সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ২

🟢

সেই রাতটা নূরাইসার নিরব অস্থিরতাতেই কেটে গেল। ঘুম তার চোখে এলেও মনের ভেতর অদ্ভুত এক অশান্তি যেন বারবার ধাক্কা দিচ্ছিল। ভোরের আলো ফুঁড়ে সকাল নামতেই সে ধীরে চোখ মেলে দেখে, নুহা তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। যেন বোনকে হারানোর ভয়েই শক্ত করে বুকে টেনে রেখেছে। দৃশ্যটা দেখে নূরাইসার ঠোঁটে ভেসে ওঠে এক অপার্থিব শান্তির হাসি। সে আলতো করে নুহার কপালে চুমু দিয়ে সাবধানে উঠে পড়ে, যাতে বোনের ঘুম না ভাঙে।

ফ্রেশ হয়ে এসে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে নুহার দিকে। তারপর স্নিগ্ধ কণ্ঠে ডেকে তোলে—

-"চল ওঠ, ফ্রেশ হয়ে আয়।"

নুহাকে বাথরুমে পাঠিয়ে নূরাইসা নিজে নেমে আসে নিচে। কিছুক্ষণ পর দুবোন একসঙ্গে নাস্তার টেবিলে এসে বসে।

টেবিলজুড়ে তখন উৎসবের উচ্ছ্বাস। সবার চোখেমুখে ঝলমল করছে আনন্দের দীপ্তি। হাসি-ঠাট্টায় ভরে আছে চারদিক, যেন সামনে আসছে এক মহা-আনন্দযজ্ঞ। বিয়ের আয়োজন নিয়ে চলছে হুল্লোড়, কে কী পরবে, কোথায় অনুষ্ঠান হবে, কার কী দায়িত্ব, সবাই যেন ব্যস্ত সুখের পরিকল্পনায়।

কিন্তু সেই টেবিলেই যেন তিনটি মুখে এক নিঃশব্দ ছায়া জমে আছে, নূরাইসা, নুহা আর আফরিন। চারপাশের উল্লাসের ঢেউ থেকে তারা যেন খানিকটা বিচ্ছিন্ন।

নূরাইসা ধীরে ঝুঁকে নিচু গলায় বলল—

-"তোমরা কাউকে কিছু বোলো না। আমি নিজেই কথা বলব ইলহান ভাইয়ার সঙ্গে।"

তার কথার উত্তরে বাকিরা শুধু নীরব মাথা নাড়ল। তাদের চোখেমুখে জমে রইল অদৃশ্য এক বোঝাপড়া, এক গোপন সঙ্কল্প।

সকালটা এভাবেই কেটে যায়। যেহেতু আজ ছুটির দিন, তাই বাড়ি ভরে আছে কোলাহলে। রান্নাঘরে একসঙ্গে ব্যস্ত মা, চাচি আর ফুপু, হাসি-ঠাট্টার ভেতরেই চলছে দুপুরের আয়োজন নিয়ে উচ্ছ্বসিত আলোচনা। হাঁড়ির টুংটাং শব্দ, মসলার ঝাঁঝালো গন্ধ, হাসির ফোয়ারায় যেন গোটা বাড়িটাই হয়ে উঠেছে এক কর্মব্যস্ত উৎসবের অঙ্গন।

নূরাইসাও সেখানে এসে দাঁড়ায়। ভার্সিটির ক্লাস না থাকলে সবসময়ই ঘরের কাজে সাহায্য করে সে। তার কাছে এই কাজ দায়িত্ব নয়, বরং এক নিখাদ ভালোবাসা।

অন্যদিকে, নুহা পড়তে পড়তে কখন যে বইয়ের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে, কেউ টেরই পায়নি। আর আফরিন বসে আছে নিঃশব্দে, দৃষ্টি আটকে আছে ফোনের পর্দায়। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, যেন ভেতরে কিছু গোপন ভার জমে আছে।

ধীরে ধীরে কাজ শেষ হলে সবাই একে একে গোসল সারতে যায়। বেলা গড়িয়ে আসে যোহরের দিকে। নামাজের সময় হলে বাড়ির পুরুষরা পরিপাটি পাঞ্জাবি ও টুপি পরে একত্রে মসজিদের পথে রওনা দেয়। নারীদের সংখ্যা এই বাড়িতে কম নয়, তারা সবাই একসঙ্গে ঘরে জামায়াত করে নামাজ আদায় করে। সারা বাড়ির ভেতর তখন এক গম্ভীর শান্তির আবহ ছড়িয়ে পড়ে, যেন সকালের কোলাহলের ভেতর দিয়ে হঠাৎ বয়ে যায় এক পবিত্র নিস্তব্ধতার স্রোত।

.

দুপুরের খাবারের পর গোটা বাড়ি নিস্তব্ধ ভাতঘুমে আচ্ছন্ন। যেন চারপাশে এক নীরবতার মোড়ক, কেবল ঘরের ভেতর ফ্যানের ঘূর্ণন আর দূরের পাখির ডাক ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। যার যার কক্ষে সবাই নিমগ্ন শান্ত বিশ্রামে।

কিন্তু তিনটি মন এই নিশ্চুপতার বাইরে, আফরিন, নুহা আর নূরাইসা। তাদের বুকের ভেতর কেবলই এক অদ্ভুত আলোড়ন, চোখেমুখে এক অস্থির জ্বলন। আজই সেই দিন। আজই বলতে হবে কথা। কারণ, ইলহান আজ বাড়িতেই আছে। এ সুযোগ হাতছাড়া করলে হয়তো আর কোনোদিন মিলবে না।

তাই নিঃশব্দে তিনজন এসে দাঁড়াল ইলহানের কক্ষের সামনে। দরজাটা হালকা খোলা, ভেতর থেকে ভেসে আসছে আবছা আলো। তারা বাইরে দাঁড়িয়ে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে, চোখাচোখি করে আবার মাথা নামিয়ে নিচ্ছে। কে ঢুকবে? কখন বলবে? এই নিয়ে যেন এক অদৃশ্য দ্বন্দ্বে আটকে গেছে তিনজন।

হঠাৎ আফরিন বিরক্তি ভরা মুখে নূরাইসাকে হালকা ধাক্কা দিল। ধাক্কাটা এতটাই আকস্মিক ছিল যে, সামলাতে না পেরে নূরাইসা সোজা ইলহানের কক্ষে গিয়ে পড়ে।

এক মুহূর্তের জন্য তার ভেতরটা কেঁপে ওঠে। কক্ষে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই বুকের ভেতর যেন অজানা ঝড় বয়ে যায়। নিজের ভার সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় সে। আর ঠিক তখনই উল্টে ঘুরে তাকায়। আর তার চোখ স্থির হয়ে যায়, সেই চেনা অথচ ভয়াবহভাবে দূরের মানুষটির উপর।

ইলহান ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে। পরনে শুধু একটি ট্রাউজার, অর্ধেক উন্মোচিত বুক ও পিঠে ভেসে উঠেছে তরুণ তেজের দাগ। বলিষ্ঠ পিঠজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য কাটা চিহ্ন, বুকের মাংসপেশীও সেই আঁচড়ে বিদীর্ণ। মনে হয় যেন দেহটা সদ্য ফিরে এসেছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের মাঠ থেকে, যেখানে প্রতিটি আঘাত ছিল অস্তিত্বের বিনিময়ে পাওয়া। সদ্যস্নাত চুল থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে, ঘাড় বেয়ে বুকের উপর নেমে আসছে স্বচ্ছ ধারা। গভীর দৃষ্টিতে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে নূরাইসার দিকে।

অপ্রস্তুত নূরাইসা লজ্জায় এক ঢোক গিলে নিল। কাঁপা কাঁপা পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেও বুঝতে দেরি হলো না, বাহির থেকে সেই দুটো বিচ্ছু, আফরিন আর নুহা, দরজাটা শক্ত করে আটকে রেখেছে। পালাবার সমস্ত পথ রুদ্ধ। অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে সে, বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন গোটা ঘরের নীরবতাকে ভেঙে দিচ্ছে। ঠিক তখনই হঠাৎ কানে আসে পরিচিত এক কণ্ঠস্বর—দাদীর।

-"কি রে, এখনই বুঝি আমার জামাইকে কেড়ে নিতে চাইছিস?"

নূরাইসার পিলে চমকে ওঠে। ঘুরে দাঁড়াতেই দেখে, দাদী বিছানার এক কোনায় বসে আছেন, যেন বহুক্ষণ থেকেই নীরবে সমস্ত দৃশ্যপটের সাক্ষী। অথচ নূরাইসা এতক্ষণ তা টেরই পায়নি। লজ্জায় মাথা নিচু করে জিভ কামড়ায় নূরাইসা। চারপাশের বাতাস যেন আরও ঘন হয়ে আসে, তার শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মিনমিন করে বলে—

-"না মানে দাদী... একটু কথা ছিল... তাই এসেছিলাম।"

দাদী চোখ কুঁচকে হালকা হেসে বললেন—

-"হুম, বুঝি বাপু। এই বয়সটা আমিও তো পেরিয়ে এসেছি। তোরা কথা বল, আমি উঠি।"

বলেই তিনি ধীরে ধীরে উঠে দরজার দিকে এগোলেন। কিন্তু দরজাটা বাহির থেকে বন্ধ। খানিকটা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকালেন, তারপর হালকা ধমকের সুরে বললেন—

-"আরে দরজা খোল! আমি থাকলে তোর ভাইবোনরা প্রেম করবে কী করে রে?"

দাদীর সরল অথচ অকপট কথায় নূরাইসার বুক ধপ করে নেমে যায়। লজ্জায় তার মাথা আরও নিচু হয়ে আসে, গাল রক্তিম, ঠোঁট কামড়ে নিঃশব্দ প্রতিক্রিয়ায় দাঁড়িয়ে থাকে সে।

ওপাশে দাঁড়ানো দুই ষড়যন্ত্রী, নুহা আর আফরিন, একটুখানি জিভ কামড়ে ভদ্রতার মুখোশ পরে ধীরে দরজা খুলে দেয়। দাদী বাইরে বেরিয়ে আসতেই লজ্জায় পরে যাওয়া নূরাইসাও তড়িঘড়ি বেরোতে উদ্যত হয়। কিন্তু ঠিক তখনই দাদী এক অদ্ভুত মিটিমিটি হাসি নিয়ে তাকে হঠাৎ ঠেলে আবার ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন, আর বাহির থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন শক্ত করে।

তারপর দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এল তাঁর কণ্ঠস্বর, উঁচু আর অকপট—

-"প্রেম করো দাদুভাই, আমরা আর বাঁধা হব না!"

মিটিমিটি হাসতে হাসতে ধীরে ধীরে সরে গেলেন তিনি। যাবার আগে নুহা আর আফরিনকে বলে গেলেন—

-"সময়ে মতো দরজা খুলে দিস, বুঝলি!"

নুহা আর আফরিন তখন হেসে কুটিকুটি। এই বিয়েটা যেন তাদের কাছেই সবচেয়ে বড় উৎসব। তাই শত রকম কৌশলে তারা চায় নূরাইসা ও ইলহানকে কাছাকাছি আনতে। অথচ নূরাইসা এখনো ভাবছে, তার এই দুই বোন সহানুভূতির প্রতিমূর্তি! দাদীর কথাগুলো মনে পড়তেই দুই বোনের মনে অজান্তেই হাসি খেলে যায়।

ঠিক তখনই রুহান রুম থেকে বেরিয়ে এল। কোথাও যাবার তাড়ায়ই যেন সে হাঁটছিল। হঠাৎ চোখ পড়ল বড় ভাই ইলহানের কক্ষের সামনে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে দুই বিচ্ছু, নুহা আর আফরিন, নিঃশব্দে আড়ি পাতছে।

রুহান এগিয়ে গিয়ে হালকা করে দুজনের মাথায় টোকা দিয়ে বলল—

-"এই তোরা এখানে কি করছিস? বড় ভাইয়ের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আড়ি পাতছিস কেন?"

নুহা বিরক্তি ভরা মুখে কুঁচকে উঠে বলল—

-"উফ! সবসময় এমন করো কেন! মাথায় মারলে যদি কিছু হয়? তখন কে বিয়ে করবে আমাদের? যত্তসব!"

দুজনেই মুখ গম্ভীর করে কিছুক্ষণ নীরব থাকে। কিন্তু মুহূর্তেই আবার দরজার কাছে এসে কান নিয়ে ঝুঁকে আড়ি পাতার কাজে লেগে যায়।

রুহানের ভেতরে এবার কৌতূহলের আগুন জ্বলে ওঠে। ধীরে ধীরে সেও এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল—

-"আড়ি পাতছিস কেন রে? ভেতরে কী হচ্ছে?"

নুহা কানে কানে বলল—

-"ভেতরে আপু আর ভাইয়া প্রেম করছে। তাই শুনছি। চুপচাপ থাকলে থাকো, না হলে চলে যাও।"

রুহান ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা মুখ ভেংচিয়ে বলল—

-"হুঁহ, প্রেম করছে নাকি! দেখি সর, শুনি তাহলে!"

বলেই সে নুহাকে কনুই দিয়ে ঠেলে সোজা সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার পাশে তখন এসে দাঁড়াল তানভীরও। মুহূর্তেই চারজন মিলে তৈরি হলো এক অভিনব দল "আড়ি বাহিনী"। কেউ হাঁটু গেড়ে বসে, কেউ দরজার ফাঁকে কান ঠেকায়, কেউ আবার জানালার পাশে গিয়ে চোখ রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু ভেতর থেকে কিছুই শোনা যাচ্ছে না।

ঠিক তখনই আচমকা ভেসে এল এক মৃদু সুর,

মোলায়েম, কোমল, যেন বাতাসে ভেসে বেড়ানো গানের ধ্বনি। চারজনই থমকে গেল। কারো ঠোঁট থেকে কোনো শব্দ বেরোলো না। শুধু বিস্ফারিত চোখে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল।

ভেতরে আসলেই কী ঘটছে? সত্যিই কি শুরু হয়ে গেল প্রেম?

ভেতরে দাঁড়িয়ে, আয়নার সামনে নিঃশব্দে চুল আঁচড়াচ্ছিল ইলহান। প্রতিচ্ছবির দৃষ্টি এড়িয়েই হঠাৎ গম্ভীর কণ্ঠে বলল—

-"কি বলবি, বল।"

নূরাইসার গলা খানিকটা কেঁপে উঠল, দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—

-"আপনার ফোনটা লাগবে... একটু..."

ইলহান এবার কপাল কুঁচকে ফিরে তাকাল তার দিকে। চোখে সেই অভ্যস্ত কঠোরতা, প্রশ্ন ঝরে পড়ল ঠান্ডা স্বরে—

-"ফোন দিয়ে কি করবি?"

সেই গম্ভীর স্বর শুনে মুহূর্তেই থমকে গেল নূরাইসা। চোখ নামিয়ে নিল মেঝেতে, তারপর এদিক-ওদিক দৃষ্টি ঘোরাতে গিয়ে হঠাৎ খাটের উপর রাখা একটি ফোন দেখতে পেল। তড়িঘড়ি সেটি হাতে তুলে নিল, আর সঙ্গে সঙ্গেই গান বাজিয়ে দিল।

ফোনটি লক খোলাই ছিল। সুর ভেসে উঠতেই ইলহান এগিয়ে এলো। প্রথমে বিরক্ত হলেও এক দৃষ্টিতে বুঝে গেল, ওটা দাদীর ফোন। তাই কিছুই বলল না।

গান ভেসে আসার সেই আবহে নূরাইসা হঠাৎ টের পেল, অর্ধউলঙ্গ ইলহান তার অতি নিকটে এসে দাঁড়িয়েছে। শরীরজুড়ে স্নায়ু টান টান হয়ে উঠল। লজ্জায় কিছুটা পা পিছিয়ে গেল সে, মাথা নামিয়ে নিল। কণ্ঠে অস্পষ্ট কাঁপুনি—

-"আমি এই বিয়েটা করতে চাই না।"

ইলহান স্থির চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। নূরাইসার অপ্রস্তুত স্বীকারোক্তি শুনে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। নূরাইসা পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালে ঠেকল। ইলহান এসে দাঁড়াল একেবারে কাছে, শরীর প্রায় গায়ে গিয়ে লেগেছে। নূরাইসার নিঃশ্বাস ভারী হতে লাগল। চোখ চঞ্চল, দৃষ্টি মাটিতে নিবদ্ধ। হঠাৎ তার কানে ভেসে এলো সেই পুরুষালি স্বর—

-"কেনো করতে চাস না?"

কাঁপা কণ্ঠে, মাথা নিচু রেখেই উত্তর দিল নূরাইসা—

-"আপনি কেনো করতে চাইছেন?"

বিজ্ঞাপন

ইলহানের ঠান্ডা উত্তর—

-"বিয়ের বয়স হয়েছে। বাড়ির সবাই বলল তাই।"

-"আপনি কি আমাকে পছন্দ করেন?"

অদ্ভুত নির্লিপ্ততায় ইলহানের ঠোঁট নড়ল—

-"না।"

শব্দটি যেন বিষের মতো বিঁধল নূরাইসার বুকের গভীরে। তবু ভেঙে পড়ল না সে। চোখের ভেতর ব্যথা লুকিয়ে আবারও প্রশ্ন করল—

-"তাহলে কেনো বিয়ে করতে চাইছেন?"

ইলহানের মুখে কাঠিন্যের যুক্তি—

-"বিয়ে করাটা দরকার। অন্য কাউকে খুঁজতে গেলে সময় নষ্ট হবে। আমার কোনো ব্যক্তিগত পছন্দও নেই। তাই যাকে পেলাম তাকেই করছি। তাছাড়া দাদু চান, আমি তোকে বিয়ে করি।"

চোখ তুলল নূরাইসা। তার দৃষ্টিতে ছিল ব্যথা, অপমান আর হেরে যাওয়া এক গভীর যন্ত্রণা। জল জমে ওঠার আগেই দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে ফিসফিস স্বরে বলল—

-"যতদিন না নতুন কাউকে খুঁজে পেতেন, ততদিন অপেক্ষা করতে পারতেন না?"

ইলহান কাঁধ ঝাঁকাল, নির্বিকার—

-"না। এখন তুই বল, তুই বিয়ে করতে চাইছিস না কেন?"

ভাঙা গলায় নূরাইসা বলল—

-"আপনি আমার চাচাতো ভাই... আপনাকে সব সময় ভাই হিসেবেই দেখেছি..."

কথাগুলো শেষ করতে পারল না সে। হঠাৎ তীব্র ব্যথায় চিৎকার করে উঠল, তার গলায় পড়েছে কামড়! অবিশ্বাস, যন্ত্রণা আর অপমানের তীব্রতায় সে চোখ বন্ধ করে ফেলল, কাঁপা হাতে আঁকড়ে ধরল পরণের জামার কাপড়।

চোখ তুলে, অগ্নিদৃষ্টিতে ইলহান বলল—

-"আমি তোর ভাই না! কোনোদিনও এই শব্দটা যেন আমার জন্য তোর মুখ থেকে না বের হয়!"

নূরাইসা স্তব্ধ। চোখ নিচু, শরীর জমাট বাঁধা। নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকে সে, না কথা বলে, না দৃষ্টি তোলে।

ইলহান একটানে শার্ট গায়ে চাপিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। হঠাৎ বজ্রপাতের মতো গর্জে উঠল তার হাত, দরজায় প্রচণ্ড আঘাত করল। বাইরে দাঁড়ানো সবাই চমকে উঠল। মুহূর্তেই বুঝে গেল, ভেতরে কিছু ঘটেছে। তড়িঘড়ি দরজা খুলে দিল তারা।

গম্ভীর মুখে, দমিত ক্রোধে গটগট করে বেরিয়ে গেল ইলহান। বাইরে ছড়িয়ে পড়ল এক অস্বস্তিকর নীরবতা। কারও ঠোঁট থেকে একটি শব্দও বের হলো না। সবাই নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার পেছনে, কিন্তু কী ঘটেছে, কেউ বুঝতে পারল না।

আফরিন, নুহা, তানভীর আর রুহান ছুটে গেল ঘরের দিকে। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, নূরাইসা কাঁদছে। চোখ-মুখ ভিজে উঠেছে অশ্রুতে। নুহা দ্রুত দৌড়ে গিয়ে বোনকে জড়িয়ে ধরল, উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে প্রশ্ন করল—

-"কি হয়েছে আপু? কাঁদছিস কেনো? ভাইয়া কিছু বলেছে?"

নূরাইসা কোনো উত্তর দিল না। শুধু কাঁপা হাতে চোখ মুছে, হঠাৎ এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিজ কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। বাকিরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশে এক অদৃশ্য আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ এমন কী ঘটল? কেউ কিছুই বুঝতে পারছে না। অথচ কারোরই সাহস হলো না ইলহানকে কিছু জিজ্ঞেস করার।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলো। নূরাইসা তখনও নিজের ঘরে অবরুদ্ধ। দরজা বন্ধ, ভেতরে আলো নিভে আছে। বাইরে পুরো বাড়ি যেন অচেনা নীরবতায় ডুবে গেল।

ইলহানও তখনও ফেরেনি।

ড্রয়িংরুমে সবাই বসে আছে অস্থির প্রতীক্ষায়। সময় যেন স্তব্ধ হয়ে আছে। রাত ১১টার দিকে অবশেষে দরজা খুলে প্রবেশ করল ইলহান। তার পদক্ষেপ ভারী, মুখে কঠোর নীরবতা। কারও সঙ্গে চোখাচোখি করল না। উপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আবার নেমে এলো। স্বস্তির শ্বাস ফেলল সবাই, অন্তত সে ফিরেছে। তবে সেই স্বস্তির আড়ালে লুকিয়ে রইল অজানা শঙ্কা।

খাবার টেবিলে সবাই একত্রিত হলো। শুধু নূরাইসা বাদে। আফরিন আর নুহা বারবার তার দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ল, কোনো সাড়া নেই। মা, বড় মা, এমনকি দাদীও ডাকলেন, তবু কোনো দরজা খোলেনি।

টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল গভীর নীরবতা। যেন কারও গলার স্বর হারিয়ে গেছে। প্রত্যেকটি মুখে অচেনা গম্ভীরতা। কারও হাত উঠছে না প্লেটের দিকে। একটিমাত্র অনুপস্থিতি, নূরাইসা যেন সমগ্র গৃহকে অন্ধকারে ঢেকে দিল। ইকবাল তালুকদার চামচ হাতে নিয়েও মুখে তুললেন না। তাঁর ভারী বিষণ্ণতা ঘরের বাতাসকে আরও ঠান্ডা করে দিল। চারদিকে নিরুচ্চার অবস্থা। শুধু ইলহান নির্বিকার। যেন কিছুই হয়নি। নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে খেতে লাগল।

খাওয়া শেষে, গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সবার দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা স্বরে বলল—

-"আগামী শুক্রবার আমি বিয়েটা করতে চাই।"

শব্দগুলো যেন বজ্রাঘাতের মতো আছড়ে পড়ল ঘরের উপর। মুহূর্তে চারপাশ স্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই তাকিয়ে রইল তার দিকে। বিস্ময়, আতঙ্ক, হতভম্বতা, কোনো ভাষাই খুঁজে পেল না কেউ।

হঠাৎ দাদু বললেন—

-"কি বলছ দাদুভাই! বাড়ির প্রথম বিয়ে, কোনো অনুষ্ঠান করবো না আমরা? এত তাড়াতাড়ি সবকিছু সম্ভব নাকি?"

ইলহান চোখ তুলল না। ঠান্ডা গলায় বলল—

-"অনুষ্ঠানের দরকার নেই।"

তার কণ্ঠের নির্লিপ্ততা যেন বাতাসকে আরও ভারী করে তুলল। আবেগ, স্নেহ, কোনো কিছুরই ছোঁয়া নেই সেই গলায়। চারপাশে ছড়িয়ে গেল অস্বস্তিকর নীরবতা। বোঝাই যাচ্ছে, সে ভেতরে ভেতরে ভীষণ রাগে ফুঁসছে।

সবার এই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থার মাঝে তানিয়া বেগম ধীরে ধীরে উঠে এলেন। স্নেহভরে ভাতিজার মাথায় হাত রেখে মায়াবি কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—

-"ইসা কিছু বলেছে তোমাকে?"

-"না।"

-"তাহলে হঠাৎ করে এভাবে বিয়ে করতে চাইছো কেনো?"

ইলহানের কণ্ঠ যেন পাথরকঠিন—

-"এমনি। তোমরা নানুবাড়ির সবাইকে খবর দিও। তানভীরের দাদুবাড়ির সবাইকেও দাওয়াত দাও। ওর বন্ধুদেরও আসতে বলো। কোনো আয়োজন হবে না, শুধু আকদ। পরে চাইলে বড় করে ওয়ালিমা করো, আমি কিছু বলব না। কাল তোমাদের মেয়েকে প্রস্তুত থাকতে বলো, শপিংয়ে নিয়ে যাব।"

সবকথা এক নিঃশ্বাসে বলে উঠে দাঁড়াল সে। রুমের দিকে এগোচ্ছিল, হঠাৎ পিছন ফিরে তাকিয়ে গর্জে উঠল—

-"তোরা সবাই যাচ্ছিস। ফারাহকে সঙ্গে নিস। তানভীর, রুহান, তোরাও!"

এটুকু বলে নিঃশব্দে মিলিয়ে গেল নিজের ঘরে।

তার ছায়া অদৃশ্য হওয়ার পরও খাবার টেবিলজুড়ে রয়ে গেল থমথমে আতঙ্ক। কেউ কিছু বলতে পারল না। সবাই চোখাচোখি করল নিঃশব্দে। এত দ্রুত বিয়ের সিদ্ধান্ত, এ নিশ্চয়ই কোনো বড় ঘটনার ফল। তবু কেউ সাহস করল না প্রশ্ন করার। এই ছেলের বিরোধিতা করার শক্তি স্বয়ং তার বাবারও নেই।

ঘরজুড়ে ভেসে এলো ভারী দীর্ঘশ্বাস।

অল্প কিছু খেয়ে উঠে দাঁড়ালেন দাদী। শান্ত অথচ গম্ভীর কণ্ঠে আফরিন ও নুহার দিকে তাকিয়ে বললেন—

-"আফরিন, এক থালা খাবার নিয়ে নূরাইসার ঘরে আয় আমার সঙ্গে।"

.

তিনজন নীরবে দাঁড়িয়ে আছে নূরাইশার ঘরের সামনে। অন্ধকার করিডোরে বাতাসও যেন স্থির হয়ে আছে। দাদীর কণ্ঠস্বর ভেসে যেতেই ভেতর থেকে ধীরে ধীরে দরজাটি খুলল সে। চোখ-মুখ কান্নায় ভেজা, ফুলে লাল হয়ে গেছে। তার মুখে জমে আছে অভিমান, অসহায়তা আর অশ্রুতে ভিজে থাকা এক নীরব প্রতিবাদ, যেন চোখে মুখে লেখা নির্দয় অভিযোগ।

তিনজন ভেতরে প্রবেশ করল। ঘর নিস্তব্ধ, শুধু চাঁদের আলো জানালা দিয়ে ঢুকে ফিকে আলো ছড়াচ্ছে। বিছানার ধারে বসে দাদী মমতাভরা দৃষ্টিতে তাকালেন নূরাইশার দিকে। স্নেহে তাকে কাছে টেনে নিলেন, পাশে বসালেন। তারপর আলতো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—

-"ইলহান কিছু বলেছে তোকে, বোনু?"

নূরাইশা চোখ নামিয়ে মাথা নাড়ল ‘না’। কোনো শব্দ নেই, কেবল একরাশ নীরবতা, ভারী দীর্ঘশ্বাসের মতো।

দাদীর বুক ভেঙে আসল। গভীর হাহাকার ভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি নিঃশব্দে তাকালেন নাতনির দিকে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আফরিন আর নুহা নিশ্চুপ, যেন কথা হারিয়ে ফেলেছে। নূরাইশার খোলা চুল ঢেকে রেখেছে তার ঘাড় ও গলার চারপাশ। তাই কেউ দেখতে পেল না সেই লালচে দাগগুলো, যেগুলো শুধু শরীরে নয়, মনের গভীরে অমোচনীয় ছাপ এঁকে দিয়েছে।

দাদী আলতো করে হাত রাখলেন মাথায়, স্নেহের পরশে বললেন—

-"একটু খেয়ে নে!"

নূরাইশা নড়ল না। সে কেবল স্থির হয়ে বসে রইল, ক্লান্ত দৃষ্টিতে। চোখে জমে আছে শূন্যতা, মনে হাহাকার।

দাদী ইশারায় বললেন—

-"আফরিন, ভাতের প্লেটটা দে তো।"

আফরিন এগিয়ে দিল প্লেটটি। দাদী নিজ হাতে এক চামচ করে খাওয়াতে লাগলেন নূরাইশাকে। তিনি জানেন, এ মুহূর্তে কোনো প্রশ্ন বা বোঝানোর দরকার নেই, দরকার শুধু স্নেহ, দরকার আশ্রয়ের মতো মমতা।

খাওয়ানো শেষে উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত অথচ কঠিন কণ্ঠে বললেন—

-"আগামী শুক্রবার তোমার আর ইলহানের বিয়ে। কালকে তোমাদের কেনাকাটা করতে হবে, প্রস্তুত থেকো।"

কথাগুলো বাতাসে ঝুলে রইল কিছুক্ষণ। নূরাইশা কোনো জবাব দিল না, কেবল নিঃশব্দে শুনল। দাদী ঘর ত্যাগ করলেন, পেছনে পেছনে নুহা আর আফরিনও নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল।

ঘর আবার নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ল। জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল চাঁদের আলো, বিছানার ধারে সাদা পর্দার উপর ছড়িয়ে পড়ল রূপালি আভা। নূরাইশা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে। চোখের কোণে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়ল নীরবে।

সে বুঝে গেছে, এই বিয়ে হবেই। যেকোনো মূল্যে।

তাই সমস্ত আশা, সমস্ত শব্দ, সমস্ত প্রতিবাদ সে মাটিচাপা দিল অন্তরের গভীরে।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প