন এসব কিচ্ছু বোঝো না।”
মোহিনী অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“সত্যি আমি এসব করেছি? কিন্তু আমি তো কখনো তোমার প্রতি অযত্ন করতে চাই না নিবিড়। তুমি জানো তুমি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে আমি কি তোমায় সেই গুরুত্বটা বোঝাতে পারলাম না?”
নিবিড় দুহাতে আরেকটু শক্ত করে মোহিনীর কোমরটা জড়িয়ে ধরে বলল,
“আগে বোঝাতে পারতে। এখন আর পারো না। আমি জানি আমারও দোষ আছে। আমি জানি তুমি সারাদিন কতটা কষ্ট করো, খাটাখাটনি করো। আমার উচিত ছিল তোমাকে বোঝা। কিন্তু আমি সেটা বুঝিনি এটা আমার দোষ। আমি একশ বার স্বীকার করছি আমার দোষ। কিন্তু তারপরও মোহিনী আমি তোমায় চাই। আমি চাই আগে যেমন আমরা দুজনে একসঙ্গে সময় কাটাতাম, এখনো তেমনভাবে কাটাই।”
মোহিনী কোন উত্তর দিল না। বেশ অনেকটা সময় নীরবতার মাঝে কাটলো। মোহিনী অনেকটা সময় পর একটা লম্বা শ্বাস টেনে শান্ত গলায় নিবিড়কে বলল,
“তাহলে এখন এর সমাধান কি করে করবো?”
নিবিড় মাথা তুলে মোহিনীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“এখানে চলে এসো। সাদিয়ার বাড়িতে থাকতে হবে না। তোমার নিজের বাড়ি আছে। তুমি কেন অন্যের বাড়িতে থাকতে যাবে? অনেক হয়েছে দূরে দূরে থাকা। যা সমাধান করার একসাথে থেকেই করবো। তোমাকে ছাড়া আর চলবে না। একটা দিনও চলবে না, একটা ঘন্টাও চলবে না, একটা মিনিটও চলবে না। আমার তোমাকে সবসময়ই চাই মোহিনী।”
মোহিনীর চোখ দুটো মৃদু ছলছল করে উঠলো। ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“সত্যি তুমি আমাকেই চাও তো? ফিরে এলে আবার ঝগড়া করবে না তো?”
নিবিড় তড়িৎ গতিতে শোয়া থেকে উঠে বসে মোহিনীর হাত দুটো শক্ত করে ধরে ওকে ভরসা দিয়ে বলল,
“আমি সত্যিই তোমাকেই চাই মোহিনী। শুধু তোমাকে চাই। ফিরে এসো। আর ঝগড়া করবো না কথা দিচ্ছি। তুমি যদি আমাকে খু'নও করো তাও কিছু বলবো না। শুধু ফিরে এসো। চলবেই না আমার তোমাকে ছাড়া। আমাদের গল্পটা ভালোবাসার হোক, ঝগড়ার হোক, হাসির হোক বা কান্নার হোক। তবুও তোমার নামেই হোক। তোমার নামেই গল্প হোক মোহিনী। শুধু তোমার নামে।”