মোহিনীর কেবিনে মুখোমুখি চেয়ারে বসে আছে নিবিড় আর মোহিনী। নিবিড়ের শরীরটা একেবারে নিস্তেজ দেখাচ্ছে। মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছে। আর মোহিনী রাগান্বিত দৃষ্টিতে নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করে ছেলেটা এসে হাজির হয়েছে। প্রায় দশ মিনিট হলো বসে আছে অথচ এখনো কিচ্ছু বলেনি। অবশেষে মোহিনী নিজেই মৃদু রাগী গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কেন এসেছ তুমি এখানে? আমি তোমায় বলেছিলাম না আমাদের একটু দূরে দূরে থাকা দরকার। বাংলা কথা বোঝো না তুমি?”
নিবিড় মাথা তুলে মোহিনীর দিকে তাকিয়ে নির্জীব গলায় বলল,
“ক্ষুধা লেগেছে। সকাল থেকে কিছু খাইনি।”
নিবিড়ের কথাটা শুনে একটু নড়েচড়ে উঠলো মোহিনী। মোহিনীতো জানতো এই ছেলেটা সকালে বাড়িতে রান্না করে খেয়ে তারপর অফিসে কোনদিনও যেতে পারবে না। ঘুম থেকে উঠতেই তো দেরি করে। রান্না করার সময় আর পাবে কি করে। সেই চিন্তায় তো নিজেও সকালে না খেয়ে বেরিয়েছে। তবে মোহিনীর যে খারাপ লাগলো নিবিড়ের জন্য সেটা বুঝতে দিতে চাইলো না। কন্ঠে গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে বলল,
“আমি কি করবো? আমি কি খেতে নিষেধ করেছিলাম?”
“তোমায় ছাড়া আমার চলবে না মোহিনী।”
“এতদিন তো দিব্যি চলতো। তখন তো আমি থেকেও ছিলাম না। ভবিষ্যতেও চলার কথা ছিল আমায় ছাড়া। তাহলে হঠাৎ করে আবার কেন মনে হলো আমায় ছাড়া চলবে না?ঠ্যালায় পড়েছো বলে? তুমি কতটা স্বার্থপর ভাবতে পারছো? তুমি যখন দেখছো আমায় ছাড়া তোমার কোন কিছু চলছে না, তুমি টিকতে পারবে না, তখন তোমার আমার কথা মনে পড়লো।”
নিবিড় মোহিনীর প্রশ্নের কোন উত্তর দিলো না। বরং পাল্টা নিজে একটা প্রশ্ন করলো মোহিনীকে।
“তুমি খেয়েছো সকালে?”
থতমত খেলে মোহিনী। আমতা আমতা করে বলল,
“হ্যাঁ খেয়েছি। খাব না কেন? পেট ভরে খেয়ে এসেছি। দুই প্লেট ভাত খেয়েছি। আরো নিতাম কিন্তু ভাত শেষ হয়ে গিয়েছিলো।”
নিবিড় দাঁত বের করে হেসে বলল,
“মিথ্যে বলছো। তুমি এত খাওনা। আর তুমি জানতে আমিও কিছু খেতে পারব না সকালে। এটা জানার পরে তোমার গলা দিয়ে খাবার নামবেই না। চলো একসাথে কিছু খেয়ে আসি।”
“গেট আউট।”
নিবিড় চোখ বড় বড় করে মোহিনীর দিকে তাকিয়ে অবুঝের মতন বলল,
“হ্যাঁ?”
“গেট আউট ফ্রম মাই কেবিন। আর কোনদিন যদি তোমায় আমার কেবিনে কেন আমার অফিসের আশে পাশেও দেখেছি অবস্থা কিন্তু খারাপ করে ছাড়বো। আর ভুলেও আমার কেবিনে আসার সাহস দেখাবেনা। সিকিউরিটি গার্ড ডেকে টেনে বের করে দেব। আমি তোমায় বলেছিলাম আমাদের দূরে দূরে থাকা প্রয়োজন। রোজ রোজ এভাবে দেখা করলে চলবে না। এখন বেরিয়ে যাও। আমার কাজ আছে। আর তাছাড়া এই সময় তুমি অফিস ছেড়ে কি করছো এখানে? তোমার কাজ নেই?”
নিবিড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“চাকরিটা থাকে কিনা কে জানে।”
মোহিনী ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“মানে?”
“ওই তুহিনের বাচ্চা ছুটি দিতে চাইছিলো না। বলেছিলাম তোমার সাথে দেখা করতে যাব তাও ছুটি দিতে চাইছিল না। সেইজন্য ওকে গালাগালি করে ওর থেকে ছুটি না নিয়েই বেরিয়ে এসেছি।”
নিবিড়ের কথাগুলো শুনে মোহিনী এক হাতে কপাল চাপড়ে বলল,
“একটা কাজ তুমি ঠিক করে করতে পারো না? তোমার বয়স বাড়ছে আর আক্কেল কমে যাচ্ছে কেন নিবিড়? বর্তমান সময়ে একটা চাকরি পাওয়া কতটা কঠিন সেটা তুমি জানো না? আমাদের দুজনের চাকরি পেতে কতটা স্ট্রাগল করতে হয়েছে ভুলে গেছো তুমি?”
“অত কিছু তো মাথায় আসেনি। ও ছুটি দিলাে না কেন? ছুটি দিলে তা আমি এমন করতাম না। আমার তোমাদের সাথে দেখা করার ইচ্ছে করছিল। বাচ্চাদের দেখতে ইচ্ছে করছিল, তোমায় দেখতে ইচ্ছে করছিল।”
মোহিনী এবারে তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“আসলেই দূরে গেলে কদর বাড়ে তাই না? দিনের পর দিন তোমার বাড়িতে, তোমার ঘরে তোমার বউ বাচ্চা ছিল। তোমার কাছে সুযোগ ছিল যখন ইচ্ছে তখন তাদের সাথে দেখা করার, তাদেরই পাশে বসে একটু গল্প করার। কিন্তু তুমি তা করোনি। আর আজ এক দিনের মাঝে বউ বাচ্চার প্রতি এতই দরদ বেড়ে গেল যে নিজের চাকরি হুমকির মুখে ফেলে রেখে তাদের সাথে দেখা করতে এলে! ওয়াও! কত ভালো স্বামী তুমি! কত ভালো বাবা তুমি! তোমার কোন তুলনা হয়না নিবিড়। তোমার তুলনা তুমি নিজেই।”
অনেকক্ষণ থেকে মোহিনীর কড়া কথাগুলো চুপচাপ হজম করে যাচ্ছিলো। আবারও ধৈর্য শক্তি বেড়ে গেছে নিবিড়ের। মোহিনী যাই বলুক না কেন খারাপ লাগছে না। কষ্টও পাচ্ছে না। ঝগড়া করার ইচ্ছে তাে একদমই নেই। আগের মতন শুধু মনে হচ্ছে মোহিনীই বলে যাক। মোহিনী নিজের রাগ ঠান্ডা করুক।
কিন্তু খালি পেটে আর এত কড়া কথা হজম করা যাচ্ছে না। পেটটা ভরা থাকলে মাথাটাও তো ঠান্ডা থাকতো। সেজন্য এবারে কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর গলায় বলে উঠলো,
“আর খোঁচা দিও না তো। পারলে খাবার দাও। তুমি খাবার আনোনি।”
“এনেছি।”
“ওটাই দাও খাই।”
মোহিনী আপত্তি জানিয়ে বলল,
“না। তোমায় কেন দেব? তোমায় দিলে আমি কি খাব? বাড়ি গিয়ে রান্না করে খাও।”
নিবিড় অসহায় মুখ করে মোহিনীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“হবে না মোহিনী। আমার রান্না আমি খেতে পারি না। অর্ধেক খাব আর অর্ধেক তোমার জন্য রেখে দেব। খুব ক্ষুদা লেগেছে। দাও না।”
মোহিনী মনে মনে নিজেকে কঠিন করার চেষ্টা করলো। ভাবলো যতই নিবিড় বলুক না কেন দেবে না। একটু তো শিক্ষা দেওয়া উচিত এই ছেলেটাকে। বাড়িতে গিয়ে একটু হাত পুড়িয়ে রান্না করে খাক। কিন্তু পারলো না মোহিনী নিজেকে কঠিন রাখতে। এবারে মোহিনীর নিজেরই নিজের উপরে রাগ হলো। ব্যাগ থেকে টিফিন বক্সটা বের করে নিবিড়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ধরো।”
নিবিড় বাড়তি একটা কথাও বলল না। অভদ্র ছেলেটা হাতটা অবধি ধুঁলো না৷ মোহিনীর রান্না ভীষণ সুন্দর। নিবিড়েরও খুবই পছন্দ। যবে থেকে মোহিনীর হাতের রান্না খেয়ে অভ্যাস হয়ে গেছে আর কারো রান্না ভালোই লাগে না। খুব তৃপ্তি করে খাবার খেলো। আর খাওয়ার পুরোটা সময় মোহিনী তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
মোহিনী খেয়াল করলো নিবিড় অর্ধেকই খেয়েছে। আর অর্ধেক রেখে দিয়েছে। কিন্তু মোহিনীতো জানে এতটুকু খাবারে নিবিড়ের পেট ভরেনি। হালকা একটু কেশে গম্ভীর গলায় বলার চেষ্টা করলো,
“পুরোটা খেয়ে নাও। আমি খাব না।”
মোহিনী বলল ঠিকই তবে নিবিড় খেল না। অর্ধেকটা খাবার খাওয়া শেষ করে টিফিন বক্সটা বন্ধ করতে করতে মোহিনী কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“না, এইটুকু তুমি খেও। শুনেছি স্বামীর এঁটো খেলে নাকি দুজনের মাঝে ভালোবাসা বাড়ে। দেখো যদি এঁটো খেয়ে ভালোবাসা আবার তৈরি হয়। তাছাড়া তো আর কোন উপায় দেখছি না আপাতত।”
“যাকে নিজের পুরো জীবনটা দিয়ে দিয়েছিলাম। সুখ দুঃখ সব কিছু বিসর্জন দিয়েছিলাম যার জন্য। তাতেই যখন ভালোবাসা বাড়লো না। এই এঁটো খেয়ে আর কি বাড়বে!”
মোহিনীর কথাটা শুনে নিবিড় থমকে গেল। কিছুক্ষণ নিজেই কি সব যেন ভাবলো। তবে আপাতত এই নিয়ে কোন কথা বলল না। মোহিনীর সাথে দেখা করা শেষ, খাবার খাওয়াও শেষ। এবার যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালো।
“ছেলে মেয়ে স্কুলে গেছে?”
“হ্যাঁ।”
“দেখা করতে চাই একবার ওদের সাথে।”
“এক সপ্তাহ পর।”
নিবিড় তুমুল আপত্তি জানিয়ে বলল,
“অসম্ভব। এটা কেমন নিয়ম? আমার ছেলে মেয়ের সাথে আমি যখন ইচ্ছে তখন দেখা করতে পারি। তুমি পারোনা আমাকে আটকাতে।”
মোহিনী চোখ গরম করে নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“পারি আমি আটকাতে। হঠাৎ করে তো বাপের ভালোবাসা উধাও হয়ে গিয়েছিল। তখন তো মা কেই বাপের ভালোবাসা দিতে হয়েছে। এখন আমি যা চাইবো তাই হবে। যখন বলেছি এক সপ্তাহ পর দেখা করতে পারবে তখন তাই হবে। আমি স্কুলে প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলে এসেছি যেন আমি বাদে আর কারো কাছে ওনারা বাচ্চাদের না ছেড়ে। এমনকি তোমার কাছেও না। এখন আমার চোখের সামনে থেকে চলে যাও।”
সত্যি রাগ হলো মোহিনীর উপর এবারে নিবিড়ের। যাওয়ার আগে আগে মোহিনী কে শাসিয়ে বলল,
“এখন খুব চলে যাও চলে যাও বলছো তো। তোমার ব্যবস্থা আমি করছি। এমন কিছু করব…...। দেখে নিও কি করি। যা করব বলবো না। একেবারে করে দেখাবো।”
মোহিনী কে হুমকিটা দিয়ে নিবিড় বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে। মোহিনী কপাল কুঁচকে নিবিড়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। কি বলতে চাইলো ছেলেটা? কি হুমকি দিয়ে গেল কিছুই তো বুঝলো না। কি করবে নিবিড়?
__________
“এবার আমি তোকে সাপোর্ট করছি আপু। তুই একদম ঠিক করেছিস। নাঈম তো আমাকে আগে বলেনি এই কথাগুলো। নয়তো সরাসরি তোদের বাড়িতে গিয়ে ভাইয়ার মাথা ফা'টি'য়ে রেখে আসতাম। ভাইয়ার সাহস হয় কি করে আমার বোন রেখে অন্য কোন মেয়ের দিকে তাকানোর। চোখ উপরে ফেলতাম আমি। তুই আমাকে আগে বলিসনি কেন?”
একটু আগে মোহিনীর বাড়িতে নাঈম আর মিতালি এসেছে। মোহিনী আপাতত ওদের জন্য চা বানাচ্ছিল। এরই মাঝে মিতালির মুখ থেকে এমন হুমকি শুনে চোখ গরম করে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোকে আমি কিছু বলতে বলেছি? আমি তোকে বলেছি নিবিড় কে মা’রতে? বড় ভাইয়ের গায়ে হাত তুলবি? কোত্থেকে শিখেছিস এসব?”
“আরে তো আমার বোনকে ঠকাবে আর আমি মা'রব না? তখন কি আর বড় ভাই-টাই মানবো নাকি।”
মোহিনী হাত উঠিয়ে মিতালিকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“থাক। যখন ভরসা দেওয়ার দরকার তখন তো দিতে পারিস না। যখন নিবিড়ের দোষ থাকে তখন তো ওর দোষ দেখতে পারিস না। আর এখন যখন ও এতটাও দোষী না তখন সরাসরি ওকে মা’রতে চলে যাচ্ছিস!”
“আরে বাবা তখন তো চরিত্রে দোষ ছিল না ভাইয়ার।”
“এখনো নেই। একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গিয়েছিল। হ্যাঁ নিবিড়ের তরফ থেকে হয়ত মেয়েটাকে একটু বেশি ছাড় দেওয়া হয়েছিল। সেটা বন্ধু ভেবে। কিন্তু আমার নিবিড়ের চরিত্রে সমস্যা নেই সেটা আমি খুব ভালো করে বুঝে গেছি। ওর চরিত্র নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলবি না। আমার পছন্দ না কেউ ওকে নিয়ে খারাপ কিছু বলুক।”
একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলল মিতালি। আসলে ওদের দুজনের ব্যাপারে কথা বলতে আসাটাই সব থেকে বড় ভুল। দুজন দুজনকে যা ইচ্ছে তাই বলবে কিন্তু একজনের বাড়ির লোক যদি অন্যজনকে কিছু বলে তাহলে কারোরই সহ্য হয় না। তখনই একেবারে গায়ে ফোঁসকা পড়ে যায়।
____________
মাঝে প্রায় তিন দিন কেটে গেছে। এই তিনদিন নিবিড় মোহিনীর না কথা হয়েছে, না দেখা হয়েছে। নিবিড় অবশ্য কয়েকবার কল করেছিল মোহিনীর নাম্বারে। তবে মোহিনী কলটা রিসিভ করেনি। পরে কল ব্যাকও করেনি। ফলে নিবিড় বুঝতে পেরেছিলো যে মোহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে এমনটা করছে। মোহিনী ওর সাথে যোগাযোগ করতে চায় না। মোহিনী তো চায় দূরত্ব তৈরি করতে।
সেজন্য নিবিড়ও আর জোর করে দেখা করার চেষ্টা করেনি। ভেবেছে মোহিনী যা চাইছে সেটাই হোক। দেখা যাক না আবারও পুরনো সেই ভালোবাসাটা ফিরে আসে কিনা।
নিবিড় তখন নিজের শার্ট ইস্ত্রি করছে। জামা কাপড় গুলো একটাও পরার অবস্থায় নেই। ওয়াশিং মেশিন থাকার কারণে কাপড় ধুঁতে অসুবিধা হয়নি। কিন্তু একটা কাপড়ও ইস্ত্রি করা নেই। মোহিনী থাকলে অবশ্য মোহিনী নিজেই করে এসব। মোহিনী নিজেই জামা কাপড় সব দোকানে দিয়ে আসতো। এসব দিকে কখনো খেয়াল রাখার প্রয়োজন পড়েনি নিবিড়ের। কিন্তু এখন তো আর মোহিনী নেই।
নিবিড়ের কাজের মাঝেই হঠাৎ করে ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনটা হাতে নিতেই দেখলো মোহিনীর নাম্বার থেকে কল এসেছে। নিবিড় প্রচন্ড অবাক হলো। নিবিড় নিশ্চিত ছিল মোহিনী কক্ষনো এই পরিস্থিতিতে ওকে আগে নিজ থেকে কল করবে না। তাহলে হঠাৎ কেন কল করলো? কোম বিপদ হলো কি? কোন সমস্যা হলো না তো?
তাড়াহুড়ো করে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“মোহিনী ঠিক আছে সব?”
অপর পাশ থেকে ভেসে এলে নিবিড়ের মেয়ের কন্ঠস্বর।
“বাবা, আম্মু না তো। আমি তোমার প্রিন্সেস।”
নিশাতের কণ্ঠস্বরটা পেতেই আপনা আপনি হাসি ফুটে উঠলো নিবিড়ের ঠোঁটে। কি এক অদ্ভুত শান্তি পেল মেয়ের কণ্ঠস্বর শুনে। এই তিন দিনে তো ছেলে মেয়ের সাথেও কথা হয়নি। মোহিনীতো ফোনই রিসিভ করেনি। যোগাযোগ করবেই বা কি করে। মেয়েটা যে এখন কোথায় থাকছে সেই খবরও তো নিবিড় এখনো জানতে পারেনি।
“আমার প্রিন্সেস কল করেছে! কেমন আছে আমার প্রিন্সেস?”
“আমি ভালো আছি বাবা। তুমি কেমন আছো?”
“আমিও ভালো আছি মা। তোমার ভাইয়া কোথায়? ভাইয়া কেমন আছে?”
“সবাই ভালো আছে। ভাইয়া ভালো আছে, আম্মুও ভালো আছে, সাদিয়া আন্টিও ভালো আছে। তুমি এখন কি করছো বাবা? তুমি কবে নিতে আসবে আমাদের? তোমার কাজ এখনো শেষ হয়নি? আমার এখানে থাকতে আর ভালো লাগছে না। এখানে আমার একটা খেলনাও নেই। আমাদের বাড়ির মতন এখানে বড় কোন টিভিও নেই। আমি কার্টুনও দেখতে পারছি না। এখানে তো তুমিও নেই। তুমি কবে নিতে আসবে বাবা?”
নিবিড় জানে না কেন তবে ওর চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। তবে নিবিড় যে কাঁধছে সেটা মেয়েকে বুঝতে দিতে চাইলো না। কন্ঠটা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
“তুমি কোথায় আছো আমায় বলো মা। তোমায় আমি আজকেই গিয়ে নিয়ে আসবো।”
নিবিড়ের কথাটা শুনে নিশাত খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলল,
“সত্যি আসবে বাবা? আমরা তো সাদিয়া আন্টির বাড়িতে আছি। এখানে এসো।”
“তোমার সাদিয়া আন্টির বাড়ি কই মা? আমি তো চিনি না।”
“আরে চিনবে না কেন। কাউকে জিজ্ঞেস করলেই সাদিয়া আন্টির বাড়ি দেখিয়ে দেবে। অনেক বড় একটা বাড়ি। বারান্দায় দাঁড়ালে আমি রাস্তা দেখতে পাই।”
“মা, এটা তো ঠিকানা না। আমাকে একটু ঠিকানাটা যে বলতে হতো। তুমি এক কাজ করো তোমার আম্মুকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো। তারপরে আমায় এসে বলো।”
মোহিনীর কথাটা উঠতেই নিশাত ফিসফিস করে বলল,
“না। আম্মুকে জিজ্ঞেস করলে আম্মু বকা দেবে। আম্মু তো জানে না আমি তোমাকে কল করেছি। তোমরা বোধহয় আবার ঝগড়া করেছো তাই না? সেজন্য আম্মু আর তোমার সাথে কথা বলবে না। তুমি ভাইয়ার থেকে শোনো।”
নিশাতের পাশেই মাহি বসেছিল। নিশাত ফোনটা মাহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ভাইয়া, বাবা কথা বলবে।”
মাহি ফোনটা কানে ধরে সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল যে আগে ওর বাবা কেমন আছে। নিবিড়ও পাল্টা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো যে ও কেমন আছে। তারপরে ঠিকানা জানতে চাইলো। মাহি বোধহয় ঠিকানাটা জানে কিন্তু কেন যেন বলতে পারল না। ওকে চুপ করে যেতে দেখে নিবিড় প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি হলো বাবা বলো? তুমি জানো না ঠিকানা?”
“জানি বাবা। কিন্তু আম্মু বকা দেবে যদি তোমায় বলে দেই। আম্মু তো জানে না তোমায় কল করেছি। নিশাত জোর করছিল বলে আম্মুর ফোনটা নিয়ে এসে তোমায় কল করেছি। আম্মু জানে না। ঠিকানা বলে দিলে বকা দিতে পারে।”
নিবিড় বুঝলো ছেলের অপারগতা। তাই আপাতত ছেলেকে জোরাজুরি করলো না আর। তবে ছেলে মেয়ে দুজনকে আশ্বস্ত করলো যে খুব তাড়াতাড়ি নিবিড় ওদের নিতে যাবে।
____________
অফিস থেকে বেরিয়ে একটা সিএনজিতে উঠেছে মোহিনী। সামনের আয়নায় অনেকক্ষণ থেকে খেয়াল করছে ওর সিএনজির পিছু পিছু একটা বাইক আসছে। প্রথম দিকে মোহিনী ব্যাপারটাকে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিল। তবে প্রায় আধাঘন্টা হয়ে গেছে কিন্তু এখনো সেই বাইকটা ওর পিছু ছাড়েনি। মোহিনীর সিএনজি যে গলিতে যাচ্ছে বাইকটাও সেদিকেই আসছে।
মোহিনী এবারে কিছুটা ঘাবড়ালো। সিএনজি চালক কে বলল গাড়িটা অন্য দিক দিয়ে নিয়ে যেতে। তবে অবাক করার বিষয় হলো এখনো বাইকটা মোহিনীর পিছু ছাড়েনি। মোহিনী হালকা একটু ভয় পেল। কিন্তু তারপরেও মনে সাহস রাখল।
ততক্ষণে বাড়ির সামনে এসে গেছে। সাদিয়া আজ অফিসে যায়নি। তাই ওকে কল করে নিচে নামতে বলল। দুজন থাকলে অন্তত একটু সাহস পাওয়া যাবে।
সিএনজি থেকে নেমে ভাড়াটা মিটিয়ে দিয়ে পিছনে তাকাতেই দেখল বাইকটাও থেমেছে। ততক্ষণে সাদিয়া নেমে এসেছে। মোহিনীর দিকে এগিয়ে এসে বলল,
“কি হয়েছে? বাড়ির রাস্তা ভুলে গিয়ে ছিলিস নাকি?”
মোহিনী বাইকটা দেখিয়ে বলল,
“না। দেখ অফিস থেকে বের হওয়ার পর থেকে ওই বাইকটা আমায় ফলো করছে। সমস্যা বুঝতে পারছি না। ওর আসলে উদ্দেশ্য…...।”
মোহিনী নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করতে পারল না। তার আগেই বাইকের উপর থাকা লোকটা নিজের হেলমেটটা খুলল। অমনি বেরিয়ে এলো নিবিড়ের মুখ।
বিস্ময়ে মোহিনীর মুখ হা হয়ে গেল। নিবিড় ঠোঁটে আলতো হাসি ফুটিয়ে তুলে ওদের দুজনকে উদ্দেশ্যে হাত নাড়ালো। বাইক থেকে নেমে ওদের দিকে এগিয়ে এসে সাদিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কেমন আছেন বজ্জাত কুচুটি আপু?”
নিবিড় কথাটা বলতেই সাদিয়া তেঁতে উঠে বলল,
“এই বজ্জাত কাকে বলছেন? আপনি বজ্জাত। সেজন্যই তো আপনার বউ বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে।”
নিবিড় চোখ মুখে মৃদু রাগী ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,
“আপনি বজ্জাত। সেই জন্য আমার বউকে ভাগিয়ে নিয়ে এসেছেন নিজের বাড়িতে। লজ্জা করে না অন্যের বউকে নিজের বাড়িতে রাখতে? আমি আপনার নামে মামলা করব। বলবাে আমার বউকে অপহরণ করে আটকে রেখেছেন আপনি।”
সাদিয়া যেই না কিছু বলে উঠতে ধরলো অমনি মোহিনী ধমক দিয়ে দুজনকে থামিয়ে দিয়ে নিবিড় কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কি সমস্যা তোমার? পিছু কেন করছিলে? আর সাদিয়ার নামে মামলা দেওয়ার আগে আমি তোমার নামে মামলা দেবো। এসব কোন ধরনের স্বভাব?”
নিবিড় বেশ গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,
“কি এমন করেছি আমি? এমনটা তো না যে তুমি আমার প্রেমিকা কিংবা অন্যের বউ। নিজের বউয়ের পিছু এসেছি। কোন আদালত আমার নামে মামলা করে সেটা আমিও দেখবো।”
"ফালতু কথা ছেড়ে কাজের কথা বলো। পিছু নিচ্ছিলে কেন?”
“তুমি কোথায় থাকছো সেটা জানার ছিল। সরাসরি তো জীবনেও বলতে না সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। সেজন্য লুকিয়ে লুকিয়ে এসেছি।”
“কেন এসেছো? আমি যেখানে ইচ্ছে থাকি তাতে তোমার কি? তুমি কি ভুলে গেছো আমাদের ডিভোর্সের কথা হচ্ছিল? আমরা ডিভোর্সের জন্য উকিলের কাছে পর্যন্ত গিয়েছিলাম। ধরে নাও না যে আমাদের ডিভোর্স…....।”
মোহিনী নিজের কথা সম্পন্ন করার আগেই নিবিড় ওর মুখ চেপে ধরে আতঙ্কিত গলায় বলল,
“যতটুকু বলেছো, বলেছো। আর এগিয়ো না মোহিনী। এই শব্দটা শুনলে এখন আমার ভয় হয়। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে ডিভোর্সের কথা মনে পড়লে। আমি শুধু ভাবি কি হয়ে গিয়েছিলো তখন আমার! আমি শুধু ভাবি কত বড় ভুল করতে গিয়েছিলাম। ভাগ্যিস বাবা-মা বুঝিয়ে রেখে গিয়েছিল। ভাগ্যিস নুসরাত বাড়ির লোকজনকে জানিয়েছিল।”
মোহিনী নিজের মুখ থেকে নিবিড়ের হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল,
“বাড়ির লোকজন কি বুঝিয়ে আমাদের কিছু করতে পেরেছিলো? বাড়ির লোকজন বোঝানোর পর যদি সবটা ঠিক করার ইচ্ছে আমাদের থেকে থাকতো তাহলে তারপরেও আমাদের মাঝে ঝামেলা হতো না। যাই হোক এখন আসতে পারো।”
কথাটা বলে মোহিনী উপরে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে নিবিড় তাড়াহুড়ো গলায় বলল,
“ছেলে মেয়ের সাথে একবার দেখা করে যাই।”
মোহিনী থামলো। কিন্তু পিছন ফিরে তাকালো না। গম্ভীর গলায় বলল,
“বাড়িতে নেই ওরা।”
“কোথায় আছে? সেখানেই যাব আমি।”
“বলবো না। তুমি ভাবলে কি করে আমি আবারও এত সহজে তোমায় ওদের নাগাল পেতে দেব? তোমাকে এবার আগে হারে হারে পরিবারের মূল্য বোঝাবো। তারপরে তুমি সবকিছু ফেরত পাবে। বাড়ি ফিরে যাও।”
কথাটা বলে মোহিনী আর সেখানে দাঁড়ালো না। উপরে চলে গেল।নমোহিনীর পিছন পিছন সাদিয়াও যেতে ধরলে নিবিড় একবার ওকে ডেকে উঠলো। সাদিয়া পিছন ফিরে তাকিয়ে খ্যাঁক করে উঠে বলল,
“কি হয়েছে?”
নিবিড় সাদিয়ার দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে মাথা নামিয়ে নিয়ে অসহায় গলায় আকুতি জানিয়ে বলল,
“একটু মোহিনীকে বোঝাবেন প্লিজ যেন ফিরে আসে আমার কাছে। অন্তত যতদিন আমার কাছে ফিরে না আসে বাচ্চাদের সাথে যেন একটু কথা বলতে দেয়। ভুল তো মানুষ মাত্রই হয়। কিন্তু কজনই বা নিজের ভুল বুঝতে পারে। আমি তো বুঝতে পেরেছি। তাহলে সে দিক থেকে আমি বাকিদের থেকে ভালো। এখন আমাকে নিজের ভুলটা তো শোধরানোর সুযোগ দেওয়া উচিত। থাকতে পারছি না ওদের ছাড়া। একটু বোঝাবেন ওকে প্লিজ!”
সাদিয়ার একটু হলেও খারাপ লাগলো নিবিড়ের জন্য। তবে সেটা নিবিড় কে বুঝতে দিতে চাইলো না। গম্ভীর গলায় বলল,
“ঠিক আছে ঠিক আছে। চেষ্টা করব। তবে আর যেন কোনদিন রাস্তায় কোন মেয়েকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে না দেখি। তাহলে কিন্তু আমি মোহিনীকে উস্কাবো যেন ও কোনদিন আপনার কাছে আর ফিরে না যায়। বাড়ি ফিরে যান এখন।”
সাদিয়া ওপরে চলে গেল। নিবিড় কিছুক্ষণ বিল্ডিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। কোন ফ্লাটে মোহিনী থাকে সেটা তো জানো না। জানালার আড়ালে দাঁড়িয়ে মোহিনীও দেখছে নিবিড় কে। তবে আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। যেন নিবিড় ওকে টের না পায়। নিবিড়ের কেন যেন মন বলছে যে মোহিনী কোথাও থেকে ঠিক দেখছে ওকে। সেজন্যই তো যাওয়ার আগে একবার হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালো।
নিবিড় জানে না মোহিনী কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, কোন ফ্লাটে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তারপরও বিশ্বাস মোহিনী ওকে দেখছে। নিবিড়ের সেই বিশ্বাস ভুল না। মোহিনী সত্যি ওকে দেখছে। নিবিড়কে হাত নাড়াতে দেখে ওড়নায় মুখ গুঁজে একটু শব্দ করে কেঁদে উঠলো।
চলে গেল নিবিড়। মোহিনীর ইচ্ছে করলো ছুটে গিয়ে একটু নিবিড় কে একবার জড়িয়ে ধরতে। একবার একটু জিজ্ঞেস করতে কেমন আছে, কিছু খেয়েছে কিনা, কেমন করে একা দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করতে পারল না। নিজেকে সামলাতে হবে। নিজের আবেগগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ওদের বাকিটা জীবন সুখে কাটানোর জন্য।