সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ১

🟢

আমার পরিবার আমার চাচাতো বড় ভাইয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক করেছে। কথাটা এতটাই হঠাৎ এবং অপ্রত্যাশিত । এই সিদ্ধান্তে আমার মতের কোনো মূল্য ছিল না, আর আমি যে এই বিয়েতে রাজি নই, সেটা বলার সাহসটুকুও যেন কোথাও হারিয়ে ফেলেছি।

আমি তাকে ছোট থেকে ভাই হিসেবেই দেখেছি, সে সম্পর্ক হঠাৎ করে স্বামীতে রূপ নেবে, এটা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। আর শুধু তাই নয়, মানুষটা ভীষণ রকম গম্ভীর, রাগী, আর বদমেজাজি। তার চোখের এক রাঙানিই যেন শীতল আগুনের মতো! তার কথার একটুকরো গম্ভীরতা, বাড়ির ছোট থেকে বড়, সবাইকে চুপ করিয়ে দিতে পারে।

আমি বরাবরই এক শান্ত, নিরিবিলি মেয়ে। ইন্ট্রোভার্ট বলা যায়। কিন্তু আপন মানুষদের মাঝে আমি প্রাণ খুলে হাসি, কথা বলি, চঞ্চলতায় ভরে থাকি। অথচ তার সামনে আমার এই চঞ্চলতা যেন নিঃশব্দে জমে যায়, ভয়ে জড়সড় হয়ে পড়ে। তার সঙ্গে জীবন কাটানোর কথা কল্পনাও করতে পারি না, সেখানে ভালোবাসার তো প্রশ্নই আসে না। আমি শুধু তাকে ভয় পাই।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এই কথা আমি পরিবারের কাউকে বলতেও পারি না। তারা তার ভক্ত। তার গম্ভীরতাকেই তারা শ্রদ্ধা ভাবে। আমার মনের কথাগুলো কাউকে বলা তো দূরের কথা, লজ্জা, ভয়, আর সেই চিরাচরিত "বড়রা যা ঠিক করেন সেটাই সঠিক" এই ধারণার ভারে আমি নীরব হয়ে গেছি।

এখন আমি কী করি, দোস্ত? তোদের বলছি, কারণ তোরাই একমাত্র যাকে নির্দ্বিধায় মনের কথা বলা যায়। একটা সম্পর্ক শুধু পারিবারিক পছন্দ বা সামাজিক মেনে নেওয়ার প্রশ্ন নয়, মন থেকেও তো মেনে নিতে হয়, না হলে জীবনটাই হয়ে পড়ে বোঝা।

নূরাইসার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল ফারাহ, নাদিম, মেঘ, আশিক আর স্মৃতি। সবার মুখে বিষণ্নতার ছাপ। এমন নয় যে তারা নূরাইসার পরিবারের ব্যাপারে কিছু জানে না, সবাই সব জানে। পরিবারটা সত্যিই খুব ভালো। কিন্তু মনকে উপেক্ষা করে তো কাউকে বিয়ে করা যায় না। সবাই একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন কারও মুখে কোনও সান্ত্বনা আসবে। নূরাইসা মাথা নিচু করে বসে থাকে, মুখটা মলিন। যেন বিয়ের কথায় তার খাওয়া-দাওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে।

এই নীরবতা ভেঙে ফারাহ বলল—

-"তুই নুহান ভাইয়ার সাথে কথা বলে দেখতে পারিস! যদি সে তোকে সাহায্য করতে পারে।"

নূরাইসা মুখ তুলে তাকায়। ক্লান্ত মুখে বলে—

-"তার সামনে গেলে ভয়ে আমার হাত-পা কাপে। আর বিয়ের কথা কিভাবে বলব বল?"

মেঘ চঞ্চল ভঙ্গিতে বলে—

-"দেখ, যত দূর জানি তুই তো ভয়ে ওনার সাথে কথা বলিস না, সামনে গিয়েও চুপচাপ থাকিস। তোদের মধ্যে যে কোনও ‘ভালো লাগা’ তৈরি হবে, সেটারও কোন সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে নুহান ভাইয়া যদি তোকে পছন্দ করে, সেটারও স্কোপ নেই। তাই, ওনার সাথে কথা বলে দেখ, হয়তো কোনও সমাধান মিলে যাবে।"

মেঘের কথায় সায় দিয়ে নাদিম আর আশিকও একই মত জানায়। নূরাইসা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে—

-"দাদা-দাদী বিয়ের প্রস্তাবটা দিয়েছেন। আর নুহান ভাইয়া তো তাদের অনেক ভালোবাসে... তাদের জন্য সব কিছু করতে পারে। আর সেখানে বিয়ে, এই প্রস্তাব তো সে কখনোই ভাঙবে না রে।"

এ কথা শুনে নাদিম পাশ থেকে হালকা একটা গাট্টা মারে নূরাইসার মাথায়। তারপর বলে—

-"ভীতুর ডিম! আগে কথা বলে দেখ তো! নিজেই সব কিছু ভেবে বসে আছিস! আগে একটা পদক্ষেপ তো নে, তারপর না হয় দেখা যাবে। এত আগে থেকেই হতাশ হচ্ছিস ক্যান!"

নূরাইসা নাদিমের কথাটি ভাবে। সত্যি আগে একবার চেষ্টা তো করি পড়ে যা হবে দেখা যাবে। নূরাইসা বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে।

.

তাদের বাড়িটি একটি দোতলা ডুপ্লেক্স, ছিমছাম, পরিপাটি এবং প্রাণভরে থাকা এক প্রাচুর্য্যময় আবাস।

বাড়িতে ঢুকলেই প্রথমেই চোখে পড়ে বিশাল বসার ঘর। তারপর একপাশে খাবার ঘর, ঘরোয়া আলোচনার নিরিবিলি স্থান। আর তার সঙ্গে লাগোয়া একটি খোলা রান্নাঘর, যেখানে প্রতিদিন ভেসে আসে মায়ের হাতের রান্নার ঘ্রাণ। বাড়ির প্রতিটি সদস্যের জন্য বরাদ্দ আছে আলাদা কক্ষ। বড়রা থাকে নিচতলায়, আর ছোটরা দোতলায়, যেন বয়স অনুযায়ী নিজস্ব এক নিজস্ব জগৎ। বাড়িটির গঠন যেমন গোছানো, তেমনি গোছানো এই পরিবারের সম্পর্কগুলোও।

এই বাড়ির বৃদ্ধ দাদা-দাদি রয়েছেন তাদের মতামতের গুরুত্ব সবাই দেন। তাদের বড় ছেলে ইকবাল দেওয়ান, একজন রূঢ় অথচ যত্নশীল মানুষ। তার স্ত্রী নাজনীন বেগম, সংসারের ছায়া-স্নেহে ভরা স্তম্ভ। তাদের দুই পুত্র— নুহান ইলহান দেওয়ান, বড় ছেলে, পরিবারের ব্যবসা দেখাশোনা করে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে। রুহান ইয়াসির দেওয়ান, ছোট ছেলে, ডাক্তারির ছাত্র শেষ বর্ষে।

ইকবালের ভাই, নাহিদ দেওয়ান তাঁর স্ত্রী ইলিনা বেগম, শান্ত স্বভাবের, হাসিমুখে সংসার সামলানো এক নারীর প্রতিচ্ছবি। তাদের দুই কন্যা — নূরাইসা ইনায়া দেওয়ান, নুহা ইসরা দেওয়ান

পরিবারের আরও এক সদস্য হলেন তানিয়া বেগম, ইকবালের বোন। তার স্বামী বিদেশে থাকেন বলে, ভাইয়ের এই বাড়িতেই তিনি সন্তানদের নিয়ে থাকেন।

তানিয়ার এক ছেলে এক মেয়ে— আফরিন তাবাসসুম শেখ, যিনি নূরাইসার সহপাঠী ও বন্ধু। তানভীর শেখ, রুহানের সহপাঠী ও মেডিকেল কলেজের বন্ধু।

পরিবারের সবাই আলাদা ঘরে থাকলেও, সম্পর্কগুলোতে নেই কোনো দূরত্ব। নুহান শুধু পারিবারিক ব্যবসা নয়, বন্ধুদের সঙ্গে গড়ে তোলা একটি যৌথ কোম্পানিও দক্ষ হাতে সামলাচ্ছে। বাড়ির ছেলেরা ব্যস্ত নিজেদের দায়িত্বে, আর মেয়েরা তৈরি হচ্ছে নিজেদের স্বপ্ন সাজাতে।

নূরাইসা বাড়িতে প্রবেশ করেই এক স্নিগ্ধ পরিচিতি ভেসে এল চোখেমুখে। বাড়িতে ঢুকেই দেখে, দাদু সোফায় বসে টিভির সামনে মনোযোগী, যেন বাইরের সব শব্দ তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক। রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসছে চা, পেঁয়াজু, আর বেগুনির গন্ধ। মা ও চাচীরা বিকেলের নাস্তায় ব্যস্ত, একেকজনের হাতে আলাদা কাজ, তবুও যেন এক ছন্দে বাঁধা।

আফরিন অসুস্থ, নিজের ঘরে শুয়ে বিশ্রামে।

নুহা তখনো ফেরেনি, কলেজ থেকে একটু পরেই আসবে। বাড়ির ছেলেরা সবাই বাইরে, কেউ অফিসে, কেউ কোম্পানির মিটিংয়ে, কেউ বা হাসপাতালের ক্লাসে।

নূরাইসা শান্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাদুর পাশে বসে।

তার কোমল স্বর দাদুর কর্কশ দিনের শ্রান্তি কিছুটা হলেও মুছে দেয়। কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে, দাদুর কাঁধে আলতো হাত রেখে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়।

দোতলায় পৌঁছে নিজের রুমের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। চোখ বুলিয়ে নেয় চেনা করিডোরের ঘরগুলো, একদম শুরুর ঘরটি নুহার, তার পাশে নূরাইসার নিজের ঘর, তারপর আফরিন, এরপর তানভীর, তারপর রুহান, আর করিডোরের একদম শেষ মাথায় নুহানের ঘর। সব ঘরের দরজাই বন্ধ, নিস্তব্ধ দুপুরের নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

নূরাইসা ধীরে ধীরে নিজের রুমে ঢুকে পড়ে। দরজা বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। একটু পরে ফ্রেশ হয়ে নূরাইসা পা বাড়াল আফরিনের ঘরের দিকে। মেয়েটা অসুস্থ, তাই একটু দেখা করে আসবে। দরজায় পৌঁছে দেখে, আফরিন শুয়ে শুয়ে ফোন টিপছে। নূরাইসা এগিয়ে গিয়ে তার মাথায় আলতো এক চাটি মেরে বলল—

-"শুয়ে শুয়ে ফোন টিপতে পারলে ভার্সিটিতে যেতে পারলি না কেনো?"

-"আহ্ লাগল তো ইসা...!"

-"লাগুক তোর। এই রকম আলসেমির জন্যই তো উচিত শাস্তি! শুধু শুধু না যাওয়ার বাহানা করিস। চল, নিচে চল, নাস্তা করবি।"

বলেই নূরাইসা আফরিনকে টেনে নিচে নামিয়ে আনল। ততক্ষণে নুহাও বাসায় ফিরে এসেছে। নূরাইসা তাকে ফ্রেশ হয়ে আসতে বলল, আর নিজে আফরিনকে নিয়ে গেল দাদুর ঘরের দিকে। সেখানে দাদি তসবিহ হাতে জিকিরে মগ্ন ছিলেন। তাকে স্নেহভরে টেনে এনে বসার ঘরে নিয়ে আসল তারা। ইতোমধ্যে মা, চাচী সবাই মিলে খাবার সাজিয়ে এনেছেন। বসার ঘরে সবাই বসে গল্প করছে আর নাস্তা নিচ্ছে।

নুহাও ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এসে তাদের আড্ডায় যোগ দিল। তার ফুপু একজন কলেজের প্রফেসর, ফারাহর মা’র সহকর্মী। যদিও তিনি এই মুহূর্তে বাসায় নেই।

কিছুক্ষণ পর তানভীর আর রুহান এসে ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। রুহান ঘেমে-নেয়ে একেবারে ক্লান্ত, আর সে নুহার একদম গা ঘেঁষে বসে পড়ায় নুহা বিরক্ত হয়ে খেঁকিয়ে উঠল—

-"সমস্যা কি তোমার ভাইয়া? এই নোংরা শরীর নিয়ে শুধু সোফায় বসেছো তাও না, আবার আমার গা ঘেঁষে বসলে কেনো? আমি তো সদ্য গোসল করে এসেছি! এখন আবার গোসল করতে হবে মনে হচ্ছে। ধুর, একদম ভালো লাগে না!"

রুহান চোখ বড় করে বলল—

-"এই ছেমরি! কোথায় দেখলি নোংরা? মাত্র মেডিকেল থেকে ফিরলাম। আর তুই বলছিস আমি নোংরা? আমি কি ড্রেইন পরিষ্কার করে এসেছি নাকি?"

-"তার চেয়েও খারাপ! হাসপাতালে কত রকম জীবাণু থাকে জানো? তার ওপর এই ঘামা শরীর! আমাকেও একেবারে নোংরা করে দিলে।"

নুহার কথা শুনে রুহান এবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে নিজের কপালের ঘাম মোছার জন্য নুহার ওড়নাই টেনে নিল, ঘাড়, গলা, কপাল সব এক করে মুছে নিলো সে।

নুহা আঁৎকে উঠে এক ধাক্কায় রুহানকে সোফায় ফেলে দিল। কান্না ধরে রাখতে না পেরে বলল—

-"নোংরা গিদর লোক! আমাকে আবার গোসল করতে হবে! ধুর, একদম ভালো লাগে না। আজই নুহান ভাইয়া এলে বলব এই গিদরটাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে!"

বলে সে দৌড়ে ওপরে উঠে নিজের ঘরে ঢুকে জোরে দরজা আটকে দিল। রুহান সোফায় পড়ে থেকে ব্যঙ্গাত্মক গলায় চিৎকার করে বলল—

-"দাঁড়া, আমি আসছি! আগে আমার পিঠটাও একটু ঘষামাজা করে দিয়ে যা।"

তার এই কথায় উপস্থিত সবাই হেসে উঠল। ঘর জুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল। হাসির মাঝেই দরজায় দেখা দিল নুহান আর বিহান। বসার ঘরে সকলের প্রাণখোলা হাসাহাসিতে খানিকটা অবাক হয়ে কপাল কুঁচকে তাকাল নুহান। বিহান এগিয়ে এসে তানভীরের পাশে বসে কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল—

-"কি হয়েছে ভাইয়া? এত হাসাহাসি কিসের?"

বিহানের কণ্ঠ শুনে সবাই চোখ তুলে তাকাল। আর দরজায় নুহানকে দেখে নূরাইসা এক দমে চুপ হয়ে গেল। নিঃশব্দে গুটিসুটি মেরে আফরিনের পেছনে গিয়ে বসে পড়ল, যেন নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে চায় সেই দৃষ্টির আড়ালে।

নুহান বুঝে ফেলল পরিস্থিতি। তার চিরচেনা হুস্কি কণ্ঠে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল—

-"আবার নুহাকে জ্বালিয়েছিস, রুহান?"

নুহানের কণ্ঠে হালকা ধমকের সুর। রুহান একটু গুটিয়ে গেল, তারপর মিনমিন করে বলল—

-"ওই... আসলে ভাইয়া..."

-"আসলে-নকলে কিছু শুনতে চাই না। সব বুঝে গেছি। যাও, দুজনেই উঠে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো। আর যেন কখনো এমন কিছু শুনতে না হয় আমার। নুহা এখন বড় হয়েছে, আর তুইও।"

কথা শেষ করে গম্ভীর ভঙ্গিতে পা চালিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরের দিকে চলে গেল নুহান। তার উপস্থিতি যেন মুহূর্তেই ঘরের উষ্ণতা খানিকটা ঠান্ডা করে দিল। রুহান ও তানভীর ফ্রেশ হতে উঠে গেল উপরে। বিহানও একবার ফ্রেশ হয়ে নিচে ফিরে এসে আগের জায়গায় বসে পড়ল।

এদিকে নুহাও গোসল সেরে নিচে নেমে এল, যেন সব ভুলে নতুন করে শুরু করছে। আবার নাস্তার পাট জমে উঠল। নুহানও নিচে এসে সবার পাশে বসে পড়ল।

নূরাইসা হঠাৎ বলে উঠল—

-"আমার খাওয়া শেষ, আমি ওপরে যাচ্ছি।"

তার মুখে হালকা লাজুক হাসি, কিন্তু চোখে কেমন এক অস্থিরতা। সবাই মনে করল, হয়তো লজ্জা পাচ্ছে। বিয়ের আলাপ চলছে, তার ওপর সে এমনিতেই লাজুক প্রকৃতির।

নূরাইসার চলে যাওয়া দেখে নুহানও কিছুক্ষণ হালকা খেয়ে উঠে গেল। আড়চোখে সে লক্ষ্য করেছিল তার চলে যাওয়া, তার অস্থির ভঙ্গি। বিহানও কিছুক্ষণ পর পিছু নিল।

বিজ্ঞাপন

আসলে তাদের দুজনেরই অফিসের কিছু জরুরি কাজ ছিল,জয়েন্ট কো-ফার্ম "কোপামনি"-র কিছু পেন্ডিং প্রজেক্ট। তাই অফিস থেকে একটু আগেভাগেই ছুটি নিয়ে বাসায় ফিরেছে তারা। আজ তাদের সেই অসমাপ্ত কাজগুলো এগিয়ে নেওয়ার কথা।

.

নিশীথের ঘণ্টা দশটা। দেওয়ান বাড়ির সকল সদস্য একত্রিত হয়েছেন রাতের খাবারের টেবিলে। প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনের মাঝেও সকালের নাস্তা আর রাতের এই মিলন-মুহূর্তটুকু পরিবারের কাছে যেন পরম প্রিয়।

টেবিলের প্রান্তে, শীর্ষ আসনে বসে আছেন পরিবারের শ্রদ্ধেয় দাদু। তার ডান পাশে ইকবাল দেওয়ান ও বিপরীতে নাহিদ দেওয়ান। নাহিদের পাশেই একসারি বসেছে নুরাইসা, নুহা আর আফরিন। টেবিলের অন্য পাশে পাশাপাশি বসেছে নুহান, রুহান এবং তানভীর। আরেক কোণে একটি চেয়ারে বসে আছেন মমতাময়ী দাদী।

তিনটি চেয়ার এখনও ফাঁকা। নাজনীন বেগম ও ইলিনা বেগম ব্যস্ত খাবার পরিবেশনে, পাশে তানিয়া বেগম ভাবীদের সহায়তা করছেন আপন মন প্রাণ দিয়ে। রান্নাঘর থেকে একে একে সব পদ এনে তারা টেবিলে সাজিয়ে দিচ্ছেন। সবকিছু ঠিকঠাক হওয়ার পর তিনজনই নিজের আসনে এসে বসে পড়লেন।

এটাই দেওয়ান বাড়ির নিয়ম, ঘরের মেয়ে-বউদের মুখে তুলে না দিলে, কেউ নিজে খেতে বসে না। একসাথে খাওয়ার এই সংস্কৃতিতে আছে সৌহার্দ্য, আছে আন্তরিকতার শিকড়।

চারপাশে ছড়ানো স্নিগ্ধ আলোর মতো হাস্যোজ্জ্বল কথোপকথন। নুহান চাচা ও বাবার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে, ভাইবোনেরা মেতে আছে নিজেদের ছোটখাটো দুষ্টু মজায়। মা-ফুপুরা গৃহস্থালির বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। শুধু নুরাইসা নিঃশব্দ। তার চোখে অদৃশ্য কোন চিন্তার ছায়া। কথা বলছে না, কিন্তু যেন কিছু বলার অপেক্ষায়।

নিঃশব্দ টেবিলে যেন আচমকা তরঙ্গ তুলল দাদুর এক প্রশ্ন। তাঁর ভারী কণ্ঠে ছলকে উঠল চিরচেনা কর্তৃত্বের ছোঁয়া—

-"নুহান দাদুভাই আর নূরাইশার বিয়ের কথা তোমরা কী ভাবলে?"

প্রশ্নটা টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে পড়তেই সাময়িক স্তব্ধতা। এক মুহূর্তের দৃষ্টি বিনিময় হলো ইকবাল দেওয়ান ও নাহিদ দেওয়ানের মাঝে। তারপরই ইকবাল দেওয়ান হালকা হেসে জবাব দিলেন—

-"তুমি তো জানো আব্বা, তোমার কথাই আমাদের কাছে শেষ কথা। তুমি যেহেতু ওদের দু’জনকে এক করতে চাও, আমাদের কীই বা আপত্তি থাকতে পারে! আমার ইসা মা যদি আমার ঘরের বউ হয়ে আসে, তবে সেটা আমাদের সৌভাগ্য। হাজারটা খুঁজলেও এমন মেয়ে কোথায় পাওয়া যাবে? নুহানের তো রাজ কপাল, আমার ইসা মা ওর বউ হবে!"

নাহিদ দেওয়ান সঙ্গে সঙ্গে দ্বিমত জানালেন ভাইয়ের কথায়—

-"কী যে বলো ভাইজান! নুহান কি কম কিছু? আমার আব্বা জানের মতন ছেলে দেখাতে পারো একটাও? আমার মেয়ের ভাগ্য বলেই এমন ছেলের জন্য আব্বা নিজেই প্রস্তাব দিয়েছেন।"

দাদু দু’জনের কথায় চোখ কুঁচকে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি নিয়ে বললেন—

-"আহা, থামো তো! নিজেদের মধ্যে সব ঠিকঠাক করেই ফেললে বুঝি? একবারও নিজেদের সহধর্মিণীর মতামত নিলে? আর ছেলে-মেয়ের মতামত? তারা কী বলছে সেটা শুনলে না?"

এই মুহূর্তে নীরবতা ভেঙে কথা বললেন ইলিনা বেগম। চোখে-মুখে লজ্জা ও বিনয়ের মিশেল—

-"আমার কোনো আপত্তি নেই আব্বা। এমন বর পেলে কে না চায় জামাই করতে? তবে একটা কথা বলি, আপা কি আমার মেয়েকে সত্যিই পছন্দ করেছে? ও তো কিছুই ঠিকঠাক পারে না, আমার ইসা তো নেহাত ছেলেমানুষী করে।"

ইলিনার কথা শেষ হওয়ার আগেই, নাজনীন বেগম যেন নিজের হৃদয়রক্ষায় রুখে দাঁড়ালেন। গলায় হালকা রাগ আর ভালবাসার রেশ—

-"এক চর মেরে দাঁত ভেঙে দেব তোকে ছোট! আমার বউমাকে নিয়ে একটা কটু কথা বললেই তোকে এই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেব! এমন মিষ্টি, ভদ্র, সুন্দর মেয়েকে বউ হিসেবে চাইবে না, এমন মানুষ আছে নাকি? আর বলছিস আমি রাজি কি না! আগে তোদের ভাসুরকে জিজ্ঞেস কর! আব্বা না বললেও আমি নিজেই চাইতাম ইসার হাত আমার ছেলের জন্য।"

ইলিনা বেগম জলভরা চোখে বড় জায়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। বুকভরা কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসায় তার চোখ যেন আরও ছলছল করে উঠল। ভাবলেন, তার ইসা কত সৌভাগ্যবতী, কত ভালোবাসা, কত স্বীকৃতি তার জন্য!

এই আবেগঘন মুহূর্তে দাদী এবার নুহানের দিকে তাকিয়ে সস্নেহে প্রশ্ন করলেন—

-"দাদুভাই, তুমি রাজি আছো তো আমার ইসাকে বিয়ে করার জন্য?"

নুহান কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর ধীর ভঙ্গিতে চোখ তুলে দাদীর দিকে তাকাল। চোখে ছিল স্থিরতা, মুখে মৃদু প্রশান্তি। তারপর আবার চোখ নামিয়ে খাবারে মনোযোগ দিয়ে শান্ত স্বরে বলল—

-"আমার কোনো আপত্তি নেই। তোমরা যা ভালো মনে করো, তাই করো।" টেবিলজুড়ে যেন নীরব এক স্বস্তির ঢেউ বয়ে গেল।

নুরাইসা এতক্ষণ নীরব ছিল, একদম নিঃশব্দ। অথচ তার বুকের ভেতর তখন ঝড় বইছিল। হৃদপিণ্ড যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। একটার পর একটা কথা হচ্ছে, সিদ্ধান্ত হচ্ছে, সবাই বলছে, মত দিচ্ছে, হাসছে, রাজি হচ্ছে, শুধু তার কথা, তার সম্মতি, তার মনের অবস্থা... কেউ জানতেও চায়নি।

নিজের বাবা-মা পর্যন্ত তাকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। তারা অলরেডি বিয়ের সবটা পাকা করে ফেলেছে, প্রস্তাব, সম্মতি, পারিবারিক আলোচনাও। যেন সে একটা বস্তু, যার মালিকানা হস্তান্তর হচ্ছে।

শেষ মুহূর্তে দাদুর কণ্ঠে সেই ভারী প্রশ্নটা এলো, নিঃশব্দ টেবিলে আবার যেন তরঙ্গ তুলল তার কণ্ঠ—

-"ইসা বোনু, তুমি রাজি তো এই বিয়েতে?"

এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল। চারপাশের শব্দ থেমে, নিঃশ্বাস গুলিও ভার হয়ে উঠল। নূরাইসা মুখ তুলল না। একটাও কথা বলল না। নিঃশব্দে খাবারের প্লেট থেকে হাত সরিয়ে নিল। চেয়ার সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। কোনো শব্দ ছাড়াই সে চলে গেল টেবিল ছেড়ে, নিজের ঘরের দিকে।

সবাই ভেবেছিল, লজ্জা পেয়েছে। হুট করে বিয়ের কথা উঠে যাওয়ায় মেয়েটা হয়তো কিছুটা অপ্রস্তুত। এটাই তো স্বাভাবিক।

নুহান এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তার চলে যাওয়ার দিকে। নূরাইসার গমনপথে তার চোখে একটুও ঝাপসা ছিল না, কিন্তু মনের ভেতর যেন কেউ চুপচাপ ঢিল ছুঁড়ে গেল। তারপর সে আবার মাথা নিচু করে খাওয়ায় মন দিল।

অন্যদিকে, নূরাইসার হঠাৎ চলে যাওয়া দেখে নুহা ও আফরিন চোখাচোখি করল। কিছু একটা ঠিক নেই, এইটা বোঝার জন্য বেশি কিছু লাগল না। দুই বোন চুপচাপ উঠে গেল টেবিল থেকে। সরাসরি চলে এলো বোনের পেছন পেছন, নূরাইসার ঘরের দিকে।

রুমে ঢুকে দেখে, দরজা খোলা। আলো নিভু নিভু। কোথাও দেখা নেই তাকে। কিন্তু হালকা কান্নার শব্দ টেনে নিচ্ছে তাদের পা। তারা বেলকনির দিকে এগিয়ে যায়। নূরাইসা বেলকনির কোণে বসে আছে, হাত গুটিয়ে মুখ লুকিয়ে রেখেছে হাঁটুতে। তার কাঁধ কাঁপছে অশ্রুতে। নুহা ছুটে গেল, আফরিনও পেছনে।

-"ইসা আপু!"

নূরাইসা মুখ তুলল। দুই বোনকে দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দু’হাতে জড়িয়ে ধরল ওদের, ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল।

আফরিন চোখে চোখ রাখল নুহার সঙ্গে, তারপর ধীরে স্নেহভরে বলল—

-"কি হয়েছে? তুই এমন কান্না করছিস কেন? তুই কি রাজি না এই বিয়েতে?”

নূরাইসা কোনো কথা বলল না। শুধু কাঁধে মাথা রেখে চুপচাপ কাঁদতেই থাকল।

বেলকনির বাতাসটা তখন থেমে থেমে আসছিল, ঠিক যেন নূরাইসার বুকের ভেতরকার দমবন্ধ কান্নার মতো। তার কাঁধ কাঁপছে, চোখের জল টুপটাপ পড়ছে আঁচলে। আফরিন এগিয়ে এসে গলা নামিয়ে বলল—

-"কি হয়েছে? কাঁদছিস কেনো, ইসা?"

নূরাইসা চোখ তুলে তাকাল, ফ্যাকাশে মুখে ফিসফিস করে বলল—

-"আমি এই বিয়েটা করতে চাই না, আফরিন।"

আফরিন চমকে গেল। চোখ বড় বড় করে বলল—

-"তাহলে নিচে যখন দাদু জিজ্ঞাসা করলেন, তখন কিছু বললি না? না বলে এইভাবে উঠে চলে এলি কেন?"

-"কি বলতাম আমি? আমার মতামতের কি কোনো দাম আছে ওদের কাছে? সবকিছু তো আগেই ঠিক করে ফেলেছে। তারপরে জিজ্ঞাসা করল, এটাই কি কোনো জিজ্ঞাসা?"

আফরিন একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করল—

-"তাহলে সমস্যাটা কোথায়? কারও প্রতি পছন্দ আছে নাকি তোর?"

নূরাইসা মাথা নাড়ল তীব্রভাবে—

-"তুই খুব ভালো করেই জানিস, আমার জীবনে এসব কিছুই নেই।"

-"তাহলে আপত্তিটা কোথায়?"

কণ্ঠটা কেঁপে উঠল নূরাইসার—

-"নুহান ভাইয়া... ওর সামনে গেলেই আমি কেমন হয়ে যাই। ছোটবেলা থেকে তাকে ভাইয়া হিসেবেই দেখেছি। যাকে সারাজীবন ভাই ভাবলাম, তাকে হঠাৎ করে কিভাবে বর হিসেবে ভাবব? সব চেয়ে বড় কথা, আমি তো ভয় পাই ওকে। জমের মতো ভয়! সেই ভয় নিয়ে সংসার হবে কীভাবে? বল তো?"

আফরিন এবার গলা শক্ত করে বলল—

-"বুঝেছি। তাহলে তুই ভাইয়ার সঙ্গে কথা বল। একমাত্র তিনিই পারবে এই বিয়েটা ভাঙতে।"

নূরাইসা কেঁপে কেঁপে বলল—

-"কিভাবে কথা বলব? ওর সামনে গেলেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায় আমার... গলা শুকিয়ে যায়..."

আফরিন রেগে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল—

-"তাহলে এইভাবেই থাক। কাঁদবি, ভেতরে ভেতরে পুড়বি, কিন্তু মুখ ফুটে একটা কথা বলবি না! যত্তসব!"

রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেলো আফরিন।

নুহা তখনও পাশে দাঁড়িয়ে ছিল চুপচাপ। চোখে মুখে গভীর কষ্ট আর অসহায়তা। তারপর ধীরে এসে বোনকে জড়িয়ে ধরল। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল না কিছুই। শুধু হাত ধরে তাকে ধীরে ধীরে ঘরে নিয়ে গেল।

নূরাইসাকে ফ্রেশ করিয়ে, কাপড় বদলে দিয়ে, কাঁধে মাথা রাখতে বলল। শান্তভাবে, মায়ায় ভরিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল তাকে। তারপর নিজেও চুপচাপ তার পাশে শুয়ে পড়ল। ঘরের আলো তখন নিভু নিভু। একটা কষ্ট যেন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, নামহীন, অথচ খুব বাস্তব।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প