সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ১৫

🟢

রুহান ও তানভীর সারারাতের দীর্ঘ নাইট ডিউটি শেষে অবশেষে ছুটি পেয়েছে। হাসপাতালের করিডোরের নিস্তব্ধতা, রাতভর রোগীদের আর্তনাদ, স্যালাইনের ফোঁটা আর মনিটরের বীপ, সব মিলিয়ে তাদের চোখেমুখে জমে আছে একরাশ ক্লান্তি। দুজনেই হেলেদুলে হাঁটছে, কাঁধে ঝুলছে অবহেলায় রাখা ব্যাগ, যেন ব্যাগ নয়, ক্লান্ত শরীরেরই কোনো ভারী অংশ।

রুহানের বাদামি চোখে ঘুম আর পরিশ্রমের ছায়া, কিন্তু তবুও চোখদুটো অদ্ভুতভাবে জেগে আছে, যেন এই পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তির মাঝেও কোনো এক প্রাণচঞ্চলতা বেঁচে আছে তার মধ্যে। তানভীরের চোখও নিস্তেজ, ঠোঁটে নিঃশব্দ ক্লান্তি। দুজনেই আনমনে হাঁটছে, কথা বলার শক্তি যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। রাস্তাটা নিস্তব্ধ, শুধু শুকনো পাতা উড়ে পড়ছে পায়ের নিচে।

হঠাৎই দূর থেকে ভেসে আসে একরাশ কণ্ঠস্বর, তারপর দেখা গেল এক তরুণীকে। সাদা ওড়না উড়ছে বাতাসে, হাতে একটা চিঠি আর একটিমাত্র গোলাপ। সে দৌড়ে আসছে এদিকেই, মুখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা, চোখে এক অচেনা আলো।

রুহান থমকে দাঁড়াল। মুখে ক্লান্তির ছায়া মিলিয়ে একটুখানি দুষ্টু হাসি ফুটে উঠলো। তানভীরের দিকে তাকিয়ে বলল—

-"তানভীর! মনে হয় তোকে প্রোপোজ করতে আসছে রে!"

তানভীর মাথা তুলল ধীরে। চোখে অবিশ্বাস, ঠোঁটে ক্লান্ত হাসি। দুর্বল কণ্ঠে উত্তর দিল—

-"তোকেই প্রোপোজ করতে আসছে। তোর মতো সুন্দর ছেলেকে কেউ হাতছাড়া করে নাকি?"

রুহান হেসে তানভীরের পিঠে জোরে থাপ্পড় মারল,সেই শব্দে চারপাশের নিস্তব্ধতা খানিকটা ভেঙে গেল।

-"সালা! আমার মতো প্লেবয়কে জেনে শুনে কোনো মেয়ে প্রোপোজ করবে না। দেখ দেখ, মেয়েটা তো এদিকেই আসছে!"

বাতাসে গোলাপের গন্ধ মিশে গেল ক্লান্ত শহরের সকালের আলোয়। হাসপাতালের গেটের ধারে দুজন তরুণ ডাক্তার, একজনের চোখে কৌতুক, অন্যজনের চোখে অনিশ্চয়তা, আর তাদের সামনে আসতে থাকা এক মেয়ের পদধ্বনি।

মেয়েটা তাদের সামনে এসে দাঁড়ানোর আগেই, রুহান ও তানভীর যেন মুহূর্তেই সব ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলল। ঘাড় সোজা, বুক টানটান, চোখে আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক। যেন হাসপাতালের ক্লান্ত ডাক্তার নয়, বরং সিনেমার নায়ক দুইজন, যারা ভাবছে, "আমরা এসব প্রোপোজ-ফ্রোপোজের ধারে কাছেও যাই না, কিন্তু কেউ করলে, তা নিয়েও আমরা ভাবিত হই!"

রুহান ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি টেনে মেয়েটার দিকে তাকাতেই সে এসে দাঁড়ালো ঠিক তাদের সামনে। সাদা ওড়নাটা কাঁধ থেকে খানিকটা গড়িয়ে পড়েছে, চুলে ঘাম জমে ছোট ছোট কোঁকড়ানো রেখা। দুহাতে চেপে ধরা একটা গোলাপ আর একটি ভাঁজ করা চিঠি।

মাথা নিচু করে, কণ্ঠে একরাশ লজ্জা মেশানো মিষ্টি সুরে, যেন কোনো শিশু মায়ের কাছে অপরাধ স্বীকার করছে—

-"রুহান ভাই, আমি আপনাকে ভালোবাসি!"

বলে সে কাঁপা হাতে রুহানের দিকে বাড়িয়ে দিলো চিঠি ও গোলাপ। তার মুখ টকটকে লাল, একদম পাকা টমেটোর মতো। পলক পড়ছে না, শ্বাস যেন গলায় আটকে আছে।

রুহান যেন এক মুহূর্তে জমে গেল। চোখ বিস্ফারিত, মুখ হা করে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে, ঠিক যেন কেউ রাতারাতি তার সামনে অ্যানাটমি বইয়ের বদলে ভালোবাসার নোট রেখে গেছে।

তানভীর তখন হালকা হাসিতে ঠোঁট চেপে ধরেছে। এগিয়ে এসে রুহানের মুখটা আলতো করে বন্ধ করে দিলো—

-"বলেছিলাম না, আমার কথাই মিলল?"

রুহান একবার ঢোক গিলে নিয়ে, চোখ মটকিয়ে তানভীরের দিকে তাকালো। তারপর মেয়েটার দিকে ফিরে, মুখে গাম্ভীর্য এনে বলল—

-"আপু, তুমি sure তুমি আমাকেই ভালোবাসো? মানে, তানভীরের মতো ভদ্র, ঠাণ্ডা, গ্রীন ফরেস্ট ছেড়ে আমার মতো দাবানল বেছে নিলে?"

মেয়েটি আরও লাল হয়ে গেল, মাথা নিচু করে লজ্জা মেশানো কণ্ঠে বলল—

-"ভালোবাসা কি আর বলে কয়ে হয় ভাইয়া? যার যাকে ভালো লাগে, সে তো তারই!"

তানভীর তখন হেসে মরছে, কিন্তু মুখ চেপে রেখেছে কষ্ট করে, মেয়েটির সামনে হাসলে মানসম্মান একেবারে শেষ।

রুহান গভীর নাটকীয় ভঙ্গিতে এক পা এগিয়ে বলল—

-"দেখো ডার্লিং, এইসব প্রেম-পিরিতিতে আমি নেই। ফ্লার্টিং পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু প্রেম? উহু! আমি করলে সোজা বিয়ে করব। এইসব ভালোবাসার সময় আমার নেই।"

বলে সে কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করে হাঁটা দিল তানভীরকে নিয়ে। দুজনের পদধ্বনি মিশে গেল সকালের রোদে। কিন্তু হঠাৎই পিছন থেকে ভেসে এলো এক কণ্ঠ, কান্নায় মিশে কাঁপছে—

-"তাহলে বিয়েই করুন! আপনাকে এত মানুষের সামনে প্রোপোজ করলাম, আর আপনি গ্রহণ করলেন না?"

রুহান থেমে গেল। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো। সকালের আলো তার মুখে পড়েছে, চোখে ঝিকিমিকি করছে দুষ্টুমি আর বিস্ময়ের মিশ্র প্রতিচ্ছবি। ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটিয়ে বলল—

-"বারো ঘাটের পানি খাওয়া মেয়ের আমি নামও মুখে আনি না, বিয়ে করা তো দূরের কথা! বিয়ে আমি তাকেই করব, যাকে দেখে আমার হৃদয় থমকে যাবে। সে তোমার মতো সুন্দর না হলেও চলবে, কুৎসিত হলেও যদি তাকে দেখে আমার বুকের ভেতরটা একবার থেমে যায়, তাহলে সেই থেমে যাওয়া হৃদয় শুধু তার জন্যই ধ্বনিত হবে। তাকেই বউ বানাব আমি, কোনো বারো ঘাটের মাঝিকে নয়!"

কথাগুলো শেষ হতেই বাতাস যেন একবার কেঁপে উঠল। রুহানের চোখে একরাশ দৃঢ়তা, ঠোঁটে কঠোর ব্যঙ্গের রেখা। সে জানে, মেয়েটি যেমন মিষ্টি চেহারার, চরিত্রের দিক থেকে তেমনি আলোচনায় ঢাকা মেডিকেলের এক পরিচিত নাম। মাত্র তিন মাসেই সবার জানা হয়ে গেছে তার গল্প, কতজন ছাত্র, এমনকি কতজন শিক্ষকও তার প্রেমে পড়ে মেসেঞ্জারে হোঁচট খেয়েছে, তার হিসেব কেউ রাখেনি।

তানভীর তখন নাক চেপে ধরে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—

-"ইস ভাই, গন্ধে টিকা যাচ্ছে না! চল চল! সকাল সকাল এইসব আকাম কে করে বাহিরে আসে? রাস্তার মাঝখানে প্রেমের নাটক! আবার আমাদের সামনে এসে ভদ্র সাজছে, আহারে! ভাই, আমার তো বমি আসছে।"

রুহান হেসে গড়িয়ে পড়ল। তার সেই অট্টহাসি যেন চারপাশের সব নিস্তব্ধতা চিরে দিয়ে ছুটে গেল।তানভীরের কাঁধে হাত রেখে বলল—

-"চল ভাই, আজকের সকালটা অন্তত আমাদের জন্য নয়।"

দুজন একসাথে হাঁটতে শুরু করল। রুহান হাসতে হাসতে তানভীরের কাঁধে হাত রেখে এগিয়ে যাচ্ছে।রুহান সবসময়ই ফ্লার্ট করে, দুষ্টুমি করে, মজা করে, কিন্তু ওর ভেতরটা আসলে ভীষণ সৎ। যতই মানুষ তাকে প্লেবয় বলুক, রুহান আজও কোনো মেয়ের হাত ধরেনি, কোনো সম্পর্কেই জড়ায়নি।

পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি রাগে লাল হয়ে উঠেছে। ঠোঁট কামড়ে, চোখে পানি জমে গেছে, তবু সে কিছু না বলে হনহন করে ঘুরে চলে গেল।

দূর থেকে এই সমস্ত দৃশ্যটা চুপচাপ দেখছিল কেউ, সাদা কোট পরে, হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। মুখে একটুকরো রহস্যময় হাসি। কিছু না বলে, সে ধীরে ধীরে ভিতরে চলে গেল, যেন ভবিষ্যতের গল্পটা আগেই জেনে ফেলেছে।

.

নূরাইসা আজ পনেরো দিন ধরে বাড়ির কারও সঙ্গে কথা বলে না। শুধু নাজনীন বেগমের সঙ্গে অল্প কিছু কথা হয়, প্রয়োজনের তাগিদে। মেয়েটি ভীতু, তবু তার ভেতরে আছে অদম্য এক জেদ। একবার অভিমান করলে সেই অভিমান ভাঙানো যেন অসম্ভব এক কাজ।

বাড়ির সবাই তার কাছ থেকে সত্য গোপন করে রেখেছে, তাই নূরাইসা এখন যেন এক নীরব প্রাচীর তুলে দিয়েছে সবার সামনে। ইলহান সারাদিন কোথায় থাকে কেউ জানে না, বাড়িতেও তেমন থাকে না। গভীর রাত পেরিয়ে যখন ফেরে, তখন পুরো বাড়ি নিঃস্তব্ধ। ঘরে ঢুকে দেখে, নূরাইসা তখন গভীর ঘুমে।ইলহান নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাথরুমে চলে যায়, তারপর ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেই রাজ্যের ঘুম এসে ধরা দেয়।

প্রতিদিন সে কিছু না কিছু নিয়ে আসে, কখনও কাঁচা ফুল, কখনও চকোলেট, কখনও নূরাইসার প্রিয় জাঙ্কফুড। রাতের নিস্তব্ধতায়, ঘুমন্ত নূরাইসার মাথার পাশে টেবিলে সেগুলো আলতো করে রেখে দেয়।কিন্তু নূরাইসা কখনও সেগুলো ছোঁয় না, দেখে না, যেভাবে ইলহান রেখে যায়, সেভাবেই থাকে সবকিছু। সকালে ইলহান ঘুম থেকে উঠার আগেই নূরাইসা উঠে কোথাও চলে যায়। ইলহান বিছানায় বসে নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তারপর উঠে ফ্রেশ হয় ধীরে ধীরে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। বাড়িতে খাওয়া দাওয়া পর্যন্ত করে না ইলহান।

বাড়ির সবাই এখন উদ্বিগ্ন, এভাবে চলতে থাকলে ওদের সংসার টিকবে না, ভেঙে যাবে অচিরেই। এই দুশ্চিন্তাতেই আজ দাদা ও দাদী নূরাইসাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।

ভার্সিটি থেকে ফিরে নূরাইসা নিঃশব্দে দাদু-দাদীর ঘরে প্রবেশ করল। ঘরের বাতাসে যেন অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য, এক অঘোষিত ভার। ইলহান ছাড়া সবাই বসে আছে।নূরাইসা একবার সবার দিকে তাকাল, তারপর মাথা নিচু করে ধীরে ভেতরে ঢুকল।

সে ঢুকতেই দাদু তার হাত ধরে পাশে বসালেন, ধীরে ধীরে হাত রাখলেন নূরাইসার মাথায়। মমতাভরা কণ্ঠে বললেন—

-"কোথা থেকে শুরু করবো বুঝতে পারছি না, বোন।

তবু আজ এই কথাগুলো বলা খুবই জরুরি। আমার মায়ের হাতে গড়া এই সংসার... আমি তা ভেসে যেতে দিতে পারি না।"

দাদু দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলে থামলেন কিছুক্ষণ। মুখে অনুশোচনার ছায়া, চোখে একরাশ বেদনা। তারপর ধীরে, ভারী কণ্ঠে আবার বললেন—

-"আমার ইলহান দাদু ভাই নির্দোষ। সে আমার কথা রাখতেই তোমাকে বিয়ে করেছে। সব সত্য আমি আর তোমার বড় বাবা তাকে বলতে মানা করেছিলাম। না হলে তুমি কোনোদিন রাজি হতে না এই বিয়েতে। আর ইলহানও চেয়েছিল তোমার ভয়টা কেটে যাক, তারপর নিজেই তোমাকে সব জানাবে।

বিজ্ঞাপন

দেখো মা, তুমি এই সংসারের বড় মেয়ে, এখন বড় বউও। এই বাড়ির প্রতিটি নিঃশ্বাসে তোমার দায়িত্ব মিশে আছে। তোমার বড় মার পর এই সংসারের হাল ধরার ভার তোমার ওপরই। তুমি যদি এখন দুর্বল হয়ে পড়ো, তাহলে এই সংসার, এই বন্ধন... সব ভেসে যাবে।"

দাদুর কণ্ঠ কাঁপছিল, কিন্তু চোখে ছিল দৃঢ়তা। নূরাইসা স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল, চোখে জল, ঠোঁটে নিঃশব্দ কম্পন।ঠিক তখনই পাশে বসা দাদী ধীরে তার দুই হাত নিজের হাতে তুলে নিলেন। মমতাভরা কণ্ঠে বললেন—

-"জীবন সবসময় কোমল ফুল নয়, কখনো কাঁটার পথেও হাঁটতে হয়। তুমি সাহস রাখো। তুমি শক্ত হও।

তুমি যদি না দাঁড়াও, এই ঘর, এই ছায়া, এই শান্তি,সব হারিয়ে যাবে।"

দাদী দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও বললেন—

-"আমার দাদুভাইকে কষ্ট দিও না, বনু।" দাদীর কণ্ঠে মমতার সঙ্গে কাঁপা সুর। চোখে একসাথে ভালোবাসা আর আর্জি।

-"সে আমাদের সবার চোখের মণি। আমরা তোমাদের সবাইকেই সমান ভালোবাসি, মা। কিন্তু ইলহান... সে এই সংসারের প্রথম সন্তান, আমাদের প্রথম নাতি।তার জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই আমরা প্রথমবার দাদা-দাদী হওয়ার স্বাদ পেয়েছিলাম। ও-ই আমাদের শিখিয়েছে কেমন করে নাতি-নাতনিদের বুকভরা ভালোবাসায় আগলে রাখতে হয়। তোমার বড় বাবা আর বড় মা তার জন্যই বাবা-মা হওয়ার সুখটা প্রথম অনুভব করেছে।তাদের মধ্যে সেই যত্ন, সেই দায়বদ্ধতার বীজ বুনেছিল ইলহানের আগমন।

তোমার বাবা-মাও পিতা-মাতা হওয়ার আগেই, ওর জন্যই যেন বাবা-মা হয়ে উঠেছিল। তোমরা পৃথিবীতে আসার আগেই সে আমাদের সবাইকে শিখিয়ে দিয়েছিল কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে সন্তানকে আগলে রাখতে হয়, যেন তোমাদের বেলায় আমরা কোনো ভুল না করি। আমাদের প্রথম অনুভূতির নাম ইলহান।

ইলহান আমাদের সবার প্রথম ভালোবাসা। ও কষ্ট পেলে আমাদের বুকটা ফেটে যায়, যেমন তুমি কষ্ট পেলে ফেটে যায়। তোমরা দুজনই আমাদের প্রাণের টুকরো। তোমাদের এই মনোমালিন্য আমরা সহ্য করতে পারছি না, বনু। নিজেদের মাঝে সব ঠিক করে নাও, এই সংসারের শান্তি তোমাদের হাতেই।"

দাদীর কণ্ঠ ধীরে নিঃশেষ হয়ে আসে, চোখে জল চিকচিক করে। ঘরজুড়ে নেমে আসে এক গভীর নীরবতা, যেন দেয়ালের ছবিগুলোও শুনছে তার কথা,

যেন বাতাসও জানে, এই সংসারের প্রতিটি নিঃশ্বাসে কতটা ভালোবাসা লুকিয়ে আছে।

ঘরজুড়ে ভারী নীরবতা। উপস্থিত সবার চোখেই অশ্রু চিকচিক করছে। নূরাইসা চুপচাপ বসে কাঁদছে, নিঃশব্দে, নিঃশ্বাসের মতো কষ্টে। সে জানে, যতই সবাই মুখে বলুক "সবাইকে সমান ভালোবাসে", প্রথম সন্তান, প্রথম নাতির প্রতি যে ভালোবাসা, তা কখনোই অন্য কারো সঙ্গে তুলনীয় নয়।

তবু তাতে তার কোনো অভিমান নেই। তাকেও তো সবাই কম ভালোবাসে না, চোখে হারায়, বুকের ভেতর আগলে রাখে। সে বোঝে, দাদু এই বিয়েটা দিয়েছিলেন যেন সে এই বাড়িটাতেই থেকে যায়, এই সংসারের বন্ধন থেকে নিজেকে ছিন্ন না করে। নূরাইসা অবুঝ নয়, সবই বোঝে সে, বোঝে, ভালোবাসার আড়ালেও কত প্রকার ত্যাগ লুকিয়ে থাকে। চোখের পানি মুছে নূরাইসা ধীরে বলল—

-"আমি বুঝেছি তোমাদের কথা। কিন্তু দাদু... সে যদি আর্মিতে যায়, আর তার কিছু হয়ে যায়, তাহলে তোমাদের কিছুই হবে না। এক বছর, দুই বছর কাঁদবে, শোক করবে... তারপর তোমাদের জীবনে আবার আলো আসবে, তোমাদের অন্য ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনিরা থেকে যাবে।

কিন্তু আমি? আমি তো এক নিমিষেই নিঃস্ব হয়ে যাবো!

জানো কেন?"

সবাই থেমে যায়। কেউ কোনো কথা বলে না। নূরাইসার কণ্ঠে কান্নার কম্পন, তার নিঃশ্বাসের শব্দ। ঠিক তখনই দরজার পাশে এসে থামে একজোড়া পা, ধুলোমলিন বুটজোড়া, নিঃশব্দ উপস্থিতি। ইলহান। সে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, সব কথা শুনছে, কিন্তু কেউ এখনো তার উপস্থিতি টের পায়নি।

নূরাইসা মাথা না তুলেই, ভাঙা কণ্ঠে আবার বলল—

-"সে আমার স্বামী! আমার দুনিয়া এখন সে-ই!" নূরাইসার কণ্ঠে ব্যথার সঙ্গে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।

-"সে হারিয়ে গেলে আমার দুনিয়া তছনছ হয়ে যাবে।তোমরা তো বাকি ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি, ভাই-বোন, সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকবে, দাদু। এক সময়ে এই কষ্ট সয়ে যাবে, মানিয়ে নেবে সবাই।

এটা অন্যায়ও নয়, আমরা মানুষ, আমাদের নিয়তি এটাই, সব মানিয়ে নিয়েই বাঁচতে হয়, হাসতে হয়, সুস্থ থাকতে হয়। কিন্তু তোমরা সেটা পারলেও আমি তো পারব না! তোমাদের তো সবাই থাকবে, আর আমার? আমার তো কেউই থাকবে না!

ওই মানুষটা না থাকলে আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো, দাদু!তোমরা কেন আমার এই ভয়টা বুঝতে পারছো না?আমার পুরো জীবন তো তাকে ঘিরেই, সে না থাকলে আমি কাকে নিয়ে এই জীবন পার করব? তোমাদের মতো একসাথে বুড়ো হওয়ার সখ আমারও... কিন্তু কাকে নিয়ে সেই সখ পূরণ করব?"

ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে রইল নূরাইসার দিকে, এমন কথা সে বলবে, কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। সত্যিই তো, সবাই ভেবেছে নিজেদের মতো করে, কিন্তু কেউ ভাবেনি নূরাইসার জীবনটা নিয়ে, তার ভয়, তার শূন্যতা নিয়ে।

এ বড্ড অন্যায় হয়ে গেল। সবাই অপরাধী মুখে দাঁড়িয়ে আছে। দরজার আড়ালে ইলহান মাথা নিচু করে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল, চোখের কোণে জমে থাকা অজস্র অপরাধবোধ, ভালোবাসা আর অনুশোচনা।

নূরাইসা ধীরে উঠে দাঁড়াল। কেউ কিছু বলার আগেই চুপচাপ নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। তার পদচারণার শব্দ যেন ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসছে, প্রতিটি পদক্ষেপে ভারী হয়ে উঠছে বাতাস, আর সবাই শুধু তাকিয়ে রইল, নিঃশব্দে, অপরাধবোধে, অশ্রুভেজা চোখে।

.

ইলহান নিঃশব্দে ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। নূরাইসা বিছানার পাশে কাঠের তক্তায় পা নামিয়ে বসে আছে, দুই হাত খাটের ধারে ভর দিয়ে, হেঁচকি তুলে কাঁদছে সে। ঘরের বাতাস ভারী, নীরবতা ছড়িয়ে আছে চারপাশে। শুধু নূরাইসার দম আটকানো কান্নার শব্দ ঘর ভরিয়ে তুলছে।

ইলহান কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে তার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। নূরাইসা চমকে তাকালো। তার ফর্সা মুখ রক্তিম, চোখ দুটি ফুলে লাল হয়ে আছে, যেন অশ্রুতে ডুবে গেছে ক্লান্ত দুপুরের সূর্যের মতো। ইলহান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ, নিঃশব্দ, অপরাধবোধে নত। তারপর ধীরে দু’হাত বাড়িয়ে নূরাইসার কোমর জড়িয়ে নিল। মাথাটা তার কোলের ওপর রেখে কাঁপা কণ্ঠে বলল—

-"আর্মি আমার কাছে সব। ওটাই আমার নিশ্বাস, আমার পরিচয়। আমি বাঁচতে পারব না যদি আর্মি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবি। আপনার জন্য আর্মি ছেড়ে দিলেও, বিশ্বাস করুন, আমি আপনার কাছে মৃত হয়েই ফিরব। আমার মাঝে আর প্রাণ থাকবে না। মানুষ মরণশীল, নূরেজান। আমি যদি আজ বেঁচে থাকি, কাল যদি না থাকি, তখনও কি আপনি একই কথা বলবেন, যেটা নিচে দাদুকে বলে এলেন?"

নূরাইসা নিথর হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর কাঁপন থেমে গেল, চোখের জলে স্তব্ধতা নেমে এলো।

ইলহান ধীরে মুখ তুলে তাকালো তার দিকে। চোখ দুটি লালচে, ভেজা, ভেতরে অজস্র অনুতাপ জমে আছে। নূরাইসা সেই চোখের ভেতর দেখে নিল তার সব ভাঙাচোরা ভালোবাসা, সব কষ্টের অব্যক্ত ভাষা।

ইলহান আবারও নরম, ক্লান্ত কণ্ঠে বলল—

-"আমিও আপনাকে ভালোবাসি, নূরেজান। এমন ভালোবাসা যা কর্তব্যের চেয়েও গভীর, অথচ আর্মির শপথের চেয়ে দুর্বল। তাই যুদ্ধ শুধু ময়দানে নয়, আমার বুকের ভেতরেও প্রতিদিন লড়ে যাই আমি।"

ইলহান গভীর কণ্ঠে বলল—

-"পৃথিবীতে কেউ চিরস্থায়ী না, নূরেজান। সবাইকেই একদিন মরতে হয়, কেউ আগে, কেউ পরে। আমি যদি আর্মিতে না গিয়ে ব্যবসা করি, তাতেই কি সারাজীবন বেঁচে থাকব? যদি এক মাস, দুই মাস পরই মারা যাই? আমাদের কি উচিত না, বেঁচে থেকে নিজের মনের কথা শোনা? আমি যদি আর্মিতে মারা যাই, আপনি অন্তত গর্বিত হবেন, আপনার স্বামী দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু যদি ঘরে বসেই মারা যাই, তখন কি আপনি আফসোস করবেন না, কেনো আমায় আর্মিতে যেতে দিলেন না?"

কথাগুলো বলতে বলতে ইলহানের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কণ্ঠের প্রতিটি শব্দে ভারী নিঃশ্বাস, প্রতিটি বাক্যে গলায় জমে থাকা বেদনা। আর্মি ছেড়ে দেওয়ার কথা মুখে আনা তার কাছে যেন মৃত্যুর চেয়েও কঠিন। সত্যিই যদি সে আর্মি ছেড়ে দেয়, তবে সে বেঁচে থেকেও মৃত থাকবে।

নূরাইসা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার দিকে। এক মুহূর্তে সব অশ্রু থেমে গেল। তারপর নিজের চোখের পানি মুছে নিয়ে, কাঁপা ঠোঁট থামিয়ে, দৃঢ় অথচ শান্ত কণ্ঠে বলল—

-"আফসোস করব না।"

ইলহান থমকে গেল। বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকাল তার দিকে।

-"মানে?"

তার কণ্ঠে প্রশ্ন নয়, ছিল একরাশ হতভম্বতা, যেন নিজের কানে শোনা কথাটাকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ঘরের বাতাসে তখন নীরবতা জমে আছে, যেন সেই এক শব্দের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি দেয়ালে।

নূরাইসা ধীরে দুই হাত বাড়িয়ে ইলহানের গাল বেয়ে নামা অশ্রুবিন্দু মুছে দিল। তারপর নিঃশব্দে, শান্ত অথচ স্থির কণ্ঠে বলল—

-"আপনি আর্মিতে ফিরে যেতে পারেন! আমি বাধা দেব না।"

ইলহান এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। মনে হলো, নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। পরের মুহূর্তেই তার চোখে উজ্জ্বল আলো ফুটে উঠল। সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে নূরাইসাকে কোলের মধ্যে তুলে নিল, হঠাৎ, অবিশ্বাস্য উত্তেজনায়।

-"সত্যি বলছেন?"—তার কণ্ঠে বিস্ময় আর আনন্দের কম্পন।

নূরাইসা ভয় পেয়ে তার শার্ট শক্ত করে খামচে ধরল, চোখ বড় বড় করে বলল—

-"হ্যাঁ, সত্যি! এখন নামান, পড়ে যাব আমি!"

ইলহান হেসে উঠল, একটা উচ্ছ্বাসময়, প্রাণবন্ত হাসি, যা যেন দীর্ঘদিনের দুঃখ ভেদ করে বেরিয়ে এলো। সে নূরাইসাকে কোলে নিয়েই ঘুরতে লাগল, চারদিকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল তার কণ্ঠের গর্জন—

-"লে. কর্নেল ইলহানের স্ত্রী আপনি! জনগণ যদি শুনে ফেলে এই কথা, তারা হাসবে! আপনার স্বামী দুর্বল না, নূরেজান! বৃদ্ধ বয়সেও আপনাকে কোলে তুলে নিয়ে ১০০ মাইল দৌড়ানোর ক্ষমতা রাখে আপনার স্বামী!"

নূরাইসা আতঙ্কে আবারও শক্ত করে তার শার্ট খামচে ধরল, চোখ বন্ধ করে রইল। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি, অবচেতনেই ফোটে উঠল। মনে হচ্ছিল, দীর্ঘ অন্ধকারের পর অবশেষে জীবনের সূর্যটা আবার একটু আলো ছড়াল তাদের দুজনার উপর।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প