চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট জায়গাটা যেন অন্য এক পৃথিবী। ভোরের বাতাসে হালকা কুয়াশা গড়িয়ে পড়ছে ঘাসের মাথায়, যেন প্রকৃতি নিজেই নিঃশব্দ সামরিক অভিবাদন জানাচ্ছে। গেটের সামনে দাঁড়ানো দু’জন সেনাসদস্যের কাঁধের ব্যাজে সকালের রোদ পড়ে চকচক করছে, সেই আলো যেন তাদের দায়িত্ববোধের গর্বকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে। দূরের ট্রেনিং গ্রাউন্ড থেকে হুইসেলের তীক্ষ্ণ শব্দ ছুটে আসছে, এটা নিয়মের, শৃঙ্খলার, আর কর্তব্যের সেই নির্দয় ঘোষণা, যাকে সম্মান করতে হয় নিঃশ্বাস পর্যন্ত থামিয়ে।
মাঠের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে রুহান। আজ সে একজন ডাক্তার, কিন্তু তার পরিচয় শুধু সাদা অ্যাপ্রনের ভেতর থেমে নেই। আজ সে বাংলাদেশ আর্মির একজন অফিসার-ট্রেইনি। তার বাদামি চোখে ভোরের আলো পড়ে এক ধরনের দৃঢ়তা তৈরি করেছে। ধীর, স্থির পায়ে সামনে এগোতে লাগল সে। মেডিক্যাল কোরের প্রশাসনিক ভবনটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে শক্ত, দৃঢ়, নির্লিপ্ত, কিন্তু তার দেয়ালে যেন অদৃশ্যভাবে খোদাই করা আছে শতাধিক যোদ্ধার জীবনদায়ী ইতিহাস।
ভেতরে প্রবেশ করতেই রুহানের সামনে দাঁড়ালো একজন মধ্যবয়সী, কঠোর চেহারার অফিসার, মেজর আরেফিন হাসান, মেডিক্যাল ট্রেনিং সুপারভাইজার।
তার গভীর, ভারী কণ্ঠস্বর পুরো কক্ষটাকে যেন আরও ছোট করে ফেলল—
-"ডাঃ রুহান ইয়াসির দেওয়ান, এসো ভেতরে এসো!"
রুহান সভাবসুলভ অমায়িক হাসি নিয়ে এগিয়ে গেল।
-"জ্বি স্যার।"
কক্ষে ঢুকেই সে সোজা হয়ে স্যালুট করল। মেজর আরেফিন ডেস্কে থাকা ফাইলে চোখ বুলিয়ে নিলেন, তারপর শান্ত অথচ প্রভাবশালী স্বরে বললেন—
-"তোমাকে মেডিক্যাল কোরে ইন্ডাক্ট করা হয়েছে।বেসিক মিলিটারি ও ফিল্ড মেডিক্যাল ট্রেনিং ঠিকঠাক হচ্ছে তো? এর পর কিন্তু তোমায় অ্যাসাইন করা হবে ‘৬ মেডিক্যাল কোম্পানি’-তে। সেখানে তোমাকে ফিল্ড ওয়ার্ক, ক্যাজুয়ালিটি হ্যান্ডলিং, ইমার্জেন্সি ট্রায়াজ, সব শিখতে হবে। Ready?"
রুহান বুক ভরে এক নিঃশ্বাস নিল। তার চোখে স্থিরতা, কণ্ঠে দৃঢ়তা।
-"Yes, Sir. Ready for duty."
মেজর আরেফিনের ঠোঁটের কোণে এক টুকরো ক্ষীণ হাসি খেলে গেল, যেন অনুমোদনের সীলমোহর।
-"Good. Welcome to the Army again."
এই এক মুহূর্তে রুহান অনুভব করল, বাইরের কুয়াশা সরে গেছে, কিন্তু তার সামনে যে পথ খুলে গেল,
তা কঠোর, গর্বময় এবং জীবন বদলে দেওয়ার মতো এক বাস্তব যাত্রা। মেডিক্যাল রুমে কিছুক্ষণ সৈনিকদের ফাইল দেখা শেষ করে রুহান ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে এলো। ভোরের আলো তখন আরও পরিষ্কার, বাতাসে একধরনের কঠোর সামরিক গণ্ডির ভাব। ট্রেনিং ব্যারাকে প্রবেশ করতেই চারপাশের দৃশ্য যেন নতুনভাবে চোখে ভেসে উঠল, একদিকে সদ্য অনুশীলন শেষ করা সৈনিকরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে, কারও নিশ্বাস ভারী, কারও চোখে দৃঢ়তার দীপ্তি। রুহান দাঁড়িয়ে সেসব চেহারা দেখছিল আর মনে মনে ভাবছিল, এখানকার সম্পর্কগুলো অন্যরকম।এখানে বন্ধুত্বের সঙ্গে শৃঙ্খলা মিশে থাকে, সময়ের সঙ্গে দায়িত্ব। এমন এক পৃথিবী, যেখানে জীবন প্রথমবারের মতো কঠোরতার প্রকৃত সংজ্ঞা পায়।
ঠিক তখনই রুহানের পাশে এসে দাঁড়ালো সাবলীল হাসি নিয়ে আত্মবিশ্বাসী এক তরুণ অফিসার, ক্যাপ্টেন রাকিব মাহমুদ, যিনি ট্রেইনিদের দৈনন্দিন রুটিন তদারকি করেন। রাকিব এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে বললেন—
-"Hello, Doctor. আর্মিতে ডাক্তার মানেই শুধু চিকিৎসক নয়, একজন সৈনিকও। এখানে আপনার প্রতিটি সিদ্ধান্ত কারো জীবন বাঁচাতে পারে। তো কেমন লাগছে সেনা জীবন?"
রুহান অভ্যর্থনার হাসি দিয়ে হাত মেলাল। বললো—
-"অসাধারণ লাগছে। জীবনে যেই এডভেঞ্চার চেয়েছি সেটা পেয়েছি।"
ঠিক তখন পেছন থেকে এগিয়ে এলো আরও দুইজন নতুন মেডিক্যাল অফিসার, ডাঃ উপমা আহমেদ এবং ডাঃ নোমান জুনায়েদ, যারা রুহানের সাথেই এবার মেডিক্যাল কোরে যুক্ত হয়েছে। তাদের চোখে উত্তেজনা, ধাক্কা, একটু ভয়, সব মিলিয়ে নতুন জীবনের এক অচেনা আলোছায়া। ডাঃ উপমা মুচকি হেসে বলল—
-"ট্রেনিং কেমন চলছে বয়েস?"
রাকিব হালকা হাসলেন।
-"কঠিন তবে প্রয়োজনীয়। যুদ্ধক্ষেত্র চায় দক্ষতা, আবেগ নয়। তাই যথেষ্ট কঠোর ভাবেই আপনাদের ট্রেইনিং নেওয়া উচিত!"
রুহান একটু হাস্যরস মিলিয়ে উত্তর দিল—
-"আরে এগুলো তো বাচ্চাদের খেলা। মাত্রই তো শুরু, সামনে আরও কঠিন ট্রেনিং আসছে!"
তার কথায় সবাই হেসে উঠল। এখানে কেউ জানে না রুহানের সম্পূর্ণ পরিচয়। কেউ জানে না ইলহানের সঙ্গে তার সম্পর্ক, তার পটভূমি। সবই ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রাখা, যেন কেউ তাকে বিশেষ ট্রিটমেন্ট না দেয়, যেন সবাই তাকে শুধুই একজন অফিসার-ট্রেইনি হিসেবে দেখে।
রুহান এখানে এসেছে প্রায় ২০ দিন হয়ে গেল। এই ২০ দিনে সে বেসিক মিলিটারি ট্রেনিংয়ে ডুবে আছে, প্রথম সপ্তাহেই তারা শিখেছে— অ স্ত্রের মৌলিক ব্যবহার, গ্রাউন্ড মুভমেন্ট, সেলফ-ডিফেন্স, কমব্যাট ফিটনেস, নাইট ড্রিল, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এসবই রুহান নূরাইসাকে বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে বলেছে। গতকাল নূরাইসা এসেছে, এই খবর শুনে সে দেখা করতেও গেছে। নূরাইসা পরিবার থেকে দূরে থাকার দুঃখ ভুলে রুহানের সঙ্গে একটি শান্ত, সুন্দর সময় কাটিয়েছে। তার চোখেমুখের মনখারাপ রুহানের কথায় অনেকটাই মিলিয়ে গেছে।
এখন সকাল ৫টা, PT (Physical Training)।
চারদিকে কুয়াশা আর ঠান্ডা বাতাসের ভেতর সামরিক শৃঙ্খলার তীব্র উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। মাঠজুড়ে দৌড়, পুশআপ, অবস্ট্যাকল কোর্স, সৈনিকদের মতোই ডাক্তারের শরীরকেও শক্ত হতে হবে, কারণ আহত সৈনিকের কাছে পৌঁছতে কখনো গুলি–বারুদের মাঝেই ছুটে যেতে হয়। রুহান চারদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ প্রশ্নটা করে ফেলল—
-"স্যার... এখানেই কি সৈনিকদের ট্রেনিং দেওয়া হয়?"
ক্যাপ্টেন রাকিব সামান্য ঘুরে দাঁড়ালেন। তার চোখে সেই অভিজ্ঞ, কঠোর অথচ নিরাপদ দৃষ্টি—
-"হ্যাঁ, ডাক্তর রুহান। কিন্তু এটা পুরো ট্রেনিং গ্রাউন্ডের একটা অংশ মাত্র। আর্মির আসল প্রশিক্ষণ, যা সৈনিকদের সত্যিকারের যোদ্ধা বানায়, তা হয় আরও ভেতরে, আরও কঠোর এলাকায়।"
তিনি আঙুল তুলে দূরের দিকে ইশারা করলেন।কাঁটাতারের সীমানা পেরিয়ে পাহাড়ের ঢালে লুকিয়ে আছে সেই প্রশিক্ষণ মাঠগুলো। সেখানে বাতাসও যেন ভারী, শোনা যায় দম ফেলার শব্দ, আর এক সেকেন্ড দেরি কোথাও পরিণত হতে পারে বিপর্যয়ে। ক্যাপ্টেন রাকিব আবার বললেন—
-"ওখানে হচ্ছে কমব্যাট ট্রেনিং এরিয়া। সেখানে সৈনিকরা শিখে কিভাবে বাঁচবে, কিভাবে লড়বে, এবং দেশের জন্য শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকবে।"
রুহান চুপচাপ তাকিয়ে থাকে সেই দিকটায়। মনে হয় যেন প্রাচীন কোনো যুদ্ধক্ষেত্র ঘুমিয়ে আছে সেখানে, শুধু সৈনিকদের পায়ের শব্দেই প্রতিদিন রাতের ঘুম ভাঙে। ক্যাপ্টেন রাকিব বললেন—
-"আপনাদের ডাক্তার হিসেবে সব ট্রেনিং এখানেই হবে না, ডাক্তর। যদিও মিলিটারি বেসিকস, দৌড়, অবস্ট্যাকল, ফিল্ড সারভাইভাল, এসব এখানেই করা হবে, কিন্তু সৈনিকদের যে অতিরিক্ত রিগোরাস ট্রেনিং, সেগুলো অন্য জোনে হয়।"
রুহান ধীরে মাথা নাড়ল। উচ্ছসিত কন্ঠে বলল—
-"মানে... একজন ডাক্তারও বুঝে নিবে সৈনিকেরা কী পার করে?"
রাকিব হাসলেন—
-"Exactly. ডাক্তার যখন জানে একটি সৈনিক কী ধরনের কষ্ট আর চাপ সহ্য করে ট্রেনিংয়ে, তখন সেই সৈনিক আহত হলে তাকে বাঁচাতে ডাক্তার দ্বিগুণ মনোযোগী হয়। আপনি যেসব জায়গায় আজ তাকাচ্ছেন, কাল, পরশু, কিংবা তারও পর আপনাকে সেখানেই দৌড়াতে হবে, সেখানেই আহতদের টেনে আনতে হবে, সেখানেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন জীবন আগে বাঁচানো জরুরি।"
এক মুহূর্তের জন্য বাতাসটা অদ্ভুত ভারী হয়ে উঠল।
দূর থেকে ট্রেনিং চিৎকার ভেসে আসছে—
-"ONE MORE ROUND! MOVE! MOVE!"
মাটিতে ধাক্কা লেগে থাকা সেই শব্দ যেন পুরো ক্যান্টনমেন্টের বুকে অনুরণিত হচ্ছে। রুহান মনে মনে বলল—
-"এই জায়গাটাই... তাদের গড়ে তোলে। আর আমাকেও।"
.
ক্যাপ্টেন রাকিব নতুন রিক্রুটদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাদের প্রতিদিনের রুটিন ধীরে, অথচ দৃঢ় স্বরে বলে দিচ্ছিলেন। চারপাশে হালকা কুয়াশা, ভোরের বাতাসে ঘাসের ডগা কাঁপছে, আর দূরে কোথাও যেন সামরিক ঘন্টাধ্বনির প্রতিধ্বনি ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার প্রতিটি নির্দেশে মনে হচ্ছিল যেন বাতাসও এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ায়। নূরাইসা মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি কথা শুনছিল। রুটিনের প্রতিটি অংশ, ভোর-পাঁচটার পিটিই থেকে শুরু করে রাতের ফায়ার-অফ পর্যন্ত, এক নিঃশ্বাসে তার মনে গেঁথে যেতে লাগল। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্ত থেকেই সে ওই কঠোর কিন্তু গর্বের জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। রুটিন ব্যাখ্যা শেষ হতেই ক্যাপ্টেন রাকিব গম্ভীর স্বরে বললেন—
-"এখন সবাই মাঠে যাবে। সেখানেই তোমাদের বেসিক ট্রেনিং শুরু হবে। প্রথমেই তোমাদের সাতজনের টিমে বিভক্ত করা হবে।"
কথাটুকু উচ্চারিত হতেই ব্যারাকের পরিবেশে যেন হালকা বৈদ্যুতিক কম্পন ছড়িয়ে পড়ল। রিক্রুটদের বুটের ঠকঠক শব্দ একসঙ্গে মিলে এক প্রকার যুদ্ধের পূর্বসঙ্গীত তৈরি করল। উত্তেজনা, ভয়, প্রত্যাশা, সব মিশে যেন বাতাসকে আরো ভারী করে তুলছে।ইনস্ট্রাক্টর হাতের ক্লিপবোর্ড খুলে উচ্চস্বরে নাম ডাকতে শুরু করলেন। সব শেষে ডাকলেন টিম-আলফা
১. নূরাইসা ইনায়া দেওয়ান।
২. সাজিদ হক – স্থিরস্বভাব, কিন্তু শক্তিশালী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা
৩. মাহিরা সাদমান – দ্রুত শিখে, পর্যবেক্ষণে তীক্ষ্ণ
৪. আয়ান বসাক – প্রাণবন্ত, দলকে মোটিভেট করে
৫. শুভ ইফতেখার – ঠান্ডা মাথার, বিশ্লেষণে দক্ষ
৬. লুবনা তাসফিয়া – ছোটখাটো, কিন্তু বিস্ময়কর সহনশীল
৭.হাবিব ওয়াহিদ – অ্যাথলেটিক, অনড় মনোযোগ
সাতজন এগিয়ে এসে এক সারিতে দাঁড়াল। নীরবতার মধ্যে তাদের চোখে চোখ পড়ল একবারের জন্য, একটি অদৃশ্য বন্ধন জন্ম নিল সেই মুহূর্তেই। মনে হলো—
-"আমরা একে অপরের ছায়া হয়ে থাকব। ব্যর্থ হলে একসঙ্গে ব্যর্থ, জিতলে একসঙ্গে জয়ী।"
ইনস্ট্রাক্টর কঠিন চোখে তাদের দেখে বললেন—
-"এটাই তোমাদের দল। সাতজন, এক শরীর, এক ছন্দ, এক উদ্দেশ্য। এখন মাঠে যাও।"
রিক্রুটরা সারিবদ্ধভাবে মাঠের দিকে হাঁটা শুরু করল,
বুটের ছন্দ যেন কোনো অজানা সংগীত তৈরি করছিল।নূরাইসা যখন মাঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, দূরের ট্রেনিং গ্রাউন্ডটা ধীরে ধীরে যেন তার সামনে উন্মোচিত হতে লাগল। বিস্তৃত সবুজ মাঠ, লম্বা দড়ির বাধা, কাঠের দেয়াল, ব্যালান্স বীম, সবকিছু দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল পরীক্ষকের মতো। বাতাসে ঘামের গন্ধ, ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ, আর ইনস্ট্রাক্টরদের কড়া শিস, সব মিলিয়ে চারপাশটা হয়ে উঠল আরও বাস্তব, আরও কঠোর, আরও নির্মম। যেন মাঠটা নিজেই বলে উঠছে—
"স্বাগতম... এখানে দুর্বলতার কোনো স্থান নেই।"
মাঠে পৌঁছাতেই বাঁশির ধারালো শব্দ ছিঁড়ে ফেলল চারপাশের নিস্তব্ধতা। রিক্রুটদের সারি মুহূর্তেই সোজা হয়ে দাঁড়াল। প্রথম দিনের বেসিক ট্রেনিং শুরু হলো একে একে, ওয়ার্ম-আপ দৌড়, বারপি, পুশ-আপ, সিট-আপ, ব্যালান্স-বীম পার হওয়া, দড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা, কাঠের বাধা ডিঙানো, দ্রুতগতির স্প্রিন্ট, আর শেষে ছোট রেঞ্জে ড্রাই-ফায়ার প্র্যাকটিস।
ঘাসে ধূলা উড়ছে, কারো শ্বাস ভারী, কারো মুখে দৃঢ়তা, মনে হচ্ছে যেন পুরো পৃথিবী সংকুচিত হয়ে এসেছে শুধু এই এক টুকরো মাঠে। টিম-আলফার সদস্যরা প্রথম দিনের ঘাম, ক্লান্তি আর উত্তেজনার ভেতরেও বুঝে গেল, এখানেই শুরু, এটাই তাদের প্রকৃত যুদ্ধের প্রথম ধাপ। পুরো রিক্রুট দলটাকে যেন আগুনে ঢেলে তাপ দেখে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, প্রথম দিনের চাপ সত্ত্বেও সবাই আশাতীতভাবে ভালো করছে।ক্লান্তিতে হাঁপাচ্ছে ঠিকই, তবু প্রত্যেকে শেষ পর্যন্ত টিকে যাচ্ছে। ইনস্ট্রাক্টরের গর্জন করা প্রশংসাসূচক কণ্ঠ বারবার ভেসে আসে—
-"গুড! স্টে ফোকাসড!"
-"রিক্রুটস, আই লাইক দ্য এনার্জি!"
সবাই যেন প্রথম দিনেই নিজেদের প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছে। কিন্তু এরপর—নূরাইসার পালা। প্রতিটা টিম জিতেছে। তার টিম থেকে শুধু সেই বাকি, সে জিততে পারলে তার টিম ও জিতে যাবে। তার বুকের ভেতরটা যেন কেঁপে উঠল। পায়ে বুটের ভিতরটাও একটু ঘেমে যাচ্ছে। ভয়টা সে চেপে রাখে, ঠোঁট শক্ত করে বাতাস টেনে নেয়। নিজেকে বুঝিয়ে ওঠে, পারতেই হবে। সবাই পারছে, আমিও পারব।
সে দৌড় শুরু করল। প্রথম একশ মিটার ঠিক ছিল, কিন্তু তারপরই গতি কমে এলো। বারপিতে হাত কেঁপে গেল। দড়িতে উঠতে গিয়ে দু’বার পিছলে নিচে নেমে এল। ইনস্ট্রাক্টর চিৎকার করে বলে উঠলেন—
-"রিক্রুট ০৭! ইউ ক্যান ডু বেটার! স্টেডি, স্টেডি!"
নূরাইসা চেষ্টা করছে, মনে মনে ভয়কে চেপে ধরে আরো একবার দড়িতে গ্রিপ নিল। কিন্তু হাত পিছলে গেল। কাঁধে যেন হালকা ব্যথার ঝাঁকুনি। আবার চেষ্টা করতে গেলেও শরীরটা মানতে চাইছিল না। দলের বাকিরা যেখানে সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো, সেখানে নূরাইসা প্রথম দিনেই বারবার ফেল করে দাঁড়িয়ে রইল। চোখেমুখে ক্লান্তি, শ্বাস ভারী, আর বুকের ভেতর ভয়টা যেন আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়। তবুও সে থেমে নেই, মনে হলো, এই ব্যর্থতা যেন তাকে থামিয়ে দেওয়ার নয়, বরং নতুন করে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার শুরু। প্রথম দিনের আর্মি ট্রেনিংয়ের কড়া বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নূরাইসা বুঝল, জীবনের এই অধ্যায় তাকে গড়ে তুলবে, কিন্তু প্রথমে তাকে ভেঙে ফেলবে। সে আবারও চেষ্টা করলো দড়ি চড়তে। কিন্তু এবারও হাত পিছলে মুখথুবড়ে মাটিতে পড়ল সে। আরও সঙ্গে সঙ্গে থুতনি কেটে র ক্ত বের হওয়া শুরু হলো।
.
দেওয়ান বাড়ি—
আফরিন আজ নুহাকে নিয়ে ভার্সিটি গিয়েছিল। নুহার সামনে HSC পরীক্ষা, তাই এখন মূলত কোচিং, ক্লাস কেবলই খুব দরকার হলে। নূরাইসা নেই, দুই বোনই বাড়িতে কেমন যেন শূন্যতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।উপরন্তু ৫–৬ দিন ধরে ফারাহও ভার্সিটিতে আসছে না। মেঘেরও কিছু একটা হয়েছে সেও আসে না। ওরা দু’জন না এলে স্মৃতি-ও আর আসে না। দিনশেষে কেবল নাদিম আর আশিককেই দেখা যায় বিভাগে।
আফরিনের নিজের ক্লাসে বন্ধু থাকলেও কেউ তেমন ঘনিষ্ঠ নয়, শুধু প্রয়োজনের সময়ই কথা হয়। তাই আফরিনও কেমন যেন একা হয়ে পড়েছে। আবার তাদের আলাদা ডিপার্টমেন্ট বলেই আফরিনকে প্রয়োজনে আসতেই হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। নুহা বাড়িতে একা বোর হচ্ছিল, তাই আজ তাকে নিয়েই আফরিন সারাদিন ভার্সিটিতে কাটালো। পরে দু’জনে সামান্য ঘুরে তারপর মাত্রই বাসায় ফিরল। বাড়িতে ঢুকেই ড্রয়িংরুমের দিকে চেয়ে দু'বোন একদম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
ড্রয়িংরুমে বসে আছে রায়হান তন্ময় এবং তার বাবা–মা। তিনজনেই সোফায় গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে আছে। অন্য পাশে বসে আছেন ইকবাল দেওয়ান, নাহিদ দেওয়ান, আর দাদা–দাদী। তানিয়া বেগম, নাজনীন বেগম এবং ইলিনা বেগম নাস্তার ট্রে এনে সামনে সাজিয়ে রেখে তারাও বসে পড়েছেন। ঘরে এক ধরনের নীরব উত্তেজনা, যেন কিছু হতে যাচ্ছে, কিন্তু দুই বোন কিছুই জানে না। আফরিন আর নুহা দ্রুতই বুঝে ফেলল, এভাবে সবার একসাথে বসা মানে ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ, খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের দু’জনেরই প্রথম প্রতিক্রিয়া, চুপিসারে উপরে উঠে যাওয়া। নজর এড়িয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতেই, ইলিনা বেগম হঠাৎ উচ্চস্বরে বলে উঠলেন—
-"ঐতো আফরিন–নুহা চলে এসেছে। এই, তোরা এইদিকে আয়!"
ইলিনা বেগমের উচ্চস্বরে বলা মাত্রই দুই বোনের পায়ের গতি থমকে গেল। এক মুহূর্তে ক্লান্ত মুখে বিরক্তির ছাপ যেন মিলিয়ে গেল, পরিবর্তে এল বাধ্যতার সংযত ভদ্রতা। আফরিন ও নুহা নিজেদের ভেতরের অস্বস্তি চেপে সামনে এগোল। ড্রয়িংরুমটি যেন হঠাৎই কিছুটা ভারী, কিছুটা আনুষ্ঠানিক,।ঝলমলে আলোয় অতিথিদের উপস্থিতি পুরো পরিবেশটাকে অচেনা করে তুলেছিল। সামনে বসে থাকা রায়হান তন্ময় ও তার বাবা–মাকে সালাম করতেই রায়হানের মা উঠে দাঁড়ালেন। মায়াবী হাসি নিয়ে তিনি আফরিনের মাথায় স্নেহে হাত রাখলেন, যেন বহুদিনের চেনা। তারপর আলতো টেনে পাশের আসনে বসালেন।
আফরিন থমকে গেল, কি হচ্ছে? কেন এমন আদর? কেন এই আনুষ্ঠানিক পরিবেশ? প্রশ্নগুলো তার চোখে ভেসে উঠলেও মুখে সে কিছু বলতে পারল না।
অন্যদিকে, নুহা ইলিনা বেগমের পাশে এসে দাঁড়িয়েই নিচু স্বরে তীব্র কৌতূহলে প্রশ্ন করল—
-"কি হচ্ছে গো মা? এমপি আর তার পরিবার আমাদের বাড়িতে কেন?"
ইলিনা বেগম গম্ভীর মুখে চোখের ইশারা করলেন—
-"চুপচাপ দাঁড়া... একটু পর সব বুঝতে পারবি।"
ড্রয়িংরুমে বসা সবাই যেন এক অদ্ভুত উত্তেজনায় নিস্তব্ধ। তানিয়া বেগম, নাজনীন বেগম, ইলিনা বেগম, নাস্তায় ভরা ট্রে টেবিলে রেখে তারাও গম্ভীর মুখে বসলেন। পরিবেশে একটা চাপা প্রত্যাশার আবেশ, যেন এই মুহূর্তেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথার দরজা খুলতে চলেছে। ঠিক তখনই রায়হান তন্ময়ের বাবা ইকবাল দেওয়ানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে কথাটা শুরু করলেন। কথা বলার ভঙ্গিতে ছিল রাজনীতিকদের স্বভাবসিদ্ধ দৃঢ়তা, কিন্তু চোখে ছিল একধরনের শ্রদ্ধা।
-"দেখুন দেওয়ান সাহেব... আমাদের পরিবার সম্পর্কে তো আপনাদের ধারণা আছে। রায়হান রাজনীতি করে, এটাও আপনারা জানেন। ছেলেকে ধরে বেঁধে বিয়ে দিতে পারিনি, ওর জেদ ছিল, আগে এমপি হবে, দেশের জন্য কাজ করবে, তারপর বিয়ে করবে।আমাদের পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাজনীতিতে আছি, তাই আমার সন্তানদের রাজনীতিতে থাকা খুব স্বাভাবিক। পাশাপাশি ব্যবসাও রয়েছে, দুটোই রায়হান দেখাশোনা করে। আমার ছোট ছেলে রিদওয়ানও ধীরে ধীরে রাজনীতিতে আসছে।"
তিনি একটু থামলেন। কথার ভেতরটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। একপলক আফরিনের দিকে তাকিয়ে আবারও বললেন—
-"কিন্তু ছেলের বয়স তো আর কম হলো না। তার মা টেনশন করতে করতে শেষ! তাই বললাম, যে ভাবেই হোক, এবার ওকে বিয়ে দিতেই হবে। পছন্দ আছে কিনা জানতে চাইতেই ও আফরিন মায়ের কথা বলেছে।"
ড্রয়িংরুমে বসে থাকা সবার দৃষ্টি যেন একইসঙ্গে আফরিনের ওপর এসে থামল। নুহা বিস্ময়ে বোনের দিকে তাকিয়ে রইল। আফরিনের নিঃশ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। রায়হানের বাবা শেষ কথাটা উচ্চারণ করলেন ধীর, দৃঢ়, স্পষ্ট কণ্ঠে—
-"আর সেই কারণেই আজ আমরা উপস্থিত হয়েছি, আমার ছেলের জন্য আফরিন মায়ের হাত চাইতে।"
ইকবাল দেওয়ান ও নাহিদ দেওয়ান মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনলেন। রায়হানের বাবার প্রতিটি শব্দ যেন ঘরের নিস্তব্ধতা আরও গভীর করে তুলল। এরপর দুজনেই তাদের বাবার দিকে ধীরেসুস্থে তাকালেন, চোখের ইশারায় যেন এক অদৃশ্য সম্মতি আদান–প্রদান হয়ে গেল। ইকবাল দেওয়ান হালকা হাসলেন, আর সেই হাসির আড়ালেই ফুটে উঠল তাঁর স্বভাবসিদ্ধ সংযম—
-"দেখুন তন্ময় সাহেব..." তিনি ধীর কণ্ঠে বললেন।
-"আফরিন আমার বোনের মেয়ে। ওকে আমরা নিজের মেয়ের মতোই বড় করেছি। কিন্তু ওর বাবাকে বাদ দিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া ছেলে–মেয়ের নিজস্ব পছন্দ–অপছন্দের কথাও আছে। আমি আমার বোন জামাইকে সব জানাব, আফরিনের সঙ্গেও কথা বলব, তারপরই আপনাদের স্পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত জানাতে পারব।"
রায়হানের মা আফরিনের দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন সামনে বসা মেয়েটিই তার ভবিষ্যতের গৃহের আলো। নরম সুরে, হাসিমাখা মুখে তিনি বললেন—
-"সমস্যা নেই। আপনরা ভেবে চিন্তেই জানাবেন,এটাই স্বাভাবিক।"
ঠিক তখনই নাজনীন বেগম ট্রে থেকে একটি কাপ তুলে রায়হানের মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন—
-"আফরিন, ওপর যাও। নুহা, ওকে নিয়ে যাও। বড়দের এখন কথা আছে, তোমাদের আর থাকা ঠিক না।"
আফরিনের গলা শুকিয়ে আসছিল। রায়হানের মা বারবার তার দিকে যেভাবে তাকাচ্ছিলেন, সেই তীক্ষ্ণ, মূল্যায়নমূলক, অদ্ভুত আগ্রহের দৃষ্টি তাকে অস্বস্তিতে ডুবিয়ে দিচ্ছিল। মুখে জোর করে হাসি ধরে রাখলেও চোখের গভীরে তার অস্থিরতা স্পষ্ট ছিল, আর নাজনীন বেগম সেটাই বুঝেছিলেন, তাই তাকে সরে যেতে বললেন।
নুহা তৎক্ষণাৎ এসে বোনের হাত ধরে ফেলল।দু'জন সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল দ্রুত, যেন নিচের ঘরের ভারী পরিবেশ থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে। সিঁড়ির মাঝপথে নুহা হঠাৎ আফরিনকে কনুই দিয়ে খোঁচা দিয়ে ফিসফিস করে বলল—
-"কিরে ভাই, আজকাল তোর এত বিয়ের প্রস্তাব আসছে কেন? আগে এমরিন রাহাফ, এখন আবার এমপি রায়হান তন্ময়! কি রে, এমপি মশাইয়ের নজরে তুই কখন পড়লি?"
নুহার কথায় রাগ, অবাকত্ব আর মজা, সবই মিশে ছিল। আর আফরিন, নিঃশব্দে হাঁটতে হাঁটতে শুধু গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বিরক্তি আর অস্থিরতার মধ্যে বলল—
-"কি জানি ভাই, কি হচ্ছে আমার সাথে এইসব? এই এমপি কে তো শুধু পোস্টারেই দেখেছি, এ আবার আমাকে দেখলো কবে?"
নুহা সামান্য কণ্ঠ চেপে হেসে বলল—
-"সেসব বাদ দে। এখন কি করবি সেটা বল?"
আফরিন চোখ কুচকে জবাব দিল—
-"কি করবো মানে?"
-"কাকে বিয়ে করবি?"
-"একটাকেও না। এই রাজনীতি আমার পছন্দ না। আরও এমরিন তো মিথ্যেবাদী।"
নুহা মাথা দুলিয়ে বলল—
-'হয়েছে বাবা, এত দাম বাড়িয়ে লাভ নাই। একটা কে বিয়ে করে ফেল তো। ওদিকে আমি একজনকে বিয়ে করতে চাই, সে আমাকে তাকে ভুলে যেতে বলে। আর এইদিকে তোকে দুইজন মানুষ বিয়ে করতে চায়। সবই কপাল ভাই, সবই কপাল!"
আফরিন চোখ কুঁচকে উত্তেজিত স্বরে বলল—
-'তুই বিহান ভাইকে এত বিয়ে করার জন্য পাগল? দাঁড়া মামুকে বলব বিহান ভাইদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যেতে!"
নুহা উচ্ছসিত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
-"সত্যি বলবি? তারাতারি বল ভাই, তাহলে তোর সাথে আমার বিয়ে টাও হয়েই যাবে এবার!"
আফরিন বিরক্তি নিয়ে তাকাল, নুহার দিকে এমনভাবে যেন চোখে চোখ রাখল, বাগানে কাঁটা লেগে গেছে মনে হচ্ছে। মুখে হতাশার হাসি ভেসে উঠল, কিন্তু চোখে আরও গভীর অস্থিরতা।
-"পাগল তুই? বিহান ভাই তোর প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, আর তোকে করবে বিয়ে? তোকে না বলেছে তাকে ভুলে যেতে, এখনো কোন আশায় বুক বাঁধিস?"
নুহা চোখ মেলে তাকিয়ে বলল—
-"তুই বুঝবি না। তুই তো কাউকে ভালোবাসিস নি। ভুলে যেতে বললেই ভুলা যায় না। আমার বিহান ভাইকেই লাগবে। সে যতই আমাকে ভুলে যেতে বলুক না কেনো, আমার আল্লাহর কাছে বার বার তাকে চাই। কত বার আল্লাহ, ফিরিয়ে দিবে? একবার তো কবুল করবেই।"
দু’জনের মধ্যে স্তব্ধতা। বাতাস যেন মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়েছে। নুহার কথায় আফরিনের চোখে হালকা রাগ আর মিশ্র অস্থিরতা ফুটে আছে। সিঁড়ির ধাপে ধাপে তাদের পদচারণায় ভরা ঘরের নিস্তব্ধতা যেনও এক ধরনের নাটকীয় উত্তেজনা তৈরি করেছে, যেখানে কেবল তাদের হৃদয়ের গতি শোনা যায়।