সকালটা কেমন যেন থমথমে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের পাহাড়ি অঞ্চল, রুমা ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার, বান্দরবান। ঘন জঙ্গলের বুক চিরে উঠেছে সাদা কুয়াশার ঢেউ। পাখির ডাকও যেন আজ ভয় পাচ্ছে। বাতাসে গন্ধ, বারুদের, ঘামের, আর অপেক্ষার।
বেসক্যাম্পের সামনে সারি সারি ইউনিফর্ম পরা সৈনিক দাঁড়িয়ে আছে নিস্তব্ধভাবে। সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে আছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল রায়হান মাহমুদ। উচ্চকায়, কঠোর চেহারার মানুষ। তাঁর কণ্ঠে কাঁপন নেই, কিন্তু চারপাশে টানটান উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
-"সবাই মনোযোগ দিন!" রায়হান বললেন গম্ভীর গলায়।
-"যে অফিসারের কথা আপনারা শুনেছেন, তিনি ফিরছেন। চার বছর আন্ডারগ্রাউন্ড থাকার পর আবার ও ফিরছেন। তার নাম শুনলেই অনেকের বুক কেঁপে ওঠে, লেফটেন্যান্ট কর্নেল Aegis Nova। যদিও এটি তার ছদ্ম নাম। তবে এই নামেই তিনি পরিচিত বেশি।"
চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা সৈনিকদের চোখে জ্বলে উঠল কৌতূহল ও শ্রদ্ধা। Aegis Nova, এক নামেই পরিচিত একজন কিংবদন্তি অফিসার। বলা হয়, তিনি একবার কোনো কিছু চোখে দেখলে ভুলেন না। ফটোগ্রাফিক মেমোরি ওনার। একবার পুরো পাহাড়ি মানচিত্র দেখে তিনি পুরো অপারেশন পরিকল্পনা করেছিলেন, যেখানে প্রতিটি গুহা, ঝর্ণা, এমনকি শত্রুর অস্ত্র রাখার পাথরের অবস্থান পর্যন্ত তাঁর মনে গেঁথে ছিল।
রায়হান আবার বললেন—
-"A-Nova শুধু বুদ্ধিমান নন, ও একজন ট্যাকটিক্যাল জিনিয়াস। তার সিদ্ধান্তে একবার সীমান্ত সংঘর্ষে আমাদের বাহিনী কোনো প্রাণহানি ছাড়াই পুরো এলাকাটা ক্লিয়ার করেছিল। কিন্তু চার বছর আগে, একটি কেস ও রাজনৈতিক চাপে তাকে আন্ডারগ্রাউন্ড যেতে হয়। তবে দুনিয়ার কাছে তাকে ‘সাসপেন্ড’ করা হয়েছে, এটাই দেখানো হয়।"
নিচু গলায় কয়েকজন সৈনিক ফিসফিস করে কথা বলছে। রায়হান তা লক্ষ্য করলেন না। তিনি সামনে তাকিয়ে বলেন—
-"কাল সে ফিরছে। তার সাথে আছে তার ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা, মেজর CipherX। দু’জন একই টিমের, যাদের ডাকা হয় ‘শ্যাডো ইউনিট’। টিমে তারা ছাড়া আরও পাঁচজন স্নাইপার, রিকন ও কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ রয়েছে। অপারেশন ‘সীমানা শুদ্ধি’-র নেতৃত্ব দেবে তারা।"
রায়হান মাহমুদ আরও বললেন—
-"A-Nova ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস-এ স্নাতক, পরে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে প্রেসিডেন্টের স্বর্ণপদক অর্জন করেছেন। বিদেশে UN Peacekeeping Mission in South Sudan-এ নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার প্রশিক্ষণ ছিল সিঙ্গাপুর ও আমেরিকার Advanced Tactical Warfare কোর্সে।
CipherX কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছিলেন বুয়েটে, কিন্তু দেশপ্রেম তাকে টেনে আর্মিতে নিয়ে এসেছে। এখন সে দেশের অন্যতম সাইবার ট্যাকটিক্স ও স্যাটেলাইট ম্যাপিং বিশেষজ্ঞ। দুজনই একসাথে ‘শ্যাডো ইউনিট’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, একটি গোপন ইন্টেলিজেন্স ও রিকন অপারেশন ইউনিট, যাদের কাজ সীমান্তের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অস্ত্র পাচার ও ড্রাগ ট্র্যাক করা।"
সৈনিকরা এক অদ্ভুত উত্তেজনা আর ভয়মিশ্রিত নিস্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে থাকে। হাওয়ার সঙ্গে মিশে আছে অজানা রহস্যের ঘ্রাণ। Aegis Nova—এক নাম যা একসাথে ভয়, শ্রদ্ধা এবং কৌতূহল জাগায়। কাল সেই ছায়াময় অফিসার ফিরছেন, এবং সেই ছায়ার আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন কিছু ঘটনা, যা সাধারণ চোখে দেখা যাবে না, কিন্তু সেনার মনে চিহ্ন ফেলে যাবে, চিরদিনের মতো।
.
রুহান আর তানভীর সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখল, পায়েল ও তার বাবা-মা ইতিমধ্যেই চলে গেছেন। চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা, যেন ঝড়ের পরের শান্ত নিঃশব্দ সকাল। তারা দু’জনে দ্রুত নুহা ও আফরিনকে ডেকে নিল, তারপর সবাই মিলে ছুটে গেল দাদীর ঘরে, ঘটনাটা জানার জন্য।
দাদীর মুখে সব কাহিনি শুনে চার ভাইবোনের মুখে ফুটে উঠল প্রশান্তির হাসি। পায়েল আগের দিন নূরাইসাকে যে অপমান করেছিল, তার প্রতিটা শব্দ যেন এখন তাদের মনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। মেয়েটা এত ভদ্র, এত নরম স্বভাবের, জবাব জানে, কিন্তু কখনও দেয় না। তবু ইলহান চুপচাপ থাকেনি। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সে পায়েলের কথাগুলো শুনেছিল নিঃশব্দে, আর সেই কারণেই রুহানকে পাঠিয়েছিল সামনে।
সব কথা শুনে চার ভাইবোন ডাইনিং রুমে এসে বসলো। সকালের আলো জানালা দিয়ে ঢুকে টেবিলজুড়ে এক কোমল আভা ফেলেছে। টোস্টের গন্ধে আর চায়ের বাষ্পে ঘরটা ভরে উঠল। সবাই নাস্তা সারল ধীরে ধীরে, গতকাল প্রচণ্ড ব্যস্ততা আর চাপে ক্লান্ত ছিল সবাই, তাই একটু দেরিতেই দিন শুরু হলো আজ।
এদিকে ইলহান বেরিয়ে গেছে বিহানকে সঙ্গে নিয়ে। বাড়ির ভেতরে নূরাইসা আর ফারাহ মিলে ব্যস্ত, নূরাইসার ঘর থেকে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এনে ইলহানের ঘরে গুছিয়ে রাখছে। পর্দা দিয়ে আসা রোদের ফোঁটা পড়ছে মেঝেতে, বাতাসে ভেসে আসছে বাসী ফুলের গন্ধ।
এই দৃশ্যের মাঝেই চার ভাইবোন ঢুকে পড়ল ইলহানের ঘরে, একরাশ কৌতূহল ও আনন্দ নিয়ে। ফারাহ খাটের ওপর বসে কাপড় ভাঁজ করছিল, আর নূরাইসা সেগুলো যত্ন করে কাবার্ডে সাজিয়ে রাখছিল। তানভীর এসে ইলহানের ওয়ার্ক টেবিলের চেয়ার টেনে বসল, যেন নিজের রাজ্য দখল করে নিয়েছে। নুহা আর আফরিন আলস্যভরে খাটে গা এলিয়ে দিল, হাসতে হাসতে পরস্পরের দিকে তাকালো। রুহান এসে ফারাহর পাশে গিয়ে বসল, তার চোখে কৌতূহলের ঝিলিক।
নিস্তরঙ্গ দুপুরের আলোয় ঘরটা যেনো এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভেসে আছে। জানালার পর্দা অর্ধেক খোলা, ভেতরে ঢুকে পড়া রোদে ধূলিকণাগুলো নাচছে হালকা বাতাসে। ফুলে সাজানো বাসরঘরের সেই পাপড়িগুলো এখন কেমন ক্লান্ত, তবুও তাদের গন্ধে এখনো ভেসে আছে এক মৃদু, স্থির সুখের আবেশ। খাটে ঝুলছে শুকনো ফুল, বিয়ের রাতের সাজসজ্জার অংশ। সূর্যের আলোয় সেগুলোর রঙ আরও মোলায়েম হয়ে উঠেছে। আফরিন চোখ মেলে সেদিকে তাকিয়ে ধীরে বলল—
-"ইসা, বাসর তো শেষ। ফুলগুলো খুলে ফেলি? দেখ, কেমন শুকিয়ে গেছে সবগুলো।"
নূরাইসা হঠাৎ ঘুরে তাকাল। চোখে রাগ, কণ্ঠে অনমনীয় দৃঢ়তা—
-"একটা ফুলও ছুঁবি না, বজ্জাত মেয়ে। বিয়ে নিজের ইচ্ছেতে না করলেও ফুলভর্তি খাটের সখ আমার সারাজীবনের।"
নুহা কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল—
-"তুই কি সারাজীবন এই ফুল রেখে দিবি নাকি?"
নূরাইসা কাপড় কাবার্ডে গুছাতে গুছাতে শান্তভাবে বলল—
-"হ্যাঁ। যতদিন ওরা নিজে থেকে ঝরে না পড়ে, ততদিন থাকবে এইভাবেই।"
পাশে বসে কাপড় ভাঁজ করতে করতে ফারাহ খোঁচা মারল—
-"ঢং দেখে বাঁচি না। কাল সকাল পর্যন্ত বিয়ে করবো না বলে কেঁদে মরছিলি, আর এখন বাসি ফুলের শয্যা রেখে দিয়েছিস! কত কিছু যে দেখতে হবে আল্লাহ!"
নূরাইসা মুখ না তুলেই বলল—
-"তোকে কেউ কিছু দেখতে বলেনি। চোখ বন্ধ করে রাখ।"
হাসির রেশে, কোণের দিক থেকে রুহান বলে উঠল—
-"তুমি চাইলে আমরাও এমন ফুলের শয্যা সাজিয়ে রাখতে পারি, ফারাহ বেবি!"
ফারাহ মুখ ভেংচে বলল—
-"পুরান পাগলে ভাত পায় না, নতুন পাগলের আমদানি!"
এক মুহূর্তে ঘর ভরে উঠল উচ্চস্বরে হাসিতে। হাসির মধ্যেই তানভীর হাতের ওয়েট বল ঘুরাতে ঘুরাতে ঠাট্টা করে বলল—
-"শ্লা, লুইচ্ছামি বাদ দে। তোর জন্য কোনো মেয়ে আমার সাথে কথা বলে না। সবাই বলে, ঐ যে রুহান ইয়াসির দেওয়ান আছে না, ওই লুইচ্ছার ফুফাতো ভাই তানভীর!"
রুহান ফারাহর পাশ থেকে উঠে বসল। শার্টের কলার ঠিক করতে করতে হেসে বলল—
-"তোর সৌভাগ্য এটা যে, সবাই তোকে আমার ভাই বলে চিনে। আর শ্লা বললি কাকে? নুহাকে আমি জীবনেও তোর সাথে বিয়ে দেব না।"
নুহা সঙ্গে সঙ্গে খেঁকিয়ে উঠল—
-"এই! খবরদার, এইসব কথা বলবে না। তোমাদের জন্যই প্রেম হওয়ার আগেই আমার জামাই হয়ে যায় কেউ না কেউ। পরে প্রেম করব কাকে নিয়ে?"
তানভীর হেসে ওয়েট বলটা রেখে বলল—
-"তোর লজ্জা করে না? বড় ভাইদের সামনে প্রেমের কথা বলিস? তোর বয়স হয়েছে নাকি প্রেম করার?"
নুহা ভ্রু কুঁচকে পাল্টা ছুঁড়ল—
-"আর তোমরা যে বোনের বান্ধবীর সাথে লুইচ্ছামী করো, সেটা?"
নূরাইসা, আফরিন আর ফারাহ একসঙ্গে হেসে উঠল। হাসির কলরবে ঘরটা আবার প্রাণ ফিরে পেল, সূর্যের আলোয় হাসির ছায়া নেচে উঠছে দেয়ালে। ঠিক তখনই, দরজার পাশে এক গম্ভীর পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো—
-"তোরা আমার ঘরে কী করছিস?"
সেই কণ্ঠে যেন এক মুহূর্তেই থমকে গেল চারপাশ। হাসি থেমে নূরাইসার বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল। ফুলের ঘ্রাণের সঙ্গে মিশে গেল হঠাৎ এক অচেনা উত্তেজনা।
সবাই একসঙ্গে দরজার দিকে তাকালো। ইলহান হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে ধীরে পা বাড়িয়ে ভেতরে এল। তার গায়ে হালকা নীল শার্ট, মুখে ক্লান্ত অথচ স্থির অভিব্যক্তি। এক মুহূর্তে ঘরের সব শব্দ যেন গিলে নিলো তার উপস্থিতি।
নূরাইসা কাবার্ডে কাপড় রাখায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল, যেন অন্য কোথাও মনোযোগ দিতে চায় না। মুখটা কাবার্ডের দিকে ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কাঁধের হালকা নড়াচড়ায় বোঝা গেল সে চেষ্টা করছে নিজের স্বাভাবিকতা ধরে রাখতে।
ইলহান নিঃশব্দে এসে বেডসাইড টেবিলে ঘড়ি, মোবাইল আর ওয়ালেট রাখল। সেই মুহূর্তের নিস্তব্ধতায় তার কাজের শব্দ, চামড়ার বেল্টের খসখস, ঘড়ির ধাতব টিকটিক, অদ্ভুত স্পষ্ট শোনাচ্ছিল।
ঠিক তখনই, রুহান একেবারে নির্লজ্জ ভঙ্গিতে হেসে বলে উঠল—
-"বাসর রাত কেমন কাটলো, বড় ভাই?"
এক নিমেষে সবাই কেশে উঠল। ইলহান ধীরে ঘুরে তাকাল রুহানের দিকে,।চোখে এক ঠাণ্ডা দৃষ্টি, ঠোঁটে কেমন এক মৃদু হাসি। তারপর শান্ত স্বরে বলল—
-"খুব জানার ইচ্ছে?"
রুহান উৎসুক বাচ্চার মতো মাথা উপর-নিচ নাড়ল, যেন সত্যিই জানতে চায়। তার আগেই তানভীর এক ঝটকায় তার মাথায় জোরে থাপ্পড় মেরে বলল—
-"গর্দভ! ছোট বোন হয় তোর। কোথায় কী বলতে হয়, আজও শিখলি না।"
রুহান মুহূর্তে ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে ফেলল। লজ্জা, হাসি আর একটু ব্যথা মিলেমিশে তার মুখে রঙ বদলাল।
ইলহান সেটা দেখে একরাশ শান্ত ভঙ্গিতে বলল—
-"তোকে বিয়ে দিয়ে দিব, তারপর নিজে বুঝে নিস, বাসর রাত কেমন কাটে!"
ঘরের বাতাসে আবার হাসির ঢেউ বয়ে গেল। নুহা তীক্ষ্ণ স্বরে ফোড়ন কাটল—
-"ওর মতো লুচুকে বিয়ে করবে কে?"
রুহান সঙ্গে সঙ্গে চোখ লাল করে তাকাল তার দিকে, যেন মুহূর্তেই তর্ক শুরু করবে। ফারাহ আর আফরিন মিটিমিটি হেসে উঠল, তানভীরের হাসি পুরো ঘরটাকে ভরে ফেলল।
শুধু নূরাইসা তখনও নির্বিকার। কাবার্ডের ভেতরে কাপড় সাজাতে ব্যস্ত, যেন এই হাসি-ঠাট্টা, এই উপস্থিতির ভার কিছুই তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
ফারাহ হালকা দুষ্টু হাসি নিয়ে চারপাশে তাকিয়ে নিল, তারপর মজার ভঙ্গিতে ইলহানের দিকে ফিরল। চোখে খেলে গেল দুষ্টুমির আলো, সে বলল—
-"দুলাভাই, আপনার বউ তো এই বাসি ফুলগুলো ফেলতে দিচ্ছে না! বলে, সারাজীবন নাকি এই ফুলগুলোই থাকবে। ছোটবেলা থেকে নাকি ওর সখ,।কাঁচা ফুলে সাজানো খাট থাকবে সারাজীবন!"
ঘরে মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা নেমে এল। ইলহান থেমে তাকাল, উল্টো ঘুরে থাকা তার নববধূর দিকে। নূরাইসা কাবার্ডে কাপড় গুছিয়ে রাখছে, যেন কিছুই শোনেনি। কিন্তু কানের লতি হালকা লাল হয়ে উঠেছে।
ইলহান একটিও কথা না বলে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল তার দিকে। তার গা ঘেঁষে দাঁড়াল। ঘনিষ্ঠতার উষ্ণ বাতাসে ঘরটা যেন মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠল। নূরাইসা কেঁপে উঠল। কাবার্ড খুলে হাত বাড়িয়ে তোয়ালে বের করতে করতে ইলহান শান্ত স্বরে বলল—
-"প্রতিদিন না হয় তার জন্য কাঁচা ফুল এনে রাখব। সে তার ইচ্ছে মতো সাজাবে।"
নূরাইসার কান গরম হয়ে গেল। বুকের ভেতর কেমন এক ঝড় বইছে, অথচ সে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। ইলহানের গরম নিশ্বাস এসে লাগছে তার গায়ে, একটা শিহরণ ছড়িয়ে পড়ল পুরো শরীরে।
উপস্থিত সবাই মুহূর্তের জন্য স্থির, যেন কেউ হঠাৎ শ্বাস নিতে ভুলে গেছে। তারপর রুহান হঠাৎ মুখ ফসকে বলে ফেলল—
-"তাহলে তো প্রতিদিন বাসররাত হবে!"
ঘরের ভেতর এক দমকা হাসির শব্দ উঠল, কিন্তু ইলহানের দৃষ্টি ছিল স্থির। সে নূরাইসার কাঁপতে থাকা মুখের দিকে তাকিয়ে শান্ত, গম্ভীর স্বরে বলল—
-"বাসর করার জন্য ফুলের শয্যার প্রয়োজন পড়ে না নুহান ইলহান দেওয়ানের। এ তো বউয়ের সখ, তাই পূরণ করা আমার দায়িত্ব।"
এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থেমে গেল। নূরাইসা স্থির দাঁড়িয়ে আছে, চোখ নামানো, বুক ধকধক করছে।ইলহান তোয়ালে হাতে নিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বাথরুমে ঢুকে গেল।
দরজা বন্ধ হতেই সবাই একসাথে ‘ওওওওওও!' বলে চিৎকারে ফেটে পড়ল। নূরাইসা লজ্জায় মরি মরি অবস্থা, মুখে কোনো কথা নেই। গাল লাল, চোখ নত, আর শ্বাস ভারী। ফারাহ, আফরিন আর নুহা ছুটে এলো তার দিকে, হাসি, খুনসুটি আর টিপ্পণির ঝড়ে পুরো ঘর আবার হালকা হয়ে উঠল।
নূরাইসা শেষমেশ লজ্জায় আর সহ্য করতে না পেরে সবাইকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল ঘর থেকে।
.
সন্ধ্যা নেমে এসেছে আপন মায়ায়। পশ্চিম আকাশ কমলা বর্ণে রঙিন, সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে শেষ আলোয় আকাশকে যেন আগুনে রাঙিয়ে তুলেছে। চারপাশে মৃদু হাওয়া বইছে, পাখিরা দল বেঁধে বাসায় ফিরছে। রান্নাঘরে নূরাইসা, নুহা আর আফরিন গল্প করছে, সঙ্গে সন্ধ্যার নাস্তা তৈরির ব্যস্ততাও চলছে।
ড্রয়িং রুমের এক পাশে তানভীর আর রুহান, দুজনেই ছোট মামার ছেলে, খালাতো ভাইদের সঙ্গে হেসে খেলে কেরাম খেলছে। বাড়ির বড়রা বসে নিজেদের মধ্যে গল্পে মেতে উঠেছে। নাজনীন বেগম, তানিয়া বেগম ও ইলিনা বেগম মিলে বোন-ভাই-বউদের সঙ্গে নানা পুরোনো স্মৃতি ঘেঁটে গল্প করছে। চারদিকে এক শান্ত, প্রাণবন্ত আবহ, পরিবারের হাসি-আনন্দে ভরে আছে সন্ধ্যার সময়টা।
এই ফাঁকে আফরিন নাস্তার বাটিগুলো সাজিয়ে সবাইকে দিচ্ছিল। হঠাৎ ওপরতলা থেকে ইলহান নেমে এসে গম্ভীর অথচ ঠান্ডা গলায় বলল—
-"তোর ভাবীকে পাঠা!"
আফরিন চোখ তুলে তাকিয়ে দুষ্টু হাসিতে রসিকতার সুরে বলল—
-"ইসা তো আমার বোনও। তাহলে তোমাকে দুলাভাই বলে ডাকব নাকি?"
ইলহান ঘুরে ফিরে যাচ্ছিল, হঠাৎ থেমে পিছে না তাকিয়েই মৃদু হেসে বলে উঠল—
-"সালি সাহেবা, তোমার বোনকে ওপরে পাঠাও।"
আফরিন ভেবচেকা খেয়ে গেল। ও তো ইলহান ভাইকে একটু টিজ করছিল, উল্টো ইলহানই তাকে এমনভাবে টিজ করে চলে গেল! মুহূর্তেই সবাই হো হো করে হেসে উঠল। আফরিনের মুখে তখন এক ভোতা, বিব্রত ভাব। লজ্জায় মুখ নিচু করে সে রান্নাঘরে ফিরে গেল, নূরাইসার দিকে তাকিয়ে আস্তে বলল—
-"আপনার স্বামী মহোদয় ডাকছে, ওপরে যাও।"
সন্ধ্যার আলো ততক্ষণে নিভে এসেছে। বাতাসে ভাসছে হাসির প্রতিধ্বনি আর এক নিঃশব্দ উষ্ণতা, একটি পরিবারের শান্ত, মায়াময় মুহূর্ত।
হাত-মুখ ধুয়ে নূরাইসা ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এল। সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই তার চোখে পড়ল, ইলহান ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল আচড়াচ্ছে। পুরো প্রস্তুত মনে হচ্ছে, যেন কোথাও বেরোবে। ঘরে হালকা পারফিউমের গন্ধ মিশে আছে, আর আলো পড়ছে ইলহানের মুখে, গম্ভীর, মনোযোগী, অথচ অদ্ভুত এক সৌম্য ভাব তার ভেতর।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নূরাইসা মৃদু কণ্ঠে বলল—
-"ডাকছিলেন?"
ইলহান চিরুনি নামিয়ে রেখে পারফিউমের বোতলটা হাতে নিল, নিঃশব্দে সারা গায়ে স্প্রে করতে করতে বলল—
-"তৈরি হয়ে নিন, ঘুরতে যাব।"
নূরাইসা থমকে গেল। বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে গেল তার। এই মানুষটা তো প্রয়োজন ছাড়া তেমন কথা বলে না, সবসময় গম্ভীর, মুখে রাগের রেখা, চোখে অনুচ্চারিত দূরত্ব। আজ তার কণ্ঠে যেন এক ভিন্ন সুর। আবার ঘুরতেও নিয়ে যাবে। নূরাইসা একটু ইতস্তত করে বলল—
-"নুহা আর আফরিনকে বলি তৈরি হতে?"
ইলহান ঘুরে দাঁড়াল। কপালের ভাঁজে হালকা বিরক্তি ফুটে উঠল। বলল—
-"পুরো পরিবারকেই সাথে নিয়ে যাই?"
নূরাইসা মুহূর্তেই হাসল। খুশিতে মুখটা যেন আলোয় ভরে গেল। একা ইলহানের সাথে যেতে হবে না, ভাবনায় বুকের ভেতর জমে থাকা লজ্জা ও অস্বস্তি মিলিয়ে গেল এক নিমিষে। নূরাইসা তো মহা খুশি। সে একা যেতে পারবে না ইলহানের সাথে। ভয়ে লজ্জায় তার কলিজা শুকিয়ে শুটকি হয়ে যাবে। সে উল্টো ঘুড়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে বের হতে যাচ্ছিল সবাইকে বলার জন্য। এমন সময় ইলহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল—
-"গর্ধব!"
নূরাইসা ঘুরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
-"কিছু বললেন?"
ইলহান একটু উচ্চস্বরে বিরক্ত গলায় বলল—
-"একা যাবো। শুধু আপনি আর আমি। আর কেউ না। জান, গিয়ে তৈরি হয়ে নিন।"
নূরাইসার মুখের হাসিটা মুহূর্তেই মুছে গেল। যেন খুশির রোদে হঠাৎ মেঘ ঢেকে গেছে। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, মাথা নিচু করে। ইলহান তাকিয়ে বলল—
-"যাচ্ছেন না কেন?"
নূরাইসা আস্তে, প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল—
-"কি পড়বো?"
তার কণ্ঠে এক অচেনা কাঁপন, চোখে লজ্জা ও সংশয়ের মিশ্র ছায়া। ঘরে তখন কেবল পারফিউমের গন্ধ, আর দুজন মানুষের অচেনা নীরবতা ভাসছে। ইলহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভাবুক গলায় বলল—
-"ইচ্ছে তো করছে আপনাকে শাড়িতে দেখতে... কিন্তু বাইরে যাবো, আমি ছাড়া আরও অনেক মানুষ থাকবে। তারা দেখবে, আমি সেটা মেনে নিতে পারব না। এক কাজ করুন, বোরকা পরে নিন। এমনিতেও তো সব জায়গায় বোরকাতেই যান।"
নূরাইসা মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের পলক যেন থেমে গেল এক নিমিষে। কি বলছে এই মানুষটা? অন্য কেউ আমাকে শাড়িতে দেখবে, আর সে সেটা মানতে পারবে না? কিন্তু কেনো? যিনি সাধারণত দু’টো কথা বলতেও কৃপণ, যার মুখ দিয়ে "হু" বা "হুম" ছাড়া বেশি কিছু শোনা যায় না, তিনি আজ এত কথা এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললেন! নূরাইসা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে বোরকা আর হিজাব বের করে পড়ে নিল। হাতের আঙুলে কাপড়ের ভাঁজ ঠিক করতে করতে মনে হচ্ছিল, যেন নিজের অচেনা অনুভূতির ভেতরেই হারিয়ে যাচ্ছে সে।
ইলহান চুপচাপ তাকিয়ে দেখল তার প্রস্তুতি। চোখের কোণে হালকা এক দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। নূরাইসার গাম্ভীর্য আর ভীত মুখ দেখে সে মিটিমিটি হাসল, যেন কোনো অদৃশ্য আনন্দ নিজের মধ্যে গোপন করে রেখেছে। নূরাইসা যখন প্রস্তুত, ইলহান ফোন আর ওয়ালেট হাতে তুলে নিল। দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে একবার ফিরে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল—
-"বিহান থাকবে।"
এই একটিমাত্র বাক্যই যথেষ্ট ছিল। নূরাইসা এক মুহূর্ত সময় নিল না। চোখ-মুখে এক ঝলক উচ্ছ্বাস ফুটে উঠল, যেন কেউ তাকে মুক্তি দিয়েছে। সে ছুটে নিচে নেমে নুহাকে তৈরি করে নিয়ে মুহূর্তেই আবার ইলহানের সামনে এসে দাঁড়াল, চুপচাপ, কিন্তু মুখে হালকা এক জয়ের হাসি নিয়ে।