আজ শাহজাদ তালুকদার বিহান-এর একত্রিশতম জন্মদিন। তারিখ আজ— ১০ নভেম্বর। চোখের পলকে কেটে গেছে কতগুলো মাস, কতগুলো দিন। আজকের দিনটা যেন বিহানের কাছে কেমন অচেনা লাগে। জন্মদিন পালন করার সামান্যতম ইচ্ছে তার কোনো দিনই ছিল না। না কোনো কেক, না কোনো হৈচৈ। তবুও বন্ধুদের আছে এক অদ্ভুত অভ্যাস, যে ট্রিট দিতে চায় না, তাকেই ট্রিট দিতে বাধ্য করে।
সব বন্ধু-বান্ধবের চাপ, ‘ট্রিট চাই ট্রিট!’ এই একটাই স্লোগান যেন পিছু নিয়েছিল বিহানের। শেষমেশ বাধ্য হয়েই সবাইকে নিয়ে এসেছে ধানমন্ডির এক চমৎকার বুফে রেস্টুরেন্টে। রেস্টুরেন্টের ঝলমলে আলোয় বন্ধুরা হাসছে, গল্প করছে, আড্ডার ফাঁকে কফির ধোঁয়া উড়ছে।
তাসিন, রায়েদ, আরিয়ান, আরিবা, ঈশান সবাই এসেছে। সবার কাছে তারা কেবল আর্মি ক্যাম্পে একসাথে থাকা বন্ধুরা ছুটিতে এসেছে ঢাকা। কিন্তু ঢাকায় ফেরার পেছনের রহস্য... এখনো অজানা সবার কাছে।
বিহান তার ছোট ভাই রিজভীকে নিয়ে এসেছে। রিজভী নুহার ক্লাসমেটও। রিজভী এক কোণে বসে আছে শান্তভাবে, মুখে অদ্ভুত এক ভাব, যেন কোনো অপেক্ষায় আছে। টেবিলগুলো ভরে গেছে বিহানের প্রিয় মানুষগুলোর হাসি-আড্ডায়। সাইমন, তার স্ত্রী সাথী। জাকারিয়া তার স্ত্রী আয়শা আর তাদের ছোট্ট ছেলে আয়মান। মুবিন পাশে বেলি। আর হেলেনা, তার স্বামী আরিফ, আর তাদের মিষ্টি মেয়ে জয়া। রাধা এসেছে, রুহিও উপস্থিত।
সবাইকে বিহান একে একে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
সবাই হাসছে, গল্পে মেতে আছে, তবুও বিহানের চোখ বারবার ঘুরে যাচ্ছে প্রবেশদ্বারের দিকে। কারণ এখনো দেওয়ান বাড়ির দিওয়ানারা আসেনি! তাদের ছাড়া যেন এই জমকালো সন্ধ্যা অসম্পূর্ণ। ঘড়ির কাঁটা ছুঁই ছুঁই করছে সাড়ে আটটা। বিহান বিরক্ত হয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিলো। ডায়াল করল এক নাম, ইলহান। কলটা ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো স্বভাবসুলভ রাশভারী কণ্ঠ—
-'হ্যাঁ, বলো বিহান বাবু।"
বিহান বিরক্ত স্বরে বলল—
-"সমস্যা কী? এখনো আসছিস না কেনো? সবাই বসে আছে, তোর জন্য অপেক্ষা করছে।"
ইলহান মুচকি হেসে জবাব দিলো, কণ্ঠে হালকা খুনশুটি—
-"দেওয়ান বাড়ির দেওয়ানীরা এখনো তৈরি হয়নি, তাই!"
বিহান চমকে উঠে হেসে ফেলল—
-"ওরা এখনো রেডি হয়নি?"
-"না ভাই!" ইলহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
-"তোর জানা উচিত, দেওয়ান বাড়ির মেয়েরা ঘড়ির সাথে নয়, মুডের সাথে তৈরি হয়। শুধু আমার বউ বাদে!"
-"ওরে বাবা, তাই নাকি!" বিহান হেসে বলল—
-"এই মুডওয়ালাদের সাথে জন্মদিন পালন করা মানে নিজের ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া!"
ইলহান ঠাট্টার সুরে বলল—
-"ধৈর্যের পরীক্ষা না দিলে সৈনিক কিসের? তুই তো আর্মির মানুষ, শিখিস নি এখনো?"
বিহান হেসে বলল—
-"তুই একবার ফোনে কথা শুরু করলে মনে হয় সিনেমা চলছে, ড্রামা, কমেডি, ট্র্যাজেডি সব একসাথে!"
ওপাশে ইলহানের হাসি শোনা গেল।
-"চিন্তা করিস না, দেওয়ান বাড়ির দেওয়ানীরা মেকআপ শেষ করলেই নামছি আমরা। আজকের রাতটা তোর নামে লিখে রাখিস, বিহান। এমন সারপ্রাইজ পাবি, স্মৃতিতে খোদাই হয়ে থাকবে।"
বিহান ফোন নামিয়ে নিলো, ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। রেস্টুরেন্টের আলো ঝলমল করছে, চারপাশে হাসির রোশনাই, কিন্তু বাতাসে আছে অজানা এক উত্তেজনা।
.
-"কিরে ভাই, বিয়ে লাগছে তোদের? এত সাজগোজ কেনো করছিস?"
আফরিনের ঘরে বসে তিনবোন তৈরি হচ্ছিল, আয়নায় আলো পড়ে যেন ঘরটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। হঠাৎ করেই রুহান দরজায় দাঁড়িয়ে সেই উচ্চকণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল। তিন ঘণ্টা ধরে তিন ভাই নিচে তৈরি হয়ে বসে আছে, অথচ এদের নামার নাম নেই! বিরক্তিতে, অস্থিরতায়, রাগে গজগজ করতে করতে রুহান ঢুকে পড়ল ঘরে।
আফরিন তখন ব্যস্ত নুহার মুখে তুলি ছোঁয়াতে, যত্নে যত্নে সাজাচ্ছে তাকে। নূরাইসা খাটের ওপর পা তুলে বসে আছে, হাঁটুর ওপর হাত রেখে তার ওপর মুখ ঠেকিয়ে সাজ দেখছে মুগ্ধ হয়ে। নুহা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে হালকা হেসে বলল—
-"আর একটু, এর পরই আসছি। তুমি যাও নিচে।"
রুহান ঝাঁঝিয়ে উঠল—
-"আর একটু মানে? তিন ঘণ্টা ধরে সাজছিস, এখনো কমপ্লিট না? এখনো চুলও বাধিস নি! এই বিয়ে নাকি তোর? বিয়ে করতে যাচ্ছিস? এত সাজের কি দরকার হ্যাঁ? যাচ্ছিস তো শুধু খেতে!"
আফরিন তখনো মনোযোগে নুহার গালে ব্লাশ দিচ্ছে। মুখে একরকম আত্মতৃপ্তির হাসি, চোখে দুষ্টু ঝিলিক। মাথা না তুলেই বলল—
-"তুমি বুঝবে না, যাও।"
রুহান কপাল কুঁচকে দাঁত চেপে বলল—
-"বল, শুনছি! আমি কেন বুঝব না হ্যাঁ?"
আফরিন হঠাৎ তুলি নামিয়ে রেখে দুই হাত নিজের গালের কাছে এনে বেশ ভাবুক ভঙ্গিতে চোখ উঁচু করে বলল—
-"আজ বিহান ভাইয়ের জন্মদিন। তাদের সব বন্ধু-বান্ধব আসবে।"
তার চোখে তখন রহস্যময় ঝিলিক, ঠোঁটে দুষ্টু হাসি।
সে একটু থেমে আবার বলল—
-"তাদের মধ্যে যদি কাউকে পটাতে পারি, তাহলে আজই আমরা দু’বোন বিয়ে করে নিবো! তাই এত সাজ!"
কথা শেষ হতেই ঘরে হাসির ঢেউ বয়ে গেল। নূরাইসা হেসে কাত হয়ে পড়ল, নুহার মুখে লজ্জার আভা ফুটে উঠল, রুহান মুহূর্তেই হতভম্ব হয়ে গেলো। চোখ বড় বড়, মুখ হাঁ, যেন বুঝে উঠতে পারছে না এরা সত্যিই কী বলল! পরক্ষণেই কপাল চাপড়ে বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে উঠল—
-"তোদের মাথার তার কি ছিঁড়ে গেছে? ওখানে উপস্থিত সবাই তোদের বয়সের দ্বিগুণ! তাদের বিয়ে করার শখ নিয়ে এত সাজছিস?"
তার কণ্ঠে রাগ, অবিশ্বাস, আর এক চিমটি হতাশার ছোঁয়া। আফরিন যেন শুনছেই না। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নুহার মুখে ব্রাশের হালকা ছোঁয়া দিচ্ছে। পাশে বসে নুহা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে লিপস্টিক ঠিক করতে করতে বলল—
-"বয়স কোনো বিষয় না রে ভাই! আপু ও তো ইলহান ভাইয়াকে বিয়ে করেছে, ওদের বয়সের পার্থক্যও কম না! বিয়েতে বয়স doesn’t matter, bro!"
শেষ কথাটিতে এমন এক আত্মবিশ্বাসী দুষ্টুমি লুকিয়ে, যা রুহানের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিলো। সে গভীর নিঃশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল। মুখে একরাশ পরাজয়ের হাসি নিয়ে বলল—
-"তোদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না!"
তারপর ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়াল। নিচে নামার পথে সিঁড়িতে এখনো শোনা যাচ্ছিল ওপরতলার মেয়েদের হাসির শব্দ, যেন তিন বোনের সাজগোজের ঘরটা এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাসে, বেপরোয়া স্বপ্নে আর চঞ্চল নারীত্বে ভরে গেছে।
.
রুহান নিচে এসে তানভীর ও ইলহানকে সব খুলে বলল। রুহানের কথাগুলো শেষ হতেই ইলহানের ঠোঁটে একরাশ সংযত হাসি ফুটে উঠল। চুপচাপ উঠে দাঁড়াল। চোখে সেই চেনা গম্ভীর দৃষ্টি, যেন ভেতরে কোথাও এক অজানা কৌতূহল খেলা করছে।সে ধীরে ধীরে ওপরে উঠে নিজের ঘরে গেল। দরজার কাছে গিয়ে হাক ছাড়ল—
-"নূরাইসা!"
নূরাইসা তড়িঘড়ি করে ছুটে এলো। পদধ্বনির সাথে সাথে তার শাড়ির পাড় মেঝেতে ছুঁয়ে যাচ্ছে, চুড়ির টুংটাং শব্দে ঘরটা মৃদু কেঁপে উঠছে। আজ তিনবোনই শাড়ি পরেছে, একই নকশার, তিন রঙে। আফরিন পরেছে হালকা গোলাপি, নুহা পরেছে নীলচে আকাশি , আর নূরাইসার গায়ে জ্বলছে গভীর মারুন রঙের শাড়ি।
সে আসলে পরতে চায়নি, কিন্তু দু’বোন মিলে জোর করেই তাকে পরিয়েছে।
ইলহান খাটের ধারে বসে আছে, পা দুটো ঝুলিয়ে, হাতে মোবাইল নিয়ে খেলছে উদাস মনে। দরজার শব্দে চোখ তুলে তাকাতেই থেমে গেল তার সমস্ত নড়াচড়া। তার দৃষ্টি নীরবে নূরাইসাকে স্ক্যান করলো, পা থেকে মাথা পর্যন্ত।
মারুন শাড়ির রঙে যেন তার গায়ের উজ্জ্বলতা আরও বেড়ে গেছে। হাতে মিলিয়ে পরা চুড়ি, ঠোঁটে লিপস্টিক, চোখে হালকা কাজল, সব মিলে এক অদ্ভুত সৌন্দর্যে মুগ্ধ করে তুলেছে তাকে। মাথায় ম্যাচিং হিজাব, হাতে ইলহানের দেওয়া সেই চিকন স্বর্ণের চুড়ি, নাক ফুল, আংটি, সব যেন আজ বিশেষভাবে উজ্জ্বল লাগছে।
নূরাইসা বুঝতে পারছিল ইলহানের দৃষ্টি তার গায়ে স্থির হয়ে আছে। বুকের ভেতর হঠাৎই এক অজানা কাঁপুনি জেগে উঠল। সে আর চোখ তুলে তাকাতে পারল না, দৃষ্টি নামিয়ে রাখল মেঝের দিকে। ঘরের বাতাস তখন নীরব, তবু ভারী, একটিমাত্র দৃষ্টি, আর নীরবতা, দু’জন মানুষকে শব্দহীন সংলাপে বেঁধে রেখেছে।
ইলহান ধীরে, ভারী পদক্ষেপে এগিয়ে এল নূরাইসার সামনে। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকে দেখল, আপাদমস্তক, যেন প্রতিটি নিঃশ্বাসে তাকে গিলছে চোখ দিয়ে। রুক্ষ অথচ গভীর মায়া-মাখানো পুরুষালি আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দিলো নূরাইসার চিবুক। চিবুকের নিচে আঙুল রেখে মুখটা আস্তে করে তুললো উপরে।
নূরাইসা চোখ মেলে তাকাতেই ইলহানের দৃষ্টিতে ঝলসে উঠলো এক অদ্ভুত তীব্রতা।
এক মুহূর্তের ব্যবধানেই ইলহান ডুবিয়ে দিলো নিজের গাঢ় পুরুষালি ওষ্ঠ নূরাইসার নরম কোমল অধরে।
চমকে উঠে নূরাইসা চোখ বন্ধ করলো। কাঁপতে থাকা হাত রাখলো ইলহানের বক্ষপটে, চেষ্টা করলো তাকে সরাতে। কিন্তু ইলহান যেন আরও গভীর আসক্তিতে তেতে উঠলো। এক হাত গিয়ে থামলো নূরাইসার কোমরে, অন্য হাতে জড়িয়ে ধরলো তাকে নিবিড়ভাবে।
যতটুকু দূরত্ব ছিল, সব মুছে গেলো এক নিঃশ্বাসে।
নূরাইসার দেহের কাঁপন আর ছটফটানি আরও প্রকট হলো, ইলহান ধীরে ধীরে তাকে ছেড়ে দিলো।
নূরাইসার গ্লোসি লিপস্টিক ছড়িয়ে গেছে, মারুন রঙ লেগে রইলো ইলহানের ঠোঁটে। সে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে, নিশ্বাস ভারী, চোখে এক অনুচ্চারিত বিস্ময়। ইলহান তার কানের কাছে মুখ নিয়ে নরম স্বরে ফিসফিস করে বলল—
-"বউ বউ লাগছে আপনাকে... বউজান।"
লজ্জায় নূরাইসার মুখশ্রী মুহূর্তেই রক্তবর্ণ হয়ে উঠলো। তার গালজোড়া যেন পাকা রক্তজবার পাপড়ি। ইলহান সেটা দেখে মৃদু হেসে বলল—
-"আমার কথায়, আমার স্পর্শে আপনি যখন লজ্জায় লাল হয়ে যান, তখন ঠিক ব্লাডমুনের মতো লাগে আপনাকে। সেই রক্তিম আভা, সেই নিঃশব্দ... মোহ যেন রাতের আকাশে জেগে ওঠে এক অলৌকিক সৌন্দর্য। খুন হয়ে যাই আমি তখন, এত সুন্দর বউ আমার।"
নূরাইসার মন চায় মাটির সাথে মিশে যেতে। লজ্জায়, সংকোচে, আর অদ্ভুত এক কাঁপন-জড়ানো আনন্দে ওর বুক দপদপ করছে। ইলহানের বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতেও পারছে না, তার পুরুষালি হাতের শক্ত গ্রাস কোমরে এখনো দৃঢ়।
ইলহান আবারও নূরাইসার নরম, কাঁপা ওষ্ঠ দু’টির দিকে উদ্যত হলো। ঠিক সেই মুহূর্তে, হঠাৎ করে ফোনটা বেজে উঠলো। অপ্রত্যাশিত শব্দে পুরো ঘরটায় যেনো এক অদ্ভুত ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো।
বিরক্ত মুখে ইলহান পকেট থেকে ফোনটা বের করলো। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই কপাল কুঁচকে গেলো, বিহান কল করছে।
মুহূর্তেই তার মুখের রঙ পাল্টে গেলো। চোখের কোণে জমে উঠলো বিরক্তি, ঠোঁটের কোণে জমে রাগের রেখা। কল ধরেই ঝড়ের মতো গর্জে উঠলো সে—
-"শ্লা! তোর সাথে আমার কোন জন্মের শত্রুতা রে? কী ক্ষতি করেছি আমি তোর? কেন বারবার আমার সর্বনাশ করছিস তুই?"
ওপাশে বিহান একদম ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। কণ্ঠে হতভম্বতার ছোঁয়া—
-"আমি আবার কী করলাম?"
ইলহানের গলা ভারী, রাগে কাঁপা। দাঁত চেপে, প্রতিটা শব্দ চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করল সে—
-"আমার অনাগত সন্তানদের আগমনে বেঘাট ঘটাছিস বারবার!"
কথাগুলো যেনো বজ্রাঘাতের মতো নেমে এলো ঘরের নিস্তব্ধতার ওপর। নূরাইসা বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেলো, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। ফোনের ওপাশে বিহান কিছুই বুঝতে পারলো না। ওপাশে শুধু বাতাসের আওয়াজ, তারপর ক্লান্ত গলায় বলল—
-"কী বলছিস বুঝতে পারছি না, তাড়াতাড়ি আয়।"
ইলহান দাঁত খিঁচে, চোখের পলকে আগুন জ্বেলে বলল—
-"তোর বাসর রাতে আমি আর্মি ফোর্স নিয়ে ঢুকবো, শ্লা!"
বলেই ফোনটা কেটে দিলো, যেনো পুরো পৃথিবীর ওপর রাগ উগরে দিচ্ছে। তারপর ঘুরে তাকালো নূরাইসার দিকে, যে তখনো অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ইলহানের গলায় এবার মৃদু অথচ গভীর সুর—
-"সবাইকে নিয়ে নিচে আয়।"
বলেই নিচে নেমে গেলো।
ঘরে কিছুক্ষণ নীরবতা। নূরাইসা স্থির দাঁড়িয়ে রইলো,
মাথার ভেতর সবকিছু যেনো গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। ধীরে ধীরে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো। ঠান্ডা পানিতে মুখ ধুয়ে নিলো, ভিজে গাল বেয়ে নেমে এলো কয়েক ফোঁটা পানি, যা যেনো লজ্জার আড়ালে লুকোনো আবেগের প্রতিচ্ছবি।
তারপর আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালো।
আলতো হাতে গ্লোসি লিপস্টিকটা ঠিক করলো, কাজল ঠিক করলো, নিঃশ্বাস সামলে নিলো। চোখে তখনো লজ্জার ছায়া, ঠোঁটে এক অনিচ্ছুক অথচ কোমল হাসি, যেনো সদ্য ফুটে ওঠা প্রেমের রঙে ভিজে আছে সমগ্র অস্তিত্ব।
ঘরের বাতাসে তখনো রয়ে গেছে ইলহানের উষ্ণ নিশ্বাসের গন্ধ, আর নূরাইসার হৃদয়ে, অজানা এক কাঁপুনি, অর্ধেক লজ্জা, অর্ধেক ভালোবাসা, যেনো প্রেমের গল্পটা মাত্র শুরু হয়েছে।
নিচে ইলহানের মুখের অবস্থা দেখে রুহান ও তানভীর পেটে হাত দিয়ে হাসিতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। হাসির শব্দে পুরো ঘর ভরে উঠলো। ইলহান বিরক্ত চোখে তাকিয়ে রইলো তাদের দিকে, রাগ লাগছে তার প্রচণ্ড।
বহু কষ্টে রুহান ও তানভীর নিজেদের সামলে নিলো। রুহান হাসি চেপে বলল—
-"ভাই, আজকাল কি ঠোঁটে লিপস্টিক দেওয়া শুরু করেছ নাকি?"
ইলহান ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল—
-"মানে?"
তানভীর এবার ফিসফিস করে হেসে বলল—
-"তোমার ঠোঁটে এত লিপস্টিক লেগেছে কেমন করে?"
ইলহান বিরক্তিতে নিঃশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ধীরপায়ে বেসিনের পাশে থাকা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। নিজের প্রতিবিম্বে তাকিয়ে তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। সত্যিই, ঠোঁটজুড়ে লিপস্টিকের দাগ, গালের পাশেও হালকা লালচে ছোঁয়া!
তবুও নির্লজ্জ ইলহানের মুখে লজ্জার ছিটেফোঁটাও নেই। বরং ঠোঁটের কোণে একরকম দুষ্টু হাসি খেলে গেল। সে ধীরে ধীরে টিস্যু তুলে ঠোঁট মুছে নিলো, তবু তার তামাটে মুখশ্রীতে সেই মিষ্টি লালচে আভা রয়ে গেলো অবিচল। ফিরে এসে রুহান ও তানভীরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল—
-"সিঙ্গেল মানুষ কি আর বুঝবে, বিবাহিত জীবনের মিষ্টি যন্ত্রণা কাকে বলে!"
ঘরে মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো। রুহান ও তানভীর দু’জনেই স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো ইলহানের দিকে, চোখে তাদের বিস্ময়, মুখে একরাশ অবিশ্বাস।
মনে হচ্ছিল, হাসি পেয়েও যেনো হাসতে ভুলে গেছে তারা, কারণ, ইলহানের মুখে সেই আত্মতৃপ্তি মেশানো চাহনি তাদের জন্য অপমান ছিল। কারণ তারা সিঙ্গেল, ইলহান তাদের কটাক্ষ করেই কথাটি বলল।
.
অবশেষে দেওয়ানবাড়ির দিওয়ানারা এসে পৌঁছালো। চারদিক কেমন যেনো উৎসবমুখর হয়ে উঠলো। হাসি, কোলাহল, গল্পের রেশে ভরে গেলো পুরো রেস্টুরেন্ট।
নুহা ও নূরাইসা, দু’জনেই পুরোনো মুখ। তাই তাদের আগমনেই বাতাসে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এলো। আফরিনের হাত ধরে নুহা একে একে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল।
অন্যদিকে ইলহানও রুহান ও তানভীরের সাথে নিজের পরিচিত অতিথিদের সঙ্গে বাকিদের পরিচয় করিয়ে দিতে ব্যস্ত। সবাই নূরাইসা ও ইলহানকে ঘিরে বসেছে, তাদের সংসার জীবন নিয়েই চলছে অগাধ কৌতূহলের আলাপ। হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠেছে সভা।
অন্যপ্রান্তে নুহাকে সবাই জ্বালাচ্ছে বিহানকে নিয়ে।
নুহা মুখে লজ্জার মুখোশ এঁটে রেখেছে, কিন্তু আসলে সে ভাইদের মতোই নির্লজ্জ। পার্থক্য শুধু এই, তার ঠোঁট কাটা নয়। লজ্জা না পেলেও লজ্জা পাওয়ার অভিনয়টা তার ভীষণ নিখুঁত। শুধু বিহানের সামনে গেলেই তার লজ্জার ডানা মেলে উড়ে।
সবাই যখন গল্পে মশগুল, তখন ইলহান হালকা হাসি দিয়ে নূরাইসাকে ডেকে নিলো নিজের আর্মি বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে। নূরাইসা এগিয়ে গেল, আর ইলহান এক মুহূর্তের দ্বিধা ছাড়াই হাত রাখল তার কোমরে।
দৃশ্যটা ছিল স্বাভাবিক, তবুও কারও চোখে সেটা অশান্তির ঢেউ তুলল। আরিবার। সে দূর থেকে তাকিয়ে রইলো, চোখে ঈর্ষার আগুন, ঠোঁটে বাঁকা হাসি। মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠলো। সহ্য হলো না। সে নিরবে সরে গেলো সেই ভিড় থেকে।
নূরাইসা একটু পর আর্মি বন্ধুদের সঙ্গে গল্প শেষ করে বোনদের কাছে ফিরে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই আরিবা তার পথ আটকে দাঁড়ালো। নূরাইসা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, চোখে হালকা বিস্ময়, ঠোঁটে প্রশ্নচিহ্ন।
আরিবা মাথা থেকে পা পর্যন্ত ওকে একবার চোখ বুলিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল—
-"সো টিপিকাল! তুমি তো খুব সাধারণ চেহারার।মনোহর নিশ্চয় পরিবারের চাপে পড়েই তোমাকে বিয়ে করেছে। আমাকে দেখো, আমি আধুনিক, আমি আর্মিতে চাকরি করি। একজন লে. কর্নেলের স্ত্রী হওয়ার উপযুক্ত যোগ্যতা আমার ছিল, এখনো আছে। অথচ তোমার মতো মেয়ে তার বউ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে!"
সে থেমে গভীর নিঃশ্বাস নিলো, তারপর চোখ সরাসরি নূরাইসার চোখে গেঁথে দিলো—
-"তুমি ইলহানের জীবনের দুর্বলতা, নূরাইসা। তোমার জন্যই সে বারবার বিপদে পড়বে। তুমি কখনোই তার সহযোদ্ধা হতে পারবে না। তুমি ওর যুদ্ধের বাঁধা, আফসোস!"
আরিবার কণ্ঠে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ ছিল, প্রতিটি শব্দ ধরলো ছুরির হয়ে নূরাইসার বুক ভেদ করে ঢুকে যাচ্ছে।চারপাশের কোলাহল মিলিয়ে গেল এক নিমিষে, থেমে গেল সময়ও, যেনো নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে এই দুই নারীর দিকে।
নূরাইসার বুকটা ধক করে উঠল। তার কি তবে কোনো যোগ্যতাই নেই ইলহান ভাইয়ের স্ত্রী হওয়ার? সে কি এতটাই সাধারণ? না কি সৌন্দর্যহীন? ভাবনার গভীরে ডুবে থাকা নূরাইসার কানে হঠাৎই ভেসে এলো সেই মিষ্টি অথচ বিষে মাখা কণ্ঠস্বর—
-"মনোহর প্রতিদিন রাতে কোথায় যায় জানো? তুমি জানবে কিভাবে, তুমি তো এসব বোঝো না। তাই ও তোমার সঙ্গে কিছুই শেয়ার করে না। কোনো কথাই না। আচ্ছা, তোমাদের মাঝে আসলেই স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্ক আছে তো? বিয়ের দুদিন পরই তো মনোহর আর্মিতে ফিরে গিয়েছিল। এখন তো, রাতে বাড়িতেই থাকে না..."
শেষ কথাগুলো ছুরির মতো কেটে গেল নূরাইসার হৃদয়ে। আরিবার চোখে তখন এমন এক বিদ্বেষের ছায়া, যেনো সে নূরাইসাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলতে চায়, তার প্রতিটি শব্দ যেন ইচ্ছে করে ছুঁড়ে দেওয়া বিষাক্ত তীর। বলে শেষ করেই আরিবা ঠোঁটের কোণে এক ব্যঙ্গাত্মক হাসি টেনে ধীরে ধীরে প্রস্থান করল।নূরাইসা স্থির দাঁড়িয়ে রইল। চোখের দৃষ্টি শূন্য, মন উথাল-পাথাল।
তার জীবনে এর আগে কেউ কখনো এমন কটু কথা বলেনি। সংবেদনশীল নূরাইসা তো কারও একটু রাগী স্বরও সহ্য করতে পারে না, আর আজ, কেউ প্রশ্ন তুলল তার যোগ্যতা, তার রূপ, তার স্ত্রী হিসেবে স্থান!
বুকের ভেতরটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অজান্তেই হাত চলে গেল বুকের কাছে, চোখের কোণে জমে ওঠা অশ্রু মুহূর্তেই গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। নীরব পায়ে ধীরে ধীরে চলে গেল সে, যেনো পৃথিবীর সব আলো তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
দূর থেকে ইলহান দাঁড়িয়ে দেখছিল সবকিছু। কপাল কুঁচকে গেছে তার, কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
শুধু দেখছে, নূরাইসা কেমন অস্থির পায়ে দূরে সরে যাচ্ছে। এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে ইলহানও ফেলে ছুটে গেল তার পিছু, যেনো বুকের ভেতর হঠাৎ এক অনির্বচনীয় অশান্তি জন্ম নিয়েছে।
.
রিজভী আর নুহা এতক্ষণ ধরে গল্পে মগ্ন ছিল। হাসির ফোয়ারা, আলাপের রেশে সময় কেটে যাচ্ছিল টেরই পাচ্ছিল না কেউ। কিন্তু নুহার মন যেন অন্যত্র, আসার পর থেকে তার একটাই সুযোগের অপেক্ষায়, বিহানকে একা পাওয়ার। আজ তার বলার আছে অনেক কথা,
মন খুলে, নির্ভয়ে, শুধু বিহানের সামনে।
কিন্তু বিহানকে তো এক মুহূর্তও একা পাওয়া যাচ্ছে না!
প্রতি দিকেই যেন মানুষ, হাসি, কথা আর আলো। হঠাৎ নুহার চোখ পড়ল বিহানের দিকে, ওয়েটারের সঙ্গে কথা বলছে সে, মুখে হালকা হাসি, চোখে আগ্রহের ঝিলিক। মুহূর্তেই নুহা উঠে দাঁড়ালো, রিজভীর দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি বলল—
-"অপেক্ষা করো, আমি আসছি!"
চঞ্চল পায়ে এগিয়ে এল সে, তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন এক অজানা উত্তেজনা। বিহানের সামনে এসে থামলো। বিহান অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে, তারপর ওয়েটারকে ইঙ্গিত দিলো চলে যেতে।
নুহা মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল—
-"আমাকে কেমন লাগছে, বিহান ভাই?"
আজ নুহা নীল শাড়িতে অনন্যা। নীল-সাদা কাঁচের চুড়ি, কপালে ছোট্ট নীল টিপ, চোখে গাঢ় কাজল,
চুল গুলো খোপা করে বাঁধা, তাতে সাদা গোলাপের পাপড়ি জ্বলজ্বল করছে আলোয়। ঠোঁটে হালকা গোলাপি আভা, সব মিলিয়ে সে যেন এক নীল স্বপ্ন।
বিহান এক মুহূর্ত নীরবে তাকিয়ে রইলো তার দিকে, দৃষ্টি নামল উপরে থেকে নিচে, তারপর হালকা হেসে বলল—
-"ছোট্ট নীল পদ্মফুলের মতো লাগছে তোমায়।"
নুহার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক মিষ্টি হাসি।
চোখ তুলে তাকিয়ে বলল—
-"আপনাকেও আজ সাদা শার্টে একেবারে সাদা গোলাপের মতো লাগছে, বিহান ভাই।"
বিহান ফিক করে হেসে ফেললো, একটা খাঁটি, অপ্রস্তুত হাসি। জীবনে এই প্রথম এমন তুলনা শুনছে সে, ছেলেদেরও যে ফুলের মতো লাগতে পারে, তা নুহার মুখে শুনে এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো তার।
নুহা তাকে হাসতে দেখে ভুরু কুঁচকে বলল—
-"হাসছেন কেন?"
বিহান তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল—
-"না না, হাসছি না... বলো তুমি।"
নুহা হঠাৎই বিহানের হাত ধরে টেনে নিলো তাকে রেস্টুরেন্টের এক নির্জন কোণে। সেখানে আলো তুলনায় একটু ম্লান, আর চারপাশে প্রায় মানুষ নেই বললেই চলে। দু’জনের নিঃশ্বাসের শব্দই যেন একমাত্র আওয়াজ, বাইরের কোলাহল যেন অনেক দূরের কোনো পৃথিবী।
নুহা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে ধীরে ধীরে বের করল একটি ছোট্ট নীল বাক্স। তার চোখে তখন একরাশ উজ্জ্বলতা, ঠোঁটে মৃদু হাসি। বাক্সটা এগিয়ে দিয়ে নরম গলায় বলল—
-"শুভ জন্মদিন!"
বিহান এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। চোখে অবাক ভাব, ঠোঁটে হালকা বিস্ময়।
-"এইসব কি এনেছো তুমি? আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি, যে জন্মদিনে উপহার দিতে হবে?"
নুহা ভ্রু কুঁচকে কৃত্রিম রাগ দেখাল, মৃদু ধমক দিয়ে বলল—
-"আমার ইচ্ছে হয়েছে, আমি এনেছি। আপনি এত কথা বলছেন কেন? নিন, ধরুন!"
তার কণ্ঠে আদেশের সুর, কিন্তু চোখে মায়া। বিহান একটু হেসে ফেলল, সেই ধমকে খেয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও চুপ করে উপহারটা হাতে নিল। হালকা অপ্রস্তুতভাবে গিফট বক্সটা হাতে ঘুরিয়ে দেখছিল সে, উল্টো ঘুরে যাবার আগেই নুহার কণ্ঠে থেমে গেল তার পা—
-"আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।"
বিহান ধীরে ঘুরে তাকাল, চোখে কৌতূহল—
-"হুম, বলো শুনছি।"
গিফট বক্সটি পকেটে রাখতে রাখতে বলল সে। নুহা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ, চুলের গোছা কপালে পড়ে মুখ আড়াল করে রেখেছে। তার কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত কোমলতা, যেন প্রতিটি শব্দ হৃদয় থেকে নিঃসৃত হচ্ছে ধীরে ধীরে—
বিহান স্থির দাঁড়িয়ে রইল, দৃষ্টি নিবদ্ধ নুহার মুখে, কিন্তু মনের ভেতর যেন এক ঝড় বইছে। নুহার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি নিঃশ্বাস তার বুকের ভেতর এসে কাঁপন তুলছে।
নুহার কণ্ঠ কাঁপছে, তবুও দৃষ্টি দৃঢ়—
-"আমি জানি, আপনি আমাকে বাচ্চা ভাবেন। কিন্তু আমি বাচ্চা নই, বিহান ভাই। আমি এটাও জানি, আপনি আমার অনুভূতি সম্পর্কে অবগত। আমি দুষ্টুমি করি, ছেলেমানুষী করি, তাই বলে আমি অবুঝ নই।আপনি কেনো সব বুঝে না বোঝার ভান করেন, আমি জানি না। হয়তো আমার বয়স নিয়ে, আমাদের বয়সের ব্যবধান নিয়ে ভাবেন আপনি।"
নুহা থামলো। চোখ বন্ধ করে গভীর এক শ্বাস নিলো, যেন বুকভরা সাহস জমিয়ে রাখছে সে। তারপর ধীরে চোখ খুলে তাকালো বিহানের চোখে, সেই দৃষ্টিতে ভয় নেই, কেবল নিরাবরণ সত্য। বলল—
-"আমি চেয়েছিলাম, পরীক্ষা শেষ হলে আপনাকে আমার মনের কথা বলবো। কিন্তু সেদিন আপনাকে এক সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে মার্কেটে দেখলাম... বিশ্বাস করুন, সেই মুহূর্তে মনে হলো আমার পৃথিবী দুলে উঠেছে। ভেবেছিলাম, আপনাকে হয়তো হারিয়ে ফেলেছি চিরতরে। তবুও একবারও চেষ্টা করিনি আপনাকে বলতে। আর সেই না-বলা কথাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস হয়ে দাঁড়াবে। আর সেটা আমি চাই না। তাই আজ সব বলব, সব!"
নুহার দৃষ্টিতে কোনো কম্পন নেই, তার কণ্ঠে নেই কোনো দ্বিধা, আছে কেবল এক গভীর, মোহনীয় স্থিরতা। ধীরে, আবেগে ভরা কণ্ঠে নুহা বলে উঠলো—
-"বিহান ভাই.. আমি আপনাকে ভালোবাসি।
এটা নিছক ভালো লাগা নয়, নয় কোনো ক্ষণস্থায়ী মোহ। যদি তাই হতো, তবে এতদিনে তা মুছে যেতো, অন্য কিছুর ভিড়ে হারিয়ে যেতো। কিন্তু তা হয়নি।বিশ্বাস করুন, আমি বারবার চেষ্টা করেছি এই অনুভূতিটা অস্বীকার করতে, নিজেকে বোঝাতে, এটা ভুল। কিন্তু বারবার হেরে গেছি নিজের কাছেই। মন আর মস্তিষ্কের যুদ্ধে মনই প্রতিবার জিতেছে। যেদিন বুঝেছি ভালোবাসা কী, সেদিন থেকেই আমার হৃদয়ে শুধু একটি নাম— শাহজাদ তালুকদার বিহান।
আমি হাজার চেষ্টা করেও এই নামটা মুছে ফেলতে পারিনি..."
নুহা থেমে গেল। নিঃশব্দে কাঁপছে তার আঙুল, ঠোঁট সামান্য কাঁপছে, চোখে জলের চিকচিকে আভা। তবুও তার দৃষ্টি স্থির, গর্বিত, ভালোবাসার সমস্ত সত্য আজ সে উজাড় করে দিয়েছে।
বিহান নির্বাক। এই ছোট নীলপদ্মের হৃদয় যে এত গভীর, এত বিশুদ্ধ অনুভূতির আধার, তা তার কল্পনারও বাইরে। সে জানত, নুহা তাকে ভালোবাসে... কিন্তু এতটা, এত নিঃস্বার্থ, এত গভীরভাবে, কখনো ভাবেনি। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বিহান। তার চোখে এখন শান্তির সঙ্গে মিশে আছে এক অদ্ভুত ক্লান্তি, যেন বহু যুদ্ধ শেষে এক সৈনিক অবশেষে অস্ত্র ফেলে দিয়েছে।
পকেটে দুই হাত গুঁজে সে স্থির দাঁড়িয়ে রইলো, নীরব, অথচ তার চারপাশের নীরবতা যেন চিৎকার করছে।
হালকা বাতাস বইছে, কিন্তু বাতাসেও যেন ভারী কোনো শব্দ লুকিয়ে আছে, অকথিত ব্যথার শব্দ, অসমাপ্ত ভালোবাসার আর্তি। বিহানের চোখ নুহার চোখে স্থির, তবুও মনে হয় যেন তার দৃষ্টি কোথাও দূরে,
অচেনা কোনো স্মৃতির কুয়াশায় হারিয়ে গেছে সে। তার দৃষ্টিতে একদিকে কোমলতা, অন্যদিকে এক অজানা শূন্যতা, যেন ভালোবাসা তাকে আর ছুঁতে পারে না, তবু ছেড়ে যায়ও না। তার কণ্ঠ নরম, তবু প্রতিটি শব্দে যেন বয়ে চলে এক অচিন্ত্য যন্ত্রণা, এক অদৃশ্য রক্তক্ষরন!ধীরে, ভারী নিঃশ্বাসে, গভীর স্বরে বিহান বলল—
-"আমাকে ভালোবেসো না, নীলপদ্ম, আমাকে ভালোবেসে তুমি কেবল অঙ্গার হয়ে যাবে। ভালোবাসার এক ফোঁটা আলোও পাবে না আমার কাছ থেকে।
এই শাহজাদ তালুকদার বিহানের হৃদয়ে ভালোবাসা নামক ফুল আর কোনোদিন ফুটবে না। সেই ফুল বহু বছর আগেই বিষক্রিয়ায় মরে গেছে, এখন শুধু তার ছাই বাকি, নিঃশেষ, নির্বিকার, নিঃস্পন্দ।"