আজ ৩০ জুন। নূরাইসা আর আফরিনের পরীক্ষা শেষ হয়েছে আজই। বিকেল গড়িয়ে প্রায় সাড়ে চারটা। মাঠের সবুজ ঘাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে সবাই। আকাশে হালকা রোদ, গ্রীষ্মের বিকেল হলেও বাতাসে আছে একরকম হালকা স্বস্তি। শেষ পরীক্ষার মুক্তি যেন সবার মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিয়েছে। তাই আজ ঠিক হয়েছে, সবাই মিলে একটু ঘুরতে যাবে।
কিন্তু তাদের এই আনন্দে যেন এক অদ্ভুত অপেক্ষার সুর বেজে চলেছে। সবাই বসে আছে আশিক ও নাহিদের জন্য। আশিক এখনো আসে নি। সেদিনের পর থেকে আশিক আর মেঘের সামনে দাঁড়াতেও সাহস করে নি। যেখানে মেঘকে দেখেছে, সেই জায়গাটাই এড়িয়ে গেছে সে। এমনকি নূরাইসা, ফারাহ, স্মৃতি, আশিক আর নাহিদ বসে যখন আড্ডা দিয়েছে, হঠাৎ মেঘ এসে পড়লে আশিক মুহূর্তে সরে গেছে। এই ব্যাপারটা সবার চোখেই ধরা পড়েছে। তবুও, আশিক চুপচাপ তার দূরত্ব বজায় রেখেছে।
অন্যদিকে, মেঘ যেন নির্লিপ্ত। একেবারেই ভাবলেশহীন। সাব্বিরের সাথে সম্পর্ক জড়ানোর পর সে বেশ হাসিখুশিই থাকে। আশিকের দিকে ফিরেও তাকায় না। অথচ বন্ধুদের চোখে চোখে এই ব্যবধান বিরক্তি বাড়িয়ে তুলছে। এমন সময় ফারাহ বিরক্তির সুরে কিছু বলতে যাবে, হঠাৎ নাহিদ দৌড়ে এসে থামল তাদের সামনে। হাঁটু ধরে হাঁপাচ্ছে সে, যেন দম ফেলবারও ফুরসত নেই। স্মৃতি সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল—
-"কি হয়েছে? আশিক কোথায়?"
হাঁপাতে হাঁপাতে নাহিদ মুখ তুলে তাকালো। তার চোখে ক্লান্তি, কণ্ঠে উত্তেজনা—
-'আসবে না। বটতলায় বসে চা খাচ্ছে।"
ফারাহর মুখ লাল হয়ে উঠল রাগে। তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল—
-"মানে কি? ফাজলামি হচ্ছে? আগে থেকে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান, আর এখন এইসব নাটক!"
মুহূর্তেই পিছন থেকে মেঘের কণ্ঠ ভেসে এলো, ঠাণ্ডা অথচ কটাক্ষে ভরা—
-'ভালোই হয়েছে যাবে না। একদম সহ্য হয় না ওকে এখন!"
সবাই অবাক। নূরাইসার মুখে স্পষ্ট বিস্ময়। সে মেঘের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল—
-"কি বলছিস এসব? ও আমাদের বন্ধু। তোকে সেদিন যা-ই বলুক, তোর ভালোর জন্যই বলেছিল। তোর ভালো চিন্তা করেই!"
মেঘ চোখ সরিয়ে বিরক্ত সুরে উত্তর দিল—
-"ওকে কে বলছে আমার ভালো চিন্তা করতে?"
নূরাইসা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে বলল—
-"বন্ধুদের জন্য চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। সেটা কাউকে বলে দিতে হয় না। আর তুইও ওকে থাপ্পড় মেরেছিলি, সেটা মোটেও ঠিক করিস নি!"
কথাগুলো শুনে মেঘ হঠাৎ চুপ হয়ে গেলো। ভেতরে ভেতরে কেমন একটা শূন্যতা নেমে এলো তার মনে। থাপ্পড় মেরে আসলেই কি ভুল করেছে? ছোটবেলার সেই বন্ধুত্ব, সেই বেস্ট ফ্রেন্ড, রাগের মাথায় কত ঝগড়াই তো হয়েছে, তবু কখনো গায়ে হাত তোলে নি সে। কিন্তু এবার?
মেঘের দৃষ্টি হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে এলো। চোখ নামিয়ে এক কোণে বসে থাকল সে। আকাশে সূর্য ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, মাঠের বাতাসে যেন মিলিয়ে যাচ্ছে অদ্ভুত এক নীরবতা। আর সেই নীরবতার ভেতরেই ভারী হয়ে ঝুলে রইলো মেঘের মন।
নূরাইসা হঠাৎই মেঘের মনোভাব পুরোপুরি বুঝে গেল। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সে উঠে দাঁড়াল। দৃঢ় গলায় নাহিদকে বলল—
-"কোথায় আছে ও? নিয়ে চল আমায়!"
নাহিদ অবাক হলেও কোনো প্রশ্ন করল না। নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। ফারাহ দ্বিধায় কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর সেও যোগ দিল। তিনজন মিলে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালো বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো বটতলায়। বিকেলের শেষ আলোয় বটগাছের ছায়া লম্বা হয়ে মাটির ওপর পড়েছে, আর চায়ের কাপে ধোঁয়া উড়ছে হালকা বাতাসে। সেখানে আশিক বসে একা চা খাচ্ছিল। ওদের আসতে দেখে সে অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল।
তিনজন এসে তার পাশে বসতেই নূরাইসা সোজাসুজি প্রশ্ন ছুড়ে দিল—
-"মেঘকে ভালোবাসিস?"
প্রশ্নটা যেন মুহূর্তেই বজ্রপাত হয়ে নেমে এলো। চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ফারাহর চোখ বিস্ফারিত, নাহিদ হতবুদ্ধি। আশিক স্তব্ধ। এমন সরাসরি প্রশ্নের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। ফারাহর চোখের দৃষ্টিতে বিস্ময় ফুটে উঠতেই নূরাইসা শান্তভাবে বলল—
-"এইভাবে তাকানোর কিছু নেই। আমি ভালোবাসা বোঝি না, বিষয়টা এমন নয়। আমিও ভালোবাসা বুঝি!"
কথাগুলো শোনার পরও ফারাহ আর নাহিদ নির্বাক। তারা শুধু ড্যাবড্যাব করে তাকিয়েই রইল। নূরাইসা ওদের দৃষ্টি উপেক্ষা করে চোখ রাখল আশিকের দিকে। তার কণ্ঠ এবার আরও কোমল, কিন্তু দৃঢ়—
-"ভালোবাসিস মেঘকে। বলিস নি কেনো ওকে?"
আশিক মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
-"যদি বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়, সেই ভয়েই!"
নূরাইসার দৃষ্টিতে মমতা আর সহমর্মিতা ভেসে উঠল। সে নরম কণ্ঠে বলল—
-"কিন্তু এখন অন্য কেউ যে ওর মনে রাজত্ব করছে, সেটাও তো সহ্য করতে পারছিস না!"
আশিক কণ্ঠ ভারী করে বলল—
-"কি করব আমি বল? আমি ওকে হারাতে চাই না। আবার নিজের মনের কথাও বলতে পারি না। অন্য কারো সাথে ওকে দেখতেও পারি না। কি করা উচিত আমার বল?"
নূরাইসা ধীরে নিঃশ্বাস ছেড়ে শান্ত গলায় উত্তর দিল—
-"তোর পাশে থাকা উচিত।"
আশিক বিস্মিত চোখে তাকাল তার দিকে—
-"মানে?"
নূরাইসা এবার নড়েচড়ে বসল, তার চোখে ছিল গভীর দৃঢ়তা। ব্যাখ্যার সুরে সে বলল—
-"দেখ, আমরা জানি সাব্বির ভালো ছেলে নয়। তবে কতটা খারাপ, বা ওর খারাপ কাজের কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে নেই। মেঘকে ওর থেকে নিরাপদ রাখতে হবে। এখনই যদি আমরা কিছু বলি, মেঘ উল্টে আমাদেরই ভুল বুঝবে। তাই এখন তাকে বোঝানো নয়, তার পাশে থাকা জরুরি। আড়াল থেকে তাকে রক্ষা করতে হবে। আর যখন সত্যিই শক্তপোক্ত প্রমাণ হাতে আসবে, তখনই আমরা তাকে সাব্বিরের আসল চেহারা দেখাতে পারব। ততদিন আমাদের গোপনেই করতে হবে যা করার।
কিন্তু তুই যদি এইভাবে দূরে সরে থাকিস, তাহলে কি তাকে রক্ষা করতে পারবি? পারবি না। তাই তোর ওর পাশেই থাকতে হবে!"
নূরাইসার কথা শেষ হতেই বটতলার বাতাস যেন থমকে গেল। সূর্যের আলো গাছের ডাল ভেদ করে ফাঁকফোকর দিয়ে পড়ছে, আর সেই আলোয় আশিকের মুখ স্পষ্ট। তার চোখে অসহায়তা, দ্বিধা, আর গভীর টানাপোড়েন, কিন্তু নূরাইসার কথাগুলো ধীরে ধীরে তার ভেতরে আলো ফেলে দিল।
আশিক দীর্ঘক্ষণ নীরব রইল। চারপাশের বাতাসে যেন কেবল নূরাইসার কথার প্রতিধ্বনি বাজতে থাকল। অবশেষে সে ধীরে মাথা তুলল। চোখে একরকম স্থিরতা ফুটে উঠেছে। কণ্ঠ নরম হলেও দৃঢ়—
-"তুই ঠিক বলেছিস, ইসা। মেঘ এখন আবেগের ঘোরে আছে, বাস্তবতা বোঝার মতো অবস্থায় নয়। প্রমাণ ছাড়া ওকে কিছু বললে উল্টে আমাদেরই ভুল বুঝবে, আর হয়তো আমাদের থেকে দূরে সরে যাবে।"
তার কথার ভেতর লুকানো যন্ত্রণাটা সবাই টের পেল। ফারাহ্ হেসে উঠে আশিকের পিঠে চাপড় মেরে বলল—
-"যাক, অবশেষে মাথাটা ঠিক জায়গায় ফিরল! তাহলে চল, এবার ঘুরতে যাই।"
সেদিনের টানটান আবহটা হালকা হয়ে গেল। চারজন একসাথে উঠে দাঁড়াল। বটগাছের ছায়া পেরিয়ে তারা এগিয়ে গেল মেঘ আর স্মৃতির দিকে। সবাইকে একসাথে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল।
আজ শেষ পরীক্ষা। তাই সবার চোখেমুখে এক অদ্ভুত স্বস্তি আর আনন্দের ঝিলিক। ক’দিনের চাপ, অস্থিরতা, টানাপোড়েন, সবকিছু যেন পিছনে ফেলে আসতে চাইছে তারা।
আফরিন ইতিমধ্যেই তার ক্লাসের বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে গেছে। আর এই নূরাইসারা আজকের বিকেলটা নিজেদের জন্যই রাখল। সোনালি আকাশের নিচে, বটতলার গম্ভীর ছায়া থেকে দূরে সরতে সরতে তাদের হাসি-আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। পরীক্ষার শেষ বিকেলটা তাই হয়ে উঠল, মুক্তির প্রথম নিশ্বাসের মতো।
তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেট পেরোতে যাচ্ছে। গেটের লোহার দণ্ডে তখন বিকেলের আলো পড়ে চকচক করছে। হঠাৎই পেছন থেকে এক গভীর পুরুষালি কণ্ঠস্বর বাতাস ছেদ করে ভেসে এলো—
-"নূরাইসা, দাঁড়াও!"
শব্দটা এমনভাবে কানে বাজল যে সবাই থমকে পেছনে ফিরে তাকাল। বাংলা সাহিত্য বিভাগের রিদওয়ান তন্ময়, দ্রুত এগিয়ে আসছে। উদীয়মান ছাত্র ঐক সংগঠনের সভাপতি, লম্বা চেহারা, মুখে একরকম তাড়াহুড়ো আর হাঁপ ধরেছে যেন। সে নূরাইসার সামনে এসে থামল। কণ্ঠে হালকা উত্তেজনা—
-"আগষ্ট মাসের ২৫ তারিখ আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তোমাদের সবাইকে কিন্তু অংশগ্রহণ করতে হবে। আর নূরাইসা, তোমাকে কিন্তু নাচতেই হবে।"
কথা শেষ হতে না হতেই চারপাশের পরিবেশ কেমন অদ্ভুত হয়ে উঠল। অন্যরা মুহূর্তেই উচ্ছ্বসিত হল, নতুন অনুষ্ঠানের খবরে মুখে আলো ফুটে উঠল সবার। কিন্তু নূরাইসার মুখে সেই আলো নেই। বরং তার চোখ-মুখে অস্বস্তি ভেসে উঠল।
সে এমনিতেই পরিবারের বাইরে কিংবা একান্ত বন্ধু ছাড়া অন্য কারো সাথে খুব একটা মিশতে পারে না। সিনিয়রদের সাথেও দূরত্ব বজায় রেখে চলে। অথচ রিদওয়ান তন্ময় প্রায় ছয় মাস ধরে নানা অজুহাতে তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করে যাচ্ছে, আন্তরিকভাবেই বলে, কিন্তু নূরাইসা কখনো সহজ হতে পারে না। আজও না।
অপ্রস্তুত হেসে নরম কণ্ঠে সে বলল—
-"ভাইয়া, আমি তো নাচতে পারি না। তাছাড়া এই ধরনের অনুষ্ঠানে আমি অংশগ্রহণও করি না।"
নূরাইসার কথার ফাঁকেই ফারাহ দ্রুত বলে উঠল—
-"হ্যাঁ ভাইয়া, ওকে বাদ দিন। ও এসব পারে না। আমরা তো আছি, আমরা অংশগ্রহণ করব!"
কিন্তু রিদওয়ান তন্ময় মাথা নাড়ল। গলায় দৃঢ়তা—
-"সেটা বললেই তো হলো না, ফারাহ। এবার সাহিত্য বিভাগের সবাই অংশগ্রহণ করছে। এই অনুষ্ঠান থেকে স্কোর যোগ হবে। আর আমি ওর নাম আগেই নাচের জন্য দিয়ে ফেলেছি।"
বাতাসে যেন হঠাৎ করেই ভারী নীরবতা নেমে এলো। উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। চোখ ঘুরে গিয়ে আটকে রইল এক জায়গায়,.নূরাইসার মুখে।
তার ঠোঁট কেঁপে উঠল, মুখের রং ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মনে হলো, কেঁদে ফেলবে এখনই। গলার স্বর আটকে আছে, চোখের জল শুধু ঝরে পড়ার অপেক্ষায়। ফারাহ সঙ্গে সঙ্গেই এগিয়ে এলো, কণ্ঠে একরকম তাড়াহুড়ো—
-"আচ্ছা, ঠিক আছে। আমরা এখন যাই।"
কথা শেষ না হতেই চারজন মিলে নূরাইসাকে নিয়ে দ্রুত সরে গেল সেখান থেকে।
পেছনে দাঁড়িয়ে রিদওয়ান তন্ময় একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তার চোখে প্রশ্ন, ঠোঁটে থমকে যাওয়া কথা। সে বোঝার চেষ্টা করল, কোথায় ভুল হলো? কেন এমন প্রতিক্রিয়া? কিন্তু কোনো উত্তর খুঁজে পেল না।শুধু মেইন গেটের সামনে নিস্তব্ধ বিকেল আর ভেতরের গুঞ্জনময় পরিবেশে তার অসহায় দৃষ্টি ঝুলে রইল।
.
ঢাকা মেডিকেল কলেজের পুরোনো ক্যান্টিনে বিকেলের নরম আলো ঝরে পড়ছে জানলার ধারে। ছয়জন তরুণ ডাক্তার, রুহান, তানভীর, সাগর, রিদয়, মেহেদী আর রাকিব, বসে আছে একসাথে। টেবিলে ধোঁয়া ওঠা চা, পাশে বিস্কুটের টিনের কৌটা, আর চারপাশে হাসির শব্দে পুরো ক্যান্টিন যেন উষ্ণ হয়ে উঠেছে।
রুহান গ্লাসটা হাতে নিয়ে চোখ টিপে বলল—
-"দেখ, আর কয়েক মাস পরেই কিন্তু আমি আর্মিতে! এখন থেকে আমাকে স্যালুট করবি তোরা!"
সাগর হেসে বলল—
-"স্যালুট তোরে? আগে নিজেকে সামলাতে শিখে নে, তারপর সৈনিকদের সামলাতে যাস!"
সবাই হেসে উঠল। তানভীর একটু চুপ করে থেকে বলল—
-"তুই সত্যি সিরিয়াস নাকি, রুহান? ওখানে জীবনটা সহজ না। ঝুঁকি, দূরত্ব, মানুষ যতটা ভাবে তার চেয়েও কঠিন হবে।"
রুহান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল—
-"আরে, ভাই, ঝুঁকি না নিলে জীবনে মজা কোথায়? আমি তো সবসময় একটু অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করি জানিস তো। তার ওপর যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের সেবা, এইটাই হবে আসল ফিলিংস।"
মেহেদী গম্ভীর গলায় বলল—
-"তোর মুখে এখনো হাসি, কিন্তু ওখানে গেলে এই হাসি থাকবে নাকি কে জানে!"
রুহান হেসে বলল—
-"আরেহ ভাই, আমি রুহান ইয়াসির দেওয়ান! কাঁদতে জানি না, শুধু হাসতে পারি। আমি গিয়ে তোকে ভিডিও কলে ডাকব, ফ্রি প্রেসক্রিপশন দিবি!"
রাকিব বলল—
-"সালা আগে প্রেসক্রিপশন বানান করা শিখ!"
সবাই আবার হেসে উঠল। হাসির ফাঁকে একটা হালকা নীরবতা নেমে এলো। জানলার বাইরে সূর্যের শেষ আলো পুরোনো ভবনের গায়ে পড়ে ঝলমল করছে। রুহানের চোখে অদ্ভুত একটা দীপ্তি, কিন্তু কোথাও যেন বিদায়ের কুয়াশাও লেগে আছে।
রিদয় নরম স্বরে বলল—
-"বন্ধুত্বের এই বিকেলগুলো মনে হয় শেষ হয়ে যাচ্ছে!"
রুহান হেসে কাঁধে হাত রাখল ওর—
-"শেষ না, ভাই। আমরা কেবল পরের অধ্যায়ে ঢুকছি। নতুন জায়গা, নতুন গল্প, কিন্তু একই বন্ধুত্ব।"
তানভীর চুপচাপ মাথা নাড়ল, চোখ নামিয়ে চায়ের গ্লাসে তাকাল। রেডিওতে বাজতে শুরু করল পুরোনো রবীন্দ্রসঙ্গীত—
-"চলিতে চলিতে পথ ফুরায়ে গেল যে..."
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হচ্ছে। ছয় বন্ধুর সেই মুহূর্তটা ঠিক যেন সময়ের ভেতর থেমে থাকা এক টুকরো উষ্ণ স্মৃতি।
.
রাতের নরম আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে পড়েছে। দূরের কোথাও ঝিঁঝি পোকার সুর, মাঝেমধ্যে বাতাসে দুলে উঠছে সেই পর্দা। ঘরের কোণে টেবিল ল্যাম্পে মৃদু আলো জ্বলছে, একটি নিঃশব্দ, ভারী পরিবেশ ছেয়ে আছে চারপাশে।
ইলহান যাওয়ার পর সেই একবারই কল করেছিল। তারপর আর একবারও নয়। কেবল একদিন মেসেজ করে জানিয়েছিল, কাজের প্রচণ্ড চাপ, ফোন ধরারও সময় পায় না। তবুও নূরাইসার জন্মদিনের আগে একবার আসবে বলে আশ্বাস দিয়েছিল সে।
দেখতে দেখতে জুলাই মাস প্রায় শেষের পথে। এই কয়েক সপ্তাহ আফরিন ও নূরাইসা যেন অলস সময়ে ভেসে গেছে। তাদের দিন কেটেছে নিস্তরঙ্গ নীরবতায়, একঘেয়ে নির্জনতায়। ইলহানের অনুপস্থিতি যেন আরও গাঢ় করে তুলেছে বাড়ির নিস্তব্ধতা।
নূরাইসার মনে ইলহানের কথা ক্রমেই বেশি করে ভিড় জমাচ্ছে। সে বেশ বুঝতে পারছে, ধীরে ধীরে তার ভেতরে এক নতুন অনুভূতি জাগ্রত হচ্ছে। যাকে একসময় সে ভয় পেত, সেই ইলহানের প্রতি অজান্তেই কোমল টান তৈরি হয়েছে। কেন এমন হচ্ছে, তা সে নিজেও জানে না। তবে কি এই বিয়ের বৈধ বন্ধনই তাকে এমনভাবে বেঁধে ফেলেছে? নাকি এর পেছনে আছে আরেক অচেনা টান, যার নাম ভালোবাসা? নূরাইসা উত্তর খুঁজে পায় না। শুধু ইলহানের অনুপস্থিতি তার হৃদয়কে নিঃশব্দে আহত করে।
এদিকে রুহান ও তানভীর তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানিয়েছে পরিবারে। সবাই তাতে বেশ খুশি। ছেলেরা দেশের জন্য কিছু করতে চায়, এই ভাবনাই যেন সবার মুখে গর্বের আলো এনে দিয়েছে। তানিয়া বেগম চেয়েছিলেন তানভীরকে স্বামীর কাছে বিদেশে পাঠাতে, কিন্তু ছেলের দৃঢ় সিদ্ধান্তে তিনি অভিভূত। তানভীর বলেছে, "দেশেই প্রথম কয়েক বছর কাজ করব, অভিজ্ঞতা অর্জন করব। তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাব, তবে ফিরব, দেশের জন্যই।"
রুহানের আর্মিতে যোগদানের সিদ্ধান্তে পুরো পরিবার আনন্দিত, শুধু নূরাইসা বাদে। তার মনে এক অজানা আতঙ্ক। যুদ্ধ, রক্ত, মৃত্যু, এই শব্দগুলো সে কোনোদিন সহ্য করতে পারেনি। অথচ তার আপনজনই এখন যাচ্ছে সেই কঠিন জীবনের পথে! ভাবনাটাই তার হৃদয়ে কাঁপন তোলে। সে নিঃশব্দে বসে আছে নিজের ঘরে, খাটের ওপর হাঁটুর ফাঁকে মুখ লুকিয়ে। ঘরজুড়ে নিস্তব্ধতা, শুধু হালকা বাতাসে পর্দা দুলছে, যেন নীরবে তার মনের অস্থিরতাকে প্রতিফলিত করছে।
ঠিক তখন দরজা খুলে একে একে ঢুকে আসে সবাই, রুহান, তানভীর, আফরিন ও নুহা। নূরাইসাকে চুপচাপ দেখে রুহান এগিয়ে এসে তার পাশে বসে। স্নেহভরা হাত আলতো করে রাখে নূরাইসার মাথায়। সেই স্পর্শে নূরাইসার বুক ভরে ওঠে অদ্ভুত এক ব্যথায়, তবু মুখ তুলে তাকায় না। আফরিন ও নুহা এসে তার দুপাশে বসে, যেন নিঃশব্দে এক অদৃশ্য বন্ধনে তাকে জড়িয়ে ধরে। তানভীর নূরাইসার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে, তার চোখে কোমল সান্ত্বনা।
রুহান ধীর, স্নেহমিশ্রিত কণ্ঠে বলল—
-"ইসা, আমি জানি তুই ভয় পাচ্ছিস, কিন্তু আমি যুদ্ধ করতে যাচ্ছি না, আমি মানুষের জীবন বাঁচাতে যাচ্ছি। আর্মি শুধু লড়াইয়ের নাম নয়, এটা এক বিশ্বাস, এক দায়িত্ব, দেশের জন্য, মানুষের জন্য।"
নূরাইসা প্রতিউত্তর করলো না। রুহান আবারও বলল—
-"কথা বলবি না?"
নূরাইসা এবার মুখ তুলে ধীরে তাকিয়ে বলল—
-"না গেলে হয় না, ভাইয়া? অতীতের কথা ভুলে গেছো? তুমিও সেই পথে পা বাড়াচ্ছো?"
রুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল—
-"আমি তো যুদ্ধ করতে যাচ্ছি না, নূরাইসা। আমি একজন ডাক্তার, যুদ্ধের ময়দানে যারা আহত হবে, তাদের সেবা করবো আমি।"
তবুও নূরাইসার মুখে সেই মলিন ছায়া ছেয়ে রইল। তানভীর পাশ থেকে বলল—
-"এখন যাচ্ছে না ও। সামনে ওর আরও কিছু কাজ বাকি আছে। অন্তত চার-পাঁচ মাস লাগবে যেতে।"
পাশ থেকে নুহা মুখ বাঁকিয়ে বলল—
-"এইসব কী বলছ ভাইয়া? আমি তো ভাবছিলাম এই বাদর এই মাসেই যাবে, আর বাড়িতে একটু শান্তি ফিরে আসবে!"
আফরিন হেসে যোগ করল—
-"সত্যি বলেছিস। ও থাকলে বাড়িতে শান্তি বলে কিছুই থাকে না, সবাই ওর জ্বালায় টিকতে পারে না।"
রুহান তেতে উঠল—
-"ওরে শয়তানের দল! আমাকে তাড়ানোর ফন্দি এঁটেছিস?একদম বিয়ে দিয়ে দু’টোকে বাড়ি থেকে আউট করে দিব, বলে দিলাম!"
নুহা মুখ ভেংচে উত্তর দিল—
-"সাহস থাকলে দাও দেখি!"
রুহান পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে বলল—
-"দাঁড়া, এখনই বদুর বাপকে ফোন দিচ্ছি! তার দুই ছেলে বদু আর কদুর জন্য তোদের দু’টোকে নিয়ে যেতে বলছি!"
মুহূর্তের মধ্যেই তিনজনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া শুরু হলো। নুহা পেছন থেকে গিয়ে রুহানের গলা জড়িয়ে ধরে মাথা পেছনের দিকে টেনে ধরল। অন্যদিকে আফরিন ফোন কেড়ে নিয়ে ভোঁ দৌড়।
নূরাইসা ও তানভীর হেসে কুটিকুটি। তানভীর মুচকি হেসে নূরাইসাকে উদ্দেশ্য করে বলল—
-"তিনটাকেই পাঠিয়ে দেই পাবনা, তাতে যদি শান্তি নামে আসে এই বাড়িতে!"
নূরাইসা তার দিকে তাকিয়ে নরম হেসে বলল—
-"এই তিনজন যখন এই বাড়িতে থাকে, তখন শান্তির কথা ভাবাই বিলাসিতা!"
দু’জনেই একসাথে হেসে উঠল। নিচতলায় তখনো নুহা, রুহান ও আফরিন দৌড়াদৌড়ি করছে, একে অপরের পিছু ছুটছে যেন শিশুদের খুনসুটি। দাদা-দাদী বসে দৃশ্যটা দেখছে, মুখে প্রশান্তির হাসি। রান্নাঘর থেকে নাজনীন বেগম ও ইলিনা বেগমের চেঁচামেচি—
-"এই তোরা থামবি না নাকি? মাথা খারাপ করে দিছিস একদম!"
ধীরে ধীরে হাসির কলরব মিলিয়ে এলো। ঘর জুড়ে রাতের নরম আলো পড়েছে। বারান্দা থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, দূরে কোথাও কুকুরের ডাকে হালকা প্রতিধ্বনি। বাতাসে ভাসছে রান্নার মসলার গন্ধ, আর সেই গন্ধে মিশে আছে একরাশ ঘরোয়া উষ্ণতা, একটি হাসিখুশি পরিবারের জেগে থাকা রাতের সুর।