তোমার নামেই গল্প হোক

পর্ব - ১৭

🟢

আজকাল আর অফিসে যাওয়ার আগে তাড়াহুড়ো করতে হয় না নিবিড় কে। কেননা অফিসে দুজনে একসঙ্গেই যায়। তাই মোহিনী একদম ঠিক ঠিক সময় জোর করে তুলে দেয়।

ঘুম থেকে উঠে এসে নাস্তার টেবিলে বসে বসেছে সবাই। নিবিড় এখনো ঘুমে ঝিমোচ্ছে আর খাবার খাচ্ছে। মাহি একা একাই খাচ্ছে। আর মোহিনী নিশাতকে খাইয়ে দিচ্ছে। নিশাতকে খাইয়ে দেওয়ার মাঝেই মোহিনী নিবিড় কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ছুটির কথা বলেছিলে অফিসে?”

নিবিড় ঘুমঘুম গলায় মোহিনীর দিকে তাকিয়ে বলল,

“কিসের ছুটি?”

“তোমাকে তো বলেছিলাম কালকের জন্য ছুটি নিয়ে রাখতে। বাচ্চাদের রেজাল্ট দেবে ।যেতে হবে ওদের স্কুলে।”

নিবিড় কন্ঠে একরাশ অনীহা প্রকাশ করে বলল,

“আমি যাব না মোহিনী। তুমি চলে যাও। গেলেই হলো একজন। আমার ছেলে মেয়ে যখন ভালো রেজাল্টই করবে। আমি গিয়ে কি করবো বলো? আমার ভালো লাগেনা একটানা অতক্ষণ বসে থাকতে।”

নিবিড় কথাটা বলার সাথে সাথে নিশাত খাওয়া থামিয়ে দিয়ে জেদি গলায় বলল,

“না বাবা তুমি যাবে। তোমাকে যেতেই হবে। সবার বাবা যায় শুধু তুমি যাও না। তুমি এত অলস কেন?”

নিবিড় ফের ঘুম জড়ানো গলায় বলল,

“তোমার বাবা তো, সেই জন্যই আমি অলস মা। তুমি আম্মুকে নিয়ে যাও। বাবা গিয়ে কি করবে ওখানে?”

“না। শুধু আম্মুকে নিয়ে যাবো না। তোমাকে যেতেই হবে। তুমি না গেলে আমিও যাব না। তোমাকে যেতেই হবে বাবা।”

নিবিড় বেশ ভালোই বুঝতে পারলো যে মেয়ের জেদের সাথে পেরে উঠবে না। সেই জন্য অসহায় মুখ করে মোহিনীর দিকে তাকিয়ে বলল,

“মোহিনী, বোঝাও না ওকে!”

মোহিনী নিশাতকে খাওয়ানো থামিয়ে চোখে মুখে রাগী ভাব ফুটিয়ে তুলে গম্ভীর গলায় বলল,

“এত তাড়াতাড়ি নিজের দেওয়া কথা ভুলে গেলে? আবার অবহেলা শুরু করছো? আবার নিজের দায়িত্ব থেকে পালানোর চেষ্টা করছে নিবিড়? মানে তুমি আসলেই শোধরাওনি তাই না? আর না কখনো শোধরাবে তাই তো? সেই আবার সবকিছু আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে। অফিসে সারাদিন বসে থাকতে বিরক্ত লাগে না। আর একদিন ছেলে মেয়ের আবদারে স্কুলে যেতেই বিরক্ত লাগবে? সব সময় এত দায়সারা ভাবে থাকতে চাও কেন?”

মুহূর্তের মাঝে নিবিড়ের দুচোখ থেকে ঘুম ছুটে গেল। পিঠ টান করে একটু নড়েচেড়ে উঠে সোজা হয়ে বসে বলল,

“না না মোহিনী। ভুল ভাবছো তুমি। আমি বদলে গেছি তো। আমি ভালো হয়ে গেছি। আমিতো মজা করছিলাম। আমি যাবো তো তোমাদের সাথে। তোমরা না গেলেও আমি একাই চলে যাব।”

মোহিনী গম্ভীর গলায় বলল,

“একা একা যাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। যেখানে যাবে পরিবার কে সঙ্গে নিয়ে যাবে। তুমি আর ব্যাচেলার না বুঝতে পেরেছো। এমনও না যে নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে, সংসারে শুধু বউ আছে। তাই দায়িত্ববোধ এখনো তৈরি হয়নি। বিয়ের দশ বছর হয়ে গেছে। সংসারে বউয়ের সাথে সাথে বাচ্চারাও আছে। নিজের স্বভাবগুলো বদলাও। এই বুড়ো বয়সে এসে নতুন করে তোমাকে আবার মানুষ করতে পারবোনা আমি।”

নিবিড় চুপচাপ শুধু মাথা নাড়ালো। একটুর জন্য তো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিল এই না জানি আবার মোহিনী বাচ্চাদেরকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। আর নিবিড় খুব ভালোভাবে জানে এইবার যদি মোহিনী বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় রেগে মেগে তাহলে ওকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

অবশ্য দোষটা এখন নিবিড়েরই। আবার আলসেমি করছিলো। একদিন ছুটির কথা মাথায় আসতেই ভেবেছিল একটু ঘুমোবে। এই ঘুমোই নিবিড়ের অর্ধেক জীবনটা শেষ করে দিল।

__________

দেখতে দেখতে নিবিড় মোহিনীর সংসারের আরও ছয়টা মাস কেটে গেল। সংসারটা একেবারে আগের মতন হয়ে গেছে। এখন ওরা কেউই কারো প্রতি করার মতন কোন অভিযোগ খুঁজে পায় না। দুজনের আর ঝগড়াও হয় না, মনোমালিন্য হয়ও না। কোন বিষয়ে মত পার্থক্যও হয় না।

দুজনে একসঙ্গে সকালে অফিসে যায়। আবার একসঙ্গেই অফিস থেকে বাড়ি ফেরে। বেশিরভাগ দিন গাড়িতে যাতায়াত করা হয়। যেদিন আবার ভিন্ন কোন কিছু করার ইচ্ছে হয় সেদিন রিক্সায় ফেরে। মাঝে মাঝে আবার দুজনে হাত ধরে গল্প করতে করতে হেঁটে আসে। যেন এখনও ওরা দুজনে প্রেমিক প্রেমিকা। এত কথা বলে তবুও কথা ফুরােতে চায় না।

রাস্তার মাঝে আবার কোথাও ফুচকার দোকান দেখলে থেমে গিয়ে এক প্লেট ফুচকা দুজনে মিলে ভাগাভাগি করে খায়। তারপরে আবারও গল্প করতে করতে বাড়ি ফেরে। রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে চারজন কিছুক্ষণ গল্প গুজব করে। নয়তো বাচ্চাদের সাথে খেলে। একটু পড়াশোনা দেখিয়ে দেয়। তারপরে বাচ্চারা নিজেদের ঘরে ঘুমোতে চলে যায়। আর নিবিড় মোহিনী নিজেদের ঘরে ঘুমোয়।

অফিসেও সবকিছু ঠিকঠাকই চলছে। দুজনেই সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে নিজেদের কাজ করছে। কাজের মাঝে একটু বিরতি পেলেই আবার দুজনে গল্পটাও সেরে নেয়। মোহিনী খুব বেশি আসে না। নিবিড়ই বেশিরভাগ ওর কেবিনে চলে যায়।

মোহিনী অফিসে খুব বেশি কথাই বলতে চায় না নিবিড়ের সাথে। কেননা কথা বললেই ছেলেটা সমানে ম্যাডাম ম্যাডাম বলে ডাকে। যেটা মোহিনীর ভালো লাগে না। কেননা অফিসে অনেক কানাঘুষো হয়। অনেকে অনেক কিছুই বলে। নিবিড়ের সমস্যা না থাকলেও অফিসের অনেকেরই এই বিষয় নিয়ে সমস্যা যে স্বামীর থেকে বউ উচ্চ পদে চাকরি করে। এই বিষয়ে অবশ্য অনেকে আবার কান পড়াও দিতে চেয়েছিলো নিবিড় কে। নিবিড় উল্টো খুব ভালো মতো বাঁশ দিয়ে ছেড়েছে সবাই কে।

তবে আজ মোহিনী খুব খুশি। নিজের যোগ্যতায় নিবিড় প্রোমোশন পেয়েছে। হ্যাঁ এখনো মোহিনীর পর্যায় পৌঁছাতে পারেনি ঠিকই। তবে হয়তো সেই পর্যায়ে পৌঁছাতেও খুব বেশি সময় লাগবেও না নিবিড়ের।

মোহিনী আজ অর্ধেক সময় অফিস করেই বাড়ি চলে গেল। নিবিড়ও যেতে চেয়েছিল সাথে। তবে নিবিড় যেন ছুটি না পায় সেই ব্যবস্থা করেই গেছে মোহিনী। নিবিড় এখন শুধু রাগে ফুঁসছে। রাতে বাড়ি ফিরে আজ এর একটা বিহিত করবে নিবিড়।

____________

রাত আটটা নাগাদ নিবিড়ের ফোনে মোহিনীর নাম্বার থেকে কল এলো। মোহিনীর নামটা দেখতেই নিজেকে একটু গম্ভীর করার চেষ্টা করলো নিবিড়। ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে রাশভারি গলায় বলল,

“কাজ করছি আমি।”

মোহিনী ঠোঁট টিপে হাসলো। জানে নিবিড় রেগে থাকার নাটক করছে। সেজন্য বিষয়টাকে খুব বেশি পাত্তা না দিয়ে বলল,

“কখন বাড়ি ফিরবে?”

“তোমার কি তাতে? আমি যেন বাড়ি ফিরতে না পারি সেজন্য হাজারটা ফাইল দিয়ে রেখে গেছো।”

“সে কি? এখনো তোমায় ছাড়েনি? আমি তো বলেছিলাম সাতটার সময় ছেড়ে দিতে।”

“যেতে বলেছিল। কিন্তু আমি যাইনি। কাজ শেষ করে তারপরে যাবো।”

“আরে যা কাজ আছে কাল করো। এখন চলে এসো। অপেক্ষা করছি তো বাড়িতে আমরা।”

“সারাদিন আমাকে অনেক বিরক্ত করেছো। আমিও তোমার অপেক্ষায় ছিলাম। এবার তুমি আমার অপেক্ষা করো। এখন ফিরবো না বাড়ি। দশটার আগে বাড়ি ফিরব না।”

নিবিড় কথাগুলো বলার মাঝেই মোহিনীর কানে কলিংবেলের আওয়াজ ভেসে এলো। বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“এখন আবার কে এলো মাথা খেতে!”

ফোনের অপর পাশ থেকে নিবিড় গম্ভীর গলায় বলল,

“আমি রাখছি। গিয়ে দেখো কে এসেছে?“

কথাটা বলে নিবিড় ফোনটা সত্যি কেটে দিল। মোহিনী ভাবল কে এসেছে সেটা দেখে এসে আগে অফিসে কল করে বলবে যেন নিবিড়কে জোর করে পাঠিয়ে দেয়। যদি বের হতে না চায় তাহলে যেন অফিস থেকে বের করে দেয়।

এসব ভাবতে ভাবতে মোহিনী গিয়ে দরজা খুলতেই দেখলো সামনে নিবিড় দাঁড়িয়ে আছে। বিস্ময়ে মোহিনীর মুখ হা হয়ে গেল। এইতো এখনই কথা বলল নিবিড়ের সাথে। এত তাড়াতাড়ি চলে এলো কি করে!

অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“তুমি এত তাড়াতাড়ি কি করে এলে? তুমি না অফিসে ছিলে!”

নিবিড় নিজের হাতে থাকা তাজা গোলাপ দিয়ে বানানো ফুলের তোড়াটা মোহিনীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“হ্যাপি অ্যানিভার্সারি মোহিনী। আমার মতন অভদ্র, বেয়াদব, রগচটা, বদমেজাজী ছেলেটার সাথে দীর্ঘ এগারোটা বছর স্ত্রী হিসেবে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য তোমার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। সেই সাথে দীর্ঘ তেরো বছর যাবত আমার বন্ধু হয়ে থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা। আমার মনমোহিনী হয়ে থেকে যাওয়ার জন্য আরো অধিক কৃতজ্ঞতা। এমনভাবে আরো হাজার বছর থেকে যেও।”

মুহূর্তের মাঝে মোহিনীর চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। মোহিনী ভেবেছিল নিবিড় ভুলে গেছে ওদের বিবাহ বার্ষিকীর কথাটা। কেননা কোন বিশেষ দিনই নিবিড় মনে রাখতে পারে না। এমনটা না যে শুধু ওদের বিবাহ বার্ষিকীর কথাটাই ভুলে যায়। যেকোনো দিন তারিখ মনে রাখতে পারে না ছেলেটা। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এর দিনগুলোও ভুলে যায়। না নিজের জন্মদিনের কথা খেয়াল থাকে, না মোহিনীর, না বাচ্চাদের জন্মদিনের কথা খেয়াল থাকে।

মোহিনী ফুলের তোড়াটা হাতে নিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়েই আগে নিবিড়কে জড়িয়ে ধরলো। অতিরিক্ত আনন্দে কেঁদেই ফেলল।

“তোমার মনে আছে! আমি তো ভেবেছিলাম ভুলে গেছো। কোন বছরই তো মনে থাকে না। এই বছর কি করে মনে আছে?”

বিজ্ঞাপন

“তার কারণ এই বছরটা একটু আলাদা। আমরা আলাদা হতে চেয়ে আবার এক হয়ে গিয়েছি। সম্পর্কটা আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। সবকিছুই আবার সেই প্রথম দিনের মতন মনে হয়। সেই জন্য এই বছরটা ভুলতে পারিনি। আর আমি ভুলে গেলে তো তুমি রাগ করো। কিন্তু তোমাকে তো আর রাগানো যাবে না। সেই জন্য এবার অনেক কষ্ট করে মনে রেখেছি।”

মোহিনী একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“আর রাগ করবো না। কখনো রাগবো না। এবার থেকে ভুলে গেলেও রাগ করবো না।”

“আরে আরে এ আমি কি দৃশ্য দেখছি! আরে তোমাদের কি লজ্জা নেই? দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এসব কি করছো? নিজেদের ঘরে যাও। ছি ছি। বাবা মা দেখে ফেলল তো।”

মিতালির কন্ঠটা কানে যেতেই মোহিনী আর নিবিড় দুজনে দুজনের থেকে ছিটলে দূরে সরে গেল। ওদের এমন আচরণ দেখে মিতালী শব্দ করে হেসে উঠলো। নাঈমও হাসলো, তবে ঠোঁট টিপে। শব্দ করলো না। শব্দ করে হাসলে তো নিবিড় আর মোহিনী লজ্জা পেয়ে যাবে। তবে একটু বিরক্ত করার ইচ্ছে হলো। মিতালীকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এসব কেমন বেয়াদবি মিতালী? দেখছো তো ভাই আর ভাবি প্রেম করছে। কোথায় তুমি একটু সাহায্য করবে ওদেরকে। তা না করে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছো। এসব মোটেই ঠিক না। ভাইয়া ভাবি, তোমার ঘরে যাও তো। দরজা বন্ধ করে দিয়ে প্রেম করো। কেউ বিরক্ত করবে না তোমাদের। বাচ্চাদেরকে আমরা দুজনে সামলে নেব।”

নাঈম কথাটা বলতেই নিবিড় বেশ গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,

“তাহলে তো ভালোই হয়। আমার কোন অসুবিধা নেই। আমি বউকে নিয়ে ঘরে থাকলে দরজা বন্ধ করেই থাকি। কারণ আমার নিজেরই নিজের উপরে কোন বিশ্বাস নেই। কিন্তু মোহিনীকে পাঠাতে পারবি কিনা এতে সন্দেহ আছে আমার।”

নিবিড় কথাগুলো বলতেই মোহিনী ওর দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল,

“কাকে কি বলছো? ও তোমার ছোট ভাই হয়। তোমার লজ্জা নেই?”

“ছোট ভাই হয়ে বড় ভাইকে প্রেম করার জন্য ঘরে পাঠাচ্ছে। তাতে ওর লজ্জা করল না। আর বউকে নিয়ে ঘরে ওঠার কথা বললেই লজ্জা পেতে হবে? সব অবিচার সবসময় আমার সাথেই কেন হয়?”

মোহিনী শুধু চোখ গরম করে তাকিয়ে রইল নিবিড়ের দিকে। রাগে ফুঁসছে। ভাবলো ঘরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে ওকে সোজা করবে। মোহিনীর এসব ভাবনার মাঝেই মিতালী ওর দিকে এগিয়ে এসে কাঁধে হালকা করে ধাক্কা দিয়ে বলল,

“এখন ভাইয়ার উপর রাগ দেখাচ্ছিস কেন? জড়িয়ে তো তুই ধরেছিলি। ভাইয়া কি একটু ফুল দিলো না দিলো তাতেই একেবারে কেঁদে ফেললি। আমি জানতাম তোকে লাল গোলাপ আট দু চারটে মিষ্টি মিষ্টি কথা বললেই তুই গলে যাবি। দেখেছো ভাইয়া, আমার বুদ্ধিটা কাজে লেগেছে।”

মিতালী কথাটা বলে হেসে উঠে যেই না নিবিড়ের দিকে তাকালো অমনি দেখলো নিবিড় চোখ গরম করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে মিতালী নিজের ভুলটা বুঝতে পেরে জিভে কামড় বসালো। জোরপূর্বক মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে একটা অজুহাত বানিয়ে বলল,

“আপু আমি একটু আসি হ্যাঁ? চুলোয় রান্না বসিয়ে ছিলাম। পুড়ে গেল বোধহয়।”

কথাটা বলে মিতালী চলে যেতে ধরলে মোহিনী ওর হাত টেনে ধরে কপাল কুঁচকে বলল,

“তুই ওকে এই বুদ্ধি শিখিয়েছিস? তারমানে আজকে আমাদের বিবাহ বার্ষিকীর তারিখটা তুই ওকে মনে করিয়ে দিয়েছিলি তাই না?’

মিতালী তাড়াহুড়ো করে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না না আপু। সত্যি বলছি আমি মনে করিয়ে দেইনি। আমি তো জানতামই না। তুই বলার পর আমার মনে পড়েছে।”

“তারপর তুই নিবিড় কে জানিয়েছিলিস তাইতো? তাইতো বলি ওর কি করে মনে থাকল তারিখ। আবার ফুলও নিয়ে এসেছে। এই কথাগুলোও নিশ্চয়ই তুই শিখিয়ে দিয়েছিস?

“আরে না না। এই কথাগুলো আমি শেখাইনি। আমি অন্যগুলো শিখিয়েছিলাম। ভাইয়া তো সেগুলো বলেইনি।”

কথাটা বলে মিতালী দ্বিতীয় দফা জিভে কামড় বসালো। সঙ্গে সঙ্গে পিছন থেকে নিবিড় হুংকার ছেড়ে বলল,

“তুই যাবি এখান থেকে। সংসারটা আমার ভাঙ্গার জন্য এসেছে। নাঈম, তোর বউকে নিয়ে যা তো। হয় ভেতরে নিয়ে যা নয়ত বাইরে বেরিয়ে যা। আমার বউয়ের মাথাটা খারাপ করে দিল।”

নিবিড় কথাটা বলতেই মিতালী পাল্টা ক্ষেপে উঠে বলল,

“দরকার শেষ আর বেরিয়ে যা তাইনা? এই আপু শোন, ভাইয়ার কিছুই মনে ছিল না। আমি তারিখ মনে করিয়ে দিয়েছি বুঝতে পেরেছিস। তোর স্বামীর এখনও এইসব দিকে খেয়াল নেই। এখনও ভাইয়া বজ্জাতই আছে।”

মিতালী ভেবেছিল মোহিনীর থেকে সমর্থন পাবে। কিন্তু মিতালী শেষের লাইনটা বলতে না বলতেই মোহিনী ধমকে উঠে বলল,

“একদম নিবিড় কে নিয়ে খারাপ কথা বলবি না। মনে করিয়ে দিয়েছিস ভালো কথা। কিন্তু ও কি বলেছিল মনে করিয়ে দিতে? বাড়ি ফিরতে ফিরতে ঠিক মনে পড়ে যেত। তোকে মাতব্বরি করতে বলেনি তো কেউ। নিজ থেকে মাতব্বরি করে এখন আবার দোষ দিচ্ছিস কেন? আমার স্বামী ভালো। সব দিকে খেয়াল আছে বুঝতে পেরেছিস? এখন সামনে থেকে সর। ভিতরে যাবো। নিবিড়, ভিতরে এসো।”

কথাটা বলে মোহিনী মিতালীকে পাশ কাটিয়ে ভিতরে চলে গেল। ওর পিছনে পিছনে নিবিড়ও গেল। ভিতরে আসার আগে অবশ্য মিতালীর দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসলো। মিতালীকে বোঝালো যতই চেষ্টা করুক না কেন ওদের দুজনের মাঝে ঝামেলা তৈরি করতে পারবেনা।

_____________

“আপু! এই আপু খেতে আয়। সবার ক্ষুধা লেগে গেছে তো।”

মোহিনী কে ডাকতে ডাকতে মিতালী ঘরে ঢুকল। তবে ঘরে কোথাও পেল না। বাহিরেও তো নেই। তাহলে গেল কোথায়। এরই মাঝে ওয়াশরুম থেকে শব্দ ভেসে এলো ওর কানে। বমি করছে মোহিনী। দরজার দিকে তাকাতেই দেখল দরজা খোলা আছে। মিতালী তাড়াহুড়ো করে ভিতরে গিয়ে দেখল মোহিনী বমি করছে। দুহাতে গিয়ে আগলে ধরে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“তোর আবার কি হলো? শরীর খারাপ নাকি?”

মোহিনী কোন উত্তর দিলো না। চোখ মুখে পানি দিয়ে মিতালী ধরে ধরে ওকে নিয়ে বাইরে এসে বিছানায় বসিয়ে দিল। গামছা নিয়ে এসে মোহিনীর মুখটা মুছিয়ে দিতে দিতে মিতালী ফের উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“কি হলো তোর হঠাৎ করে বলতো? শরীর বেশি খারাপ লাগছে?”

“শরীরটা খুব দুর্বল লাগছে রে। মাথাটাও ঘুরছে। বমি করেছি তো, আরো বেশি দুর্বল লাগছে।”

মোহিনীর কথাগুলো শুনতেই সঙ্গে সঙ্গে মিতালী ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,

“কি বললি মাথা ঘোরাচ্ছে, বমি বমি লাগছে, শরীরও দুর্বল?”

“হ্যাঁ।”

মিতালী বেশ কিছু সময় তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মোহিনীর দিকে। হঠাৎ করে মাথায় একটা কথা এলো। সন্দেহী গলায় জিজ্ঞেস করল,

“আপু, আমি যা সন্দেহ করছি সেটাই কি ঠিক?”

মোহিনী মাথা তুলে মিতালীর মুখের দিকে তাকাতেই ওর অভিব্যক্তি দেখে যেন বোঝা গেল যে মিতালী কি সন্দেহ করছে। মিথ্যে বলার ইচ্ছে নেই মোহিনীর। আবার এখন সত্যিটাও বলতে চায় না। কেননা আগে নিবিড়কে খবরটা জানাবে। সেই জন্য কোন উত্তর দিলো না। চুপ করে থাকলো।

মোহিনীকে চুপ করে থাকতে দেখে মিতালী নিজের সব উত্তর পেয়ে গেল। মুহূর্তের মাঝে ঠোঁটে হাসির ফুটে উঠলো। উচ্ছ্বসিত গলায় লাফিয়ে উঠে বলল,

“আরে আপু কংগ্রাচুলেশন, কংগ্রাচুলেশন। আমি আবার খালামনি হবো। না না, এবার আমি কাকি হবো। আরে এত বড় একটা খবর তুই দেসনি কেন আমায়? দাঁড়া দাঁড়া। আমি সবাইকে জানিয়ে আসছি আগে। ভাইয়া, ও ভাইয়া! তাড়াতাড়ি শুনে যাও তুমি কি করেছো। ভাইয়া!”

মোহিনীর থেকে আর কোন কিছু না শুনে মিতালী একা একাই কথাগুলো বলে ভাইয়া ভাইয়া করে ডাকতে ডাকতে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

কয়েক সেকেন্ড যেতে না যেতেই দৌড়ে ঘরে নিবিড় এলো। মোহিনী তখন বিছানায় বসে ছিল। নিবিড় দৌড়ে ঘরে এসে মেঝের উপর মোহিনীর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে অস্থির গলায় বলল,

“মোহিনী, আমি কি ঠিক শুনলাম? মিতালী যেটা বলল সেটা কি ঠিক?”

হালকা একটু লজ্জা পেল মোহিনী। নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলো না। মাথাটা নামিয়ে নিয়ে ছোট্ট করে উত্তরে বলল,

“হুম।”

মোহিনীর উত্তরটা পেতেই নিবিড় চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকালো। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর অবিশ্বাস্য গলায় বলে উঠলো,

“সত্যি বলছো মোহিনী? মানে আমি আবার মা হবো। না মানে তুমি আবার বাবা হবে। আরে ধুর মানে আমরা আবার মা-বাবা হবো?”

নিবিড়ের পাগলামি দেখে মোহিনী একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“তৃতীয় বারের মতন এই সুখবর পাওয়ার পরও এখনো এত পাগলামি! এখনো এত অস্থিরতা!”

নিবিড় দু হাতের আজলায় মোহিনীর মুখটা নিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“আরে এতটা ভালো লাগছে যে মনে হচ্ছে প্রথমবার এই খবরটা পেলাম। এই মোহিনী, আরেকবার বলো না সত্যি আবারো আমাদের একটা অংশ আসছে? মানে আমাদের বাড়ি মাতিয়ে রাখার জন্য আরও একজন আসছে? সত্যি তো?”

মোহিনী দুহাতে নিবিড়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল

“হ্যাঁ, একদম সত্যি। আবারো আমার যত্ন করার জন্য তৈরি হয়ে নাও। আমার রাগ, জেদ, অদ্ভুত আচরণগুলো সহ্য করার জন্য নিজেকে তৈরি করে নাও। আবারো রাত জাগার, কান্না সহ্য করার অভ্যাস করে নাও। আর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ, আবারো ডায়াপার বদলানোর অভ্যাসটা ফিরিয়ে আনো।”

বিজ্ঞাপন
তোমার নামেই গল্প হোক গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাংসারিক ও রোমান্টিক গল্প