সকালের মোলায়েম রোদ জানালার কাঁচ ছুঁয়ে বসার ঘরটাকে যেন নতুন প্রাণ দিয়েছে। টেবিলে একসাথে সকলে নাশতা করছে, কথাবার্তা কম, কিন্তু চারপাশে এক নিঃশব্দ উষ্ণতা ছড়িয়ে আছে। অথচ অনুপস্থিত নূরাইশা। তার চেয়ারটা খালি, আর সেই শূন্যতা যেন পুরো ঘরটাকেই ভারী করে তুলেছে। কারো ঠোঁটে প্রশ্ন নেই, কিন্তু মনের ভেতর নিঃশব্দে জন্ম নিচ্ছে নানা ভাবনা, হয়তো বিয়ের প্রসঙ্গেই সে আড়াল হয়েছে, হয়তো লজ্জা কিংবা দ্বিধা তার নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে আছে।
নাশতা শেষে একে একে সবাই যার যার কাজে চলে গেল। শুধু তানভীর, রুহান, ইলহান, নুহা আর আফরিন বাদে। তারা আজ শপিংয়ে যাবে বলে অপেক্ষায় বসে রয়েছে নিচে। সময় গড়িয়ে যায় ধীর তালেই। কিন্তু নূরাইশার কোনো সাড়া নেই। বিরক্তি জমে উঠতেই নুহা সোজা উঠে গেল উপরে। দরজা ঠেলে ঢুকেই সে বলল—
-"কি করিস আপু! এখনো তৈরি হোসনি? যাবি না আমাদের সাথে?"
বিছানার ধারে বসা নূরাইশা চোখ না তুলেই বলল শান্ত গলায়—
-"না। তোরা যা, আমার যাওয়ার দরকার নেই। যা দরকার, কিনে নিয়ে আয়।"
নুহা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইলো। কিছু বলতে উদ্যত হতেই ভেসে এলো এক গম্ভীর পুরুষালি কন্ঠস্বর—
-"পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিচে না নামলে আমি নিজে এসে তুলে নিয়ে যাব।"
তার কথার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ নিস্তব্ধ ঘর কেঁপে উঠল দৃঢ়, পুরুষালি এক কণ্ঠে, চমকে উঠল দু’জনেই। চোখ ঘুরল দরজার দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ইলহান। চোখে কঠোর দৃঢ়তা, ঠোঁটে আবেগহীন রেখা, কণ্ঠে শীতল অথচ অস্বীকারহীন আদেশের সুর। মুহূর্তেই বাতাস ভারী হয়ে উঠল। কোনো উত্তর বা প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা না করেই ঘুরে চলে গেল সে। কিছুক্ষণ পর মা ও বড়মা এসে প্রায় জোর করেই নূরাইশাকে সাজিয়ে দিল, ঠেলে নামাল নিচে।
.
গাড়ির ইঞ্জিন এক অচেনা গর্জনে কেঁপে উঠল। স্টিয়ারিং আঁকড়ে বসে আছে ইলহান, দৃষ্টি স্থির সামনের রাস্তায়। পাশে নিশ্চুপ নূরাইশা, মাথা নিচু, ঠোঁট সিল করা। তার চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে জানালার কাঁচে ভেসে থাকা সকালের আলো, তবু মনে হচ্ছে আলো নয়, অজানা অন্ধকারই তাকে ঘিরে রেখেছে। পেছনের সিটে রুহান, নুহা, আফরিন, তানভীর আর ফারাহ, তবে তাদের হাসি-কথার আড়ালে স্পষ্ট এক চাপা ছন্দ, এক অঘোষিত উত্তেজনা।
গাড়ি এসে থামল এক বিশাল শপিং মলের সামনে। আলো ঝলমলে স্থাপনা, কাঁচের দেয়ালে প্রতিফলিত হয়ে যেন চারপাশ জুড়ে তৈরি করেছে এক ভিন্ন জগৎ। একে একে সবাই নামতে শুরু করল। মুহূর্তেই চোখে পড়ল বিহানকে, তার উপস্থিতি যেন পরিবেশকে নতুন আলোয় ভরিয়ে দিল।
নুহার চোখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তি, দীর্ঘশ্বাস সবকিছুই হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। মুখে এক ঝলক উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে পড়ল, বুকের ভেতর লুকোনো অনুভূতিগুলো হঠাৎ যেন প্রাণ ফিরে পেল। এই মানুষটিকেই তো সে নিঃশব্দে এতদিন ধরে ভালোবেসে এসেছে!
বিহান এগিয়ে এলো। ইলহানকে জড়িয়ে ধরলো। রুহান তানভীরকেও। সবার সাথে কুশলবিনিময় করে সবাই হাটা ধরলো। ভিড় জমে সবাই ভেতরে প্রবেশ করল। আলোর মায়াজালে সাজানো সিঁড়ি আর এসকেলেটরগুলোয় হাঁটতে হাঁটতে কারও মুখে বিস্ময়, কারও ঠোঁটে মিষ্টি হাসি। ফারাহ একটু এগিয়ে গেল দল থেকে, আর পেছন পেছন রুহান। শুধু অনুসরণ নয়, চোখেমুখে দুষ্টুমি, ঠোঁটে হাসি। রুহান ফারাহর চুলে আলতো টান দিয়ে ফিসফিস করে বলল—
-"তুমি না হাঁটলে চাঁদও থেমে যাবে মনে হয়, সুন্দরী!"
ফারাহ মুখ গম্ভীর রাখতে চাইল, কিন্তু চোখের কোণে ফুটে উঠল লাজুক আলোর ঝিলিক। সে উত্তর দিল—
-"অতিরিক্ত প্রশংসা কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য হয় না, জানেন তো রুহান ভাই?"
রুহান হেসে বলল—
-"তবু তোমাকে দেখলেই সব প্রশংসা ছোট হয়ে যায়, ফারাহ।"
ফারাহ সামনের দিকে তাকিয়ে কটাক্ষ করে বলল—
-"আপনার তো সব মেয়েকে দেখলেই একই অনুভূতি হয় রুহান ভাই!"
রুহান অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো। দ্রুত ফারাহর সামনে দাড়িয়ে বলল—
-"মোটেও না। আমি সবার প্রশংসা করি না ফারাহ!"
-"হ্যাঁ, আমি খুব ভালো করেই জানি!"
বলেই ফারাহ দ্রুত এগিয়ে গেলো সামনে। রুহান প্রতিটা মেয়ের সাথেই এইভাবে কথা বলে। তাই ফারাহ বিশেষ কিছু ভাবলো না। রুহানের স্বভাবটাই এমন। সব সময় মজার ছোলেই থাকে সে।
অন্যদিকে বিহানের পাশে নুহা হাঁটছে। তার মনে হচ্ছে পায়ের নিচে ফুল বিছানো আছে, প্রতিটি পদক্ষেপে স্বপ্নের রঙ মিশে যাচ্ছে বাস্তবতায়। বুকের গভীর থেকে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে— "তুমি আমার প্রার্থনার মানুষ, বিহান ভাই!" কিন্তু ঠোঁট শুধু কেঁপে ওঠে, শব্দ হয়ে বেরোতে পারে না। নুহা বারবার আড়চোখে দেখছে বিহানকে, যে তানভীর ও আফরিনের সাথে দুষ্টুমি করতে ব্যস্ত।
বিহানের সঙ্গে তখন আড্ডায় মেতে আছে তানভীর আর আফরিন। হাসির ঝলকানি তাদের কথায় স্পষ্ট। কেউ ঠাট্টা করছে, কেউ মজা করছে। বিহান বয়সে তাদের বড় হলেও সবসময় বন্ধুসুলভ আচরণ করে তাদের সাথে। তানভীর, আফরিন, রুহান, নুহা—যেমন ইলহানের ভাইবোন, বিহানও ছোটবেলা থেকেই তাদের সেইভাবেই দেখে আর স্নেহ করে।
কথার ফাঁকেই তানভীর হেসে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল—
-"বুঝেছো বিহান ভাই, আমাদের রুহান ভাইয়ের না জীবনের একটাই টার্গেট, ফারাহর পিছে ঘোরা!"
আফরিন হাত নেড়ে সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল—
-"ঘোরা না, ফলো করা! মানে এমনভাবে ঘোরে, যেন গুগল ম্যাপেও লোকেশন লুকানো যায় না।"
সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। বিহান হেসে কপালে হাত দিয়ে বলল—
-"এই রোগটা ওর বাল্যকাল থেকে আছে। পাড়ার মেলায় যেমন লালচে ফিতা হাতে ঘুরতো, এখনো ঠিক তেমনই, শুধু টার্গেট পাল্টায়!"
তানভীর গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল—
-"ওরে ভাই, একদম প্লেবয় ভার্সন ২.০! শুধু নাম আর প্রোফাইল পিক পাল্টায়, কাণ্ডকারখানা আগের মতোই থাকে।"
আফরিন খিলখিলিয়ে উঠল—
-"কিন্তু মানতেই হবে, ফারাহ একবার মুচকি হাসলেই রুহান ভাইয়ের ব্যাটারি ফুল চার্জ।"
বিহান মজা করে বলল—
-"ভালোই তো! অন্তত চার্জারের খরচ বাঁচে ওর।"
তখনই নুহা পাশ থেকে ফিসফিস করে বলে উঠল—
-"শুধু ফারাহ আপু না। যেকোনো মেয়েই ওর দিকে তাকিয়ে হাসলে আর ব্যাটারি ফুল। মানে এ কি জীবনে কোনোদিন সিরিয়াস হবে না। এইভাবে চলতে থাকলে কপালে বউ জুটবে না ওর।"
তাদের হাসি থামতে না থামতেই হঠাৎ পিছন থেকে একটা গম্ভীর গলা শোনা গেল—
-"এই যে, আমার নামে এত কি কথা হচ্ছে শুনি?"
সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখা গেল রুহান দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমি ভরা হাসি, চোখে ঝিলিক।তানভীর এক সেকেন্ড নীরব থেকে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
-"এটা তোর কল্পনা, রুহান। আমরা তো তোর নামই নেইনি!"
আফরিন যোগ করল—
-"হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা আসলে এক ভদ্রলোককে নিয়ে আলোচনা করছিলাম, যার নাম রুহান-এর মতো শোনায়!"
বিহান আর নুহা হেসে গড়িয়ে পড়ল, আর রুহান ঠাট্টার ছলে পাশে গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গম্ভীর মুখ করে বলল—
-"খুব মজা পেয়ে গেছিস তোরা, দাঁড়া... আমি কিন্তু এর সঠিক প্রতিশোধ নেব!"
তাদের হাসি-ঠাট্টায় পুরো পরিবেশ আবার নতুন করে জমে উঠলো।
.
সামনে হাঁটছে ইলহান, চিরকালীন শান্ত, গম্ভীর, একরোখা স্বভাবের প্রকাশ তার ভঙ্গিতেই ধরা দেয়। তার পিছু পিছু হাঁটছে নূরাইশা, মাথা নিচু, হাত দুটো বারবার কচলাতে কচলাতে যেন নিজের সাহসটুকু আঁকড়ে ধরতে চাইছে। উপস্থিত সবাই জানে, নূরাইশা ইলহানকে ভয় পায়। দৃশ্যটি এত পরিচিত যে, কারও মনে আজ কোনো প্রশ্ন জাগে না।
অবশেষে তারা এসে দাঁড়াল একটি নামী শাড়ির দোকানে। দোকানটি যেন ভেতরে এক রাজপ্রাসাদ, ঝাড়বাতির আলোয় ঝলমল করছে দেয়াল, নরম সোফাগুলো ডেকে নিচ্ছে ক্লান্ত দেহকে, চারপাশে ছড়িয়ে আছে ফুলের সুগন্ধ। সবাই বসতেই দোকানদার এগিয়ে এল হেসে। তার অভিজ্ঞ চোখ মুহূর্তেই বুঝে নিল এই ভিড় বিয়ের কেনাকাটার অংশ। তাই বিনম্র কণ্ঠে প্রশ্ন করল—
-"শাড়ি দেখাবো, নাকি লেহেঙ্গা?"
দোকানদার প্রশ্ন করতেই তানভীর মজা করে বলে উঠল—
-"ভাই, আগে লেহেঙ্গা দেখান! শাড়ি তো রোজকার জিনিস।"
আফরিন সঙ্গে সঙ্গেই চোখ বড় বড় করে তাকাল—
-"কি বললে! বিয়ের শপিংয়ে শাড়ি বাদ দেওয়া যায় নাকি? শাড়িতেই কনের রূপ ফুটে ওঠে।"
তানভীর হেসে পাল্টা জবাব দিল—
-"আচ্ছা, তাই নাকি? তাহলে কনেকে শাড়ি আর ব্রাইডসমেডদের লেহেঙ্গা, ফাইনাল!"
সবাই হেসে উঠল। দোকানের ভেতরে হাসির প্রতিধ্বনি যেন ঝাড়বাতির কাঁচে বাজতে লাগল। এদিকে ফারাহ আলতো করে একটি রঙিন লেহেঙ্গা হাতে তুলতেই রুহান এগিয়ে এসে বলল—
-"তোমার জন্য একেবারে পারফেক্ট। জানো কেন?"
ফারাহ ভুরু কুঁচকে তাকাল—
-"কেন?"
রুহান দুষ্টু হাসি দিয়ে উত্তর দিল—
-"কারণ এর ঝলকানির কাছে তারারাও হেরে যাবে, কিন্তু তুমিই একমাত্র যাকে ওরা দেখে ঈর্ষা করবে।"
ফারাহ মুখে বিরক্তির ভান করলেও গাল লাল হয়ে উঠল। সে ফিসফিস করে বলল—
-"আমি আপনার ছোট বোনের বাঁধুনি রুহান ভাই। এইসব ফ্লার্টবাজি বন্ধ করুন!"
রুহান আরও ঝুঁকে এসে মৃদু স্বরে বলল—
-"বোনের বান্ধবী বোন তো আর নয়!"
ওদিকে একটু দূরে বসে আছে নুহা। তার চোখ গোপনে খুঁজছে বিহানকে। দোকানের আলোয় ঝলমল করতে থাকা শাড়ির রঙ তার চোখে পড়ে না, সব আলো যেন কেবল বিহানের চারপাশেই গাঢ় হয়ে ।
ইলহান বসে দোকানের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছে। তার চোখে কেমন যেন কঠোরতা। নূরাইশা নীরবে তার পাশে বসে আছে, হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরেছে। যেন মনে মনে প্রার্থনা করছে, ইলহানের সামনে কোনো ভুল যেন না হয়।
দোকানদার আবার এগিয়ে এসে বলল—
-"এই দিকটায় নতুন কালেকশন এসেছে। চাইলে একটু দেখতে পারেন।"
সব চোখ একসাথে ঘুরে পড়ল নূরাইশার দিকে। সে তখনও মাথা নিচু করে ইলহানের পাশেই বসে আছে। মনে হচ্ছিল, যেন নিজের অস্তিত্বকে গুটিয়ে নিয়েছে বুকের ভেতরে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার মুহূর্ত যেমন ছিল, এখনো ঠিক তেমনই, স্থির, নিশ্চুপ, অনিমেষ। একবারের জন্যও সে চোখ তুলে তাকায়নি কারো দিকে। এই নিরবতা যেন ইলহানের অস্থির রাগকে আরও প্রজ্বলিত করে তুলল। হঠাৎ করেই তার কঠোর স্বর ঘিরে ফেলল পুরো পরিবেশ—
-"তামাশা করতে এসেছি আমরা এখানে? প্রশ্ন করা হচ্ছে, আর কেউ উত্তর দিচ্ছে না কেনো?"
ইলহানের ধমকে কেঁপে উঠল নূরাইশা। চারপাশে বসা সবাই মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তার রাগ সম্পর্কে কমবেশি সকলে জানে, তবু এই প্রকাশ্য রূঢ়তা যেন হঠাৎ বজ্রপাতের মতো নেমে এল। তখনই বিহান দ্রুত এগিয়ে এসে ইলহানের কাঁধে হাত রাখল। কণ্ঠে চাপা ধমক আর অদৃশ্য বারণ মিশিয়ে বলল—
-"শান্ত হ । এটা পাবলিক প্লেস, জানিস তো। আর ইসা তোকে এমনিতেই ভয় পায়। ভীতু মেয়েটাকে তুই কেন আরও কাঁপিয়ে দিচ্ছিস?"
ইলহান চোখ কুঁচকে নিচু গলায় গর্জে উঠল—
-"বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে একবারও তাকায়নি কারো দিকে। কথা পর্যন্ত বলছে না। দোকানদার প্রশ্ন করছে, আর সে একদম চুপ। থাপড়াতে ইচ্ছে করছে আমার!"
বিহান থমকালো, রাগ দমন করল, তারপর ধীর কণ্ঠে বলল—
-"কালকে তুই যা করেছিস, তার পর ওর এইরকম আচরণ স্বাভাবিক। তুই জানিসই তো, সে এমনিতেই ভীতু স্বভাবের। তোর রুক্ষ ব্যবহার সব মিলে একদম স্তব্ধ করে দিয়েছে ওকে। একটু নরম ভাবে বল, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।"
ইলহান বিরক্ত মুখে সরে দাঁড়াল। ঠোঁটে একরাশ তিক্ততা ছড়িয়ে বলল—
-"পারবো না আমি। যদি এতই দরদ হয়, তাহলে তুই বল ওকে।"
বিহান গভীর হতাশায় মাথা নাড়ল। একগুঁয়েমির যেন কোনো সীমা নেই! দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল সে। চোখের ইশারায় নুহাকে কিছু বোঝাল, তারপর ধীরে ধীরে নূরাইশার পাশে গিয়ে বসল। তার কণ্ঠে এল এক অপার্থিব কোমলতা, এক নিঃশব্দ সহানুভূতির পরশ—
-"ইসা আপু, কী নেবে তুমি? শাড়ি, না লেহেঙ্গা?"
নূরাইশা নিশ্চুপ। সাড়া নেই, দৃষ্টি নেই। যেন সে চারপাশের পৃথিবী থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। হঠাৎ বিহান লক্ষ করল, নূরাইশার চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ছে তার হাতের উপর। সেই কান্না ছিল শব্দহীন, অথচ অপ্রতিরোধ্য। বিহান থমকে গেল, বাকরুদ্ধ। বিহানের নিস্তব্ধতা দেখে অন্যরাও তাকাল নূরাইশার দিকে। ভয়ে, লজ্জায়, অপমানে চুপসে গিয়ে সে কাঁদছে, শব্দহীন অথচ তীব্র ব্যথায় ভিজে। চারদিকের নীরবতায় সেই কান্নার ভার যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। যখন অতিরিক্ত ভয় পায় নূরাইসা, তখন কান্না করে দেয়।
ইলহানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখে অদৃশ্য বজ্রপাত জমে উঠল। গম্ভীর স্বরে দোকানদারকে নির্দেশ দিল—
-"আপনি লাল বেনারসী বের করুন।"
দোকানদার তড়িঘড়ি মাথা নেড়ে নির্দেশ মেনে চলে গেল। ইলহান নিজেই একটি লাল বেনারসী বেছে নিল। তারপর নির্লিপ্তভাবে অন্যদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল—
-"তোরা কী নিবি?"
নুহা ও আফরিন একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। চোখেমুখে ভয়, কণ্ঠে চাপা স্বর—
-"কাঞ্জিভরম শাড়ি..."
ইলহানের মুখে কোনো আবেগের ছাপ নেই। নিঃস্পৃহ কণ্ঠে দোকানদারকে নির্দেশ দিল—
-"ওদের কাঞ্জিভরম শাড়ি দেখান। আর আমাকে ২০টা সুতি শাড়ি, ১৫টা কাতান, ১২টা কাঞ্জিভরম আর ১০টা সিল্ক শাড়ি দেখান।"
চারপাশ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। কারও মুখে কোনো কথা নেই। সবাই বিস্মিত। এত শাড়ি দিয়ে কী করবে সে? নূরাইশা তো সাধারণত অনুষ্ঠানের বাইরে শাড়িই পরে না। অথচ সে কিছু বলছে না, মাথা নিচু করে একেবারে নিশ্চুপ। যেন সে এই জগতে নেই, বরং কোথাও দূরে, অদৃশ্য ভয়ের গভীরে ডুবে গেছে।
সবাই একে একে নিজেদের পছন্দমতো শাড়ি বেছে নিল। ইলহানের নির্দেশে বাড়ির অন্য মহিলাদের জন্যও শাড়ি কেনা হলো। এরপর তারা সবাই ছেলেদের জন্য পাঞ্জাবির দোকানে গেল, শেষে কসমেটিকসের দোকানে। মেয়েরা তখন রীতিমতো কেনাকাটায় মশগুল। কেউ লিপস্টিক পরীক্ষা করছে, কেউ পারফিউমের ঘ্রাণে হারিয়ে যাচ্ছে, কেউ বা নেলপলিশের রঙ মিলিয়ে দেখছে আঙুলে। চারপাশে যেন রঙিন উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছে দোকানটা। আর ছেলেরা? তারা দাঁড়িয়ে আছে একপাশে, হাতে শপিং ব্যাগের বোঝা, চুপচাপ ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছে যেন।
ঠিক তখনই রুহান হালকা দুষ্টুমির ভঙ্গিতে বলে উঠল—
-"এই জন্যই আমাদের মতো নিরীহ পুরুষদের নিয়ে আসে এরা! লাখ লাখ টাকার শপিং ব্যাগ হাতে করে ঘোরানোর জন্য। এত শপিং মানুষ করে নাকি? পুরো শপিং মল তো আমরা কমপক্ষে বিশবার চক্কর মেরে ফেললাম! আমার তো মনে হচ্ছে, পায়ের নিচে আর মাটি নেই, শুধুই জুতো হাঁটছে এখন।"
বিহান তখন নুহার শপিং ব্যাগগুলো কাঁধে ঝুলিয়ে আস্তে আস্তে সামনের দিকে হাঁটছে। মুখে হালকা হাসি, চোখে পরিপক্ব সৌম্য ভাব। তার পাশে তানভীর, দুই হাতে সামলে রেখেছে আফরিনের ব্যাগ। মাঝে মাঝে বিরক্ত মুখ করে আফরিনকে ঠাট্টা করছে—
-"আর কত? পাঞ্জাবি কেনা শেষ, কসমেটিকস শেষ, এবার কি চুলের দড়ি কিনবি নাকি?"
আফরিন কেবল হেসে দিল, যেন জানে, তানভীরের এই বিরক্তি কেবল বাহ্যিক। ঠিক তখনই নুহা রুহানের দিকে কটাক্ষ ছুঁড়ে দিল—
-"বাহ! নিজের বোনের ব্যাগ অন্য পুরুষ নিচ্ছে, আর আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন বোনের বান্ধবীর ব্যাগ হাতে! একটু তো লজ্জা থাকা উচিত, না রুহান ভাই?"
রুহান প্রথমে থমকাল। তারপর চোখে বিদ্যুৎ খেলে গেল, গলায় দৃঢ়তা জমে উঠল। সে জোরে বলে উঠল—
-"একদম বেশি কথা বলবি না! তুই তো নিজে গিয়ে বিহান ভাইয়ের হাতে ব্যাগ গুঁজে দিলি। আর এখন নাটক করছিস আমার সাথে! আমি বেশ করেছি ফারাহর ব্যাগ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, ভবিষ্যতের বউয়ের ব্যাগ, অন্য কারো না!"
মুহূর্তেই চারপাশ থমকে গেল। তার কণ্ঠের দৃঢ়তা, চোখের অভিমানের ঝিলিক, সবাইকে স্তব্ধ করে দিল।ফারাহ হতভম্ব। মুখে কিঞ্চিৎ রঙ ছড়িয়ে গেল, চোখ নামিয়ে নিল সে, যেন কথার ভার সইতে পারছে না। বিহান মুখ নিচু করে হেসে ফেলল। আধা গম্ভীর, আধা রসিক সুরে বলল—
-"বাহ! ছোট ভাই এখন পুরো প্রেমিকের জায়গায় বসে গেছে দেখি। সাহসটা তো মন্দ না!"
তানভীর ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখতে না পেরে বলে উঠল—
-"ছোট বোনের বান্ধবী। কুছ তো লিহাজ কার। সব জায়গায় নিজের স্বভাব উন্মুক্ত করতে নেই ভাই!"
আফরিন মুচকি হেসে তানভীরকে কনুই দিয়ে খোঁচা মারল। আর নুহা? সে রীতিমতো তর্জনী তুলে বলল—
-"হয়েছে থামো। শপিং করতে তো আসি নি, এক এক জন প্রেম করতে এসেছে যেনো। রুহান ভাই ভন্ডামি বাদ দাও। নইলে জীবনে বউ জুটবে না কপালে।"
কথা শেষ হতে না হতেই সবাই একসাথে হেসে উঠল। দোকানের ভেতর হাসির রোল ছড়িয়ে পড়ল, টানটান পরিবেশ মুহূর্তেই হালকা হয়ে গেল। রুহান মুখ গম্ভীর রাখার ভান করল, কিন্তু ফারাহর মুখের দিকে তাকিয়ে আর নিজেকে সামলাতে পারল না, হালকা হাসি চাপা পড়ে গেল শপিং ব্যাগের আড়ালে।
ইলহান তখন একপাশে নিরব দাঁড়িয়ে আছে, হাতে নূরাইশার শপিং ব্যাগগুলো। যদিও নূরাইশা নিজে কিছুই কিনে নি, তবুও তার নামে যা যা কেনা হয়েছে, সবই ইলহানের পছন্দে, তার ইচ্ছার ছায়া ছুঁয়ে ছুঁয়ে। নূরাইসা ভয়ে নিজের খোলস ছেড়ে বের হতে পারছে না। ইলহান বোঝে, তাই কিছু বলছে না।
চারপাশে হৈচৈ, দুষ্টুমি আর রঙিন আলোয় ভরা এক উৎসবমুখর পরিবেশ। হাসি আর খুনসুটির বন্যায় ভেসে যাচ্ছে দোকানঘর। কেউ লিপস্টিকের শেড মিলাচ্ছে, কেউ পারফিউমের গন্ধে চোখ বুজে ঘোরে হারিয়ে যাচ্ছে, আবার কেউ নেলপলিশের রঙে আঙুল ঘুরিয়ে দেখছে, যেন প্রত্যেকেই আপন জগতে মগ্ন।
কিন্তু এই প্রাণচাঞ্চল্যের আড়ালে, এক কোণে নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে আছে নূরাইশা। তার নীরবতা যেন জনারণ্যের ভেতরেও বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপ। মাথা নিচু, হাতের আঙুলে আঙুল পেঁচিয়ে রেখেছে, অজানা এক দ্বিধা, চাপা এক ভয় যেন বন্দি হয়ে আছে তার ভেতরে। ইলহান সামনে থাকলে সে স্বাভাবিক হতে পারে না। যদিও ইলহান কখনোই তাকে শাসন করে নি বকাঝকা করে নি। কিন্তু বাড়ির অন্য সদস্যদের ওপর করেছে। যার ফলে আজ এই ভয়ে জমে আছে সে। ভাবনার মাঝেই হঠাৎ নুহা দৌড়ে এসে দাঁড়াল তার সামনে। কণ্ঠে হালকা অভিমান, চোখে ভাবনার ছায়া—
-"আপু, কিছু নিচ্ছিস না কেন? বিয়ের দিন কি পড়বি তবে?"
নূরাইশা মুখ তোলে না। কণ্ঠে নেই কোনো আবেগ, সাদামাটা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল—
-"আমার কিছু লাগবে না। তুই যা নিচ্ছিস, তোরটাই নে। অনুষ্ঠান তো হবে না, তাই এত কিছুর প্রয়োজন নেই।"
এই উত্তরটা যেন ছুরির ফলার মতো বিঁধে গেল ইলহানের মনে। তার কপালের শিরা টনটন করে উঠল। ঠোঁট কেঁপে উঠল কিছু বলার জন্য, কিন্তু তখনই বিহান দ্রুত এগিয়ে এসে তার হাত টেনে থামাল। শান্ত স্বরে, দয়া মেশানো সতর্কতায় বলল—
-"মেয়েটা কিছুক্ষণ হলো কান্না থামিয়েছে, ইলহান। আর কিছু বলিস না। ওর মতো থাকতে দে ওকে।"
ইলহানের চোখ মুহূর্তেই রক্তিম হয়ে উঠল। সে তীব্র দৃষ্টিতে বিহানের দিকে তাকাল, একরাশ ক্ষোভ জমে আছে চোখের গভীরে। তবুও কোনো কথা না বলে হাতে থাকা ব্যাগগুলো বিহানের হাতে তুলে দিয়ে সোজা নূরাইশার দিকে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ নীরব চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর হঠাৎই নূরাইশার কনুই ধরে টেনে নিয়ে গেল দোকানির সামনে। কণ্ঠে কোমলতা নেই, কিন্তু চোখে আছে এক অদম্য তাগিদ, এক অনুচ্চারিত দাবি।
-"মেয়েদের বিয়ের জন্য যত কসমেটিকস লাগে, সব দেখান। ভালো ব্র্যান্ডের হতে হবে। আর হ্যাঁ, লাল বেনারসির সঙ্গে মিলিয়ে সুন্দর সুন্দর চুড়ি দেখান।"
দোকানি অভ্যস্ত ভঙ্গিতে একে একে পণ্য বের করতে লাগল। ইলহান নিজের হাতে একে একে নূরাইশার হাতে চুড়িগুলো পরিয়ে দেখছে, কোনটা মানায়, কোনটার আওয়াজ নরম, কোনটায় হাতটা যেন আরও বেশি সুন্দর লাগে।
নূরাইশা চুপ। শুধু চুড়ি পরে যাচ্ছে, খুলছে, আবার পরছে। যদিও সব চুরি ইল হান নিজেই পড়াচ্ছে ও খুলছে। নূরাইসার চোখ একবারও উঠছে না মাটির ওপর থেকে, যেন এই সাজসজ্জার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই। অথচ আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। ইলহানের চোখে তখন একরাশ অপূর্ণ অভিমান, একটা অনুচ্চারিত আর্তি, এক অদৃশ্য ব্যথা। শেষমেশ সে লাল-সাদা দুই জোড়া চুড়ি বেছে নিল। তার ওপর রূপালি সুতোর কাজ, যা লাল বেনারসির রূপালি ডিজাইনের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলে যায়।
এই দৃশ্য দেখে চারপাশ স্তব্ধ। কারও মুখে শব্দ নেই। মেয়েদের চোখে বিস্ময়, মুখে চাপা প্রশংসা। কারণ সব মেয়েই চায়, তার প্রিয় মানুষটা তার ছোট ছোট জিনিসের খুঁটিনাটিও যত্ন নিক। আর ইলহান যেন সেই স্বপ্নের পুরুষটির নিঃশব্দ প্রতিরূপ। রুহান তো মুগ্ধ হয়ে রীতিমতো ভিডিও করে ফেলল। হাসি, প্রশংসা আর অবাক বিস্ময়ের দৃষ্টি জমে আছে চারপাশে।
শুধু... নূরাইশা বাদে। সে ভয়ে স্তব্ধ!
সে যেন এক প্রাণহীন পুতুল, নড়ছে, চলছে, সাজছে, কিন্তু ভিতরে কোনো আলো নেই। চাইলে যে কেউ তাকে যেখানে-সেখানে বসিয়ে রাখতে পারে। তার নিজের কোনো ইচ্ছে নেই, কোনো দাবি নেই, কোনো কথা নেই।
ইলহান একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। তবুও নূরাইশা এখনো মাথা নিচু করে আছে, চোখে কোনো আলো নেই। ইলহান আর কিছু বলল না, হয়তো অভিমানে, হয়তো ব্যথা চেপে রাখার অদ্ভুত অভ্যাসে।
সব কেনাকাটা শেষ হলে তারা গেল স্বর্ণের দোকানে। সেখানেও ইলহান নিজ হাতে প্রতিটি গহনা একে একে নূরাইশার গায়ে পরিয়ে দেখল, হার, কানের দুল, নথ, চুড়ি। শেষে সবার মাঝে সেরা গহনার সেটটি বেছে নিল সে, নিখুঁত মনোযোগে, নিখাদ ভালোবাসার চোখে।
টাকার অঙ্ক যেন তার কাছে অর্থহীন। সেদিন প্রায় ১৫ লাখ টাকার কেনাকাটা হলো। শুধু নূরাইশার জন্য নয়, ফারাহ, বিহান, পরিবারের সবাইকে ভালোবাসা আর যত্নে ভরিয়ে দিল ইলহান। তবুও, যা তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, যা সে সবচেয়ে বেশি খুঁজছিল, একটি চাহনি, একটি হাসি, একটি সম্মতি, সেটি পেল না সে। যা পেল সে, তা হলো এক জোড়া আতঙ্কভরা চোখ, যার গভীরে ভয় জমে আছে শুধু ইলহানের জন্য।
নূরাইশা রয়ে গেল চুপ, একান্ত চুপ। তার নীরবতা যেন ইলহানের সমস্ত আয়োজনের বিপরীতে এক অনুচ্চারিত দহন, ভয়ের নিঃশব্দ প্রতীক।