রাত তখন তিনটা পনেরো। নগরীর আকাশে ঝুলে আছে ক্লান্ত চাঁদ, বাতাসে নীরবতার ভারী গন্ধ।রাস্তাগুলো নিঝুম, মাঝে মাঝে কুকুরের হালকা ডাকে যেন এই নিস্তব্ধতা আরও গভীর হয়ে ওঠে। ইলহান তখন নূরাইসাকে বুকে আগলে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। বহুদিন পর এমন নিশ্চিন্ত ঘুম নেমে এসেছে তার চোখে। প্রতিটি রাত যুদ্ধের মতো কেটেছে, অন্ধকার শহরের গলিঘুঁজিতে শত্রুর ছায়া, বিশ্বাসঘাতকতার গন্ধ, মৃ ত্যুর ঠাণ্ডা নিঃশ্বাস। কিন্তু আজ রাতে সবকিছু ভিন্ন। আজ তার শরীর, মন দুটোই পেয়েছে কিছুক্ষণের শান্তি।
তবুও ভাগ্যের খেলা যেন কখনো থামে না। নীরব ঘরটায় হঠাৎই বাজল ফোনের ক্ষীণ শব্দ, যেন রাতের বুক চিরে বেজে উঠল এক অশনি ইঙ্গিত। ইলহানের চোখ কেঁপে উঠল। আধো ঘুমে হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নিলো। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই তার দৃষ্টি এক নিমেষে কঠিন হয়ে গেল। ঘুমের ছায়া মুছে গিয়ে জায়গা নিলো যুদ্ধের সতর্কতা। সে ধীরে উঠে বসল। নিঃশব্দে নূরাইসার মাথাটা বালিশে রেখে দিলো। তারপর বাইক রাইডের পোশাক পরতে শুরু করল, কালো চামড়ার জ্যাকেট, ভারী বুট। তার প্রতিটি নড়াচড়া যেন নীরব, তবু দৃঢ়, এক অদৃশ্য যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি যেন।
সব সাজসজ্জা শেষ করে সে ফিরে এল বিছানার ধারে। চাঁদের আলোয় নূরাইসার মুখে এক অদ্ভুত শান্তি, যেন সে জানেই না, এই রাতই হয়তো আবার অন্ধকারের নতুন অধ্যায় লিখবে। ইলহান নরম হাতে তার কাঁধে স্পর্শ করল। নিচু কণ্ঠে, এত মৃদু যে বাতাসকেও কাঁপিয়ে দিলো সে শব্দ—
-"নূরেজান... উঠ, আমাদের যেতে হবে।"
নূরাইসা নিদ্রাভাঙা চোখ মেলে তাকালো। ঘুমের চোখে ঝাপসা ইলহানকে দেখল, কালো পোশাকে মোড়া, চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা, যেন রাতের আঁধার তার শরীরে লেপ্টে আছে। বিভ্রান্ত কণ্ঠে বলল—
-"আবারও... বের হবেন?"
ইলহান কোনো উত্তর দিল না। নিঃশব্দে এগিয়ে এসে তার দুই বাহু ধরে আস্তে করে বসিয়ে দিলো। সাইড টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে নূরাইসার দিকে বাড়িয়ে দিলো। নূরাইসা চুপচাপ গ্লাসটা নিয়ে পানি টুকু খেয়ে নিলো। বুকের ভেতর হালকা আতঙ্কের ঢেউ তবু সে চেপে রাখল। গ্লাসটা ইলহান নিজের হাতে নিয়ে আবার টেবিলে রেখে দিলো। তারপর ধীরে, পরম যত্নে নূরাইসার মুখ দুই হাতে তুলে ধরল সে। চামড়ার গ্লাভসের রুক্ষ স্পর্শের ভেতরেও ছিল এক অদ্ভুত কোমলতা। চোখে জ্বলে উঠল এক রহস্যময় শান্তি, কণ্ঠে নরম অথচ অটল দৃঢ়তা—
-"ভয় পাস না... আমি আছি। এখন যা বলব, শান্ত হয়ে শুনবি, ঠিক আছে?"
নূরাইসা কিছুই বুঝল না। তবু বুকের গভীরে অচেনা এক শঙ্কা ধীরে ধীরে বাসা বাঁধতে লাগল, যেন আসন্ন কোনো ঝড়ের আগমনী বাতাস। কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখে জ্বলে উঠল সচেতনতার এক দীপ্তি। সে মনে করল, সে কেবল এক সাধারণ নারী নয়, এখন সে এক সৈনিকের স্ত্রী। এই জীবন মানেই অনিশ্চয়তা, প্রতিদিনের লড়াই। যে কোনো সময় আসতে পারে ভয়ানক কোনো সংবাদ, তবুও ভেঙে পড়া চলবে না। শক্ত থাকতে হবে। সে ভীতু, দুর্বল, ইলহানের দুর্বলতা সে। আর শত্রুরা সেই দুর্বলতার সুযোগই নেয় বার বার। না তাকে সাহসী হতে হবে, ইলহানের দুর্বলতা না হয়ে তার শক্তি হতে হবে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করার অদম্য সাহস তার সঞ্চয় করতে হবে। তার স্বামীর জন্যই তাকে হতে হবে অটল, সাহসী, অদম্য।
একজন শক্তিশালী স্ত্রী তার স্বামীর সবচেয়ে বড় আশ্রয়, সবচেয়ে দৃঢ় প্রাচীর। আর এক দুর্বল, কাঁপা মন, সেই প্রাচীরেই ফাটল ধরায়। কোনো অবস্থাতেই সে দুর্বল হবে না। নিজের ভেতরেই নীরব প্রতিজ্ঞা করল নূরাইসা—
-"আমি তার দুর্বলতা হয়ে নয়, তার সহযোদ্ধা হয়ে, তার শক্তি হয়ে থাকব তার পাশে!"
ধীরে চোখ তুলে তাকালো ইলহানের চোখে। দৃষ্টিতে আর ভয়ের ছায়া নেই, আছে দৃঢ়তা, এক অদ্ভুত শান্ত শক্তি। সে দুই হাত বাড়িয়ে রাখল ইলহানের হাতের ওপর, যে হাত এখনো তার মুখ আঁকড়ে আছে। তার কণ্ঠে তখনো ঘুমের কোমলতা, কিন্তু ভেতরে ফুটে উঠেছে সাহসের আগুন—
-"বলুন... শুনছি আমি।"
ইলহানের হঠাৎ মনে হলো, তার নূরাইসা বদলে যাচ্ছে।সেই কোমল মেয়েটি হঠাৎই যেন আগুনের মতো দৃঢ়, সাহসের মতো শান্ত। যেকোনো দুঃসংবাদ, যেকোনো ঝড়, সে যেন প্রস্তুত তার জন্য। তার চোখে এখন কোনো ভয় নেই, শুধু নির্ভীক প্রত্যয়ের দীপ্তি। ইলহান গভীর শ্বাস নিল। বলল—
-"আমি যাদের খোঁজে ঢাকা এসেছি, তারা আমার সত্যতা জেনে গেছে। যে কারণে আমাকে আন্ডারগ্রাউন্ড হতে হয়েছিল, তারা এখন সেটা জানে। আজ তারা আমার নামে কলঙ্ক রটাতে চেয়েছিল, ড্রাগের মাধ্যমে, মিথ্যা প্রমাণ সাজিয়ে। একই সঙ্গে আমার সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত করেছে,আমার পরিবারে। আমার নুহাকে তুলে নিয়ে গেছে।
তবে চিন্তার কিছু নেই, নূরেজান, নুহাকে অ প হ র ণের সঙ্গে সঙ্গেই বিহান তাদের পিছু নিয়েছিল। রুহান আর তানভীরকেও আমি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। ওরা এখন সবাই হাসপাতালে আছে, সামান্য আঘাত পেয়েছে, গুরুতর কিছু নয়। আমি তোকে ঘুম থেকে তুলতাম না, কিন্তু একটা কারণে তুলতে হলো।"
নূরাইসা পুরোটা মনোযোগ দিয়ে শুনল। তার কণ্ঠ শান্ত, স্থির, যেন এই পৃথিবীর কোনো ভয় তাকে ছুঁতে পারবে না।
-"কি কারণ?"
ইলহান মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। তার মনে হলো, এই নারী কি সত্যিই তার সেই নূরাইসা? যে অন্ধকারে ছায়া দেখলেই ভয়ে কেঁপে ওঠে, আজ সে অচঞ্চল পাথরের মতো! একটুও ভয়ের ছাপ নেই মুখে। ভাইবোনের আহত হওয়ার কথা শুনে তো ওর এখন কান্না শুরু করে দেওয়ার কথা। সেখানে এতো শান্ত কিভাবে আছে সে?
নূরাইসার মুখে নেই কোনো আতঙ্ক, নেই উৎকণ্ঠার ছাপ। শান্ত, স্থির, অথচ চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি, যেন সাহসের মূর্ত প্রতীক সে নিজেই।
ইলহান তাকিয়ে রইল হতবাক হয়ে। তার মনে হলো, হয়তো অতিরিক্ত ভয় বা দুশ্চিন্তায় সে প্রতিক্রিয়া দেখাতে ভুলে গেছে। তবুও তার বুকের ভেতর এক ঝাঁপসা উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল, এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি, তাতে গর্বও আছে, ভালোবাসাও আছে, ভয়ও আছে একটু। সে ধীরে এগিয়ে গিয়ে নূরাইসাকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিলো। চামড়ার পোশাকের গন্ধে, গভীর নিশ্বাসের উষ্ণতায়, সেই মুহূর্তে দুইজনের নীরবতা মিলেমিশে গেল এক সুরে। ইলহান মৃদু, আদুরে কণ্ঠে বলল—
-"তুই ঠিক আছিস, ব্লাডমুন? কান্না পাচ্ছে? কাঁদতে পারিস, আমি কিছু বলব না... তাও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা। ভয় পাচ্ছিস জান?"
নূরাইসা কোনো উত্তর না দিয়ে ইলহানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার কণ্ঠে ভেসে উঠল অবিচল আত্মবিশ্বাস—
-"ভয় পাচ্ছি না আমি। আপনি থাকতে কিসের ভয়?"
ইলহান যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারল না।
এই মেয়েটি তার সেই নূরাইসা, যে একসময় সামান্য ছায়া দেখেও আঁতকে উঠত? এখন সে ঝড়ের ভেতরেও স্থির। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এত পরিবর্তন? কিভাবে সম্ভব?
নূরাইসা আবারও বলল—
-"কি কারণে ডাকলেন আমায়, বললেন না তো?"
ইলহান চোখ নামিয়ে সংক্ষিপ্ত স্বরে উত্তর দিলো—
-"হাসপাতালে গিয়ে বলব। এখন তৈরি হয়ে নে।"
বলে সে আলতোভাবে নূরাইসাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
তারপর আলমারির দিক থেকে ফিরে এল এক কালো বাইক রাইডের পোশাক হাতে নিয়ে, যা সে নূরাইসার জন্য নিজে কিনেছিল। বউকে নিয়ে রাতের শহরে বাইক রাইড করার স্বপ্ন তার। আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে, তবে এক ভিন্ন, তীব্র বাস্তবতার মধ্যে।
নূরাইসা পোশাকটা নিলো, ধীরে বাথরুমে গেল। কয়েক মিনিট পর বেরিয়ে এলো, চুল খোলা, চোখে দৃঢ়তা, আর কালো পোশাকে যেন রাতেরই এক প্রতিরূপ।
ইলহান একবার তাকিয়ে রইল, তার চোখে গর্ব, ভালোবাসা, আর অদ্ভুত এক শান্তি। তারপর হাত বাড়িয়ে বলল—
-"চল।"
দু’জন নিঃশব্দে নিচে নামল। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ, সবাই ঘুমিয়ে, বাড়ির বাকি কেউ কিছু জানে না। বাড়ির বাইরে অন্যরকম এক পৃথিবী তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। গ্যারেজের দরজা খুলতেই ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল বাইকের গন্ধ। ইলহান বাইকটা স্টার্ট দিলো, গর্জন করে উঠল ইঞ্জিন। নূরাইসা পিছনে বসল, কোমর জড়িয়ে ধরল ইলহানকে।
এক ঝটকায় বাইক বেরিয়ে গেল অন্ধকার রাত চিরে, দু’জন মানুষ, এক অনিশ্চিত গন্তব্য, আর ভালোবাসায় মোড়া এক ভয়হীন যাত্রা, হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।
.
হাসপাতালের করিডোরে তীব্র ওষুধের গন্ধ, সাদা আলোয় ঝলসে যাচ্ছে দেয়াল। বিহান, রুহান, তানভীর ও এমরিন, চারজনকেই ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হয়েছে।রুহান ও তানভীরের শরীরে ছুরির আঘাত, বিহানের অবস্থাও তেমনই। এমরিনের হাতে গভীর ক্ষত।চারজনেই নুহার কেবিনের বাইরে, কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে। মুখে ক্লান্তি, চোখে উদ্বেগ। ভেতরে, কেবিনের নরম আলোয় আফরিন নুহার পাশে বসে আছে। নুহার মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে কেনোলা ও স্যালাইন, ডাক্তার জানিয়েছেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই তার জ্ঞান ফিরে আসবে।
ইলহান ও নূরাইসা ছুটে এলো। হন্তদন্ত, উদ্বিগ্ন, মুখে নিঃশ্বাসহীন উত্তেজনা। নূরাইসা এতক্ষণ শক্ত থাকলেও, ভাইদের আহত শরীর দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখের জল হুহু করে গড়িয়ে পড়ল গালে। সে ঝুঁকে রুহানের পাশে বসে কাঁদতে লাগল, কণ্ঠে কান্না, চোখে আতঙ্ক, তবু বুকের ভেতর গভীর ভালোবাসা।
ইলহান কয়েক পা দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার চোখে বিরক্তির ঝিলিক বিড়বিড় করতে লাগলো—
-"ভাইরা সামান্য আঘাত পেয়েছে, আর সে যেন পৃথিবীর শেষ দেখে ফেলেছে! বারবার বলেছে ইলহান— আমার জন্য কাঁদবি, আর আমার কারণেই কদবি।কিন্তু এ মেয়ে শুনলে তো! ভাইদের জন্য কেঁদে বন্যা করে ফেলছে।
রুহান আর তানভীর মৃদু হেসে এগিয়ে এল। দু’জন মিলে নূরাইসাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কান্না থামালো, তারপর তাকে নুহার কেবিনে পাঠিয়ে দিল—
-"ওকে এখন তোর দরকার।"
ইলহান তখন বিহানের পাশে এসে দাঁড়াল। চোখে হালকা রাগ, কণ্ঠে কঠোর গাম্ভীর্য—
-"শ্লা, একা পাঁচজনকে সামলাতে পারলি না? তুই পারিস শুধু কম্পিউটারের সাথেই!"
বিহান দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
-"শ্লা! তুই যেতে পারলি না তোর বোনকে বাঁচাতে? আমারে কেনো বারবার জমের মুখে ঠেলিস?"
ইলহান ঠান্ডা গলায় তিরিক্ষি সুরে বলল—
-"শ্লা, খেটে খা! বহুত বসে বসে খেয়েছিস!"
বিহান চোখ রাঙিয়ে পাল্টা জবাব দিল—
-"তুইও অর্ডার কম কম দে! সব জায়গায় তোর পাওয়ার দেখাবি না। মনে রাখ, আমরা এখন ঢাকায়!"
বিহানের কথাটা শেষ হতে না হতেই ঠাস! ইলহানের ঘুষি সোজা বিহানের পেটে। বিহান দু’হাতে পেট চেপে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো।
রুহান অসহায় গলায় বলে উঠলো—
-"ভাই, আমরা আহত, একবারও জিজ্ঞাসা করলে না কেমন আছি!"
ইলহান ধীরে ঘাড় কাত করে তাকালো রুহান ও তানভীরের দিকে। চোখে একরাশ বিরক্তি, কিন্তু ভেতরে কোথাও হালকা ঝড়, কারণ, তার বউ ঠিক এই দুইজনের জন্যই কেঁদে বন্যা করেছে। রাশভারী কণ্ঠে সে বলল—
-"পুরুষ মানুষ এইটুকু ব্যথাও সহ্য করতে পারিস না?সামান্য ক্ষত, আর তাতেই তোমাদের বোন কান্নায় ভাসায় ঘর? কই, আমি তো কতবার মরার মতো আহত হয়েছি, আমার জন্য তো কেউ কাঁদে না!"
তানভীর, রুহান আর বিহান একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল। তাদের বুঝতে দেরি হলো না, ইলহানের এই বিরক্তি, এই রাগ আসলে অন্য কিছু নয়... জেলাসি! নিজের বউ অন্য পুরুষদের জন্য কেঁদেছে, এটা মেনে নিতে কষ্টই হচ্ছে ওর।
ইলহান মুহূর্তে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। চোখ গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এমরিনের দিকে, ভ্রু কুঁচকে, ঠান্ডা দৃষ্টিতে পুরো দৃশ্যটা দেখছে সে। ইলহান নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে গেল তার দিকে। গলায় কঠোরতার ভেতরেও মিশে রইল সামান্য কৃতজ্ঞতা—
-"বিহান আমাকে সব বলেছে... আপনার ব্যাপারে।
আপনাকে ধন্যবাদ, আফরিনকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য। আর নুহাকে বাঁচাতে যাওয়ার জন্যও।
যদিও আপনার যাওয়া প্রয়োজন ছিল না, তবু মানবতা দেখিয়েছেন, এর জন্য কৃতজ্ঞ।"
এমরিনের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
গলায় এক অচেনা দৃঢ়তা—
-"ইটস ওকে। এটা আমার দায়িত্ব ছিল। তবে একটা কথা জানতে ইচ্ছে করছে, আপনারা তো সাধারণ মানুষ, আপনাদের বোনকে কেউ অ প হ র ণ করতে চাইবে কেনো? আর পুলিশে খবর না দিয়ে নিজেরাই গেলেন কেন? আপনারা জানলেনই বা কীভাবে, ওদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?"
ইলহান আগেই বুঝেছিল, এই প্রশ্নগুলো আসবেই। আসল সত্যিটা চতুরতার সাথে আড়াল করলো সে।চোখের দৃষ্টি সামান্য নরম করে, স্বাভাবিক ভাব বজায় রেখে বলল—
-"আমাদের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাজ এটা।
আমার বোনরা বাইরে গেলেও আমরা সবসময় ওদের ওপর নজর রাখি। কোনো বিপদ হলে আগে আমরাই খবর পাই। আপনি জানেনই তো, বিজনেস ওয়ার্ল্ডে অনেক হিংসুক থাকে, যারা আপনার সাফল্য মেনে নিতে পারে না। আর পুলিশে জানাজানি হলে শেয়ার মার্কেট ক্ষতিগ্রস্ত হবে, নিজেরাই সামলে নেওয়াই ভালো।"
এমরিন মাথা নেড়ে বোঝাল, সে ইলহানের ব্যাখ্যা বুঝেছে। তার ঠোঁটে হালকা একটা অনির্বচনীয় হাসি ফুটে উঠল, যেন বোঝে, তবু বিশ্বাসের ঘাটতি রয়ে গেছে। ঠিক তখনই রুহান এগিয়ে এসে কৌতূহলভরা চোখে বলল—
-'মিস্টার রাহাফ, আপনি এত নিখুঁত শুট করেন কীভাবে? পরপর দুইটা টার্গেট, একটাও মিস করেননি!"
এমরিনের ঠোঁটের কোণে আত্মবিশ্বাসী এক মুচকি হাসি। শান্ত, কিন্তু দৃঢ় গলায় উত্তর দিল—
-"আমি একজন ডিটেক্টিভ। এইসব আমার কাছে বাচ্চাদের খেলা।"
রুহান মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকল ওর দিকে। বিহান এগিয়ে এসে এমরিনের কাঁধে হাত রাখল। চোখেমুখে ক্লান্তি, তবুও কণ্ঠে ছিল কৃতজ্ঞতা মেশানো দৃঢ়তা—
-"আমাদের ওদের জীবিত প্রয়োজন ছিল, কে বা কারা তাদের পাঠিয়েছিল, সেই তথ্য দরকার ছিল আমাদের।
যাই হোক, যা হয়েছে, হয়েছে, ধন্যবাদ আপনাকে।"
এমরিন কিছু বলল না, শুধু চোখ নামিয়ে রাখল কিছুক্ষণ। তার দৃষ্টি যেন কাচের মতো ঠান্ডা, তবু ভেতরে কোথাও এক অজানা প্রশ্নের ঢেউ খেলে গেল।
.
ঘরের বাতাসে সিগারেটের ধোঁয়া ঘুরছে। টেবিলের উপর ছেঁড়া কাগজ আর আধ-খালি সিগারেটের প্যাকেট, সবই যেন এই রুমের অস্থিরতার সাক্ষী।কাদা-গন্ধার ভঙ্গিতে কেউ কেউ দাঁত টিপে বসে আছে, কেউ চেয়ারে ঢালু হয়ে, কেউ গম্ভীর মৌনতায়। টেবিলের ওপাশে বসা এক পুরুষ অবয়ব প্রথমেই গলায় কড়া, ক্ষিপ্ত স্বরে ফুঁসে উঠে বলল—
-"shit, damn it! তোরা একজনও কাজের না। একটি মেয়েকে তুলে আনতে পারলি না?"
টেবিলের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সহকারী ঠোঁট কামড়ে জবাব দিল—
-"সরি বস। ওরা কিভাবে যেনো জেনে গিয়েছিল। সাইফারx পিছু নিয়ে ধরে ফেলে আমাদের লোককে।"
টেবিলের ওপাশে বসা দ্বিতীয়জন ক্ষিপ্ত সুরে বলল—
-"গর্ধব। সামান্য একটি মেয়েকে তুলে আনতে গিয়ে সব গুলো মোড়ল।"
পাশের চেয়ারে বসা এক পুরুষ, মুখে অদ্ভুত এক শীতল হাসি রেখে, গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
-"মরেছে, ভালো হয়েছে। বেঁচে থাকলে A-nova ধরে ফেললে আমাদের কাছে পৌঁছে যেতে!"
সিগারেট ধোঁয়া উড়িয়ে বসা টেবিলের ওপাশের লোক ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে শব্দ করে বলল—
-"কারেক্ট। আমাদের অন্য পথ খুঁজতে হবে। A-nova জানে ওর পরিবার টার্গেট হবে। ও সব রকম সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছে।"
ওপর দিকের চেয়ারে বসা ক্ষিপ্ত, শক্তচেষ্টা পুরুষ, এক ঢেকে উইস্কির গ্লাস শেষ করে টেবিলে রেখে বলল—
-"আপাতত সবাই শান্ত থাকো। সময় হলে আমি বলব কী করতে হবে। এখন শুধু ওদের ওপর নজর রাখো!"
কেউ কথা বাড়ালো না। সব মুখে একরকম কঠিন নীরবতা, মাথা নেড়ে সম্মতিও জানাল সবাই, এমন আচ্ছন্ন মৌনতার মধ্যে রুমটা যেন অপেক্ষা করছিল, পরবর্তী পদক্ষেপ কবে, কেমন হবে, তা জানবার জন্য।
.
নুহার জ্ঞান ফিরেছে। চোখ খুলতেই দেখল, চারপাশে তার প্রিয়জনেরা ঘিরে আছে। অন্ধকার রাতের আবেশে আলোর কোমল ছটা পড়ছে মুখে মুখে, কোথাও একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ভেসে বেড়াচ্ছে। এতক্ষণে যেন সমস্ত ভয়, আতঙ্ক, মৃ ত্যুর ছায়া মিলিয়ে গেছে কোথায়! ভাইদের মুখ দেখে নুহার বুকের জমাট ভয়টা মুহূর্তেই গলে গেলো।
জ্ঞান ফিরতেই নূরাইসা ছুটে এসে বোনকে জড়িয়ে ধরলো। তার চোখে তখন জল, বুক কাঁপছে উদ্বেগে, আর কণ্ঠ কাঁপছে ভালোবাসার ভারে। নুহা একটু বিরক্ত মুখে বলল—
-"আরে বা ল, বেঁচে আছি আমি! ছাড় তো, সেই কখন থেকে জাপটে ধরে আছিস। গু ণ্ডা দের আ ঘা তে না ম র লেও, তোর জড়িয়ে ধরার চাপে এখন দম বন্ধ হয়ে ম র ব বোধহয়!"
নূরাইসা নাক টেনে টেনে নুহাকে ছেড়ে দাড়ালো, চোখের জল মুছতে মুছতে বলল—
-"এমন করে বলছিস কেনো? তোর কি একটুও ভয় করে নি?"
নুহা মুচকি হেসে একপাশে চুল সরিয়ে বলল—
-"তিনটা দামড়া ভাই থাকতে কিসের ভয় হবে? আমি জানতাম ভাইয়ারা ঠিকই বাঁচাতে আসবে আমায়!"
রুহান তখন কপাল কুঁচকে রাগমাখা গলায় বলল—
-"তুই আসলেই মানুষ তো? এত বড় ঘটনা ঘটলো, আর তুই একফোঁটা কান্না করছিস না, ভয়ও পাচ্ছিস না, কেনো?"
তানভীর হেসে রুহানের কথায় যোগ করল—
-"সত্যিই তো! আমরা যদি সময়মতো না পৌঁছাতাম, কি হতো জানিস? অবশ্য আমাদের আগেই বিহান ভাই এসে পৌঁছেছে। না হলে তো যা তা অবস্থা হয়ে যেতো!"
নুহা জামাকাপড় ঠিক করতে করতে, গলা নামিয়ে গর্বভরে বলল—
-"ইলহান ভাই আগেই বলে রেখেছিল। বিপদ আসতে পারে। এই যে ব্রেসলেটটা দেখছো, এতে ট্র্যাকার আছে। রিন পাউডারের ব্রেসলেটেও একই ব্যবস্থা। যেখানেই নিয়ে যেতো, ভাইয়া নিমিষেই খুঁজে বের করত আমায়। এই গাধীটা "—আফরিনের দিকে ইঙ্গিত করল—" সব ভুলে গিয়েছিল, তাই ভয়ে কেঁদে কুটে বন্যা করেছে। বেকুব মহিলা!"
উপস্থিত সবাই যেন এক মুহূর্তে ভেবাচেকা খেয়ে গেলো। আফরিন চোখ গরম করে তাকালো, নুহা পাত্তা দিলো না। বাতাসে তখনও অস্থিরতা, ঘরে মৃদু আলো, রাতের ভারী নীরবতা যেন কারও বুকের ভেতর জমে থাকা অশান্তির প্রতিচ্ছবি। নূরাইসা তখনও মৃদু কন্ঠে কাঁদছে, কণ্ঠ কাঁপছে, চোখে লেগে আছে আতঙ্কের ছায়া। ঠিক তখনই দরজার কাছে পায়ের শব্দ, ইলহান ও বিহান ভেতরে এলো।
নুহার চোখ পড়তেই যেন তার ভিতরটা কেঁপে উঠল।বিহানকে দেখে এক মুহূর্তে মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেলো, স্থির নিস্তব্ধ মুখে সে বেডের ধারে বসে পড়ল। ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। নূরাইসা কান্না থামিয়ে ধীরে ধীরে চোখ মুখ মুছে নিলো। কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রতিজ্ঞা করেছিল, সে আর দুর্বল হবে না, আর কাঁদবে না। তবুও নিজেকে সামলানো তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইলহান সোজা এগিয়ে গেল আফরিনের দিকে। আফরিন প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে। মুখে ক্লান্ত অথচ হাস্যরসের ছোঁয়া নিয়ে ইলহান বলল—
-"রিন পাউডার!"
আফরিনের মুখ মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠলো। সে চোখ পাকিয়ে বলল—
-"ভাইয়া, তুমিও?"
ইলহান থতমত খেয়ে হেসে ফেলল—
-"সরি, ভুলে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে!"
ঘরের টানটান পরিবেশ হঠাৎ হালকা হয়ে গেল। সবাই হো হো করে হেসে উঠল, যেন এতক্ষণ জমে থাকা উত্তেজনা সেই হাসির ঢেউয়ে গলে গেলো। আফরিন কটমট দৃষ্টিতে তাকালো সবার দিকে, চোখে মিশে আছে লজ্জা আর অভিমান। ইলহান হেসে তার মাথায় আলতো করে হাত রাখল, তারপর শান্ত গলায় বলল—
-"তোর হাতটা একটু কে টে ফেল, বোন।"
বাক্যটা শেষ হতেই নূরাইসা ও আফরিন প্রায় একসাথে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল—
-"মানে?!"
উপস্থিত সবাই চিৎকার শুনে মুখ কুঁচকে কান চেপে ধরল। ইলহান ধীরে কান থেকে হাত নামিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
-"পরে বলছি... আগে হাত কা ট!"
বলেই সে এগিয়ে গেল বিহানের দিকে। ঠাণ্ডা স্বরে নির্দেশ দিল—
-"একটা ঘু ষি মা র, যাতে ঠোঁট কে টে যায়।"
বিহান নিঃশব্দে তেমনটাই করল। উপস্থিত কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারল না। নূরাইসা আতঙ্কে স্থবির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তাদের দিকে। ইলহান ঘু ষি খেয়ে একটু কাত হয়ে পড়ল। এক হাতে ঠোঁটের কোণা থেকে গড়িয়ে পড়া র ক্ত মুছে নিল, তারপর নূরাইসার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসিতে বলল—
-"আপনাকে কিছু করতে হবে না, জান। শুধু বলবেন, আপনার হাতে ব্যথা।"
নূরাইসা ভেবাচেকা খেয়ে গেল। তার মুখে কোনো শব্দ নেই, চোখে নিস্তব্ধ ভয়। উপস্থিত কেউই বুঝতে পারল না ইলহানের সদ্য ঘটে যাওয়া কর্মকাণ্ডের মানে। সবাই হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।
ইলহান তখন ঠোঁট প্রসারিত করে দাঁত বের করে হেসে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে, সেই হাসিতে ছিল একরাশ রহস্য, আর এক ফোঁটা উন্মাদনা।