“বিয়ের দশ বছর পর মনে হচ্ছে আমরা একে অপরের জন্য সঠিক না। আমার ডিভোর্স প্রয়োজন। আমি আর পারছিনা নিবিড়ের সঙ্গে থাকতে।”
মোহিনীর কথাটা শুনে নুসরাতের মাথায় যেন একটা বাজ পড়লো। বিশ্বাসই হতে চাইলো না যে এই কথাটা ওকে মোহিনী বলছে। মোহিনী বলছে নিবিড়ের সঙ্গে আর থাকতে পারছে না এটাও সম্ভব! নুসরাতের কথাটা একদমই বিশ্বাস হলো না।
“তুই মজা করছিস তাই না? তুই নিবিড় এর থেকে আলাদা থাকতে পারবি না মোহিনী। আজেবাজে কথা বলিস না। উল্টোপাল্টা কিছু খেয়ে এসেছিস নাকি? আরে দুটো বাচ্চা আছে তোদের। পাগল হয়ে গেছিস?”
মোহিনী নির্জীব গলায় বলল,
“মজা করার হলে তোর বাড়িতে গিয়ে করতাম। তোর কাজের জায়গায় এসে করতাম না। তুই তো ডিভোর্স লয়ার নুসরাত। একটা ব্যবস্থা করে দে না। যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব করে দে।”
নুসরাতের মাথাটা ঘুরে উঠল যেন। এ যাবত অনেক ডিভোর্স কেস লড়েছে। এই ব্যাপারটা তো নুসরাতের কাছে ভীষণ স্বাভাবিক। প্রত্যেকদিন কত মানুষ ওর কাছে আসে ডিভোর্সের জন্য। কিন্তু কখনো এমন হয়নি। কখনো তো নুসরাত এটা ভাবেইনি যে মোহিনী আর নিবিড়ের ডিভোর্স হতে পারে।
নুসরাত নিজের চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে মোহিনীর পাশের চেয়ারে বসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,
“নিবিড়ের সাথে ঝগড়া হয়েছে? ও আজেবাজে কিছু বলেছে? বাড়িতে কথা বল। নিবিড়ের বাবা মায়ের সাথে কথা বল। যদি কোন সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে তার সমাধানও আছে মোহিনী। কিন্তু ডিভোর্সটা সমাধান না। তোদের ছেলে মেয়ের কি হবে আমায় বলতো?”
মোহিনী নির্জীব দৃষ্টিতে নুসরাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“একসঙ্গে থেকেই বা কি হচ্ছে? রোজ রোজ বাবা মায়ের মাঝে ঝগড়া দেখছে। দেখছে ওদের বাবা মায়ের বন্ডিংটা ঠিক কতটা খারাপ, বোঝাপড়ার কতটা অভাব। এর থেকে ওরা কি শিখবে? ভবিষ্যতে ওরাও নিজেদের জীবন সঙ্গীর সাথে এমন আচরণই করবে।”
নুসরাত এবারে রাগান্বিত গলায় বলল,
“একটা থা'প্প'র দেবো তোকে। গালে একটা চ'ড় পড়লেই ডিভোর্সের ভূত মাথা থেকে এমনি নেমে যাবে। ঝামেলা কোন সংসার হয় না? মা'রা'মা'রি পর্যন্ত হয়। আর কিসের তোদের বন্ডিং খারাপ? তোর আর নিবিড়ের বন্ডিং খারাপ এটা আমায় বিশ্বাস করতে হবে? দেখ মাথা গরম করিস না আমার। বাড়ি যা। নিবিড় কে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ বসে থাক। এমনি সব ঠিক হয়ে যাবে।”
মোহিনী এবারে পাল্টা রাগান্বিত গলায় চিৎকার করে উঠে বলল,
“আমি তোর কাছে এসেছি সাহায্যের জন্য। সাহায্য করলে কর নয়তো বল করতে পারবি না। তোর জ্ঞান শোনার মতন মানসিকতা আমার নেই। আমি আর নিবিড় একে অপরের জন্য সঠিক মানুষ না। বোঝ আমার কথাটা। একে অপরের সঙ্গে থেকে রোজ ঝগড়া ঝাটি করার থেকে, একে অপরকে অসম্মান করার থেকে, কটুকথা শোনানোর থেকে সম্মানের সাথে আলাদা হয়ে যাওয়া অনেক ভালো নুসরাত।”
এবারে যেন হাল ছেড়ে দিলো নুসরাত। এই মেয়ের মাথাটা পুরো খারাপ হয়ে গেছে সেটা বুঝতে আর বাকি রইল না। তবে যে করেই হোক ওকে মোহিনীর মাথা ঠান্ডা করতেই হবে।
এবারে নুসরাত শান্ত গলায় ওকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি তোকে সাহায্য করবো। তার আগে আমায় বল নিবিড়ের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করেছিস? নিবিড়ও কি এটাই চায়?”
“জানিনা।”
“তুই ওর সাথে আলোচনা করিসনি?”
“না।”
নুসরত বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“সিরিয়াসলি মোহিনী! তুই ওর সাথে কোন আলোচনা না করে একা একাই সিদ্ধান্ততা নিচ্ছিস! ভাবতে পারছিস ওর কানে কথাটা গেলে ও কতটা কষ্ট পাবে?”
মোহিনী তাচ্ছিল্য হোসে বলল,
“চিন্তা করিস না। ও এটাই চায়, শুধু বলতে পারছে না। ও মনে মনে এই কথাটাই ভাবছে। আমিও এটাই ভাবছিলাম। দুজনের মধ্যে শুধু পার্থক্য এটাই ও কোন পদক্ষেপ নিচ্ছেনা, আমি নিচ্ছি।”
রাগে নুসরাতের মাথায় আ'গু'ন জ্ব'ল'ছে ঠিকই। তবে মোহিনীর সামনে সেসব প্রকাশ করা যাবে না। কেননা এখন যদি নুসরাত রাগারাগি করে তাহলে মোহিনী হয়তো ওর কাছ থেকে চলে যাবে। ডিভোর্স লয়ার তো আরো অনেক পেয়ে যাবে। সেসব হতে দেওয়া যাবে না। যে করেই হোক ওদের ডিভোর্সটা আটকাতেই হবে।
লম্বা একটা শ্বাস টেনে বলল,
“ডিভোর্সের কারণ কি? কেন ডিভোর্স চাস ওর থেকে? ও কি পরকীয়া করছে?”
মোহিনী তৎক্ষণাৎ উত্তরে বলল,
“কখনোই না। নিবিড় কেন পরকীয়া করতে যাবে? ও এমন ছেলে না। খবরদার নুসরাত ওর চারিত্রিক বিষয়ে কোনো বাজে কথা তুই উল্লেখ করবি না।”
নুসরাত মাথা নাড়িয়ে মোহিমীর কথায় সম্মতি জানিয়ে বলল,
“ঠিক আছে করব না। তাহলে আর কি সমস্যা হতে পারে। ও তোর গায়ে হাত তোলে? অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে?”
মোহিনী এবারে বিরক্তিকর গলায় বলল,
“কি যা তা বলছিস। আমার সামান্য হাত কেটে গেলেও নিবিড় অস্থির হয়ে যায় আর ও আমার গায়ে হাত তুলবে! একটা ফুলের টোকা অব্দি লাগতে দেয় না। আর আমাদের মাঝে ঝগড়া হয় ঠিকই কিন্তু ও কখনো আমায় গালাগালি করে না। এমন ছেলে নিবিড় না।”
“তাহলে কি সমস্যা? তুই চাকরি করিস সেটা নিয়ে সমস্যা? তুই ক্যারিয়ারে ওর থেকে এগিয়ে যাচ্ছিস এটা ওর পছন্দ হচ্ছে না? হিংসা করছে ও তোকে? নাকি তোর কোন ছেলে কলীগের সাথে ও অযথা তোকে সন্দেহ করছে? নাকি তোরই কারো সাথে সম্পর্ক চলছে?”
মোহিনীর মাথাটা এবারে খারাপ হয়ে গেল। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নুসরাত কে উদ্দেশ্য করে রাগান্বিত গলায় বলল,
“তুই একটা চ'ড় খাবি আমার হাতে। নিবিড় ছাড়া কখনো কোন পুরুষের কথা আমি কল্পনাতেও ভাবতে পারি না। আর নিবিড় আমার উন্নতি দেখে হিংসা করবে এটা কখনোই সম্ভব না। ও সব সময় আমায় সাপোর্ট করেছে। আমি আজ যে পর্যায়ে এসেছি সেটা ওর জন্য। আর ও আমায় সন্দেহ করবে? হাসালি। ও আমাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে।”
নুসরাতও এবার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পাল্টা রাগান্বিত গলায় বলল,
“কোন কিছুই যখন সমস্যা না তাহলে ডিভোর্স চাইছিস কেন? মাথার তার কেটে গেছে? এই বয়সে এসে ভীমরতি হয়েছে? টুকটাক কি না কি ঝগড়া হয়েছে তার জন্য সোজা ডিভোর্স চাইতে চলে এলি? না নিবিড়োর কোন সমস্যা, না তোর কোন সমস্যা, তোদের দুজনের পরিবার এত ভালো, এত সাপোর্টিভ, দুটো মিষ্টি বাচ্চা আছে তোদের। আর এত কিছু রেখে তুই ডিভোর্স চাইতে এসেছিস? সত্যি তোকে আমার কিছু বলার নেই মোহিনী। তোর থেকে এই ইম'ম্যাচিউরিটি আমি কখনোই আশা করিনি। আরে নিবিড় এই কথাটা শুনে কতটা কষ্ট পেতে পারে একবার ভাব। ছেলেটা এখানে এসে কান্নাকাটি জুড়ে দেবে।”
দমে গেল মোহিনী নুসরাতের কথাগুলো শুনে। সত্যিই তো ওর কাছে ডিভোর্স চাওয়ার কি আদৌ কোন যৌক্তিক কারণ আছে? আছে কারণ। তবে সেটা যৌক্তিক কিনা জানে না।
আজকাল আর দুজনের মাঝে স্বাভাবিক কিছু নেই। ওদের মাঝে স্বাভাবিক কথাবার্তা হয় না। হলে ঝগড়া হয়, নয়তো কথাই হয় না। যে যার মত নিজের জীবনে চলছে। কেউ কারো খোঁজ-খবর নেয় না। কেউ কাউকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করে না। ভালো মন্দ কিছু বলে না। কার জীবনে কি সমস্যা, কে কার জীবনে কতটা উন্নতি করলো এই নিয়ে আলোচনা হয় না। নিজেদেরকে দেওয়ার মতন দুজনের কাছেই সময় নেই। দুজনের জীবনেই বিশাল ব্যস্ততা, নয়তো কথা বলার আগ্রহ নেই।
আজকাল দুজনের মাঝে শুধু ঝগড়াই হয়। ঘরটা পর্যন্ত দুজনে বদলে নিয়েছে। ওদের ঝগড়া করার কোন নির্দিষ্ট বিষয় থাকে না। এমনি এক বিষয় নিয়ে ঝগড়া করে। আজকাল দুজনের মাঝে স্বাভাবিক কথাবার্তাও যেন ঝগড়ায় রূপ নেয়। এই কারণগুলো কি যথেষ্ট না ডিভোর্সের জন্য? প্রতিনিয়ত দুজন দুজনকে কষ্ট দিচ্ছে, অপমান করছে, নিজেদের সম্পর্ক কে ছোট করছে। এর থেকে কি আলাদা থাকা ভালো নয়?
মোহিনী কে শান্ত হয়ে ভাবনার জগতে নিমগ্ন হয়ে যেতে দেখে নুসরাত ভাবলো বোধহয় একটু কাজ হয়েছে। আর এই সুযোগটাই ওকে কাজে লাগাতে হবে। মোহিনী কে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে শান্ত গলায় বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“শোন মোহিনী, ডিভোর্স সব সমস্যার সমাধান না। অন্তত তোর আর নিবিড়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তো কখনোই না। তোরা পারফেক্ট কাপল। তোদের দুজনকে দেখে আমরা শিখেছি কিভাবে একে অপরকে ভালোবাসতে হয়। দেখ, আমি বলছি বাড়ি যা। মাথা ঠান্ডা কর। যা সমস্যা হয়েছে নিবিড়ের সাথে সামনাসামনি কথা বলে সেগুলোর সমাধানের চেষ্টা কর। নিজেদের জন্য না হলেও বাচ্চা দুটোর মুখের দিকে তাকিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক করার চেষ্টা কর।”
দীর্ঘ প্রায় আধাঘন্টা যাবত নুসরাত আরো বিভিন্নভাবে অনেক কিছু বোঝালো মোহিনী কে। অনেক কিছু বোঝানো শেষে মোহিনী যেন একটু বুঝলো। অন্তত সাময়িক সময়ের জন্য হলেও মাথা থেকে ডিভোর্সের ভুতটা নামলো। নুসরাত মোহিনী কে বুঝিয়ে বাড়ির পথে পাঠিয়ে দিলো।
মোহিনী সেখান থেকে চলে যেতেই নুসরাত নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে ভাবনার মাঝে পড়ে গেল যে কথাটা নিবিড় কে জানানো উচিত কিনা। নিবিড় কে যদি জানায় তাহলে কি ওদের সাহায্য হবে নাকি সম্পর্কটা আরো খারাপ হয়ে যাবে। এমনও হতে পারে হয়তো ওদের মনে হবে সম্পর্কে এতটাই বেশি দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছে যে এখন তৃতীয় ব্যক্তি কে ওদের মাঝে এসে সব ঠিক করে দিতে হচ্ছে।
বেশ অনেকটা সময় ধরে নুসরাত এসবই ভাবলো। হঠাৎ করে কেবিনের দরজায় কারো টোকা দেওয়ার আওয়াজ পেল। গলা উঁচিয়ে বলল,
“কাম ইন।”
আগন্তুক কে দেখার উদ্দেশ্যে দরজার দিকে তাকাতেই বিস্ময়ে নুসরাতের চোখ কপালে উঠে গেল। নিবিড় এসেছে। কিন্তু কেন? আজই কেন এলো? তাহলে কি মোহিনীকে এখানে ঢুকতে দেখেছিল নাকি বেরিয়ে যেতে দেখেছে? নাকি ওদের দুজনের মাঝে হওয়া কথাগুলো শুনে ফেলেছে? কিন্তু কি করে শুনবে। নিবিড় তো তখন কেবিনে ছিল না।
নুসরাতের এসব ভাবনার মাঝে ওর সামনে চেয়ার টেনে বসে পড়লো নিবিড়। মাথা নিচু করে বসে আছে। চোখ মুখের ভাবভঙ্গি খুবই খারাপ। খুব ক্লান্ত লাগছে। দেখে মনে হচ্ছে বিষন্নতা একেবারে চেপে ধরেছে যেন নিবিড় কে।
নুসরাত নিজেকে স্বাভাবিক করলো। নিবিড়কে এসব বলা যাবে না। ওকে কিচ্ছু বুঝতে দেওয়া যাবে না। বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে একটু হেসে বলল,
“কি রে হঠাৎ করে এখানে এলি যে? এতদিন পর বান্ধবীর কথা মনে পড়লো? ম'র'লেও তো খবর পাবি না।”
নিবিড় মাথা তুলে নুসরাতের দিকে তাকিয়ে চোখমুখে একরাশ বিরক্তি ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,
“তোর কি আমাকে দেখে মনে হচ্ছে যে আমি বেঁচে আছি? আমিই তো ম'রে গেছি, তুই খবর পেয়েছিস? তুই খবর নিয়েছিস যে আমাকে দোষারোপ করছিস? তোরা মেয়েরা এমন কেন রে? সব সময় শুধু ছেলেদেরই কেন সব বিষয়ে দোষারোপ করিস? একটু আমাদের দিকটাও বোঝার চেষ্টা কর।”
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল নুসরাত। সেই সাথে বুঝলো মোহিনীর যেমন মন মানসিকতা ঠিক ছিল না সেই একই অবস্থা নিবিড়েরও। এই ছেলের মাথাও খারাপ হয়ে গেছে। কে জানে আবার কখন মোহিনীর মতন ডিভোর্সের কথা শুরু করে দেয় কিনা।
“কি হয়েছে বল তো আমায়? তোকে এত চিন্তিত লাগছে কেন দেখতে? কোনো সমস্যা হয়েছে?”
নিবিড় জীবনের প্রতি একরাশ বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে বলল,
“জীবনটাই এখন একটা সমস্যা। বেঁচে থাকাটা এখন একটা সমস্যা। সংসার আরো বড় সমস্যা। মোটকথা আমি জন্ম নিয়েছিলাম কেন? আমার জন্ম নেওয়াটাই এখন একটা সমস্যা।”
নুসরাতের কেন যেন মনে হচ্ছে নিবিড় যেকোনো সময় ডিভোর্সের প্রসঙ্গটা তুলবে। ওর আবভাব দেখেই বুঝতে পারছে। মোহিনীর মুখ চোখের অবস্থাও ঠিক এমনই ছিল। ওর কথা বলার ভঙ্গিও ঠিক এমনই ছিল।
নুসরাত যথারীতি নিজের চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে নিবিড়ের পাশের চেয়ারটায় বসে শান্ত গলায় ওকে প্রশ্ন করলো,
“কি হয়েছে আমায় বল? মোহিনী কে নিয়ে আসতে পারতি তো।”
মোহিনীর নামটা শুনতেই নিবিড় তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বলল,
“আমায় একা পছন্দ হচ্ছে না? সব সময় সব জায়গায় মোহিনীকে নিয়ে যেতেই হবে? মোহিনীকেই তোদের সবার প্রাধান্য দিতে হবে? আমি কি মানুষ না? আমি একা এসেছি বলে তোর সমস্যা হচ্ছে? ঠিক আছে সেটা বলে দে আমি চলে যাচ্ছি। আর জীবনেও আসবো না। তোর এখানে আসার আগে মুশতাকের কাছে গিয়েছিলাম মনটা ভালো করার জন্য। শা'লা ওই ও বলে একা কেন এসেছি, মোহিনীকে কেন আনিনি।”
“আরে এত রেগে যাচ্ছিস কেন? আমি তো একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন করেছি? কি হয়েছে তোর সত্যি করে বলতো আমায়? মোহিনীর উপর এত রেগে আছিস কেন? ঝগড়া করেছিস দুজনে?”
লম্বা কয়েকটা শ্বাস টানলো নিবিড়। ডেস্কের ওপর কিছুক্ষণ মাথাটা এলিয়ে দিয়ে রাখলো। নুসরাত তাড়া দিলো না। বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর নিবিড় সোজা হয়ে নুসরাতের দিকে ঘুরে বসে বলল ,
“তুই তো ডিভোর্স লয়ার। আমার আর মোহিনীর ডিভোর্সের ব্যবস্থা কর। যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব ততটা তাড়াতাড়ি।”
ঠিক এই কথাটা শোনার অপেক্ষাতেই যেন নুসরাত ছিল। ওর অবাক হওয়া উচিত কিনা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা। ওর মন বলছিল যে নিবিড় যেকোন সময় এই কথাটা বলবে। আর ঠিক তাই হলো। এদিকে নুসরাত কে চমকাতে না দেখে নিবিড়ের কেন যেন একটু সন্দেহ হলো ব্যাপারটা। ভ্রুঁ কুঁচকে সন্দেহী গলায় বলল,
“চমকালি না যে? মোহিনীর সাথে তোর কথা হয়েছে নাকি কয়েকদিনের মাঝে?”
ধ্যান ভাঙালো নুসরাতের। তড়িঘড়ি করে বলল,
“না। ওর সাথে কথা হয়নি আমার। সেসব কথা বাদ দে। তার আগে তুই বল তুই এসব কি বলছিস? ডিভোর্স কোন সমাধান হলো নিবিড়? তুই তো মোহিনীর সাথে এই বিষয়ে কোনো আলোচনাও করিসনি। এই খবর ওর কানে গেলে ওর উপর দিয়ে কি ঝড় বয়ে যাবে বুঝতে পারছিস?”
নিবিড় সন্দেহি দৃষ্টিতে নুসরাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই কি করে বুঝলি ওর সাথে আমি কোন আলোচনা করিনি?”
নুসরাত নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
“আরে ওর সাথে আলোচনা করলে ও নিশ্চয়ই আমাকে জানাতো। এত বড় একটা খবর তো লুকিয়ে রাখত না।”
স্বাভাবিকভাবে নিলো নিবিড় কথাটা। আবারো কেমন যেন উদাস হয়ে গিয়ে বিষন্ন গলায় বলল,
“আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়াটাই বোধহয় উচিত। একসঙ্গে আমরা ভালো নেই। দশটা বছর একসঙ্গে কাটিয়ে দিলাম। তবে শেষ কয়েকটা বছর একদমই ভালো কাটছে না। আমাদের মাঝে কিচ্ছু ঠিক নেই। আমরা আর একে অপরকে বুঝতে পারি না। আমরা আর একে অপরের হাসির কারণ হয়ে উঠতে পারিনা।”
“এগুলো ডিভোর্স চাওয়ার কারণ? এগুলো কোন যৌক্তিক কারণ বলে তোর মনে হয়?”
নিবিড় একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“আরো অনেক কারণ আছে।”
নুসরাত এবারে কিঞ্চিত রাগান্বিত গলায় বলল,
“আর কি কারণ আছে? তুই পরকীয়া করিস না তোর বউ পরকীয়া করে? কেননা এটাই এখন ডিভোর্সের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের সমাজে।”
নিবিড় ঘৃণা ভরা কন্ঠে বলল,
“ছিঃ! পরকীয়া আবার কেউ করে নাকি। আর তোর সাহস কি করে হলো মোহিনী কে নিয়ে এই ধরনের কথা বলার? সেই কলেজ জীবন থেকে ও আমি বাদে কারো দিকে চোখ তুলেও তাকায়না প্রয়োজন ব্যতীত।”
“তাহলে আর কি সমস্যা? তোকে ঠিকমতো তিনবেলা রেঁধে খাওয়ায় না? তোর বাচ্চাদের যত্ন করেনা নাকি দিনরাত তোর মায়ের সাথে ঝগড়া করে? নাকি তোকে তোর পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখতে দেয় না? নাকি তোর সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে কিছু চায় যেগুলো তোকে ভালো থাকতে দিচ্ছে না?”
নিবিড় বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,
“কি যা তা বলছিস। তুই না ওর বান্ধবী। নিজের বান্ধবীর সম্পর্কে নোংরা নোংরা কথাগুলো বলতে একবারও তোর বিবেকে বাঁধছে না? ও বাড়ি আর অফিস দুটোই সমান ভাবে সামলায়। ওর মতন যত্ন করে সংসার করতে আমি আর কোন মেয়েকে দেখিনি। আমার মাকেও দেখিনি। আর আমার মায়ের সাথে করবে ও ঝগড়া? আরে ওরা দুজনে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। কি যে আবোল তাবোল বলিস না।”
নুসরাত এবার বেশ জোরে নিবিড়ের বাহুতে একটা কিল বসিয়ে বলল,
“তাহলে কি জীবনে অশান্তি তৈরি করার জন্য ডিভোর্স চাইতে এসেছিস? ইচ্ছে তো করছে থা'প'ড়ি'য়ে গাল লাল করে দিতে। বেরিয়ে যা তো তুই এখান থেকে। তোর মুখও দেখতে ইচ্ছে করছে না। যত সব আজগুবি বায়না নিয়ে চলে আসে। আরে আমি ডিভোর্স লয়ার জন্য কি যখন তখন যে কোন কারণে ডিভোর্স চাইতে চলে আসবি? মগের মুল্লুক। যা এখান থেকে। আমার আরো অনেক কাজ আছে।”
একটু অপমানিতই হলো নিবিড়। না হয় একটু সাহায্য চাইতেই এসেছিল। তাই বলে এভাবে তাড়িয়ে দেবে। ওর কি কোন মান সম্মান নেই। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পাল্টা রাগী গলায় বলল,
“ঠিক আছে ঠিক আছে চলে যাচ্ছি। এত ভাব দেখাতে হবে না। সাহায্য চাইতে এসেছিলাম করলি না তো ঠিক আছে। পৃথিবীতে আরো অনেক উকিল আছে। যত্তসব।”
সঙ্গে সঙ্গে নুসরাত জিভে কামড় বসালো। বুঝলো ভুল করে ফেলেছে। এইভাবে বলাটা উচিত হয়নি। নিবিড় যেতে ধরলে তাড়াহুড়ো করে উঠে গিয়ে ওর হাত টেনে ধরে অপরাধী গলায় বলল,
“আচ্ছা সরি। চলে যাচ্ছিস কেন? আরে রাগের মাথায় বলে ফেলেছি।”
নিবিড় এক ঝটকায় নুসরাতের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“ছাড়তো। তোদের মেয়ে মানুষকে নিয়ে এই এক জ্বালা। কথাবার্তার কোন লাইন নেই তোদের। যখন যা মুখে আসে তাই বলে দিস। সারাদিন শুধু তোরা ছেলেদের মাথার উপরে উঠে বসে নাচতে চাস। তোর মুখও দেখতে ইচ্ছে করছে না আমার।”
নিবিড় এখন যতই অপমান করুক না কেন তবুও নুসরাতের সে কথাগুলো ধরলে চলবে না। মোহিনীকে যেমন বুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়েছে এই ছেলেটাকেও সেভাবে বুঝিয়ে বাড়ি পাঠাতে হবে। শান্ত গলায় বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে ভুল হয়ে গেছে আমার। আর এভাবে বলবো না। কিন্তু আমার কথাটা শুনে যা। ডিভোর্সের ভুত মাথা থেকে নামিয়ে ফেল। নিশাত আর মাহির কি হবে বলতো? ওরা দুজনে এখনো ছোট। এই বয়সে যদি তোরা মা-বাবা আলাদা হয়ে যাস ওদের উপরে কতটা বাজে প্রভাব পড়বে বুঝতে পারছিস?”
“একসঙ্গে থেকেও ভালো প্রভাব পড়ছে না ওদের উপরে। বাড়িতে একসঙ্গে থাকলে সারাদিন মা-বাবা কে ঝগড়াই করতে দেখছে ওরা আজকাল। কি ভালো প্রভাব পড়ছে এতে? তুই আমায় বল ওরা কি শিখছে আমাদের থেকে? ভবিষ্যতে তো ওরাও নিজেদের জীবনসঙ্গীদের সাথে এভাবে ঝগড়াই করবে তাই না? একসঙ্গে থেকে যখন ভালো কিছু শিক্ষা দিতে পারছি না তাহলে একসঙ্গে থেকে কি করবো? এর থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া ভালো।”
নুসরাতের ভীষণ রাগ হচ্ছে। দুজনের কথার ধরন একই। কেউ কাউকে নিয়ে খারাপ কিছু বলতেও দেবে না। অথচ চলে এসেছে ডিভোর্স চাইতে। নুসরাত এই কথাটাই বুঝতে পারছে না হঠাৎ করে এদের মাথায় এই ভুতটা চাপালো কে।
বেশ অনেকটা সময় ধরে নুসরাত নিবিড় কে বুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। আরেকটু ভাবতে বলল। যাওয়ার আগে মোহিনীর সঙ্গে আলোচনা করতে বলল এই ব্যাপার নিয়ে। কি ভেবে যেন নিবিড় চুপচাপ সায় জানিয়ে চলে গেল সেখান থেকে।
নুসরাত পড়ে গেলে এবারে মহা ঝামেলায়। কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। কাকে জানাবে সেটাও বুঝতে পারছে না। সবশেষে অনেক কিছু ভাবনা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিলো দুজনের পরিবারকে এই কথাটা জানানো দরকার। একমাত্র পরিবারই পারবে ওদের মাথা থেকে ডিভোর্সের ভুতটা নামাতে।