সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ১৩

🟢

রাতটা নূরাইসা নুহার সঙ্গেই কাটিয়েছিল। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে, এক অদ্ভুত অস্থিরতা নিয়ে যখন নিজের ঘরে ফিরে এলো, তখনই থমকে গেলো দরজার চৌকাঠে। চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে আছে, পুরো ঘর ভরে আছে কাঁচা ফুলের সুবাসে। মেঝেতে ছড়ানো ফুলের পাপড়ি, পর্দার গায়ে গায়ে ঝুলে আছে ফুলের মালা, আর বিছানার মাঝখানে একটিমাত্র গিফট বক্স, চুপচাপ, অথচ উপস্থিতিটা যেনো পুরো ঘর দখল করে আছে।

এক মুহূর্তে বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেলো তার।কার এমন সাহস? রাতের গভীরে কে এসেছিল এই ঘরে?ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নূরাইসা দৌড়ে গেলো আফরিন ও নুহার রুমে। দু’জনকে টেনে নিয়ে এলো নিজের ঘরে।

ঘরে ঢুকেই নুহা থমকে দাঁড়াল। আফরিনের কপাল ভাঁজ পড়ল। তিনজনের চোখে একটাই প্রশ্ন— "কে করল?"

সন্দিহান চোখে তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো গিফট বক্সটার দিকে। বক্সের পাশে রাখা ছিলো একটা ছোট্ট চিরকুট। নুহা সেটি তুলে নিয়ে কাঁপা কণ্ঠে জোরে পড়ল—

-"অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলাম, কিন্তু আপনি এই ঘরেই আসলেন না। তাই চলে গেলাম। আশা করি উপহার আপনার পছন্দ হবে।"

এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো ঘরে।ফুলের গন্ধটা যেনো এখন বিষাক্ত লাগছে। তিনজনে এমনভাবে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল, মনে হলো যেনো বাতাসেও কেউ গোপনে হাসছে।

অস্থির হয়ে উঠল নূরাইসা। আফরিন বক্সটা খুলতে যাবে , কিন্তু তার আগেই নূরাইসা তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল—

-"খোলার প্রয়োজন নেই! কে না কে দিয়েছে, যদি খারাপ কিছু থাকে?"

আফরিন একটু সোজা হয়ে বলল—

-"না খুললে জানব কিভাবে কি দিয়েছে?"

নূরাইসার গলা কেঁপে উঠল, তবুও চোখে দৃঢ়তা—

-"জানার দরকার নেই... ফেলে দে ওটা।"

নুহা কাছে এগিয়ে এসে সাবধান স্বরে বলল—

-"কিন্তু আপু, জানা তো দরকার। এত রাতে কেউ তোর ঘরের বারান্দা দিয়ে উঠেছে! পরের বার যদি আবার আসে, তোর ক্ষতি করে তখন?"

নূরাইসা এক গভীর শ্বাস ফেলে উত্তর দিল—

-"সৎ উদ্দেশ্য যে না, তা তো স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। আমি এইসব নিয়ে আর ভাবতে চাই না। ইলহান ভাই না ফেরা পর্যন্ত আমি তোর বা আফরিনের সাথেই থাকব।

আর বাড়ির কাউকে এই ব্যাপারে কিছু বলার দরকার নেই!"

দুজনেই বুঝে গেলো, নূরাইসার ভয়টা গভীর, অজানা আতঙ্কে ভরা।তারা আর জোর করল না। আফরিন নিঃশব্দে গিয়ে গিফট বক্সটা তুলে নিয়ে বারান্দা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলল। নুহা ধীরে জিজ্ঞাসা করল—

-"ফুলগুলো কি করবো?"

নূরাইসা নিচু স্বরে বলল—

-"ফেলে দে।"

তিনজন মিলে ঘর পরিষ্কার করে ফেলল। ফুলের সৌরভ মিলিয়ে গেল ধীরে ধীরে, কিন্তু ঘরের ভেতর রেখে গেল এক অদ্ভুত ভারী নীরবতা।

তারপর, যেন কিছুই হয়নি, তিনজন স্বাভাবিক মুখে নিচে নেমে এল। নূরাইসা হাসিমুখে সবার সঙ্গে নাস্তা করল, কথা বলল, কিন্তু তার চোখের ভেতর, এক টুকরো অজানা ভয় তখনো নিঃশব্দে কাঁপছিল।

.

আজ ২৫ আগস্ট। নূরাইসার ভার্সিটিতে অনুষ্ঠান।সকাল থেকেই চারপাশে উৎসবের আমেজ। আঙিনা ভরাট হয়ে আছে ছাত্রছাত্রীদের হাঁকডাক, ঝলমলে সাজসজ্জা আর আলোর রঙিন ছটায়। নূরাইসা,সাজগোজের প্রস্তুতি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছে। নুহার যাওয়ার ইচ্ছে না থাকায় তাকে আর নেওয়া হয়নি। শুধু আফরিন এসেছে সাথে। নূরাইসা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে নাচের পোশাক আর গয়না, ভার্সিটির গ্রিন রুমেই হবে শেষ প্রস্তুতি।

গ্রিন রুমে ঢুকতেই যেন ছোটখাটো মেলার ভিড়। আয়নার সামনে ঝুঁকে আছে কেউ চোখে কাজল টানছে, কেউ গালে লালচে ব্লাশ ছড়াচ্ছে, কেউ বা সাজপোশাকের ভাঁজ মেলায় ব্যস্ত। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ফেস পাউডারের গন্ধ আর মেয়েদের চাপা হাসাহাসি। সবাই তৈরি হতে এতটাই মগ্ন, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই স্টেজ কাঁপিয়ে দিতে হবে তাদের।

নাচের দলে নূরাইসা একাই। অন্যদিকে ফারাহ্, মেঘ আর স্মৃতি মিলে প্রস্তুত করছে দলীয় নাচ। আশিক ও নাহিদ আলাদা করে ফারাহ্ ও স্মৃতিকে নিয়ে কাপল ড্যান্স করবে, তাদের হাসি আর ঠাট্টায় পুরো ঘর সরগরম।

ঠিক তখনই সবার নজর পড়লো নূরাইসার পোশাকে। গোল কাটের একটি লম্বা জামা গায়ে দিয়েছে সে।দেখে ফারাহ্ ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এল।

-"এইসব কি পরেছিসি? শাড়ি পর।"

হাতে চুড়ি পরতে পরতে নূরাইসা শান্ত গলায় বলল—

-"শাড়ি পরা সম্ভব না।"

মেঘ বিস্মিত চোখে প্রশ্ন ছুঁড়ল—

-"কেনো?"

নূরাইসা একটু থেমে গম্ভীরভাবে ঘুরে তাকাল তার দিকে। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

-"আমার পতিদেব বারণ করেছে। সে ছাড়া অন্য কেউ আমাকে শাড়িতে দেখতে পারবে না।"

বাক্য শেষ হতেই মুহূর্তের জন্য ঘর নিস্তব্ধ। তারপর ফারাহ্ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ফেলল—

-"অতি পতিভক্তি চরের লক্ষণ!"

এবার মেঘ আর স্মৃতিও খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করল। তাদের হাসির মধ্যে কেমন যেন কটাক্ষ মিশে গেল। নূরাইসা গোমড়া মুখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, চোখেমুখে অভিমান জমে উঠল যেন। ফারাহ্ কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বলল—

-"রবীন্দ্রসঙ্গীতে শাড়িই মানাবে তোকে।"

নূরাইসা হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে ফিসফিস করে বলল—

-"জানতে পারলে আসত গিলে খাবে !"

ফারাহ্ এক চিলতে আশ্বাসের হাসি ছড়িয়ে দিল।

-"জানবে কীভাবে? ভাইয়া তো এখানে নেই। আর আমরা কেউ জনাব না।"

কথাগুলো যেন এক প্রকার শলাকা হয়ে গেঁথে গেল নূরাইসার মনে। শেষমেশ সবাই মিলে প্রায় জোর করেই তাকে শাড়ি পরিয়ে দিল। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই রঙিন শাড়িতে নূরাইসা যেন আরও উজ্জ্বল, আরও দীপ্তিময় হয়ে উঠল। কিন্তু তার চোখের গভীরে লুকিয়ে রইল একরাশ দুশ্চিন্তা।

অন্যদিকে স্টেজে তখন কবিতা আবৃত্তি চলছে, কারও কণ্ঠে ভেসে আসছে গান। দর্শকসারিতে বসে আফরিন মগ্ন হয়ে উপভোগ করছে অনুষ্ঠান। আর গ্রিন রুমে নীরবে তৈরি হচ্ছে এক অনুচ্চারিত নাটক, ভালোবাসা, ভয় আর বিদ্রূপের মিশ্র এক অদ্ভুত দৃশ্য।

একে একে নাম ডাকা শুরু হলো। সিনিয়র, জুনিয়র, সব ক্লাসের ছেলেমেয়েরা ঝলমলে আলোয় একে একে নাচতে উঠল। করতালি, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, উল্লাসে পুরো অডিটোরিয়াম সরগরম। অবশেষে ডাক এলো নূরাইসাদের ক্লাসের। প্রথমে ফারাহ্, মেঘ, স্মৃতিদের গ্রুপ ড্যান্স, তারপর আশিক আর নাহিদের কাপল ড্যান্সে স্টেজ জমে উঠল।

শেষে নাম ঘোষণা হতেই আলো এসে থামল নূরাইসার উপর। এক মুহূর্তের জন্য তার বুক ধড়ফড় করে উঠল। কিন্তু সুর বাজতেই যেন এক অদৃশ্য সাহস ভর করল তার শরীরে। নূরাইসা মঞ্চ জুড়ে ছড়িয়ে দিল এক স্নিগ্ধ নৃত্যরেখা। দর্শকসারিতে বসে থাকা ফারাহ্, মেঘ, স্মৃতি, আফরিন, আশিক, নাহিদ, সকলের হাততালি একসাথে মিলিয়ে যেন বজ্রধ্বনি তুলল। কেউ ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে, মুহূর্তটি সবার জন্যই এক আনন্দঘন স্মৃতি হয়ে রইল।

নাচ শেষে নূরাইসা কাঁপা-কাঁপা পদক্ষেপে নামল মঞ্চ থেকে। বন্ধুরা এগিয়ে এসে প্রশংসার ঝড় তুলল।

-"দারুণ নেচেছিস!"

-"বিশ্বাসই হচ্ছে না তুই এমন নাচতে পারিস!"

কথাগুলো শুনে নূরাইসার গাল লালচে হয়ে উঠল। লজ্জায় সে মাথা নিচু করল। এত মানুষের সামনে এই প্রথম সে নেচেছে, ভয়ে, লজ্জায় তার ভেতরটা ওলটপালট হচ্ছিল। অথচ প্রশংসার ঢেউ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। সে দ্রুত সরে এল বন্ধুদের ভিড় থেকে। প্রস্থান করল নিঃশব্দে, যেন দম নিতে চায়। গ্রিন রুমের দিকে যাচ্ছিল ঠিক তখনই, হঠাৎই অডিটোরিয়ামের কোলাহল ছাপিয়ে ভেসে এলো এক পুরুষালি কণ্ঠস্বর—

-"ইসা... দাঁড়াও!"

পা থেমে গেল নূরাইসার। সে ধীরে ঘুরে তাকাল।দেখল, রিদওয়ান দ্রুত তার দিকে ছুটে আসছে। কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়াল তার সামনে।

-"অনেক সুন্দর নেচেছো!"

নূরাইসা মুখ নিচু করে, লজ্জা সামলে ছোট্ট স্বরে বলল—

-"ধন্যবাদ, ভাইয়া।"

রিদওয়ান ঠোঁটে মৃদু হাসি মেখে বলল—

-"তোমাকে কিছু বলার ছিল।"

নূরাইসা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রইল। বাতাসে তখন হালকা গুঞ্জন, দূরে ভেসে আসছে মাইকের আওয়াজ। রিদওয়ান গভীর শ্বাস নিল, যেন সাহস সঞ্চয় করছে। তারপর থেমে থেমে বলল—

-"আসলে... আমার তোমাকে ভালো লাগে। অনেক দিন ধরে বলতে চাইছি, কিন্তু সাহস হয়নি। তুমি খুব একটা কথাও বলো না, তাই কখনো সুযোগও পাইনি। কিন্তু আজ... আজ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। নূরাইসা, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি কি... তুমি কি আমার গার্লফ্রেন্ড হবে?"

বিস্ময়ে যেন জমে গেল নূরাইসা। তার চোখ বড় হয়ে উঠল, ঠোঁট শুকিয়ে এল। পুরো পৃথিবী যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। রিদওয়ান তার দিকে তাকিয়ে আছে, চোখে একরাশ আশার ঝিলিক। নূরাইসা কিছু বলতে উদ্যত হতেই পেছন থেকে ভেসে এলো বজ্রকণ্ঠের এক কর্কশ, পুরুষালি আওয়াজ—

-"শি ইজ ম্যারিড!"

অডিটোরিয়ামের কোলাহলও সেই কণ্ঠস্বরের সামনে মুহূর্তে থেমে গেল। কথাটি বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতেই নূরাইসার ডান পাশ দিয়ে হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল এক পুরুষ। চোখেমুখে তীব্র ক্রোধ, দৃষ্টি যেন অগ্নিশিখার মতো জ্বলছে। নূরাইসা পাশ ফিরে তাকাতেই তার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে এলো, বুকের ভেতর জমে উঠল স্তব্ধতা।

রিদওয়ানও ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল সেই পুরুষটির দিকে। তারপর জড়ানো কণ্ঠে প্রশ্ন করল—

-"ম্যারিড? কবে বিয়ে হয়েছে ইসার? কার সাথে বিয়ে হয়েছে?"

এক মুহূর্ত দেরি না করে পুরুষটি উত্তর দিল—

-"আমার সাথে।"

শব্দগুলো যেন বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ল চারপাশে। রিদওয়ান হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। কণ্ঠে অবিশ্বাস আর কাঁপন—

-"আপনি না ওর চাচাতো ভাই?"

ইলহানের চোখ তখন রক্তবর্ণ, দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল—

-"ছিলাম! এখন আমি ওর হাজব্যান্ড। তুমি আমার বউকে প্রপোজ করেছ... এখন তোমাকে কি করা..."

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই পেছন থেকে বিহান ছুটে এসে ইলহানের কাঁধে হাত রাখল, শক্ত কণ্ঠে থামিয়ে দিল—

-"ঝামেলা বাড়িও না। চলে যাও, রিদওয়ান।"

রিদওয়ান মুহূর্তের জন্য কিছু বলতে চাইল, চোখে কষ্ট আর অপমানের ছাপ, কিন্তু পরিবেশের টানটান উত্তেজনা তাকে পিছু হটতে বাধ্য করল। গম্ভীর মুখে সে ঘুরে চলে গেল অডিটোরিয়ামের ভিড়ের ভেতর।

রিদওয়ান চলে যেতেই ইলহান হঠাৎ তীব্র আক্রোশে নূরাইসার দিকে ঘুরল। রক্তচক্ষু নিয়ে তার গলা চেপে ধরল। টেনে একদম নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে হিসিসিয়ে বললো, সেই হিসিসিয়ে বলা কথা গুলোতে আগুন ঝরছিল—

-"তোকে বলিনি, আমি ছাড়া অন্য কেউ তোকে শাড়িতে দেখবে না। তাহলে কোন সাহসে তুই শাড়ি পরে বাইরে এলি?"

ইলহানের চোখে তখন উন্মত্ততার ছায়া। স্থান, কাল, পরিবেশ, সব ভুলে গেছে সে। একমাত্র জ্বলন্ত চিন্তা তাকে পাগল করে তুলেছে, শাড়িতে সাজানো তার নূরেজানকে অন্য কেউ দেখেছে! অন্য কেউ দেখেছে তার বউ কতটা সুন্দর! এই চিন্তা তাকে দমিয়ে আনছে না, বরং আরও ক্ষিপ্ত করে তুলছে।

বিহান ছুটে এসে ইলহানের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। আতঙ্কে চারদিকে কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে পড়েছে। বিহানের কণ্ঠে তাড়াহুড়ো আর শাসন—

-"ইলহান থাম! এটা একটা ভার্সিটি। মানুষজন দেখছে। তুই কথা দিয়েছিলি, শুধু দূর থেকে একবার ইসাকে দেখে চলে যাবি। এখন সিন ক্রিয়েট করিস না!"

কিন্তু ইলহানের কানে কিছুই পৌঁছাল না। তার আঙুলের বাঁধন আরও শক্ত হলো। নূরাইসার শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। ইলহান যেন রক্তচক্ষু নিয়ে পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সমস্ত দখলদারিত্ব নিয়ে।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, গলা চেপে ধরা অবস্থাতেই নূরাইসা ভাঙা গলায় বলে উঠল—

-"মিথ্যেবাদী!"

বিজ্ঞাপন

শব্দটি ছুরির মতো গেঁথে গেল ইলহানের বুকের ভেতরে। চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল, মানুষজনের দৃষ্টি জমে গেল তাদের উপর, যেন সময় থেমে গেছে।

নূরাইসার বাম চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রুর একটি রেখা। সেই ফোঁটা যেন আগুনের মতো ছুঁয়ে গেল ইলহানের বুক। তার শক্ত বাঁধন ধীরে ধীরে আলগা হতে লাগল। বিহান হতাশায় মাথা নিচু করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যেন আগাম বিপর্যয়ের ছায়া সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।

নূরাইসা আবারও ফিসফিস করে বলল—

-"প্রতারক!"

শব্দটা বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ল ইলহানের অন্তরে। মুহূর্তেই তার হাত ছেড়ে দিল নূরাইসার গলা। মুক্তি পেয়েই নূরাইসা এক ছুটে বেরিয়ে গেল সেখান থেকে। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা, ডান হাত দিয়ে বারবার মুছছে চোখ, কিন্তু থামানো যাচ্ছে না সেই দুঃখের স্রোত। তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল ভার্সিটির করিডরে।

ইলহান বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ আটকে আছে নূরাইসার প্রস্থানের দিকে। কিছুই যেন বুঝতে পারছে না। উল্টো ঘুরে সে বিহানের দিকে তাকিয়ে ভারী শ্বাস নিয়ে ফিসফিস করে বলল—

-"আমাকে মিথ্যেবাদী, প্রতারক কেন বলল?"

বিহান একবার তার দিকে তাকাল। দৃষ্টি যেন ছুরির মতো গেঁথে গেল ইলহানের উপর। মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নিয়ে আবার নিঃশব্দে নিচু হয়ে গেল। ইলহান হঠাৎ থমকে গেল, বিহানের দৃষ্টি দেখে নিজেই নিচের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে উঠল—

-"ও শিট... আমি ইউনিফর্ম পরে আছি!"

কথাটা মুখ থেকে ঝরতেই আর এক মুহূর্ত নষ্ট করল না। ইলহান ছুটে বেরিয়ে গেল নূরাইসার পিছু, যেন প্রলয়ঙ্করী বাতাস তার পা তাড়া করছে। পেছন পেছন ছুটলো বিহানও, তার মুখে নিঃশ্বাসের সাথে মিশে আছে শঙ্কার ছাপ।

নূরাইসা দৌড়াতে দৌড়াতে পৌঁছল ভার্সিটির মেইন গেটে। তার ঠিক উল্টো দিক দিয়ে ভেতরে ঢুকছিল আরও পাঁচজন সেনাসদস্য, সবাই আর্মি পোশাকে, তাদের ভেতরে একজন নারীও ছিল। প্রবল গাম্ভীর্যে ঢুকতেই তাদের চোখ থেমে গেল নূরাইসার উপর। এক ঝলক দৃষ্টি, যেখানে প্রশ্ন, বিস্ময় আর সংশয় মিলেমিশে আছে।

কিন্তু মুহূর্তের ব্যবধানে তাদের সামনে ছুটে এলো ইলহান। তার চোখ জ্বলছে ক্রোধে, আর পেছনে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়াচ্ছে বিহান। দৃশ্যটা এতটাই অস্বাভাবিক যে পাঁচজনই থমকে দাঁড়িয়ে গেল।কপালে ভাঁজ পড়ল সবার। তাসিন কণ্ঠে বিস্ময় নিয়ে চিৎকার করে উঠল—

-"সাইফারএক্স স্যার! আপনারা দৌড়াচ্ছেন কেন?"

বিহান দৌড়াতে দৌড়াতে, কণ্ঠে উত্তেজনা আর ক্লান্তি মিশিয়ে উত্তর দিল—

-"তোমাদের বসের দুদিনের সংসার বাঁচাতে!"

শব্দগুলো বাতাসে ধাক্কা খেয়ে ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু কেউ তা পুরোপুরি বুঝল না। তারা বিস্মিত দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে রইল ইলহান, নূরাইসা আর বিহানের প্রস্থানের দিকে। এক মুহূর্ত থমকে থাকার পর বাকিরা দ্রুত জিপের দিকে এগিয়ে গেল। ভেতরে বসার সময়ও তাদের চোখে ছিল অদ্ভুত এক প্রশ্ন, বসের দুদিনের সংসার... সেখানে কী ঝড় বইছে? আর এইজিস নভার বিয়ে করলো কবে?

.

ভার্সিটির গেট পেরিয়ে নূরাইসা ছুটে উঠলো রিকশায়। চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে কান্নায়। পথের মানুষজন তাকাচ্ছিল, তবু সে কিছুই টের পাচ্ছিল না। হৃদয়টা যেন ফেটে যাচ্ছে। বাড়ির ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকেই সে ফুঁপিয়ে উঠল। চিৎকার ভরা কান্নায় ঘর কেঁপে উঠলো।

ইকবাল দেওয়ান আর নাহিদ দেওয়ান ঘর থেকে ছুটে এলেন, আজ তারা অফিসে যান নি। বৃদ্ধ দাদা-দাদিও লাঠি ফেলে এগিয়ে এলেন। রুহান-তানভীর ভিডিও গেম খেলছিল, কান্নার শব্দে গেম ফেলে ছুটে এলো তারা। রান্নাঘর থেকে ছুটে এলো ইলিনা বেগম, নাজনীন বেগম আর নুহা। দরজায় দাঁড়ানো বিধ্বস্ত নূরাইসাকে দেখে সবার বুক কেঁপে উঠল। সবাই বিচলিত হয় এগিয়ে এসে বলল—

-"কি হয়েছে ইসা? তোর এই অবস্থা কেনো?"

কান্নাজড়ানো কণ্ঠে নূরাইসা বলে উঠলো,

-"তোমরা আমাকে এক প্রতারকের হাতে তুলে দিয়েছো... তোমাদের ছেলে একজন মিথ্যেবাদী প্রতারক!"

সবার নিঃশ্বাস আটকে গেল। নাজনীন বেগম দৌড়ে এসে নূরাইসাকে ধরে বললেন—

-"কি বলছিস তুই? ইলহান কি করেছে?"

ঠিক তখনই, পেছন থেকে ধীরপায়ে ভেতরে প্রবেশ করল ইলহান। বুকভরা আর্মি ইউনিফর্ম, তবু তার মুখে কোনো গৌরব নেই। বাদামি চোখে একরাশ বিষণ্ণতা। বুকের পাশে স্পষ্ট লেখা—

-"Lieutenant Colonel Ilhan."

তার পাশে আরেকটা ছায়া। বিহান। তার বুকের বাম দিকে লেখা—

-"Major Bihan."

ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। সবার চোখে উত্তর এসে গেল। এক মুহূর্তে বাড়ির সবাই বুঝে গেলেন অদেখা কাহিনি। কেন নূরাইসা আজ এমন ভাঙাচোরা হয়ে ফিরেছে। ইলহান ও বিহান দুজনেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। নিস্তব্ধ ঘরে নাজনীন বেগম নির্বাক।

পরিবারের সবার দৃষ্টি দেখে নূরাইসার বুকের ভেতর হঠাৎ সন্দেহ জেগে উঠল। সে সবার দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলে উঠল—

-"তোমরা সবাই জানতে?"

মাথা নিচু করে নীরব সম্মতি দিল সকলে। চোখ লাল হয়ে উঠল নূরাইসার। ভাঙা বুকের সমস্ত যন্ত্রণা মিলিয়ে ক্ষোভের ঝড়ে চিৎকার করে উঠল সে—

-"তোমরা সবাই মিথ্যেবাদী প্রতারক! সব জানতে তোমরা, শুধু আমাকে আর বড় মাকে অন্ধকারে রেখেছ! আমাদের থেকে লুকিয়ে রেখেছিলে সত্যটা। তোমরা সবাই প্রতারক!"

নূরাইসার কান্না হঠাৎই পরিণত হলো উন্মাদের মতো চিৎকারে। সবাই হতভম্ব। তার এই রূপ বাড়ির কেউ কোনো দিন দেখে নি। ঠিক তখনই ইলহান এগিয়ে এলো। তার গম্ভীর চোখে এক ভয়ঙ্কর দৃঢ়তা।

হঠাৎই নাজনীন বেগমের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, শরীর ঢলে পড়ল মেঝেতে। রুহান ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে আগলে ধরল। এক মুহূর্ত দেরি করল না ইলহান। ঝড়ের বেগে নূরাইসাকে জড়িয়ে কোনো কথা না বাড়িয়ে নূরাইসাকে জোর করে কাঁধে তুলে নিল। ওপরে উঠতে উঠতে গম্ভীর স্বরে বলল—

-"মাকে রুমে নিয়ে যা, আমি আসছি।"

কাঁধে ঝুলে থাকা নূরাইসা ধস্তাধস্তি শুরু করে দিল। অসহায় রাগে কণ্ঠ ফেটে গেল তার—

-"ছাড়ুন আমাকে! নামিয়ে দিন... আমি বলছি নামিয়ে দিন!"

কিন্তু ইলহান বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করল না। নীরব, কঠোর ভঙ্গিতে তাকে নিয়ে সোজা হেঁটে গেল তাদের ঘরে। ঘরে ঢুকেই নূরাইসাকে মেঝেতে নামিয়ে দিল। নূরাইসা চোখ লাল করে দাঁড়াল। দরজার দিকে পা বাড়াতেই ইলহান ঝড়ের মতো ঘুরে দাঁড়াল। বাদামি চোখে জ্বলে উঠল আগুন। হুংকার ছেড়ে বলে উঠলো—

-"একদম এই ঘরের বাইরে পা রাখবি না!"

তার কণ্ঠে বজ্রনাদ, রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে বলল—

-"যদি এক পা বাইরে গিয়েছিস, তাণ্ডব শুরু করবো আমি!"

কথাটা ছুঁড়ে দিয়ে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না সে। দরজা খোলার শব্দ হলো, তারপর ঠাস করে বন্ধ। বাইরে থেকে লাগিয়ে দিল। ইলহানের ভারী বুটের শব্দ সিঁড়ি বেয়ে দূরে মিলিয়ে গেল। তার গন্তব্য, মায়ের ঘর।

.

ইলহান নাজনীন বেগমের ঘরের দরজার সামনে এসে নিঃশব্দে দাঁড়ালো। ভিতরে তখন রুহান মায়ের মুখে পানি ছিটিয়ে তাঁর জ্ঞান ফিরিয়েছে। নাজনীন বেগম ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। ইলহান মৃদু পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল। নাজনীন বেগম তাকালেন না, তাঁর চোখে অভিমান, নীরবতার ভেতরে লুকিয়ে থাকা মাতৃত্বের ব্যথা। ইলহান তা বুঝল। সে মায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মায়ের দুই হাত তুলে নিল নিজের হাতের মুঠোয়। নরম কণ্ঠে বলল—

-"রাগ করো না মা... তুমি কষ্ট পাবে বলেই তোমাকে বলিনি।"

নাজনীন বেগম কোনো উত্তর দিলেন না। ইলহান হার মানল না, আবারও বলল—

-"তুমি তো জানো মা, আর্মি আমার প্রাণ, আমার নেশা, আমার ধ্যানজ্ঞান সব। আমি এই পেশা ছাড়া বাঁচতে পারব না। তুমি তো জানো আমি কতটা পাগল আর্মির জন্য।"

নাজনীন বেগম এবার ধীরে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন—

-"তাই বলে নিজের জীবন বারবার ঝুঁকিতে ফেলবে? কেউ আমাকে জানালো না পর্যন্ত!"

ইকবাল দেওয়ান তখন এগিয়ে এসে শান্ত কণ্ঠে বললেন—

-"আমি বারন করেছিলাম। ইলহান ছোট থেকেই পড়াশোনায় অসাধারণ। ওর ফটোগ্রাফিক মেমোরির জন্য অল্প বয়সেই অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আমার ছেলে দেশের জন্য জীবন দিলেও আমার আফসোস থাকবে না, বরং গর্ব হবে।"

নাজনীন বেগম ছলছল চোখে তাকালেন স্বামীর দিকে। ইলহান মায়ের মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে নরম স্বরে বলল—

-"আমি যদি আর্মিতে না ফিরতাম মা, তবে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে মরে যেতাম। সেটা তোমার জন্য আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক হতো। তুমি কি পারতে চোখের সামনে নিজের ছেলেকে তিলে তিলে শেষ হতে দেখতে?"

নাজনীন বেগম ফুপিয়ে উঠলেন। তিনি জানেন, তাঁর ছেলের কাছে আর্মি মানে নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো প্রয়োজন। তিনি সেই স্বপ্নে বাধা হতে চান না, আবার হারানোর ভয়ও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ছেলের মাথায় হাত রেখে ধীরে বললেন—

-"আমি না হয় তোমার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে অনুমতি দিতাম... যাও, আজ তোমাকে অনুমতি দিলাম। আমার বুক খালি করে ফিরো না।"

ইলহান মায়ের হাত চুমু খেয়ে হালকা হেসে বলল—

-"ইনশা আল্লাহ! আল্লাহ তোমার বুক খালি করবেন না, মা।"

নাজনীন বেগম চোখ মুছে ধীর স্বরে বললেন—

-"কিন্তু নূরাইসা মানবে না। ওকে কিভাবে বোঝাবে?"

ইলহান মাথা নিচু করে নীরব হলো। কীভাবে বোঝাবে সেই অবুঝ মেয়েটিকে, যে নিজের চাচাতো ভাই ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও তাকে আর্মিতে পাঠাতে রাজি ছিল না? সেখানে তার স্বামী, সেই মানুষটিই ফিল্ডে ফাইট করবে, সে কি তা মেনে নেবে?

.

সন্ধ্যার নরম আলোয় ঘরটিতে ছায়া ঘনিয়ে এসেছে। জানলার পর্দা হালকা বাতাসে দুলছে, কোথাও দূরে আজানের ধ্বনি মিলিয়ে যাচ্ছে। এমন এক বিষণ্ণ আলো–আঁধারিতে ইলহান ঘরে ফিরে এলো অনেক ক্ষণ পর। নাজনীন বেগমকে বুঝিয়ে শান্ত করতে সময় লেগেছিল বেশ।

ঘরে ঢুকেই নূরাইসাকে কোথাও দেখতে পেল না। বুকের ভেতর হঠাৎ এক অজানা শঙ্কা ভর করলো তার। বিচলিত পায়ে সে বারান্দায় চলে এলো। ইলহানের বারান্দায় নিচের টুকু গ্রিল দিয়ে সাজানো, বাকি উপরের অংশে কোনো গ্রিল নেই, একদম উন্মুক্ত। নূরাইসা সেখানে গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। নূরাইসাকে দেখে ইলহানের দেহে যেন প্রাণ ফিরে এলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সে। নীরবে পিছন থেকে নূরাইসাকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিল।

নূরাইসা এক মুহূর্তে চমকে উঠল, তারপর বুঝতে পেরে ছিটকে সরে গেল। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল—

-"একদম ছুবেন না আমায়! একদম কাছে আসবেন না!"

ইলহান ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল—

-"আমার বউকে আমি ছুবো, তুই বলার কে?"

নূরাইসা তেতে উঠল—

-"আপনি মিথ্যে বলছেন! মিথ্যেবাদী, প্রতারক! বাড়ির সবাই আমাকে মিথ্যে বলছে। আপনি এখনো আর্মিকে ভুলতে পারেননি। অথচ আপনি কথা দিয়েছিলেন, আর ফিরে যাবেন না!"

ইলহান শান্ত কণ্ঠে মানানোর সুরে বলল—

-"শান্ত হোন নূরেজান, আমার কথাটা তো শুনুন।"

-"কোনো কথা শুনব না আপনার! আপনি মিথ্যেবাদী!এই কারণেই আপনি এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করেছেন। এখন আমি সব বুঝতে পারছি।"

ইলহান হাত বাড়াল তাকে ধরার জন্য। নূরাইসা এক ঝটকায় হাত সরিয়ে বলল—

-"কোন সাহসে স্পর্শ করেন আমায়? একদম ধরবেন না, দূরে থাকুন!"

এতক্ষণ ধৈর্য ধরে থাকা ইলহান এবার আর পারল না। এক ঝটকায় নূরাইসাকে টেনে নিজের বুকে আনল। নূরাইসা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই ইলহানের রুক্ষ কণ্ঠ ছুঁয়ে গেল তার কান—

-"সমস্যা কী? আমাকে তো পছন্দ না তোর, বিয়ে করতে চাস নি। তাহলে আমার জন্য এত অতলা হচ্ছিস কেন? কিছু হলে আমার হবে, তুই কেনো এত ভয় পাচ্ছিস? ম র লে আমি ম র ব তোর কি?"

নূরাইসা হঠাৎ থমকে গেল। ইলহানের বুকের ভেতর তার নিঃশ্বাসের ওঠানামা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে সে চোখ তুলে তাকালো তার দিকে, এই প্রথম সে ইলহানের বাদামি চোখের গভীরে চোখ রাখল।

বলা বাহুল্য, দেওয়ান বাড়ির পুরুষদের চোখের রঙ সবাই জানে, এক অদ্ভুত উষ্ণ বাদামি, যেন ভেতরে লুকিয়ে আছে দগদগে আগুন, সূর্যের মতো। মেয়েরা সেই রঙের ভাগ পায়নি। নূরাইসার চোখে সেই মুহূর্তে ইলহানের দৃষ্টি আরও প্রখর হয়ে উঠল। অশ্রুসিক্ত নয়নে নূরাইসা কাঁপা কণ্ঠে বলল—

-"আমি.... কে?"

ইলহান নিজের ভুল বুঝতে পারল নূরাইসার ভাঙ্গা কন্ঠস্বর শুনে। সে উতলা হয়ে বলল—

-"আমি ঐভাবে বলতে চাই নি নূরেজান!"

নূরাইসা চোখ বন্ধ করে লম্বা একটি নিশ্বাস নিয়ে বলল—

-"আপনি হয়তো অতীত ভুলেছেন, কিন্তু আমি ভুলি নি।"

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প