সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ১৪

🟢

আকাশের বুকজুড়ে মেঘের গাঢ় সীমানা, মাঝে মাঝে দূরে কোথাও বিদ্যুৎ চমকে উঠছে। বাতাসে ভিজে গন্ধ, নতুন বৃষ্টির পরের মাটির গন্ধ যেন শোকগাথা লিখছে চারপাশে। বাতাসে দুলছে বারান্দার পর্দা, আলো-আঁধারের খেলা ছুঁয়ে যাচ্ছে নূরাইসার মুখে।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে নূরাইসা আর ইলহান। নীরবতা এমন, মনে হয় যেন সময়ও থেমে আছে তাদের মাঝে। বাতাসের প্রতিটি ঝাপটা যেন বোবা সাক্ষী হয়ে আছে আসন্ন ঝড়ের। নূরাইসা ইলহানকে কিছু বলার সুযোগ দিল না। কান্না গিলে হঠাৎ বলে উঠল—

-"আমি আপনাকে ঘৃণা করি না। আপনি অতীত ভুলে গেছেন, আমি না। চার বছর আগে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যখন আপনি বাড়ি ফিরেছিলেন, তখন আপনার বেঁচে থাকা নিয়েই সন্দেহ ছিল। জানেন, আপনার সেই অবস্থাটা দেখে আমি কতটা ভয় পেয়েছিলাম? সারাদিন-রাত জায়নামাজে বসে শুধু আপনার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেছি আমি। পুরো বাড়িটা তখন আতঙ্কে থম মেরে ছিল, বড় মা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

আপনি কারো কথা ভাবেননি, না নিজের মা, না পরিবারের, শুধু নিজের সেই সখ, সেই স্বপ্ন! তখন আপনি ছিলেন আমার চাচাতো ভাই, আর আমি আপনার জন্য কেঁদেছি। আর এখন? এখন আপনি আমার স্বামী... আমি ভালোবেসে ফেলেছি আপনাকে।"

শেষ বাক্যটি বলতে গিয়ে নূরাইসার গলা কেঁপে উঠল। বাতাসে তার কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল। পর্দার দোলায় তার মুখে আলো-ছায়ার খেলা যেন তার অন্তরের দ্বন্দ্বের প্রতিবিম্ব। সে থামল না, কাঁপা গলায় বলল—

-"আপনার এই আর্মিতেই যদি ফেরার ছিল, তাহলে কেনো বিয়ে করলেন আমাকে? কেনো আমায় আপনাকে ভালোবাসতে বাধ্য করলেন, বলুন কেনো? আর এখন আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন, আপনার জন্য আমি কেনো উতলা হচ্ছি, কেনো ভয় পাচ্ছি? আমি কে?"

শেষ প্রশ্নটার সঙ্গে যেন পুরো পরিবেশও নিঃশব্দ হয়ে গেল। দূরের আকাশে বিদ্যুতের ক্ষীণ ঝলক নূরাইসার চোখে পড়ে, আর তার অশ্রু সেই আলোয় ঝিকমিক করে ওঠে।

"আপনাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি"— বাক্যটা যেন ইলহানের মাথার ভেতর বজ্রপাতের মতো আঘাত করল। বারবার প্রতিধ্বনি হতে লাগল তার কানে।চারপাশের সব শব্দ মিলিয়ে গিয়ে শুধু সেই কণ্ঠস্বর, কাঁপা, সত্য, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কণ্ঠস্বর, তার মনের ভেতর প্রতিধ্বনি তুলল। ইলহানের হাতের বন্ধন আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে এলো। নূরাইসা ধীরে ধীরে মুক্তি পেল তার বক্ষপিঞ্জর থেকে। বাতাসে তখন নীরবতা আর অসমাপ্ত বাক্যের ভার।

দূরে আবারো মৃদু গর্জন শোনা গেল। আকাশে ঝুলে থাকা মেঘ যেন তাদের দু’জনের জীবনের মতই ভারী হয়ে আছে, বৃষ্টি নামবে কিনা, কে জানে।

বারান্দার বাতাস নিস্তব্ধ। মেঘের গর্জন থেমে থেমে কাঁপিয়ে দিচ্ছে আকাশের প্রান্তর। সন্ধ্যার আলো ক্রমে ম্লান, নরম বৃষ্টি নেমেছে ছিটেফোঁটা করে। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ আর কষ্টের ভার মিলেমিশে গেছে এক অদ্ভুত নীরবতায়। ইলহান স্থির চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে, অবাক, অবশ, নির্বাক।

যে শব্দগুলো সে কখনো শুনতে চেয়েছিল, সেগুলো আজ নূরাইসার কণ্ঠে এভাবে শুনবে, এটা সে কোনোদিন ভাবেনি। তার ঠোঁট নড়ল না, কণ্ঠরোধ হয়ে গেল। শুধু চোখের দৃষ্টি আটকে রইল নূরাইসার মুখে, যেখানে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে নিঃশব্দ বৃষ্টির মতো।

বাতাসে কাঁপছে পর্দা, নরম আলো এসে পড়ছে তার মুখে এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এই মুহূর্ত সময়ের বুকেও স্থির হয়ে থাকবে চিরকাল।

নূরাইসা চোখের পানি মুছে নিঃশব্দে ঘরের ভেতর চলে গেল। দরজাটা ধীরে টেনে বন্ধ করে সে বাথরুমে ঢুকে পড়ল।কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে পানির শব্দে মিলেমিশে ভেসে এলো এক নরম কান্না, ম্লান, চাপা, অথচ বেদনায় ভরা কান্না।

ইলহান একটুও নড়ল না। তার বুকের ভেতরটা যেন ভারী পাথরচাপা হয়ে গেল। বাতাসে জমে থাকা আর্দ্রতা মিশে গেল তার নিঃশ্বাসে। অপরাধবোধ, অনুশোচনা আর এক অসহ্য ভালোবাসার যন্ত্রণা একসাথে ঝড় তুলছে তার অন্তরে।

বাথরুমের ভেতর থেকে নূরাইসার কান্নার শব্দটা আবার স্পষ্ট হলো। ইলহান হঠাৎ মাথা তুলে তাকাল দরজার দিকে। বুকের ভেতর কিছু যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে, চেপে রাখা কষ্ট হঠাৎ বিদীর্ণ হয়ে উঠল। সে আর স্থির থাকতে পারল না। চোখে একরাশ অস্থিরতা, মুখে নিস্তব্ধতা। কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, নিঃশব্দে।

চারপাশে ঝরছে হালকা বৃষ্টি। বাতাসে দুলছে পর্দা, ফোঁটা ফোঁটা পানি এসে পড়ছে বারান্দার রেলিংয়ে।

ইলহানের ছায়া মিলিয়ে গেল ধূসর সন্ধ্যার অন্ধকারে, এক ভাঙা মানুষ, এক নিঃশব্দ ভালোবাসা,

আর এক অসমাপ্ত গল্প রেখে।

.

ইলহান বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত গড়িয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটা তখন ঠিক বারোটা ছুঁয়েছে। শহর নিস্তব্ধ,নিঃশব্দে ঘুমিয়ে আছে। শুধু দেওয়ান বাড়ির বাতাস ভারী, অজানা আশঙ্কা আর ক্লান্ত নিঃশ্বাসে ভরা। বারান্দায় ভিজে থাকা বাতাসের সঙ্গে মিশে আছে দূরের মেঘের গন্ধ, যেন কোনো অসমাপ্ত দুঃখের প্রতিচ্ছবি।

অফরিন সারাদিন নূরাইসাকে খুঁজে বেড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কোণায় ক্লাসরুম, ক্যান্টিন, লাইব্রেরি। কোথাও তাকে পায়নি। শেষে নুহাকে ফোন করতেই সব জানতে পারে। দেরি না করে ছুটে আসে বাড়ি। এসে দেখে, ঘরে যেন ঝড় বয়ে গেছে।

ইলহান বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে নূরাইসার ঘরে। নাজনীন বেগম কাঁদছেন, মা, দাদী বোঝানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু নূরাইসা সেই যে বাথরুমে ঢুকেছে, আর বের হয়নি। কেউ দরজায় কড়া নাড়লেও ভেতর থেকে কোনো উত্তর মেলে না। শুধু নীরবতা, আর টিপটিপ করে পড়া পানির শব্দ, যেমন সব দুঃখ পানি হয়ে পড়ছে মেঝেতে।

নূরাইসা কারও সঙ্গে কথা বলতে চায় না। তাদের কণ্ঠস্বর, কান্না, অনুনয়, সব শুনেছে সে। তবুও নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে। অনেকক্ষণ পরে সবাই ক্লান্ত হয়ে চলে গেলে, ধীরে ধীরে দরজার ছিট খুলে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে নূরাইসা।

চোখ লাল, মুখ ফ্যাকাসে। গোসল করে জামাকাপড় বদলে নেয় সে, হয়তো নিজের সব দুঃখ ধুয়ে ফেলতে চায় পানির ধারায়। চুলগুলো কোনোমতে মুছে নিঃশব্দে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। কিন্তু ঘুম আসে না। শরীর ভীষণ ক্লান্ত, মন আরও বেশি। চোখ বুঁজলেই ভেসে ওঠে পুরোনো সব দৃশ্য, একটা বীভৎস খবর, এক ঝড়ে ভেঙে পড়া পৃথিবী। বাড়ি জুড়ে কান্নার রোল।

তারপর, সেই দিন বিকেলে বাড়ির উঠোনে সাজানো টেবিল। টেবিলের উপর একটি কাঠের ফ্রেমে ঝুলছে একটি স্বর্ণপদক, পাশে সরকারের দেওয়া "Certificate of Honor" যেখানে লেখা—

-"For extraordinary bravery and ultimate sacrifice in the line of duty."

আরও আছে একটি মরনোত্তর পুরস্কারের ফলক, তাতে খোদাই করা নাম, মেজর ইরফান দেওয়ান (Posthumous)। লাল, সবুজ আর সোনালি ফিতেয় বাঁধা পতাকা ধীরে ধীরে গুটিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, বড় মায়ের কাঁপা হাতে। বারো বছর বয়সী নূরাইসার চোখে সেই দৃশ্য ছিল ভয়ংকর, বীভৎস।

বারান্দার বাতাস, ঘরের নিঃশব্দতা, বৃষ্টির ভিজে থাকা মেঝে, সবই যেন সেই স্মৃতিকে আজও শ্বাসের সাথে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ইলহানের আর্মিতে ফিরে যাওয়া, নূরাইসার ভাঙা মন, এবং অতীতের এই ক্ষত, সব মিলিয়ে আজ দেওয়ান বাড়ির এই রাত যেন দীর্ঘায়িত দুঃখের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে নূরাইসার জন্য।

আজ দশ বছর পরও নূরাইসা সেই মুহূর্ত ভুলতে পারেনি। চোখের কোণ বেয়ে অনবরত পানি পড়ছে, চায় না কাঁদতে, কিন্তু চোখ কি কখনো হৃদয়ের কথা শোনে? বাতাসে শীতলতার নরম ছোঁয়া, ঘরের অন্ধকার, সব মিলিয়ে যেন এই অদৃশ্য বেদনার ভার আরও গাঢ় করে দিয়েছে।

ঠিক তখনই দরজা খোলার শব্দ কানে এলো।

নূরাইসা চমকে উঠল। নিস্তব্ধ ঘরে ইলহানের ভারী পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। সে এসে দরজার সামনে থেমে দাঁড়ালো, নীরবে, দীর্ঘক্ষণ। ঘরের অন্ধকারে নূরাইসা অনুভব করতে পারল তার দৃষ্টি, কেমন তীক্ষ্ণ, কেমন অপরাধবোধে ভরা, নিঃশব্দে ক্ষমা প্রার্থনার মতো।

সময় যেন থমকে রইল কয়েক মুহূর্ত। বাতাসে শোক, লজ্জা আর অপ্রকাশিত ভালোবাসার ভার মিশে আছে, যেন প্রতিটি অণু কাঁপছে।

ইলহান তখনও পুরো আর্মি ইউনিফর্মেই, কালো বুটে ধুলো জমে, কাঁধে র‌্যাঙ্কের প্রতীক মৃদু আলোয় ঝলমল করছে। ঘরের বাতাসে ঘাম, ধুলো আর গাম্ভীর্যের মিশ্র গন্ধ। ধীর পায়ে সে কাবার্ডের দিকে এগিয়ে গেল, সেখানে রাখা তোয়ালে, একটি টিশার্ট আর ট্রাউজার বের করে বাথরুমে ঢুকে পড়ল।

বাথরুমের দরজা বন্ধ হতেই শাওয়ারের টুপটাপ শব্দ, বাইরে, বিছানায় নূরাইসা নিরব শুয়ে রইলো। মিনিট বিশেক পরে ইলহান বেরিয়ে এলো, চুল ভেজা, গায়ে সাদা টিশার্ট, মুখে ক্লান্ত অথচ এক অদ্ভুত স্থিরতা।

সে খাটের এক পাশে শুয়ে পড়ল। অন্য পাশে নূরাইসা পিঠ ফিরিয়ে নিঃশব্দে শুয়ে আছে। মাঝখানে যেন এক অদৃশ্য দেয়াল, একই বিছানা, অথচ দুই পৃথিবী। সেই দূরত্ব ইলহানের মোটেও ভালো লাগলো না।

মুখে কোনো কথা না বললেও, ভিতরে ভিতরে তার চিন্তার বন্যা বইতে লাগলো। নিজের মনেই সে বিড়বিড় করতে লাগল—

-"তিন মাস ধরে অনেক দূরত্ব ছিল, এখন এই দূরত্বের কোনো মানে হয়? কোথায় স্বামী এতদিন পর এসেছে, বুকে টেনে নেবে, তা না, কি একটা ঝামেলা হয়ে গেলো! সব দোষ ওই রিদওয়ানের। ও আমার বউকে প্রপোজ না করলে কি আর আমি সামনে যেতাম? দূর থেকে দেখেই চলে আসতাম। না আমি সামনে যেতাম, আর না আমার বউ আমাকে ইউনিফর্মে দেখতো। আমি তো আগে ওর ভয় কাটাতে চেয়েছিলাম, তারপর সব সত্য বলতাম। কিন্তু না, আমার তো পড়া কপাল! শ্লা রিদওয়ান, তোকে একবার সামনে পাই, কাঁচা চিবিয়ে খাবো!"

বিজ্ঞাপন

নিজের মনে রিদওয়ানের গুষ্টি উদ্ধার করে ইলহান কিছুটা শান্ত হলো। তারপর হালকা গলায় কাশল, যেন নূরাইসার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। কিন্তু নূরাইসার কোনো হেলদোল নেই, পিঠ ফিরিয়ে নিশ্চুপ শুয়ে আছে, যেন পৃথিবীর কোনো কথাই তার কানে পৌঁছায় না। ইলহান কপাল কুচকে ফিসফিস করে বলল—

-"এই মেয়ে না আমাকে জমের মতন ভয় পায়? কোন শ্লা বলেছে রে এই কথা? কি অনায়াসে আমাকে আজকে যা না তাই বলেছে, আবার চোখের দিকে তাকিয়েও বলেছে। আর এখন না ঘুমিয়ে শুয়ে আছে অথচ আমাকে চার আনার পাত্তা দিচ্ছে না।"

নিজের ভাবনাগুলোকে সাইডে সরিয়ে রাখল ইলহান।

এখন ভাবনার সময় নয়, এখন বউকে কাছে পাওয়ার সময়। ইলহান নূরাইসার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল—

-"তুই আমার বুকে আসবি, না আমি তোর বুকে যাবো?"

এতখন চুপ থাকা নূরাইসা নিজের শরীরটাকে আরও গুটিয়ে নিয়ে খাটের এক কোণে সরে গেল। তারপর তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল—

-"একদম আমাকে ছুঁবেন না! দূরে থাকুন!"

কিন্তু ইলহান কি আর এমন কথা শোনার মানুষ! এক ঝটকায় সে নূরাইসাকে টেনে সোজা করিয়ে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারপর সাথে সাথে নূরাইসার বুকে মুখ গুঁজে ফেলল। ইলহানের হাতের বন্ধনে এমনভাবে আটকে গেছে যে তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে প্রাণপণে ইলহানের বাঁধন ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল—

-"ছাড়ুন আমাকে, না হলে কিন্তু আমি চিৎকার করব!"

ইলহান নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল—

-"কর।"

-"বাড়ির সবাই চলে আসবে কিন্তু!"

-"কেউ আসবে না। চিৎকার করার আগে ভেবে নিস, আমরা স্বামী-স্ত্রী! তোর এই চিৎকারের অর্থ কিন্তু সবাই আলাদা করে নেবে।"

নূরাইসার মুখটা মুহূর্তেই থমকে গেল। অথচ ভেতরে রাগে ফুঁসছে। সে রাগ মিশিয়ে বলল—

-"ছাড়ুন আমাকে, নইলে কিন্তু কামড়াবো আপনাকে!"

ইলহান এবার মুখ তুলে তাকাল। চোখে এক চিলতে হাসি। ধীরে গলা এগিয়ে এনে নূরাইসার মুখের একদম সামনে ধরে বলল—

-"নে, দে কামড়।"

নূরাইসা হতভম্ব হয়ে গেল। ভাবতেও পারেনি ইলহান এতটা কাছে আসবে, এতটা নির্লজ্জ সহজতায় কথা বলবে। ইলহান নূরাইসার বিমূঢ় চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল—

-"যুদ্ধের হাজার ক্ষত আমি শরীরে বয়ে বেড়াই গর্বের সাথে। তোর দেওয়া ভালোবাসার ক্ষতও না হয় সেই গর্বের অংশ হোক।"

নূরাইসা মুখ ঘুরিয়ে নিলো। মুহূর্তেই চোখে অশ্রু জমে উঠলো। যেদিন সে ইলহানের ঘরে এসেছিল, বিয়ে করবে না সেটা বলতে, সেদিনই দেখেছিল পিঠজুড়ে গভীর ক্ষতচিহ্ন, ছু রি র আ ঘা ত, না জানি আরও কত নির্দয় আ ঘা তের স্মৃতি। এত ব্যথা সহ্য করেও মানুষটা কষ্ট পায় না, তবুও সেই আর্মিতেই ফিরে যেতে হবে তাকে, দায়িত্বের টানে, কর্তব্যের ডাকে। আর্মির প্রতি তার ভালোবাসা যেনো নেশার মতো, রক্তে মিশে থাকা এক উন্মাদনা। জান-প্রাণ সবকিছুতেই আর্মির অস্তিত্ব। সেখানে না যেতে পারলে ইলহান যেন জীবিত থেকেও মৃ ত হয়ে যাবে।

এ কথা ততটাই সত্য, যতটা নিশ্চিতভাবে প্রতিদিন সূর্য উদিত হয়।

নূরাইসা ভাঙা কণ্ঠে বলল—

-"থাকবো না আপনার সাথে আমি আর।"

ইলহানের তবু কোনো হেলদোল নেই। একটুও নয়।

সে আবারও নূরাইসার বক্ষপিঞ্জরে মুখ গুঁজে দিয়ে হালকা স্বরে বলে উঠলো—

-"ডিভোর্স দিবি? দে, সমস্যা নেই!"

নূরাইসা অবাক হয়ে গেলো। মুখ ঘুরিয়ে তাকালো ইলহানের দিকে, যে তার বুকে মাথা রেখে তাকিয়ে আছে তারই দিকে, অধরে দুষ্টু হাসি লেপ্টে আছে সেই চেনা ভঙ্গিতে। ইলহান তার দৃষ্টি দেখে মুচকি হেসে বলল—

-"কাবিন হিসাবে তো এই নুহান ইলহান দেওয়ানকেই পাবি। তাহলে আর ডিভোর্স দিলেই কি, না দিলেই কি, তোকে থাকতে তো হবে আমার সাথেই।"

নূরাইসার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। কি ধুরন্ধর লোক ভাবা যায়! এইসব সে আগেই জানতো, আর তাই চালাকি করে কাবিননামায় সেইভাবে লিখেছে। নূরাইসা এবার দুঃখে কষ্টে কেঁদেই ফেলল। কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বলল—

-"খারাপ লোক, বজ্জাত লোক! আপনি আগে থেকেই জানতেন এমন পরিস্থিতি আসবে, আর তাই চালাকি করে ঐভাবে কাবিন করেছেন!"

ইলহান এবার শব্দ করে হেসে ফেললো। নূরাইসা তা দেখে চোখের পানি মুছে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল—

-"সরুন , উঠুন! আমি থাকব না এই ঘরে, এখনই চলে যাব আমার ঘরে, সরুন!"

নূরাইসা কথাগুলো বলতে বলতে ইলহানকে উঠানোর জন্য ঠেলল। দুর্বল নূরাইসা এক চুলও নড়াতে পারল না ইলহানকে। উল্টো ইলহান আরও শক্ত করে তাকে ধরে বলল—

-"রাগারাগি কর, আমাকে মার, যা খুশি কর, কিন্তু এই ঘরের মধ্যে থেকেই করতে হবে। এই ঘরের বাইরে যাওয়ার কথা আজ বলেছিস, দ্বিতীয়বার যেন মুখ দিয়ে না বের হয় সেই শব্দ। আমি যতই খারাপ হই না কেন, তোকে আমার সঙ্গেই থাকতে হবে, আর এই ঘরেই থাকতে হবে।"

নূরাইসা ফুপিয়ে উঠলো। সারাদিন না খাওয়ায় শরীর ক্লান্ত, মন আরও বেশি। তারওপর এত কিছু হয়ে গেছে, ভেতরে ভাঙা অনুভূতি, অজানা কষ্ট, পুরনো স্মৃতির ছায়া, সব মিলিয়ে তাকে স্তব্ধ করে রেখেছে। আর কিছু বলার বা করার শক্তি তার নেই। শুধু ফুপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে, নিঃশব্দ, একাকী।

ইলহান আজ বাধা দিলো না। কাঁদতে দিলো। চুপচাপ, কিছু বলতে না পারা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। একটা মুহূর্ত মনে হলো, সময় থেমে গেছে, শুধু তাদের দু’জন এবং নীরবতার ভার রয়ে গেছে।

সে সত্যিই চায়নি নূরাইসা এভাবে সব জেনে যাক। এই ভীতু মেয়েটিকে সামলানো বা বোঝানো সহজ নয়, যেমন ভীতু, তেমন জেদি। রাগও আছে, তবে সবসময়, সব জায়গায় সেটা প্রকাশ পায় না। অন্তরে যেন দানা বাঁধা ঝড়, যা কখনো কখনো চুপচাপ চোখে ভেসে ওঠে।

আকাশ নীল অন্ধকার, দূরে বৃষ্টি হতে পারে এমন গন্ধ। বাতাসে আর্দ্রতা, ঘরের ভেতরের ভারী নিঃশ্বাস, সবই মিলিয়ে এই মুহূর্তকে আরও ঘন করে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প