সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ২৪

🟢

ইলহান ঘরের সব পর্দা টেনে দিয়েছিল, ফলে ঘরটা ডুবে আছে এক গভীর, স্থির অন্ধকারে, যেন বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। শুধু জানালাগুলো বন্ধ করেনি সে, সেগুলো অর্ধেক খোলা, নিঃশব্দে কাঁপছে হালকা বাতাসে।শীতের বিকেল, আকাশটাও আজ কেমন ধূসর কুয়াশায় মোড়ানো, রোদ নেই, আছে কেবল এক ম্লান আলো, যা ঘরের ভেতরে ঢুকতে সাহস পায় না। হঠাৎই দমকা হাওয়া এসে পর্দাগুলোকে উন্মত্ত করে তুলল, তারা একসাথে উড়ে উঠল। মুহূর্তের জন্য জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ল একখণ্ড উজ্জ্বল আলো, নরম কিন্তু তীক্ষ্ণ। সেই আলো এসে থামল নূরাইসার মুখে।

ইলহান থমকে গেল। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল সে।

নূরাইসার সুশ্রী মুখখানি যেন এক শিল্পীর নিখুঁত তুলির আঁচড়ে গড়া। কি দারুন কায়দায় চোখ দুটো বন্ধ করে রেখেছে, চিকন পাতলা মসৃণ গোলাপি ঠোঁটের ওপর সূক্ষ্ম কাঁপন, যেন নিঃশ্বাসের প্রতিটি শব্দও সুরে বাঁধা। কালো চুলগুলো মুখের চারপাশে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে, এক অদ্ভুত সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে।প্রাকৃতিক সেই ক্ষণিকের আলো যেন ইলহানের চোখের গভীরে গিয়ে আলোড়ন তুলল, যেনো সম্মোহন করে গেল, তার দৃষ্টি, মন, শরীর, সবকিছু কেমন এক অচেনা ব্যাকুলতায় ভরে উঠল।

ঠিক তখনই দরজায় কড়া পড়ল। একবার, দুইবার, একটানা, হালকা অথচ স্পষ্ট ঠকঠক শব্দ।

নূরাইসা তড়াক করে চোখ মেলে তাকাল। তার মুখের সমস্ত রঙ এক নিমিষে বদলে গেল, লজ্জা, বিস্ময়, ভয় আর অচিন্তনীয় অস্থিরতা একসাথে মিশে গিয়ে মুখমণ্ডল জুড়ে সৃষ্টি করল এক অনির্বচনীয় দৃশ্য।ইলহানের দৃষ্টির সঙ্গে চোখ মেলতেই নূরাইসা যেন লজ্জায় গলে পড়ল, ঠোঁটের কোণে কাঁপন, বুকের ভেতর অস্বাভাবিক তীব্র শ্বাসের ওঠানামা। ইলহান তখনও স্থির। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ নূরাইসার প্রতিটি ভঙ্গিমায়, প্রতিটি কাঁপনে। নূরাইসার চোখে তখন বিড়ালছানার মতো আশ্চর্য এক ভয়ভরা কোমলতা।আর ইলহানের ঠোঁটে ফুটে উঠল সেই দুর্লভ, গোপন হাসি, যা বোঝার মতো সাহস সবার থাকে না।

সে ধীরে, প্রায় নিঃশব্দে, নূরাইসার উপর থেকে সরে এসে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। পর্দাগুলো আবার নিস্তব্ধ, হাওয়াও থেমে গেছে, শুধু ঘরে রয়ে গেল সেই অদৃশ্য আবেশ, যা একবার স্পর্শ করলে আর ফেরা যায় না। দরজাটা ধীরে খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো ইলহান। মুখে এক গম্ভীর স্থিরতা, চোখে গভীর চিন্তার ছায়া। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল বিহান।

ইলহান হালকা স্বরে বলল—

-"কি হয়েছে?"

বিহান ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল—

-"পরশু সকালে যেতে হবে চট্টগ্রামে। কল এসেছে!"

এক মুহূর্ত থেমে রইল ইলহান। ভ্রূকুটি নামল কপালে।

-"এত তাড়াতাড়ি?"

-"হ্যাঁ, জরুরি বলা হয়েছে।"

ইলহান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল—

-"ঠিক আছে। বাকিটা আমি বুঝে নিচ্ছি।"

ইলহান উল্টো ঘুরে যাবার জন্য পা বাড়িয়ে আবারও ফিরে তাকালো, গম্ভীর কন্ঠে বলল—

-"সবাই কে আমার ঘরে আসতে নিষেধ করবি!"

বিহান কৌতূহল ভরা দৃষ্টিতে তাকাল—

-"ইসা কি তোর চলে যাওয়ার খবর মেনে নিতে পারে নি?"

ইলহান মৃদু হেসে মাথা নাড়ল—

-"এবার কবে ফিরব জানি না। যাওয়ার আগে ওকে সময় দিয়ে যেতে চাই।"

বিহান আর কিছু বলল না। কেবল সম্মতি জানিয়ে নরম কণ্ঠে বলল—

-"বুঝেছি। কেউ বিরক্ত করবে না।"

তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল সে।নিচে পৌঁছে সবাইকে সবটা খুলে বলে। সবাই চুপ করে শুনল। কারও মুখে কোনো কথা নেই, কেবল নিঃশব্দে একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল তারা।সবাই বুঝল। বিয়ের পর থেকে সেইভাবে সময় ও কাটায় নি তারা।

ইলহান তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে দরজাটা নিঃশব্দে লক করে ভেতরে প্রবেশ করল। ঘরের ভারী নীরবতায় যেন বাতাসটাও থমকে আছে। মৃদু আলোয় নূরাইসার মুখের ছায়া কেঁপে উঠছে, ভয়, বিভ্রান্তি আর অজানা আশঙ্কায়। সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে বারান্দার দিকে এগোতে লাগল।

ইলহান বউয়ের মত গতি বুঝে এগিয়ে গেলো। নিঃশব্দে পেছন থেকে ইলহানের বলিষ্ঠ হাত নূরাইসার কোমর জড়িয়ে ধরল। নিঃশব্দে, অথচ অদ্ভুত শক্তিতে তাকে তুলে নিল শূন্যে। নূরাইসার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। ইলহান তার চুলের ভেতর মুখ গুঁজে, গরম নিঃশ্বাসে কাঁপিয়ে দিল তার ঘাড়ের নিটোল অংশ , তারপর নিচু, হিসহিসে কণ্ঠে বলল—

-"কোথায় পালাচ্ছিস, ব্লাডমুন? আজ পালানোর সব পথ বন্ধ জান!"

তার কণ্ঠে যেন আগুনের ছোঁয়া, আদেশ নয়,এক অদ্ভুত নিবিড় দাবি। ইলহান নূরাইসাকে নিয়ে ধীরে ধীরে বেডের ওপর বসাল। ঘরের নিস্তব্ধতা আরও ঘনীভূত হলো, জানালার পর্দা নড়ে উঠল হালকা বাতাসে, তাতে ঝলমল করে উঠল ম্লান আলো।ইলহানের ঠোঁটের কোণে গাঢ় রহস্যের ছায়া, চোখে এক আগুনের মতো দৃষ্টি। নূরাইসার দেহ কাঁপছে, ভয়, না কি অন্য কিছু, বোঝা যায় না। পালানোর পথ যেন সত্যিই আর কোথাও নেই।

হঠাৎ ইলহান নিজের শার্ট খুলে ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে।

ধীরে ধীরে বেল্ট খুলতে খুলতে এগিয়ে এলো তার দিকে। নূরাইসার নিঃশ্বাস যেন আটকে গেল বুকের গভীরে। বিভ্রান্তিতে তার সমস্ত দেহ শিথিল হয়ে এল, অথচ ভেতরে এক অজানা টান জেগে উঠছে। ইলহান সামনে এসে হাত বাড়িয়ে নূরাইসার কামিজের প্রান্ত তুলতেই, নূরাইসা কম্পিত হাতে খামচে ধরল তার হাত। কাঁপা কণ্ঠে, যেন ভেতরের সমস্ত ভয় মিশে গিয়ে এক বিন্দু আবেদন হয়ে বেরিয়ে এলো—

-"কি করছেন... কি?"

ইলহানের চোখে সেই মুহূর্তে এক অচেনা গভীরতা নেমে এলো। কণ্ঠে কাঁপন, তবুও দমিত এক উন্মাদনার গাঢ় ছাপ ঝরে পড়ছে তার প্রতিটি শব্দে। সে আরও কাছে এগিয়ে এলো। তার নিঃশ্বাস কাঁপছিল, আর কণ্ঠস্বরটাও কোনোমতে নিজেকে সামলে রেখেছিল। এক খাঁটি, লুকোনো না-পারা সততার ভারে, কথাগুলো কেঁপে উঠছিল। ফিসফিস করে বলল সে—

-"আই ওয়ান্ট ইউ, নূরেজান... রাইট হিয়ার, রাইট নাউ!আমি আপনাকে অনুভব করতে চাই... আপনার উপস্থিতি, আপনার স্পর্শ, আপনার সেই নরম ছোঁয়া, যা আমার গায়ে থেকে যাবে। আমি এই মুহূর্তটাকে আপনার সাথে নিজের করে নিতে চাই। প্লিজ, ডোন্ট পুল অ্যাওয়ে, লাভ। আমি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারব না..."

নূরাইসা স্থবির হয়ে বসে রইল। কানে যেন নিজের হৃদস্পন্দনের বজ্রধ্বনি ছাড়া আর কিছু পৌঁছায় না। সে কিছু বলার আগেই ইলহান আলতো করে তার থুতনি তুলে ধরল, চোখে সেই গভীর, অসহায় কোমলতার জ্বলন্ত দহন নিয়ে। সে কপালটা তার কপালে মিলিয়ে দিলো। মুখের কাছে মুখ রাখতেই নিঃশব্দে বলল—

-"আই নিড ইউ ক্লোজার দ্যান দ্য এয়ার আই ব্রিদ। আপনি যখন এভাবে আমার দিকে তাকান... এভরিথিং ইনসাইড মি অনরেভেলস। সেই মুহূর্তে আমার মাথায় একটাই ভাবনা ঘুরপাক খায়, আপনি! যেভাবে আপনার হৃদস্পন্দন আমার হৃদস্পন্দনের জবাব দেয়, যেভাবে আপনার উপস্থিতি নিঃশব্দে আমার ভেতরের ফাঁকা স্থানগুলো একে একে পূর্ণ করে দেয়, তা আমাকে প্রতিটি মুহূর্তে আরও গভীর, আরও অজান্তে আপনার দিকে টেনে নিয়ে যায়। আপনার দৃষ্টি, আপনার নীরবতা, আপনার অনুচ্চারিত স্পন্দন, সবকিছু মিলেই যেন আমার অস্তিত্বকে নতুন করে লিখে দেয়।আর আমি... আমি শুধু অনুভব করি, কতটা অবধারিতভাবে আপনিই হয়ে উঠছেন আমার প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি স্পন্দন, প্রতিটি অনুভূতির কেন্দ্রবিন্দু। প্লিজ, আমাকে আজ সামলে নিন ব্লাডমুন।"

ইলহানের হাত দু’টি অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠছিল, যখন সে নূরাইসাকে আলতো করে ধরল। যেন এতটুকু অসাবধানতা হলেই সে হাতছাড়া হয়ে যাবে,ডিসেম্বারের ঘন কুয়াশার মতো হঠাৎ মিলিয়ে যাবে কোথাও।নিমেষে তার কণ্ঠ আরও নরম, আরও অনুনয়ভরা হয়ে উঠল—

-"আমার হয়ে থাকুন... এই মুহূর্তটাকে আমাদের চারপাশে জড়িয়ে থাকতে দিন। যেমন করে আমার হৃদয় এতদিন আপনাকে নিঃশব্দে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে, ঠিক সেভাবেই আপনাকে কাছে টেনে আনতে দিন আমাকে। আপনি আমার ঝড়ের মাঝে শান্তি... শীতের দীর্ঘ, ঠান্ডা রাতগুলোর উষ্ণ নিঃশ্বাস। আর এই মুহূর্তে, আমি শুধু আপনাকেই চাই। শুধুই আপনাকে।আই ওয়ান্ট ইউ, নূরেজান... রাইট হিয়ার, রাইট নাউ। আই ক্যান’ট গো ব্যাক লাইক দিস। আই ওয়ান্ট টু ফিল ইউ... ইয়োর টাচ, ইয়োর মার্ক অন মাই হার্ট, অন মাই সোল।আই ওয়ান্ট টু ক্লেইম ইউ অ্যাজ মাইন... টু হোল্ড ইউ সো ক্লোজ দ্য ওয়ার্ল্ড ডিসঅ্যাপিয়ার্স। প্লিজ... ডোন্ট সে নো, জান। আই ক্যান’ট কন্ট্রোল হোয়াট আই ফিল এনি-মোর..."

ঘরটি নিঃশব্দ হয়ে গেল, এক অদৃশ্য শক্তি যেন বাতাসের ওপর ঝুঁকে পড়ল, কাঁপানো, জীবন্ত, আর সেই নীরবতার মাঝে রইল শুধু তারা দু’জন। এক এমন মুহূর্তের আকর্ষণে বন্দি, যেখান থেকে কেউই আর সরে যেতে পারছিল না। ইলহানের কণ্ঠের ব্যাকুলতা, প্রতিটি শব্দের দহনে গলে যেতে লাগল নূরাইসার ভেতর জমে থাকা সমস্ত জড়তা। নূরাইসা শরীর ঠেলে সম্পূর্ণভাবে ইলহানের সাথে মিশে গেল। ইলহানের চোখে তখনও অনুনয়ের ছায়া, অনুমতির নীরব অপেক্ষা। কিন্তু নূরাইসার এই স্বতঃস্ফূর্ত আত্মসমর্পণ, এই স্পর্শকাতরতার ঝিলিক, তার ছোঁয়ায় ইলহানের চোখ দুটো তেতে উঠল দাহে। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল বিজয়ের এক গাঢ় বাঁকা হাসি। এক মুহূর্তও দেরি করল না সে।

এরপর কোনো পূর্বাভাস না দিয়েই ইলহানের অধর ঝাপিয়ে পড়ে নূরাইসার ওষ্ঠে। উগ্র, দাবদাহময় চুম্বনে আবদ্ধ করে নেয় তাকে। নূরাইসা ছটফট করে উঠলেও ইলহান ছিল অবিচল, যেন এক মগ্ন, নিটোল, প্রবল সাধনায় লিপ্ত। এই মুহূর্তটির দাবিদার সে দীর্ঘকাল ধরে। অধরের বাঁধন ছেড়ে সে নেমে আসে গ্রীবায়, যেন এক তৃষিত ভ্রমর সুধা আহরণে ব্যস্ত। মুহূর্ত পর নূরাইসাকে ছেড়ে দেয়, তাকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দেয়। নিস্তব্ধ অন্ধকারে আচ্ছন্ন রুমটায় সন্তর্পনে পৌঁছাল সে কাঙ্ক্ষিত মানুষটার কাছে। অনুভব করল মানুষটির শরীরের তীব্র কম্পন, যা তার পৌরুষ হৃদয়ে উষ্ণ উন্মাদনার জন্ম দিল। নূরাইসা ছটফটিয়ে উঠলেও ইলহান তাকে ছাড়ল না। বরং সময় যত গড়াতে থাকে, ইলহান তার নূরেজানকে উম্মাদের ন্যায় নিজের করে নেওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এতো বছরের তৃষ্ণা যেন আজ মিটিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর সে। ধৈর্যশীল ইলহান আজ ভীষণ ধৈর্যহীন।

বলিষ্ঠ দেহের ইলহানের বক্ষের নিচে ক্ষুদ্রকায় নূরাইসা মৃদু হাসিতে তার স্বামীকে বরণ করে নিল, যেন তার আগমনে পুরো পৃথিবীটা একটু উষ্ণ হয়ে উঠল। নিস্তব্ধ, ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন রুমটা যেন গুমোট চাদরে ঢেকে রইল কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ সেই গুমোট ভেঙে যায়। দু’জোড়া মানব-মানবীর উষ্ণ নিঃশ্বাসের মিলন ক্রিয়ায় রুমজুড়ে ঝংকার তোলে এক প্রগাঢ় সুর। বাতাস ভারী হয়ে উঠল তীব্র অনুভূতির ঘ্রাণে। জমে থাকা হাজারো প্রণয় একত্রিত হয়ে যেন এক সুখময় কাব্যের ছন্দ তুলছে, দু’জন কপোত-কপোতীর মিলনের গল্পে।মুহূর্তটির সূচনাতে যে সুখ, যে অনুভূতিতে লুটোপুটি খাচ্ছিল নূরাইসা, সহসা সেই অনুভূতি যেন আঁধারে মিলিয়ে গেল। রুমজুড়ে দোল খেল নূরাইসার ক্রন্দনরোধী সুর। নখে একের পর এক আঁচড় কেটে গেল ইলহানের সারা পিঠজুড়ে। ইলহানের তাতে কিছু যায় এলো না, বরং তার মুখে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত তৃপ্তির ছায়া। নূরাইসার সেই তীব্র ক্রন্দন ও আঁচড়গুলো তার পৌরুষে এক বিচিত্র তৃপ্তির অনুভূতি এনে দিল, যেন দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথে এইটুকু প্রতিরোধ কেবল উন্মাদনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। কক্ষজুড়ে তখন শুধু উষ্ণ নিঃশ্বাস আর অশ্রুর এক জটিল, তীব্র নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছিল।

.

রাত তখন প্রায় দুটো। পুরো বাড়িময় গভীর নিস্তব্ধতা, জানালার ফাঁক গলে ঢুকে আসা শীতল হাওয়ার সঙ্গে মিশে আছে দূরের রাতজাগা পাখির ডাক। চার ঘণ্টা আগে ইলহানের আলিঙ্গন থেকে ছাড়া পেয়েছে নূরাইসা। সেই বিকেল থেকে ইলহান যেন মত্ত ছিলো শুধু তার মধ্যেই, তার স্পর্শে, তার গন্ধে, তার অস্তিত্বে।ক্লান্ত-দুর্বল নূরাইসাকে ফ্রেশ করিয়ে নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে সে।নূরাইসাও ঘুমিয়ে ছিল, কিন্তু খিদের হালকা তীব্রতায় তার চোখ খুলে গেলো। দুপুরে দু’জনেই শেষবার খেয়েছিল, সেই পর থেকে আর কিছুই মুখে তোলা হয়নি।

ইলহানের বুকের ওপর শুয়ে থাকা নূরাইসা মাথা তুলে তাকালো তার স্বামীর দিকে। এত কাছে থেকেও মনে হলো যেন নতুন করে দেখছে তাকে, এক অদ্ভুত মুগ্ধতায়, এক গভীর আশ্চর্যতায়। সে ধীরে হাত বাড়িয়ে সাহাদাত আঙুলটি ইলহানের মুখ জুড়ে স্লাইড করতে লাগলো। ইলহানের সরু লম্বা নাক, ঘন কালো চোখের পাপড়ি, সিগারেট-ছোঁয়া চিকন ঠোঁট, চোয়ালের ধার ঘেঁষে ছড়িয়ে থাকা দাড়ি, মিলিয়ে তার চেহারার গঠনে তৈরি হয়েছে কঠিন অথচ শান্ত এক সৌন্দর্য। গায়ের রং সোনালি-উষ্ণ, সূর্যছোঁয়া। মনে হয় রোদে পোড়া নয়, বরং রোদের নিজস্ব আলোই যেন তার গায়ে গিয়ে থিতু হয়ে আছে। ডান চোখের ভ্রু থেকে চোখের নিচ পর্যন্ত নেমে আসা কাটা দাগটি নূরাইসার দৃষ্টি আটকে রাখলো কিছুক্ষণের জন্য। এই দাগ... এই ক্ষতচিহ্নগুলো ইলহানের সারা শরীরজুড়ে ছড়িয়ে আছে। তার কঠোর জীবনের সাক্ষী। আর সেই চিহ্নগুলো দেখে নূরাইসা বুঝেছে, তার স্বামী শুধু সুদর্শন মানুষ নয়, একজন দক্ষ সৈনিক। একজন যুদ্ধফেরা যোদ্ধা।

নূরাইসা আলতো করে ইলহানের ঠোঁটের ওপর আঙুল বুলিয়ে নিলো। তারপর ধীরে, খুব ধীরে হাত উঠিয়ে পৌঁছে গেলো সেই কাটা দাগের কাছে। আঙুল ছুঁতেই যেন বুকের ভেতর কেঁপে উঠলো তার। নিঃশ্বাসের ওপর নিঃশ্বাস ফেলে, নরম ফিসফিসে স্বরে বলে উঠলো—

-"ভালোবাসি, আমার মোল্টেন হার্ট... আপনার ঐ চোখের প্রেমে পড়েছি আমি, জানেন? আমার মনের খবর রাখেন আপনি? আপনার সেই চোখ দেখার অধিকার শুধু আমার। আপনি যখন ঐ চোখে অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকান, আমার সহ্য হয় না। ঐ চোখে শুধু আমি থাকবো!

আপনার চোখ দুটো... আহ, কী ভয়ংকর সুন্দর! যেন ঝড়ের ভেতর লুকানো সোনালি আগুন, একবার তাকালেই মনে হয় আমাকে গলিয়ে ফেলবে। সূর্যের আলো পড়লে কত রহস্য ভেসে ওঠে জানেন? সোনালি রঙে লুকিয়ে থাকা লালচে আভা... যেন ঠিক আমার নাম ধরে ডাকে। এই চোখে তাকালে মনে হয় আপনি আমাকে পড়ে ফেলেন, আমার অবলা কথা, আমার চুপচাপ কান্না, আমার গোপন ভালোবাসা, সব।আপনার চোখ দুটো আমার ওপর এমনভাবে ঝরে... যেন আমি আপনাকে চাই না, বরং আপনার চোখই আমাকে দাবি করে। এই আগুনে-রঙা, অদ্ভুত অপার্থিব চোখ, শুধু আমার। আমি ছাড়া অন্য কারও দিকে এভাবে জ্বলবে, তা ভাবতেও পারি না।"

নূরাইসার কথার ভারী আবেগে ঘরটা যেন নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘুম ও জাগরণের মাঝখানে আটকে থাকা ইলহান ফিসফিসে গলায় উত্তর দিলো—

-"এই চোখে শুধু একজনের মুখশ্রী ভাসে... তার উপস্থিতিতেও, তার অনুপস্থিতিতেও। আর সেই মুখশ্রী আপনারই, নূরেজান।"

অপ্রত্যাশিত এই স্বীকারোক্তিতে নূরাইসা চমকে উঠে তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নিলো, যেন তার ছোঁয়া হঠাৎই খুব বেশি দাহকর হয়ে উঠেছে। ইলহান ধীরে চোখ মেলে তাকাল তার দিকে, ঘুমে ভারী চোখ দুটো আরও ছোট হয়ে এসেছে, তবু সেই চোখের কোণে জমে থাকা নরম স্মিত হাসি যেন নূরাইসার বুকের ভেতর গলে যেতে থাকে। লজ্জায় নূরাইসা মুখ গুঁজে ফেলল তার বুকে, হৃৎস্পন্দনের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেয়ে আরও অস্থির হয়ে উঠল।

ইলহান হালকা হাসিতে একটু কাছে ঝুঁকে ফিসফিসে বলে উঠল—

-"জালানছেন কেনো? ঘুমোতে দেবেন না? সন্ধ্যার সেই মুহূর্ত আবার চান?"

এই একফোঁটা বাক্যের উত্তাপে নূরাইসার কান পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল, যেন তার ভেতরকার সব গোপন স্মৃতি জ্বলে উঠেছে একসাথে। তড়িঘড়ি উঠে যেতে চাইতেই ইলহান দ্রুত তার কব্জি ধরে টেনে বালিশে ফেলে দিলো, যেন ওর ভেতরের অদৃশ্য ঝড়টা আর ধরে রাখতে পারল না। নিজের দেহপুঞ্জ দিয়ে তাকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরতেই নূরাইসার নিঃশ্বাস হঠাৎ থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। তার গলা ভীষণ ভারী, কম্পমান, নিশ্চুপ ঘরের অন্ধকারে সেই কম্পন আরও গভীর হয়ে শোনা যায়—

-"আমার থেকে পালিয়ে যাওয়ার জায়গা আছে আপনার? আপনার শেষ গন্তব্য, এই ইলহান। আর আপনার শুরুও আমি।"

তার এই কথাগুলো নূরাইসার হৃদয়ের নরমতম স্থানে গিয়ে ধাক্কা মারল। লজ্জায় চোখ নামিয়ে মিনমিন করে বলল—

-"খিদে পেয়েছে আমার..."

এক মুহূর্তে ইলহানের মুখভঙ্গি বদলে গেলো। দুপুরে যে দু’জনে খেয়েছিল তার পর থেকে সে নূরাইসাকে ঘর থেকে বের হতে দেয়নি, খাওয়ার তো দূরের কথা। অপরাধবোধে ভারী গলায় বললো—

-"আমি... আমি এখুনি কিছু বানিয়ে নিয়ে আসছি!"

বিজ্ঞাপন

নূরাইসা হতবাক হয়ে তার হাত চেপে ধরলো।

-"আমি থাকতে আপনি কেন রান্না করবেন? আপনি বসুন... আমি বানিয়ে নিয়ে আসছি।"

কথাটি বলেই যেই নূরাইসা বিছানা থেকে পা নামিয়ে হাঁটার চেষ্টা করল, অমনি তীব্র ব্যথায় তার চোখ–মুখ শক্ত হয়ে এল। মুহূর্তেই শরীর ঢলে আবার বিছানায় বসে পড়ল। ইলহান দ্রুত এগিয়ে এলো, মুখে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা—

-"বেশি ব্যথা করছে জান? ডাক্তার আংকেলকে ডাকি?"

নূরাইসার গাল রক্তিম লজ্জায় রঙ বদলাচ্ছে। তার ওপর এমন প্রশ্ন! চিবিয়ে চিবিয়ে বলল—

-"মাথা খারাপ হয়েছে আপনার?"

ইলহান মাথা চুলকে অপরাধী বাচ্চার মতো দাঁড়িয়ে রইল, যেন কিছুই বুঝতে পারছে না। নূরাইসা হতাশার নিঃশ্বাস ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু সে হাঁটবার আগেই ইলহান তাকে পাজাকোল করে তুলে নিল। হতভম্ব নূরাইসা চিৎকার করে উঠল—

-"আরে কী করছেন! নামান আমাকে!"

কিন্তু ইলহান একটাও কথা বলল না। দৃঢ় বাহুতে তাকে আঁকড়ে ধরে সোজা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।ওপেন কিচেনে পৌঁছে রান্নাঘরের প্রশস্ত কাউন্টারের ওপর তাকে বসিয়ে দিল। তারপর চুলার দিকে গিয়ে পানি বসালো, আর পেঁয়াজ–মরিচ বের করে কাটতে শুরু করল। নূরাইসা অবাক হয়ে নেমে তার পাশে এসে দাঁড়াল—

-"আমাকে দিন, আমি করছি। নুডলস খাবেন?"

ইলহান আর এক মুহূর্ত তাকালো তার দিকে। পরমুহুর্তেই তাকে আবার তুলে কাউন্টারে বসিয়ে দিল।দুই হাত কাউন্টারের দু’পাশে রেখে সামান্য ঝুঁকে শান্ত কিন্তু কর্তৃত্বপূর্ণ গলায় বলল—

-"আপনার স্বামী রান্না করতে পারে। আপনি বসে থাকুন। আমি সামলে নিতে পারব।"

নূরাইসা নরম স্বরে প্রতিবাদ করল—

-"আমি জানি আপনি রান্না পারেন... কিন্তু আমি থাকতে আপনি কেনো রান্না করবেন? আপনি বসুন, আমি..."

বাকিটা বলার সুযোগ হলো না। এর আগেই ইলহান তার ওষ্ঠ চেপে ধরল নিজের অধর দিয়ে, তাকে চুপ করাতে। ওষ্ঠ ছেড়ে ইলহান শান্তভাবে বলল—

-"চুপচাপ বসে থাকুন।"

নূরাইসা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ইলহানের চলাফেরা, হাতের নড়াচড়া, তার গম্ভীর মনোযোগ, সবকিছু এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছিল। গরম পানির ফোঁটা শব্দ, কাটা সবজির খচখচে আওয়াজ আর রান্নাঘরের উষ্ণ আলো মিলে ঘরটাকে এক আলাদা নরম আবহে ঢেকে রাখছিল।

ঠিক তখনই পায়ের শব্দ শোনা গেল। নূরাইসা মুখ তুলে তাকালো, ওপেন রান্নাঘর হওয়ায় সেখান থেকেই সব দেখা যায়। তানভীর, রুহান আর বিহান নিচে নামছিল।

তারা তিনজন এগিয়ে এসে ইলহানকে রান্না করতে দেখে রুহান চোখ গোল করে বলে উঠল—

-"কি রান্না করছো ভাইয়া? আমাদেরও খিদে পেয়েছে। গেম খেলতে খেলতেই কখন এত রাত হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না!"

ইলহান না তাকিয়েই গম্ভীর স্বরে বলল—

-"তুই বাসায় যাস নি?"

বিহান শার্টের হাতা গুটিয়ে এগিয়ে এলো। নিঃশব্দে পাশে দাঁড়িয়ে সবজি কাটতে কাটতে বলল—

-"বড় মা যেতে দিলেন না।"

ইলহান শুধু মাথা নাড়ল। তারপর রুহানের দিকে তাকিয়ে আদেশ করল—

-"নুহা আর আফরিনকে ডেকে নিয়ে আয়।"

ঠিক তখনই নূরাইসা কাউন্টার থেকে নেমে দ্রুত

বলল—

-"আমি যাচ্ছি!"

এক নিঃশ্বাসে সে সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল। ইলহান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, এইমাত্র যে ব্যথায় হাঁটা দূরের কথা, দাঁড়াতেও কষ্ট পাচ্ছিল... সে এখন দৌড়াচ্ছে!

কিছুক্ষণ পর নুহা আর আফরিন ঘুম–ঘুম চোখে, দুলতে দুলতে নিচে নেমে এল। তারা সোফা ধরেই ড্রয়িং রুমে বসে পড়ল। এদিকে রান্নাঘরে রুহান, তানভীর, বিহান আর ইলহান, চারজনের জমাটি টিমওয়ার্কে রান্নাঘর গমগম করে উঠল। হাসাহাসি, থালা–বাটির শব্দ, চুলায় উঠতে থাকা ধোঁয়ার গন্ধ, পুরো ঘর যেন এক অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরে গেল।

রান্না শেষ হলে সবাই মিলে খাবারগুলো ড্রয়িং রুমের প্রশস্ত ফ্লোরে সাজিয়ে রাখল। শীতের রাত। মেঝে হালকা ঠান্ডা। সবাই গোল বৃত্ত করে বসে পড়ল। খাবার মেনুও জমকালো, গরম ধোঁয়া ওঠা নুডলস,চিকেন ফ্রাই করে, তাজা ভাপে ওঠা মোমো, আর সাথে সফট ড্রিংকস। ভাই-বোনদের এই মধ্য রাতের ভোজ সারা বছর চলে। তাই ইলিনা বেগম ও নাজনীন বেগম অনেক কিছুই ডিপ ফ্রিজে রেখে দেয়, যাতে ছেলে মেয়েরা রাতে ভেজে খেতে পারে। এই উষ্ণ, হাসিখুশি বিশাল টেবিলবিহীন রাতের ভোজ যেন মুহূর্তেই সবাইকে আরও কাছাকাছি এনে ফেলল, ঘরের আলো, খাবারের গন্ধ আর সবার উপস্থিতিতে রাতটা যেন নিঃশব্দে উৎসবে পরিণত হলো।

নূরাইসা আফরিনের পাশে বসেছিল। আফরিনের অন্য পাশে নুহা। একটু পরেই ইলহান এসে নূরাইসার ডানদিকে গিয়ে বসে পড়ল। তারপর রুহান, তানভীর আর বিহান এসে সারি ধরে জায়গা নিলো। বিহান এসে নুহার পাশেই বসল, আর সেই বসার মুহূর্তেই নুহার ঘুম যেন হাওয়া হয়ে গেল। সে একবারে ছোট হয়ে, জড়োসড়ো হয়ে বসে রইলো। আড়চোখে বারবার তাকাচ্ছে বিহানের দিকে। কিন্তু বিহান, শীতল পাথরের মতো, একবারও তার দিকে তাকালো না। নুহার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। এক অদৃশ্য বিষণ্নতা গলা অবধি এসে আটকে গেল। মনের ভেতর হাজারো প্রশ্ন ছুটে চলল, "তাকে কি একটুও ভালোবাসা যায় না? সে কি তবে বিহান ভাইয়ের যোগ্য নয়? কেনো... কেনো বিহান ভাই তাকে ভালোবাসে না?"

চারপাশে সবাই খুনসুটি করে, হাসতে হাসতে খাচ্ছে।ইলহান আর বিহান আর্মি ক্যাম্পে এইভাবেই দলের সঙ্গে বসে খেতো। কত মজা হতো তখন! সেসব দিনের গল্প মনে পড়তেই তারা দু’জনে স্মৃতির দরজা খুলে দিলো, জঙ্গলে নিজেরা পাখি ধরে ভেজে খাওয়া, নদীতে নেমে মাছ ধরা, আগুন জ্বেলে দল বেঁধে রাত কাটানো... তাদের গভীর, উত্তেজনাভরা কথাগুলো সবাই যেন মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। রাতের নিস্তব্ধতা আর তাদের গলা, সব মিলিয়ে মুহূর্তটি যেন অন্য এক জগতে নিয়ে যাচ্ছিল। শুধু নুহা ছাড়া। তার ভেতরে ছায়া জমেছে। বাইরে হাসির ঝলকানি, গল্পের স্রোত, আর তার মন ভরে আছে অকারণ ব্যথায়, অপ্রকাশিত অনুভবে।

এদের এই রাতজাগা আড্ডা, এইভাবে রান্না করে খাওয়া, আজকের নতুন কিছু নয়। বহুদিনের অভ্যাস। যে কেউ রাত জেগে থাকলে বাকি সবাইকেও ঘুম থেকে তুলে এই ভোজ আয়োজন করবেই। রাতে একত্র হয়ে খাওয়া, গল্প করা, হাসাহাসি করা, এটাই তাদের দিনের শেষ রীতি। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। শুধু নুহার অন্তরের অস্থিরতা ছাড়া, যা আগুনের আলোতেও গলে গেল না।

.

বিকেলের ম্লান আলোয় তিন বোন, আফরিন, নুহা ও নূরাইসা, মার্কেটের ভিড় পেরিয়ে হাঁটছিল। কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কেনাকাটা সেরে ফেরা তাদের উদ্দেশ্য। নুহার ব্যান্ডেজটাও নতুন করে করে দেওয়া হয়েছে, তাই তার চলাফেরায় আজ একটু বাড়তি সতর্কতা। তবু তিন বোনের মুখে হাসি, কথায় ফেরির মতো টুংটাং শব্দ, মনে হচ্ছিল দিনের ক্লান্তি তাদের ছুঁতেই পারেনি। ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্যে চোখে পড়ল এক চেনা মুখ। আরিবা। তাদের দেখা মাত্রই সে ঠোঁট বাঁকিয়ে এগিয়ে এলো। নূরাইসাকে লক্ষ্য করে ব্যঙ্গমিশ্রিত স্বরে বলল—

-"কি মনোহরের দুর্বলতা, কেমন আছো?"

নূরাইসা চুপ। কিন্তু চুপ থাকল না আফরিন ও নুহা। তারা একসঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ালো, দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

-"আমার ভাইকে কোনো নিকনাম দিবে না, বলে দিচ্ছি।"

আরিবা হেসে উঠল, সেই হাসিতে রাগ ও বিদ্বেষের সূক্ষ্ম রেখা। তারপর নূরাইসার দিকে তাকিয়ে, যেন তাকে খোঁচাতেই জন্মেছে এমন ভঙ্গিতে বলে উঠল—

-"নিজে কথা বলতে পারো না বলে বোনদের সঙ্গে নিয়ে ঘুরছো? তোমার হয়ে কথা বলানোর জন্য?"

এইবার নূরাইসা থেমে রইলো না। সে ধীরে সামনে এগিয়ে এল।আফরিন ও নুহাকে থামিয়ে দিয়ে, মুখে এক অদ্ভুত শান্ত অথচ ধারালো দৃঢ়তা নিয়ে বলে উঠলো—

-"রাস্তার মানুষের কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না।"

আরিবার চোখ চকচক করে উঠল। ব্যঙ্গের তীর আরও তীক্ষ্ণ হয়ে তার ঠোঁটে ঠাঁই নিল—

-"হাহ! তাই নাকি? তো ইলহান তো আগামীকাল চলে যাবে। তখন কি করবে তুমি? সেখানে তো সেই আমার সাথেই তাকে থাকতে হবে! তুমি এখানেই স্বামীর পাশে থাকতে পারো না, দূরে থেকে আর কি করবে?"

সে আরও ঝুঁকে এসে মাথা কাত করে ফিসফিসিয়ে বলল—

-"আমার সাথে লড়াই করতে পারবে তুমি? সাহস আছে? ইলহানকে একবার পেলে কিন্তু আমি আর এবার ছাড়বো না... নিজের করেই ছাড়বো!"

পাশ দিয়ে হাওয়া বইল, তাতে আরিবার কথার বিষ যেন ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। রাস্তার এক পাশের দোকানিরা মুখ তুলল, বাতাসে টানটান উত্তেজনা জমে উঠল। নূরাইসার মুখে প্রথমবারের মতো দেখা গেলো সেই নিঃশব্দ ঝড়, যা শব্দ করে না, কিন্তু নীরবে সবকিছু ভেঙে দিতে পারে। এই পর্যায়ে আফরিন ও নুহা আর কোন কথা বলল না। যা বলার, যা করার, এখন নূরাইসাকেই করতে হবে। স্বামী তার, লড়তেও হবে তাকেই। দুই বোন চুপচাপ পিছিয়ে দাঁড়ালে নূরাইসা এক পা সামনে এগিয়ে এল। মুখে হালকা, তীক্ষ্ণ হাসি। সে শান্ত অথচ কঠিন কণ্ঠে বলল—

-"আমি তোমাকে আজ চ্যালেঞ্জ করলাম, আরিবা আপু। আমি আমার স্বামীর দুর্বলতা হব না... আমি তার শক্তি হবো। আমি বেঁচে থাকতে তাকে তুমি কোনোদিন পাবে না। আর আমি মরে গেলেও যে পাবে, সেই আশা করো না। আমি মরে গেলেও তার ক্ষমতা হবে না অন্য কাউকে বউ করার। তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই নূরাইসা তার বউ থাকবে। মরার পরেও।"

আরিবা উচ্চস্বরে হেসে উঠল। সেই হাসি যেন কাটার মতো বাতাসে বিঁধে গেল।

-"কি করবে তুমি? তোমার মতো ভীতু মেয়ে কিছু করতে পারবে? তুমি আমার সঙ্গে পারবে? ভুলে যেও না, আমি ডিফেন্সে আছি। তোমার ক্ষমতা আমার ক্ষমতার কাছে চুনোপুটি! যদি পারো তো আর্মিতে এসো। তারপর দেখা যাবে কার কত ক্ষমতা! অবশ্য তোমার মতন ভীতু মেয়ে সাথে লরতেও আমার বিবেকে বাধে। আমার লেভেলে এসো তারপর না হয় সমানে সমানে টক্কর হবে!"

নূরাইসা সাধারণত রাগে না, কিন্তু আজকের অপমান তার বুকের ভেতর আগুন ধরিয়ে দিল। চোখে ঝড় জমে উঠল। সে ক্ষিপ্ত স্বরে বলে উঠল—

-"অপেক্ষা করো আমার জন্য। আমি তোমাকে আর্মিতেই হারাবো। যেই ডিফেন্স থাকা নিয়ে তোমার এত অহংকার, সেই ডিফেন্সই হারার জন্য প্রস্তুত হও।এমন হারাবো... এমন হারবে তুমি, লজ্জায় আর কোনোদিন এই মুখ দেখাতে পারবে না! ইলহানকে নিজের করে পাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করার সাহস টুকু হবে না তোমার এ জীবনে, কথা দিলাম!"

আরিবা ঠোঁটে হালকা বিদ্রূপ টেনে বলল—

-"বেশ, ঠিক আছে। এক মাস, হ্যাঁ, মাত্র এক মাস যদি আর্মিতে থাকতে পারো, কঠোর ট্রেইনিং সহ্য করতে পারো, তাহলেই আমি হার মেনে নেবো। কিন্তু তুমি আর্মিতে আসবে কিভাবে? সেই যোগ্যতাও তো তোমার নেই!"

নূরাইসা খুব শান্তভাবে হেসে উঠল, যেন তার ভেতরের ঝড় অন্য কেউ শুনতে পায় না।

-"কি আছে আর কি নেই সেটা তো পরে তুমি বুঝেই যাবে। আপাতত আসি... দেখা হবে আর্মিতে। তৈরি থেকো জীবনে জঘন্য ভাবে হেরে যাওয়ার জন্য!"

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প