নূরাইসা ও আফরিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ থেকে তৃতীয় বর্ষে ওঠার শেষ পরীক্ষায় ব্যস্ত। জুনের ১৫ তারিখ থেকে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকে তারা। এত বড় প্রতিষ্ঠানে জায়গা পাওয়া যেন এক যুদ্ধ জয় করার সমান ছিল তাদের জন্য। তাই পড়াশোনায় বিন্দুমাত্র গাফিলতি করার সুযোগ নেই।
বিশেষ করে নূরাইসা, মেয়েটা যেন বইয়ের ভেতরেই বেঁচে থাকে। সাহিত্য তার কাছে নিছক পাঠ্য নয়, একরাশ শান্তি, আত্মার আশ্রয়। ভবিষ্যতে কী হবে, তা সে জানে না, তবে শব্দ, কবিতা, আর গল্পের ভেতরে হারিয়ে যেতে ভালোবাসে সে।
এই পড়ার ভিড়ে, খাতা আর কলমের শব্দে, সে খেয়ালই করেনি, ইলহান চলে যাওয়ার পর একদিনও কথা হয়নি তাদের মধ্যে। সময় যেন নিরবতার মোড় ঢেকে দিয়েছে সবকিছু।
আফরিন আর নূরাইসা, দুজনেই নিজ নিজ ঘরে ডুবে থাকে পড়ায়। সকাল-বিকেল খাবার তাদের ঘরের দরজায় গিয়ে রেখে আসে কেউ। নীচতলাটা তাই প্রায় ফাঁকা। কেবল নুহা একা একা ঘুরে বেড়ায়, টিভির শব্দে একঘেয়েমি ভাঙতে চায়।
রুহান আর তানভীর এখন ঘরে খুব কমই থাকে। হাসপাতালের দায়িত্বে ব্যস্ত, কখনও সারা রাতও ফেরা হয় না।
বিকেলে নুহা একা বসে টিভি দেখছিল। বাইরে প্রচণ্ড গরম। নাজনীন বেগম আর ইলিনা বেগম তখন মার্কেটে। ফেরার পর দরজা খুলেই বললেন—
-"একটু পানি এনে দে তো মা, যেই গরম পড়েছে!"
নুহা কিছু না বলে উঠে গেল রান্নাঘরে। আগেই বানানো লেবুর শরবতটা বের করল ফ্রিজ থেকে। বরফ গলে গলে কাচের গ্লাস ঠান্ডা হয়ে উঠেছে। ট্রেতে সাজিয়ে এনে দুইজনের সামনে ধরল গ্লাসগুলো। নাজনীন বেগম ও ইলিনা বেগম অবাক হয়ে একে অন্যের দিকে তাকালেন। গ্লাস হাতে নিয়ে এক চুমুক খেয়ে হাসলেন—
-"এই যে! এক গ্লাস পানি খেতেও যেই আড়ষ্টতা, আজ শরবত পর্যন্ত বানিয়ে আনলি যে?"
নুহা মৃদু হেসে সোফায় বসল। বলল—
-"কি করবো আর মা? আপুরা পড়ছে, ভাইয়ারা কেউ বাসায় নেই। তোমরাও ছিলে না। একা একা এত বোর লাগছিল... তাই ভাবলাম তোমাদের জন্য শরবত বানিয়ে ফেলি। আরও আছে ফ্রিজে, বাবা আর বড় বাবা এলে দিও।"
মেয়ের মুখের আন্তরিকতা দেখে দুজনেই মুগ্ধ হলেন। শরবতের মিষ্টি স্বাদে যেন নুহার একাকিত্বটুকুও মিশে আছে। নাজনীন বেগম ও ইলিনা বেগম দুজনেই প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন তাকে। তারা বুঝে গেলেন, বোনদের অনুপস্থিতিতে এই ঘরটা নুহার কাছে কেমন নিঃসঙ্গ লাগে।
তাই তাঁরা মার্কেট থেকে আনা ব্যাগগুলো খুলে রাখলেন টেবিলের ওপর। নানা রঙের কাপড়, কসমেটিকস, আর ছোটখাটো অলঙ্কারের ভেতর বসে নুহার মুখে ফিরে এলো একটুখানি হাসি। ঘরের ভেতর হালকা বাতাস বইল, যেন দিনের সমস্ত গরম ছুঁয়ে গেল সেই মিষ্টি মুহূর্তটাকে।
.
রাত ঠিক ১০টা। বাড়ির ডাইনিং টেবিলে এক অন্যরকম উষ্ণতা ছড়িয়ে আছে। নূরাইসা ও আফরিনকে টেনে এনেছে নুহা, তার প্রাণোচ্ছল হাসিতে পুরো পরিবেশ যেনো হালকা হয়ে উঠেছে। সবাই একসাথে বসে গল্প করছে, কারো হাতে ভাতের প্লেট, কারো হাতে গ্লাস, একটা মিলনমেলার আবহ যেনো ছড়িয়ে পড়েছে সারা ঘরে।
ঠিক তখনই ইকবাল দেওয়ানের ফোন বেজে উঠল।স্ক্রিনে ভেসে উঠল ইলহানের নাম, ভিডিও কল করেছে। মুহূর্তেই টেবিলের শান্ত পরিবেশে এক ঢেউ নেমে এলো। খাবার মাঝপথে ফেলে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল ইকবাল দেওয়ানের ফোনের দিকে। রুহান, তানভীর, নুহা, আফরিন, সবার মধ্যে যেন প্রতিযোগিতা লেগে গেল কে আগে কথা বলবে, কে আগে মুখ দেখাবে।
হাসি-চেঁচামেচিতে ডাইনিং রুম ভরে উঠল।
ওপাশ থেকে ইলহান মৃদু হেসে বলল—
-"আচ্ছা, আচ্ছা, সবাই চুপ করো! আগে নুহাকে দাও, ওর সাথেই কথা বলি।"
নুহা ফোন হাতে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই মুখ ফুলিয়ে বলল—
-"ভাইয়া, আজ বিশ দিন হয়ে গেল তুমি গেছো, একটাবার কল পর্যন্ত করলে না! এটা কি ঠিক হলো?"
ইলহান হাসল, তার কণ্ঠে ক্লান্তি, তবু উষ্ণতার সুর।
-"কাজের চাপ ছিল অনেক, নুহা। সময় পাইনি কল করার। এখন বল, পড়াশোনার খবর কী?"
দু’ভাইবোনের কথোপকথনে হাসির রোল উঠল।
নুহা একে একে সবার নামে অভিযোগ জানাতে লাগল, কে তাকে সময় দেয় না, কে শুধু নিজের কাজে ব্যস্ত। সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ছে, কেউ চুপচাপ তাকিয়ে আছে স্ক্রিনে।
চেয়ারে বসে থাকা নূরাইসা নীরবে সব দেখছে। তার বুকের ভেতর কেমন যেন এক অচেনা অনুভূতি জেগে উঠেছে। হৃদপিণ্ডের স্পন্দন হঠাৎ বেড়ে গেছে, যেন বাতাসের মধ্যে অজানা এক উত্তেজনা, এক আবেগ ছড়িয়ে আছে। আজ বিশটি দিন পর সেই কন্ঠস্বর, সেই মুখ। যখন ইলহান একে একে সবার খবর নিচ্ছিল, তখনও নূরাইসা চুপচাপ তাকিয়ে ছিল ফোনের আলোয় ভেসে থাকা মুখটির দিকে। ইলহানের হাসির শব্দ, তার কণ্ঠের উষ্ণতা, সবকিছু মিলিয়ে নূরাইসার ভিতর যেন এক অজানা আলোড়ন তৈরি হচ্ছে।
এদিকে ইলহান একে একে সবার সঙ্গে কথা বলল, খবর নিল, ঘরের কোণায় কোণায় ঘুরে দেখল সবাইকে। শেষে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল—
-"নূরাইসা কোথায়?"
মুহূর্তেই যেন ঘরের বাতাস থেমে গেল। নূরাইসার বুকের ভেতর 'ধক' করে উঠল কিছু একটা। আফরিন ফোন নিয়ে তার দিকে এগিয়ে এলো, কিন্তু নূরাইসা তড়িঘড়ি উঠে উপরে চলে গেল। সবাই হেসে উঠল।
রুহান মজা করে বলল—
-"দেখো ভাই, তোমার বউ তো পালিয়ে গেল!"
ইলহান হাসতে হাসতেই বলল—
-"আমি ওর ফোনে কল দিয়ে কথা বলে নেবো। এখন রাখছি, আমার অনেক কাজ আছে।"
নূরাইসা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। ছুটে ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলো। কিন্তু সে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দম নিতে না নিতেই, ফোনটা বেজে উঠল। ইলহানের ভিডিও কল।
নূরাইসা চমকে উঠল। স্ক্রিনে নামটা জ্বলজ্বল করছে, অথচ আঙুলটা থেমে আছে 'রিসিভ' বাটনের ওপর।সে ধরলো না। একবার, দু’বার, তিনবার, প্রতি বারই কলটা কেটে দিলো। কিন্তু ফোন থামল না। বারবার, নিরলসভাবে বেজে চলেছে, মোট কুড়িবার!
শেষে ইলহান হাল ছেড়ে ভিডিওর বদলে অডিও কল করল। এইবার নূরাইসা ফোনটা কানে ধরল। কিন্তু কোনো কথা বলল না। নীরবতা। দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া পৃথিবীটা যেন থেমে আছে সেই মুহূর্তে। বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, দূরত্বের ভেতরেও যেন কিছু স্পর্শ করছে কারো হৃদয়ে। নীরবতা ভেঙে অবশেষে ইলহান বলল—
-" করেছেন আমাকে?"
কোনো উত্তর নেই। শুধু নূরাইসার নিঃশ্বাসের শব্দটা একটু কেঁপে উঠল। ইলহান আবার বলল—
-"জানি... দূরে আছি বলে আপনি বেশ শান্তিতেই আছেন। এখন কথা পর্যন্ত বলছেন না।"
তখন নূরাইসার ঠোঁট নড়ল ধীরে—
-"কবে আসবেন?"
ইলহান হেসে বলল—
-"মিস করছেন?"
আবারও নীরবতা। এবার একটু দীর্ঘ, একটু ভারী। হঠাৎ ইলহানের কণ্ঠ ভেসে এলো, আগের চেয়ে অনেক নরম, ঘোর লাগা কন্ঠস্বর, অনেক বেশি ব্যাকুল—
-"নূরেজান?"
শব্দটা যেন ছুঁয়ে গেল নূরাইসার বুকের গভীরে। তার শরীর হিম হয়ে গেল, কান গরম হয়ে উঠল, গাল দুটো মুহূর্তেই লাল হয়ে গেল। এইভাবে কেউ কাউকে ডাকে নাকি? বাড়িতে থাকাকালীন ইলহান কোনোদিনও এমন করে ডাকে নি। এই ডাকের ভেতর ছিল এক অদ্ভুত অসহায়তা, ব্যাকুলতা।
নূরাইসা ছোট্ট করে বলল—
-"হুম?"
ইলহান ঘোর লাগা কণ্ঠে বলল—
-"আপনাকে অনেক মিস করছি। আপনাকে ছাড়া আমার ঘুমোতে কষ্ট হচ্ছে। এই নরম তুলোর বালিশও আপনার নরম বক্ষপিঞ্জরের মতো উষ্ণতা দিতে পারে না।"
ওপাশের নূরাইসা হঠাৎই থমকে গেল। মুখে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে। চোখ দুটো কাঁপতে কাঁপতে এক ঝটকায় বন্ধ করে নিল সে। বুকের ভেতর কেমন এক অচেনা আলোড়ন জেগে উঠল, মিষ্টি, লজ্জায় ভরা, অথচ অদ্ভুত উত্তপ্ত এক অনুভূতি। হাঁটু যেন অবশ হয়ে এলো, খাটের প্রান্তে এসে সে ধপ করে বসে পড়ল। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না।
ইলহান সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল, তার নূরাইসা লজ্জা পেয়েছে। সামনাসামনি থাকলে তো এমনিতেই মুখ ফেরায়, দূর থেকে এখনো কল কেটে দেয়নি, এটাই তার কাছে বিস্ময়। ফোনের ওপাশে ইলহানের মুখে এক দুষ্টু হাসি ফুটল, নূরাইসা যার ঘ্রাণও পেল না।
সে হেসে নিচু স্বরে বলল—
-"একটা চুমু দিন, নুরেজান... আপনার এই তৃষ্ণার্ত স্বামীর তৃষ্ণা একটু মেটান।"
কথা শেষ হতে না হতেই নূরাইসা এক নিমিষে কল কেটে দিলো। রুমে শুধু নূরাইসার জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলার শব্দ। বুকে ঝড়ের মতো শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে, যেন সে হঠাৎই কোনো দৌড় থেকে ফিরে এসেছে।চোখের পাতা নামছে না, মুখের রক্তিমতা এখনো ক্ষীণ আলোয় জ্বলছে, রাতের নরম অন্ধকারেও যেন দেখা যায় তার লজ্জা ও ভয়ের মিশ্র আগুন।
.
রাতের তৃতীয় প্রহর। আকাশ তখন গাঢ় কালো, নিস্তব্ধতার ওপর ঘন ছায়া বিস্তার করেছে। পাহাড়ের বুক চিরে বইছে নিরবচ্ছিন্ন ঝরনার শব্দ, যেন অরণ্যের হৃদস্পন্দন। দূরে কোথাও পাহাড়ি শেয়ালের হাহাকার ভেসে আসছে, ভয় আর নিঃসঙ্গতার এক অদৃশ্য সুর বয়ে যায় সেই আওয়াজে। আকাশে অর্ধচন্দ্র, আলো এত ক্ষীণ যে ঘন জঙ্গলের ভিতর থেকে হাত বাড়ালেও নিজের আঙুলগুলো দেখা যায় না। সবকিছু যেন মৃত্যুর আগে নিঃশ্বাস গোনার মতো শান্ত।
কিন্তু এই নীরবতার আড়ালেই চলছে মৃত্যু ব্যবসা।
দক্ষিণ সীমান্ত, মানচিত্রে নামটি পরিচিত হলেও, এখানে রাতের শব্দ আলাদা রকমের। এই সীমান্তে বাতাসের গন্ধে মিশে থাকে অপরাধের ইতিহাস, আর নদীর জলে ভেসে আসে গোপন চুক্তির প্রতিধ্বনি।
তীরের নিচে, অন্ধকারের চাদরে মোড়া জায়গাটায় একদল লোক ব্যস্ত তাদের কাজ ভাগ করে নিতে।গাছের গোড়ায় স্তূপ করে রাখা কয়েকটি কাঠের বক্স, বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও, ভেতরে লুকিয়ে আছে এমন কিছু যা দিনের আলোয় দেখা নিষেধ।
নদীতে একটি ছোট নৌকা নোঙর করা, ইঞ্জিন বন্ধ, যেন নিঃশব্দ সহযোগী এই রাতের। চার-পাঁচজন লোক মিলে বক্সগুলো একে একে নৌকায় তুলছে। কারও মুখে কথা নেই, শুধু শ্বাসের শব্দ আর কাঠের ঘর্ষণে তৈরি মৃদু আওয়াজ।
তাদের মধ্যে একজন, অন্যদের চেয়ে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, হাতে ধরা সিগারেটের আগুন মাঝে মাঝে মুখটাকে আলোকিত করে তোলে। তার চোখে বোঝা যায়, এ কাজ তার অচেনা নয়। সে যেন অন্ধকারেরই এক অংশ, রাতেরই একজন অধিবাসী।
সব বক্স নৌকায় তোলা হলে সেগুলো সাজিয়ে রাখা হয়, তারপর তার উপর দিয়ে বিছানো হয় বাঁশের গুরি। দূর থেকে দেখলে মনে হবে জ্বালানির বোঝা,একেবারে নিরীহ কিছু। কিন্তু অন্ধকারের ভেতরে লুকিয়ে আছে এমন সত্য, যা জানলে কারও ঘুম আর ফিরে আসবে না।
রাত এখনও তরুণ। আর এই তরুণ রাত সাক্ষী হয়ে থাকে মানুষের লোভ, মৃত্যু, আর সীমান্তের নীরব চুক্তির।
.
শ্যাডো ইউনিটের একটি শব্দবৃত্তে কণ্ঠহীন সংকেত ভেসে এসেছে। কম্যান্ড সেন্টারের ভেতর ডিজিটাল আওয়াজে টুকরো টুকরো কাঁপুনি। মেজর সাইফারএক্স সেই সংকেত পেয়ে স্ক্রিনে স্যাটেলাইট লেয়ার টেনে আনতেই মানচিত্রে লোনাজলের রেখা উঠে এল, আর তার মাঝখানে একখানা ক্ষুদ্র সাদা বিন্দু জ্বলে উঠল। কণ্ঠে বরফের মতো ঠান্ডা স্থিরতা নিয়ে সাইফারএক্স বলল—
-"তারা ০৩:৪২-এ নদী পার হবে।"
লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ-নোভা আকাশের দিকে তাকিয়ে সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল—
-"Got it."
খবর পাওয়া মাত্রই Aegis Nova তার ইউনিটের পাঁচজন সদস্যকে নিয়ে পরিকল্পনা সাজাতে শুরু করল। কে কোথায় থাকবে, কে কী করবে, সব ধাপে ধাপে বুঝিয়ে এক এক করে সবাই বেরিয়ে পড়ে লক্ষ্য একটাই মিশন সীমান্ত শুদ্ধি সফল করতেই হবে।
রিকন তাসিন, ভূমি পর্যবেক্ষণে বিশেষজ্ঞ। অচেনা পথের মধ্যে ক্ষীণ চিহ্ন খুঁজে বের করাই তার কাজ। বাঁধের পাশে ফেলা পাথরের রেখা, কচুরিপানার মাঝে আটকে থাকা রাবারের টুকরো, এইসব সূক্ষ্ম চিহ্ন সে অদ্ভুত মনোযোগে খুঁজে বের করে। ঠান্ডা বাতাসে কাঁধে জাম্পার জড়িয়ে সে হেঁটে হেঁটে প্রতিটি চিহ্ন স্কেচ করে রাখলো। তারপর টকিতে নিচু স্বরে জানায়—
-"এই পথেই তারা নামবে।"
স্নাইপার রায়েদ, পাহাড়ের পাদদেশে নিঃশব্দ ছায়ার মতো। নিজেকে এমনভাবে মাটির ফাঁকে গুঁজে রেখেছে, যেন প্রকৃতিরই অংশ হয়ে গেছে সে। চোখ স্থির আকাশে, হাতে লেজার রেঞ্জফাইন্ডার। নিশানায় আঙুল রাখতেই তার শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। রায়েদ জানে, একটি ভুল শ্বাস, এক সেকেন্ড দেরি,।সব শেষ। সে কণ্ঠ না ছাড়িয়ে রেডিওতে কেবল তিনটি সংখ্যা পাঠায়—
-"৩...২...১..."
ফিল্ড ফাইটার ঈশান, মাঠে তার উপস্থিতি যেন বজ্রপাতের মতো। এক মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে গাছের কাণ্ড আঁকড়ে ধরে, নিঃশব্দে নেমে যায় নিচের দিকে। ভেতরে ঢুকে বক্সগুলো খুলে দেখা, প্যাকেট যাচাই এইসব তার কাজ। কাঁধে ভারী ব্যাগ, পায়ের নিচে শুকনো পাতার শব্দও যেন বাতাসে মিলিয়ে যায়। নির্ভয়ে সে এগিয়ে যায়।
আরিয়ান, টেক সাপোর্ট ও মাইন এক্সপার্ট। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা ইলেকট্রনিক ফাঁদগুলো তার কাছে খেলনার মতো। সে বুটের নিচ থেকে ছোট একটি ড্রোন ছেড়ে দিলো, নিঃশব্দ, দ্রুত, আলোহীন। ড্রোনটি রাতের অন্ধকারে সরে যায়, আরিয়ান স্যাটেলাইট লেয়ারের সঙ্গে তার ফিড যুক্ত করে স্ক্যান চালায়। কোথাও চাপার বোর্ড, কোথাও লুকানো কেবল, সবই তার চোখে ধরা পড়ে। হাতের উপরে হালকা স্পার্ক তুলে একটি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস সাজিয়ে রাখলো, প্রয়োজনে মুহূর্তেই শত্রুর সিগন্যাল অচল করে দেবে। নিজেদের অবস্থানে তারা প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। এখন শুধু অপেক্ষা, অর্ডার পাওয়ার সাথে সাথে একশনে নেমে পড়বে।
আরিবা, কমিউনিকেশন এক্সপার্ট। শ্যাডো ইউনিট এই মিশনের জন্য দক্ষিণ সীমান্তে গোপন ক্যাম্প তৈরি করেছে। সেখানে বসেই সে তার কার্যক্রম চালাচ্ছে। কাচের মতো শান্ত কণ্ঠে সে জানাল—
-"জ্যামিং লাইন ধরে রেখেছি। সীমান্ত-প্যাট্রোলের ফ্রিকোয়েন্সি এখন কাটা।"
তার হাতে কেরফিউ-রেডিও, একসাথে শত্রুর বার্তা ডিকোড করছে, আবার নিজেদের চ্যানেল খোলা রাখছে। সে জানে কখন নিঃশব্দে এক শব্দ পাঠাতে হবে, কখন এক নিশ্বাসেই হুকুম দিতে হবে। মৃদু হাসি দিয়ে যোগ করল—
-"তাদের নেভিগেশন সিস্টেমে হালকা পরিবর্তন করেছি। ওরা কয়েকটা ভুল করবে।"
মেজর সাইফারএক্স, সাইবার ও স্যাটেলাইট ট্যাকটিক্সের বিশেষজ্ঞ। সেও আরিবার পাশে বসে তার ট্যাবলেটের স্ক্রিনে মানচিত্র ঝলকাচ্ছে। ঠান্ডা কণ্ঠে বলে উঠল—
-"আমি তাদের চালানকে 'ভ্যানিশিং পয়েন্ট' বানিয়ে দেব। তারা দেখবে, কিন্তু পৌঁছাতে পারবে না। আমি তাদের মানচিত্রে সাতটি মিথ্যা সংকেত ঢুকিয়েছি, ভুল পথেই যাবে ওরা।"
লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ-নোভা, পুরো অপারেশনের পরিচালক। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা মাথায় নির্দেশ দিল—
-"রায়েদ, ডান পাশে তিন গজ উপরে। রিকন, তুমি নদীর ওপাশের ঢাল কভার করবে। আরিয়ান, মাইন লেয়ার বন্ধ রাখো, ওরা যদি ফাঁদ পাতে, আমরা যেনো অক্ষত থাকি। ঈশান, তুমি প্রথম ঢুকবে। দুটি কনট্রোল পয়েন্ট মাথায় রেখো। আরিবা, আমাদের কমিউনিকেশন ব্লকিং দুই মিনিট বাড়াও।"
তার কণ্ঠে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, শুধু নিখুঁত সময়জ্ঞান, যেন প্রতিটি শব্দই যুদ্ধক্ষেত্রের আদেশ। সবাই নিজ নিজ অবস্থানে অপেক্ষা করছে সেই নৌকা আসার।
.
জঙ্গলের আঁকাবাঁকা পথে একটি কাঠের নৌকা ধীরে ভেসে আসছে সাঙ্গু নদীর ধার ঘেঁষে। বাতাসে সাই সাই শব্দ, তার সঙ্গে মিশে নৌকার ইঞ্জিনের গর্জন। নৌকার গায়ে বাঁশের গুঁড়ি বাঁধা, দেখলে মনে হয় সাধারণ জ্বালানি কাঠ নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে আছে এম-১৬, রকেট লঞ্চার আর আধুনিক অটোমেটিক রাইফেলের বক্স। তারা নিশ্চিন্ত মনে এগিয়ে আসছে। অথচ কেউ জানে না, তাদের প্রতিটি নড়াচড়া ইতিমধ্যেই স্যাটেলাইটে ধরা পড়েছে।
শ্যাডো ইউনিট ধীরে ধীরে নেমে পড়েছে অন্ধকারে। নামের মতোই তারা ছায়ার মতো নীরব, পায়ে পায়ে চলে যাচ্ছে নদীর ধারের ঘন সবুজে। নৌকায় থাকা লোকগুলো কিছুই টের পেলো না। বাঁশের গুঁড়ির নিচে থাকা কাঠের বক্সগুলো রিকন দেখতে পায়, তার চোখে পড়ে সেই লুকানো চিহ্ন। রায়েদের চোখে তখন লেজার নিশানা জ্বলছে। মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে যায়।
হঠাৎ, একটা তীক্ষ্ণ শব্দ কেটে দেয় সেই নীরবতা।নৌকার ডিজেল ইঞ্জিন থেকে কিটিং আওয়াজ, পাচারকারীদের কথাবার্তা, একসাথে লাফিয়ে উঠল অনেক হাত। রায়েদ নিশানায় হাত রাখে, নিঃশব্দে ট্রিগার টানে, গুলির শব্দ বাতাস চিরে যায়, কিন্তু চিৎকার ওঠে না। প্রথম শটেই নৌকার এক কোণে থাকা অস্ত্রভাণ্ডার ভেঙে পড়ে। রাত পায় তার প্রথম রক্তচিহ্ন।
ঈশান ঝাঁপিয়ে পড়ে নৌকার দিকে। কাঁধের ব্যাগ খুলে ভিতর থেকে বের করে ধাতব যন্ত্রপাতি, রাস্তার যন্ত্রাংশ, পাচার করা সামগ্রী। রিকন চোখে দেখে চিনে ফেলে, এগুলো সীমান্তের ওপাশের জেনিথ কারখানার অংশ।
পাচারকারীরা পিছু হটতে চায়, কিন্তু আরিবা তখনই তাদের রেডিও লাইন কেটে দেয়।
-"ওয়াচার, এখন নামাও!" এ-নোভা রেডিওতে আদেশ দেয়। পুরো ইউনিট মুহূর্তে সক্রিয় হয়ে যায়, নিঃশব্দে, নিখুঁতভাবে।
আরিয়ান তখন এক ছোট্ট যন্ত্র ছুড়ে দেয়, এর নাম "চুপি"। চুপি জলের নিচে ঢুকে নৌকার গতিপথ বদলে দেয়, ইঞ্জিন থেমে যায়। পাচারকারীরা তখন বুঝে যায়, তারা ফেঁসে গেছে। আরিয়ান মৃদু হাসে, চোখে তৃপ্তি।মেজর সাইফারএক্স রেডিওতে বলে ওঠে—
-"সিগন্যাল ব্ল্যাকআউট, চার মিনিট।"
একটা নিস্তব্ধতা, তারপর হঠাৎ গুলির ঝলক। পাচারকারীরা পাল্টা গুলি ছোড়ে, আগুন লেগে যায় নৌকার পাশে। রায়েদ ঠান্ডা কণ্ঠে বলে—
-"কোণ ঠিক রাখো।"
আরেকটি শট, এক শত্রু নিঃশেষ। ঈশান সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে, মাটিতে পড়ে থাকা অস্ত্র সরিয়ে রাখে, হাতের মুঠোয় ধরা পড়ে পাচারকারীরা। তখনই কেউ বলে ওঠে—
-"একজন পালাচ্ছে! উত্তর দিকের গুহায়!"
এ-নোভা হাঁটু গেড়ে বসে ছোট স্ক্রিনে মানচিত্র দেখে।তার চোখে পরিকল্পনা ঝলমল করে ওঠে।
-"রিকন, গুহার প্রবেশপথ বন্ধ করো। ঈশান, পিছনের কভার নাও। রায়েদ, আমাদের সিগন্যাল দাও।"
তার কণ্ঠে দৃঢ়তা, যেন পাহাড় কেঁপে ওঠে।
মেজর সাইফারএক্স দ্রুত স্যাটেলাইট লেয়ার আপডেট করে। তার কণ্ঠে জরুরি সতর্কতা—
-"তাদের সঙ্গে শুধু অস্ত্র নয়, সিগন্যাল-বোমও আছে।ওটা সক্রিয় হলে আশপাশের মাইন ফেটে যাবে। আরিয়ান, ওটা বন্ধ করো।"
আরিয়া চোখ নামিয়ে দ্রুত কমান্ড পাঠায়। একটা ভুয়া সিগন্যাল পাঠিয়ে বোমা নিস্ক্রিয় করে ফেলে। তারপর ইউনিট একসাথে এগিয়ে যায় গুহার দিকে।
অন্ধকার ছিন্ন হয়ে যায়, শব্দ, ধোঁয়া, আর ধুলোর গন্ধে রাত ভরে ওঠে।
বনের ভেতর তখন কুয়াশা নেমে এসেছে। পাহাড়ের গায়ে বৃষ্টির পুরোনো জলধারা টুপটাপ পড়ছে, মাটিতে পচা পাতার গন্ধ। দূর থেকে নদীর গর্জন শোনা যায়, কিন্তু সেই শব্দ এখন মিলেমিশে আছে গুলির প্রতিধ্বনির সঙ্গে। রাতের অন্ধকারে শ্যাডো ইউনিট এগিয়ে যাচ্ছে, দৃষ্টি একটিমাত্র দিকে, সেই গুহা, যেদিকে পাচারকারীর শেষ লোকটা পালিয়েছে।
রিকন তাসিন এগিয়ে চলেছে সবচেয়ে সামনে। তার চোখে ইনফ্রা-ভিশন গগলসের সবুজ আলো। সে হাত তুলে থামার ইশারা দেয়, গাছের গোড়ায় পায়ের ছাপ, নতুন কাদায় গভীর দাগ। সে নিচু কণ্ঠে বলে—
-"এখান দিয়েই গেছে।"
রায়েদ দূর থেকে এলাকা পর্যবেক্ষণ করছে, পাহাড়ের ঢালে বসে তার রাইফেলের স্কোপে চাঁদের আলো পড়ছে।
-"গুহার মুখ থেকে একটাই তাপচিহ্ন আসছে! একজন ভেতরে আছে।" সে জানায়।
এ-নোভা মাথা নাড়ল—
-"ঈশান, তুমি সামনে যাবে। আরিয়ান, তোমার ড্রোন উড়াও, ভেতরের মানচিত্র চাই আমার।"
আরিয়ান ব্যাগ থেকে ছোট্ট ড্রোন ‘চুপি-টু’ বের করল, আঙুল ছুঁতেই সেটি হালকা শব্দে উড়ে গেল। গুহার মুখে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেল মিনি-ক্যামেরার মতো। তার স্ক্রিনে ভেসে উঠল গুহার ভেতরের চিত্র, পাথরের দেয়ালে ঝুলছে ঝিলিক দেওয়া তার, এক কোনায় একটা ধাতব বাক্স, আর সেই পাচারকারী কিছুর সঙ্গে তার সংযোগ দিচ্ছে।
আরিয়ান হালকা আতঙ্কে বলল—
-"ওটা বোমা নয়... এটা ডেটা কোর। কারো সঙ্গে লাইভ কানেকশন করছে!"
মেজর সাইফারএক্স তখনই সিগন্যাল ধরল।
-"ওরা বাইরের স্যাটেলাইট লিঙ্কে আপলোড করছে, এটা শুধু অস্ত্র পাচার নয়, ডেটা ট্রান্সফার ও!"
এ-নোভা দ্রুত নির্দেশ দিল—
-"আরিবা, জ্যাম করো। রায়েদ, কভার দাও। ঈশান, ভেতরে ঢোকো।"
ঈশান নিঃশব্দে গুহার দেয়াল বেয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। বাতাস ভারী, ভেতরে অদ্ভুত গন্ধ, ধোঁয়া আর ধাতুর মিশ্রণ। পাচারকারী পেছন ফিরে তাকাতে না তাকাতেই ঈশান তার কাঁধে হাত রাখে, এক ধাক্কায় তাকে মাটিতে ফেলে দেয়।
-"থামাও!" চেঁচিয়ে ওঠে ঈশান। কিন্তু তখনই সেই মানুষটা কোটের ভেতর থেকে একটা ছোট্ট ডিভাইস টিপে দেয়। চোখের পলকে গুহার দেয়াল কেঁপে ওঠে, আলো নিভে যায়, ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে।
-"EMP Pulse! সব ডিভাইস বন্ধ হয়ে গেছে!"
আরিয়ান চিৎকার করে ওঠে।
অন্ধকারে শুধু শ্বাসের শব্দ, গুলির ঘ্রাণ আর দূরের নদীর গর্জন। এ-নোভা শান্ত স্বরে বলে—
-"শান্ত থাকো, চোখ ব্যবহার করো।"
রায়েদ অন্ধকারেও নিশানা ধরে রাখে। একটি ক্ষীণ শব্দ, জুতার ঘর্ষণ। ট্রিগার টানার সঙ্গে সঙ্গে এক ঝলক আলো, পাচারকারী পড়ে যায় মাটিতে, তার হাতের ডিভাইস গড়িয়ে এসে থামে ঈশানের পায়ের কাছে।
আরিয়ান তড়িঘড়ি সেটা তুলে নিয়ে ব্যাটারি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ডিভাইসের স্ক্রিনে কিছু ভেসে ওঠে, একটি লোগো: "Zenith Protocol : Phase-2 Initiated."
সবাই একে অপরের দিকে তাকায়। সাইফারএক্স নীচু স্বরে বলে—
-"এই চালান শুধু অস্ত্র নয়, এটা কোনো বড় প্রকল্পের অংশ। কেউ ডেটা পাঠাচ্ছিল ওপাশে। আমাদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য অস্ত্র পাচার করার ঢং রচেছে।"
এ-নোভা নিঃশব্দে দাঁড়ায়। গুহার বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। সে বলে—
-"ওরা শেষ হয়নি। এটা কেবল পর্দা তোলা মাত্র। Zenith... আমরা এখন বুঝতে পারছি, কারা আসল খেলোয়াড়।"
তার কণ্ঠে দৃঢ়তা, চোখে এক অচেনা আগুন।
-"আজ রাতের মিশন শেষ নয়, এটি শুরু। শ্যাডো ইউনিট খালি হাতে ফিরে যাবে না, এবার আমরা তাদের খুঁজে বের করব।"
গুহার মুখ দিয়ে আলো ঢুকছে ধীরে ধীরে। নদীর স্রোত আবার শান্ত। তবুও বাতাসে এক ধরনের ভার, যেন এই পাহাড় জানে, আগামীর যুদ্ধ এখানেই শুরু হবে।
বান্দরবনের নিঃশব্দ রাতে নদী আবার শান্ত সুরে বইতে থাকে। গাছের ছায়ায় মিলিয়ে যায় শ্যাডো ইউনিটের অবয়ব। তবুও বাতাসে রয়ে যায় এক প্রশ্নের গন্ধ,
এই রাত কি সত্যিই শেষ নয়, এ কি এ কেবল পরের যুদ্ধের ভূমিকা?