কেটে গেছে তিন দিন। ইলহানের সঙ্গে নূরাইসার আর দেখা হয়নি। হঠাৎ করেই যেন কাজের চাপ আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে, নূরাইসা কিছুতেই এর অর্থ খুঁজে পায় না। এই ক’দিন ইলহান খুব একটা বাড়িতেও থাকে না। এমনভাবে সব কিছু গুছিয়ে দিচ্ছে, যেনো সে কোথাও বহু দূরে পাড়ি জমাবে।
এমনই এক বিকেলে হঠাৎ করে নূরাইসার ঘরে ঢুকে পড়ল তার মামাতো বোন আঁখি ও খালাতো বোন কেয়া। গত ক’দিনে পুরো বাড়িটাই গমগম করে উঠেছে। নানুবাড়ি, খালাবাড়ি, মামাবাড়ি, সব পক্ষের লোকজন এসে একত্রিত হয়েছে। নূরাইসার এক মামা, তাদের বড় মেয়ে ও ছোট ছোট দুই ছেলে, খালারা, তাদের মেয়েরা, এমনকি ইলহানের নানুবাড়ির দুই মামা ও দুই খালাও এসেছেন, সাথে তাদের ছয় সন্তান। প্রতিজনের ঘরে দুজন করে সন্তান রয়েছে। আফরিনের ফুপু-কাকারা এসেছেন তাঁদের সন্তানদের নিয়ে। আফরিনের দাদা-দাদী আর বেঁচে নেই।
বাড়ি যেন কোলাহল ও প্রাণের উৎসবে গিজগিজ করছে। অথচ, কোনও নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান নেই। তবুও সবাই এক ধরনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, আকদের প্রস্তুতি।
সব মেয়েরা মিলে নূরাইসার ঘরে বসে আড্ডায় মেতে উঠেছে। নূরাইসাকে মেহেদী পড়াচ্ছে আফরিন। সে খুব ভালো মেহেদী পড়াতে জানে। ছেলেরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত। ঠিক তখনই, ইলহানের মামাতো বোন পায়েল সামান্য অহংকার মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠল—
-"ইলহান ভাইয়ের কপালটাই খারাপ। আরও কত সুন্দর মেয়ে ছিল! কেন যে ফুপু এত হঠাৎ করে তোমার সঙ্গে বিয়ে ঠিক করলো, বুঝতেই পারলাম না।"
তার কথায় ঘরে যেন মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে আসে। সবাই হতবাক চোখে তাকায় তার দিকে। নূরাইসা নির্বাক, স্তব্ধ। কোনো প্রতিক্রিয়া দেয় না। কিন্তু ফারাহ, তার প্রিয় বান্ধবীর, এই অবমাননা সহ্য করতে পারে না। সে স্পষ্ট কণ্ঠে বলে—
-"ইসার চেয়ে ভালো মেয়ে বলতে কি আপনি নিজেকেই বোঝালেন, আপু?"
পায়েল নির্লজ্জভাবে জবাব দেয়—
-"হ্যাঁ, বলতে পারো। আমি ওর চেয়ে সুন্দর, আর পড়াশোনায়ও অনেক বেশি যোগ্য।"
নূরাইসার ঘরের সামনে এসে একজোড়া পা থমকে গেলো, ভেতর থেকে ভেসে আসা কথাগুলো শুনে। কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল সেই পায়ের মালিক, শব্দের প্রতিটি সুর যেন বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধছিল। তারপর হঠাৎ যেন কিছু একটার সিদ্ধান্ত নিয়ে ধীরে উল্টো ঘুরে গেলো সে। কেউ দেখল না তাকে, করো নজরেও এলো না সেই পা।
এইবার আফরিন গলায় কড়া রাগ ঝরিয়ে বলে ওঠে—
-"তা আপু, আপনার তো বয়স কম হলো না। সব দিক দিয়ে যখন এত ভালো, তখন আপনার বাবা-মা কেনো ইলহান ভাইয়ের জন্য আপনার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসলেন না?"
পায়েল কেমন থতমত খেয়ে যায়। সে জানে, তার বাবা একবার প্রস্তাব দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ইলহান তা সোজাসুজি প্রত্যাখ্যান করেছিল। সেই থেকেই সম্পর্কের দূরত্ব। একসময় যে ইলহান তার সঙ্গে অনায়াসে কথা বলত, এখন চোখ তুলে তাকায়ও না। নিজেকে সামলে নিয়ে পায়েল বলে—
-"দিত, আর কিছুদিন পর। কিন্তু তার আগেই তো বিয়েটা হয়ে যাচ্ছে।"
এইবার নুহা চুপ থাকতে পারেনি। সে চোখ সরু করে গম্ভীর কণ্ঠে বলে—
-"যখন বিয়েটা হচ্ছেই, আর পাত্রী আপনি নন, তখন এইসব কথা তোলার মানে কী? না কি ইচ্ছাকৃতভাবে আপনি কথা তুললেন আমার বোনকে ছোট করতে?"
নূরাইস এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিল। কিন্তু এবার সে নুহাকে চোখের ইশারায় থামতে বলল। তারপর ধীরে নিজের মেহেদী-রাঙা হাত পায়েলের মুখের সামনে তুলে ধরল। ডান হাতে লেখা— "ইলহানের বউ নূরাইসা", আর বাম হাতে মেহেদীর আঁচলে জড়ানো একটি লাভ আর্ট, যার মাঝখানে জ্বলজ্বল করছে অক্ষরগুলো— "নুহান ইলহান দেওয়ান"।
হাত দু’টি নামিয়ে নূরাইসা স্থির দৃষ্টিতে তাকাল পায়েলের দিকে, ঠোঁটের কোণে এক অনির্বচনীয় দৃঢ়তা নিয়ে বলল—
-"আপনার ভাইয়ের কপাল খারাপ, কিছু করার নেই। তাকে সারাজীবন এই খারাপ কপাল নিয়েই বাঁচতে হবে।"
পায়েল এবার রেগে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ঘর কাঁপিয়ে এক গম্ভীর পুরুষালি কণ্ঠস্বর শোনা গেল—
-"পায়েল, ঘরে যা। নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে থাক। আমার ভাবির আশেপাশে যেন তোকে না দেখি। লিভ রাইট নাউ।"
রুহান, চোয়াল শক্ত করে বলল। চোখ দুটো জ্বলছে রাগে। তার স্বভাব চঞ্চল হলেও রাগে সে কম যায় না। ঘরে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ। পায়েল ভীষণ ঘাবড়ে যায়। রুহান একবার রেগে গেলে কি থেকে কি করে ফেলে নিজেও জানে না। ইলহান প্রচণ্ড রাগী, তবে রেগে গেলেও নিজের হুশ খুইয়ে ফেলে না। কিন্তু রুহান তার উল্টো। তাই পায়েল রুহানকে না ঘেঁটে, কিছুটা রাগে গজগজ করতে করতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
তার চলে যাওয়ার পর, রুহান ঘরের ভেতরে এসে নূরাইসার সামনে বসে তার দুই হাত নিজের হাতে নিতে যাবে অমনি ফারাহ চেঁচিয়ে উঠলো—
-"আরে মেহেদী দেওয়া ওর হাতে। সব নষ্ট হয়ে যাবে তো!"
রুহান দেখলো সত্যি মেহদী গুলো এখনও কাঁচা। তাই আর হাত ধরলো না। পাশে বসে নূরাইসার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল—
-"চুপ করে থাকিস কেনো? জবাব দিতে তো পারিস তাহলে সব সহ্য করিস কেনো?"
নূরাইসা ধীরে মাথা নিচু করে জবাব দিল—
-"আমি কাউকে কষ্ট দিয়ে কিছু বলতে পারি না, তুমি তো জানো।"
-"তাই বলে সব কিছু হজম করবি?" রুহান বিস্ময়ে প্রশ্ন করে।
নূরাইসা শান্ত কণ্ঠে বলে—
-"তুমি যেমন ব্যবহার করবে, সেই ব্যবহারই একদিন তোমার দিকেই ফিরে আসবে।"
রুহান এবার মৃদু হাসে। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলে—
-"তুই ঝামেলা এড়িয়ে চলতে চাস, বুঝি। ঠিক আছে, তোর কোনো ঝামেলায় জড়াতে হবে না। আমি তোর ভাই, ওরফে দেবর। আমি আছি তোর পাশে, অপমান, ঝামেলা, বিপদ, সবকিছুর বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে থাকবো। এমনকি আমার ভাই যদি কখনও তোকে কাঁদায়, আমি সেই অশ্রুর হিসাবও ছেড়ে দেব না।"
নূরাইসা ছলছল চোখে তাকায় তার দিকে। কত মানুষ যে তাকে ভালোবাসে! তার বোনেরা, তার বন্ধুরা, তার ভাইয়েরা তাকে আগলে রাখতে চায়। সে কখনোই এ ভালোবাসার মূল্য ভুলবে না, কষ্ট দেবে না কাউকে। এই সম্পর্ক, এই বিয়ে, সব কিছু ধরে রাখার জন্য সে প্রাণপণ চেষ্টা করবে। ইলহান ভাইয়ের প্রতি তার সমস্ত ভয় কেটে যাবে, সে বিশ্বাস করে। চোখের অশ্রু মুছে রুহানকে জড়িয়ে ধরে বলে—
-"ধন্যবাদ ভাইয়া। তোমার মতো ভাই, আমার বন্ধুদের মতো বন্ধু, আর বোনদের মতো বোন, সবাই যেন সব মেয়ের কপালে জোটে। আমি খুবই ভাগ্যবতী, কারণ তোমরা আছো আমার জীবনে। আমি তোমাদের খুব ভালোবাসি।"
ঘরে উপস্থিত সব মেয়ে একসাথে চেঁচিয়ে বলে উঠল—
-"আমরাও তোকে খুব ভালোবাসি ইসা!"
ঠিক তখনই রুহান বিরক্ত সুরে বলে—
-"আরে বাবা রে, আমার কান গেলো রে! ইসা, ছাড় আমাকে। এই মহিলা জঙ্গলীদের চেঁচামেচিতে আমার কানের পর্দা ফেটে গেছে!"
নূরাইসা হেসে তাকে ছেড়ে দেয়। তখন বাকি মেয়েরা একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে—
-"আমরা জংলী?"
রুহান হেসে উঠে যেতে যেতে বলে—
-"হ্যাঁ, তোরা জংলী! আমার কানের সর্বনাশ করলি রে। আমার তো মনে হয় এই জীবনে বিয়েই হবে না! ও ভাইয়া, আমার কী হবে গো!"
রুহানের কথা শুনে পেছন দিক থেকে আফরিন হঠাৎ বলে উঠল—
-"তুমি যেই প্লেবয়, তোমাকে কোনো বাবা তার মেয়ে দিবে না!"
রুহান তখন ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আফরিনের সেই কথা কানে যেতেই দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে একরাশ দুষ্টুমি ভরা হাসিতে বলল—
-"না দিলে তুলে নিয়ে আসব!"
নুহা পাশে দাঁড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে কটাক্ষ করে বলল—
-"তোমার মতো নির্লজ্জকে বিয়ে করবে কে?"
রুহান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে উত্তর দিল—
-"চিন্তা করিস না। আমার ফারাহ বেবি আছে না! কি বলো, বেবি?"
শেষ কথাটি বলেই ফারাহর দিকে তাকিয়ে একচোখ টিপল সে। ফারাহ চোখ কুঁচকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রাগভরা গলায় বলল—
-"আমার বয়েই গেছে আপনার মতো লজ্জাহীন পুরুষকে বিয়ে করতে!"
রুহানের কপালে তখন দুই ভাঁজ পড়ে। কপাল কুঁচকে বুকের ওপর দুই হাত ভাঁজ করে হালকা ঠাট্টার সুরে বলল—
-"আচ্ছা, লজ্জা কি কোথাও কিনতে পাওয়া যায়? না মানে আমি কিছু লজ্জা কিনতাম আর কি!"
নুহা কটাক্ষের হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বলল—
-"লজ্জাও তোমাকে দেখে লজ্জা পাবে! তাই ওইসব কেনার আশা বাদ দিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যা। এই জীবনে তোর কপালে কোনো মেয়ে জুটবে না, ভাইয়া!"
নুহার কথা শুনে রুহানের মুখ চুপসে গেলো। তারপর সে নাটকীয় ভঙ্গিতে উল্টো ঘুরে যেতে যেতে চেঁচিয়ে উঠল—
-"ও দাদু গো আমি সন্ন্যাসী হবো না! ও বাবা গো, আমি বিয়ে করব গো! ও ভাইয়া গো, আমাকে বিয়ে দে গো!ওরে তানভীর, আমার কি হবে রে? একটা মাইয়া আইনা দে ভাই, আমি বিয়া করব!"
রুহানের এই অদ্ভুত অভিনয় ও কান্নাকাটি শুনে সবাই হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল। হাসির রোল উঠল চারদিকে। দীর্ঘ পাঁচ দিন পর, অবশেষে নূরাইসার মুখে ফুটে উঠল একরাশ হাসি, আর সেই হাসি দেখে উপস্থিত সবাই মুহূর্তেই মুগ্ধ হয়ে গেল।
.
অবশেষে এসে গেল সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন, আজ নূরাইসা ইনায়া দেওয়ান ও নুহান ইলহান দেওয়ান-এর শুভ বিবাহ। কোনো জাঁকজমক নেই, নেই কোনো বাহুল্য কিংবা কর্ণবিদারক গানবাজনা। সাদামাটা, নিঃশব্দ, অথচ গহিন এক পবিত্রতায় ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনদের সাক্ষী রেখে সম্পন্ন হতে চলেছে এই পরিণয়।
বাড়ি জুড়ে কাঁচা ফুলের সুবাস। প্রতিটি কোণে রঙিন গন্ধরাজ, গাঁদা, রজনীগন্ধার গন্ধ মিশে আছে বাতাসে। বসার ঘরের মাঝখানে ফুল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বৃত্তাকার বেরা। এক পাশে পাত্রপক্ষের জন্য, অন্য পাশে কনে পক্ষের জন্য আলাদা বসার আয়োজন। ছেলেরা একে একে বসেছে নির্ধারিত স্থানে, ইলহান, বিহান, রুহান, তানভীর, মামারা, খালুরা, এমনকি নূরাইসার দুই ছেলে বন্ধুও এসে যোগ দিয়েছে।
ঘরভরা মানুষের চোখ তখন বারবার সিঁড়ির দিকেই যাচ্ছে। ঠিক সেই সময়ে, ইলহানের কানে ভেসে আসে চুড়ির ক্ষীণ রিনঝিন শব্দ। সে মুখ তুলে তাকায়, আর সাথে সাথে তার চোখ অনুসরণ করে তাকিয়ে থাকে পুরো ঘর। সিঁড়ির গা বেয়ে নামছে এক অপার্থিব সুন্দরী রমণী।
লাল টকটকে বেনারসী, যার গায়ে রূপালী জরির সূক্ষ্ম কাজ। মাথায় লাল ওড়না, যা মুখশ্রীটাকে ঢেকে রাখলেও চোখ দুটোতে পড়ে এক অজানা কাঁপুনির ছাপ আড়াল করতে পারে নি। পাশে ফারাহ ও আফরিন, পেছনে মেঘ, স্মৃতি, নুহা আর অন্যান্য কাজিনরা। তারা ধীরে ধীরে একত্র হয়ে নিয়ে আসছে কনেকে, নূরাইসাকে।
নূরাইসাকে নিয়ে এত আদিখ্যেতা পায়েলের সহ্য হচ্ছিল না। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে সে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে নূরাইসার দিকে, দৃষ্টিটা এমন, যেন চোখ দিয়েই তাকে গিলে খাচ্ছে।
নূরাইসাকে এনে বসানো হয় নির্ধারিত আসনে। চারপাশে বসে পড়ে মেয়েরা, তাকে ঘিরে যেন একটা রঙিন আশ্রয় গড়ে তোলে। নিঃশব্দে কথা হয় চোখে চোখে, স্পর্শে ও স্নেহে।
অন্যদিকে, ইলহানের মুখে কোনো কথা নেই, তবে চোখে কথা আছে। অজস্র কথা। তার দৃষ্টি পড়ে আছে কাঁপতে থাকা নূরাইসার ওপর। সে দেখছে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে কেমন যেন কাঁপন কাজ করছে তার মধ্যে। যেনো কিছু একটা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে হৃদয়ের ভিতর থেকে। এত মানুষের উপস্থিতিতে, এত নীরব আনন্দের মাঝেও নূরাইসার ভিতরে যেন ঢেউ খেলে যায়, ভয়, ভালোবাসা, বিশ্বাস আর অসমাপ্ত প্রশ্নে।
ঘরের মাঝখানে পাতা হয় সাদা চাদর, আর পাশে বসেন কাজী সাহেব, মুখে হালকা দাড়ি, কণ্ঠে নরম অথচ ভারী সুর। তার হাতের কাগজে লেখা থাকে নিয়ত, দেনমোহর ও স্বাক্ষরের জায়গা। চারদিকে তখন নিঃশব্দ এক জিজ্ঞাসা, এই মুহূর্তটাই কি তাহলে জীবনের নতুন শুরু? কাজী সাহেব প্রথমে উচ্চারণ করেন খুতবা, আল্লাহর নামে শুরু করে বলেন—
-"নিকাহ্ একটি পবিত্র বন্ধন। এটি নবী করীম (স.)-এর সুন্নত। যারা সুন্নতকে ভালবাসে, তারা এর মর্যাদা রাখে। নিকাহ্ শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি ইবাদতেরই এক রূপ।"
এরপর, নরম গলায় প্রশ্ন করলেন তিনি—
-"দেনমোহর কত বাঁধা হবে?"
ইলহান শান্তস্বরে উত্তর দিল—
-"দেনমোহর হিসাবে বাঁধা হবে স্বয়ং নুহান ইলহান দেওয়ান।"
তার কথা শুনে এক নিমিষে ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এল। সবাই অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকাল তার দিকে। নূরাইসা থমকে গেল। হতচকিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তার দিকে। যে মানুষটা স্পষ্ট বলেছিল সে তাকে পছন্দ করে না, সেই মানুষটাই আজ নিজেকে দান করে দিল তার দেনমোহর হিসেবে! কাজী সাহেব কণ্ঠে দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
-"বাবা, দেনমোহর তো টাকায় বাঁধা হয়।"
ইলহান মুচকি হেসে বলল—
-"তাহলে এই নামের সঙ্গে এক টাকাও যুক্ত করে দিন।"
কাজী সাহেব এবার একটু কঠিন স্বরে বললেন—
-"এইভাবে হয় না বাবা। মানুষকে কিভাবে দেনমোহর হিসাবে লিখব?"
ইলহান চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা নিয়ে বলল—
-"লিখলেই হবে। যদি কোনোদিন ভবিষ্যতে আমাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে, তাহলে সেই বিচ্ছেদের বিনিময়ে আমরা একে অপরকেই ফিরে পাব। অর্থাৎ, এর প্রকৃত অর্থ দাঁড়ায়, আমাদের কখনও বিচ্ছেদ ঘটবে না।"
সে নূরাইসার চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল কথা গুলো। নূরাইসা সেই দৃষ্টি দেখে সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিলো। কাজী সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বললেন—
-"কিন্তু দেনমোহর আদায় করেই স্ত্রীর কাছে যেতে পারবে!"
ইলহান এবার শান্ত অথচ আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলল—
-"আমিই তো যাচ্ছি তার কাছে। সে পাবে তার দেনমোহর, আমাকে, এবং সঙ্গে তার স্বামীকেও।"
কাজী সাহেব যেন হাল ছেড়ে দিয়ে বিয়ে পড়াতে শুরু করলেন। বাড়ির বড়দের মুখে কোনো বিস্ময় ছিল না, যেন তারা এমন কিছু প্রত্যাশাই করছিলেন। তবে আশেপাশে যারা ছিল, তারা বিস্ময়ের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। কাজী সাহেব দেনমোহর লিখে বলা সুরি করলেন—
-"নূরাইসা ইনায়া দেওয়ান, আপনি কি নুহান ইলহান দেওয়ানকে এক টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিয়েতে কবুল করেছেন? তাহলে বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল।"
নূরাইসা মুখ তুলে তাকায় না। তার ঠোঁট কাঁপে, হৃদয় ঢেউ তোলে, আর এক মুহূর্তের নীরবতার পর, সে ধীর কণ্ঠে বলে—
-"আলহামদুলিল্লাহ কবুল।"
একই ভাবে আরো দুবার কবুল বলা হয়।
তারপর জিজ্ঞাসা করা হয় ইলহানকে—
-"নুহান ইলহান দেওয়ান আপনি কি নূরাইসা ইনায়া দেওয়ানকে এক টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিয়েতে কবুল করেছেন? তাহলে বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল।"
ইলহান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে চোখ বন্ধ করে হালকা মাথা নোয়ায়—
-"আলহামদুলিল্লাহ কবুল।"
সবাই যেন দম নিয়ে বসে থাকে সেই ক্ষণ পর্যন্ত। তিনবার উচ্চারিত কবুল-এর পর, যখন সাক্ষীরা সাক্ষর করেন কাগজে, তখন জীবন বদলে যায়। তখন আর সেই শুধু এক ছেলেমেয়ের সম্পর্ক নয়, তা পরিণত হয় এক পবিত্র বন্ধনে, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে বরকতস্বরূপ।
.
বিয়ে পড়ানোর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে, নূরাইসাকে নিয়ে যাওয়া হয় ইলহানের ঘরে। সযত্নে সাজানো সেই কক্ষ যেন এক পুষ্পবাগান। ঘরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে থাকা কাঁচা ফুলের সৌরভে ভরে উঠেছে বাতাস, মন জুড়ানো এক মোমো গন্ধ। বিছানার উপর গোলাপের পাপড়িতে আঁকা হয়েছে একটি হৃদয়চিহ্ন, যার ঠিক মাঝখানে লেখা, নূরাইসা ও ইলহান। কক্ষের মাঝখানে শান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে নূরাইসা। চোখে-মুখে অচেনা আবেগের আভা। এই ঘরে খুব একটা প্রবেশ করেনি সে, এক ধরনের শঙ্কা আর দূরত্ব বোধে। অথচ আজ থেকে এ ঘরই তার স্থায়ী ঠিকানা, তার নতুন পৃথিবী।
রাত বারোটা বাজে। এখনো ইলহানের দেখা নেই। সে আছে বাইরে, বন্ধুদের সঙ্গে। যদিও বিয়েতে তেমন কাওকে আমন্ত্রণ জানায়নি, শুধু বিহান ছিল তার সঙ্গী। অফিসের এক জরুরি কাজের সূত্র ধরেই বেরিয়েছিল, ফিরতেও দেরি হলো বেশ। অবশেষে, গভীর রাত পেরিয়ে বাড়ির চৌকাঠে পা রাখে তারা দুজন। বিহান আজ এই বাড়িতেই থেকে যাবে।
ইলহান সোজা নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। ক্লান্ত শরীর, চোখে নিদ্রার ছাপ, কিন্তু দরজার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়, সামনে একদল বাধা! নুহা, রুহান, ফারাহ, আফরিন, তানভীর, সবাই একসাথে দরজার সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাসরের দরজায় যেন ছোটখাটো এক "টোল প্লাজা"!
ইলহান ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন ছোড়ে—
-"এখানে কী চাই তোমাদের?"
রুহান খিকখিক করে হেসে বলে—
-"এটা তো বড় ভাইয়ের বাসর! আমরা বাসর সাজিয়েছি, এখন তার পারিশ্রমিক চাই।"
নুহা মিষ্টি হেসে বলে—
-"টাকা দাও, তারপর ঢুকতে পারবে। নইলে আজ বউয়ের মুখ দেখাও যাবে না!"
ইলহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে, স্পষ্ট বোঝা যায় আর ঝামেলায় যেতে চায় না। পকেট থেকে টাকা বের করতে উদ্যত হয় ঠিক তখনই বিহান পাশে দাঁড়িয়ে বাধা দেয়—
-"এই যে, এত সহজে কেন টাকা দিচ্ছিস? আগে শুনি, কী অপরাধে এই জরিমানা?"
নুহা কোমরে হাত রেখে এগিয়ে আসে, মুখে বিজয়ীর হাসি—
-"অপরাধ নয়, অধিকার! বাসরঘর আমরা সাজিয়েছি, তাই তার পারিশ্রমিক চাই। ঘর সাজাতে ফুল কিনেছি, আলো জ্বেলেছি, কুশন সাজিয়েছি, সবই খরচের হিসাব আছে।"
বিহান ঠোঁটে ব্যঙ্গাত্মক হাসি টেনে বলে—
-"তোমাদের কি কেউ বলেছিল সাজাতে? নিজের শখে কাজ করেছো, এখন তার দাম নিচ্ছো? দায়িত্ব নিলে ভালো, দাবি তুললে সেটা তো চাঁদাবাজি!"
নুহা রাগে ফেটে পড়ে—
-"কি বললে? চাঁদাবাজি?"
-"হ্যাঁ, আইনগত ভাষায় একে তাই বলে!" বিহান হেসে জবাব দেয়।
রুহান হাসতে হাসতে যোগ করে—
-"বড় ভাই, তোমার আইন পড়া বন্ধুটা আজ বাসরেও জজ মিয়ার মতো বক্তৃতা দিচ্ছে!"
আফরিন এবার সামনে আসে, কণ্ঠে মিষ্টি দৃঢ়তা—
-"ভাইয়া, যত যুক্তিই দাও, আজ ঘরে ঢুকতে হলে টোল দিতে হবে। না দিলে আজ রাত তোমার ড্রয়িংরুমেই বিছানা পেতে ঘুমাতে হবে।"
ফারাহ চোখ টিপে যোগ করে—
-"আর যদি ভাবেন, ঘুষ দিয়ে কাজ হবে, তাও ভাবুন ভালো করে, এই টোলের হার নির্দিষ্ট নয়, মুড অনুযায়ী বাড়বে কমবে।"
তানভীর পাশ থেকে হেসে বলে—
-"আমি সাক্ষী! এখন না দিলে পরে সুদসহ দিতে হবে।"
সবাই হাসিতে ফেটে পড়ে। ইলহান মাথা নেড়ে হেসে ফেলে—
-"তোমাদের এই নাটক বন্ধ করার কোনো উপায় আছে?"
নুহা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে—
-"হ্যাঁ, একটা উপায় আছে, টাকা দাও!"
অবশেষে ইলহান পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে বাড়িয়ে দেয়। নুহা তৎক্ষণাৎ সেটা গুনে নিয়ে বলে—
-"চলবে না! আমাদের সাজানো বাসরের মান অনুযায়ী এটা টিপস, পারিশ্রমিক নয়!"
বিহান হাসতে হাসতে বলে—
-"এরা তো একদম ইনকাম ট্যাক্স অফিসার!"
শেষমেশ আফরিনই সমাধান করে—
-"ঠিক আছে, ভাইয়া, মিষ্টি মুখে একটা প্রতিশ্রুতি দাও, বউকে সারাজীবন ভালো রাখবে। তাহলেই আজকের টোল মাফ।"
ইলহান হেসে বলে—
-"প্রতিশ্রুতি দিলাম। এখন কি ঢুকতে পারি?"
সবাই একসাথে চিৎকার করে ওঠে—
-"পারো!"
দরজা খুলে যায়, হাসির গুঞ্জনে ভরে ওঠে চারপাশ,
আর ইলহান প্রবেশ করে তার নতুন জীবনের প্রথম প্রহরে।
এক এক করে সবাই সরে যায়। কোলাহল থেমে যায়, কিন্তু করিডোরে এখনো রয়ে গেছে দুটি ছায়া, নুহা আর বিহান। দুজনেই নিঃশব্দ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। বাতাসে গোলাপের ঘ্রাণ, আলো নিভু নিভু করছে।
বিহান হালকা হেসে বলে—
-"তুমি না থাকলে এই বাড়িটা একদম নিরস হয়ে যেত!"
নুহা ঠোঁট বাঁকিয়ে জবাব দেয়—
-"আমি না থাকলে তুমি কাকে খেপাবে! সেই জন্য এখন পাম দিচ্ছ, আমি ফুলছি না মোটেও!"
-"খেপানো তো এখন আমার নেশা হয়ে গেছে।"
বিহান মুচকি হাসে, চোখে দুষ্টু ঝিলিক।
নুহা ভ্রু কুঁচকে বলে—
-"তুমি সবসময় এমন ব্যঙ্গ করে কথা বলো কেন বিহান ভাই?"
-"কারণ তুমি সিরিয়াস হয়ে গেলে দেখতে খুব বাজে লাগে।"
নুহা গম্ভীর স্বরে বলে—
-"একদিন কেউ তোমাকেও খেপাবে, তখন বুঝবে মজা!"
-"আমার মতো মানুষকে কে খেপাবে বলো তো? আমার জন্য কেউ এত কষ্ট করবে না।" বিহান হেসে গায়ে হাত ঝাড়ে।
নুহা চোখ নামিয়ে ফেলে, মৃদুস্বরে বলে—
-"কেউ কেউ কষ্ট করে, শুধু তুমি বুঝো না।"
বিহান শুনতে পায় না, কিংবা শুনেও ধরতে পারে না কথার মানে। তার কণ্ঠে হাসির ছোঁয়া—
-"চল, এখন ঘুমাতে যাও। কাল সকালেই নতুন গল্প শুরু হবে।"
নুহা মুচকি হেসে বলে—
-"হ্যাঁ! আপু আর ভাইয়ার নতুন জীবন শুরু হবে, একদম উপন্যাসের মতন।"
বিহান হালকা হেসে বলে—
-"উপন্যাস জগতের মধ্যেই থাকো সারাজীবন। বাস্তব জীবনেও বেরিয়ে এসো কখনও!"
নুহা হাঁটতে হাঁটতে বলল—
-"উপন্যাস জীবনে দুঃখ কষ্ট নেই। শুধুই আনন্দ। তোমার কাছে বাস্তব জীবন কি, বিহান ভাই?"
বিহান মজা করে বলে—
-"বাস্তব মানে অফিস, ঘুম, আর খাবার। তোমার কথাবার্তা মানে ফ্যান্টাসি!"
নুহা চুপ করে যায়। তার চোখে একরাশ আলো জমে ওঠে, যে আলো বিহান দেখতে পায় না, আর সেই আলোতেই লুকিয়ে থাকে তার একতরফা ভালোবাসা।
বিহান হেসে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে ওঠে—
-"শুভরাত্রি, ছোট পাগলি।"
নুহা নিঃশব্দে উত্তর দেয়—
-"শুভরাত্রি, কিন্তু আমার পাগলামি তুমি কোনোদিনই বুঝবে না, বিহান ভাই।" শেষের কথা গুলো নুহা বিড়বিড় করেই বলে, যার ফলে বিহান শুনতে পায় না।
করিডোর ফাঁকা হয়ে যায়। বাতাসে তখনও গোলাপের ঘ্রাণ, আর একটু একটু করে জমে ওঠে এক নতুন জীবনের পৃষ্ঠা, যেখানে ভালোবাসা আছে, কিন্তু স্বীকার নেই।