তোমার নামেই গল্প হোক

পর্ব - ৭

🟢

বিগত এক সপ্তাহ যাবৎ মোহিনী আর নিবিড়ের সংসারটা সম্পূর্ণ ঝগড়া বিহীন ভাবে কাটছে। আকরাম চৌধুরীর অসুস্থতার পর থেকে মোহিনী কেমন যেন ঝিমিয়ে গেছে। নিবিড়ও আর এর মাঝে মোহিনীকে বিরক্ত করতে চায়নি। সেজন্য ঝগড়া হতে পারে এমন কিছু বলেওনি। বলা যায় দুজনেই খুব সামলে রেখেছিল দুজনকে।

দুজনে চাকরি করছে, সংসার করছে, রাত হলে ঘুমিয়ে পড়ছে। আবার সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই একই নিয়ম। ওদের দুজনের সম্পর্কের কোন উন্নতি হয়নি। শুধু ঝগড়াঝাঁটি বন্ধ হয়েছে।

রাতে বাচ্চাদেরকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে মোহিনী। ঘড়িতে তখন সময় রাত এগারোটা বাজে। কিন্তু তবুও নিবিড় বাড়ি ফেরেনি। মোহিনী একবার কল করেছিল কিন্তু রিসিভ করেনি নিবিড়। পরবর্তীতে আর কল ব্যাক করারও সময় হয়ে ওঠেনি নিবিড়ের। সেজন্য মোহিনীও আর কল করেনি।

ওদের ঘরের জানালার কাছে দাঁড়ালে রাস্তা বেশ ভালো মতই দেখা যায়। মোহিনী বর্তমানে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। নিবিড় কখন ফিরবে কে জানে!

মোহিনীর এসব ভাবনার মাঝেই ওদের বাড়ির সামনে একটা কালো চার চাকার গাড়ি এসে থামলো। ভ্রুঁ কোঁচকালো মোহিনী। ওদের ফ্ল্যাটের তো কারোরই না এই গাড়িট। এত রাতে কেই বা এলো।

মোহিনীর কপালের ভাঁজটা আরো গাঢ় হলো যখন দেখলো গাড়ি থেকে নিবিড় নামলো। শুধু নিবিড় একা না। ড্রাইভিং সিট থেকে একটা মেয়েও নামলো। মেয়েটাকে মোহিনী চেনে না। একেবারেই নতুন। যদি নিবিড়ের বন্ধু হয়ে থাকতো তবে তো চিনতো। ওদের দুজনের বন্ধুরা একই। নিবিড়ের ঘনিষ্ঠ কেউ হয়ে থাকলে তো মোহিনী তাকে অবশ্যই চিনতো। তাহলে এই নতুন মেয়েটার উদ্ভব ঘটলো কোত্থেকে।

গাড়ি থেকে নেমে কয়েক মিনিট হেসে হেসে মেয়েটার সাথে নিবিড় কথা বলে তারপরে ভিতরে এলো। চলে গেল মেয়েটা গাড়ি নিয়ে। মোহিনী জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস ছেড়ে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলো। মনে মনে ঠিক করলো যে ঝগড়া করবে না। নিবিড় কে এই বিষয়ে কোন কিছু জিজ্ঞেসও করবে না। জানতেও চাইবেনা যে মেয়েটা কে। যদি নিবিড় আগবাড়িয়ে বলে তাহলে ঠিক আছে।

মোহিনীর এসব ভাবনার মাঝেই কলিং বেল বেজে উঠলো। মোহিনী চুপচাপ গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। কোন কথা হলো না দুজনের মাঝে। নিবিড় চুপচাপ জুতো খুলে ভিতরে এলো। এখন ওরা এক ঘরেই থাকে। ঘরটা আপাতত আর আলাদা করেনি। কে জানে কখনো আবার করবে কিনা!

ঘরে এসে নিবিড় পকেট থেকে ফোনটা বের করে ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হওয়ার জন্য। মোহিনী ঘরে এসে নিবিড়কে কোথাও দেখতে পেল না। ওয়াশরুম থেকে পানির শব্দ ভেসে আসতেই বুঝলো ও ফ্রেশ হতে গেছে। মোহিনী চলে যেতে ধরলো সেখান থেকে। তখনই ওর কানে ভেসে এলো মেসেজের টুং শব্দ। মোহিনীর ফোনটা ওর হাতেই ছিল। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলো ওর ফোনে কোন মেসেজ আসেনি। তার মানে নিবিড়ের ফোনে মেসেজ এসেছে।

হঠাৎ করে খুব কৌতুহল হলো জানার জন্য যে কে মেসেজ দিয়েছে। কেন কৌতুহল হলো জানেনা। ড্রেসিং টেবিলের ওপরে দেখলো নিবিড়ের ফোনটা রাখা। বেশ কয়েকবার শব্দ হলো মেসেজ আসার। ফলস্বরূপ মোহিনীর আগ্রহ আরো কয়েকগুণ বাড়লো।

ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে নিবিড়ের ফোনটা হাতে নিল। নিবিড়ের ফোনের পাসওয়ার্ড মোহিনীর জানা। তাই খুলতে অসুবিধা হলো না। মেসেঞ্জারে ঢুকতেই দেখলো একটা মেয়ের আইডি থেকে বেশ কয়েকটা মেসেজ এসেছে। মেয়েটার নাম ফারিন তাবাসসুম। প্রোফাইলে মেয়েটার নিজের ছবি। যতটুকু চেহারা মোহিনী বুঝতে পারলো তাতে বুঝলো যে মেয়েটা নিবিড় কে ছাড়তে এসেছিল এটা সেই মেয়ের আইডি। কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে ইনবক্সে ঢুকেই পড়লো দেখার জন্য যে কি মেসেজ দিয়েছে।

“আজকের ডিনার ট্রিটের জন্য ধন্যবাদ নিবিড়। তোমার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো সত্যি খুব দারুন হয়। রোজ তোমার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো খুব ভালো লাগে। ধন্যবাদ আমাকে এত সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত উপহার দেওয়ার জন্য।”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও মোহিনীর হাত পা কাঁপছে মেসেজটা পড়ে। চোখ দুটো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে এলো। যে সন্দেহটা এতদিন মোহিনী করার প্রয়োজন মনে করেনি, যে বিষয়গুলো কখনো ভাবার প্রয়োজন মনে করেনি। কেন যেন মনে হচ্ছে আজ সেগুলোই সত্যি। সেই বিষয়গুলো মোহিনীর ভাবা উচিত ছিল। হঠাৎ করে নিবিড়ের বদলে যাওয়া, এতটা দায়িত্ব জ্ঞানহীন হয়ে যাওয়া, ওদের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করার কারণ মোহিনী এবার খুঁজে পাচ্ছে।

মোহিনীর এসব ভাবনার মাঝেই ওয়াশরুমের দরজা খোলার আওয়াজ পেল। তাড়াহুড়ো করে ফোনটা ড্রেসিং টেবিলের উপরে রেখে চোখের জল মুছে চলে নিল। নিবিড় ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে তোয়ালেটা চেয়ারের সাথে রেখে ফোনটা হাতে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। ফোনটা হাতে নিতেই আবারও একটা মেসেজ এলো। ফারিনই মেসেজটা দিয়েছে। ওর দেওয়া মেসেজটা দেখে ভ্রুঁ কোঁচকালো নিবিড়।

“সিন করে, রিপ্লাই দিলে না যে?”

তার আগের মেসেজগুলোও দেখলো নিবিড়। ও কখন সিন করল মেসেজ? ফোনই তো এখন হাতে নিল।

নিবিড়ের এসব ভাবনার মাঝে মোহিনীর গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ওর কানে।

“আমার রান্না করা খাবার খাওয়ার তো নিশ্চয়ই প্রয়োজন নেই তাই না? বাইরে থেকে তো খেয়ে এসেছো নিশ্চয়ই?”

সঙ্গে সঙ্গে নিবিড় মোহিনীর কথার মানেটাও বুঝলো, আবার ফারিনের মেসেজ এর মানেটাও বুঝলো। হালকা একটু কেঁশে গম্ভীর গলায় পাল্টা মোহিনী কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“অফিসে একটা ইম্পোর্টেন্ট প্রজেক্ট এর দায়িত্ব আমার আর ফারিনের উপর পড়েছিল। ও নতুন জয়েন করেছে। প্রেজেন্টেশন বানাতে অসুবিধা হচ্ছিলো। আমি প্রেজেন্টেশনটা বানিয়ে দিয়েছিলাম। সেটা খুব পছন্দ হয়েছে ক্লায়েন্টের। ও সেজন্যে ট্রিট দিতে চেয়েছিল আমাকে। কিন্তু আমি একটা মেয়ের টাকায় কিভাবে খেয়ে আসতাম। সেজন্য আমি বিল পে করেছিলাম।”

“আমি তো তোমার থেকে কিছু জানতে চাইনি। তুমি প্রজেক্টের খুশিতে তোমার কলিগকে ট্রিট দাও, নাকি এমনি খুশিতে ট্রিট দাও আমার তো তাতে যায় আসে না। দরকার হলে আমাদের ডিভোর্সের খুশিতেই ট্রিট দাও, আমার তাতেও যায় আসেনা। কিন্তু আমার সমস্যা হলো তুমি যে বাইরে থাকে খেয়ে আসবে সেই কথাটা আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করোনা। এমনকি তোমার স্ত্রী কল করলে সেই কলটা রিসিভ করারও সময় হয় না। অবশ্য হবে কি করে। তখন তো তুমি তোমার কলিগের সাথে হাসি ঠাট্টায় মেতে থাকো।”

নিবিড় মৃদু রাগী গলায় বলল,

“শাট আপ মোহিনী। বাজে ইঙ্গিত দিও না। স্বাভাবিক একটা ব্যাপার কে স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার চেষ্টা করো।”

“একটা ছেলে মেয়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে না নিবিড়। তাও যেখানে মেসেজের ধরন এমন। এতক্ষণ একসঙ্গে সময় কাটিয়েও তোমাদের মন ভরে না সেজন্য বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে আবার লম্বা একটা সময় ধরে দুজন হাসাহাসি করলে। তোমার বাড়ি ফেরার কি দরকার ছিল? ওই মেয়েটার সাথে ওর বাড়িতে চলে গেলেই পারতে। তোমার যে ঘরে বউ বাচ্চা আছে সেদিকে তো খেয়াল নেই। অফিস থেকে এসে ফ্রেশ হয়ে একবার বাচ্চাদের ঘরে যাওয়ারও প্রয়োজন মনে করোনা। সরাসরি আবার ফোন নিয়ে শুয়ে পড়লে।”

নিবিড় তেঁতে উঠে বলল,

“তোমার জন্যই তো যাই না। আমি বাচ্চাদের ঘরে গিয়ে একটু আদর করে ওদের কপালে চুমু খেলেই তোমার সমস্যা হয়ে যায়। বলো আমি নাকি ওদেরকে জাগাতে এসেছি। তুমি অনেক কষ্টে ঘুম পাড়িয়েছো। ওরা ঘুমোনোর পরে আমার ওদের ঘরে পা রাখাই তুমি পছন্দ করে না। সেইজন্য যাই না। আমি যাই না কারণ আর অশান্তি করতে চাই না আমি।”

মোহিনী ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলে উঠলো,

“ও আচ্ছা। তুমি এমন একটা ভাব দেখাচ্ছো নিবিড় যেন তুমি আমার কথা মত আজকাল ওঠো আর বসো। তোমার কি মনে হয় তুমি এখনো আগের মতনই আছো? নিজের মাঝে কি একটুও পরিবর্তন দেখতে পাও না তুমি?”

নিবিড় বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

“না, পাই না। তার কারণ আমার মাঝে কোন কিছুই পরিবর্তন হয়নি। আমি আগে যেমন ছিলাম এখনও তেমনই আছি। বরং বদলে গেছো তুমি। তুমি আগে আমায় চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে মোহিনী। আর আজ তুমি আমায় সন্দেহ করছো!”

“আগে তোমায় চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতাম তার কারণ তখন তুমি বিশ্বাসযোগ্য ছিলে। এখন এমন কাজ করছো কেন যার কারণে আমার সন্দেহ তৈরি হয়? আর তোমার সত্যি মনে হয় তুমি বদলাওনি? যদি তুমি আগের মতনই থাকতে নিবিড়, তাহলে আমাকে কল করে তুমি জানিয়ে দিতে যে তুমি বাইরে থেকে তোমার কলিগের সাথে ডিনার করে আসছো। মনে আছে তুমি সবসময় বাইরে ডিনার করলে বাড়ি ফেরার পথে আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসতে। কিছু না কিছু অবশ্যই নিয়ে আসতে। কই আজ তো আনোনি। তোমার এই চিরাচরিত স্বভাবটার পরিবর্তন ঘটল কি করে যদি তোমার পরিবর্তন না ঘটে থাকে?”

নিবিড় হাতে থাকা ফোনটা বিছানার উপরে রেখে উঠে অফিসের ব্যাগের চেইন খুলে কিছু একটা বের করলো। বেশ কয়েকটা চকলেটের প্যাকেট। সবগুলো চকলেটের প্যাকেট বিছানের উপর ছুঁড়ে দিয়ে বলল,

“আজও এনেছি। বিরিয়ানি আনতে চেয়েছিলাম। যেই দোকানের বিরিয়ানি তোমার পছন্দ সেই দোকানটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পাইনি কোথাও বিরিয়ানি ফেরার পথে। সেই জন্য বাধ্য হয়ে চকলেট এনেছি। দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। আর কত ভুল বের করবে আমার মোহিনী? নিজের ভুল গুলোর দিকেও তো একবার নজর দাও। সারাক্ষণ শুধু বলো আমি বদলে গেছি, আমি তোমাকে সময় দেই না, আমার কাছে পরিবারকে দেয়ার মতন সময় নেই, তোমাকে দেওয়ার মতন, বাচ্চাদেরকে দেওয়ার মতন সময় নেই। একবার নিজেকে প্রশ্ন করে দেখো তোমার কি আমাকে দেয়ার মতন সময় আছে?”

মোহিনী জিজ্ঞাসু গলায় বলল,

“কি বলতে চাইছো?”

“আমি বলতে চাইছে নিজের দোষ গুলো দেখার চেষ্টা করো মোহিনী। তুমি চাকরি করছো, সংসার করছো, বাচ্চাদেরকে সামলাচ্ছো সব ঠিক আছে। তুমি সব সামলাতে পারো। কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা কি সামলাতে পারছ? আমার জন্য রাতে না খেয়ে বসে থাকলেই ভালোবাসা হয়ে যায়? শুধুমাত্র রাতে আমার জন্য না খেয়ে বসে থাকলে স্ত্রীর দায়িত্ব পালন হয়ে যায়? তোমার মনে আছে শেষ কবে তুমি একটু আমার পাশে বসে আমার সাথে ভালো মতো কথা বলেছিলে? আমাদের মাঝে দূরত্বটা কেন তৈরি হয়েছে জানো? কারণ তোমার কাছে আমাকে দেওয়ার মতন সময় নেই। তোমার কাছে অফিসে দেওয়ার মতন সময় আছে, সংসারের কাজ করার মতন সময় আছে, বাচ্চাদের দেখাশোনা করার মতন সময় আছে শুধু সময় নেই আমার জন্য। আগে তো সারাক্ষণ আমার সাথে গল্প করার জন্য ব্যস্ত হয়ে থাকতে। আমি অসুস্থ হলে আমার পাশ থেকে নড়তে না। আমি বলছি না আমি এখনো অসুস্থ হলে তুমি দায়সারা ভাবে থাকো। সময়মতো তুমি ওষুধ খাওয়ার কথা বলো, না খেলে বকাঝকা করো, আমার পছন্দের খাবার বানিয়ে এনে দাও। কিন্তু আমি তো এগুলো চাই না তোমার থেকে মোহিনী। আমি চাই তুমি আমার পাশে দুদণ্ড বসো। আমি চাই তুমি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও। আমি চাই তুমি একটু নরম গলায় আমায় জিজ্ঞেস করো যে আমার শরীর কেমন লাগছে। কিন্তু তুমি এগুলো না করে সব সময় খিটখিটে মেজাজই থাকো।”

বিজ্ঞাপন

মোহিনীর দুচোখ ছাপিয়ে জল বেরিয়ে এলো। অশ্রুসিক্ত নয়নে নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“সারাদিন অফিস করে এসে, বাচ্চাদেরকে সামলে, আবারও সংসারের কাজ করে আমার নিজের শরীর আর কোন কিছুতে সায় দেয় না নিবিড়। যদি শরীর ঠিক না থাকে মেজাজ কি খিটখিটে হবে না? আর আমি এসব কার জন্য করি? তোমার জন্যই তো করি, আমাদের সংসারের জন্যই তো করি।”

নিবিড় একটু শান্ত হলো। যথেষ্ট শান্ত গলায় বলল,

“তোমার কাজগুলোকে আমি ছোট করে দেখছি না। আমি জানি তুমি সারাদিন অনেক কাজ করো। কিন্তু আগে তো এমন হতো না। আগে তো এতো কাজ করার পরও তুমি শান্ত থাকতে। আমার সাথে ভালোভাবে কথা বলতে। তাহলে এখন কেন বলো না মোহিনী? সংসারের কাজ আমি তোমার সাথে ভাগাভাগি করে নিতে চাইলেও তোমার সমস্যা। তুমি তাতেও রাজি হও না। আমার কাজ নাকি তোমার পছন্দ হয় না। হাতেগোনা কয়েকদিন বাচ্চাদেরকে স্কুলে পৌঁছে দেবার ব্যাপারে একটু দেরি হয়েছিল আমার। তুমি তারপর থেকে বাচ্চাদের সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছো। তাহলে আমি করবোটা কি? দোষ শুধু আমার একতরফা দিলেই হলো?”

মোহিনী তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“ও আচ্ছা। তারমানে আমার মাঝে যে কমতি গুলো তুমি খুঁজে পাচ্ছো সেগুলোই পূরণ করার জন্য অন্য কারো কাছে যেতে হচ্ছে আজকাল। আমি তোমার চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারছি না জন্যই বোধহয় আজকাল অন্য কারো সাথে ডিনারে যাওয়া হচ্ছে তাই না?”

নিবিড় অগ্নিদৃষ্টিতে মোহিনীর দিকে তাকিয়ে সাবধানে গলায় বলল,

“ডোন্ট ক্রস ইয়োর লিমিট মোহিনী। তোমার যথেষ্ট আজেবাজে কথা সহ্য করেছি। তোমার থেকে যথেষ্ট অপমানিত হয়েছি। কিন্তু ভুলেও আমাকে ক্যারেক্টারলেস প্রমাণ করার চেষ্টা করবে না। তোমার কোন ছেলে কলিগ নেই? তুমি কোন ছেলের সাথে কথা বলো না? তোমার ফোনে তোমার কোন কলিগের মেসেজ আসে না? নাকি এখন বলবে তোমার অফিসে শুধু মেয়েরাই কাজ করে।”

“অবশ্যই ছেলেরা আছে। কাজের সূত্রে অনেক ছেলে কলিগের সাথেই আমার কথা হয়। কিন্তু আমি আমার স্বামীকে বাড়িতে না খাইয়া বসিয়ে রেখে আমার সেই কলিগদের সাথে ডিনার করতে যাই না। একজন বিবাহিত হিসেবে আমি আমার সীমা জানি। তাদের সঙ্গে যতটুকু সম্পর্ক রাখা দরকার ততটুকুই রাখি। আমি অফিসের সম্পর্কটা বয়ে বাড়ির দরজা পর্যন্ত আনি না।”

নিবিড় দুই হাতে মাথার চুল খামচে ধরে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,

“পাগল হয়ে যাব আমি। সিরিয়াসলি বলছি আমি পাগল হয়ে যাব তোমার জ্বালায়।”

মোহিনী কিছুক্ষণ নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নিবিড়ের দিকে। অনেক কিছু যেন বোঝাতে চাইলো মোহিনী নিবিড় কে। কিন্তু নিবিড় বুঝলো না সেসব। এখন তো আরো রেগে আছে। বুঝবেই বা কি করে। মোহিনী একটু পর দুই হাতে নিজের চোখের জল মুছে শান্ত গলায় বলল,

“অনেক সমস্যা শুনলাম। তাহলে সমাধান কি বলো।”

নিবিড় খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“কি সমাধান বলবো? তোমার কাছে সমাধান মানেই তো ডিভোর্স।”

“তোমার কাছে কি একসঙ্গে থাকা?”

“তুমি যা চাইবে তাই হবে। আমার কথার কোন মূল্য এমনিতেই এই বাড়িতে আছে নাকি। তোমার কাছে তো…..।”

নিবিড় নিজের কথা সম্পূর্ণ করার আগেই ওর কানে ভেসে এলো মাহির ডাক। দুজনেই একযোগে দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ করে দুজনেই শান্ত হয়ে গেল। মোহিনী তাড়াহুড়ো করে চোখের জল মুছে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল,

“কি হয়েছে বাবা? তোমরা ঘুমোওনি? উঠে এলে কেন?”

“তোমরা ঝগড়া করছিলে। তোমাদের চেঁচামেচির আওয়াজ পেয়ে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে গেছে। তোমরা দুজন এত ঝগড়া করো কেন? আমি আর নিশাতও তো এত ঝগড়া করি না। স্কুলে আমাদের বন্ধুদের সাথেও আমরা ঝগড়া করিনা। কেউ ঝগড়া করে না, শুধু তোমরা দুজনেই ঝগড়া করো।”

নিবিড় আর মোহিনী দুজনে একবার দুজনের দিকে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে আবার নিজেদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল। দুজনেই বলার মতন কিছু খুঁজে পেল না। ওদেরকে চুপ করে থাকতে দেখে মাহি আবারো বলে উঠলো,

“রাত হলে তোমরা দুজনে প্রতিদিন ঝগড়া করো। আর তোমাদের ঝগড়ার কারণে প্রতিদিনই আমাদের ঘুম ভেঙে যায়? তোমরা এমন করো কেন? বাবা, তুমি মায়ের উপরে চেঁচাচ্ছিলে কেন?”

মাহি কথাটা বলতেই নিবিড় অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালো মোহিনীর দিকে। ছেলে মেয়েকে কি করে বোঝাবে যে নিবিড় একা চেঁচাচ্ছিলো না। এতক্ষন মোহিনীও চেঁচাচ্ছিলো। কিন্তু নিবিড়ের কপাল খারাপ। ছেলে মেয়ে এসে ওকেই চেঁচাতে দেখেছে। তবে যাই হোক এখন এই পরিস্থিতিটা সামাল দিতে হবে। নিবিড় ছেলের দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,

“আমরা তো ঝগড়া করছিলাম না বাবা। আসলে এমনিতেই একটু জোরে জোরে কথা বলছিলাম। সেজন্য তোমাদের কাছে মনে হয়েছে ঝগড়া করছিলাম।”

নিবিড়ের কথাটায় নিশাত তীব্র আপত্তি জানিয়ে মুখ গোমড়া করে বলল,

“তাহলে আম্মু কাঁদছিল কেন? তুমি রোজ আম্মুর সাথে এমন করো আর আম্মু শুধু কাঁদে। তুমি খুবই পঁচা হয়ে যাচ্ছো বাবা। তুমি আর আমাদের সাথে আগের মতন গল্প করো না। আমার সাথে খেলোও না। তুমি আর আমাকে ঘুরতেও নিয়ে যাও না। আমাকে পড়তেও বসাও না, আমার জন্য আইসক্রিম নিয়ে আসো না। স্কুলের মিটিং এ আম্মু একাই যায়। তুমি আসো না। সবারই তো বাবা-মা আসে। শুধু আমারই একা আম্মু যায়। তুমি খুবই পঁচা হয়ে গেছো বাবা।”

মেয়ের মুখ থেকে শেষোক্ত বাক্যটা শুনে নিবিড়ের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। নিশাত কি বলছে এগুলো? নিবিড় ভালো বাবা না? নিবিড় নিজের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করে না? তাহলে কি মোহিনী যেগুলো বলে সেগুলোই ঠিক? নিবিড়ি কি বদলে গেছে? তার মানে কি সব ভুলগুলো শুধু একতরফা নিবিড়ের? যদি শুধু মোহিনী ওকে একা দোষারোপ করতো তাহলে না হয় ভাবতো যে মোহিনী নিজের বেলায় অন্ধ। কিন্তু এখানে তো নিবিড়ের নিজের মেয়ে ওর দোষ গুলো চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দিচ্ছে। ছোট একটা বাচ্চা নিবিড়ের ভুলগুলো ধরিয়ে দিল। নিবিড় তাহলে কেন বুঝতে পারছে না?

ওকে চুপ করে যেতে দেখে মোহিনী বুঝলো এবার ওকে পরিস্থিতিটা সামাল দিতে হবে। ওদের মাঝে যাই হোক না কেন বাচ্চাদেরকে অন্তত এখনই বুঝতে দেওয়া যাবে না সবটা। মোহিনী নিশাতের দিকে এগিয়ে গিয়ে ওকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

“এভাবে বলেন না মা। বাবা পঁচা কেন হতে যাবে? বাবা তো সময় পায়না। তোমার জন্য চকলেট কিনতে হবে হয় না বাবাকে। সেজন্য বাবা অনেক কাজ করে। ওই যে দেখো বিছানার ওপরে তোমার জন্য কতগুলো চকলেট রাখা। তোমার বাবাই তো ওগুলো এনেছে।”

বিছানার দিকে তাকাতেই দেখল সেখানে অনেকগুলো চকলেট। মুহূর্তের মাঝে নিশাতের চোখে হাসি ফুটে উঠলো। দৌড়ে গিয়ে বিছানায় উঠলো। নিবিড় একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। যাক অন্তত এই যাত্রায় মোহিনী মেয়েকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে। এদিকে মেয়ে চকলেটের কাছে গেলেও মাহি এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। মাহির চোখ মুখ এখনো শুকনো। মোহিনী ছেলের গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“কি হয়েছে বাবা? তোমার মুখ এমন শুকনো দেখাচ্ছে কেন? বেশি ঘুম ধরেছে? যাও ঘুমিয়ে পড়ো।”

নিবিড় আর মোহিনী তখন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল। মাহি কোন উত্তর দিলো না মোহিনীর কথার। একবার মাথা তুলে নিবিড় আর মোহিনীর দিকে তাকিয়ে দুহাতে দুজনকে একসঙ্গে জড়িয়ে ধরলো। মাহি একটা শব্দও বের করলো না মুখ দিয়ে। শুধু দু হাতে শক্ত করে বাবা মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে থাকলো। দুজনকে খুব শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। যেন কেউ কোথাও না চলে যায়।

মোহিনীর ব্যাপারটা ঠিক লাগলো না। সন্দেহ হলো যে বাড়ির লোকজন থাকা অবস্থায় ওদের ডিভোর্সের কথাবার্তা ছেলের কানে গেছে কি না। নয়তো হঠাৎ করে এমন করার কথা না। নিবিড় চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কি হয়েছে মাহি?”

মাহি মাথা তুলে নিবিড়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আজ তোমাদের সঙ্গে এই ঘরে ঘুমোই বাবা!”

মাহি কথাটা বলতেই নিবিড় আর মোহিনী দুজনে একযোগে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। যাক তবে যতটা খারাপ ভেবেছিল ততটা খারাপ কিছু হয়নি। আলতো হেসে মাহির কথায় সম্মতি জানালো। চারজনেই আজ অনেকগুলো দিন পর একসঙ্গে ঘুমোলো। নিশাত ঘুমালো ওর বাবার গলা জড়িয়ে ধরে। আর মাহি ঘুমোলো মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে। ছেলে-মেয়ে তো ঘুমিয়ে গেছে কিন্তু ঘুম নেই নিবিড় আর মোহিনীর চোখে। নিজেদের ভবিষ্যত, বাচ্চাদের ভবিষ্যত নিয়ে হঠাৎ করেই দুশ্চিন্তা হচ্ছে। কে জানে কি লেখা আছে ওদের কপালে।

বিজ্ঞাপন
তোমার নামেই গল্প হোক গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাংসারিক ও রোমান্টিক গল্প