সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ১৭

🟢

আফরিন পথে এক অসুস্থ বৃদ্ধাকে ধরে টলতে টলতে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিল। বৃদ্ধা হাঁটতে পারছেন না, পা কাঁপছে, নিঃশ্বাস কেমন যেন ছুটছে। তাই আফরিন ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে এগোচ্ছিল। রাস্তা পার হতে বেশ সময় লাগছিল। আজকের দিনটা অদ্ভুতভাবে নির্জন, যেন শহর হঠাৎ থেমে গেছে। কিছু কেনাকাটা করতে বের হয়েছিল আফরিন, ফেরার পথে একটু শান্ত রাস্তা বেছে নিয়েছিল নিজের মতো করে হাঁটার জন্য। আর সেই নিরিবিলি পথেই পড়ে থাকতে দেখে এই বৃদ্ধাকে। করুণ মুখ, কাঁপা হাত, ক্লান্ত চোখে অনুনয়। আফরিন থেমে যায়, তাকে ধরে উঠায়, ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে। জিজ্ঞেস করছিল, "মা, কিভাবে পড়লেন? শরীর খারাপ কবে থেকে?" বৃদ্ধা উত্তর দিতে পারছিলেন না। তবুও আফরিন কথা বলেই যাচ্ছিল, যেন শব্দের উষ্ণতায় তাকে সাহস দিচ্ছে।

রাস্তা এত ফাঁকা দেখে মনে হচ্ছিল যেন এই শহরের বাতাসও তাদের জন্য থেমে আছে। হঠাৎই কোথা থেকে এক তীব্র গর্জন! আফরিনের হৃদয় যেন গলার কাছে উঠে এলো। তার পাশে দাঁড়ানো বৃদ্ধা কাঁপতে লাগলেন, বৃদ্ধা থাকায় আফরিন সরে যেতে পারলো না। চোখে পড়লো কালো গাড়ির চকচকে বডি, যেন রাত্রির বুক চিরে আগুন ছুঁড়ে এসেছে কোনো দানব। আফরিন চোখ শক্ত করে বন্ধ করে নিলো, ভাবলো, এটাই শেষ। কিন্তু কোনো আঘাতের ব্যথা অনুভব হলো না। কালো এক মার্সিডিজ ঝড়ের বেগে ছুটে আসছিল, তাদের সামনে এসে এক ঝটকায় ব্রেক কষলো। চাকার ঘর্ষণে ধুলো উড়ে গেল, বাতাস থেমে গেল এক মুহূর্তে। আফরিন ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই দেখলো, গাড়িটি তার সামনে থেমে আছে। পিছন থেকে আরও পাঁচ-ছয়টা গাড়ি এসে সারি বেঁধে দাঁড়ালো। প্রতিটি গাড়ি থেকে নেমে এলো কালো পোশাক পরিহিত লোক, সবাই লম্বা, প্রশিক্ষিত, চোখে গম্ভীর দৃষ্টি। মুহূর্তেই পুরো রাস্তা ভরে গেল তাদের পদচারণায়। বাতাসে যেন এক ধরনের ভারী উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।

আফরিনের বুক ধকধক করছে, কিন্তু মুখে ভয় নেই, বরং ক্রোধ। ফর্সা মুখে রক্ত জমে গিয়ে নাকের পাটা লাল হয়ে উঠেছে। সে বৃদ্ধাকে আলতো করে রাস্তার পাশে বসিয়ে রেখে হনহন করে এগিয়ে গেল সেই কালো মার্সিডিজের দিকে। প্রতিটি পদক্ষেপে তার চোখে ঝলসে উঠছিল অগ্নি। গিয়ে থামলো গাড়ির সামনে, একদম কাছাকাছি। একটু ঝুঁকে দরজার কাচে টোকা দিল, টোক, টোক।

মুহূর্তেই এক বডিগার্ড ছুটে এলো। স্যুট-টাই পরা, চওড়া কাঁধ, গলায় ওয়্যারলেস। দক্ষ ভঙ্গিতে সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল—

-"ম্যাম, আপনি দয়া করে সরে দাঁড়ান। কি হয়েছে ম্যাম? আমাকে বলুন, স্যারকে ডাকার প্রয়োজন নেই।"

বডিগার্ডের গলায় ছিল বিনয়, কিন্তু মুখে ছিল আতঙ্কের ছাপ।

আফরিন রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো তার দিকে, দৃষ্টি এমন যে, তাতে আগুন ঝলসে ওঠে। লোকটি চুপসে গেল সেই এক দৃষ্টিতেই, যেন নিজের অস্তিত্বই মুছে ফেলতে চাইল মুহূর্তে। আফরিন আবারও গাড়ির কাচে টোকা দিল, একবার, দু’বার, তবুও কোনো সাড়া নেই। তার ধৈর্য ফুরিয়ে এলো। চোখের ভেতর ক্ষোভ জমে আগুনের মতো দাউ দাউ করছে। এবার বেশ জোরেই টোকা দিল, টোক! টোক!

একটা নরম ক্লিক শব্দে গাড়ির দরজা খুলে গেল।

আর বেরিয়ে এলো এক পুরুষ, অভিজাত, শান্ত, অথচ তার উপস্থিতিতেই চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।কালো প্যান্ট, সাদা শার্টের ভেতর হালকা ভাঁজ পড়া, কনুই পর্যন্ত হাতা গুটানো, নিখুঁতভাবে গোঁজা শার্টের নিচে দৃঢ় বুকের রেখা স্পষ্ট। চুল কালো, কুচকুচে, হালকা এলোমেলো, যেন বাতাস তার সঙ্গ চায়। আর সেই চোখ, গভীর নীল, শীতল অথচ ধারালো। সে গাড়ি থেকে নামতেই আফরিন একটু সোজা হয়ে দাঁড়ালো।মুখে অগ্নি, গলায় সাহস। চোরা, তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল—

-"দেখে গাড়ি চালাতে পারেন না? এত বড় ফাঁকা রাস্তায় দুজন মানুষ আপনার চোখে পড়ল না?"

পুরুষটি তার দিকে তাকিয়ে এক পা এগিয়ে এলো।ঠোঁটের কোণে অল্প এক হাসি, কিন্তু তাতে ছিল অভিজাত ঔদ্ধত্যের ছোঁয়া। রাশভারী কণ্ঠে বলল—

-"পড়ার মতো হলে, অবশ্যই পড়ত।"

বাতাস থেমে গেল এক মুহূর্তে। আফরিনের চোখে জ্বলে উঠল নতুন এক আগুন। তার গলার স্বর কেঁপে উঠল রাগে, তবুও দমে গেল না—

-"ফাজলামো করছেন আমার সাথে আপনি? দু’জন জলজ্যান্ত মানুষ আপনার চোখে পড়ল না?"

পুরুষটি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, যেন আফরিনের ক্রোধের আগুনে নিজেই শান্তি খুঁজে পাচ্ছে।

-"বললাম তো, দেখার মতো না তাই দেখি নি!"

পুরুষটির কণ্ঠে ছিল একধরনের ঠান্ডা ঔদ্ধত্য। যেন ক্ষমা নয়, চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। আফরিনের ভেতরে রক্ত ফুঁসতে শুরু করল। ক্ষুব্ধ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল সে—

-"নিজের সেফটির জন্য ছ’ছটা গাড়ি ভর্তি বডিগার্ড নিয়ে ঘুরছেন, অন্য মানুষকে আহত করার জন্যই কি নেমেছেন রাস্তায়? এই আপনাকে গাড়ি চালানো কে শিখিয়েছে, হ্যাঁ? লাইসেন্স আছে আপনার? কোন গর্দভ আপনাকে লাইসেন্স দিয়েছে?"

পুরুষটির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে তীক্ষ্ণ রেখা। রূঢ় কণ্ঠে বলল—

-"আওয়াজ নিচে নামাও। কার সাথে কথা বলছো, জানো?"

আফরিন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াল, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।

-"কোনো বড়োলোক বাপের বিগড়ে যাওয়া সন্তান, যে নিজের পরিচয়টাই জানে না।"

পুরুষটি এবার সত্যিই ক্ষিপ্ত হলো। মুখ লাল, চোখে নীল আগুন জ্বলছে। উচ্চশব্দে বলে উঠলো—

-"ইউ! মুখ সামলে কথা বল, মেয়ে! তুমি জানো না কে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে!"

আফরিন ঠান্ডা, নির্লিপ্ত গলায় বলল—

-"পাবনা থেকে পালিয়ে আসা এক পা গ ল লোক!"

কথাটা যেন তীরের মতো গিয়ে বিঁধল তার অহংকারে। পুরুষটি এক ঝাঁকুনিতে সামনে তেড়ে এলো, কিন্তু তার আগেই পাশে থাকা সেই স্যুট-টাই পরিহিত লোকটি তাড়াতাড়ি এসে তাকে থামিয়ে দিল। বোঝানো সুরে বলল—

-"স্যার, ঠান্ডা হন! এটা পাবলিক প্লেস!"

সুদর্শন পুরুষটি গভীর শ্বাস নিতে লাগল, ঘন ঘন, ভারী, উত্তপ্ত। চোয়াল শক্ত, হাত মুষ্টিবদ্ধ। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, নিজেকে সামলাতে কষ্ট হচ্ছে। ঠিক তখনই সেই স্যুট পরা লোকটি, শান্ত গলায়, সামান্য এগিয়ে এসে বলল—

-"আমি ওনার অ্যাসিস্ট্যান্ট, আশিক। ম্যাম, আপনাদের তো কোনো ক্ষতি হয়নি। তাই দয়া করে এই ব্যাপারটা এখানেই শেষ করি।"

আফরিনের চোখে ঝিলিক খেল। একবার তাকালো সেই কালো মার্সিডিজের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুদর্শন পুরুষটির দিকে, তার নীল চোখের দৃষ্টি এখনও বিদ্ধ করছে বাতাসকে। তারপর শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে আশিকের দিকে তাকিয়ে বলল—

-"ফাঁকা রাস্তা মানে অবাধ গতি নয়। আপনার স্যারকে বলবেন, মানুষের জীবনের দামে যেন নিজের তাড়াহুড়ো না মাপে।"

বলেই উল্টো ফিরে সেই বৃদ্ধার দিকে এগিয়ে গেল আফরিন। তার মুখে তখনো রাগের ছাপ, কিন্তু চোখে ছিল এক অদ্ভুত কোমলতা, যেন ক্রোধের ভেতরও মানবতার আলো নিভে যায়নি। লোকটি আড়চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে, তারপর আশিককে হালকা ইশারা করল। আশিক সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত এগিয়ে এসে বিনয়ী কণ্ঠে বলল—

-"আপনারা কোথায় যাবেন, ম্যাম? চলুন, আপনাদের নামিয়ে দিচ্ছি।"

আফরিন না বলতে মুখ খুলেছিল, কিন্তু তার আগেই বৃদ্ধা হালকা ক্লান্ত হাসি দিয়ে বলল—

-"চলো না মা, গাড়িতেই কইরা যাই। আমার ঠেঙ্গ আর চলতাছে না রে!"

অগত্যা আফরিন আর কিছু বলল না। অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাথা নাড়ল। বাধ্য হয়েই তাদের সঙ্গে গাড়িতে উঠতে হলো। বাকি গাড়িগুলোতে জায়গা না থাকায় শেষমেশ উঠতে হলো সেই পুরুষের গাড়িতেই, যে পুরুষটির সঙ্গে কিছুক্ষণ আগেই তার ঝড়-বৃষ্টি বয়ে গেছে চোখের ভাষায়।

গাড়ি নীরব। ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ ছাড়া যেন কিছুই নেই। আফরিন পাশের সিটে বৃদ্ধাকে ধরে বসে আছে, আর লোকটি সামনের দিকে তাকিয়ে, একদৃষ্টে রাস্তা দেখছে। মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু তার চোখে মাঝে মাঝে পড়ছে আফরিনের প্রতিচ্ছবি। অবশেষে গাড়ি এসে থামল একটি হাসপাতালের সামনে। দরজা খুলে বাইরে নামল আশিক আর সেই পুরুষটি। আফরিন বৃদ্ধাকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল। ডাক্তার দেখানো, টেস্ট করানো, ওষুধ কেনা, সবকিছু নিজ হাতে করে দিল আফরিন। বৃদ্ধার হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে নরম গলায় বলল—

-"চলুন মা, এখন আপনি বাসায় যান। নিয়ম করে ওষুধ খাবেন।"

বৃদ্ধা চোখে জল নিয়ে আশীর্বাদ করলেন—

-"আল্লাহ তোর মঙ্গল করুক মা।"

বলে ধীরে ধীরে হেঁটে চলে গেলেন। আফরিন হাসি মুখে তাকিয়ে রইল তার পেছনে। সেই হাসিতে ছিল তৃপ্তি, মমতা, আর এক অচেনা শান্তি। দূরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল সেই পুরুষ আর আশিক। আশিকের কপালে ঘাম জমেছে, সে বুঝতে পারছে না, নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাহলে স্যার এখনো কেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ভয়ে কিছু বলার সাহস পেল না আশিক।

আফরিন ঘুরে তাদের দিকে এগিয়ে এল। মুখে সৌজন্যময় হাসি, চোখে স্থির আত্মবিশ্বাস। বলল—

-"ধন্যবাদ আপনাদের। উনি খুব অসুস্থ ছিলেন, রিকশাও পাচ্ছিলাম না। হেঁটে আসলে অনেক দেরি হয়ে যেত। ধন্যবাদ, মিস্টার...?"

পুরুষটি ধীরে পকেট থেকে হাত বের করল, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি। রাশভারী কণ্ঠে বলল—

-"এমিরান রাহাফ।"

আফরিন কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল তার দিকে, চোখে সেই একই অহংকার, কিন্তু তাতে যেন এখন এক অদ্ভুত সংযমের ছায়া। তারপর হালকা মাথা নত করে বলল—

-"আফরিন।"

আফরিন হালকা এক হাসি ফুটিয়ে বলল—

-"ধন্যবাদ, মিস্টার এমিরান রাহাফ। আসি তাহলে। নেক্সট টাইম আর এমন রাফ ড্রাইভ করবেন না।

বলার ভঙ্গিটা ছিল ভদ্র, কিন্তু চোখে যেন তির্যক এক সতর্কতা। দু’জনের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য একে অপরের মধ্যে গেঁথে গেল, একটি দৃষ্টিতে আগুন, অন্যটিতে বরফ। তবুও কোথাও যেন একই তাপমাত্রায় গলে গেল চারপাশের বাতাস। কথা শেষ করেই সে ঘুরে হাঁটা দিল। কাঁচের দরজা ঠেলে হাসপাতালের ভেতরের আলোতে মিলিয়ে গেল তার ছায়া।

এমিরান স্থির দাঁড়িয়ে রইল। চোখে এক অচেনা ঝিলিক, ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি। তার দৃষ্টি যেন গলে গিয়ে পড়ল আফরিনের হাঁটার পায়ের শব্দে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীরে, গভীর কণ্ঠে বলল—

-"সব ডিটেইলস খুঁজে বের করো, আশিক। এই মেয়েটা আমার লাগবে।"

আশিক হতভম্ব হয়ে তাকাল তার স্যারের দিকে। অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলল—

-"স্যার, এই মেয়ে তো আপনাকে অপমান করেছে! তাহলে তাকে লাগবে মানে?"

এমিরান চোখে তখনো সেই দৃষ্টি, যেখানে অহংকার, আগ্রহ আর বিস্ময় একসাথে জ্বলে উঠেছে। ঠোঁটের কোণে অল্প এক হাসি টেনে বলল—

-"জীবনে প্রথম কোনো মেয়ে আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলেছে... সাহসের আগুনে আমাকে অপমান করেছে!"

তার কণ্ঠ ভারী, কিন্তু তাতে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

-"সাহস আছে, বলতে হবে মেয়েটির। আর এমিরান রাহাফের পাশে... এমন এক সাহসী মেয়েই তো প্রয়োজন।"

আশিক নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল। বাতাসে তখনো ভাসছে আফরিনের গলার নরম কন্ঠস্বর, আর এমিরানের চোখে অদ্ভুত এক ঝড়, যে ঝড় থেমে থাকলেও বুঝে নেওয়া যায়, তার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন শুধু আফরিন।

বিজ্ঞাপন

.

আজ ইলহান নিজে নূরাইসাকে ভার্সিটিতে নামিয়ে দিতে এসেছে। অনেকদিন হলো, সে নূরাইসাকে ঠিকমতো সময় দিতে পারছে না। হঠাৎ হঠাৎ রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে যেতে হয় তাকে, কোনও ব্যাখ্যা ছাড়াই। নূরাইসার মন অজানা চিন্তায় ভারী হয়ে থাকে। ইলহান নূরাইসার চিন্তা, ভয় বাড়াতে চায় না বলে সত্য বলতেও পারছে না।

গাড়ির ভেতর নীরবতা ঝুলে আছে নিঃশব্দ ঘণ্টার মতো। কাঁচের বাইরে রোদ হালকা কুয়াশায় মিশে গেছে, বাতাসে মেঘের গন্ধ। নূরাইসা চুপচাপ বসে আছে, জানলার বাইরে তাকিয়ে। ইলহান একবার চোখ বুলিয়ে নিলো তার মুখে, তারপর দৃষ্টি ফের রাস্তায় স্থির রেখে বলল—

-"রাগ করেছিস?"

নূরাইসা ধীরে মাথা তুলল। চোখে ক্লান্ত মৃদু আলোর ছোঁয়া। সে শান্ত গলায় বলল—

-"কি নিয়ে রাগ করব?"

এখন আর ইলহানকে আগের মতন ভয় পায় না নূরাইসা। সেদিনের রাতের পর থেকে তার ভয়টা অনেকটা কমে গিয়েছে,তবে লজ্জাটা যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ইলহান গাড়ির গিয়ার বদলাতে বদলাতে বলল—

-"তোকে সময় দিতে পারছি না বলে!"

নূরাইসা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো। বাতাসে তার হিজাবের কোন উড়ছে, সে শুধু বলল—

-"না।"

এই ‘না’ শব্দের ভেতর যে অভিমান ছিল, তা ইলহান খুব ভালো করেই শুনতে পেল। গাড়ি এসে থামলো ভার্সিটির গেটের সামনে। ইলহান এক দম গভীর শ্বাস নিল, তারপর নিচু গলায় বলল—

-"I’m sorry, নূরেজান... আমি ইচ্ছে করে এমন করছি না, বিশ্বাস কর। দু’টো অফিসের পেন্ডিং কাজ গুলো সামলাতে সত্যি বেশ বেগ পেতে হচ্ছে আমাকে।"

নূরাইসার ঠোঁট কেঁপে উঠল। মনে মনে কত কথা জেগে উঠল—

-"গভীর রাতেও নিশ্চয়ই অফিসের কাজ থাকে?"

কিন্তু সেই কথাটা গলার কাছে এসে থেমে গেল। কিছুই বলল না সে। শুধু আলতো কণ্ঠে বলল—

-"আমি বুঝি।"

তার কণ্ঠে ছিল বোঝার ভান, অথচ চোখের গভীরে জমে ছিল এক অদ্ভুত নীরব বেদনা। ইলহান তাকিয়ে রইলো তার দিকে, নূরাইসার মুখে পড়ে থাকা আলো-ছায়ার খেলায় সে বুঝতে পারলো, বোঝা মানেই ক্ষমা নয়। গাড়ির ভেতর বাতাস থমকে গেল, যেন সময়ও থেমে শুনছে দু’জনের না বলা কথাগুলো।

নূরাইসা গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। হালকা বাতাসে তার ওড়না দুলে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে ইলহানও দরজা খুলে নামলো। নূরাইসা দ্রুত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছিল গেটের দিকে, তখনই ইলহান তার হাত টেনে থামিয়ে নিল। মুহূর্তের মধ্যে নূরাইসা এসে দাঁড়ালো ইলহানের ঠিক সামনে। চারপাশের ভিড় যেন হঠাৎ নিঃশব্দ হয়ে গেল।ইলহান একটাও কথা না বলে তার কপালে আলতো করে অধর ছুঁইয়ে দিলো। সেই ছোঁয়া ছিল নরম, কিন্তু তার ভেতরে যেন হাজার কথা, হাজার ক্ষমাপ্রার্থনা লুকিয়ে ছিল। নূরাইসা চোখ বন্ধ করে নিল, হৃদস্পন্দন কানে বাজতে লাগলো, সময় থেমে গেল যেন।

ইলহান কপাল থেকে মুখ সরিয়ে গভীরভাবে তাকালো নূরাইসার মুখের দিকে। মৃদু কণ্ঠে, ভারী অথচ কোমল সুরে বলল—

-"তোর সব অভিযোগ, সব অভিমান আমি ভাঙব নূরেজান... একটু সময় দে আমাকে। কথা দিচ্ছি, আর কোনোদিন তোকে অভিযোগ করার সুযোগ দেব না।"

শব্দগুলো যেন নূরাইসার বুকের ভেতর নরম ঢেউ তুলল। হঠাৎই নূরাইসার কি হলো কে জানে, সে এগিয়ে এসে ইলহানকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। তার মাথাটা গিয়ে ঠেকলো ইলহানের বুকপকেটে, যেখানে ইলহানের হৃদস্পন্দন ছন্দের মতো বেজে চলেছে।

রাস্তায় চারপাশে মানুষ ছিল, নূরাইসা যেনো সব ভুলে গেল। যেন পৃথিবীতে শুধু দু’জন মানুষই আছে, সে আর ইলহান। ইলহান তার হিজাবের ওপর দিয়ে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত কোমলতা, গভীর আশ্বাসের সুর—

-"অপেক্ষা করবেন... নিতে আসব আমি।"

বাতাস থেমে গেল, রোদ পড়লো তাদের ওপর হালকা সোনালি ছায়া হয়ে। নূরাইসা চোখ বন্ধ রেখেই শুনলো ইলহানের হৃদয়ের শব্দ, সেই শব্দের ভেতরেই যেন মিশে ছিল প্রতিশ্রুতি, ভালোবাসা, আর এক অসমাপ্ত গল্পের শুরু।

.

নূরাইসা, ফারাহ্, মেঘ আর স্মৃতি, চারজনের হাসি-আড্ডায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো ক্যাম্পাসের সবুজ ঘাসের চত্বর। বিকেলের কোমল রোদে ঝলমল করছে তাদের চুলের ডগা, হাতে রঙিন কাগজে মোড়ানো ঝালমুড়ির ঠোঙা। কেউ চামচ দিয়ে খাচ্ছে, কেউ আবার আঙুল ডুবিয়ে একে অপরের মুখে দিচ্ছে। হালকা হাওয়ায় মেঘের হাসির শব্দ মিশে যাচ্ছে পাখির ডাকে।

এই প্রাণচঞ্চলতার মাঝেও নূরাইসা একটু পর পর ফোনটা হাতে তুলে দেখছে। স্ক্রিন জ্বলে নিভে যাচ্ছে, কিন্তু তার চোখে এক অদ্ভুত প্রতীক্ষার ছায়া।

ফারাহ্ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল—

-"এত বার ফোন চেক করছিস কেনো, হুঁ?"

নূরাইসা চমকে তাকালো, অন্যমনস্ক ছিল সে। মুখে হালকা হাসি এনে বলল—

-"না, এমনি।"

ফারাহ্ কৌতূহল মেশানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—

-"ভাইয়ার মেসেজের অপেক্ষা করছিস?"

নূরাইসা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। কণ্ঠে একরাশ কোমলতা—

-"নিতে আসবে বলেছিল... এখনো এলো না, তাই..."

পাশে বসা মেঘ মুখে ঝালমুড়ি নিয়ে বলল—

-"তুই ফোন করে নে না? সমস্যা কোথায়?"

নূরাইসা নিচু স্বরে বলল—

-"যদি ব্যস্ত থাকে? রাগ করে যদি..."

তার গলায় যেন একটা ভয়, এক চিমটি অনিশ্চয়তা।স্মৃতি এক চিলতে দুষ্টুমি মেশানো হাসি হেসে ফোনটা টেনে নিল নূরাইসার হাত থেকে।

-"তোকে কিছু বলতে হবে না!" বলেই দ্রুত নম্বর টিপে দিল ইলহানের।

-"নে, ধর! আমি কল করে দিয়েছি।"

নূরাইসা থমকে গেল। বুকের ভেতর ধকধক শব্দ যেন বাইরের পৃথিবীর আওয়াজ ঢেকে দিল। কাঁপা হাতে ফোনটা কানে ধরল সে। কয়েকবার রিং বেজে উঠল, এক, দুই, তিন... প্রতিটি রিং যেন তার হৃদস্পন্দনের সাথে তাল মেলাচ্ছে। তারপর হঠাৎ ওপার থেকে ভেসে এলো এক গম্ভীর, রাশভারী কণ্ঠ—

-"হ্যালো?"

এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে গেল। বাতাসও যেন স্তব্ধ। নূরাইসার বন্ধুরা নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে আছে। নূরাইসার কণ্ঠ কেঁপে উঠল, এক অচেনা সঙ্কোচ, একরাশ অভিমান মিশে আছে তাতে। সে নিঃশব্দে বলল—

-"কখন আসবেন?"

ওপাশ থেকে ইলহানের গম্ভীর, তাড়াহুড়োর সুর ভেসে এলো—

-"মিটিংয়ে আছি!"

এক মুহূর্ত থেমে নূরাইসা নিঃশব্দে বলল—

-"আচ্ছা... আমি একাই চলে যাব তাহলে।"

ইলহানের কণ্ঠ কোমল হলো। যেনো অনুশোচনা হচ্ছে। কোমল কন্ঠে বলল—

-"গাড়ি পাঠাই?"

নূরাইসা হালকা নিঃশ্বাস ফেলে উত্তর দিল—

-"না, প্রয়োজন নেই। ফারাহ্ যাবে সাথে।"

বলেই কলটা কেটে দিল। একটুখানি নীরবতা নেমে এলো চারপাশে। নূরাইসার মুখটা যেন হঠাৎই মলিন হয়ে গেল, চোখে ক্লান্তির ছায়া, ঠোঁটে এক নিঃশব্দ হাসি, যেটা কেবল কষ্টের পর্দা টেনে রাখার জন্যই জন্ম নেয়। চারপাশের মেয়েরা কিছুই জিজ্ঞেস করল না। সবাই বুঝে গেছে, কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে বড় সমবেদনা।

পরিবেশটা ভারী হয়ে উঠেছিল। তাই হঠাৎই ফারাহ্ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল—

-"এই মুডটা চলবে না, একটু গান গাই।"

আর সাথে সাথেই সে গাইতে শুরু করল চেনা হাস্যরসের সুরে—

-"যখন বন্ধুর স্বামী ছিল না, তখন ছিলাম আমি...

এখন বন্ধুর স্বামী হয়েছে, পর হয়েছি আমি..."

ফারাহর কণ্ঠে গান ভেসে উঠতেই সবাই হো হো করে হেসে উঠল। হাসির ফাঁকে নূরাইসাও মৃদু হাসল, ফারাহর পিঠে আলতো একটা কিল বসিয়ে বলল—

-"তুই একদিন পাগল হয়ে যাবি!"

কিন্তু হাসির সেই দৃশ্যের পেছনে কেউ ছিল, দূর থেকে, অজানা এক কোণায় দাঁড়িয়ে ক্যামেরায় বন্দী করছে নূরাইসার প্রতিটি হাসি, প্রতিটি অভিব্যক্তি।

সে জানতেও পারল না, এই নিরীহ বিকেল, এই বন্ধুত্বের মুহূর্তই তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা লেখা হচ্ছে। এক ঝড় ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে, যার খবর এখনো নূরাইসার চোখে পৌঁছায়নি, কিন্তু ভাগ্য ইতিমধ্যেই কলমে লিখে ফেলেছে তার আগমনবার্তা।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প