তোমার নামেই গল্প হোক

পর্ব - ৩

🟢

ড্রয়িং রুমের সোফায় পাশাপাশি বসে আছে নিবিড় আর মোহিনী। ওদের সম্মুখে বসে আছে দুজনের মা-বাবা। আর তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে মিতালী আর নাঈম। সম্পর্কে ওরা দুজন স্বামী স্ত্রী। নিবিড় আর মোহিনীর সাথে ওদের দুটো করে সম্পর্ক। মিতালী সম্পর্কে মোহিনীর বোন। ওর আবার বিয়ে হয়েছে নিবিড়ের ভাই নাঈমের সঙ্গে। সেই হিসেবে এখন দুই বোন সম্পর্কে জা।

ভেতরের ঘরে নিশাত আর মাহির সাথে মিতালী আর নাঈমের দুই ছেলে খেলছে। কেননা এমন গুরুতর আলোচনার মাঝে বাচ্চাদের না রাখাটাই ভালো।

নিবিড় আর মোহিনী এখনও জানে না ওদের অপরাধটা কি। কেন ওদের দুজনকে এভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে সকলে মিলে।

বেশ অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর নিবিড়ই আগে জিজ্ঞেস করে উঠলো,

“প্লিজ বলবে হয়েছেটা কি? আমার চিন্তা হচ্ছে। আমরা কি করেছি?”

মোহিনীর বাবা আকরাম চৌধুরী গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,

“তোমরা দুজনে নাকি একে অপরের থেকে ডিভোর্স নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছো? তোমরা নাকি আর একে অপরের সঙ্গে থাকতে পারছ না? এটা কি সত্যি?”

মোহিনী আর নিবিড় দুজনেই চমকে উঠে বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকালো। ওরা যে এই সিদ্ধান্তটা নিয়েছে সেটা তো বাকি কারো জানার কথা ছিল না। ওরা দুজনেই তো দুজনকে বলেনি। তাহলে বাড়ির লোকজন কি করে জানলো? তবে কি নুসরাত খবর দিয়েছিল! তার থেকেও বড় কথা, তার মানে ওরা দুজনই নুসরাত এর কাছে গিয়েছিল ডিভোর্সের ব্যাপারে কথা বলতে। তার মানে ওরা দুজনে এটাই চায়।

মনে তৈরি হওশা প্রশ্নটা মোহিনীই আগে নিবিড় কে করলো।

“তুমি নুসরাতের কাছে গিয়েছিলে আমাদের ডিভোর্সের ব্যাপারে কথা বলতে?”

নিবিড় উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো,

“তুমি নুসরাতের কাছে গিয়েছিলে এই ব্যাপারে কথা বলতে?”

“প্রশ্নটা আগে আমি করেছি তাই উত্তরটা আগে আমার চাই।”

“তুমি আগে প্রশ্ন করেছো জন্য তোমায় আগে উত্তর দিতে হবে তেমনটা না। আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। তারপরে তোমার প্রশ্নের উত্তর পাবে।”

“বললাম তো আগে আমার প্রশ্নের উত্তর চাই। সব সময় তোমার কথাই চলবে না নিবিড়।”

“সব সময় তোমার কথা অনুযায়ীও সব চলবে না মোহিনী। যা বলেছি সেটা চুপচাপ করো।

উত্তর দাও তুমি গিয়েছিলে নুসরাত এর কাছে?”

ওদের দুজনের তর্কাতর্কি দেখে বাড়ির লোকজন তাজ্জব বনে গেল। কতটা অবনতি হয়েছে ওদের দুজনের সম্পর্কের যে বাড়ির লোকজনের সামনে এভাবে তর্কাতর্কি করছে। পরিস্থিতিটা সামাল দেওয়ার জন্য বখতিয়ার সাহেব গর্জে ওঠে দুজনকেই উদ্দেশ্য করে বললেন,

“থামবে তোমরা। সামনে বড়রা বসে আছে ভুলে গেছো সেসব। নিবিড় কি হচ্ছে এসব? কেমন ভাবে তুমি মোহিনীর সঙ্গে কথা বলছো। এত মানুষের সামনে স্ত্রীর সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতে কে শিখিয়েছে তোমায়?”

নিবিড় কিছু বলে ওঠার আগেই পাশ থেকে আকরাম চৌধুরী বলে উঠলেন,

“নিবিড়ের একার দোষ দিয়ে তো কোন লাভ নেই বখতিয়ার ভাই। আমার মেয়ের অধঃপতনও তো আমি খুব ভালোভাবে দেখছি। মোহিনী, এটা কেমন ভাবে তুমি নিবিড়ের সঙ্গে কথা বলছো? স্বামীর সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলা তোমাকে কে শিখিয়েছে?”

এত অপ্রাসঙ্গিক কথায় ভীষণ বিরক্ত হলো মিতালী। বিরক্তিকর গলায় সবাই কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এই শিক্ষা গুলো পরে দিলেও চলবে। যে উদ্দেশ্যে আলোচনাটা উঠেছে সেটা আগে শেষ করবে প্লিজ! আপু তুই বলতো তুই কেন ডিভোর্স চাইছিস? তুই ভাবলি কি করে ভাইয়ার থেকে ডিভোর্সের কথা? তোর থেকে আমি এটা এক্সপেক্ট করিনি।”

মোহিনী মিতালীর দিকে তাকিয়ে মৃদু রাগী ভঙ্গিতে বলল,

“শুধু আমার একার দোষ দিচ্ছিস কেন? শুনলি না তোর ভাইয়াও গিয়েছিলো ডিভোর্সের কথা বলতে?”

চট করে পাশ থেকে নিবিড় বলে উঠলো,

“এবার বুঝতে পারছি আমি কেন নুসরাত আমার কথাটা শুনে অবাক হয়নি। তার মানে আমার আগে তুমি গিয়েছিলে ওখানে তাই না? তুমি আগে গিয়েছো কথাগুলো বলতে, আমি আগে যাইনি। দোষটা তোমার।”

মোহিনী তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“এমন ভাব করছো যে আমি গিয়েছিলাম জন্য তুমিও গিয়েছিলে। কে আগে গিয়েছিলাম সেটা ম্যাটার করেনা। আমার কেউই জানতাম না যে আমরা একে অপরের ডিভোর্সের জন্য গিয়েছিলাম নুসরাতের কাছে। আগে যাওয়াটা বড় বিষয় না। আমরা দুজনেই গিয়েছিলাম এটা বড়।”

থেমে গেল নিবিড়। অযৌক্তিক না মোহিনীর কথাটা। মোহিনী আর নিবিড় কে বাড়ির লোকজন মিলে বিভিন্ন প্রশ্ন করলো যে কেন ওরা ডিভোর্স চায়, কেন হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্তটা নিল, দুটো বাচ্চার কথা কেন ভাবলো না। কিন্তু কেউই কোন উত্তর দিতে পারলো না। আপাতত কারোরই এই নিয়ে কোন কথা বলার ইচ্ছে হচ্ছে না।

একপর্যায়ে গিয়ে বিরক্ত হয়ে দুজনের বাবাই থেমে গেল। নিবিড়ের মা সাজেদা বেগম নিজের বসার জায়গা থেকে উঠে এসে মোহিনীর পাশে বসলেন। মোহিনীর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“কি সমস্যা মা আমায় বল? আমার ছেলের কোন দোষের কারণে তুই এই সিদ্ধান্ত নিতে চাইছিস? আমাদের বল! আমি শাসন করব আমার ছেলেকে। আমি তোকে চিনি। আমি জানি আমার ছেলে তোর কাছে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ। নিশ্চয়ই খুব বড় কিছু হয়েছে তার জন্য তুই এই সিদ্ধান্তটা নিতে বাধ্য হয়েছিস তাই না?”

মোহিনী কোন উত্তর দিতে পারল না। চুপচাপ শুধু শুনে গেল। কি উত্তর দেবে বুঝে উঠতে পারছেনা। এত মানুষের সামনে নিজেদের ব্যক্তিগত ঝামেলা গুলো তুলতেও অস্বস্তি হচ্ছে। পাশ থেকে নিবিড় মৃদু রাগী গলায় ওর মা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমাকেও জিজ্ঞেস করো মা আমার কি সমস্যা। আমার জন্যও মোহিনীগুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাও আমি কেন এই সিদ্ধান্তটা নিলাম সেটা তো জানা দরকার তোমাদের তাই না?”

সাজেদা বেগম শীতল দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“দুজনের কথাই শুনবো। আগে মোহিনীর কথা শুনতে দাও। তুমি চুপচাপ বসে থাকো।”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিবিড় থেমে গেল। সাজেদা বেগম পুনরায় মোহিনী কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি হলো মা বল কি সমস্যা? আমি তোকে কখনো ছেলের বউ হিসেবে দেখিনি। আমি তোকে মেয়ের মতন ভালোবেসেছি। আমি জানি তুইও আমাকে নিজের মায়ের মতন ভালোবেসেছিস। তারপরেও যদি আমাকে বলতে অস্বস্তি হয় তাহলে তোর নিজের মা আছে, বোন আছে ওদেরকে বল। যদি কোন সমস্যা হয়ে থাকে তার সমাধানও অবশ্যই আছে। তাই বলে আলাদা হয়ে যেতে হবে মা! তোর শ্বশুরের সঙ্গে আমার পয়ত্রিশ বছরের সংসার। কত ঝামেলা হয়েছে, কতবার রাগ করে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছি, কতবার ভেবেছি একসঙ্গে থাকবো না। তাই বলে কি আলাদা হয়ে গিয়েছি? আলাদা হয়ে যাওয়াটা সমাধান? তুই থাকতে পারবি নিবিড় কে ছাড়া?”

শেষের বাক্যটা শুনে মোহিনীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। হুট করে মনে হলো পারবেনা নিবিড় কে ছাড়া থাকতে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে পড়ে গেল যে নিবিড়ও ডিভোর্স চায়। তার মানে ও থাকতে চায় না মোহিনীর সাথে।

গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল তাড়াহুড়ো করে মোহিনী মুছে নিয়ে বলল,

“শুধু আমি একা চাই না ডিভোর্স। নিবিড়ও চায়। ও আর আমার সঙ্গে থাকতে চায় না। যখন দুজনেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি যে আর থাকতে পারবো না একসঙ্গে এই নিয়ে কথা বলে কি হবে। যদি চাওয়াটা আমার একতরফা হতো তাহলে না হয় বুঝতাম আমি ভুল করছি। কিন্তু চাওয়াটা যখন দুজনেরই তাহলে নিশ্চয়ই এটাই ঠিক।”

কথাটা বলে মোহিনী উঠে গেল সেখান থেকে। পিছন থেকে ওকে অনেক ডাকলো তবে শুনলো না। সাজেদা বেগম এবার ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

বিজ্ঞাপন

“তুমি বলো তুমি কি বলতে চাও।”

নিবিড় কেন যেন এই কথাটা মেনে নিতে পারছে না যে মোহিনীও গিয়েছিল ডিভোর্সের জন্য। তারমানে মোহিনীও ওর সঙ্গে থাকতে চায় না। মোহিনী ওর সঙ্গে খুশি না। সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“আমি আর আলাদা করে কি চাইবো। সব সময় যা চেয়েছি এখনও তাই চাই। মোহিনী ভালো থাকুক, খুশি থাকুক। সে যদি আমার থেকে আলাদা থাকলে ভালো থাকে তাহলে তাই থাকুক। ডিভোর্সের জন্য যখন ও গিয়েছিল সবকিছু ভেবেচিন্তেই নিশ্চয় গিয়েছিল। আমায় ছাড়া থাকতে পারবে বলেই নিশ্চয়ই গিয়েছিল। তাহলে এই নিয়ে কথা বলে কি হবে? সিদ্ধান্ত তো ও নিয়েই নিয়েছে।”

কথাটা বলে নিবিড়ও চলে গেল সেখান থেকে। কি এক অদ্ভুত অশান্তি তৈরি হলো হঠাৎ করে সংসারে। নিবিড় আর মোহিনী ডিভোর্সের কথা চিন্তা করছে এই দিনটাও দেখতে হলো ওনাদের! কখনো কি কল্পনাও করেছিলেন ওনারা যে এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়তে হবে! কে জানে কি এমন ঝামেলা হয়েছে দুজনের মাঝে যে সরাসরি ব্যাপারটা তালাক অব্দি পৌঁছে গেল।

_________

বিছানার উপর দুহাতে নিজের মাথার চুল খাঁমচে ধরে বসে আছে মোহিনী। মিতালী বিরতিহীনভাবে ঘরের মাঝে পায়চারি করছে আর কিসব যেন বিড়বিড় করছে। বেশ অনেকক্ষণ চুপচাপ মিতালীর এসব বকবক সহ্য করার পর অবশেষে মোহিনী আর সহ্য করতে পারলো না। বিরক্তিকর গলায় বলে উঠলো,

“চুপ করবি প্লিজ! নিবিড়ের হয়ে ওকালতি করার হলে ওর ঘরে গিয়ে কর। আমার ঘরে দাঁড়িয়ে কেন বিড়বিড় করছিস?”

মিতালী ঝাঁঝালো গলায় বলল,

“তুই আমায় বল তোদের দুজনের ঘর কেন আলাদা? তোরা কি প্রেমিক প্রেমিকা যে ঘর আলাদা করেছিস। তোদের বিয়ের দশ বছর হয়ে যাচ্ছে আপু। এতদিনে এসে ঘর আলাদা করছিস! কি বাচ্চামো হচ্ছে এগুলো বলতো আমায়?”

“নিবিড় কে গিয়ে জিজ্ঞেস কর সেটা যে এগুলো কেমন ধরনের বাচ্চামো হচ্ছে। এটা আমাদের ঘর। আমি কি ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছি? বেরিয়ে গেছে তোর আদরের ভাইয়া। ওকে গিয়ে কারণ জিজ্ঞেস কর।”

“জিজ্ঞেস করেছিলাম আমি ভাইয়াকে কারণ। বলেছে তুই নাকি বেরিয়ে যেতে বলেছিলি।”

মোহিনী তেঁতে উঠে বলল,

“আমি তো ওকে বাড়ি থেকেও বেরিয়ে যেতে বলেছিলাম। ও কি বেরিয়েছে? আর একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ তোর ভাইয়া এখন আর আমার এত বাধ্য নেই। আমার কথা ওর এখন সহ্যই হয় না। তাহলে আবার এই কথাটা এত সিরিয়াসলি নিতে গেল কেন? রাগের মাথায় তো মানুষ কত কিছুই বলে। আমি তো এর আগেও ওকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছি। তখন তো বের হয়নি। এখন ওর উদ্দেশ্যই আমার থেকে দূরত্ব তৈরি করা। আমাকে সহ্য করতে পারেনা ও। সে জন্য বেরিয়ে গেছে ঘর থেকে বুঝতে পেরেছিস?”

ঘর থেকে এত চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ পেয়ে ছুটে এলো নাঈম। উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কি হয়েছে মিতালী?”

মিতালী ইশারায় মোহিনী কে দেখিয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,

“আরে কি হয়েছে সেটা তুমি তোমার ভাবিকে জিজ্ঞেস করো। ওরা দুজনে যে ঘরও আলাদা করে নিয়েছে এই ব্যাপারটার সমাধান বাবা মা কি করে করবে? বাবা-মা কে বলবো কি করে এই কথাটা।”

“ওদের ব্যাপার তো ওদেরকে বুঝে নিতে দাও। তুমিই বা আবার এটা নিয়ে কথা বলছো কিভাবে?”

“আরে অদ্ভুত তো! আমরা কি এখানে নাটক দেখতে এসেছি না সমস্যার সমাধান করতে এসেছি? মানে তুমি বলতে চাইছো ওদের থেকে সব সমস্যার কথাগুলো শুনে চুপচাপ আবার চলে যাবো সমাধান না করে? অদ্ভুত মানুষ তুমি! দেখি সরো তো তুমি সামনে থেকে। তোমায় দিয়ে কিচ্ছু হবে না।”

নাঈম কে পাশ কাটিয়ে মিতালী এগিয়ে গিয়ে মোহিনীর পাশে বসে ওকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে শান্ত গলায় বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

“দেখ আপু, পাগলামি করিস না। হয়তো কোন ঝামেলা হয়েছে সেই জন্য ভাইয়া রাগ করে ঘর থেকে চলে গেছে। তুই এক কাজ কর তুই ওই ঘরে চলে যা।”

মোহিনী মিতালীর কথায় তিব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,

“কক্ষনো না। এই ঘর থেকে চলে গিয়ে ও আমায় অপমান করেছে। দূরত্বটা ও তৈরি করেছে। তাই সমাধান ওকেই করতে হবে। ঝগড়াঝাঁটি যাই হয়ে যাক না কেন ও কোন সাহসে ওই ঘরে চলে গেল? আচ্ছা আমি নাহয় সেই এক রাতের জন্য বলেছিলাম চলে যেতে। তাও তো রাগের মাথায় বলেছিলাম। ও তার পরের দিন থেকে কেন আবার এই ঘরে থাকা শুরু করল না? ও কেন তারপর থেকে পার্মানেন্টলি ওই ঘরে থাকা শুরু করলো বলতে পারিস আমায়?”

মিতালী কিছু বলে উঠতে ধরলে নাঈম ওকে থামিয়ে দিয়ে মোহিনীর কথায় সমর্থন জানিয়ে বলল,

“ভাবি একদম ঠিক কথা বলেছে মিতালী। রাগের মাথায় তো তুমিও আমায় মাঝে মাঝে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলো। আমিও তোমায় ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলি। কিন্তু কখনো কি আমরা গিয়েছি? এই ঘর থেকে চলে গিয়ে অন্যায়টা করেছে ভাইয়া।”

নাঈমের কথাটা মিতালী মেনে নিয়ে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে। মানলাম অন্যায় ভাইয়া করেছে। কিন্তু আপু তুই আমায় একটা কথা বল, তুই আর একবারও ভাইয়াকে বলেছিলি এই ঘরে আসার কথা? একবারও কি জিজ্ঞেস করেছিলি কেন এখনও ওই ঘরে থাকছে? করিসনি তো। এটা তোর ভুল। এখন তোরা দুজনেই যদি ভুলগুলো ধরে বসে থাকিস তাহলে কি করে চলবে বলতো। নিশাত আর মাহি সমানে আমায় জিজ্ঞেস করছিল কেন তোদের দুজনকে বাবা-মা বকা দিয়েছে। তোর ছেলে মেয়ে আমাকে নালিশ করছে যে তোরা নাকি সারাদিন শুধু ঝগড়াই করিস। এই দিনও দেখতে হলো! তুই আর ভাইয়া ঝগড়া করছিস এই কথাটা শোনার জন্যই কি আমি বেঁচে আছি!”

মোহিনী বেশ গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,

“তো কে বেঁচে থাকতে বলেছে তোকে? যা ইচ্ছে কর। নিজের জীবনের অশান্তি নিয়ে বাঁচি না এর মধ্যে আবার তুই তোর বাঁচা ম'রা নিয়ে কথা তুলছিস। তোরা যা তো এখান থেকে। সব্বাই এক। তোরা কেউ আমায় বুঝিস না। নিবিড়ের পা ধোঁয়া জল খেয়েছিস তো ওর কাছে গিয়ে বসে থাক। তোদের কারোর প্রয়োজন নেই আমার। ও যখন আমার থেকে ডিভোর্স চায় তাহলে ডিভোর্সটা হবেই।”

মিতালী নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“যা ইচ্ছে তাই কর।”

কথাটা বলে গটগট করে হেঁটে চলে গেল মিতালী। ওর পিছন পিছন নাঈম গেল না। শুধু দরজাটা বন্ধ করে দিলো যেন ওদের দুজনের কথাবার্তার মাঝে কেউ না আসতে পারে।

দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এসে নাঈম মোহিনীর পাশে বসলো। তৎক্ষণাত কিছু জিজ্ঞেস করলো না। মোহিনী বুঝতে পারছে নাঈম ওর সাথে কথা বলতে চাইছে। কিন্তু মোহিনীর যে এই নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। অসহায় গলায় নাঈমের দিকে তাকিয়ে বলল,

“প্লিজ নাঈম এখন আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবি না। আমার ভালো লাগছে না এখন এই নিয়ে কথা বলতে। কিছু জানার থাকলে তোর ভাইকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর।”

“জিজ্ঞেস করেছিলাম ভাইয়াকে। ভাইয়া বলল তোমার থেকে শুনে নিতে। তারপর বাবা, মা গিয়ে কথা শোনালে রাগারাগি করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।”

“ওতো আজকাল পারেই ওই এক কাজ করতে। সংসারের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই ওর। বউ বাচ্চার প্রতি কোন দায়বদ্ধতা নেই। সকালে সূর্য উঠতে না উঠতে অফিসে বেরিয়ে যায় আবার বাড়ি ফেরে মাঝরাতে। দুদিন পর ছেলেমেয়ে নিজের বাবার চেহারা ভুলে যাবে। আমি আমার স্বামীর চেহারা ভুলে যাবো। ও আমায় পাগল করে দেবে।”

কথাটা বলে মোহিনী আবারও দুহাতে নিজের মাথার চুল খামচে ধরলো। মাথাটা ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে। যেন এভাবে একটু চুলটা খামচে ধরলে হালকা একটু আরাম পাচ্ছে। নাঈম মোহিনীর দিকে একটু এগিয়ে বসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,

“শান্ত হও ভাবি। আমরা আছি তো তোমার পাশে। কিন্তু সমস্যাটা কি হয়েছে একটু বলবে আমায়? তুমি যদি কিছু না বলো তাহলে ভাইয়ার সাথে কি নিয়ে কথা বলব বলো?”

মোহিনী একটা লম্বা সাস টেনে অশ্রুসিক্ত নয়নে নাঈমের দিকে তাকিয়ে বলল,

“নিবিড় পাল্টে গেছে। ও আর আগের মতন নেই। ওর মাঝে আমি সেই পুরনো নিবিড় কে আর দেখতে পাই না। হ্যাঁ আমি বলছি না যে ও আমাকে ভালোবাসে না। ও আমাকে এখনো ভালোবাসে আমি জানি। কিন্তু ওর ভালোবাসায় আজকাল আমি কমতি খুঁজে পাই। ও সব সময় দায়িত্ব থেকে পালানোর চেষ্টা করে। ও সব সময় একা থাকার চেষ্টা করে। ও রোজ অফিস থেকে রাত আটটায় বের হয়। আধা ঘন্টার রাস্তায় ওর বাড়ি ফিরতে ফিরতে এগারোটা বা বারোটা পার হয়ে যায়। আমি জানি ও কোন বন্ধুর সাথে আড্ডা দেয় না, ও কোন মেয়ে কলিগের সাথে কোথাও ঘুরতেও যায় না। তাহলে ও বাড়ি কেন ফেরেনা? মানে তো এটাই দাঁড়ায় তাই না আমি ওর কাছে অসহ্যকর হয়ে উঠেছি। ও আমার সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করছে না। আমার মুখ দেখতেও পছন্দ করছে না। তাহলে তুই বল আমি এই সংসারে থেকে করবোটা কি? আমি কি শুধু তিনবেলা রান্না করার জন্য ওকে বিয়ে করেছি? আমি কি শুধুমাত্র ওর ছেলে মেয়েকে মানুষ করার জন্য ওকে বিয়ে করেছি? ওকে ভালোবাসি জন্য, ওর সঙ্গে সারাটা জীবন শান্তিতে কাটাবো বলে বিয়ে করেছি। এখন সেই শান্তি আর কোথাও খুঁজে পাই না।”

“হঠাৎ এমন হওয়ার কারণ কি?”

“সেটা ওই ভালো বলতে পারবে। ওর আসলে একা একা থেকে অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। বেশি মানুষজন পছন্দ করে না। চেঁচামেচি পছন্দ করে না। বাচ্চারা কাঁদলে উল্টাে আমাকে গরম দেখায়। আমি ওর এই ভিন্ন রূপটা সহ্য করতে পারি না নাঈম। ও কেমন খিটখিটে স্বভাবের হয়ে গেছে।”

কথাটা বলে মোহিনী এবার একটু শব্দ করে কেঁদে উঠলো। নাঈম ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলো। তবে মোহিনীর কান্না থামল না। নাঈমের তখন নিজেরই কেমন অসহায় লাগছে। এদের সম্পর্কের ঝামেলা গুলো খুবই সাধারণ। কিন্তু সেই সাধারণ ঝামেলা যেন কেমন প্রকট হয়ে উঠেছে। যেগুলোর সমাধানের কোন পথই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন
তোমার নামেই গল্প হোক গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাংসারিক ও রোমান্টিক গল্প