দরজার বাইরের সমস্ত শোরগোল স্পষ্ট কানে এসেছে নূরাইসার। কিন্তু যখন ইলহানের কণ্ঠস্বর কানে এলো, বুকটা ধক করে উঠল, যেন হঠাৎ একটা অজানা ঝড় তার ভেতরটা কাঁপিয়ে দিল। অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। ভয় আর লজ্জার অজানা ভারে শরীরটা একেবারে নিস্তেজ হয়ে এলো, হাত-পা ঠান্ডা, ঠোঁট শুকিয়ে আসছে। নিঃশব্দে আরও গুটিসুটি মেরে বসে রইল সে।
অবশেষে ঘরে প্রবেশ করল ইলহান। ঘরজুড়ে কাঁচা ফুলের মোহময় সাজ। বাতিগুলো জ্বলছে ধীর আলোর কোমলতায়। ইলহান ঘরে ঢুকেই নিঃশব্দে দরজাটি বন্ধ করে দিল। কিছুক্ষণ সেখানেই স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ পড়ল বিছানার দিকে, ফুলের আস্তরণে মোড়া বিছানার মাঝে যেন আরেকটি ফুল জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। এখনো একবারের জন্যও নূরাইসাকে এই সাজে দেখেনি সে। সেই বিয়ে পড়ানোর সময় দেখেছিল। তাও ঘোমটার আড়ালে ছিল।
ধীরে ধীরে পা বাড়াল সে। এগিয়ে গেল নূরাইসার কাছে। নূরাইসা যেন নিজেকে হেডবোর্ডে মিশিয়ে ফেলেছে, আধভয়ে, আধলজ্জায়।
ইলহান ঠিকই তা অনুভব করল। তাই আর এগোল না। খাটের পাশে ফোন ও ওয়ালেট রেখে, কোনো কথা না বলে ঘুরে দাঁড়াল। কাবার্ড খুলে ট্রাউজার আর একটি টিশার্ট বের করল। তারপর চুপচাপ বাথরুমে ঢুকে গেল।
নূরাইসা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বুক ভরে বড় বড় নিশ্বাস নিল। কিছুটা হালকা লাগল বুকে।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে সোজা খাটে এসে বসে পড়ল ইলহান। এক হাতে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
-"ফ্রেশ হয়ে আসা হোক।"
নূরাইসা বুঝে গেল, নির্দেশটা তার জন্যই। ধীর পায়ে উঠে গিয়ে কাবার্ড খুলে দেখে, মার্কেট থেকে কেনা সব শাড়ি সাজানো আছে, একটাও থ্রি-পিস নেই। একটু ইতস্তত করলো, অবশেষে সেখান থেকে একটা সূতি শাড়ি বের করে নিল। প্রতিটা শাড়ির সাথেই ব্লাউজ ও পেটিকোট মিলিয়েই বানিয়ে রাখা। আফরিন ও নুহা মিলিয়েই সব গুছিয়েছে।
বাথরুমে ঢুকে বেশ কিছুক্ষণ পরে যখন সে বেরিয়ে আসে, তখন দেখে ইলহান ঠিক আগের মতোই খাটে বসে রয়েছে, হাঁটুর ওপর দুই হাত রাখা, মাথাটা সামান্য নিচু, যেনো গভীর কোনও চিন্তায় ডুবে আছে।
নূরাইসা তোয়ালেটা বারান্দায় মেলে দিতে এগোতেই, আচমকা ইলহান খপ করে তার হাত চেপে ধরে। কোনো রকম ভূমিকা না করেই এক এক ঝটকায় কাছে টেনে নেয়, কোলের ওপর বসিয়ে নেয় তাকে। পরক্ষণেই গলায় মুখ গুঁজে দেয়, নাক, ঠোঁট, নিঃশ্বাস, সবকিছু মিশে যায় এক অদ্ভুত ঘোরে। ইলহানের নিঃশ্বাস যেনো জ্বালাময়ী, তপ্ত...! গলায় মুখ গুঁজে সে গভীরভাবে শ্বাস নিচ্ছে, যেনো নূরাইসার গায়ের সুবাসে বুঁদ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছে ঘাড়ের পাশ... ধীর, কিন্তু জোরালো স্পর্শে যেনো অনুভূতির কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেহে।
নূরাইসার দেহ জমে যায়, চোখ বড় বড় হয়ে যায়, কিন্তু প্রতিবাদ করার মতো সাহস, কিংবা ভাষা কিছুই আর খুঁজে পায় না সে। সমস্ত জড়তা ছাপিয়ে, সেই মুহূর্তে কেবল অনুভবই স্পষ্ট হয়ে থাকে। নূরাইসার শরীর লজ্জা আর ভয়ে কাঁপছে। ইলহান তা ঠিকই অনুভব করল। ধীরে ধীরে গলায় মুখ ডুবিয়ে হালকা হাস্কি কণ্ঠে সে বলল—
-"এত ভয় কিসের?"
নূরাইসা নিশ্চুপ। একটিও শব্দ করে না। ইলহান তা দেখে আরও গভীরভাবে তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়, কোমরে আলতো করে জড়িয়ে ধরে। তার ঠান্ডা হাতের স্পর্শে নূরাইসার সমস্ত শরীর আরও একবার শিউরে ওঠে। ইলহান নেশা মেশানো স্বরে আবার বলে ওঠে—
-"কখনও কি রাগ দেখিয়েছি? ধমক দিয়েছি কখনো? কিংবা গায়ে হাত তুলেছি? তাহলে এত ভয় কেনো আমাকে?"
নূরাইসা অস্ফুটস্বরে, কাঁপা কণ্ঠে উত্তর দেয়। তার দুই হাত নুহানের কাঁধে শক্ত করে খামচে ধরে রেখেছে, যেন সামান্য চেতনার ভুলে পড়ে যাবে সে।
-"আপনি আমায় কখনো শাসন করেননি ঠিকই, কিন্তু আপনি অনেক রাগী। রুহান ভাইয়া, তানভীর ভাইয়া, আফরিন, এমনকি নুহাও, সবাইকে ধমকেছেন আপনি। রুহান ভাইয়াকে তো মারেন ও। বড় আব্বু, বাবা, বড় মা, আপনার চোখের দিকে তাকালেই যেন ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যায়। আমি কীভাবে তার ব্যতিক্রম হই?"
নূরাইসা থেমে গেল। ইলহান এমন শক্ত করে ধরে আছে যে তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘ এক নিশ্বাস নিয়ে আবারও বলতে শুরু করল সে—
-"যখন আমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি, তখন এক ছেলে আমাকে টিজ করেছিল। আপনি রাস্তায় ফেলে তাকে এমন আধমরা করে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন যে দৃশ্যটা আমি আজও ভুলতে পারিনি। সেই মুহূর্ত থেকেই আমার ভয় যেন আরও গভীরভাবে গেঁথে বসেছে মনে।"
ইলহান নীরবভাবে সব শুনছিল। কিছুক্ষণ পর গভীর স্বরে বলল—
-"ওরা ভুল করেছিল, তাই আমার রাগের মুখোমুখি হয়েছে। আপনি তো কোনো ভুল করেননি! আর সেই ছেলের কথা, আপনার জায়গায় যদি অন্য কোনো মেয়েও থাকত, আমি একই কাজই করতাম। যে পুরুষ নারীর প্রতি সম্মান দেখাতে জানে না, তার এই সমাজে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।"
নূরাইসা যেন হঠাৎই উপলব্ধি করল, সেদিন আসলে তাকে অসম্মান করার কারণেই ছেলেটির সেই পরিণতি হয়েছিল। অথচ ভাই-বোনেরা বাকিরা কিছু না কিছু ভুল করেছে জীবনে, শুধু নূরাইসাই পরিবারের সবচেয়ে আজ্ঞাবহ, সবচেয়ে লক্ষ্মী সন্তান ছিল। যার ফলে তাকে কোনো দিন শাসন বা বকাঝকা সহ্য করতে হয়নি।
ধীরে, অনেকটা নিজের ভয়কে ছুঁয়ে দেখার মতো সতর্ক কণ্ঠে সে প্রশ্ন করল—
-"তাহলে... যদি কোনোদিন আমি ভুল করি? তখন কি আমার সাথেও আপনি ঠিক ওইরকম করবেন?"
এক মুহূর্ত নীরবতা। ঘরের বাতাস যেন থমকে যায়। ইলহান মুখ তুলে নূরাইসার চোখের দিকে তাকায়। নূরাইসা মাথা নিচু করে নেয় লজ্জায়। ইলহান শান্ত গম্ভীরতায় জবাব দেয়—
-"না... করব না। অবশ্যই রাগ হতো। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে রাগের রূপ হতো ভিন্ন। আপনার প্রতি আমার রাগের বহিঃপ্রকাশ আপনি সেদিন অনুভব করেছেন, সেই মুহূর্ত নিশ্চয় ভুলে যাননি আপনি!"
নূরাইসার লজ্জায় মরি মরি অবস্থা। সমস্ত শরীর যেন লজ্জা আর সংকোচে গুটিয়ে গেছে। মুখে কোন রঙ নেই, চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া। মনে মনে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতে থাকে—
-"হায় আল্লাহ! মাটি যদি এখনই ফেটে যায়... আমি যদি তাতে ঢুকে যেতে পারতাম!"
যার চোখের দৃষ্টি তাকে এতদিন কাঁপিয়ে রাখত, সেই মানুষটাই আজ তার স্বামী। বড় চাচাতো ভাই, আজ তার প্রিয়তম। আর সেই ইলহানের কোলেই সে এখন চড়ে বসে আছে! মনে হচ্ছিল, এই পৃথিবীর সব লজ্জা যেন একত্রিত হয়ে তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। নূরাইসা মাথা নিচু করে কাঁপা কণ্ঠে মিনমিন করে বলল—
-"নামিয়ে দিন! আমাকে... নামিয়ে দিন।"
নুহানের কানে কথাটা অসহ্য লাগল। সে কিছু না বলেই নূরাইসাকে আরও জোরে নিজের বুকে চেপে ধরল। তার মুখ নূরাইসার গলায় ডুবিয়ে এক নিশ্বাসে নূরাইসার গন্ধ নিতে থাকল। হঠাৎই ইলহান সজোরে দাঁত বসিয়ে দিল নূরাইসার কাঁধে। নূরাইসা তীব্র ব্যথায় একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে শব্দ করে ওঠে—
-"আহ্...!"
কিন্তু ইলহান তাও তাকে ছাড়ে না। বরং আরও গভীরভাবে তাকে নিজের মাঝে মিশিয়ে নিতে থাকে।
তার নিশ্বাস ঘন, তীব্র। এমনভাবে চেপে ধরেছে যে, নূরাইসার দম আটকে আসছে। সে হাঁসফাঁস করতে লাগল, ছটফট করেও মুক্তি পেল না। এই সময় ইলহানের কণ্ঠে ধরা পড়ল এক অদ্ভুত ঘোরলাগা সুর, নেশামত্ত হাস্কি কণ্ঠে সে ফিসফিস করে বলল—
-"অসম্ভব সুন্দর লাগছে আপনাকে! আপনার নেশায় আমি মাতাল হয়ে যাচ্ছি, নুরেজান।"
সেই শব্দগুলো যেন নূরাইসার হৃদয়ে বিদ্যুতের মতো খেলে গেল। নূরেজান! এই নামে কখনো ডাকেনি তাকে কেউ। আর আজ... এত ব্যাকুল, এত গভীর আর নেশামিশ্র কণ্ঠে ইলহান তাকে এভাবে ডাকল, সে স্তব্ধ হয়ে যায়। ছটফট করাও থেমে যায়। চোখ বড় বড় হয়ে তাকিয়ে থাকে সামনে, অথচ মন তার গিয়ে পড়ে অতীতে। এই ইলহান তো একদিন বলেছিল—
-"তোমাকে আমি পছন্দ করি না।"
তবে আজ? তবে কেন এই উন্মাদনা? কেন এই আগুনমাখা স্পর্শ, আর কণ্ঠে এমন অদ্ভুত মায়া? নূরাইসা ধীরে, নিঃসন্দেহে দ্বিধা মেশানো কাঁপা কণ্ঠে বলে ফেলে—
-"আপনি তো বলেছিলেন, আমাকে পছন্দ করেন না।"
ইলহান এক মুহূর্তে থেমে গেলো। মুখ তুলে তাকালো তার নববধূর মুখপানে। আকস্মিক উঠে দাঁড়ালো সে। নূরাইসা তখনও ইলহানের কলে। নূরাইসা কেঁপে উঠলো। রেগে গেলো নাহ তো? মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো ভয়ার্ত চোখে। কিন্তু না, সেই মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে আছে তার চোখেমুখে। যেন এক রহস্যময় সমুদ্র, যার গহীনে প্রবেশের সাহস হয় না সহজে।
ইলহান ধীরে কাছে এসে নূরাইসাকে বিছানায় শুইয়ে দিলো। একটুও শব্দ হলো না। তারপর উঠে গিয়ে নিঃশব্দে নিভিয়ে দিলো আলো। অন্ধকার ঘরে হঠাৎ করেই যেন সময় থমকে দাঁড়াল।
নূরাইসার বুক ধকধক করে উঠলো। মনে মনে বলতে লাগলো—
-"কিছু করবে না তো?"
ভয় আর লজ্জার এক অদৃশ্য জালে জড়িয়ে পড়লো সে। কিন্তু মুহূর্তেই সেই জাল ছিন্ন হলো। লাইট নিভিয়ে ধীরে এসে শুয়ে পড়ে ইলহান। নূরাইসার বুকে মাথা রেখে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। তারপর নূরাইসার উষ্ণ বক্ষপিঞ্জরে মুখ ডুবিয়ে দেয় ইলহান। যেন সেখানে সে খুঁজে পায় একান্ত আশ্রয়, এক অনুচ্চারিত শান্তি।
নূরাইসা কেঁপে ওঠে। তার সেই নিঃশব্দ কম্পন স্পর্শ করে ইলহানের গভীর অনুভবকে। সে তীব্রভাবে সেই কাঁপুনি টের পায়, অন্তর্দেহে যেন ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত শিহরণ। নূরাইসা কাপা কন্ঠে ফের প্রশ্ন করে—
-"বললেন না তো!"
ইলহান সেইভাবেই মুখ ডুবিয়ে রেখে বলে—
-"কি?"
-"পছন্দ করেন আমাকে?"
ইলহান এবার মুখ তুলে তাকালো সোজা নূরাইসার চোখে। নূরাইসা চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলো। ইলহান দেখলো। তারপর বলল—
-"পছন্দ করি না।"
বাক্য টুকু শেষ করেই ইলহান আবারও মুখ ডুবালো নূরাইসার বক্ষপিঞ্জরে।
হঠাৎ তার কণ্ঠস্বর নেমে আসে নিচু, হুস্কি সুরে,
চাপা তাপ আর আকুতি মিশিয়ে বলে—
-"আমার সামনে সব সময় শাড়ি পড়বেন। আমি ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো চোখ যেনো আপনাকে শাড়ি পড়া অবস্থায় না দেখে।"
নূরাইসাকে আর কিছুই বলার সুযোগ দেয়নি সে সেই রাতে। নূরাইসাও ভয়ে, লজ্জায় কুঁকড়ে ছিল, নিঃশব্দ, নিঃসাড়। ইলহানের সঙ্গে এক বিছানায়, এমন করে নিজেকে কোনোদিন কল্পনাও করেনি সে। অথচ এখন, এক ছাদের নিচে, এক শয্যায়, ইলহান নিঃশ্বাস ফেলছে তার বক্ষপিঞ্জরে মাথা রেখে। নিঃচেতন ঘুমে।
নূরাইসার চোখে ঘুম নেই। তার চোখে মেঘ জমেছে, মনে ভেসে চলেছে নামহীন ভাবনার ঢেউ। আলো-আঁধারির নিঃস্তব্ধ রাত্রিতে সে নিজের অনুভূতিকে নিজেই ধরতে পারছে না। ভাবনায় বিভোর, কখন যে নিজের হাত বাড়িয়ে ইলহানের চুলের ভেতর গুঁজে দিয়েছে, সে নিজেও বুঝে ওঠেনি।
.
পরদিন সকাল। নরম রোদ জানালা বেয়ে ঘরে ঢুকেছে, পর্দার ফাঁক গলে আলো এসে পড়েছে নূরাইসার মুখে। হালকা বাতাসে পর্দা দুলে উঠলো। ঘুম ভাঙতেই সে দেখলো, বিছানাটা ফাঁকা। পাশে ইলহান নেই। অবাক হলো না। ইলহান এমনিই, ভোরের পাখির মতো প্রতিদিন অনেক আগে উঠে যায়।
চুপচাপ উঠে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এল সে। তারপর নিজের রুম থেকে একজোড়া হালকা রঙের থ্রি-পিস বেছে নিয়ে পরল। চুলগুলো খুলে কাঁধে ছড়িয়ে দিলো। মুখে হালকা পানির ছিটে, তবু সেই ভেজা মুখে একধরনের অদ্ভুত প্রশান্তি। যেন নতুন দিনের শুরুতেও তার মায়াবী স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে আছে।
ধীরে পা ফেলে নিচে নামলো নূরাইসা। নিচতলায় তখন সকাল সকাল কোলাহল, বাসার বড়রা সকলে খাবার টেবিলে বসে নাস্তা করছেন। গরম পরোটা, ডিম ভাজি, দুধের গন্ধে গোটা ডাইনিং ভরে গেছে। ভাই-বোনেরা কেউ এখনো নামেনি, শুধু নূরাইসা এসেছে।
রান্নাঘরের দিক থেকে ধোঁয়া উঠছে, টিনের চামচের শব্দ মিলেমিশে গেছে কথাবার্তার ভেতর। নূরাইসা চুপচাপ এগিয়ে গেলো রান্নাঘরের দিকে। মা, বড় মা আর মনিকে সাহায্য করতে শুরু করলো। তারা বারণ করলেও নূরাইসা শুনে নি। এক হাতে গরম চা তুলে দিচ্ছে, অন্য হাতে পরোটা সাজাচ্ছে। এত ভিড়েও তার চলাফেরায় একধরনের কোমল মাধুর্য, যেন সে নীরবে সংসারের ভেতর আলো ঢেলে দিচ্ছে।
ডাইনিং টেবিলে বসা পুরুষেরা তখন ব্যস্ত ব্যবসার আলাপে। শেয়ার, জমি, প্রজেক্ট, সব কথাই চলছে জমিয়ে। আর মেয়েরা কেউ খাবার তুলছে, কেউ আবার হালকা গুঞ্জনে কথা বলছে।
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল পায়েল ও তার মা। বাকি মামী খালারা এখনো নামে নি। পায়েলের চোখ একবারেই নূরাইসার গায়ে গিয়ে থামলো। মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নিল সে। গায়ের ফর্সা রঙ, বড় টানা টানা হরিণী চোখ, ঘন কালো চুল কাঁধে ছড়ানো, শরীরের গড়ন সুশ্রী, লম্বায় প্রায় পাঁচ ফুট দুই, নূরাইসা যেন স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের এক নিঃশব্দ ঘোষণা।
পায়েলের বুকের ভেতর হঠাৎ যেন কাঁটার মতো কিছু বিঁধে গেল। চোখে একরাশ ঈর্ষা। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলেই ফেলল সে—
-"নতুন বউ, এইসব পরেছো? শাড়ি পরতে পারো না?"
এক মুহূর্তে ঘরের বাতাস থেমে গেল। চামচের শব্দ থেমে গেল, কথাবার্তাও থেমে গেল। সবাই একসাথে তাকালো পায়েলের দিকে। নূরাইসার বাবা নাহিদ দেওয়ান, বড় বাবা ইকবাল দেওয়ান, দাদু, দুই পক্ষের মামা ও খালুরা, সবার চোখে মিশে আছে বিস্ময় ও অস্বস্তি। রান্না ঘরে ব্যস্ত তানিয়া বেগম, নাজনীন বেগম ও ইলিনা বেগম ও শুনলেন কথাটা। ইলিনা বেগমের মাথাটা নিচু হয়ে গেলো। বড় ও জা ও ননদ এসে আগলে নিলো।
ডাইনিং টেবিলের চারপাশে তখন নিস্তব্ধতা ছায়া ফেলেছে। পায়েলের কণ্ঠে ঈর্ষা ও ব্যঙ্গের মিশ্র সুরে ভরপুর, অথচ নূরাইসার মুখে শান্ত হাসি, চোখে দৃঢ়তা। নূরাইসা একটু ঝুঁকে ইলহানের মামার প্লেটে পরোটা দিতে দিতে মুখে একটুও বিরক্তি না এনে শান্ত গলায় বলল—
-"এটা আমারও বাড়ি, পায়েল আপু। নিজের বাড়িতে শাড়ি পরতে যাবো কেন? কোনো উৎসব ছাড়া।"
পায়েলের মা পাশ থেকে মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে তাকে চোখ দিয়ে শাসালেন চুপ করার জন্য। কিন্তু পায়েল সেই হাত ছাড়িয়ে নিল, মায়ের চোখ রাঙানিকে পাত্তা দিলো না। পায়েলের ঠোঁটের কোণে একটুখানি ঠান্ডা হাসি ফুটলো। কণ্ঠে কাঁটার মতো অহংকার—
-"তোমার বাড়ি ছিল, নূরাইসা। এখন এটা তোমার শ্বশুরবাড়ি। আর শ্বশুরদের সামনে নতুন বউ এইসব পোশাক পরে ঘুরবে?"
নূরাইসার চোখ মুহূর্তে স্থির হলো, ভ্রু কুচকে তাকালো পায়েলের দিকে। মুখে একটুখানি তাচ্ছিল্যের ছোঁয়া, তবে কণ্ঠে শান্ত যুক্তি—
-"আপু, আপনি কোন যুগে বাস করছেন বলুন তো? এখনো এসব ধরা-বাঁধা নিয়মে বিশ্বাস করেন? আর শ্বশুর বলছেন? উনি আমার দাদু, আর উনি আমার বড় বাবা। জন্ম থেকে মানুষ করেছেন তারা আমাকে, এটা ভুলে যাবেন না।"
পায়েল ঠোঁট কামড়ে হাসলো, একটা শীতল, বিষাক্ত হাসি।
-"মানুষ করেছে, ঠিকই। কিন্তু এখন তুমি এই বাড়ির বউ। আর বাড়ির বউদের কেমন করে চলতে হয়, সেটা তুমি জানো না?"
নাহিদ দেওয়ান মাথা নিচু করে বসে রইলেন। বড় ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ির লোক, নইলে তার সামনে তার মেয়েকে অপমান করবে আর সে চুপচাপ থাকবে, কখনোই না। রান্নাঘরের দিক থেকে চামচ পড়ে যাওয়ার শব্দে সবার দৃষ্টি ওদিকে ঘুরলো। ইলিনা বেগম দ্রুত এগিয়ে এলেন, মুখে স্পষ্ট রাগ, চোখে হতাশা। পেছন পেছন তানিয়া বেগম ও নাজনীন বেগমও ছুটে এলেন। ইলিনা বেগম কোনো কিছু না বলেই মেয়ের পিঠে এক চাপড় দিয়ে বললেন—
-"এত কথা বলছ কেন, ইসা? যাও, গিয়ে শাড়ি পরে এসো। তোমাকে এখন এসব শিখিয়েও দিতে হবে?"
মুহূর্তেই নাজনীন বেগম নূরাইসাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলেন। ছোট জায়ের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন তার আগেই শুনতে পেলেন পায়েলের কন্ঠ। পায়েল একচুলও নড়লো না। বরং মুখে আরও তীক্ষ্ণ বিদ্রূপের হাসি এনে বললো—
-"হয়েছে, আন্টি! সবার সামনে নাটক বন্ধ করুন। শিক্ষা তো দিতে পারেননি, এখন আবার দেখাতে এলেন?"
পায়েলের বাবা মনির করিম মেয়েকে ধমক দিয়ে উঠলেন—
-"কি অসভ্যতামি শুরু করেছ? ঘরে যাও।"
পায়েল পাত্তা দিলো না। ওরকম তার বাবা প্রায়ই করে থাকেন। পাশেই পায়েলের মা চুপচাপ দাঁড়িয়ে, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে মেয়ের দিকে। কিন্তু পায়েল তাতে কর্ণপাত করলো না।
ঠিক তখনই, সদর দরজার দিক থেকে ভেসে এলো এক গম্ভীর, রুক্ষ, অথচ রক্ত শীতল করে দেওয়া কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠ যেন ঘরের প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনি তুললো—
-"আমি ওকে বারণ করেছি শাড়ি পরতে।"
মুহূর্তেই সবাই পেছনে ঘুরে তাকাল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইলহান। চোখ দুটো লাল, তাতে যেন আগুন জ্বলে উঠেছে। জগিং থেকে ফিরেছে, পুরো শরীর ভিজে গেছে ঘামে। কপাল বেয়ে, চুল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে নিচে।
নাহিদ দেওয়ান সেই রূপ দেখে ঘাবড়ে গেলেন। অথিতি দিয়ে ভরা বাড়িতে, এই ছেলের যেই রাগ। কোনো অঘটন না ঘটিয়ে ফেলে। উনি টেবিল থেকে উঠে এগিয়ে গেলেন, হাত বাড়িয়ে শান্ত করতে চাইলেন ইলহানকে। শান্ত কন্ঠে তিনি বললেন—
-"ইলহান, বাবা, রাগ নিয়ন্ত্রণ করো। মেয়েরা তো আড্ডা দিচ্ছিল, তুই তো জানিস পায়েল একটু খামখেয়ালি। কথায় কথায় ওকে গুরুত্ব দেওয়া ঠিক নয়।"
কিন্তু ইলহান যেন শুনতেই পাচ্ছে না। ধীর, অথচ দৃপ্ত পদক্ষেপে পায়েলের সামনে এসে দাঁড়াল। পায়েলের মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। সে কাচুমাচু করে একপাশে সরে দাঁড়াতে চাইলো। ইলহান রাগান্বিত কণ্ঠে গর্জে উঠল—
-"আমার বউকে শাড়ি পরে দেখার অধিকার আমি কাউকে দিইনি! সেই অধিকার একমাত্র আমার। ও শাড়ি পরবে শুধু আমার সামনে, অন্য কারো সামনে নয়। আর কি যেন বলছিলি তুই? নতুন বউ! নতুন বউ হওয়ার আগে ও এই বাড়ির মেয়ে। ওর যা খুশি ও পরবে, যেভাবে খুশি ঘুরবে। ওর শ্বশুরেরও এতে কোনো সমস্যা নেই! তাই না বাবা? আপনার কোনো আপত্তি আছে?"
শেষের বাক্যগুলো ইলহান সোজা বাবা ইকবাল দেওয়ান উদ্দেশে ছুঁড়ে দিল। দৃষ্টি পায়েলের মুখে স্থির রেখে। ইকবাল দেওয়ান চামচ নামিয়ে রেখে দৃঢ় স্বরে উত্তর করলেন—
-"আমার কি আপত্তি থাকবে। বাড়ির মেয়ে যা খুশি তাই পড়বে। এখানে ওর যা ইচ্ছে তাই করবে। এ ঘর ওর নিজের বাড়ি।"
এই দৃঢ় উত্তর শুনে পায়েলের মুখ চুপসে গেল। সে নিচু চোখে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই ইলহানের বড় মাম মনির করীম চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন। গম্ভীর দৃষ্টিতে পায়েলের দিকে তাকিয়ে ঝড়ের মতো এগিয়ে এসে এক ঝটকায় তার গালে চড় বসিয়ে দিলেন। তিনি দাঁত চেপে বললেন—
-"চুপ বেয়াদব মেয়ে! বেড়াতে এসেও নিজের স্বভাব ফেলে রেখে আসতে পারো নি। চল, ভেতরে চল।"
পায়েল কেঁদে উঠতেই মনির করীম তাকে টেনে নিয়ে গেলেন ঘরের দিকে। দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই ঘরে জমাট বাঁধা উত্তেজনা হালকা হলো। সবাই যেন একসাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ইলহান নিজে থাপ্পড় তুলতে যাচ্ছিল, মনির করিম সেটা দেখেই এগিয়ে এসে নিজেই মেয়ের গালে চড় বসিয়ে দেন। পায়েলের বলা প্রতিটা শব্দ ইলহানের কানে পৌঁছেছিল। আর সেটা দাদুর চোখ এড়ায়নি। পায়েলকে উচিত জবাব দেওয়ার জন্য মুখ তুলতেই দরজায় দাড়ানো রাগান্বিত ইলহানকে উনি দেখে ফেলেন। তাই তো দাদু নীরবে ইশারায় বড় ছেলে ইকবালকেও চুপ থাকতে বলেন। যেন পরিস্থিতি বোঝে তারা, নীরব থাকে। নইলে তাদের চোখের সামনেই, এই বাড়ির মেয়েকে কেউ অপমান করার সাহস করত না, সে যতই পরম আত্মীয় হোক না কেন।
ইলহান একবার নূরাইসার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল নিজের ঘরে। ছেলের রাগ অনুধাবন করে নাজনীন বেগম সবার উদ্দেশে শান্ত স্বরে বললেন—
-"আমি ভাইকে বুঝিয়ে বলব, আজই যেন চলে যায়। তোমরা খাওয়া শুরু করো।"
তারপর নূরাইসার মাথায় স্নেহভরে হাত বুলিয়ে দিয়ে তিনি যোগ করলেন—
-"ওপরে যা, রাগ কমে যাবে।"
ভয়ার্ত চোখে নূরাইসা শাশুরির দিকে তাকাল। দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করল—
-"যদি মারে?"
নাজনীন বেগম আশ্বাস দিলেন দৃঢ় স্বরে—
-"তোকে কিছু বলবে না যা।"
তবুও ভেতরে ভয় চেপে ধরে আছে নূরাইসাকে। ইতস্তত করে ধীরে পা বাড়াল সে। ভয়ে ভয়ে ওপরে উঠে এলো নিজের কক্ষে। চারদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে বুঝল, ইলহান নেই। হঠাৎ বাথরুম থেকে পানির শব্দ কানে এলো, ইলহান ভেতরে।
ডাকবে কি ডাকবে না, এই দ্বিধায় কাঁপা কণ্ঠে এগিয়ে এসে বলল নূরাইসা—
-"বলছি... নিচে চলুন, নাস্তা করবেন।"
কথাটা বলেই সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল উত্তরের অপেক্ষায়। কিন্তু কোনো উত্তর এলো না।
আচমকা দরজা খুলে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল ইলহান। সারা শরীর ভেজা, ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরে পড়ছে গা বেয়ে। পরনে কেবল একটি তোয়ালে। নূরাইসার নিঃশ্বাস আটকে এল, সে ঘুরে চলে যেতে চাইছিল। এর আগেই ইলহান হঠাৎ তার হাত টেনে নিয়ে গিয়ে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল নূরাইসাকে।
নূরাইসা এক ঝলক তাকাল ইলহানের দিকে। তার চোখের সাদা অংশ লালচে হয়ে উঠেছে, যেন ভেতরের আগুন বাইরে ফেটে পড়ছে। ভয়ে, সংকোচে নূরাইসা চোখ নামিয়ে নিল।
গম্ভীর, গভীর কণ্ঠে ইলহান বলল—
-"মানুষ কষ্ট পাবে বলে চুপ থাকা কোনো সমাধান নয়। যার যা প্রাপ্য, তাকে সেটাই দিতে হয়, প্রয়োজনে কঠিন জবাব দিয়েই। নিজের জন্য নিজেকেই কথা বলতে হবে। অন্য কারও মুখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকলে চলবে না। কারণ জীবনের লড়াই শেষ পর্যন্ত একাই লড়তে হয়। সব সময় কেউ পাশে থাকবে না, পাশে থাকার মতো মানুষও একদিন বেঁচে থাকবে না। তাই শিখে নিন, নিজের লড়াই নিজেকেই লড়তে হয়। আর নিজের কথা, নিজেকেই বলতে হয়।"
একটু থেমে ইলহান নূরাইসার চোখে চোখ রেখে দৃঢ় স্বরে যোগ করল—
-"আপনি এখন শুধু নূরাইসা ইনায়া দেওয়ান নন, আপনি নুহান ইলহান দেওয়ানের স্ত্রী। সেই পরিচয়ে কথা বলার অভ্যাস গড়ে ফেলুন।"