সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ৪

🟢

সারাদিন কেটে গেছে শপিং করতে করতে। রাত গড়িয়ে এখন প্রায় দশটা। সবাই ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত। শহরের এক ব্যস্তময় রেস্টুরেন্টে ঢুকেছে তারা। বেশ বড়সড় একটি টেবিল নিয়ে বসেছে পুরো দলটি। ইলহানের পাশে বিহান ও তানভীর, আর তাদের পাশেই স্তূপ হয়ে রাখা রয়েছে সব ব্যাগপত্র। টেবিলের অপর প্রান্তে বসেছে নূরাইসা, নুহা, আফরিন, ফারাহ আর রুহান। রুহান বসেছে ফারাহর ঠিক পাশেই। আর ইলহান, সে বসেছে নূরাইসার মুখোমুখি।

নূরাইসা নীরব। নির্জন মুখ, নত দৃষ্টি, কারো সঙ্গে কোনো কথা নেই, এমনকি চোখেও নেই কোনো আলোর ঝলক। যেই বিয়েতে তার সম্মতি নেই, সেই বিয়ের উৎসবে তার কোনো উল্লাসও নেই। হ্যাঁ, ইলহান একজন ভালো ছেলে, তা অস্বীকার করা যায় না। যে কোনো মেয়ের সৌভাগ্য তার মতন স্বামী পাওয়া। কিন্তু নূরাইসার মতো ভীতু, শান্তশিষ্ট মেয়ের কাছে ইলহান যেন যমদূতের মতোই ভয়ংকর। সে রাগী, প্রচণ্ড রাগী। তার আচরণে বারবার কেঁপে ওঠে নূরাইসা। আর গতকালের ঘটনাটা, সে কথা মনে পড়লেই বুকের ভেতর কাঁপুনি ওঠে, গা শিউরে উঠে।

ইলহান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার সামনের বিষণ্ণ মুখের দিকে। গভীরভাবে টের পাচ্ছে, এই নীরবতা, এই আড়ষ্টতা, সব কিছুর মূলে তারই উপস্থিতি। কবে ভাঙবে এই ভয়? এই দুর্ভাবনা, এই দূরত্ব কাটানোর জন্যই তো এমন তাড়াহুড়ো করে বিয়ের সিদ্ধান্ত!আরও একটি কারণ রয়েছে এই হঠাৎ বিয়ের আয়োজনের, যা শুধু সে আর বিহান জানে।

ওয়েটার এসে একে একে সবার অর্ডার নিয়ে নিলো। শেষে যখন নূরাইসার কাছে এসে জানতে চাইল, সে নিচু স্বরে বলল—

-"আমি কিছু খাবো না।"

তার এই কথাটা মুহূর্তেই যেন টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। অল্প আগেও যেসব মুখে ছিল উচ্ছ্বাস, তা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে এলো। আফরিন রাগ সামলাতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠলো—

-"এক থাপ্পড় মেরে সব দাঁত ফেলে দেবো! ফাইজলামি করছিস? সারাদিন চুপচাপ, কোনো কথা নেই, কিছু মুখে দিলি না, আর এখন এই রাতবিরেতে নাটক শুরু করলি?"

আফরিনের কড়া কণ্ঠে উচ্চারিত কথায় কেঁপে উঠল নূরাইসা। এতক্ষণ অন্যমনস্ক ছিল, হঠাৎ ধমক পেয়ে চমকে গেলো, তার শরীরটাও একরকম ঝাঁকুনির মতো কেঁপে উঠল। ইলহান তা অনুভব করল, এবং বোঝল, বাকিরাও সেটা টের পেয়েছে। টেবিলজুড়ে সবার দৃষ্টি তখন নিবদ্ধ হলো নূরাইসার দিকে।

আফরিন হঠাৎ রূঢ়তা ছেড়ে কোমল হতে চাইল। মুচড়ে গেল তার কণ্ঠ, তবুও চোখে জ্বলজ্বল করছিল রাগ—

-"ভয় পাচ্ছিস কেন সোনা? আমি তো সব সময় তোকে এইভাবেই বলি। তুই তো অভ্যস্ত। ইলহান ভাইয়ের রাগী কণ্ঠ ছাড়া তো তুই আর কেউ চেঁচালে ভয় পাওয়ার কথা না!"

তখনই তানভীর অসহিষ্ণু হয়ে গর্জে উঠল—

-"সব সময় সারগোরুর মতো চেঁচাস কেনো? মেয়েটা এমনিতেই সারাদিন চুপচাপ ছিল, ভয় ধরেই আছে ওর মনে!"

ঠিক সেই মুহূর্তে নূরাইসা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। কোনো দিকে না তাকিয়েই শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

-"আমি বাসায় যাচ্ছি।"

তার কথা শুনে সবাই নিথর। নিস্তব্ধতা হঠাৎ গিলে খেলো পুরো টেবিলটাকে। কাল থেকে এমন আচরণ করছে সে, কিন্তু আজ যেন তার ভিতরটা আরও গভীর অচলায়তনে জড়িয়ে গেছে। ইলহান ধীরে উঠে দাঁড়াল। বিহানের দিকে তাকিয়ে বলল—

-"ওদের সবাইকে নিরাপদে বাসায় পৌঁছে দিস।"

বিহান বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—

-"তুই কোথায় যাচ্ছিস?"

কোনো উত্তর দিলো না ইলহান। শুধু নিঃশব্দে এগিয়ে গেল নূরাইসার দিকে। তার হাতটা আলতোভাবে ধরে রেস্টুরেন্ট থেকে তাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো, যেন আর কোনো প্রশ্নের সুযোগ না থাকে, কোনো ব্যাখ্যারও প্রয়োজন নেই। নূরাইসাকে গাড়িতে বসিয়ে ইলহান আবার রেস্টুরেন্টের ভেতরে এলো। কিছু ফ্রেঞ্চ ফ্রাই হাতে নিয়ে আবার গাড়িতে ফিরে গেলো।

রেস্টুরেন্টের ভেতরে এখন এক অদ্ভুত থমথমে নীরবতা। চারপাশে মানুষের গুঞ্জন, হাসাহাসি, থালাবাটির শব্দ, সবই স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, অথচ তাদের টেবিলে যেন সেই সব শব্দ ঢুকতেই পারছে না। খাবার এসে পড়েছে, তবু কারো হাতে চামচ উঠছে না। যেন প্রতিটি দৃষ্টি আটকে আছে একই প্রশ্নে, নূরাইসার ভেতরে কী চলছে?

বিহান গলা খাঁকারি দিয়ে হালকা গম্ভীর স্বরে বলল—

-"খেয়ে নাও সবাই। ইলহান তো ওর সাথে আছে, ঠিক মতো খাইয়েই বাড়ি পৌঁছে দেবে।"

তার কণ্ঠে নিশ্চয়তা থাকলেও টেবিলের কেউ আশ্বস্ত হলো না। বরং কথাটা যেন আরো ঘন করে দিল অস্বস্তির আবহকে। নুহা হঠাৎ আহত কণ্ঠে বলে উঠল—

-"আপুর কী হয়েছে? এমন অচেনা আচরণ করছে কেনো? মানলাম ভাইয়ার সামনে ও একটু ভয় পায়, কিন্তু এতটা কখনোই না। আজ ওর চোখে-মুখে যে আতঙ্ক দেখলাম.. মনে হচ্ছে, কিছু একটা ঘটেছে। এমন কিছু, যেটা থেকে এখনও বের হতে পারছে না।"

নুহার কথায় টেবিলে আরও গাঢ় হলো নীরবতা। রুহান দ্বিধায় দুলল কিছুক্ষণ, তারপর মাথা নিচু করে, প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল—

-"হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস নুহা। আমিও খেয়াল করেছি... কাল ভাইয়ার রুম থেকে বেরোনোর পর থেকেই ইসা যেন অন্য মানুষ হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই কিছু ঘটেছিল তাদের মধ্যে।"

কথাটা হাওয়ায় ঝুলে রইল। সবার ভেতর দিয়ে অদ্ভুত এক শিরশিরানি বয়ে গেল। আফরিন সেই নীরবতা ভেঙে নিচু স্বরে বলল—

-"আমি ইসার ঘাড়ে কামড়ের দাগ দেখেছিলাম। ওড়না দিয়ে খুব শক্ত করে ঢেকে রেখেছিল, কিন্তু ইলহান ভাইয়া যখন গয়না পরাচ্ছিল তখন দাগটা চোখে পড়ে যায়।"

এক মুহূর্তে যেন টেবিলের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। কথা শেষ হতেই তিন পুরুষ হঠাৎ একসাথে কাশতে শুরু করল, প্রথমে বিহান, তারপর তানভীর, তারপর রুহান। কাশি যেন থামতেই চায় না। মেয়েরা হতভম্ব, কেউই বুঝতে পারল না হঠাৎ এমন কাশির কারণ। ফারাহ তাড়াতাড়ি পানি বাড়িয়ে দিল, নুহা এগিয়ে দিল টিস্যু।

কিছুটা থিতু হলে নুহা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—

-"হঠাৎ তোমাদের সবার একসাথে কাশি শুরু হলো কেন?"

তানভীর চোখ নামিয়ে গলার স্বর নিচু করে বলল—

-"ওই... খাবারটা গলায় আটকে গিয়েছিল।"

আফরিন সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে উঠল—

-"তিনজনের একসাথে?"

তিনজনই এবার নীরব, শুধু মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। তাদের চুপচাপ মুখ ফেরানোয় টেবিলের উত্তেজনা আরও ঘনীভূত হলো। কিন্তু আফরিনের ভেতরে তখন অদ্ভুত এক আলোড়ন। মাথার ভেতর শব্দগুলো বাজছিল, আর হঠাৎই তার ঠোঁট ফসকে বেরিয়ে এলো—

-"ইলহান ভাই কামড়েছে!"

শব্দগুলো যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল সবাইকে। ফারাহ বিস্ফারিত চোখে তাকাল, নুহা নিঃশব্দে জমে গেল। ছেলেরা খাবারের চামচ মাঝপথে থামিয়ে চোখ তুলল আফরিনের দিকে। মুহূর্তেই আফরিন টের পেল নিজের ভুল। জিহ্বায় দাঁত বসিয়ে মাথা নিচু করে প্লেটের দিকে তাকাল। কিন্তু ততক্ষণে যা বলার, তা বলে ফেলা হয়ে গেছে।

টেবিলে বসা প্রত্যেকের চোখে তখন এক অদ্ভুত সত্য ভেসে উঠছে, নূরাইসার ভয়ের কারণ, তার আচরণের অচেনা পরিবর্তনের রহস্য, আর আড়ালে রইল না।

.

ইলহান নূরাইসাকে নিয়ে গাড়িতে বসেছে। নূরাইসা এখনও নিঃশব্দ, মাথা নিচু করে রেখেছে, যেন চারপাশের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে আছে। একবার তার দিকে তাকিয়ে ইলহান গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছু না বলে গাড়ি চালাতে লাগল। হঠাৎই সে গাড়ি থামিয়ে নেমে গেল। নূরাইসা একবার তাকালো, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই চোখ নামিয়ে নিল।

কিছুক্ষণ পর ইলহান ফিরে এলো, হাতে ভরে আছে নানা রকমের চিপস, চকলেট, সফট ড্রিঙ্কস। নূরাইসা এসব খাবার পছন্দ করে। গাড়িতে উঠে সে কোনো কথা না বলে সবগুলো নূরাইসার কোলের ওপর রেখে দিল। তারপর আবার গাড়ি চালিয়ে এক নির্জন জায়গায় থামল।

নূরাইসা চোখ তুলে তাকায়নি। কোথায় এসেছে, চারপাশে কী আছে, কিছুই দেখার ইচ্ছে নেই তার। শুধু কোলের ওপর রাখা প্যাকেটগুলোর দিকে একবার তাকিয়েছিল। হঠাৎ ইলহান বলল—

-"নেমে আয়।"

নূরাইসা ধীরে মাথা নাড়িয়ে, নিচু গলায় বলল—

-"আমি বাড়ি যাবো।"

ইলহান বিরক্ত হলো। নিজেই এগিয়ে এসে তার সিটবেল্ট খুলতে গেল। তাকে কাছে আসতে দেখে নূরাইসা ভয়ে সিটের কোণে গুটিয়ে নিল নিজেকে। সেই ভঙ্গিমা দেখে ইলহান রাগে ফেটে পড়ল। স্টিয়ারিংয়ে সজোরে ঘুষি মেরে দরজা খুলে নেমে গেল সে। দরজা সজোড়ে ধাক্কা দিয়ে বন্ধ করে দিলো। বিকট শব্দে চমকে উঠল নূরাইসা।

বিজ্ঞাপন

অনেকক্ষণ পর নিস্তব্ধতা ভেঙে ইলহান ফিরে এলো, হাতে এক প্যাকেট বিরিয়ানি। কিছু না বলে পাশে বসে প্যাকেটটি বাড়িয়ে দিল নূরাইসার দিকে। কিন্তু সে কোনো সাড়া দিল না, বসে রইল নির্বিকার হয়ে। ইলহানের মাথা আরও গরম হলো। রাগ সামলাতে না পেরে গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে তার পাশের দরজা খুলে গম্ভীর গলায় বলল—

-"বের হও। একটা শব্দ নয়, নেমে আয়।"

ভয়ে ভয়ে নূরাইসা নেমে এলো। ইলহান পিছনের সিটের দরজা খুলে দিল। নূরাইসা চুপচাপ উঠে বসল। কিছুক্ষণ পর ইলহানও অন্য পাশ দিয়ে উঠে এলো। বিরিয়ানির প্যাকেট খুলে এক লোকমা তুলে তার মুখের সামনে ধরল। নূরাইসা স্থির হয়ে বসে রইল। ইলহান এবার ধমক দিল। বাধ্য হয়ে ধীরস্থির ভঙ্গিতে নূরাইসা তার হাত থেকেই একে একে সব লোকমা মুখে তুলল। ইলহান গম্ভীর মুখে খাইয়ে দিলো। তবে সেই গম্ভীর মুখের আড়ালে লুকিয়েছিল যত্ন।

খাওয়া শেষ হলে ইলহান নেমে গিয়ে হাত ধুয়ে এলো। তারপর দু’জন সামনের সিটে গিয়ে বসলো। ইলহান ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। গাড়ির গম্ভীর শব্দ যেন নিঃশব্দ দুজনের ভিতরকার অস্থিরতা আড়াল করার বৃথা চেষ্টা করছিল। গাড়ি ধীরে ধীরে বাড়ির পথে রওনা দিল।

নূরাইসা ভয়ে এমনভাবে অবশ হয়ে ছিল যে টেরই পেল না, যে মানুষটিকে সে ভয়ের কারণ ভেবেছিল, সেই-ই তাকে যত্ন করে খাইয়ে দিলো, অথচ সারাদিন সে নিজেও অভুক্ত থেকে গেল।

.

রেস্টুরেন্ট থেকে একে একে বেরিয়ে এলো সবাই। বাইরে হালকা বাতাস বইছে, চারপাশে ছড়িয়ে আছে এক মৃদু ক্লান্তির অনুভূতি। বিহান নিজের গাড়ি নিয়ে এসেছিল, তাই সবাই সেই গাড়িতেই গন্তব্যের পথে রওনা দিতে প্রস্তুত। গাড়িতে উঠতে গিয়েই হঠাৎ শুরু হলো এক ছোটখাটো ঝগড়া। নুহা প্রথমেই সামনের সিটে বসতে চাইল, ড্রাইভিং সিটের একেবারে পাশে। কারণ বিহান ড্রাইভার। কিন্তু তানভীর সঙ্গে সঙ্গেই আপত্তি তুলল—

-"পেছনে বস। সামনে আমি বসব।"

কথাটা বলতেই যেন আগুনে ঘি পড়ল। নুহা এক পা সামনে বাড়িয়ে দৃঢ় স্বরে বলল—

-"সব সময় তো তুমি সামনেই বস! এবার আমি বসব।"

তানভীর ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল—

-"আমার মাথা ধরেছে। চুপচাপ সামনে বসতে চাই। তুই তো সবসময় বকবক করিস।"

নুহা চোখ বড় বড় করে তাকাল—

-"ওহ্ তাই নাকি! তাহলে বাসায় গিয়ে শুয়ে থাকতে পারতে। আসতে হলে আমাদের সাথেই আসতে হলো কেন?"

ড্রাইভিং সিটে বসে বিহান একহাতে স্টার্ট দিতে দিতে বিরক্ত স্বরে বলল—

-"তোমরা দুইজন একদিন ঝগড়ার জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়ে যাবে!"

পেছনে বসা বাকিরা হেসে উঠল একসাথে। তবুও নুহা আর তানভীর কারোরই একচুল পিছু হটার ইচ্ছা নেই। সামনের সিট নিয়ে তাদের এই ছোট্ট যুদ্ধ আসলে চিরচেনা, ঝগড়ার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত স্নেহ, এক অভ্যস্ত ভালোবাসা।

শেষ পর্যন্ত নুহাকে বাধ্য হয়ে পেছনের সিটে বসতে হলো, আফরিনের পাশে। তবে তার ভেতরে একটুখানি অভিমান রয়ে গেল। এদিকে রুহান ফারাহর দিকে তাকিয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মজার ছলে লাইন মারতে লাগল। ছেলেটিকে দেখে মনে হয়, কারও পেছনে না লেগে থাকলে তার শ্বাসই বন্ধ হয়ে যাবে। সে যেন হাঁড়ির চামচ, সব জায়গাতেই ঢুকে পড়তে হয়!

আফরিন বিরক্ত গলায় বলল—

-"ভাই, তোমার এই প্লেবয়গিরি অন্য কোথাও দেখাইও। অন্তত আমার বান্ধবীর সামনে না প্লিজ! মানসম্মান বলে তো কিছু আছে। বিশ্বাস করো, তুমি আমার মামাতো ভাই, এটা বলতে লজ্জা লাগে।"

রুহান সঙ্গে সঙ্গেই চেঁচিয়ে উঠল। মুখে মেকি রাগ এনে বলল—

-"কে বলেছে তোকে আমি প্লেবয়? একটু মজা করি, একটু ফ্লার্ট করি তাই বলে প্লেবয় হয়ে গেলাম? যাহ্! তোদের সাথে বসবই না আমি। এই তানভীর, পেছনে এসে বস। এরা তো আমার চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন তুলে! এক সেকেন্ডও এদের সাথে থাকব না!"

পাশ থেকে নুহা ফিসফিস করে হেসে বলল—

-"ভালোই ঢং পারো ভাইয়া!"

স্টিয়ারিংয়ে বসা বিহান ক্লান্ত গলায় বলল—

-"আরেকটু চালিয়ে যাও, নাটকটা পুরস্কার পেয়ে যাবে। ভাই, চুপচাপ বসো। গাড়ি ছাড়ছি আমি। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। পরে ইলহান এসে কারও দেরির দোহাই শুনবে না।"

সবাইকে নিরস্ত করে বিহান গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়ি ধীরে এগোতে লাগল। বাইরের মৃদু আলো, হালকা বাতাস আর ভেতরের ঠাট্টা-মিষ্টি ঝগড়া, সব মিলিয়ে মুহূর্তগুলো হয়ে উঠল একেবারে নিখুঁত আনন্দ ঘেরা মুহূর্ত।

.

রাত প্রায় এগারোটার দিকে ইলহান নূরাইসাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে নিঃশব্দে কোথাও হারিয়ে গেল। কাউকে কিছু না জানিয়েই। বিহানও সবাইকে নামিয়ে দিয়ে নিজ গন্তব্যে পাড়ি জমাল। এদিকে, নুহা আর আফরিন সদ্য আনা জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ির লোকেদের দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রুহান ও তানভীর ক্লান্ত শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে নিজ নিজ ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

নূরাইসা নিঃশব্দে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। সবাই ধরে নিল, ক্লান্তির ভারেই নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে, তাই আর ডাকাডাকি করল না কেউ।

বৃদ্ধ দাদা-দাদীর চোখেও ক্লান্তির ছায়া নেমে এসেছে। তারাও নিস্তব্ধতায় ডুবে ঘুমিয়ে পড়লেন। অন্যদিকে বাবা-চাচারা বসার ঘরে বসে অফিসের কিছু জরুরি আলোচনা করছিলেন। মাঝেমধ্যে শপিং ব্যাগ খুলে পছন্দ-অপছন্দ যাচাই করছিলেন তারা।

বড় মা, ছোট মা আর মনি একত্র হয়ে প্রতিটি সামগ্রী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন। যেন সেগুলো কেবল বাজার থেকে আনা জিনিস নয়, বরং স্নেহে গড়া নিখুঁত গল্প। বিশেষ করে স্বর্ণালঙ্কারের কারুকাজ দেখে সবাই মুগ্ধ হয়ে গেল। তবে সব কিছুর শিরোমণি হয়ে উঠল একটি লাল বেনারসী, যার গায়ে রূপালী সুতোয় আঁকা সূক্ষ্ম নকশা। তার সাথে মিলিয়ে আনা রুপালি চুড়িগুলোর টুকটুক আওয়াজ যেন আগাম কোনো শুভসংকেত শোনাচ্ছিল।

আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে সবাই একমত হলো, এত রুচিশীল পছন্দ ইলহানের ছোঁয়া ছাড়া সম্ভব নয়। যা যা এনেছে, প্রতিটি জিনিস যেন হৃদয় থেকে বাছাই করা, ভালোবাসার এক নিখুঁত অনুবাদ। বসার ঘর ভর্তি হয়ে গেছে রঙিন শপিং ব্যাগে। আর সেই ব্যাগগুলোর ভেতর গচ্ছিত প্রতিটি সামগ্রীতে জমে আছে কারো না কারো স্বপ্ন, ভালোবাসা আর অপেক্ষার নীরব প্রতিধ্বনি।

হঠাৎ মনির চোখে পড়ল, এক পাশে আলাদা করে রাখা আছে ঠিক ৫৮টা শাড়ি। তার ভেতর সূতি, কাতান, কাঞ্জিভরম, সিল্কও রয়েছে। সেগুলো হাতে তুলে নিয়ে তানিয়া বেগম, নাজনীন বেগমকে উদ্দেশ করে বিস্মিত কণ্ঠে বললেন—

-"তোমার ছেলে তো পুরো দোকানটাই তুলে এনেছে যেন! ৫৮টা শাড়ির কী প্রয়োজন ছিল? এত শাড়ি কেন কিনেছে ও?"

নাজনীন বেগম শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বললেন—

-"বেশ করেছে কিনেছে। ও তার বউয়ের জন্য এনেছে। আমরা কে যে এর মধ্যে কথা বলব? ও যেমনভাবে রাখতে চায়, রাখুক। ওর বাবা আমাকেও এমনভাবেই রেখেছেন, আজও রাখেন। তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী যা দিয়েছেন, আমি খুশি হয়েছি। আম্মাও কখনো ইলহানের বাবাকে এ নিয়ে প্রশ্ন করেননি। আমিও করবো না।"

ইলিনা বেগম এবার জোর করেই বললেন—

-"তবুও আপা, এত শাড়ি! দরকার তো ছিল না।"

নাজনীন বেগম এবার ধমক দিয়ে বললেন—

-"তুই কম কথা বল ছোট। আমরা আমাদের বউমাকে কী দেব, না দেব, সেটা আমাদের ব্যাপার। মেয়ের মা, মেয়ের মায়ের মতো চুপ করে থাকাটাই ভালো।"

ইলিনা বেগম মুখ বন্ধ করে বসলেন। এ বাড়ির ছেলেদের শিক্ষা এমনই, যার সূচনা করেছেন তাঁদের শ্বশুরমশাই। স্ত্রীকে সামর্থ্য অনুযায়ী খুশি রাখতে যা কিছু সম্ভব, সব দেওয়ার চেষ্টা করা, এই নীতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। তাঁদের স্বামীরাও সেই পথেই হেঁটেছেন। তাই ইলহানের কাজে কেউ বিস্মিত হননি। বরং এক অদ্ভুত গর্বে ভরে উঠল সবার মন।

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে উঠোনে গাড়ির শব্দ ভেসে এলো। ঘুমে আচ্ছন্ন বাড়ির কেউ তা টের পেল না। শুধু নূরাইসা এখনো জেগে ছিল। জানালার পর্দা সরিয়ে তাকাতেই বুঝল, ইলহান ফিরে এসেছে।

কয়েক মুহূর্ত পর ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার শব্দ ভেসে এলো। ধ্বনি থেমে গেল নূরাইসার দরজার সামনে। হঠাৎ নিঃশ্বাস আটকে রাখল সে। নিস্তব্ধতার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা এক অদৃশ্য উপস্থিতি যেন ঘিরে ধরল চারপাশ। স্পষ্ট বোঝা যায়, বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ নিরবতা, তারপর সেই পদচারণা আস্তে আস্তে সরে গেল, মিলিয়ে গেল অন্যত্র। ইলহান ফিরে গেল নিজের ঘরে।

নূরাইসা ধীরে ধীরে বেলকনির দরজার দিকে এগিয়ে এলো। কপালে অদ্ভুত ঘাম জমেছে। হালকা কাঁপতে থাকা আঙুলে পর্দা সরিয়ে সে বেলকনিতে দাঁড়াল।রাত গভীর। আকাশজুড়ে অসংখ্য তারা যেন নিস্তব্ধতার বুক চিরে জ্বলজ্বল করছে। দূরের হাওয়ায় হালকা শীতলতা, অথচ তার বুকের ভেতর দাপাদাপি করছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। ঠোঁট সামান্য কাঁপে, চোখের কোণে টলমল করছে অশ্রু।

নিজের ভেতরে জমে থাকা ভয় আর অসহায়তাকে মুঠো করে চেপে ধরে সে দৃষ্টি তুলল আকাশের দিকে। কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—

-"আল্লাহ... যাকে জমের মতো ভয় পাই, তার সঙ্গেই কি সংসার করতে হবে আমাকে? আমাকে শক্তি দাও... যেন এই ভয় পেরিয়ে এগিয়ে যেতে পারি। আমি যেনো ইলহান ভাইকে মেনে নিতে পারি। এই ভয় যেন দুর হয়।"

রাতের অন্ধকারে নূরাইসার প্রার্থনার শব্দ মিলিয়ে গেল। আকাশের তারারাও যেন নিঃশব্দে তার কান্নার সাক্ষী রইল।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প