#সুর্যস্নাত_ভালোবাসা
ক্যান্টনমেন্টের রাতের হাওয়া আজ অদ্ভুত ঠান্ডা। চারপাশে থমথমে নীরবতা, দূরে কোথাও পাহাড়ের ঢালে রাতের পাখির ডাক ভেসে আসে। ক্যাম্পের শেষ প্রান্তে, যেখানে কিছু ঘন গাছপালা জঙ্গলের মতো ছায়া ফেলে রেখেছে, সেখানে এসে থেমে গেছে নূরাইসা। দৌড়াতে দৌড়াতে তার নিঃশ্বাস ভেঙে গেছে, শরীর কাঁপছে ক্লান্তিতে। তখন ফেদার একদম তার মুখের ওপর এসে পড়ে। ইলহান এমন জোরে মেরেছিল যে মুহূর্তেই নূরাইসার নাক রক্তজবারের মতো লাল হয়ে ওঠে। হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যে সেই ব্যথা আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। রাগে, দুঃখে, লজ্জায় আর ব্যথায় চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে, সে দুই হাত দিয়ে বারবার মুছছে, কিন্তু থামছে না কিছুতেই।
ইলহান দৌড়াতে দৌড়াতে নূরাইসার পেছনে এসে দাঁড়াতেই দৃশ্যটা স্পষ্ট হয় তার চোখে, নূরাইসা একা দাঁড়িয়ে,বারবার নাক টানছে, ঠান্ডায় কাঁপছে, আর অশ্রুতে ভিজে যাচ্ছে তার গাল। এক মুহূর্তও দেরি করলো না ইলহান। দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। নূরাইসা মোচড়া-মুচড়ি শুরু করে দিলো, তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে মরিয়া হয়ে। কিন্তু ইলহান, আরও শক্ত করে চেপে ধরলো তাকে।
চারপাশের অন্ধকার গাছপালায় বাতাস সোঁ সোঁ শব্দ তুলছে, দূরে পাহারার কুকুরের ডাক মিশে যাচ্ছে নিস্তব্ধ রাতের গায়ে। সেই অন্ধকারেই, ইলহানের হাত আস্তে আস্তে উঠে গেল নূরাইসার ঝুটি করে বাঁধা চুলের দিকে। সেই নিঝুম অন্ধকারে, কেবল দুজনের নিঃশ্বাসের তীব্রতা আর হৃদস্পন্দনের শব্দই যেন বেঁচে আছে। সে ধীরে ধীরে চুলগুলো সরিয়ে নূরাইসার ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দিলো, শীতের তীব্র রাতেও উষ্ণ সেই স্পর্শে কেঁপে উঠল নূরাইসার পুরো শরীর। ইলহান নরম, ধীর, কিন্তু অধিকারী ভঙ্গিতে নূরাইসার ঘাড়ে নিজের নাক ঘষতে শুরু করলো। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস ঘাড় বেয়ে নেমে যেতে লাগলো, অস্থিরতা আর অজানা আবেগের ঢেউ তুলতে তুলতে। মাঝেমধ্যে ক্ষুদ্র, অস্থির চুমু নূরাইসার ঘাড়ে লেগে যাচ্ছিল, নীরব রাতকে আরও ভারী করে তুলছিল সেই স্পর্শ।
নূরাইসা কাঁপছে, কিন্তু তা কি শীতের জন্য, না কি অন্য কোনো দুর্বোধ্য আবেগের জন্য, সে নিজেই বুঝতে পারছে না। সেই অন্ধকারের গভীরে, নূরাইসার ঘাড়ে উষ্ণ নিঃশ্বাস রেখে, তার ত্বকে নাক ঘষতে ঘষতে, ইলহান খুব নিচু, খুব স্থির, আরামদায়ক অথচ অধিকারী কণ্ঠে বলে উঠলো—
-"অনেক মিস করেছি জান... তোর স্পর্শ, তোর সান্নিধ্য, তোর শরীরের এই মিষ্টি ঘ্রাণ... তোর মিষ্টি স্বাদ... তোকে অনেক মিস করেছি!"
ইলহানের গরম নিঃশ্বাস নূরাইসার ঘাড় বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে এলো। হাড়কাঁপানো শীতের রাতেও সেই আকস্মিক উষ্ণতা নূরাইসার শরীরকে থরথর করে কাঁপিয়ে তুলল। কাঁপল তার ভেতরের লুকানো নারীসত্তা, যেন কোনো অতল স্পর্শে হৃদস্পন্দন তাল হারিয়ে ফেলেছে। গোলমাল হয়ে গেল তার সব চিন্তাভাবনা—যা কিছু যুক্তি ছিল, সব যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
ইলহান তাকে আলতো করে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। রাতের ঠান্ডা বাতাসে ফেদারের তীক্ষ্ণ পতঙ্গগুলোর আঘাতে নূরাইসার নাক আরও লাল হয়ে উঠেছে। তা দেখে হঠাৎ ইলহানের মুখে হাসি ফুটে উঠল। প্রথমে সে সেই হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করল, ঠোঁট শক্ত করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলো। মুহূর্তেই উচ্চস্বরে হেসে উঠল, রাতের নিস্তব্ধতা ছিন্ন করে সেই হাসি ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে।
নূরাইসা ছলছল চোখে তাকিয়ে রইল, অবাক, লজ্জিত, ক্ষুব্ধ, সব আবেগ একসাথে তার মুখমণ্ডলে জমে উঠল। এক নিমেষে তার মুখ রাগে লাল হয়ে ওঠে। আর সেই রাগের আতিশয্যে হঠাৎ সে ইলহানের বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, থাপ্পর, কিল, ঘুষি, এলোপাথাড়ি আঘাতের ঝড় বয়ে দিল। কিন্তু ইলহানের ইস্পাতের মতো শক্ত বুকে সেই সব আঘাত তুলোর মতো নরম লাগছিল। নূরাইসার রাগও যেন তার কাছে শিশুর অভিমান হয়ে দাঁড়াল। তবু নূরাইসা থামেনি। ক্রমাগত আঘাত করতে করতে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল—
-"বজ্জাত লোক! এতগুলো মানুষের সামনে আমাকে অপমান করলেন! আপনি খুব খারাপ... খুব!"
ইলহান তার দুই হাত নিজের এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরলো, নূরাইসার ছোট্ট, ছটফট করা হাত দুটো তার হাতের মুঠো থেকে বের হতে চাইলেও পারবে না। আর অন্য হাত দিয়ে পুরো শরীরটাকে শক্ত করে টেনে নিলো নিজের বুকে, এমনভাবে, যেন পৃথিবীর সব ঝড়-তুফান থেকেও তাকে আড়াল করতে পারে। রাতের ঠান্ডা বাতাস তাদের শরীর ছুঁয়ে গেলেও, সেই আলিঙ্গনের ভেতর উষ্ণতা জমাট বেঁধে উঠল। নূরাইসা তীব্র নিঃশ্বাসে হাঁপাচ্ছে, চোখদুটো ভেজা আর রাগে ধকধক করছে, আর ইলহান খুব কাছ থেকে সেই প্রতিটি আবেগ দেখছে, অনুভব করছে, যেন তার চোখের ভেতর ঢুকে সব পড়ে ফেলতে পারছে।
সে ধীরে, খুব ধীরে নূরাইসার দিকে ঝুঁকে এলো।দুজনের নিঃশ্বাস এক বিন্দু দূরত্বে আটকে গেল।নূরাইসার কপাল, চোখ, ঠোঁট, সবই ইঞ্চি দূরে, উষ্ণতা আর শীতলতার মিশ্র ধোঁয়াশায় ডুবে আছে মুহূর্তটি।তারপর ইলহানের কণ্ঠ, গভীর, নিশ্বাসমাখা, স্থির আর অব্যর্থ, বিরক্ত রাগী নূরাইসার ঠিক কানে গিয়ে নিচু স্বরে বলে উঠল—
-"হেরে যেতে বলছিস আমাকে? তাহলে আমার মানসম্মান থাকতো? একজন ট্রেইনির কাছে লে. কর্নেল হেরে গেলে কেমন দেখাতো বল?"
নূরাইসা মুখ তুলে তাকালো। চোখদুটো ভেজা, দোদুল্যমান, আর রাগে কাঁপছে তার পাপড়ি। তার নাকটা সত্যিই রক্তজবার পাপড়ির মতো লাল, রাগ, শীত আর অভিমান মিলেমিশে যেন ফুলের রঙে রঙিন হয়েছে। ঠোঁটটা ক্ষুদ্র শিশুর মতো উল্টে গেছে, পুরো মুখেই জমে আছে একরাশ ক্ষোভ আর অপমানের কাঁপুনি। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে, ভেতরের সারা ঝড়টা একসাথে তার কণ্ঠে এসে আটকে গেল। তারপর বাচ্চার মতো ক্ষোভে, আঘাত খাওয়া আত্মসম্মানের গলা জড়ানো স্বরে বলে উঠল—
-"হারতেন না... তাই বলে আঘাত করবেন? দেখেন তো নাকের কি অবস্থা আমার!
ইলহান মুখ টিপে হাসছে, আর এই হাসিটা নূরাইসার রাগ আরও বাড়িয়ে দিলো।
-"ছাড়ুন আমাকে! আমাকে নাস্তানাবুদ হতে দেখে খুব মজা লাগছে আপনার!"
ইলহান হাসতে হাসতেই এগিয়ে এলো আরও কাছে, চাঁদের আলোয় তার চোখ দুটো অদ্ভুত নরম দেখাচ্ছে।
-"বিশ্বাস কর নূরেজান... তোকে একদম গুলুমুলু বাচ্চা লাগছে। যে একটু আঘাতে নাক লাল করে... ঠোঁট ফুলিয়ে রেখেছে।"
বলতে বলতেই নূরাইসার নাকে টুপ করে এক ক্ষণিক চুমু এঁকে ইলহান সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো তার ওষ্ঠে। আচমকা বজ্রাঘাতের মতো সেই স্পর্শে নূরাইসা পুরো শরীরটায় ঝাঁকুনি খেল। বিস্ময়, অপমান, রাগ, সব মিশে ছটফট করতে লাগল সে। কিন্তু ইলহান ছাড়ল না, আড়াই মাস পর স্ত্রীর সান্নিধ্য পেয়েছে সে। এত সহজে কি আর ছেড়ে দেওয়া যায়? দীর্ঘ অপেক্ষার তৃষ্ণা যেন তার প্রতিটি স্পর্শে, প্রতিটি নিশ্বাসে দাবানলের মতো দাউ দাউ করে জ্বলছিল। নূরাইসার ঠোঁটে নিজের অভাব, অভিমান আর আকাঙ্ক্ষার সমস্ত আগুন ঢেলে দিচ্ছিল সে, এমনভাবে, যেন অনাহারী মানুষ হঠাৎ অমূল্য কিছু ছুঁয়ে ফেলেছে।
নূরাইসার ছটফটানি ততক্ষণে আরও তীব্র হয়ে উঠল। কিন্তু ইলহানের বাহুর বাঁধন ছিল পাথরের মতো দৃঢ়, যেভাবে সে তাকে আলিঙ্গনে পুড়িয়ে রেখেছে, তাতে মনে হচ্ছিল তার ঠোঁটটাই বোধহয় গ্রাস করে ফেলবে সে। সময়টা নূরাইসার কাছে যেন এক অনন্তযুগের মতো দীর্ঘ লাগল। অবশেষে, অনেকক্ষণ পর, ইলহান ধীরে ধীরে তাকে ছাড়লো। নূরাইসা হাঁপাতে হাঁপাতে বাতাস খুঁজছে, বুক ওঠানামা করছে তীব্র শ্বাসে, আর ইলহান, যেন কিছুই হয়নি এমন নির্বিকার ভঙ্গিতে, ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিভরা এক হাসি টেনে শান্ত গলায় বলল—
-"এত ছটফট কেন করিস? মিস করিস নি আমার স্পর্শ? আড়াই মাস পরে তোকে টেস্ট করতে পারলাম, তাও শান্তিমতো টেস্ট করতে দিলি না!"
নূরাইসা অবাক পল্লবে তাকিয়ে রইল। দশ মিনিট, হ্যাঁ, পুরো দশ মিনিট, এভাবেই আঁকড়ে ধরেছিল সে।নিঃশ্বাস নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। আর এই লোক এখন বলছে সে নাকি টেস্ট করতে পারেনি?এমন বেহায়া লোকও নাকি হয়? ক্ষিপ্ত, কাঁপা কণ্ঠে নূরাইসা বলে উঠল—
-"ছাড়ুন! আপনার শরীর থেকে ঘামের গন্ধ আসছে... নিশ্বাস পর্যন্ত নিতে কষ্ট হচ্ছে। এই কনকনে হাড়কাঁপানো শীতে আপনি আবার ঘামলেন কীভাবে?"
ইলহানের মুখের রঙ বদলে গেল। তার শরীরে গন্ধ?
নিজের দিকে তাকিয়ে সত্যিই অবাক হল, ভোরবেলায় ইউনিফর্ম পরে বেরিয়েছিল, এখনো সেই ইউনিফর্মই। চট্টগ্রামে নেমেই জুনিয়ররা ধরে কোর্টে নিয়ে গিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলিয়েছে। যে মানুষটা সারাদিন ঘাম ঝরিয়েছে, তার গায়ে ঘামের ছাপ থাকবেই, কিন্তু বউয়ের মুখে এটা শুনে তার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে চোখ কুঁচকে নূরাইসার দিকে তাকাল—
-"আমার শরীরে গন্ধ? বউদের কাছে স্বামীর ঘামের গন্ধও ফুলের সুবাসের মতো লাগে। আর তুই গন্ধ বলছিস? সারাদিন যে বাইরে ছিলাম, ক্যান্টনমেন্টে এসে শাওয়ার নেওয়ারও সুযোগ পাইনি, তার আগেই মাঠে নামিয়ে দিয়েছে, সেটা ভুলে গেছিস? দাঁড়া, আজ এই গন্ধেই তোকে গোসল করাবো!"
বলতেই না বলতেই ইলহান তার দিকে ঝুঁকে পড়ল।এক মুহূর্তেই ইউনিফর্মের বোতাম খুলে নূরাইসার ঘাড় ধরে তাকে নিজের বুকে চেপে ধরল। আলিঙ্গনটা এমন শক্ত, এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বেষ্টন করা, যেন সে তাকে বুকের ভেতরেই লুকিয়ে ফেলতে চাইছে। নূরাইসার দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল, নিশ্বাস আটকে গেল, তার ছটফটানি বাড়ল আরও মরিয়া হয়ে উঠল, তার দু’হাত, দু’চোখ, পুরো শরীর লড়ছে, তবুও ইলহানের আলিঙ্গন যেন পাহাড়ের মতো দৃঢ়, অচল, অনমনীয়।
হঠাৎই চারপাশ ভারী হয়ে উঠল, বাতাস থম মেরে দাঁড়িয়ে, চারপাশে অদৃশ্য কোনো উত্তাপ নেমে এলো।
গাছের পাতারাও যেন কাঁপছে দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাসের তীব্রতায়। অনেকটা সময় পরে সে তাকে ছেড়ে দিল।
নূরাইসা বড় বড় করে নিশ্বাস নিচ্ছে, হাওয়া যেন গিলে গিলে খাচ্ছে, যেন নীরব পৃথিবীর ভিতর ফিরে পেতে চাইছে নিজের অস্তিত্বটা।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন তার শরীরটা মাত্রই স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, নূরাইসার উত্তাল বুকে দম ফিরতে শুরু করেছে, ইলহান তখন আবার তাকে কাছে টেনে নিল। এবার কোনো শব্দ নেই, নেই কোনো ভূমিকা, শুধু হঠাৎ, হিংস্র কোমলতায় সে সোজা তার গ্রীবার ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে দিলো।
দমচাপা উত্তাপে ঢেকে গেল চারিপাশ, আর নূরাইসার শরীর কেঁপে উঠল সেই অচেনা, তীব্র অনুভূতিতে, যেন মুহূর্তটা তাদের দুজনকে পুরো পৃথিবী থেকে আলাদা করে এক অদৃশ্য বৃত্তে আবদ্ধ করে ফেলেছে।
.
নূরাইসা ও ইলহান গেছে তো গেছে, ফিরে আসার নামই নেই। হঠাৎ কী হলো, কেউই বুঝতে পারল না। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ইলহান কেন এমনভাবে ছুটে গেল? আর তাদের মধ্যে আসলে সম্পর্কটা কী, এসব নিয়েই জুনিয়রদের ভেতর ইতস্তত গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ছে। ঠান্ডা বাতাসেও সেই ফিসফাস যেন গরম হয়ে উঠছে। কিন্তু সিনিয়ররা জানে। সেনাবাহিনীর সবচেয়ে রাগী, সবচেয়ে কঠোর যোদ্ধা তার বউয়ের পেছনে এভাবে দৌড়াচ্ছে, এই বিরল দৃশ্যটা দেখে তারা ঠোঁট চেপে হেসে ফেলছে। সেই হাসি যেন গুঞ্জনের ভেতরে নিঃশব্দ এক চুম্বক হয়ে ঢুকে পড়ে।
ঠিক সেই সময়, হাসি আর গুঞ্জনের মাঝেই ইলহান ও নূরাইসা ফিরে আসে। ইলহান, বরাবরের মতো, মাথা উঁচু, কাঁধ টানটান, চোখে তীক্ষ্ণ দৃঢ়তা। ঠোঁটে তির্যক হাসি, যেন সবকিছু তার মুঠোয়। তার পেছনে নূরাইসা হেঁটে আসে লাজে কাঁচুমাচু হয়ে, মাথা নিচু, মুখ পুরো লাল, গ্রীবা ও ঘাড়ে হালকা লালচে ছাপ। শীতের পোশাক টেনে টেনে ঢাকতে চেয়েও ব্যর্থ। চোখের কোণে লাজুক এক আলো, যা কিছুই লুকাতে পারছে না।
ইলহান সিনিয়রদের পাশে গিয়ে বসে। তার কণ্ঠ অপরিবর্তিত, কিন্তু ভঙ্গি থেকে বোঝা যায়, পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই। নূরাইসা নিজের দলের পাশে গিয়ে বসে, অথচ চোখে যেন লুকোচুরি খেলা। ওদের ছয়জন তখনই হামলে পড়ল—
"তাদের সম্পর্ক কী?"
"হঠাৎ কী হলো?"
একটার পর একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। নূরাইসা সামান্য তীর্যক স্বরে, সংযত অথচ স্পষ্ট করে বলল—
-"রুমে গিয়ে বলব সব। এখন চুপ থাকো, তোমরা।"
কিন্তু তার চোখের কোণ, এলোমেলো চুলের ফাঁক দিয়ে ফোটা লাজ, আর গলার নিচে ছড়িয়ে থাকা লালচে আভা, সব মিলিয়ে যেন থমকে থাকা এক নিঃশব্দ নাটকের মতো, যেখানে কথার চেয়েও বেশি কিছু বলে দিচ্ছে নীরবতা।
.
উপমা একা বসে আছে। চারপাশে হাসি-আনন্দের ঢেউ, কেউ রান্নায় ব্যস্ত, কেউ Bonfire-এর প্রস্তুতিতে ছুটছে, কেউ খেলছে, কেউ চিৎকার করে ডাকছে। পুরো পরিবেশ যেন জীবন্ত, অথচ উপমার ভেতরে অদ্ভুত নিঃশব্দ স্থিরতা। নোমান আর রুহান এতক্ষণ ধরে সৈনিকদের সঙ্গে ফুটবল খেলছিল। উপমা দূর থেকে দেখেছে পুরোটা। যতদূর যেখানেই যাক তারা, তার চোখ রুহানের ওপরই লেগে থাকে। কারণ রুহানের সান্নিধ্যের একটি মুহূর্তও উপমা হাতছাড়া করতে চায় না। তাই তো তার বন্ধু নেই, সঙ্গী নেই, রুহান আর নোমানই যেন তার ছোট্ট দুনিয়া।
রুহান ও নোমানের সামনে দাঁড়ালে উপমার সব দুষ্টুমি বাইরে বেরিয়ে পড়ে, অকারণ হাসি, অদ্ভুত উচ্ছ্বাস।কিন্তু অন্য সবার সামনে, বিশেষ করে মেয়েদের সামনে, উপমার মুখ একেবারে গম্ভীর, বরফ-ঠান্ডা। এমন দৃষ্টি দেয় যে মনে হয়, আর এক সেকেন্ড এইভাবে তাকিয়ে থাকলে তাদের গিলে ফেলবে। আর তাকাবেই বা-না কেন? এই মেয়েগুলো রুহানের দিকে বারবার চোরাচোখে তাকায়, কিছু জানতে চায়, সুযোগ পেলে এসে উপমার কাছে প্রশ্নও করে। উপমা তাচ্ছিল্যের হাসি চেপে রাখে, তার রুহান সম্পর্কে সে কেন কিছু বলবে? রুহান তো শুধু তারই। তার ভাবনা, তার ভালোবাসা, তার একতরফা নিবেদন, সবকিছু মিলিয়ে রুহান উপমার পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু।
দূরে রুহান আর নোমান দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আলোর ঝিলিক তাদের চারপাশে ছায়া ফেলে এক মোহনীয় দৃশ্য এঁকে দিয়েছে। উপমা আবারও তাদের দিকে তাকাল। ব্যাডমিন্টনের মাঠের পুরো দৃশ্য সে দেখেছে, কিভাবে ইলহান নূরাইসার পিছু নিয়েছে, কিভাবে তাদের চোখে চোখ রেখে খুনসুটি চলেছে। উপমা মুগ্ধ হয়েছে, মানুষ কি এমন ভালোবাসাও পায়! তাদের ভালোবাসার আলো যেন চারপাশকে উজ্জ্বল করে তুলেছিল। আর সেই আলোয় দাঁড়িয়েই উপমা দেখে তার রুহানকে, বাতাস লেগে দোল খাচ্ছে কোকড়া চুল, বাদামি চোখে গম্ভীর চাহনি, লম্বা বলিষ্ঠ দেহে অবচেতন আত্মবিশ্বাস। রুহান যেন দূরের আগুনকুণ্ডের মতোই, ঝলমলে, আকর্ষণীয়, আর ঠান্ডা রাতে বিপজ্জনকভাবে উষ্ণ।
উপমার ঠোঁটে ধীরে ধীরে এক গোপন মুচকি হাসি ফুটে উঠল। গভীর, একরোখা, একটু সাইকোটিক আবেগে ভরা সেই হাসি। সে মনে মনে ফিসফিস করে—
-"তোমার আর আমার প্রেম কি কখনও এমনই হবে, রুহান? আমি যে তোমাকে ভালবাসি... এত বছরের একতরফা ভালোবাসার সময় কি তবে ফুরিয়ে আসছে? তুমি কি দেবে আমার ভালোবাসার পূর্ণতা?বলবে না তো যে, এতদিন ধরে তোমার চারপাশ ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ানো এই মেয়েটি তোমার চোখেই অদৃশ্য?"
তার চোখ রুহানের ওপর গেঁথে থাকে, এক ধরনের নীরব অধিকারবোধ নিয়ে। এতটাই গভীর, এতটাই গোপন, এতটাই দহনে ভরা, যে বাতাস পর্যন্ত থমথমে হয়ে যায়। যেন উপমার দৃষ্টি অদৃশ্য শেকলের মতো রুহানের প্রতি মুহূর্তকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
আর দূরের আগুনের নরম লাল আলোয়, উপমার এই নীরব, প্রগাঢ়, possessive ভালোবাসা যেন চারপাশের রাতকে আরও গভীর করে তোলে।
হঠাৎ—
-"ওই! এত সিরিয়াস মুখ কেন? মনে হচ্ছে কেউ তোমাকে এখনই সবার সামনে অপারেশন করতে বলছে!"
উপমা চমকে উঠল। রুহান কখন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, সে বুঝতেই পারেনি। চোখ মেলে তার দিকে তাকাতেই রুহানের মুখে দুষ্টু হাসির রেখা। উপমা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিলো—
-"আমি তো শুধু সবাইকে দেখছিলাম। কত খুশি সবাই আজ। আর তুমি কি আবার হাইলাইট হতে এসেছ?"
রুহান ভ্রু তুলে মজা করে বলল—
-"হাইলাইট? না না, আমি তো শুধু এটেনশন নিচ্ছিলাম... তুমি কি আমাকে ignore করছ?"
উপমার ঠোঁটের কোণে খেলা করল চাপা হাসি—
-"ignore? হুম... হয়তো একটু। কিন্তু তুমি সবচেয়ে বিরক্তিকর distraction।"
রুহান হাত গুটিয়ে দাঁড়াল, চোখে সপ্রতিভ চ্যালেঞ্জের ঝিলিক—
-"বিরক্তিকর? তাহলে আমি কি তোমাকে প্রতিদিন বিরক্ত করতে পারব, নাকি একবারেই শাস্তি হবে?"
উপমা শান্ত অথচ উস্কানি কন্ঠে বলল—
-"শাস্তি দিতে হলে, আগে তো শুরু করতে হবে, দেখবো তুমি কতটা সাহসী।"
রুহান ঠোঁট চেপে হাসল—
-"সাহসী? আমি সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ।"
উপমা একটু এগিয়ে গিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল—
-"ঠিক আছে, তাহলে তুমি আজই আমার বিরক্তির রেকর্ড ভাঙো... কিন্তু সাবধানে, আমি প্রতিশোধ নিতে জানি।"
রুহান হেসে মাথা কাত করল—
-"প্রতিশোধ? হাহ! সেক্ষেত্রে আমি তো আরও মজা খুঁজছি... তুমি কবে থেকে এত মজার মানুষ হলে?"
উপমা ধীরে ধীরে চোখ নামাল—
-"তোমার সঙ্গে থাকতে থাকতে, রুহান... তুমি তো সবসময়ই সমস্যা খুঁজে বের করো।"
রুহান হাত বাড়িয়ে তার পাশে এসে দাঁড়াল—
-"ঠিক আছে, সমস্যা মানেই মজা! আর আজ তোমার দুষ্টুমি highlight করব!"
সবকিছু যেন মুহূর্তেই জমে থাকা আলোতে ঝিলমিল করে উঠল,।দুজনের কথায়, চোখে, আচরণে একটা অদ্ভুত খুনসুটি আর ঘনিষ্ঠতার সুর বাজতে লাগল,
যেন তাদের দু’জনকে কেন্দ্র করেই পরিবেশ হঠাৎ একটু বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
.
সব হাসি, আনন্দ, খেলাধুলা আর গুঞ্জনের ভিড়ে কখন যে গভীর রাতে ঢলে পড়েছে, কেউ টেরই পায়নি।শীতের বাতাসে দুলতে থাকা ক্যান্টনমেন্ট হঠাৎই যেন উষ্ণ হয়ে উঠল, যখন সবাই একসাথে জড়ো হলো প্রশস্ত খোলা মাঠের মাঝে। সেখানে আগেই বড় করে আ গু ন জ্বালানো হয়েছে, লালের ভেতর কমলা, কমলার ভেতর নীলচে দপদপানি, আ গু নের শিখাগুলো যেন নিজের ভাষায় উৎসবের গল্প বলছে।
আ গু নের চারপাশ ঘিরে বসে আছে পুরো ক্যান্টনমেন্টের মানুষ, সৈনিক থেকে অফিসার সবাই।শুধু যারা নিরাপত্তায় আছে, তাদের জন্য খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে অন্যদিকে। বাকিরা একসাথে বসেছে, আগুনের উষ্ণতায় পিঠ সেঁকে, হাত মুড়ে, হাসাহাসি করতে করতে। কেউ খাচ্ছে, কেউ গল্প করছে, কেউ আবার টুকটুক করে লাঠি দিয়ে আগুন নাড়ছে, মাঠজুড়ে এক অদ্ভুত শান্ত অথচ প্রাণবন্ত পরিবেশ।
রুহান, নোমান আর উপমা আগুনের একটু পাশেই বসে খাচ্ছে। তাদের তিনজনের যেন আলাদা একটা ছোট্ট দুনিয়া, যেখানে চিরকালই বাচ্চাসুলভ ঝগড়া লেগেই থাকে। এজনের প্লেট থেকে ওইজন খাবার তুলে নিচ্ছে, আবার সেটা নিয়ে শুরু হচ্ছে খাবার-কাড়াকাড়ি। উপমা রাগে-ভরা ভান করে দুজনের পিঠে একে একে কিল-ঘুষি দিচ্ছে—"এই! খাচ্ছ নাকি মারামারি করছ?" তারপর নিজেরাই আবার হেসে লুটোপুটি। তাদের এই খুনসুটির মাঝে আগুনের আলোয় অন্যরাও খাওয়া-গল্পে মগ্ন।
ওদিকে একটু দূরে, ইলহান সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে বসে গল্প করছে। আগুনের আলো তার মুখে লালচে আভা ছড়িয়ে দিয়েছে, আর আশেপাশের সবাই তার দিকে তাকিয়ে যেন নীরবে স্বীকার করছে, এমন মানুষকে আদর না করে, সম্মান না করে উপায়ই নেই।
এখানেও সে সকলের চোখের মণি, ব্যক্তিত্ব, বিনয় আর উপস্থিতি মিলিয়ে এক অদ্ভুত আকর্ষণ।
সিনিয়রদের কেউ একজন মজা করে ইলহানকে খোঁচা দিলেন— "কী হে, বউয়ের পিছে দৌড়াতে গিয়ে না আবার মাঠেই হেরে বসো!" পুরো চত্বর হাসিতে ভেসে গেল। ইলহান লাজুক হাসিতে মাথা চুলকাল, কিন্তু চোখেমুখে ফুটে থাকা আনন্দ লুকিয়ে রাখল না একটুও। আগুন তখন দপদপ করে আরও উঁচু হয়ে ওঠে, যেন এই রাত্রিটা, এ মানুষগুলো, এ হাসিগুলো, সবকিছু মিলেই একটা গল্প বুনে চলেছে।
ইলহানদের ঠিক সামনে, আগুনের বিপরীত পাশে, আলফা টিম বসে খাচ্ছে। তাদের হাসাহাসিতে পুরো বাতাসই যেন উষ্ণ হয়ে উঠেছে। মজা করতে করতে সবাই মিলে নূরাইসাকে লজ্জা দিচ্ছে। তাদের চোখের কোণে দুষ্টুমি, ঠোঁটে অকারণ হাসি, আর এর মাঝেই নূরাইসা আরও লাল হয়ে উঠছে।
ইলহান মাঝে মাঝেই তার দিকে তাকায়, সেই রক্তিম মুখ, সেই দ্বিধাগ্রস্ত চোখ, সব দেখে তার ঠোঁটে মৃদু, কুটিল এক হাসি ফুটে ওঠে। নূরাইসা একবার চোখ তুলে তাকালেই সেই হাসিটা দেখে ফেললে, ইলহানকে আজই খেয়ে ফেলবে! সে মোটেই চায়নি সবাই তাদের সম্পর্কে কিছু জানুক। চায়নি কেউ তাকে আলাদা চোখে দেখুক। কিন্তু আজ রাতের আগুনের আলোয় সব রহস্যই যেন ফাঁস হয়ে গেছে। সবাই এখন অন্য চোখে তাকাচ্ছে, চোরা বুঝদার হাসি নিয়ে।
"আসল সত্য জানলে এরা কী করবে?" এই ভাবনায় নূরাইসার ভেতরটা কেঁপে উঠল। সেই চিন্তার জালে ডুবে থাকা অবস্থাতেই সে একটুকরো বারবিকিউ তুলে মুখে দিল। দাঁত বসানোর আগেই, হঠাৎই একটি ঠান্ডা, শক্ত, বলিষ্ঠ হাত তার থুতনি ধরে উপরের দিকে তুলল।
তার মুখ ঘুরে গেল ঠিক ইলহানের দিকে। আর মুহূর্তের মধ্যেই ইলহানের অধর নেমে এলো তার অধরে, নরম, উষ্ণ, দাবিদার এক চুম্বনে, যে চুম্বন তার মুখ থেকে মাংসের টুকরো ছিনিয়ে নিয়ে গেল।
নূরাইসা সম্পূর্ণ তাজ্জব। তার চারপাশে বসে থাকা সবাই একসাথে—
"আআআহহহ!"
বলে চেঁচিয়ে উঠল, কেউ মুখ ঢাকল, কেউ আবার লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেলল। আগুনের শিখা পর্যন্ত যেন দপদপ করে উঠল সেই উত্তাপে। ইলহান মুখে নেওয়া মাংসটুকু আস্তে চিবিয়ে নিজের জিহ্বা দিয়ে নূরাইসার ঠোঁটের কোণায় থাকা সামান্য ঝোল চেটে নিল, আলতো, ধীরে, ইচ্ছাকৃতভাবে আর নিষিদ্ধের মাঝামাঝি এক ছোঁয়ায়।
তারপর কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই আবার সোজা হয়ে বসে থাকা অবস্থান থেকে উঠে দাঁড়াল। গম্ভীর মুখে না, বরং দুষ্টু আধা-হাসি নিয়ে। হাঁটতে হাঁটতে পাশ কাটিয়ে চলে গেল আগুনের আলো ভেদ করে অন্ধকারের দিকে। নূরাইসা মুহূর্তেই আচমকা গুটিয়ে গেল। তার গাল জ্বলছে, শ্বাস আটকে আছে। চারপাশে তাকাতে পারছে না, মনে হচ্ছে পৃথিবীটাই তাকে দেখছে। কিন্তু তার বুকের গভীরে, ইলহানের সেই আকস্মিক, রুক্ষ, দখলদার চুম্বন এখনও গলে গলে উষ্ণতা ছড়াচ্ছে।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে ইলহান আর নূরাইসার প্রতিটি মুহূর্তকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে আর্সলান দেহরান। আগুনের লালচে আলো তার মুখে এমন ছায়া ফেলেছে, যেন অন্ধকার আর আগুন একসাথে গা মিশিয়ে তার ভেতরের দহনটাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। নূরাইসার ও ইলহানের সেই ঘনিষ্ঠ, অতি ব্যক্তিগত মুহূর্তও তার নজর এড়ায়নি। এক মুহূর্তের জন্যও না। তার দৃষ্টি ছিল শিকারীর মতো, স্থির, ধারালো, দহনময়। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ, আঙুলের গাঁটগুলো শক্ত হয়ে সাদা হয়ে আছে। দাঁত চেপে থাকা তার চোয়াল টান টান, মনে হচ্ছিল ঠিক এখনই ভেঙে পড়বে পুরো পৃথিবী।
আগুনের আলোয় তার বাদামি চোখ ভয়ংকরভাবে জ্বলছে, যেন সেই শিখাগুলোই তার চোখে আশ্রয় নিয়েছে। ধীরে, রাগে থরথর কাঁপা কণ্ঠে সে বিড়বিড় করে উঠল—
-"কেন সবকিছু তুইই পাস, ইলহান? কেন তোর জীবনে কোনো কিছুর অভাব নেই? পরিবার, ভালোবাসা, বন্ধু, সবই তোকে ঘিরে। আর আমি? আমি কি তবে জন্মেছি শুধু বঞ্চিত হওয়ার জন্য?"
তার দৃষ্টির পাপোষে তীক্ষ্ণ প্রতিশোধের আগুন।
-"এবার আমি হারব না, ইলহান। এবার আমি জিতব।তোর থেকে কেড়ে নেব... তোর নূরেজানকে। কথা দিলাম।"
বাতাসও যেন মুহূর্তে হিম হয়ে গেল। আগুনের শিখার ফিসফিসানি আর আর্সলানের ভিতরের অন্ধকার প্রতিজ্ঞা, রাতকে আরও গভীর, আরও বিপজ্জনক করে তুলল।