সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ১২

🟢

ফারাহ, মেঘ, স্মৃতি, আফরিন আর নুহা, সবাই মিলে অনেক বুঝিয়েছিল নূরাইসাকে। যেহেতু অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, আর সেই অংশগ্রহণের ওপরই নির্ধারিত হবে চূড়ান্ত স্কোর, তাই শেষমেশ নূরাইসাও অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হয়েছে। তবু তার ভেতরে অস্থিরতা, রাগ, আর কষ্ট একসাথে উথালপাতাল করছে। মানুষের সামনে নাচতে তার একেবারেই স্বাচ্ছন্দ্য লাগে না। সামাজিক অস্বস্তি কাজ করে তার মধ্যে। অথচ তার অমতে, বিনা অনুমতিতে, সেই বজ্জাত সভাপতি রিদওয়ান তন্ময় তার নামটা নাচের তালিকায় দিয়ে দিয়েছে!

এ নিয়ে রাগে ফেটে পড়েছিল নূরাইসা। ফারাহ, আফরিন আর নুহার সামনে যেন কথার ঝড় তুলেছিল সে। অথচ সেই রিদওয়ানের সামনে গিয়ে হঠাৎ যেন সব রাগ মিলিয়ে যায়,ভীতু বিড়ালের মতো মিউ মিউ করে ফেলে। বাইরে যতটা নরম, ঘরে ফিরে ততটাই রাগে জ্বলে ওঠে সে।

আজ ২০ আগস্ট, নূরাইসার জন্মদিন। সকাল থেকেই দেওয়ান বাড়ির আঙিনায় যেন এক অন্যরকম কোলাহল। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে মিষ্টি গন্ধ, নূরাইসার প্রিয় সব পদ আজ তৈরি হচ্ছে। যদিও তার জন্মদিনে বড় কোনো আয়োজন হয় না, তবু নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেওয়া এই সামান্য আনন্দেই ভরে ওঠে পুরো বাড়ি।

দেওয়ান বাড়িতে আজ উৎসবের আমেজ। মেঘ, স্মৃতি, ফারাহ, নাহিদ, আশিক, সবাই এসেছে। হাসি-আড্ডায় মুখর হয়ে উঠেছে চারদিক। তানভীর আর রুহানও দুপুরেই চলে এসেছে। সবাই মিলে একসাথে খাওয়া-দাওয়া করে এখন ড্রইং রুমে বসে জমিয়ে তুলেছে গল্পের আসর।

ফারাহ পাশ ফিরে নূরাইসার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল—

-"দুলাভাই না বলেছিল, তোর জন্মদিনে আসবে?"

নূরাইসা নিঃশব্দে দরজার দিকে তাকাল। দৃষ্টি কিছুক্ষণ স্থির থাকল সেখানে, তারপর আস্তে চোখ নামিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল—

-"এখনও তো এলো না, নাকি কাজের চাপে ভুলেই গেছে কে জানে?"

আফরিন ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল—

-"রাত বারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। এটা কিন্তু ইলহান ভাই! ওর কাজ, ওর ভাবনা, সবই মানুষের ধারণার বাইরে। যখন কিছু করবে, তখন সবাইকে অবাক করবেই।"

সবাই একসাথে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। ঘরজুড়ে হাসির কলরব, আনন্দের গুঞ্জন। তবুও সেই কোলাহলের মাঝেও নূরাইসার মন যেন অচেনা কোনো শূন্যতায় ভেসে আছে। সে চুপচাপ বসে থাকে, চোখে যেন দূরের কোনো দৃশ্য। মনের ভেতরে অদৃশ্য ঝড় বয়ে যায়, আজ তার জন্মদিন, কিন্তু তার অপেক্ষা কেবল একজনের জন্য। মুখে হাসি টানার চেষ্টা করলেও সে জানে, সেই হাসি কেবল মুখেই থেমে আছে, হৃদয়ে নয়।

তার মন ভালো করতে সবাই মিলে ছাদে উঠল।দেওয়ান বাড়ির ছাদ যেন আর দশটা ছাদের মতো নয়, বিশাল, বাতাসে ভরা, আর জীবনের উচ্ছ্বাসে পূর্ণ। সূর্যের আলো নেমে এসেছে টবভরা ফুলে, পাতায়, আর ফলের গাছে। প্রতিটি গাছই আফরিন, নুহা আর নূরাইসার পছন্দের। এক পাশে টেবিল টেনিসের টেবিল, কেরাম বোর্ড, নানা খেলার জিনিস, সবই তানভীর আর রুহানের আনা। চারপাশে ছাদের ঘেরাটোপ ঘরের মতো হলেও খোলা আকাশের নিচে এক উন্মুক্ত প্রশান্তি ছড়িয়ে রেখেছে।

আরেক পাশে, এক বিরাট জায়গা জুড়ে কবুতরের বাসা, ইলহানের প্রিয় শখ। বাড়িতে থাকলে সে নিজেই তাদের খাওয়ায়, কবুতরের থাকার জায়গা পরিষ্কার করে, যত্ন নেয়। আর সে না থাকলে সেই দায়িত্ব নেয় তানভীর ও রুহান। আজও তারা এসে খাঁচার দরজা খুলে দিল, সাদা, ধূসর, কালচে নীল কবুতরগুলো উড়ল আকাশে ডানা মেলে। যত দূরেই যাক, সন্ধ্যা নামলেই ফিরে আসে তারা, যেমন ভালোবাসা ফিরে আসে তার নিজের ঠিকানায়।

ছাদের মাঝখানে সবাই পাটি বিছিয়ে বসে পড়ল।ইলিনা বেগম নাস্তা পাঠিয়ে দিয়েছেন, গরম সমুচা, চা, কফি আর ঝালমুড়ি। গল্পের স্রোত, হাসির রোল, আর চাঁদের আলোয় সবার ছেলেমানুষি একসাথে মিশে যাচ্ছে।

রুহান তো আসার পর থেকেই ফারাহর পাশে বসে তার সাথে ফ্লার্ট করছে। সবাই হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে, আর ফারাহর মুখ লাল হয়ে উঠছে রাগে–লজ্জায় মেশানো এক অদ্ভুত রঙে।

রুহানের দুষ্টু হেসে ফারাহর দিকে তাকিয়ে বলল—

-"ফারাহ বেবি, জন্য? আজকের সূর্যটা একটু বেশিই সুন্দর লাগছে। পরে বুঝলাম, তুমি ছাদে উঠেছ বলেই ওর এত উচ্ছ্বাস!"

ফারাহ ভুরু কুঁচকে বলল—

-"সূর্যের কাজই উচ্ছ্বাস দেওয়া রুহান ভাই। আগুনের ফুলকির মতন সূর্য সব সময় জ্বলজ্বল করেই।"

রুহান বোকা হেসে বলল—

-"আসলে এখন তো বিকেল, চাদ নেই। তাই সূর্যকে দিয়েই লাইনটা মেরে দিলাম!"

সবাই উচ্চশব্দে হেসে উঠলো। আফরিন হেসে বলল—

-"রুহান ভাই, তুমি এখন কবি হতে চাইছো নাকি? চাঁদ-তারা, সূর্য নিয়া কথা বলছো যে!"

রুহান হাসতে হাসতে বলল—

-"কবি হতে চাইছো না রে, রুন পাউডার। প্রেমে পড়লেই সবাই একটু কবি হয়ে যায়।"

আফরিন তেতে উঠে বলল—

-"এই খবরদার রীণ পাউডার বলবে না!"

রুহান মুখ ভেঙ্গালো। পাশ থেকে ফারাহ বলল—

-"প্রেমে পড়েছেন কার?"

রুহান দুষ্টু হাসি দিয়ে প্রতিউত্তর করলো—

-"এই প্রশ্নটা তুমি করবি বলে আমি আজ সারাদিন অনুশীলন করছি, উত্তরটা মুখস্থ করেছি!"

সবাই একসাথে—

-"কি উত্তর?"

রুহান মুচকি হেসে বলল—

-"যার চোখে এত রাগ, অথচ মনটা মাখনের মতো নরম, তার সাথেই প্রেমে পড়েছি!"

ছাদজুড়ে হো হো করে হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল। সূর্যের আলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যেন সেও হেসে উঠেছে দেওয়ান বাড়ির ছাদের গল্পে।

ফারাহ্ বিরক্ত মুখে নূরাইসার দিকে তাকিয়ে বলল—

-"তোর ভাই জীবনে ভালো হবে না! এক কাজ কর, যে রবীন্দ্রসঙ্গীতে অনুষ্ঠানের জন্য নাচ প্র্যাকটিস করেছিস, সেটা আমাদের দেখা!"

নূরাইসা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে না করল।

-"না, আমি পারব না এখন..."

কিন্তু কেউই শুনল না তার কথা। আফরিন, নুহা, মেঘ, ফারাহ, সবাই একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর দিকে, হাসতে হাসতে চেপে ধরল তাকে। অবশেষে নূরাইসা হাল ছেড়ে দিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়াল।

রুহান হেসে ফোনে গান চালিয়ে দিল। সুর ভেসে উঠতেই বাতাসে যেন অন্যরকম একটা মায়া ছড়িয়ে পড়ল, রবীন্দ্রসঙ্গীতের নরম সুর গোধূলির আকাশের সঙ্গে মিশে গেল নিঃশব্দে। নূরাইসা চোখ বন্ধ করল। তারপর ধীরে ধীরে নাচতে শুরু করল।

ছাদের খোলা আকাশের নিচে, চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু সুর, বাতাস, আর নূরাইসার পদচারণা। তার দেহের প্রতিটি নড়াচড়ায় যেন আলো ঢেউ খেলে যাচ্ছে।গোধূলির শেষ আভা এসে মিশেছে তার গায়ে, সূর্যাস্তের সোনালি রঙে সে যেন এক অপার্থিব ছায়ামূর্তি। তার হাতের কোমল ভঙ্গিমা, শরীরের বাঁক, পায়ের সূক্ষ্ম শব্দ, সব মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত কবিতা। চুলগুলো বাতাসে দুলে উঠছে, আকাশের আলো তার চোখে এসে লেগেছে, তাতে ঝলমল করছে এক অচেনা দীপ্তি, এক নিঃশব্দ আত্মসমর্পণ।

ঠিক তখনই, ছাদের ওপরে ইলহানের কবুতরগুলো আকাশে উড়ে উঠল। সাদা, ধূসর, বাদামি ডানায় ভেসে গেল তারা, যেন তার নাচের সঙ্গী হয়ে গেছে।নূরাইসার হাত উঁচু হলে তারা ডানা মেলে উড়ে যায়, হাত নামালে ফিরে আসে বৃত্তে। তানভীর ও রুহানের চোখে অবাক বিস্ময়, এ যেন নাচ নয়, এক অলৌকিক সংলাপ, যেখানে মানুষ আর প্রকৃতি এক সুরে বাঁধা।

সূর্যের শেষ রশ্মি তখন তার গালে, চোখের কোণে, কপালে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে। হালকা ঘূর্ণনের সাথে তার ওড়না বাতাসে দুলে উঠছে, যেন সন্ধ্যার হাওয়া তাকে আলিঙ্গন করছে। কবুতরগুলোর ডানার শব্দ মিলেমিশে যাচ্ছে গানের তালে, বাতাস, আলো, সুর, আর এক তরুণী, সবকিছু মিলে যেন সৃষ্টি করেছে এক ক্ষণস্থায়ী মায়াজগৎ।

কেউ কথা বলছে না, কেউ নড়ছে না। সবাই স্তব্ধ।ফারাহর ঠোঁটে মুগ্ধতার রেখা, নুহার চোখে বিস্ময়, রুহানের ফোনের স্ক্রিনে জমে যাচ্ছে আলো, কেউ বুঝতেও পারছে না, তারা এখন কোনো সাধারণ নৃত্য নাকি এক অলৌকিক মুহূর্তের সাক্ষী হচ্ছে।

দেওয়ান বাড়ির ছাদে হাসি, গল্প, সুর আর আলোয় জমে উঠেছে প্রাণের মেলা। নূরাইসা নৃত্যে মগ্ন, তার শরীরের প্রতিটি ভঙ্গিমা যেন ছুঁয়ে যাচ্ছে গোধূলির শেষ আভাকে। চারদিকে বাতাসে দুলছে ওড়না, মিশে আছে হাসির শব্দ, কিন্তু সেই মুহূর্তে কেউ টের পায় না, বাড়ির গেটের কিছুটা দূরে, ছায়ার আড়ালে এক পুরুষ অবয়ব স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

পরনে কালো হুডি, মুখে কালো মাস্ক, চেনা যায় না মুখের রেখা, বোঝা যায় না পরিচয়। শুধু দুটি চোখ, গভীর বাদামি, যা অন্ধকার ভেদ করে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছাদের দিকে।সেই চোখে ছিল এক কঠিনতা, এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা, যেন কারো ভেতরটাকে যাচাই করছে, কিংবা নিজের অস্থিরতাকে দমন করতে চাইছে। কিন্তু ধীরে ধীরে দৃষ্টির ধার নরম হয়ে আসে, অস্তরাগের শেষ রশ্মি এসে পড়ে তার চোখে। সেই আলোর ছোঁয়ায় কঠোর দৃষ্টি গলে যায় নরম মুগ্ধতায়,

যেন তার চোখের গভীরে কোনো নরম স্মৃতি জেগে উঠেছে নিঃশব্দে।

সে টের পায় না, কখন থেকে তার নিঃশ্বাস ধীর হয়ে গেছে, কখন থেকে চারপাশের কোলাহল মিলিয়ে গেছে দূরে। ছাদের ওপরে নূরাইসার নাচ যেন সময় থামিয়ে দিয়েছে, তার প্রতিটি ভঙ্গিমা, প্রতিটি ঘূর্ণন, বাতাসে ছড়ানো প্রতিটি ওড়না যেন সরাসরি এসে আঘাত করছে তার হৃদয়ে।

অস্তগামী সূর্যের আলো নূরাইসার শরীরের চারপাশে এক সোনালি আভা বুনে দিয়েছে। সে যখন ঘুরে দাঁড়ায়, তার চুল বাতাসে উড়ে উঠে, আর সেই উড়ন্ত চুলের আড়ালে, সেই পুরুষ অবয়বের চোখে মিশে যায় আলো, ধোঁয়া, আর এক গভীর মুগ্ধতা।

চারপাশে তখন শব্দ আছে, তবু নেই। রুহানের হাসি, আফরিনের উচ্ছ্বাস, তানভীরের কণ্ঠ, সবই যেন দূরে কোথাও মিলিয়ে গেছে। রয়েছে শুধু ছাদের ওপর নৃত্যমগ্ন এক তরুণী, আর বাড়ির গেটের কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক পুরুষ, যার চোখে সেই নাচের প্রতিটি ভঙ্গি প্রতিফলিত হচ্ছে, যেন পৃথিবীর সব আলো এসে থেমেছে সেই এক জোড়া চোখে।

তার দৃষ্টিতে এখন আর কঠোরতা নেই, আছে শুধু এক নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি, এক অচেনা, অথচ আপন মুগ্ধতা, যা বলা যায় না, কেবল অনুভব করা যায় বাতাসের হালকা কম্পনে, আকাশের নরম আলোয়,

আর নূরাইসার নৃত্যের ভেতর লুকিয়ে থাকা সেই নিঃশব্দ সুরে।

গান থেমে গেলে নূরাইসা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।বাতাসে এখনো ভাসছে তার চুলের গন্ধ, তার শরীরের গতির ছায়া। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে হালকা হাসে, যেন নীরবে কিছু বলল সেই মানুষটিকে, যে এখনও আসেনি, তবুও যার উপস্থিতি নূরাইসার হৃদয়ের প্রতিটি কোণে অনুভূত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

.

রাত গভীর। নিস্তব্ধতার চাদরে মোড়ানো পুরো দেওয়ান বাড়ি। চারদিক নিস্তব্ধ, কেবল মাঝে মাঝে ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ ভেসে আসছে। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, শুধু ঘুম আসেনি নূরাইসার চোখে। মৃদু আলোয় ভেসে থাকা ঘরে সে একা বসে আছে, ইলহান আর তার ঘরের দেয়ালে টানানো ছবির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে। কতক্ষণ কেটে গেছে, সে নিজেও জানে না। তারপর হঠাৎই তার ঠোঁট নড়ল—

-"কথা দিয়েছিলেন আসবেন... কথা যখন রাখতেই পারবেন না, তবে কথা দিয়েছিলেন কেনো?"

কণ্ঠে অভিমান, চোখে অশ্রুর কুয়াশা। ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ ঠাস! করে কিছু একটা পড়ার শব্দ কানে এলো। চমকে উঠল নূরাইসা। হৃদস্পন্দন যেন হঠাৎ দ্বিগুণ হয়ে গেল। ইলহানের ঘরটা বাড়ির একদম শেষপ্রান্তে, আশেপাশে কেউ নেই। নিস্তব্ধ রাতের সেই শব্দে ভয়টা আরো গভীর হয়ে উঠল। কিছু না ভেবেই তাড়াহুড়ো করে ফোন হাতে নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এল সে।

বাতাসে হালকা শীতের ছোঁয়া, চারপাশে ছায়ার খেলা। ঠিক তখনই চোখে পড়ল, নুহার ঘরের দরজার নিচ দিয়ে মৃদু আলো বেরোচ্ছে। নূরাইসা কপাল কুচকে সেইদিকে এগিয়ে গেল। দরজায় কড়া নাড়ল একবার, দুইবার... তিনবার। শেষে হালকা বিরক্ত মুখে দরজা খুলল নুহা।

দরজা খুলতেই নূরাইসার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। নুহা নামাজে ছিল, তাহাজ্জুদের নামাজ। জায়নামাজ বিছানো খাটের সামনে। নূরাইসার দরজার পাশে ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে নুহা, ভেজা মুখ, ফুলে থাকা চোখ, কাঁপা ঠোঁট। সেই দৃশ্য দেখে নূরাইসা বিচলিত হয়ে পড়ল। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল—

-"কাঁদছিস কেনো?"

নুহা উঠলো ঘুরে ঘরে ঢুকে জায়নামাজ ভাঁজ করে রেখে নিঃশব্দে বিছানায় বসে পড়ল। নূরাইসাও পিছু পিছু ভেতরে ঢুকে পাশে বসল। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর নুহা প্রশ্ন করল—

-"তুই এত রাতে বাইরে কি করছিস?"

নূরাইসা এখনও কিছুটা ভীত সুরে বলল—

-"আরে, কিছু একটা পড়ার শব্দ পেয়েছি, তাই ভয় পেয়েছি। ভাবলাম আফরিনের ঘরে যাই। পরে দেখি তোর ঘর থেকে আলো আসছে, তাই চলে এলাম।"

নুহা মৃদুস্বরে বলল—

-"ওহ!"

নূরাইসা হালকা হেসে বলল—

-"বললি না তো!"

-"কি?"

-"কাঁদছিলি কেনো?"

নুহা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। চোখ নামিয়ে রেখে মৃদু কণ্ঠে বলল—

-"আল্লাহর কাছে কাঁদছিলাম, আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা ভিক্ষা চাইছিলাম।"

নূরাইসা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ধীরে বলল—

-"বিহান ভাই?"

নুহা মাথা নিচু করে নিঃশব্দে হ্যাঁ বলল। নূরাইসা গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মুখে মৃদু আলো-ছায়ার খেলা।

-"আমি ভেবেছিলাম, তুই হয়তো মজা করিস... কিন্তু তুই এতটা সিরিয়াস ওনাকে নিয়ে?"

নুহা বোনের দিকে তাকাল। চোখে ভেজা হাসি, ঠোঁটে একটুকরো মৃদু শান্তি। তারপর নরম কণ্ঠে বলল—

-"যে মানুষটা নিজের দোয়ায় কাউকে চাইতে শেখে, সে কি আর মজা করতে পারে, আপু?"

নুহার কণ্ঠ কেঁপে উঠল—

-"প্রথম যখন ভালোবাসা বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই ওনাকে ভালো লাগে। আজ চার বছর ধরে নামাজে, মোনাজাতে, কান্নায় আল্লাহর কাছে তাকে ভিক্ষা চাইছি। জানি না, আল্লাহ আমাকে দেবেন কিনা..."

নূরাইসা চুপচাপ তাকিয়ে রইল বোনের দিকে। মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল—

-"যদি না দেন? তখন কি করবি? ভুলে যাবি ওনাকে?"

নুহা হালকা মাথা তুলে তাকাল। চোখের কোণে জমে থাকা জল আলোর ছোঁয়ায় চিকচিক করছে। কণ্ঠে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা, অথচ ভিতরে এক গোপন ভাঙন—

-"যদি কাউকে ছেড়ে যাওয়া এত সহজ হতো, তাহলে তো আত্মা নিতে ফেরেশতারা আসতো, আপু। আর আত্ম নিতে কখনও ফেরেশতারা আসে না। তাকে ছাড়া আমি আমার জীবন কল্পনাই করতে পারবো না। আমি তাকে চাই, যেকোনো মূল্যে। কারণ, তাকে ছাড়া বেঁচে থাকা মানে যেন শরীর থেকে আত্মা টেনে নেওয়া, যন্ত্রণাদায়ক, নিঃশেষ করা এক অনুভব।

তাকে ভুলে যাওয়া মানে নিজের ভেতর থেকে আত্মা ছিঁড়ে ফেলা, আপু... আর আমি আমার আত্মাকে আলাদা করতে পারবো না, পারবো না কোনোদিন।"

নূরাইসা নির্বাক হয়ে বসে রইল। তার চারপাশে হঠাৎ মনে হলো বাতাস থেমে গেছে। জানলার পর্দা নড়ে উঠছে ধীরে ধীরে, যেন সেই বাতাসও নুহার যন্ত্রণায় ভারী হয়ে গেছে। রাতের নিস্তব্ধতা আরও গভীর, আরও তীব্র, দুই বোনের মাঝখানে শুধু এক নিঃশব্দ ভালোবাসার আর্তি ঝুলে আছে, যা উচ্চারণ না করলেও অনুভব করা যায় হৃদয়ের গভীরে।

রাতের নরম আলোয় দুই বোনের মুখে ভেসে উঠছে ভিন্ন ভিন্ন ছায়া। একদিকে নুহার সরল অথচ দৃঢ় ভালোবাসা, অন্যদিকে নূরাইসার মুখে অব্যক্ত এক সংশয়, এক গোপন অনুভবের ঢেউ। নূরাইসা মৃদু স্বরে জিজ্ঞাসা করল—

-"বিহান ভাইকে বলবি না তোর ভালোবাসার কথা?"

নুহা চোখ নিচু করে হাসল একটু, তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল—

-"বলব, আমার পরীক্ষা টা হয়ে যাক আগে। উনি এখনো আমায় বাচ্চা ভাবে। তাই আমি সময় নিচ্ছি।"

নূরাইসা মাথা নাড়ল হালকা করে, যেন কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। নুহা চোখের পানি মুছে সোজা হয়ে বসল। তারপর দুষ্টু হেসে বলল—

-"আমার কথা বাদ দে, তোর কথা বল! তুই তো ভাইয়াকে ভালোবেসে ফেলেছিস!"

নূরাইসা যেন বজ্রাহত। মুখে হালকা হাসি, কিন্তু চোখে ধরা পড়ে স্পষ্ট অস্বস্তি।

-"কি বলছিস এইসব? ছোট মানুষ, এত কি বুঝিস তুই?"

নুহা ঠোঁট বাঁকিয়ে জবাব দিল—

-"এখন মানুষ ১৪-১৫ বছরেই প্রেম করে আর সেখানে তো আমার ১৮ বছর আপু। যথেষ্ট বুঝি আমি। তুই ভাইয়ার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিস।"

নূরাইসা হাসির ভান করে বলল—

-"হ্যাঁ, তোর কানে কানে এসে বলে গেছি তো!"

-"বলতে হবে না, আমরা সবাই দেখি সব!"

নূরাইসা কপাল কুঁচকে তাকাল—

-"মানে?"

নুহা গম্ভীর হয়ে বলল—

-"মানে এইযে ভাইয়া যাওয়ার পর থেকেই তুই মলিন মুখে থাকিস। তিন মাস হতে চলল ভাইয়া নেই। সেই যে একবার ফোন করেছিল, তারপর কোনো খোঁজ নেই। তোর জন্মদিনে আসার কথা ছিল, আসে নি, আর সেই অভিমান তুই বুকে বয়ে বেড়াচ্ছিস। সারাক্ষণ অন্যমনস্ক, চুপচাপ। কারো সাথে ঠিকমতো কথা বলিস না।"

নূরাইসা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল—

-"অন্য কারণও হতে পারে নুহা। আর দুই দিনে কারো প্রতি ভালোবাসা জন্মায় না। বিয়ের পর দুদিনই ছিলাম একসাথে।"

নুহা দৃঢ় স্বরে বলল—

-"ভালোবাসা জন্মানোর জন্য একসাথে থাকা জরুরি না, আপু। আমিও তো বিহান ভাইকে ভালোবাসি, অথচ আমরা কখনো একসাথে থাকি না। দূরত্বই মানুষকে বুঝিয়ে দেয়, কে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, কি কতটা আপন। তখন ভালোবাসা, মায়া, সবকিছুই বাড়ে।"

নূরাইসা মুখে গম্ভীর ভাব আনল, কিন্তু চোখের কোণে ক্ষীণ এক হাসি ফুটে উঠল—

-"হ্যাঁ, হয়েছে খুব জানো পাকুন্নি! এবার ঘুমাও।"

নুহা উঠে দরজা বন্ধ করল। ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ নীরবতা, তারপর বালিশে মুখ গুঁজে নরম স্বরে বলল—

-"তুই নিজেও জানিস, আপু... তুই ভাইয়াকে ভালোবেসে ফেলেছিস। এখন তুই স্বীকার না করতে চাইলে করিস না। কিন্তু নিজের জামাইর কাছে তো একদিন স্বীকার করতে হবে, তাই না?"

ঘরের বাতাস থমকে গেল। জানালার বাইরে চাঁদের আলো এসে পড়ল নূরাইসার মুখে, নিঃশব্দ, তবু অশ্রুভেজা। তার চোখে ঠিকরে পড়ল এক নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি, যা মুখে বলা হয়নি, কিন্তু রাত শুনে ফেলেছে, পুরোপুরি।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প