বাড়িতে রুমের স্বপ্লতা। মোটকথা রুমের স্বল্পতা আসল ব্যাপার না। ব্যাপারটা হলো মোহিনী আর নিবিড় কে এক ঘরে রাখা। নাঈম আর মিতালী কষ্ট করে অনেক কিছু বুঝিয়ে, ওদের ঘুমোনোর জন্য পর্যাপ্ত ঘর নেই এসব বলে শেষমেষ নিবিড় কে মোহিনীর ঘরে পাঠাতে সক্ষম হলো।
রাতের খাওয়া দাওয়া শেষে যে যার ঘরে গেল ঘুমোতে। মোহিনী আগে এসেছিল ঘরে। নিবিড় পরে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে চুপচাপ গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। মোহিনী তখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছে। নিবিড় এমন ভাবে শুয়ে থেকে ফোন স্ক্রল করছে যেন ঘরে আর কেউ উপস্থিতই নেই। মোহিনীকে যেন দেখতেই পাচ্ছে না। মোহিনীও সেজন্য খুব বেশি পাত্তা দিলো না নিবিড় কে। এমন ভাবে থাকলো যেন ঘরে নিবিড় কোথাও নেই। আর কিছুদিন পর তো দুজনে আলাদা হয়েই যাবে। দশটা বছর যখন সহ্য করলো আর কয়েকটা দিন সহ্য করতে পারবে না!
মোহিনীর এসব ভাবনার মাঝেই ওর ফোনটা বেজে উঠল। ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো নুসরাত কল করেছে। রিসিভ করে ফোনটা কানে ধরে গম্ভীর গলায় বলল,
“বল?”
“কিরে কেমন আছিস তোরা? কোন খোঁজ খবরই তো নেই। নিবিড় কোথাও? ও কেমন আছে?”
মোহিনী গম্ভীর গলায় বলল,
“নিবিড় কেমন আছে সেটা নিবিড় কে কল করে জিজ্ঞেস কর। অন্যরা কেমন আছে সেই খোঁজ আমি তোকে কি করে দেব? আমি কেমন আছি সেটা জানতে চাইলে জিজ্ঞেস করতে পারিস।”
নিবিড়ের কানে কথাগুলো গেল ঠিকই তবে এমন ভান করলো যেন শুনতে পায়নি। মোহিনী আড়চোখে একবার তাকালো। ও খুব ভালো করে জানে নিবিড় কতগুলো শুনেও না শোনার ভান করছে।
মোহিনীর এসব ভাবনার মাঝেই অপর পাশ থেকে আবারও নুসরাতের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“এভাবে কেন কথা বলছিস মোহিনী? নিবিড়ের খোঁজ তুই জানবি না এটা হতে পারে!”
মোহিনী তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“কেন হতে পারেনা? আজকাল কত কিছু হয়! একজন আরেকজনকে না জানিয়ে ডিভোর্সের জন্য চলে যাচ্ছি। তুই বল, এটা হতে পারে তুই কখনো ভেবেছিলি? কিন্তু তাও তো হয়ে গেছে। দুদিন পর দেখবি ডিভোর্সও হয়ে গেছে। হয়তো তুই জানতেও পারবি না।”
এবারে আর চুপ করে থাকতে পারলো না নিবিড়। নিজের হাতে থাকা ফোনটা বিছানার উপর ফেলে মোহিনীর দিকে এগিয়ে এসে ওর কান থেকে মোহিনীর ফোনটা এক প্রকার কেড়ে নিয়ে কানে ধরে অপর পাশে থাকে নুসরাত কে উদ্দেশ্যে করে রাগান্বিত গলায় বলল,
“আজকাল তো দেখি তোর ভালোই অধঃপতন হয়েছে নুসরাত। তোকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম মোহিনীর সাথে কথা হয়েছিল কিনা তুই বলেছিলিস হয়নি। তা কার সঙ্গে থেকে এত মিথ্যে বলা শিখেছিস? আর একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ, যদি আমার খবর নেওয়ার ইচ্ছে থেকে থাকে তাহলে সরাসরি আমাকে কল করবি। যাকে তাকে আমি আমার খোঁজ খবর দেই না বুঝতে পেরেছিস? মাথার মধ্যে ঢুকেছে কথাটা? আরেকটা কথা, তোকে যে ডিভোর্সের ব্যাপারে বলেছিলাম তুই কি কাগজপত্র তৈরি করেছিস? যদি তোর দ্বারা এই কাজ না হয় তাহলে আমাকে বলে দে। আমি অন্য লয়ারের সাথে যোগাযোগ করবো। কিন্তু তারপরও যে আমার সঙ্গে থাকতে চায় না আমি তার সঙ্গে থাকবো না।”
নিবিড় ভেবেছিল নির্ঘাত মোহিনী এবার তেঁতে উঠে ওর সাথে ঝগড়ায় নেমে পড়বে। তবে তেমন কিছুই হলো না। নিবিড় যে মোহিনীর থেকে ওর ফোনটা কেড়ে নিল তার জন্যও মোহিনী কিছু বলল না। চুপচাপ নিজের কাজই করে যাচ্ছে।
এদিকে ফোনের অপর পাশে থাকা নুসরাত হঠাৎ করে নিবিড়ের কন্ঠ পেয়ে একটু থতমত খেয়ে গেছে। কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। জানেই তো পাশে মোহিনী আছে। এখন কি নিবিড়ের ডিভোর্সের প্রসঙ্গটা তোলা খুব দরকার ছিল! মিতালীর থেকে তো খবর পেয়েছিল যে দুজনকে এক ঘরে রাখা হয়েছে। এই সময়টা কি একটু নিজেদের মাঝে সবকিছু মিটমাট করে নেওয়া যেত না!
এদিকে মোহিনীর থেকে কোন প্রতিক্রিয়া না পেয়ে নিবিড়ের ব্যাপারটা মোটেই ভালো লাগলো না। ও নিজেই বলে ঝগড়া করতে চায় না। আবার ঝগড়া না করলে ভালোও লাগছে না। মোহিনীর এখন কিছু একটু বলা উচিত ছিল যার প্রেক্ষিতে নিবিড় আরো দু চারটে কথা শোনাতে পারতো। কিন্তু মেয়েটা কিচ্ছু বলল না। অদ্ভুত!
নুসরাতের সাথেও আর কথা বলার ইচ্ছে হলো না নিবিড়ের। একটা ঝাড়ি মেরে নুসরাতকে ফোনটা রাখতে বলে নিজেই কেটে দিয়ে ফোনটা বিছানার উপর ছুঁড়ে ফেলল।
একবার ভাবলো চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়বে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে হলো তার আগে মোহিনীর নিরবতার কারণটা জানা দরকার।
হালকা একটু কেশে মোহিনীর মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো। তবে কোন কাজ হলো না। মোহিনী পাত্তা দিলাে না। নিবিড় যখন বুঝলো এগুলো করে কোন লাভ হবে না তখন সরাসরি গম্ভীর গলায় প্রশ্নটা করেই ফেলল,
“এত কিছু বললাম তাও ঝগড়া করলে না যে? কিছুই কি বলার নেই?”
মোহিনী মাথা তুলে আয়নার ভেতরে নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বেশ শান্ত বলায় বলল,
“সিদ্ধান্ত যখন হয়ে গেছে আর বলার মতন কিই বা থাকতে পারে! আর আমার উদ্দেশ্য সব সময় ঝগড়া করার হয় না নিবিড়।”
“তাহলে কি বলতে চাইছো আমার উদ্দেশ্যে ঝগড়া করার হয়?”
“আমি তো চুপ করেই ছিলাম। কিন্তু তোমারই তো আমার চুপ থাকাটা পছন্দ হচ্ছে না। তুমিই তো চাইছো যেন ঝগড়া করি আমি তাই না?”
“একদম বাজে কথা বলবে না মোহিনী। তুমি জানো ঝগড়া জিনিসটা আমার কতটা অপছন্দ।”
মোহিনী আলতো হেসে বলল,
“সেই সাথে বোধহয় আজকাল আমাকেও ভীষণ অপছন্দ তোমার তাই না?”
একটু থতমত খেল নিবিড়। আমতা আমতা করে বলল,
“না, তেমন না।”
“তাহলে কেমন নিবিড়? আচ্ছা আমায় একটা কারণ বলোতো তোমার ডিভোর্স চাওয়ার? আমায় একটু একটা শক্ত পোক্ত কারণ দেখাবে?”
নিবিড় অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
“তুমিও তো ডিভোর্স চাও। আমি যদি তোমাকে এই প্রশ্নটা করি তুমি আমাকে কোনো ঠিকঠাক কারণ দেখাতে পারবে?”
“আমি কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছি না জন্যই তো তোমার থেকে জানতে চাইলাম। ভাবলাম হয়তো তোমার দিক থেকে কোন ভুল নেই। কিন্তু আমার দিক থেকে হয়তো অনেক ভুল আছে। সেসব যদি জানতে পারি তবুও নিজেকে একটু সান্ত্বনা দিতে পারবো। বলো না কি দোষ আমার? আমার কোন স্বভাবের কারণে হঠাৎ করে আমি তোমার এতটা অপছন্দের হয়ে উঠলাম?”
নিবিড় খেয়াল করলো মোহিনীর চোখ দুটো ছলছল করে উঠেছে। মোহিনীর চোখে পানি দেখতেই হঠাৎ করে কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল নিবিড়। অন্যান্য সময় তো মোহিনীকে কাঁদতে দেখলে আজকাল আর এমন হয় না। তখন ঝগড়া হয় জন্য কি খারাপ লাগেনা! আর এখন ওদের মাঝে কোন ঝগড়াঝাটি ছাড়া মোহিনী কাঁদছে সেজন্য কি খারাপ লাগছে! হ্যাঁ ভীষণ খারাপ লাগছে নিবিড়ের। খুব অস্থির লাগছে। মোহিনী কেন কাঁদবে? মোহিনীর চোখে তো জল মানায় না।
তাড়াহুড়ো করে নিবিড় মোহিনীর দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর চোখের জল মুছে দিয়ে বলল,
“কাঁদছো কেন? তুমি আমার অপছন্দের না। কেঁদো না। তুমি কাঁদলে আমার ভালো লাগেনা।”
মোহিনী অশ্রুসিক্ত নয়নে নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমিই কাঁদিয়ে আবার তুমিই বলছো আমি কাঁদলে তোমার ভালো লাগেনা! অদ্ভুত ভালোবাসা তোমার নিবিড়। এটা কে কি আদৌ ভালোবাসা বলা যায়? এই অনুভূতির নাম আমি কি দেব একটু বলবে?”
নিবিড় কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“আমার ভালোবাসায় সন্দেহ হয় তাহলে আজকাল?”
“স্বাভাবিক নয় কি? বিশ্বাস-অবিশ্বাসের পাঠ তো কবেই চুকে গেছে আমাদের মাঝে। যাইহোক সেসব কথা বাদ দাও। তুমি বরং বলো ডিভোর্সের কারণ হিসেবে কি উল্লেখ করবে। কোনো কারণ তো লাগবেই। কি বলবে তোমার স্ত্রী খারাপ নাকি চরিত্রের দোষ উল্লেখ করবে?”
“তোমার মনে হয় আমি এই কথাগুলো উল্লেখ করবো ডিভোর্সের কারণ হিসেবে?”
“কিছু তো উল্লেখ করতেই হবে।”
“যা উল্লেখ করার আমি দেখে নেব। তোমায় ভাবতে হবে না।”
“তারমানে ডিভোর্স তুমি আমায় দেবেই?”
“তুমিও তো দেবে। তুমি সব সময় আমার দোষটাই কেন দেখো বলোতো? ডিভোর্স চাইতে তুমি আগে গিয়েছিলে। এখনো ডিভোর্সের কথাটা তুমি আগে তুলেছো, আমি তুলিনি। তুমি ডিভোর্স চাইলে দোষ না, আর আমি ডিভোর্স দিলেই দোষ। তুমি যা চাইছো সেটাই তো দিচ্ছি। তারপরও তোমার কিসের এত সমস্যা? আরো কি চাইছো আমার থেকে?”
মোহিনী কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে থাকলো নিবিড়ের দিকে। হঠাৎ করে নিবিড়ের থেকে একটু দূরত্বে দাঁড়িয়ে দুহাতে নিজের চোখের জল মুছে বলল,
“ডিভোর্সই চাইছি। আর কিছু না। এটা দিয়ে দাও। সারা জীবনে আর কখনো কিছু দিতে হবে না।”
নিবিড় কটকট দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মোহিনীর দিকে। ভেবেছিল মোহিনী হয়তো বলবে ডিভোর্স না দিতে। কিন্তু না, সেই একই কথা ধরে বসে আছে মোহিনী। নিবিড় দাঁত চিবিয়ে বলল,
“ঠিক আছে তাই দেব। যতবার ডিভোর্স চাও ততবারই ডিভোর্স দেবো।”
কথাটা বলে নিবিড় শুয়ে পড়লো বিছানায়। মোহিনীও লাইটটা বন্ধ করে দিয়ে অন্য পাশে শুয়ে পড়লো। মোহিনী চুপচাপ কাঁদছে। নিবিড়ও খুব চেষ্টা করছে যেন চোখ দিয়ে জল না বেরোয়। কিন্তু পারলো না। সেই তো কেঁদেই ফেলল। কিন্তু কাঁদছে কেন? কার জন্য কাঁদছে যে ওর সাথে থাকতে চায় না তার শোকে? মোহিনীর জন্য তো কাঁদা উচিত না নিবিড়ের। নিবিড় তো সবসময় চায় যেন মোহিনী ভালো থাকে। তাহলে বেশ মোহিনী যা চায় তাই দিয়ে দেব ওকে।
___________
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে মোহিনী রান্নাবান্না সব করলো। মিতালী ওকে সাহায্য করলো। অনেক মানুষের রান্না বান্না। আবার রান্নাবান্না শেষে বাচ্চাদেরকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে মোহিনী কে অফিসে যেতে হবে। সেজন্য তাড়াহুড়ো একটু বেশি।
একে একে বাড়ির সবাই উঠে পড়লো। নিবিড়ের আজও ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়ে গেছে। অফিসে যাওয়ার জন্য একেবারে তাড়াহুড়ো বাঁধিয়ে দিল। সকালের নাস্তা করার সময়ও নেই এতটাই তাড়াহুড়োর মাঝে আছে। কোনমতে শুধু তৈরি হয়ে বেরিয়ে যেতে ধরলে বখতিয়ার সাহেব ওকে গম্ভীর গলায় ডেকে উঠলেন।
নিবিড় পিছন ঘুরে ওনার দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত গলায় বলল,
“বাবা, তাড়াতাড়ি বলো কি বলবে।”
বখতিয়ার সাহেব গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“বাড়ি ফিরবে কখন?”
“কেন? প্রতিদিন যখন ফিরি। রাত হয়ে যাবে।”
“আজকের দিনটা কি কোনমতে ছুটি নেওয়া যায় না?”
নিবিড় ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“কিন্তু ছুটি কেন নেব? কি আছে আজ?”
“তোমাদের আলতু ফালতু ঝামেলার জন্য তো আমরা নিজেদের কাজ ফেলে রেখে এখানে বসে থাকতে পারি না। আমার ব্যবসা আছে, চৌধুরী সাহেবের ব্যবসা আছে, নাঈম-মিতালীর চাকরি আছে, বাচ্চাদের স্কুল আছে। তোমাদের এই ঝামেলাটার সমাধান তো করতে হবে আমাদের। এখন তোমরা দুজনেই যদি বাড়িতে না থাকো তাহলে আমরা আলোচনা করব কার সাথে।”
মোহিনীকে বেশ স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। চুপচাপ সবার প্লেটে খাবার বেরে দিচ্ছে তখন। যেন এদিকে কোন খেয়াল নেই। আড়চোখে নিবিড় একবার মোহিনীর দিকে তাকালো। চট করে আবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে বখতিয়ার সাহেবের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“আলোচনা করার মতন আর কি বাকি আছে? জীবনটা যেহেতু আমাদের দুজনের সিদ্ধান্তটা আমাদের দুজনেরই হবে। বিয়ে করার সিদ্ধান্তটাও আমাদের দুজনের ছিল, আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্তটাও আমাদের দুজনেরই। গতকাল রাতেও মোহিনী আমাকে স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে ও আমার থেকে ডিভোর্স চায়। আর আলোচনা করার মতন থাকলো কি তাহলে?”
মোহিনী এবারও কোন উত্তর দিল না। নিবিড় কে নিজের মতন কথাগুলো বলতে দিল। বখতিয়ার সাহেব চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ওদের দুজন কে উদ্দেশ্য করেই বললেন,
“সংসারটা কি নাটক মনে হয় তোমাদের কাছে যে যখন ইচ্ছে হলো বিয়ে করে নিলে আবার যখন ইচ্ছে হলো ডিভোর্স দিয়ে দিলে। সব সময় তোমাদের দুজনের প্রতিটা বিষয়ে তাড়াহুড়ো। দশ বছর আগে যেমন পরিবারের সবার অমতে দুজন পালিয়ে বিয়ে করেছিলে ঠিক এখনো তেমনি সবার অমতে মাতব্বরি করে আবার দুজনে ডিভোর্সের সিদ্ধান্তটা নিয়েছো। তোমরা এতটাই বড় হয়ে গেছো যে বাবা-মার সিদ্ধান্তের আর কোন মূল্য নেই তোমাদের কাছে?”
নিবিড় একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে শান্ত গলায় বলল,
“প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ত যেহেতু আমরা দুজনেই নিয়েছি তাই দোষ আমাদেরই বাবা। আমরা তোমাদের কাউকেই দোষারোপ করছি না। নিজেদের ভালো-মন্দের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার সবারই থাকে। দশ বছর আগে আমাদের মনে হয়েছিল যে আমরা একসঙ্গে থাকলে ভালো থাকবো। আজ দশ বছর পরে আমাদের মনে হচ্ছে আমরা আলাদা থাকলে ভালো থাকবো। ব্যস কথা শেষ।”
নার্গিস বেগম একবার মেয়ের দিকে তাকালেন। মেয়ের এত নির্লিপ্ততা ওনার খুবই অপছন্দ হচ্ছে। যেখানে ওদের তালাকের কথা হচ্ছে সেখানে মোহিনী কিভাবে এতটা শান্ত থাকতে পারে। ওর কি একটুও কষ্ট হচ্ছে না! বাচ্চাদের কথা ভেবেও কি একটুও কষ্ট হচ্ছে না! কোন মেয়েরই তো সংসার ভাঙার কথা উঠলে এতটা শান্ত থাকার কথা না। এতটা স্বাভাবিকভাবে ব্যাপারটা নেওয়ার কথা না। বসা থেকে উঠে মোহিনীর দিকে এগিয়ে গিয়ে শক্ত করে ওর বাহু ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে কটমটিয়ে বললেন ,
“তুই কিছু বলতে পারছিস না? নিবিড় কে গিয়ে বোঝাতে পারছিস না যেন শান্ত হয়? কিসের জন্য ডিভোর্স চাস তুই? কি করবি ডিভোর্স নিয়ে তুই? মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর। সংসার ভাঙতে চলেছে আর তুই এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছিস? কষ্ট হচ্ছে না তোর? বিবেক বুদ্ধি সব কি হারিয়ে ফেলেছিস?”
মোহিনী নির্জীব গলায় বলল,
“ঠিকই বলেছো মা। সব ধরনের অনুভূতি শক্তি আমি হারিয়ে ফেলেছি। আমি যে বেঁচে আছি সেটাও এখন আর অনুভব করতে পারিনা।”
“চুপ কর। আমার কথা কান খুলে শোন, এসব নাটক বন্ধ কর। মান সম্মান থাকলো তোর বাবার? এই সমাজে তোর বাবার কত নাম ডাক। একবার তো পালিয়ে বিয়ে করে সব শেষ করেই দিয়েছিলি। এখন আবার ডিভোর্স দিয়ে আমাদের মান সম্মান ডোবাতে চাচ্ছিস। কোথায় যাবি তুই নিবিড়কে তালাক দিয়ে? বাবা মাকে মা'রা'র ইচ্ছে হয়েছে? তুই জন্ম নিয়েছিস শুধু আমাদেরকে অশান্তি দেওয়ার জন্য তাই না? একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ মোহিনী, যদি তুই নিবিড়ের সাথে সম্পর্ক শেষ করেছিস আমি আর তোর বাবাও কিন্তু তোর সাথে কোন ধরনের সম্পর্ক রাখবো না।”
মোহিনী এবারে আর শান্ত থাকতে পারলো না। নিজেও রাগী গলায় বলে উঠলো,
“অদ্ভুত তো। তুমি শুধু আমার দোষ দিচ্ছো কেন? আমি কি একাই ওর থেকে ডিভোর্স চেয়েছি? ও আমাকে ডিভোর্স দিতে চাইছে না? জীবনটা আমাদের দুজনের মা। আমাদের দুজনকে সিদ্ধান্তটা নিতে দাও। তোমরা কেউ আমার হয়ে সংসারটা করে দিচ্ছো না যে তোমরা আমার পরিস্থিতিটা বুঝবে। আর চিন্তা করো না তোমাদের সাথে আমি সম্পর্ক রাখবো না। কাউকে পরিচয়ও দেবো না তোমাদের মেয়ে হিসেবে। তোমাদের বাড়িতে গিয়ে উঠবোও না। দরকার হলে ম'রে যাবো কিন্তু তবুও তোমাদের আশ্রয়ে গিয়ে উঠবো না।”
মেয়ের কথাবার্তার ধরন শুনে নার্গিস খানম বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলেন। ভীষণ রাগ হলো ওনার মেয়ের উপরে। মেয়েটার মাথা একেবারে খারাপ হয়ে গেছে। নয়তো সুস্থ থাকলে কি আর এসব বলতে পারতো। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মেয়েকে চ'ড় মা'রার জন্য উদ্যত হলেন তিনি। তবে মা'রতে পারলেন না।
নিবিড় বোধহয় অনেকক্ষণ আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিলো ব্যাপারটা। নার্গিস খানম মোহিনীকে চ'ড় মা'রা'র আগেই নিবিড় ওনার হাতটা ধরে ফেলল। মোহিনী কে আড়াল করে দাঁড়িয়ে বলল,
“এসব কি করছেন মা? হাত তুলছেন কেন ওর গায়ে?”
পাশ থেক মিতালী রাগী গলায় বলে উঠলো,
“ওর মাথা থেকে ভূত নামানো দরকার ভাইয়া। মা কে একটু ওর সাথে কথা বলতে দাও। ছোটবেলায় যখন মায়ের হাতে মা'র খেয়ে আমরা নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নিতাম। এখনো ওর ক্ষেত্রে সেই একই কাজটা করতে হবে।”
নিবিড় মিতালীকে একটা ধমক দিয়ে বলল,
“তুই চুপ কর তো। তোকে নিষেধ করেছিনা আমার বউকে নিয়ে আজেবাজে কিছু বলবি না। আমি আপনাকেও বলছি মা, সবাইকেই বলছি। তোমরা আমার গায়ে হাত তোলার তুলেছো, আমাকে বকাবকি করেছো ঠিক আছে। কিন্তু মোহিনীর সাথে এই নিয়ে কেউ লাগবে না। ভুলেও ওর গায়ে হাত দেবে না। আমার পছন্দ না। ওর সঙ্গে যা করার আমি করব। তোমরা কেউ করবে না। আমি এখন অফিস যাচ্ছি। এসে যেন না শুনি তোমরা ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছো। তোমাদেরকেও বলছি তোমরা চলে যাও সবাই। আমাদের ব্যাপারটা আমরা বুঝে নেব।”
সবাইকে কথাটা বলার নিবিড় এবার মোহিনী কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোমার বাড়ি থাকার দরকার নেই। অফিস চলে যাও। ফেরার আগে এরা সবাই চলে যাবে। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে এদের আজেবাজে কথা শোনারও প্রয়োজন নেই, এদের হাতে মা'র খাওয়ারও কোন প্রয়োজন নেই ঠিক আছে? অফিস চলে যাও।”
মোহিনী কে কথাগুলো বলে বেড়িয়ে গেল নিবিড়।
মোহিনী প্রতিটা মুহূর্ত অবাক হয় নিবিড়ের আচরণে। মোহিনী সত্যি ভেবে পায় না কেন ওদের সম্পর্কের এতটা অবনতি হলো। মাঝে মাঝে তো নিবিড় কে দেখে মনে হয় একটুও বদলায়নি। সেই পুরনো নিবিড়ই আছে। এই যেমন সবার থেকে মোহিনী কে আড়াল করে গেল। সবার থেকে মোহিনী কে বাঁচিয়ে গেল। অথচ নিজে ঠিকই কথা শোনাবে। কেন যে ওদের সম্পর্কটা এমন হয়ে গেল তার কোনো কারণই মোহিনী খুঁজে পায় না।