-"তুই এখানে কি করছিস?"
থেমে থেমে, চাপা গলায় উচ্চারণ করল ইলহান কন্ঠে যেনো আ গু ন জ্বেলে। শব্দগুলো বাতাস কেটে গেল ছু রির ধার মতো। নূরাইসা স্থবির, যেন পায়ের নীচের জমি হঠাৎ হারিয়ে ফেলেছে। তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি পাঁচজনও এক মুহূর্তেই নিস্তব্ধ। হাসির রেখা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল মুখগুলো থেকে, কুয়াশায় ঢেকে যাওয়া সন্ধ্যার মতো। নূরাইসা অসহায়, নিচু গলায় বললো—
-"আমি ওই..."
ইলহানের কণ্ঠ এবার বরফের মতো শীতল, অথচ দহনজ্বালায় পূর্ণ—
-"আমি ওই কি? তুই এখানে কেনো এসেছিস? তুই না আর্মি ভয় পাস, তাহলে তোর গায়ে ট্রেনিংয়ের পোশাক কেনো? তুই ক্যান্টনমেন্টে কার অনুমতিতে প্রবেশ করেছিস?"
কোনো উত্তর আসে না। শুধু থরথর করে কাঁপছে মেয়েটা। মাথা নিচু, চোখ ভিজে ভিজে। কুয়াশা গাঢ়, আলো কমে গেছে, সন্ধ্যা ডুবে রাত এসে পড়েছে চুপিসারে। অদৃশ্য ঠান্ডা ভয় যেন তার বুকের ওপর পাথর হয়ে বসেছে। নূরাইসা কিছু বলতে পারছে না দেখে বিহান এগিয়ে আসে ইলহানের ঠিক পাশে, স্বর নরম, শান্ত—
-"আমরা সবাই মাত্র এসেছি অনেক ক্লান্ত। আগে রেস্ট নেই… তারপর ওর ব্যাপারে তোকে সব বলব!"
কিন্তু সেই শব্দ যেন ইলহানের কানে পৌঁছায় না। তার দৃষ্টি ব ন্দু কের মতো স্থির, শুধু নূরাইসার মুখে। ধীরে ধীরে, তার মুখের রেখা বদলে যায়। কঠিনতা নরম হয়। রাগ সরে গিয়ে জন্ম নেয় উদ্বেগ, অতল, অস্থির।হঠাৎই সে তীব্র পদক্ষেপে নূরাইসার দিকে এগিয়ে যায়।উপস্থিত ছয়জন একসাথে চমকে ওঠে, তারা ভেবেছিল ইলহান হয়তো আঘাত করতে যাচ্ছে! আতঙ্কে দু’পা এগিয়ে আসে সবাই। কিন্তু তাদের ভুল প্রমাণ করে ইলহান নূরাইসার মুখ দু’হাতে তুলে নিল। নিজের দুই হাতের আঁজলে তার ভয়ার্ত, কাঁপা মুখটা যেন আশ্রয় পেল। ইলহানের কণ্ঠ ভয়ার্ত, কাঁপা—
-"কপাল কে টেছে কিভাবে? র ক্ত পড়ছে তো!"
তখনই বাহিনী-ভর্তি চোখগুলো নূরাইসার দিকে তাকিয়ে দেখে, কপালের বাম পাশ বেয়ে র ক্ত নামছে ধীর টুপটাপ সুরে। নূরাইসা হাত তুলে ছুঁয়ে দেখে, হাত ভিজে যায় পরমুহূর্তেই। নিজেরই র ক্ত দেখে তার গলা শুকিয়ে ওঠে, নিশ্বাস আটকে যায়। তবুও নিজেকে সামলে মুখে হাসি নিয়ে বলে—
-"কিছু হয় নি। পড়ে গিয়েছিলাম তো... তখন ছোট ইটের টুকরো সাথে লেগে গেছে।"
ইলহানের স্বর এবার বিস্ফোরিত, দুশ্চিন্তার আগুনে—
-"কিছু হয় নি কি! কত র ক্ত বেরিয়েছে দেখেছিস? চল, মেডিক্যাল রুমে চল!"
নূরাইসাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সে তাকে কোলে তুলে নিয়ে ছুটে চলে। যেন তার সমস্ত পৃথিবী ওই ক্ষতবিন্দুতেই স্থির। তার ছুটে যাওয়ার পায়ের শব্দ রাতের নিস্তব্ধতায় প্রতিধ্বনিত হয়, উন্মাদের উন্মেষের মতো।
পেছনে দাঁড়িয়ে বিহান হেসে ফেলল। ঠোঁটের হালকা বাঁক এবং চোখে অদ্ভুত দীপ্তি যেন রাতে জমে থাকা শীতের আভা। তাসিন, ঈশান, রায়েদ, আরিয়ান, সবাই বিস্ময়ের অচেতন আবেশে চোখ বড় করে চমকে উঠে।তাসিন চিৎকার করতে করতে বলে উঠল—
-"কে এই মেয়ে, মেজর?"
আরিয়ান পাশে দাঁড়িয়ে বললো—
-"A-NOVA কেনো এভাবে পাগলামি করছে? একটু আগেই তো মনে হচ্ছিল মেয়েটাকে খেয়ে ফেলবে, আর এখন সামান্য র ক্ত দেখেই নিজেই পাগল হয়ে যাচ্ছে!"
বিহান শান্ত, মৃদু হাসি নিয়ে ইলহানের ছুটে যাওয়ার দিকে তাকাল। চোখে এমন দীপ্তি, যেন কোন গভীর জ্ঞান এক মুহূর্তের জন্য ফুটে উঠল—
-"প্রাণভোমরার শরীর থেকে বিন্দু পরিমাণ র ক্তও... সাগর সমান লাগে, তাসিন।"
ঈশান অবাক, কণ্ঠে কেবল হালকা নড়বড়ে বিস্ময়—
-"মানে বুঝলাম না, মেজর!"
বিহান এবার স্থির, গভীর স্বরে বলল, যেন রাতের ঠান্ডা বাতাসেও শব্দগুলো ঝরে পড়ছে—
-"নূরাইসা ইলহানের প্রাণভোমরা। ওর অর্ধাঙ্গিনী।"
রায়েদ চমকে উঠল, চোখ আরও বড় হয়ে, নিঃশ্বাস থেমে গেল মনে হয়—
-"A-Nova বিয়ে করলো কবে?"
বিহান চোখ বন্ধ করে ঠান্ডা রাতে উষ্ণ স্মৃতির আভা টেনে আনে। কণ্ঠে মৃদু, আবেগময় সুর—
-"যেদিন আমরা অফিশিয়ালি জয়েন করেছিলাম, তার দু’দিন আগে।"
এদিকে ইলহান মেডিক্যাল রুমের দিকে ছুটে যাচ্ছে। করিডোরের নিঃশব্দ শীতের রাতের আকাশের মতো, প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিধ্বনি হয়ে ভেসে আসে তার আতঙ্কিত চিৎকার—
-"রুহান! রুহান কোথায় তুই?"
ভেতরে রুহান, উপমা ও নোমান গল্পে ডুবে ছিল। হঠাৎ সেই তীব্র কণ্ঠে তারা চমকে ওঠে। রুহান ঘুরে তাকাতেই যেন পৃথিবী গতি বদলে দেয়, ইলহানের দু’হাতে অচেতন ভঙ্গিতে মাথা রাখা নূরাইসা। রুহান দ্রুত এগিয়ে আসে, বিস্ময় আর দুশ্চিন্তা মুখজুড়ে—
-"কি হয়েছে ভাইয়া? তুমি কখন এলে?"
ইলহানের কণ্ঠ তীক্ষ্ণ, নিঃশ্বাস ভারী—
-"আগে ওর কপালে ব্যান্ডেজ কর, কে টে গেছে!"
ঠিক তখনই উপমা এগিয়ে আসে শান্ত কন্ঠে বলে—
-"বেডে শুইয়ে দিন। আমি দেখছি।"
ইলহান নূরাইসাকে আলতো করে বেডে শুইয়ে দেয়। উপমা তুলোর নরম স্পর্শে র ক্ত পরিষ্কার করে, হাতের কাজে দ্রুততা, তবে স্পর্শে কোমলতা। ব্যান্ডেজ সাদা, কিন্তু র ক্তের লাল আভা দেখলে মনে হয় বুকের ভেতর কোথাও ধারালো ব্যথা বাজছে।রুহান কাছে এসে নরম হাসিতে জিজ্ঞেস করে—
-"কিভাবে কা টলো ইসা?"
নূরাইসা নিচু স্বরে, লুকানো অস্বস্তি নিয়ে—
-"তেমন কিছু না ভাইয়া। তোমার ভাই বেশি বেশি করছে।"
সেই মুহূর্তেই ইলহানের কণ্ঠ বজ্রপাতের মতো পড়ে—
-"এক চর মারবো বেয়াদব। কোন সাহসে এসেছিস এখানে তুই? আমার অনুমতি নিয়েছিস?"
শক্ত ধমকে নূরাইসা থমকে যায়। মুখ নরম, চোখ ভিজে, যেন মেঘ জমে আছে এই বুঝি বৃষ্টি ঝরে পড়বে। রুহান পাশেই মিটিমিটি হাসছে, পরিস্থিতি তার কাছে পরিচিত। নোমান কৌতূহলী চোখে বলে—
-"আপনরা একে অপরকে চেনেন?"
রুহান গর্বের ঝলক নিয়ে হাসে—
-"আমার বড় ভাই আর ওর বউ নূরাইসা। ইসা আবার আমার চাচাতো বোন।"
নোমানের চোখ বিস্তৃত, যেন নতুন রহস্য আবিষ্কার করছে—
-"কি? A-Nova তোমার ভাই?"
রুহান বুক ফুলিয়ে, সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে—
-"হুম। তবে এই সত্য কেউ জানে না। তোমরা জানলে আর কাউকে বলবে না, কথা দাও!"
নোমান মাথা নাড়ে, গম্ভীর অঙ্গীকারের ভঙ্গিতে—
-"বেশ, কথা দিলাম।"
এদিকে উপমা ব্যান্ডেজ শেষ করে সোজা হয়ে দাঁড়ায়—
-"হয়ে গেছে। তেমন গভীর ক্ষত নয়। রুমে নিয়ে যেতে পারবেন।"
ইলহান উপমার দিকে একবারও তাকায় না। শুধু নরম কন্ঠে বলল—
-"ধন্যবাদ! রুহান ও আমার সম্পর্ক কি, সেটা গোপন রাখবে তোমরা আশা করি!"
নোমান ও উপমা হালকা হেসে শুধু মাথা নাড়ে, জর অর্থ তারা গোপন রাখবে এই সত্য।
নূরাইসা উপমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ধীরে ধীরে উঠতে চায়, কিন্তু ইলহান এক মুহূর্তের মধ্যে এগিয়ে এসে চোখের পলকে তাকে কোলে তুলে নেয়। নূরাইসা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার শরীর হালকা ভাসমান, কিন্তু পড়ে যাওয়ার ভয়ে শক্ত করে ইলহানের ইউনিফর্মের কলার ধরে ফেলে। ইলহানও শক্ত করে ধরে রাখে, কোনো যুক্তি নয়, কোনো প্রশ্ন নয়, শুধু তার কাছে টেনে নিয়ে যায়। তার চোখে প্রতিফলিত হলো ভয়ের ছায়া, প্রেমের তীব্রতা, হারিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক, সব একসাথে। উল্টো ঘুরে, নির্ভয়ে, অচঞ্চল পদক্ষেপে সে বেরিয়ে যায়।
উপমা সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকে, চোখে বিস্ময় আর মুগ্ধতা মিশে, কণ্ঠে ফিসফিস—
-"অবিশ্বাস্য, কেমন এক শক্তি, কেমন এক আবেগ।অনেক ভালোবাসে তোমার ভাই তার বউকে!"
রুহান তাকিয়ে থাকে তাদের সরে যাওয়ার দিকেই—
মুখে নরম অথচ গভীর সত্যের মতো উচ্চারণ—
-"নিজের থেকেও বেশি।"
.
রাত গভীর। ক্যান্টনমেন্টের বাতাসে শীতের কুয়াশা আরও ঘনীভূত, চারপাশ যেন ঘন করে ওঠা ধূসর চাদরের আড়ালে ঢেকে গেছে। দূরে প্রহরীর রাইফেলের হালকা টোকা, টিপটিপ বাতাসে ওড়ার শব্দ, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা সৃষ্টি করেছে। ওই নিস্তব্ধতাই ভেঙে যায় ইলহানের ভারী, নির্ভয়ে পদক্ষেপের শব্দে। তার কলে নূরাইসা, নিঃশব্দ, শান্ত, কিন্তু চোখগুলো থেমে নেই। সেখানে লুকিয়ে আছে পাহাড়সম ভয়, আরেকদিকে অদ্ভুত এক শান্তি, যা শুধুই ইলহানকে দেখার জন্য। দরজা খুলে রুমে ঢুকতেই হিটার থেকে উষ্ণতা ভেসে আসে, শীতের কুয়াশা মুহূর্তে ছাপিয়ে যায়। ইলহান নূরাইসাকে বিছানায় আস্তে শুইয়ে দেয়, যেন ভাঙা কাঁচের ওপর ফুল রাখছে। চোখে কোনো কঠোরতা নেই, শুধু ভালোবাসার কোমল আগুন। নূরাইসা ফিসফিস কণ্ঠে বলে—
-"এখানে নিয়ে এলেন কেনো? আমাকে আমার বেডে দিয়ে আসুন। সবাই তো সন্দেহ করবে!"
ইলহান একদৃষ্টে তাকায়। চোখ লাল, দুশ্চিন্তার অবশিষ্ট আগুনে ভরা। নূরাইসা কুড়কে যায়। ইলহান শীতল কণ্ঠে বলে—
-"চুপচাপ বসে থাক, এক চুল নড়বি না।"
তার গলা ভারী, যেন গভীর সমুদ্রের নীচ থেকে ওঠা বুদবুদ। সামনে বসে সতর্ক হাতে তার ব্যান্ডেজ ছুঁয়ে দেখে, শ্বাস ছেড়ে বলে—
-'আমাকে আঘাত করতে কষ্ট দিতে তুই এত ভালোবাসিস? আমাকে এত কষ্ট... না..."
কথা শেষ হয় না। কন্ঠ থেমে যায়, রাগের দাপট নয়, স্রেফ আতঙ্কের জমে থাকা সুর। নূরাইসা ঠোঁট কামড়ে, চোখ নামিয়ে নিয়ে, কাপা গলায় বলে—
-"আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাই না, বিশ্বাস করুন।আমি তো আপনাকে হারানোর ভয়ে এখানে এসেছি!"
ইলহান মাথা তোলে না। তার আঙুল ব্যান্ডেজের ওপর থেমে থাকে। ঘরে দীর্ঘ নিস্তব্ধতা নেমে আসে, পরীক্ষার হলের মতো ঠান্ডা, টানটান, শব্দহীন। তারপর খুব আস্তে, ভাঙা নিস্তব্ধতার মতো—
-"আমি যে তোর... এতে তোর কোনো সন্দেহ আছে?"
কথাটা ছু রির ডগার মতো নূরাইসার বুকে লাগে। ব্যথা দেয়, আবার একই সাথে উষ্ণও করে, কারণ অনুভব করা ব্যথা জন্ম নেয় যখন হারানোর ভয় থাকে। ইলহান এবার মুখ তোলে, তাকায় সরাসরি তার চোখে। দৃষ্টিতে দোষারোপ নেই,।শুধু দাবি, মালিকানা, আর ভিতরে জমে থাকা অস্থিরতা—
-"এখানে এলেই তুই আমাকে হারাবি না বলছিস, আমি তো তোকে এখানে আসতে বলিনি। তাহলে তুই কেন এলি এখানে?"
নূরাইসা ধীরে শ্বাস নেয়। চোখের কোণে অশ্রুর ভিজে ছায়া জমে। তারপর ফিসফিস করে—
-"আরিবা আপু বলেছে আপনাকে আমার থেকে কেড়ে নেবে। সে আমাকে চ্যালেঞ্জ করেছে... যদি আমি এক মাস ট্রেনিং করি, ওকে হারাতে পারি, তাহলে সে আর আমাদের মাঝে আসবে না।"
ইলহানের চোখে বিস্ময়ের ক্ষীণ ঝলক জ্বলে ওঠে। আর সেই মুহূর্তে নূরাইসা তার শার্টের কাপড় দু’হাতে ধরে, শিশুসুলভ অসহায়তায় এগিয়ে আসে—
-"আমি তো আপনাকে হারাতে পারবো না... আপনাকে ছাড়া তো আমার নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। আমার সহ্য হয় না কেউ আপনার দিকে তাকাক। সেখানে একজন আপনাকে কেড়ে নিতে চায়, আমি কি করবো?"
নূরাইসার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, হাতদুটো আরও শক্ত করে ইলহানের শার্ট আঁকড়ে ধরে—
-"আমি তো ছোটবেলা থেকেই নিজের জিনিসের প্রতি খুব পসেসিভ... আমার জিনিস কাউকে দিই না।সেখানে আপনাকে নিয়ে আমার পসেসিভনেস কতটা গভীর, আপনি বুঝতে পারছেন?"
তার চোখে আতঙ্কের কুয়াশা, তবু ভিতরে ভালোবাসার জ্বলন্ত সত্য—
-"আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম... আপনাকে হারানোর।"
বাতাস স্তব্ধ। চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন জমে থাকা শীতের কুয়াশার মতো ঘন হয়ে আছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ইলহান হঠাৎ নূরাইসার হাত ধরে তাকে নিজের বুকের ভিতর টেনে নেয়। আলিঙ্গনটি কঠোর নয়, অস্থির ব্যাকুলতায় ভরা, যেন দীর্ঘক্ষণ ডুবে থাকার পর জলের কাছে ফিরে আসা কোনো দমবন্ধ মানুষ। তার বুকে নূরাইসাকে পাওয়া মানে যেন আবার প্রাণ ফিরে পাওয়া।
-"আমি আপনার একান্ত ব্যক্তিগত, পুরোটাই আপনার নামে দলিল করা। আমাকে কেউ আপনার থেকে কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। আমি আপনাকে ভালোবাসি, অন্য কাউকে... না, শুনছেন আপনি? আপনার গায়ে আঘাতের দাগ, আমার সহ্য হয় না। আপনি আঘাত পেলে আমার হৃদয় থেকে র ক্ত ঝরে!"
তার কণ্ঠে রাগ নয়, গভীর ব্যথার বুনন। নূরাইসা ছোট করে হাসে, যেন সেই ব্যথাকে নরম করে দেওয়ার একমাত্র সান্ত্বনা সে-ই। কাঁধে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে—
-"আর আপনি রাগ দেখালে... আমার হৃদয় কাপে।"
এক টুকরো নীরবতা নেমে আসে, গভীর, উষ্ণ, মিষ্টি। দু’জনের নিঃশ্বাসে যেন শীতের রাত আরও নরম হয়ে ওঠে। বাইরে হঠাৎ পাহারা বদলের হুইসেল বাজে। দূরের সেই তীক্ষ্ণ শব্দও এই ঘরের আবেগঘন পরিবেশ ভাঙতে পারে না, বরং স্মরণ করিয়ে দেয়, এই ছোট ঘরটিই এখন তাদের নিরাপদ আশ্রয়। ইলহান নূরাইসার চুলে হাত বুলিয়ে, গভীর গলায় আদেশের মতো আদর মিশিয়ে বলে—
-"ঘুমিয়ে পড়ুন, আমি এখানেই আছি!"
নূরাইসা চোখ বন্ধ করে। তার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে নরম হয়, চোখের পাতা ভারী হয়, কিন্তু ঠোঁটে একটি শান্তির রেখা ফুটে থাকে, যেন এই মুহূর্তেই পৃথিবী তার কাছে নিঃশব্দে আত্মসমর্পণ করেছে। ইলহান সজাগ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন নিজের সমগ্র পৃথিবীকে পাহারা দিচ্ছে। এমন দৃষ্টি, এমন নীরব প্রতিশ্রুতি কেবল সেই মানুষই দিতে পারে যার ভালোবাসা যে কোনো বিপদের চেয়ে বড়।
.
ভোরের আলো এখনও আকাশ ছুঁয়ে ওঠেনি। পূর্ব দিগন্তে শুধু হালকা নীলচে রেখা, রাত আর দিনের মাঝখানে টেনে রাখা এক নিঃশব্দ সেতু।ক্যান্টনমেন্টের বাতাসে শীতের টান, কুয়াশা এসে মাঠের চারদিককে নরম দুধের মতো ঢেকে রেখেছে। চারপাশ এমন নীরব, এমন স্নিগ্ধ, মনে হয় পৃথিবীর প্রথম নিঃশ্বাস এখনই নেওয়া হলো। পাহাড়, জমিন, ঘাসের ডগায় কুয়াশার ফোঁটা, সব যেন ঘুমিয়ে আছে মহাশান্তিতে। সেই সমগ্র নিস্তব্ধতার ভেতরে বিহান একাই দৌড়াচ্ছে ট্র্যাক ঘেরা লালচে মাটির ওপর। তার মুখে বিষণ্নতার ছায়া,প্রতিটি ধাপে যেন বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা দুঃখের টংকার বাজতে থাকে। ঠাণ্ডা হাওয়া চিরে ছুটে যাওয়ার সময় তার উষ্ণ নিশ্বাস বাষ্প হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।
মুখে বিষণ্নতা লেপটে আছে, কোনো শব্দ নেই, শুধু দৌড়, শুধু বয়ে চলা নিঃশ্বাস।
অল্পক্ষণ পর, সেই একাকী ছন্দের সাথে আরেকটি ছন্দ এসে মিশে যায়, ইলহানের। বহু বছরের পরিচিত সেই ভারী অথচ স্থির পদক্ষেপ। শব্দ শোনামাত্রই বিহান বুঝে যায়, তার শৈশবের বন্ধু এসে গেছে। দু’জন পাশাপাশি, কোনো কথা না বলে, একই ছন্দে দৌড়াতে থাকে। পুরো ক্যাম্প তখনও গভীর ঘুমে, অন্ধকার, কুয়াশা আর নিস্তব্ধতার স্তরে ঢেকে আছে, আর সেই প্রভাতের স্যাঁতসেঁতে বাতাসে শুধু ওদের দু’জনের শ্বাস-শব্দই ভেসে বেড়ায়। শত শত মানুষ ঘুমিয়ে আছে।জেগে আছে শুধু তারা দু’জন, দুই কাঁধে, দুই জীবনে একই রকম ভার নিয়ে। দৌড়ের মাঝে বিহান নিচু গলায় বলল—
-"এখন কেমন আছে ইসা?"
ইলহানের চোখে সদ্য জন্ম নেওয়া ভোরের আলো পড়ে ঝলসে উঠল—
-"রাতে জ্বর এসেছিল... এখন ঠিক আছে।"
দৌড় শেষ হলে দু’জন পাশাপাশি ঘাসের ওপর ধপ করে শুয়ে পড়ল। কুয়াশা মেশানো আকাশের নিচে শুয়ে তারা চুপচাপ থাকল অনেকক্ষণ। তাদের বন্ধুত্বের গভীরতা এমন, এখানে শব্দ অপ্রয়োজনীয়। চোখের দৃষ্টিতে, নিঃশ্বাসের ছন্দে, কুয়াশার গন্ধে, তারা একে অপরের মন পড়ে নিতে পারে সহজেই। নিঃশব্দতা ভাঙল ইলহান—
-"আর কত দিন এইভাবে থাকবি?"
বিহান শান্ত, ক্লান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
-"কিভাবে?"
ইলহানের গলা হঠাৎই ভারী হয়ে এলো—
-"নিঃসঙ্গ... একা। কেন এত দিন ধরে অতীত নিয়ে পড়ে আছিস? জীবনটা গুছিয়ে নে রে ভাই। তোর এই ছন্নছাড়া চলাফেরা, আমাকে কষ্ট দেয়। তোর এই ছন্নছাড়া জীবনের জন্য বারবার নিজেকে অপরাধী মনে হয়।"
বিহান মলিন হেসে তাকাল আকাশের দিকে, কুয়াশা ভেদ করে ভোরের আলো ধীরে ধীরে রঙ ছড়াচ্ছে। শান্ত কন্ঠে বলল—
-"তোর তো কোনো দোষ নেই। নিজেকে শুধু শুধু দোষ দিচ্ছিস। আমার সাথে যা হয়েছে... সেটা সে ইচ্ছা করেই করেছে। আমি এমন হারা হেরেছি বন্ধু, দ্বিতীয়বার বাঁচা আমার জন্য মুশকিল হয়ে গেছে।"
ইলহান ঘুরে তাকাল তার দিকে। চোখে ব্যথার ক্ষীণ রেখা, গলায় অব্যক্ত এক আকুলতা জমে আছে বহু দিনের ধূলি হয়ে—
-"আমার বোন তোকে অনেক ভালোবাসে, শাহ। ও সবার ছোট, তবুও সবার চেয়ে বুঝদার। জেনে–বুঝেই তোকে ভালোবেসেছে। তোর অতীত ও জানে না... কিন্তু তোর ক্ষত সারানোর একমাত্র ওষুধ নুহা-ই।"
বিহান গভীর নিঃশ্বাস ফেলল, যেন বুকের ভেতর বন্দি বহু বছরের ক্লান্তি কুয়াশার মতো বেরিয়ে আসে। অতঃপর নরম কন্ঠে বলে ওঠে—
-"বিশ্বাস কর... আমি চাই নুহা ভালো থাকুক। ওর সব পাগলামি, না বলা কথাগুলো, আমি বুঝি। ও এখন যে বয়সে আছে, আবেগে ভেসে যাওয়ার। ঠিক হয়ে যাবে।কিন্তু... আমি ওকে গ্রহণ করলেও কোনোদিন ভালোবাসতে পারব না, বন্ধু। আর ভালোবাসা ছাড়া ও দুমড়ে–মুচড়ে মরবে... যেমন আমি মরছি।"
তার গলা ভেঙে এল, কথাগুলো কাঁপতে কাঁপতে বেরোল—
-"আমি ঐ নিষ্পাপ নীলপদ্মকে এই যন্ত্রণা ভোগ করতে দিতে পারি না! তার চেয়ে সে জানুক, আমি কিছু জানি না, বুঝিও না। এটাই ভালো।"
চারপাশ তখন নিঃশব্দ। দূরে পাহাড়ের মাথা ছুঁয়ে সূর্যের প্রথম আলো ধীরে ধীরে ভেসে উঠছে, নতুন দিনের জন্ম, কিন্তু তাদের ভেতরের রাত এখনো কাটেনি। কুয়াশা মেশানো নিঃশ্বাস দু’জনের মুখ থেকে বেরিয়ে এসে এক অদ্ভুত ধোঁয়ার পর্দা তৈরি করছে। মাটির সেঁতসেঁতে গন্ধ, জমে থাকা নিশ্বাস, আর না–বলা কথাগুলোর বোঝা সকালে আরও ভারী করে তুলল। ইলহানের গলা দুঃখে কাঁপল—
-"এইভাবে কতদিন? আন্টি তোকে নিয়ে চিন্তা করতে করতে শেষ হয়ে যাচ্ছে। একটি ভুল প্রেমের জন্য তুই নিজের জীবন ধ্বংস করবি?"
বিহান কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল, আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক ঝাপসা পৃথিবীর দিকে। ভোরের শেষ কুয়াশা যেন তাকে ঘিরে নরম বিষাদের চাদর ফেলেছে। ঠিক সূর্য ওঠার আগের যে নীরবতা নেমে আসে, সেই নীরবতার মাঝেই বিহানের বুকে লুকিয়ে থাকা দাউ-দাউ হাসিটা হঠাৎ ফেটে বেরোল। উচ্চস্বরে হেসে বলল—
-"সে প্রেম শিখাইলো, প্রেমিকা হইলো... কিন্তু প্রেমিকা রইলো না!"
এই হাসির ঝাঁকুনিতে যেন পুরো মাঠটা থমকে উঠে আবার কেঁপে উঠল। ব্যথা আর হাসি মিশে এক অচেনা, খাঁ–খাঁ শব্দ তৈরি করল, যা শুনে ইলহানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল বন্ধুর দিকে। যে চোখ একদিন আগুনের মতো ঝলকে উঠত, আজ সেগুলো নিভে যাওয়া চুলোর মতো ঠান্ডা। ইলহান অনুভব করল, এই ভাঙা মানুষটির কষ্টে তার নিজেরও একটি অংশ জড়িয়ে আছে।কোথাও না কোথাও সে নিজেকেই দায়ী করে এই বন্ধুর ভেঙে পড়া অবস্থা দেখে। মনে হয়, বিহানের যন্ত্রণার ওপরে তার ছায়াটাও লেগে আছে। আর যতদিন না সে নিজের হাতেই বন্ধুর পুরোনো ক্ষত সব মুছে ফেলতে পারছে, ততদিন সে এই অভিশপ্ত অপরাধবোধ থেকে মুক্ত হতে পারবে না। এই সত্য সে খুব ভালোভাবেই জানে। আর এই রোগেরওষুধ, সে জানে। বিহানের এই নিঃশব্দ যন্ত্রণা সারানোর একমাত্র উপায় তার নীলপদ্ম, নুহা।
কিন্তু বিহান তা বুঝতে চায় না। সে বুঝতে দেয়ও না, নিজের চারপাশে এমন এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে রেখেছে, যার ভেতরে কারো প্রবেশাধিকার নেই। ইলহান ধীরে ধীরে উঠল। চারপাশে ভোরের আকাশে সূর্যের প্রথম আলোর সরু সোনালি রেখা ছড়িয়ে পড়ছে। সেই আলো তার চোখে পড়তেই যেন সেখানে নতুন দিনের এক কঠিন দৃঢ়তা জ্বলে উঠল। তার ভঙ্গিতে কোনো দ্বিধা নেই, কেবল সিদ্ধান্তের ভারী নীরবতা। যেভাবেই হোক, তাকে বিহানকে নুহার কাছে পাঠাতেই হবে। কারণ তার বোনই পারে বিহানের হৃদয়ের এই জমাট বেদনা গলিয়ে দিতে, যা কোনো ওষুধ, কোনো সময়, কোনো যুক্তি পারেনি সারাতে।
এই একটাই পথ, এবং ঠিক সেই পথেই তাকে এগোতে হবে, ঢাকার দিকে, নতুন এক সূর্যের দিকে, নতুন শুরু করার সম্ভাবনার দিকে। সিদ্ধান্তের সেই ক্ষণিক মুহূর্তে ইলহানের ভেতরটা যেন হঠাৎই জ্বলে উঠল নবজাগরণের আলোয়। ভোরের প্রথম রশ্মি তার মুখে পড়তেই মনে হলো, আলো নিজেই যেন তাকে পথ দেখাচ্ছে। যেন সেই আলো নিঃশব্দে তাকে বলে দিল—
-"নীলপদ্ম তার ভালোবাসার রোগ সরানোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তার ভালোবাসাকে পাঠানো হোক তার কাছে।"
সেই মুহুর্তেই ইলহান সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। বিহানকে সেইভাবেই হোক ঢাকা পাঠাতে হবে। নুহার কাছে।
.
আফরিন দাঁড়িয়ে আছে নুহার কলেজের সামনে। চারদিকে হালকা কুয়াশার পর্দা, শীতের সকালটার মায়াবি রোদ গায়ে এসে পড়ছে নরম উষ্ণতার মতো। হুট করেই আজ নুহার কোনো ক্লাস নেই, তবুও জরুরি কোনো ঘোষণা আছে, তাই তাকে ডেকে পাঠিয়েছে।আফরিন অপেক্ষা করছে, নীরবে, কলেজের লোহার গেটের পাশে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ সামনে দিয়ে একটি সাদা গাড়ি দ্রুতগতিতে ছুটে চলে গেল। গাড়ির স্টিকারে লেপটে থাকা ধুলো হাওয়ার ধাক্কায় উড়ে এসে লাগল আফরিনের শাল ভেদ করে ত্বকে। সে চোখ মিটমিট করে তাকালো। কিছু দূর গিয়েই গাড়িটি থেমে গেল, অকারণ থামা নয়, অনেকটা হিসেব করে রাখা থামা।আফরিন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো।
গাড়ির দরজা খুলে নামল সাদা পাঞ্জাবি–পাজামা পরা এক পুরুষ, গম্ভীর ভঙ্গিতে। রায়হান তন্ময়। আফরিন একদম সোজা হয়ে দাঁড়ালো। বিরক্তি গা ভাসিয়ে উঠল তার মুখে, এমরিনের ঝামেলাই কম নয়, এখন আবার এমপি এসে হাজির! যেন দিনটা আরও জটিল হয়ে ওঠার সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেছে। রায়হান এগিয়ে আসতেই আফরিন সামান্য ঝুঁকে সালাম দিল। রায়হান সালামের উত্তর দিয়ে নিচু গলায় বলল—
-"একটু কথা ছিল তোমার সাথে।"
আফরিন হালকা, ভদ্রতা মেশানো এক হাসি দিয়ে বলল—
-"হ্যাঁ, বলুন.. শুনছি।"
রায়হান চারদিকে তাকিয়ে নীরবতার আশ্রয় খুঁজল।কলেজের গেট, ভিড়ের শব্দ, দু-একজন অভিভাবকের উপস্থিতি, সব মিলিয়ে জায়গাটা কথোপকথনের জন্য খুব সুবিধাজনক নয়। সে ঠোঁট শক্ত করে বলল—
-"এখানে নয়, একটি ক্যাফেতে গেলে ভালো হয়।"
আফরিনও আশপাশে চোখ বুলালো। একজন জননন্দিত এমপি এইভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটি মেয়ের সাথে কথা বলছে, খারাপ ব্যাখ্যার সুযোগ অক্সিজেনের মতো বাতাসে ভাসবে। দু'জনের জন্যই ঝুঁকি। তাই সে সংক্ষেপে বলল—
-"সামনেই ক্যাফে আছে, চলুন। আমার বোন কলেজে, ওকে নিয়ে যেতে হবে। বেশি দূরে গেলে চিন্তা করবে।"
রায়হান মাথা নেড়ে বলল—
-"ঠিক আছে, এসো।"
তার কথায় যেন নিরুচ্চার এক উত্তেজনা, যেন তারা দু’জন হঠাৎ এমন এক অজানা অধ্যায়ের দিকে হাঁটতে যাচ্ছে, যার ফল কী, দু’জনের কেউই জানে না।
রায়হান ও আফরিন মুখোমুখি বসে আছে ক্যাফের এক কোণায়, বড় কাঁচের জানালা দিয়ে ম্লান শীতের আলো ঢুকছে। এমপি আসার খবর পেয়েই ক্যাফে কর্তৃপক্ষ পুরো জায়গাটা ফাঁকা করে দিয়েছে।টেবিলগুলো ফাঁকা, চেয়ারের শব্দ নেই, একটি অস্বস্তিকর নীরবতায় ঢেকে আছে পুরো পরিবেশ। শুধু স্টাফরা দূরে সরে দাঁড়িয়ে আছে, আর রায়হানের বডিগার্ডেরা ছায়ার মতো ছড়িয়ে আছে। তাদের দু’জনের খুব কাছেই ক্যাশ কাউন্টারে একজন বডিগার্ড কম্পিউটারে কী যেন টাইপ করছে, শীতল, যান্ত্রিক ক্লিক শব্দ।
আফরিন এসব নিয়ে ভাবে না, রাজনীতি, ক্ষমতা, নিরাপত্তা,।এগুলো তার দুনিয়া নয়। তার সামনে রাখা কোল্ড কফির গ্লাসেই তার মনোযোগ। জানুয়ারির ঠান্ডা বাতাসেও তার এই একটি অভ্যাস, কোল্ড কফি।রায়হান গরম ধোঁয়া ওঠা কফিতে এক চুমুক দিয়ে কাপটি আলতো করে টেবিলে রাখল। তার দৃষ্টি একদম স্থির, কাঁপা নয়, তাড়াহুড়ো নয়, কেমন যেন নীরব সিদ্ধান্তের মতো। তারপর বলল—
-"আমাকে বিয়ে করতে কি সমস্যা?"
প্রশ্নটি হাওয়াময় নরম নয়, বরং সরাসরি, শীতল এবং আত্মবিশ্বাসী। আফরিন চোখ তুলে তাকালো। তার মুখে কোনো ভান নেই, কোনো অপ্রস্তুতি নেই, শুধুই স্বচ্ছ সত্য—
-"আমার রাজনীতি পছন্দ না। এর সাথে যুক্ত মানুষও না।"
রায়হান একটু ঝুঁকে এলো, যেন কথার একেবারে ভেতরে ঢুকে যেতে চায়।
-"এ ছাড়া আর কোনো সমস্যা নেই? ধরো তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করলে, সে যে ভালো হবে তার কোনো গ্যারান্টি আছে?"
আফরিন তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল—
-"আপনি যে ভালো... তার কোনো গ্যারান্টি আছে?"
রায়হান হালকা হাসল, তার চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা, যেন যুক্তি খেলায় সে অভ্যস্ত।
-"আমি যে খারাপ... তার কোনো গ্যারান্টি আছে?"
আফরিন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল, কফির শেষ চুমুকটি গলায় ঢালতে ঢালতে বলল—
-"রাজনীতি মানুষকে নিষ্পাপ থাকতে দেয় না মিস্টার রায়হান তন্ময়!"
রায়হান এবার আর তর্ক করল না, তার গলা গভীর, মন্থর।
-"হুম, এটা ঠিক। তবে আমাকে আমার পেশা দিয়ে বিচার না করলে খুশি হতাম।"
আফরিন ভ্রু তুলল—
-"যেমন?"
রায়হানের চোখে তখন অচেনা এক সত্যতার ঝিলিক।
-"এমপি রায়হান তন্ময় এবং ব্যক্তি রায়হান তন্ময়, দু’জন এক নয়। তোমার উচিত ছিল ব্যক্তি রায়হান তন্ময়কে জানা, তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া।"
এই মুহূর্তে ক্যাফের নিস্তব্ধতা আরও গভীর হয়। কফির শেষ ফোঁটাও শেষ। আফরিন গ্লাস সরিয়ে সোজা হয়ে বসল। তার মুখে দৃঢ়তা, আর চোখে প্রতিরোধের জ্যোতি। সে দুই হাত টেবিলে রেখে রায়হানের দিকে তাকাল, একেবারে চোখে চোখ রেখে, উত্তর দেবার জন্য প্রস্তুত। আফরিন এক মুহূর্ত চোখ সরাল না। রায়হানের দৃষ্টি সে সোজা, নির্ভীকভাবে মোকাবিলা করল, যেন ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো সাধারণ মেয়ে নয়, বরং দৃঢ় নীতির একা যোদ্ধা। সে গলা স্থির রেখে বলল—
-"যেই মানুষকে আমি বিয়ে করব, তার পেশা নিয়ে আমার সমস্যা থাকতেই পারে। আমার অপছন্দের পেশার মানুষের সাথে আমি কিভাবে সংসার করবো?
তাই ব্যক্তি রায়হান তন্ময়কে জানার বৃথা চেষ্টা বা সময় অপচয়, কোনোটাই আমি করি নি। আপনার কি এই বিষয়েই কথা বলার ছিল? তাহলে আমাদের কথা শেষ। এবার আমি আসি।"
কথা শেষ করেই আফরিন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। চেয়ার সরানোর ক্ষীণ শব্দটা যেন নিস্তব্ধ ক্যাফের ভেতর ঢেউ তুলল। কোনো তাড়াহুড়া নেই, কোনো ভয় নেই, শুধু সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা। কোল্ড কফির খালি গ্লাসটাও যেন তার অবস্থানকে সমর্থন করে শান্তভাবে পড়ে থাকল টেবিলে। সে হাঁটতে শুরু করল দরজার দিকে। হালকা শীতের বাতাস কাচের জানালা দিয়ে মুখে এসে লাগছে, তবু তার পদক্ষেপ একটুও কাঁপছে না। কাচের দরজা ঠেলে বের হয়ে গেল আফরিন, যেন নিজের সিদ্ধান্তের চাদর গায়ে জড়িয়েই চলে যাচ্ছে।
রায়হান চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার যাওয়া পথে, দরজার ফ্রেমে দেখা সেই শেষ ছায়াটা মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত। তার চোখে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি, হতাশা নয়, রাগও নয়, বরং শিকারি মনোযোগ, কৌতূহল, আর অদ্ভুত তৃপ্তির ছোঁয়া। তার ঠোঁটের কোনায় ধীরে ধীরে এক বাকা হাসি ফুটে উঠল। সে নিজের মধ্যে বিড়বিড় করে বলল—
-"এতটুকু মেয়ের কি তেজ! রায়হান তন্ময়ের সামনে দাঁড়িয়ে তার চোখে চোখ রেখে কথা বলে গেলো! হুম... ইন্টারেস্টিং। তবে রায়হান তন্ময়ের চোখে চোখ রেখে কথা বলা মানুষ, জীবিত থাকে না আফরিন জাহান শেখ!"