জুন মাসের প্রখর সূর্যের তাপ যেন চারদিক জ্বালিয়ে দিচ্ছে। দুপুরের আকাশ ফেটে বের হয়েছে আগুনরঙা রোদ। মাথার ওপর সূর্য দাঁড়িয়ে আছে একদম মাঝনদীতে নোঙর ফেলা জাহাজের মতো, অচল, দাউ দাউ করে জ্বলছে। গরমে মানুষের অবস্থা শোচনীয়, ঘাম আর ক্লান্তিতে কাহিল মুখগুলোতে অস্বস্তির ছাপ। বাতাসে যেন আগুনের পরশ, কোথাও নেই এক চিলতে শীতলতা।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের পাহাড়ি অঞ্চল। রুমা ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার, বান্দরবান। ঘন সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে স্থাপিত সেই বেসক্যাম্পের সামনে সারি সারি সৈনিক দাঁড়িয়ে আছে নিস্তব্ধভাবে।চারপাশে টানটান উত্তেজনা। প্রত্যেকে অপেক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ করো আগমনের।
হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এল ইঞ্জিনের গর্জন। ধুলো উড়িয়ে বেসক্যাম্পে প্রবেশ করল একটি আর্মি জিপ। মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশে শৃঙ্খলার শীতল শ্বাস। জিপের দুই পাশে দরজা খুলে নেমে এলো দুজন ত্রিশ বছর বয়সী তাগড়া যুবক, দুজনেই ইউনিফর্মে মোড়ানো, দৃঢ়চেতা, আত্মবিশ্বাসে ভরা।
ডান পাশের দরজা থেকে নামলেন এক সৈনিক, প্রায় ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতা। চুল গুলো এমন ভাবে কাটা যেন নিখুঁত যত্নে আঁকা এক শিল্পকর্ম, উপরে সামান্য ঘন, হালকা উঁচু হয়ে দাঁড়ানো, আর পাশে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেছে ত্বকের সাথে। মুখে হালকা দাড়ির রেখা, না খুব ঘন, না একেবারে ছেঁটে ফেলা, যেন অনিচ্ছুক এক বিদ্রোহের মতো নীরবে মুখের চারপাশে বসে আছে। চোয়ালের ধার ঘেঁষে ছড়িয়ে থাকা দাড়ি তার মুখের গঠনে এনে দিয়েছে এক কঠিন অথচ শান্ত সৌন্দর্য। গায়ের রং সোনালি-উষ্ণ, সূর্যছোঁয়া। মনে হয়, রোদে পোড়া নয়, বরং রোদের সাথে মিশে যাওয়া। সেই রঙে আছে জীবন, পরিপক্বতা আর একটু নীরব অহংকার। চোখে কালো সানগ্লাস, হাতে বিশ্বের অন্যতম দামী ঘড়ি। তার ইউনিফর্ম শরীরের সঙ্গে এমনভাবে লেগে আছে যেন পোশাক নয়, একখণ্ড শৃঙ্খলা। মাংসপেশির প্রতিটি রেখা যেন বলে দেয়, এ মানুষ যোদ্ধা। সব মিলিয়ে সে যেন এক নিরব, অথচ গভীর চরিত্রের প্রতিচ্ছবি।
সে এগিয়ে এলো আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে। সূর্যের আলোয় চোখের সানগ্লাসটা খুলে নিলো, আর তখনই দেখা গেলো ডান ভ্রু থেকে চোখের নিচ পর্যন্ত কাটা দাগটি, যেন যুদ্ধের স্মারক। বাদামি চোখের মণিতে রোদের প্রতিফলনে আগুনের মতো জ্যোতি। তার উপস্থিতিতেই সৈনিকদের সারি যেন সজীব হয়ে উঠল। মুহূর্তেই ধ্বনি উঠলো সমস্বরে—
-"লেফটেন্যান্ট কর্নেল A-nova!"
জিপের বাম পাশ থেকে নামলেন আরেকজন, বলিষ্ঠ দেহ, প্রায় ছয় ফুট উচ্চতা, ধবধবে ফর্সা গায়ের রং। তাকে দেখলে মনে হয় বিদেশি কোনো সেনানায়ক। মুখে হালকা চাপ দাড়ি, চোখে সানগ্লাস, চুল নিখুঁতভাবে পরিপাটি। একই ঘড়ি ঝলসে উঠছে তার কব্জিতে। যেনো বন্ধুত্বের প্রতীক সেই ঘড়ি। তার পদক্ষেপের ভঙ্গি, দেহের দৃঢ়তা, সব কিছুতেই শাসনের আভিজাত্য। তাকে দেখেও আরেক দল সৈনিকের গলা কাঁপল গর্বে—
-"মেজর CipherX!"
সূর্য তখনও মাথার ওপর দাউ দাউ করে জ্বলছে, কিন্তু সেই প্রখরতার মাঝেও যেন ঠান্ডা এক দৃঢ়তা ছড়িয়ে পড়ল পুরো বেসক্যাম্পে। যুদ্ধের ময়দানে দুজন কিংবদন্তির আগমন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল A-nova এবং মেজর CipherX।
সৈনিকদের এই উল্লাস দেখে দুই বন্ধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে উঠল। সেই হাসিতে ছিল এক অদৃশ্য বন্ধনের গল্প, যে বন্ধন গড়ে উঠেছে যুদ্ধের মাঠে, ঘামে, রক্তে আর অনন্ত বিশ্বাসে।
মুহূর্তের মধ্যেই বেসক্যাম্প যেন প্রাণ ফিরে পেলো। শত শত সৈনিক ছুটে এসে ঘিরে ধরল তাদের দুজনকে। আনন্দে উচ্ছ্বাসে তারা লেফটেন্যান্ট কর্নেল A-nova ও মেজর CipherX-কে তুলে নিলো নিজেদের কাঁধে, কারও হাতে, কারও মাথার ওপর।
চারপাশে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে একই দুই নাম—
-"A-nova! CipherX! A-nova! CipherX!"
পাহাড়ের বুক কাঁপিয়ে সেই ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল দূর পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত। যেন প্রকৃতিও জানিয়ে দিল, দুজন কিংবদন্তি ফিরে এসেছে তাদের ঘরে।
সৈনিকদের উল্লাস ধীরে ধীরে স্তিমিত হলো। কিছুক্ষণ পর দুজন যোদ্ধাকে নামিয়ে দেওয়া হলো মাটিতে। তারা এখনো হাসছে, একটা ক্লান্ত, কিন্তু আত্মবিশ্বাসে ভরা হাসি। সূর্যের নিচে তাদের চোখে লুকিয়ে আছে অদৃশ্য আগুন। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ালেন একজন গম্ভীর মুখের কর্মকর্তা— কর্নেল রায়হান মাহমুদ, রুমা ব্যাটালিয়নের সিনিয়র অফিসার। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, গায়ের রং চাপা, কিন্তু দৃষ্টি তীক্ষ্ণ ও কর্তৃত্বময়। কপালের মাঝখানে গভীর ভাঁজ, যেন অভিজ্ঞতার ছায়া।
তিনি হালকা গলায় বললেন—
-"Enough of the hero’s welcome, gentlemen. এবার আমার কেবিনে আসো, ব্রিফিং বাকি আছে।"
A-nova ও CipherX একে অন্যের দিকে তাকিয়ে হেসে মাথা নাড়ল। দুজনেই জানত, উৎসবের পরই শুরু হয় কাজের সময়।
.
রুমা ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার – কর্নেল রায়হান মাহমুদের কেবিন। কেবিনটা কাঠ আর পাথরের মিশেলে তৈরি, দেয়ালে ঝুলছে মানচিত্র, পাহাড়ি এলাকার টপোগ্রাফিক চার্ট, আর সামরিক চিহ্নে ভরা বোর্ড। জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে পাহাড়ি বাতাস আর গাছের পাতার ছায়া।
দরজাটা খুলতেই একঝলক পরিচিত গন্ধ নাকে এল, গানপাউডার, ঘাম, আর পুরনো কাঠের গন্ধ। ভেতরে আগে থেকেই বসে আছে পাঁচজন দক্ষ সৈনিক,
কেউ স্নাইপার রাইফেল পলিশ করছে, কেউ ল্যাপটপে ডেটা এনালাইসিস করছে, কেউ আবার যোগাযোগ যন্ত্র ঠিক করছে। এরা সবাই "শ্যাডো ইউনিট" এর সদস্য, বাংলাদেশ আর্মির গোপনতম ও সবচেয়ে বিশেষায়িত টাস্কফোর্স। পাঁচজন মানুষ, যারা একসময় তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। পাঁচ জনই উঠে এসে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য। হাসির ঝলক যেন এক মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল ঘর জুড়ে।
-"A-nova, তুমি বেঁচে আছো নাকি রোবট বানায় ফেলেছে আর্মি তোমাকে!" চিৎকার করে উঠল দলের স্নাইপার রায়েদ, চোখে দুষ্টুমি।
CipherX হেসে উত্তর দিল—
-"রোবট নয় রে, আপগ্রেডেড ভার্সন, এখনও আগের মতোই বুলেট ধরতে পারে হাতে।"
হাসির শব্দে কেবিন গমগম করে উঠল। রিকন স্পেশালিস্ট তাসিন এগিয়ে এসে হাত মেলালো—
-"চার বছর পর আবার একই ছাদের নিচে! Shadow Unit আবার একসাথে, can’t believe this!"
তার পাশ থেকে ফিল্ড ফাইটার ঈশান হেসে বলল—
-"তোমাদের ছাড়া Shadow Unit মানে ছিল একদম নিঃশব্দ বেস। এখন আবার আগুন লাগবে!"
আরিয়ন, যিনি ইউনিটের টেক সাপোর্ট ও মাইন এক্সপার্ট, ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
-"আচ্ছা বলো তো, এতদিন কোথায় ছিলে? রেডিও সিগন্যালেও নাম পাওয়া যেত না।"
A-nova মুচকি হেসে জবাব দিল—
-"Shadow তো আলোয় চলে না, আরিয়ন। সময় হলে নিজেরাই ফিরে আসি।"
সবাই হেসে উঠল। কেউ পিঠে চাপড় মারছে, কেউ চোখ মুছছে। কমিউনিকেশন এক্সপার্ট আরিবা চোখে হালকা জল নিয়ে বলল—
-"তোমরা ফিরে আসবে ভেবেছিলাম... কিন্তু এইভাবে আবার সবাই মিলে বসব, সেটা কল্পনাও করিনি।"
A-nova চারদিকে তাকিয়ে ধীরে বলল—
-"সবাইকে একসাথে দেখা, feels like home."
এক মুহূর্তের জন্য কেবিন ভরে গেল হাসি আর স্মৃতির গন্ধে। তারপর সেই হাসি থামিয়ে কর্নেল রায়হান মাহমুদ গম্ভীর গলায় বললেন—
-"Alright, emotional reunion শেষ করো। এখন কাজের কথায় আসো।"
রায়হান মাহমুদ গলায় এক ধরনের দৃঢ়তা নিয়ে বললেন—
-"তোমরা জানো কেন এখানে এসেছো। অপারেশন 'সীমানা শুদ্ধি' এটাই আমাদের পরবর্তী মিশন।"
তিনি টেবিলের ওপর মানচিত্র বিছিয়ে দিলেন। পাহাড়ি সীমান্তের আঁকাবাঁকা রেখাগুলো যেন নিঃশব্দে বলছে, এখানেই শুরু হবে নতুন ইতিহাস।
-" দক্ষিণ সীমান্তে নতুন করে সক্রিয় হয়েছে এক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক। তারা অস্ত্র পাচার করছে পাহাড়ি পথ ধরে। সরকার সরাসরি চায়, এই রুটটা চিরতরে বন্ধ হোক।"
CipherX চোখ তুলে তাকাল—
-"Target location confirmed, sir?"
রায়হান মাথা নাড়লেন—
-"Confirmed. তোমরা দুজন এই মিশনের লিড। A-nova গ্রাউন্ড অপারেশন তোমার হাতে। CipherX, কমিউনিকেশন ও এয়ার সাপোর্ট তোমার কন্ট্রোলে থাকবে।"
A-nova ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলল—
-"Understood, sir. Shadow Unit’s back in the game."
CipherX চেয়ারে হেলান দিয়ে ফিসফিস করল—
-"Let’s clean the borders... once and for all."
রায়হান মাহমুদ তাদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন—
-"অপারেশন 'সীমানা শুদ্ধি'। নেতৃত্ব দেবে তোমরা দুজন, A-nova ও CipherX। বাকি সবাই তোমাদের সাপোর্ট করবে স্নাইপিং, রিকন আর কমিউনিকেশনে।"
A-nova সামান্য ঝুঁকে বলল—
-"Understood, sir. Shadow Unit reporting for duty."
রায়হান মাহমুদ তাকিয়ে বললেন—
-"চার বছর আগে তোমরা ছিলে সীমান্তের ছায়া। এবার সেই ছায়ারা আবার নেমে আসবে.. দেশের জন্য।"
কেবিনের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। সবাই জানত, এ হাসি, এ উচ্ছ্বাসের আড়ালেই অপেক্ষা করছে আগুন, ধোঁয়া, আর গুলির প্রতিধ্বনি।
.
নূরাইসা এখন আবার ভার্সিটিতে যাতায়াত শুরু করেছে। বিরতির পর সে ফিরে এসেছে তার চেনা পৃথিবীতে। বন্ধুরা যেনো হারানো কাউকে ফিরে পেয়ে এক মুহূর্তের জন্যও তাকে একা ছাড়ে না। হাসি, গল্প, আড্ডায় ভরে উঠেছে তাদের প্রতিটি দিন। ফারাহ্ আর নূরাইসা বাংলা সাহিত্য বিভাগে পড়ে, আর আফরিন কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্রী। তাই একসাথে ভার্সিটিতে এলেও একসাথে সময় কাটানোটা এখন খুব কঠিন হয়ে গেছে।
আজ তারা সবাই জড়ো হয়েছে বিকেলের নরম আলোয় ভেসে থাকা ভার্সিটির মাঠে। আকাশে সোনালি রোদ, হালকা বাতাসে চুল উড়ছে, দূরে ক্যান্টিনের চায়ের গন্ধ এসে মিশে যাচ্ছে তরুণতার অস্থির নিঃশ্বাসে। চারপাশে হাসির গুঞ্জন, অথচ এই হাসির মাঝেও এক অদৃশ্য উত্তেজনার স্রোত বইছে, বিষয়টা মেঘের প্রেম কাহিনী।
আফরিন হঠাৎ মুখ টিপে হেসে বলল—
-"সিনিয়র ভাইয়া তোকে প্রপোজ করেছে, তুই কি উত্তর দিলি রে?"
মেঘ একটু থেমে, চোখ নামিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে বলল—
-"আমি এখনো কোনো উত্তর দিইনি তাকে।"
ফারাহ্ পাশ থেকে ঠোঁট বাঁকিয়ে কৌতুকের সুরে বলে উঠল—
-"তুই কি পছন্দ করস সাব্বির ভাইয়াকে?"
মেঘের মুখে ফুটে উঠল এক লাজুক হাসি। চোখের কোণে লাজের আলো চিকচিক করে উঠল।
সে ধীরে, প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল—
-"হ্যাঁ!"
এই ছোট্ট স্বীকারোক্তিই যেন চারপাশের হাওয়া ভারী করে তুলল। পাশে বসে থাকা আশিকের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। কলিজা কেঁপে উঠল হঠাৎ, যেন কেউ এক মুঠো আগুন ছুঁড়ে দিয়েছে তার বুকে। তার চোখ থেমে রইল মেঘের মুখে, ওই লাজুক হাসিটা যেন ছুরি হয়ে বিঁধছে তার ভেতরটায়।
মেঘ তখনও সাব্বিরের প্রশংসায় মেতে আছে। তার চোখে একরাশ উচ্ছ্বাস, মুখে অনাবিল উজ্জ্বলতা। আশিকের ধৈর্য তখন ভেঙে যাচ্ছে বিন্দু বিন্দু করে। অবশেষে সে আর সহ্য করতে না পেরে, গলাটা ভারী করে, চেঁচিয়ে বলে উঠল—
-"সব প্রশংসা করেই ফেললি! ও যে একটা প্লেবয়, সেটা বললি না?"
এক মুহূর্তে মাঠের গুঞ্জন থেমে গেল। বাতাস যেন থমকে দাঁড়াল। সবাই বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল আশিকের দিকে। কারণ আশিক, যে ছেলেটা কখনো রাগ করে না, কখনো মেঘের ওপর উচ্চস্বরে কথা বলে না, আজ তার কণ্ঠে রাগের ঝড়।
মেঘ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, তারপর রাগে চোখ লাল করে উঠে দাঁড়াল—
-"না জেনে কথা বলবি না, আশিক!"
আশিকের কণ্ঠে এবার তীব্র কাঁপন,
-"না জেনে কি? গিয়ে খোঁজ নে তোর সখের পুরুষের চরিত্রের! মেয়েদের টিস্যুর মতন ব্যবহার করে ফেলে দেয়। মেয়ে জাতি ওর কাছে ভোগের পণ্যের মতন!"
মেঘ চিৎকার করে উঠে দাড়ালো। আশিকের গালে এক চড় মেরে বলে উঠলো—
-"একদম ফালতু কথা বলবি না আশিক। তোর কাছে কোনো প্রমাণ আছে?"
আশিক গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলো। চারদিক স্তব্ধ। শুধু বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে আশিকের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি, আর কোথাও মেঘের আশিককে মারা চড়ের প্রতিধ্বনি। এই মাঠ, এই বিকেল, এই আড্ডার হাসির মাঝেও এখন ভাসছে এক অদৃশ্য বেদনার গন্ধ, যেন ভালোবাসা নিজেই লজ্জায় মুখ ঢেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
মুহূর্তেই দু’জনের মধ্যে তর্কটা এমনভাবে জ্বলে উঠল যেন শুকনো খড়ে আগুন পড়েছে। মেঘের চোখে ক্ষোভ, আশিকের চোখে জ্বালা, আর চারপাশের পরিবেশটা এক নিমিষেই ভারী হয়ে উঠল। হাসির মাঠে এখন শুধু উত্তেজনার ভারী নিঃশ্বাস।
নূরাইসা চুপচাপ সবকিছু লক্ষ্য করছিল। মুখে কিছু না বললেও তার চোখে ফুটে উঠেছিল একরাশ অস্বস্তি। অবশেষে সে নাদিমের দিকে তাকিয়ে আলতো করে ইশারা করল—
-"ওকে নিয়ে যা, এখনই।"
নাদিম আর কিছু না বলে আশিকের কাছে গিয়ে ধীরে ধীরে তাকে টেনে নিয়ে গেল। আশিক প্রথমে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু নূরাইসার দৃষ্টি দেখে থেমে গেল। কেবল মেঘের দিকে একবার তাকাল, তারপর মাথা নিচু করে চলে গেল মাঠের প্রান্তে।
বাতাসে একরকম নিস্তব্ধতা নেমে এলো। ফারাহ্, আফরিন আর স্মৃতি ছুটে গিয়ে মেঘকে ঘিরে ধরল। কেউ পানি বাড়িয়ে দিল, কেউ কাঁধে হাত রাখল, কেউ নিঃশব্দে সান্ত্বনার কথা বলল। মেঘের বুকের ভেতর এখনও রাগের আগুন দাউদাউ করছে, কিন্তু বন্ধুদের স্পর্শে ধীরে ধীরে শান্ত হতে লাগল সে।
কিছুক্ষণ পর, যখন পরিস্থিতি একটু ঠান্ডা হলো, ফারাহ্ নূরাইসার দিকে তাকিয়ে দেখল, মেয়েটা কেমন নিঃশব্দ হয়ে আছে। চারপাশের হৈচৈয়ে সে একেবারেই অংশ নিচ্ছে না। মুখে এক অদ্ভুত স্থিরতা, চোখে দূরের কুয়াশা। ফারাহ্ ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে বলল—
-"কি রে, দুলাভাইয়ের বিরহে শোকদিবস পালন করছিস নাকি?"
নূরাইসা ধীরে চোখ তুলে তাকাল, এক মুহূর্ত ফারাহ্র দিকে চেয়ে আবার নিচে তাকাল। কিছুই বলল না।
আফরিন এবার মুখ খুলল—
-"ভাইয়া আজ দশ দিন হলো বিদেশে গেছে। যাওয়ার আগে এদের মধ্যে কিছু হয়েছি কি না, আল্লাহই জানে। একদম চুপচাপ হয়ে গেছে। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে শুধু মুখ ফিরিয়ে নীরব হয়ে থাকে।"
মাঠের বাতাসে একরকম ভারী নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল। হাসির দলটা এবার গম্ভীর হয়ে গেল। ফারাহ্, মেঘ, স্মৃতি, তিনজনেই ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নূরাইসাকে ঘিরে বসল। ফারাহ্ আলতো করে নূরাইসার কাঁধে হাত রেখে কোমল কণ্ঠে বলল—
-"কি হয়েছে রে? ভাইয়ার সাথে কোনো ঝামেলা হয়েছে নাকি?"
নূরাইসা চোখ নামিয়ে রাখল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে দু’পাশে মাথা নেড়ে 'না' বোঝাল।
স্মৃতি পাশ থেকে নরম কণ্ঠে বলল—
-"তাহলে কী হয়েছে তোর, ইসা?"
নূরাইসা মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ রইল। বাতাসে তার চুল উড়ে এসে মুখে লাগছে। তারপর হালকা কাঁপা গলায় বলল—
-"জানি না কী হয়েছে। ইলহান ভাই চলে যাওয়ার পর থেকে কেমন এক শূন্যতা অনুভব করছি। অথচ এই বিয়েটা আমি করতে চাইনি। তাকে এত ভয় পাই যে কথা বলতে গেলেও শরীর কাঁপে আমার। বিয়ের পর আমরা একসাথে ছিলাম মাত্র দু’দিন... এর মধ্যে ভালোবাসা জন্মানোর তো কথা না। তবুও তার অনুপস্থিতি আমাকে এত অস্থির করছে কেনো? কেনো এই কষ্ট হচ্ছে আমার?"
মেঘ তার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল—
-"স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যেমন হয়, তোদের মধ্যে তেমন কিছু হয়েছে কি?"
প্রশ্ন শুনে নূরাইসা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। চোখ নামিয়ে দু’পাশে মাথা নেড়ে 'না' বোঝালো। মেঘ ভ্রু কুঁচকে, একটু কৌতূহলের ভঙ্গিতে বলল—
-"তাহলে এই অনুভূতি হচ্ছে কেন তোর? কিছু হলেও বুঝতাম এটাই কারণ। তুই তো জীবনে কোনো প্রেম করিসনি। প্রথমবার কোনো পুরুষের এতটা কাছাকাছি এসেছিস, স্বাভাবিকভাবেই মন কেঁপে উঠবে।"
ফারাহ্ তখন সামনে এগিয়ে এল, একটু দৃঢ় গলায় বলল—
-"ওসব কিছু না, মেঘ।"
তারপর নূরাইসার দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বলল—
-"দেখ, তুই ইলহান ভাইকে ঘৃণা করিস না, শুধু ভয় পাস। আর চাচাতো ভাই বলেই হয়তো একটু অস্বস্তি লাগে। কিন্তু এটা স্বাভাবিক। জীবনে প্রথম কোনো পুরুষের সংস্পর্শে আসছিস, গভীর না হলেও সেই সান্নিধ্য কিছুটা তোর মনে ছোঁয়া দিয়েছে। তোর মতো সংবেদনশীল মেয়ে অল্পতেই অনুভবের জগতে ডুবে যায়। তাই তুই যা অনুভব করছিস, সেটা ভয়ের কিছু না। তোরা একটি পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ। এইরকম অনুভূতি হওয়া স্বাভাবিক। ভালোবাসা এখনো জন্ম নেয়নি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যাবে। সব বিয়েতেই তো প্রথমে ভালোবাসা আসে না, আস্তে আস্তে আসে।"
ফারাহর কথার সঙ্গে সবাই নিঃশব্দে সম্মতি জানাল। বাতাসের মাঝে যেনো এক অদ্ভুত শান্তির ছোঁয়া। কিন্তু সেই নীরবতা ভেঙে গেল হঠাৎই। পেছন থেকে ভেসে এলো এক পুরুষের রসিক কণ্ঠ—
-"বাহ্, বাহ্ ফারাহ বেবি! তোমার তো দেখছি বেশ অভিজ্ঞতা এইসব বিষয়ে! আমাকেও একটু শেখাবে নাকি?"
সবাই একসঙ্গে ঘুরে তাকাল। হালকা রোদে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছেলেটার মুখে ছিল দুষ্টু হাসি, চোখে অজানা খেলার ঝিলিক। মুহূর্তেই বাতাসের আবহ বদলে গেল, লজ্জা, বিস্ময় আর হাসির এক মিশ্র ঢেউ বয়ে গেল চারজনের মুখে।
রুহান দাঁড়িয়ে আছে, এক হাতে বেলি ও টগর ফুল, অন্য হাতে রজনীগন্ধা। মুখে তার এক চেনা বাকা হাসি, চোখে দুষ্টামির ঝিলিক। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো ওদের সামনে।
ফারাহ্ মাথাটা সামান্য উঁচিয়ে তাকিয়ে বলল—
-"আপনি এখানেও চলে এসেছেন?"
রুহান ফারাহর পাশ ঘেঁষে বসে পড়তে পড়তে বলল—
-"কেনো বেবি, খুশি হওনি আমাকে দেখে?"
ফারাহ ঠান্ডা গলায় বলল—
-"আপনাকে দেখে খুশি হওয়ার কী আছে? আপনি এখানে কেন এসেছেন?"
রুহান তখন নূরাইসার দিকে ইশারা করে মুচকি হেসে বলল—
-"কেন আবার? তোমার বন্ধুটা দেখো না, মুখটা পেঁচার মতো করে রেখেছে! দশ দিন ধরে জামাইয়ের সাথে কথা হচ্ছে না তাই। আর সেই জন্য তার জামাই আমাকে পাঠিয়েছে তার পছন্দের ফুল দিতে। কিন্তু এই জুন মাসে শিউলি কোথায় পাবো? তাই বেলি আর টগর নিয়ে এসেছি। জামাই-বউ মিলে বেচারা আমি রুহানকে খাটিয়ে মেরে ফেলছে!"
নূরাইসা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। তার মানে ইলহান ভাই ফোন করেছিল? কিন্তু আমাকে কেন করেনি? ভাবনার ঘূর্ণি মাথায় ঘুরতেই রুহান তার কোলে ফুলগুলো ছুঁড়ে দিল।
পাশ থেকে আফরিন হেসে বলল—
-"সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু রজনীগন্ধা কার জন্য এনেছো?"
রুহান দুষ্টু হেসে ফারাহর দিকে আরো ঝুঁকে তার মুখের সামনে ফুলগুলো ধরল—
-"কার জন্য আবার, আমার বেবীর জন্য!"
ফারাহ বিরক্ত মুখে চোখ-মুখ কুঁচকে নিল। সবাই তখন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। নূরাইসা নিজের কোলে পড়ে থাকা ফুলগুলো হাতে নিয়ে মুচকি হেসে বলল—
-"নিয়ে নে, অন্তত তোর জন্য কেউ স্বশরীরে এসে ফুল দিচ্ছে। আর আমাকেতো ডেলিভারি বয় পাঠিয়েছে।"
রুহান ভ্রু কুঁচকে তাকালো তার দিকে। সন্দেহমিশ্রিত কণ্ঠে বলল—
-"কিরে ইসা, জামাইকে মিস করছিস নাকি? বলব আসতে?"
নূরাইসা মুখ ঘুরিয়ে নিল। ঠোঁট শক্ত করে বলল—
-"যে আমাকে মিস করে না, আমি কেন তাকে মিস করব?"
আফরিন পাশ থেকে খোঁচা মেরে বলল—
-"কিন্তু তোর মুখ তো অন্য কিছু বলছে!"
নূরাইসা বিরক্ত মুখে বলল—
-"কিছু বলছে না, চুপ থাক রিন পাউডার।"
পাশ থেকে মেঘ হেসে বলল—
-"ফারাহ্ বেবি, ফুলগুলো নিয়ে নে। নইলে আবার অন্য মেয়েকে দিয়ে দিবে। আমাদের রুহান ভাইয়া তো আবার নাম্বার ওয়ান প্লেবয় কিনা।"
রুহান তখন গর্বভরে শার্টের কলার উঁচিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসল। তার ভঙ্গি দেখে সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল।
ফারাহ মুখ কুঁচকে বলল—
-"হ্যাঁ! সারাজীবন তো শুধু মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করেই গেলো ওনার!"
রুহান হাসতে হাসতে ফারাহর দিকে ঝুঁকে বলল—
-"তুমি একবার হ্যাঁ বলে দাও, ফারাহ বেবি। তারপর আর কোনো মেয়ের দিকেই তাকাবো না, স্বপ্নেও না।"
ফারাহ মুখ ভেংচে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই পাশ দিয়ে এক মেয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। রুহান তার দিকে তাকিয়ে বেশ উচ্ছসিত কন্ঠে বলল—
-"আরে, বাস! কি সুন্দর মেয়ে যাচ্ছে রে! তোরা থাক, আমি আসছি।"
সবাই রুহানের দিকে অবাক চোখে তাকালো, তারপর মেয়েটির দিকেও একবার নজর বুলিয়ে নিল। রুহান উঠে দাঁড়িয়ে শার্ট ঠিক করে নিল, তারপর হালকা সিটিসহ মেয়েটির পিছু নিল।
রুহানের এই অবস্থা দেখে নূরাইসা, আফরিন, ফারাহ, মেঘ আর স্মৃতি হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল।
রুহান দূরে গিয়ে মেয়েটির পেছনে হাঁটতে হাঁটতে গলা ছেড়ে গান ধরল—
-"চুমকি চলেছে এক পথে, সঙ্গী হলে দোষ কী তাতে..."