সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ৩২

🟢

#সুর্যস্নাত_ভালোবাসা

রুহান সকালের মর্নিং ট্রেইনিং শেষে মাত্রই নিজের রুমে ফিরেছে। ফ্রেশ হয়ে এসে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে চুল মুছছে। কতদিন হলো, বাড়ির কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলা হয়নি। কাজের চাপ এমন ভাবে গলা টিপে ধরে যে খবর নেওয়ারও সময় পায় না সে। তানভীরকে খুব মিস করছে... সমবয়সী তানভীর ও রুহান তো কখনোই একে–অপরকে ছাড়া এতদিন দূরে থাকেনি। দুজনেই আঠার মতন লেগে থাকত একে-অপরের সঙ্গে।

চুল মুছতে মুছতে জানলার পাশে এসে দাঁড়ায় রুহান। রোদের লাইটের হলুদ আভা তার বাদামি চোখে পড়ে ঝিলিক তুলছে। ঝাঁকড়া কোকড়া চুলগুলো সে কোনোদিনই পরিপাটি করে না, একদম পাখির বাসার মতো এলোমেলো। মা যদি এই চুল এখন দেখতেন, তাহলে নিশ্চিত কান মলা দিয়ে খাটে বসিয়ে গুছিয়ে আঁচড়ে দিতেন। সেই দৃশ্য মনে পড়তেই রুহানের ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটে ওঠে।

তারপর মনে পড়ে, ঢেঁঙঢেঁঙ করে সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় নুহা আর আফরিনকে জ্বালিয়ে আসত, কী যে আনন্দ! দুই বোন চিরুনি হাতে তার পেছনে দৌড়াত, চেঁচাতে চেঁচাতে বলত, "এসো না! আজ চুল ঠিক করেই ছাড়ব!" স্মৃতিগুলো ঘরে হালকা উষ্ণতা ছড়িয়ে দেয়। নূরাইসা এখানে আছে, এটাই রুহানের জন্য এক ধরনের স্বস্তি। তবুও তাকে এই জায়গায় আনতে যে কত কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে, শুধু তারাই জানে। যেভাবেই হোক, যতদিন সম্ভব তাকে এখানে রাখতে হবে, নইলে সর্বনাশ অনিবার্য।

ঘরের নরম আলো, জানলার বাইরে ঢুলুঢুলু সকাল, আর রুহানের মনে জমে থাকা অজস্র অনুভূতি। এত ভাবনা আবার রুহানের স্বভাবে মানায় না। তার ঘর থেকে মাঠটা স্পষ্ট দেখা যায়, মেয়েরা ঠিক নিচেই ট্রেইনিং করছে। এখানে আসার পর ওদের সাথে সময় কাটানোই আর হয়ে ওঠে না। ইশ, কত সুন্দর সুন্দর মেয়ে... অথচ তাদের একটুও সময় দিতে পারছে না রুহান। এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার। না, নিজের জন্য নয়, ওই নিরীহ মেয়েগুলোর কপাল ভেবেই। এত হ্যান্ডসাম, এত সুন্দর ‘দেওয়ান বাড়ির দেওয়ানা’ সামনে থাকতেও তারা তার সান্নিধ্য পাচ্ছে না,।এটা কি আর মেনে নেওয়া যায়? রুহান গলা পরিষ্কার করে নাটকীয় ভঙ্গিতে জানলার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল—

-"চু ছ্যাড সুন্দরীরা! চিন্তা কইরো না, এখনো অনেক পথ বাকি। এই রুহানের দর্শন তোমরা পাবেই!"

বলেই সে এক নাটুকে উক্তি ভঙ্গিমায় ঘুরে দাঁড়াল। শিশ বাজাতে বাজাতে, একধরনের মন-খোলা উচ্ছ্বাস নিয়ে, তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল রুম থেকে। তার ঘরের পাশের রুমটাই উপমার। নুহা আর আফরিনকে নিয়ে করা আগের দুষ্টুমিগুলো মনে পড়তেই শয়তানি হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। দরজাটা হালকা খোলা, মানে লক করা নেই। রুহান এক সেকেন্ড দেরি করল না, ফট করে ঢুকে পড়ল ভিতরে। আর ঢুকতেই, হাঁ করে দাঁড়িয়ে গেল। রুহানের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল।হৃদস্পন্দন মুহূর্তে থমকে গেল। কারণ রুমের ভিতর যা দেখল, তা তার একদমই আশা ছিল না।

.

বিহান শারীরিক ব্যায়াম শেষ করে ফ্রেশ হয়ে ধীরে ধীরে ইউনিফর্ম পরে নিল। আজ তাকে পুরো এলাকাটা একবার ঘুরে দেখতে হবে। চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা, স্বাভাবিকের চেয়েও অতিরিক্ত নিস্তব্ধ। শ্যাডো ইউনিটের বাকি সদস্যরাও একই খবর দিয়েছে। কিন্তু বান্দরবনের এই সীমান্তে, এতটা নীরবতা? এটা কখনোই ভালো লক্ষণ নয়।

পাহাড়ি হাওয়াটা ভারী লাগছে, উপত্যকার বুকে ছায়া পড়ে আছে অস্বস্তির। বিহানের মন যেনো বারবার শঙ্কার সিগন্যাল দিচ্ছে। সিনিয়রদের সে জানিয়েছিল, কিন্তু তারা তেমন গুরুত্ব দেয়নি। ইলহানেরও বিষয়টা সুবিধার লাগছে না। কারণ তারা খুব কাছে চলে এসেছে শত্রুকে ধরার। আর শত্রুরা কখনো সরাসরি আক্রমণ করে না, তারা আঘাত হানে সবচেয়ে নরম, দুর্বল জায়গায়। এই ভেবেই বিহানের বুকটা কেমন চাপা হয়ে আসে। কারণ এখন টার্গেট, ইলহান।

বন্ধুর বিপদের আঁচ যেনো সে আগেই টের পায়। ইলহানকে কিছু না জানিয়ে দেওয়ান বাড়ির পুরো সিকিউরিটি সে অর্ধেক বাড়ায়নি, পুরো দশ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে আফরিন আর নুহার। তানভীরকেও ফোন করে বারবার সতর্ক করেছে। তবুও অজানা দুশ্চিন্তা তার গলা চেপে ধরে আছে। কারণ, আর্সলান দেহরান এখন ক্যান্টনমেন্টে। যদিও আসার আগে সে ইলহানকে বুঝিয়ে এসেছে, কিন্তু র ক্ত গরম ইলহান রাগের বশে কী করে ফেলে, কেউ বলতে পারে না।

সব ভাবনা, দুশ্চিন্তা, পাহাড়ি ভয়ের অদৃশ্য চাপ নিয়ে বিহান বেরিয়ে পড়ল। বান্দরবনের বাঁকানো রাস্তা, কুয়াশায় ঢেকে থাকা অচেনা গিরিখাত, আর গভীর অরণ্যের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য রহস্য, সবই আজ বাইনারি কোডের মতন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিতে হবে তাকে। জিপের দরজা বন্ধ করে স্টার্ট বাটন চাপতেই ইঞ্জিন গর্জে উঠল। নিঃশব্দ পাহাড়ির বুক চিরে সেনাবাহিনীর জিপ এগিয়ে চলল, এক অজানা আশঙ্কার দিকে।

.

নূরাইসা বরাবরের মতো আজও সব টাস্ক এ হেরেছে।এইভাবে চলতে থাকলে সে কখনোই আরিবাকে হারাতে পারবে না। উপস্থিত সবাই অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে নূরাইসার দিকে। গত রাতে ইলহান সবার সামনে নূরাইসাকে তার বলে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে নূরাইসাকে সব বলতে হয়েছে। সবাই তাকে অনেক সাহস যোগালো। এত সাহস সাহায্যের পরও সে একটি টাস্ক পারল না। দুঃখে সে মাঠ ছেড়ে চলে গেলো।

ক্যান্টনমেন্টের এক কোনায় বিষন্ন মুখে বসে আছে সে এখন। চারপাশের বাতাসে যেনো এক অদৃশ্য নীরবতা। সবকিছু স্থির, নিস্তব্ধ, শুধু তার বুকের ভারী শ্বাসটা স্পষ্ট শোনা যায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার সামনে এসে থামে একজোড়া জুতো। নূরাইসা ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায়, আর্সলান দেহরান!

তাকে দেখামাত্রই নূরাইসা দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। আর্সলান কোনো শব্দ না করে তার পাশে বসে পড়ে। পকেট থেকে একটি সিগারেট বের করে আঙুলে ঘুরিয়ে আগুন ধরায়। শুকনো বাতাসে ধোঁয়া ভেসে উঠে নূরাইসার মুখের পাশে মিলিয়ে যায়। নূরাইসা কপাল কুচকে বলে—

-"আপনাদের না মেডিকেলে টিকতে হয়? সিগারেট খাচ্ছেন কেনো তবে?"

আর্সলান ভেবেলেশিন ভঙ্গিতে উত্তর দিলো—

-"আমি এখানকার বেস্ট স্নাইপার। আমাকে কে কি বলবে? আমি যা খুশি করতে পারবো, করো সাহস হবে না আমাকে কিছু বলার!"

নূরাইসা ভ্রু তোলে—

-"সিনিয়ররাও না?"

আর্সলান নূরাইসার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল—

-"না!"

নূরাইসা মুখ ঘুরিয়ে নিলো। আর কোনো প্রশ্ন করলো না। কিন্তু আর্সলান থামল না, সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো তাকে। একেবারে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। তার পাশে বসে থাকা রমণী যেনো হঠাৎই নিস্তব্ধ ক্যান্টনমেন্টের একমাত্র উজ্জ্বল রং হয়ে ওঠে। হরিণী চোখ। ঘনো কালো চুল। ফর্সা গায়ের রং। পাতলা গোলাপী ঠোঁট। ঘনো পাপড়ি। চিকন সরু নাক। আর ঠোঁটের নিচে একটি কালো কুচকুচে তিল, সেই তিলেই আর্সলানের দৃষ্টি আটকে যায়, যেনো পুরো পৃথিবী গলে গিয়ে এই মুহূর্তটুকুতে সীমাবদ্ধ।

নূরাইসা অসস্তি বোধ করতে থাকে। তার শ্বাসের শব্দও যেনো ভারী হয়ে যায়। আর আর্সলান সেই তিল থেকে চোখ সরায় না। আর্সলানের কণ্ঠটা হঠাৎই নরম, কিন্তু তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ মেশানো—

-"এখানে কেনো এসেছো তুমি? একটি টাস্কও তো পারো না। তোমার মতন দুর্বল, নরম, সরল মেয়েদের জন্য সেনাবাহিনী না! তাহলে কেনো এখানে এসে কষ্ট করছ?"

নূরাইসা ঠোঁট চেপে বলল—

-"আমার ব্যক্তিগত কারণ আছে এখানে আসার!"

আর্সলান গভীর শ্বাস টেনে নূরাইসার দিকে তাকাল—

-"তুমি বুঝতে পারছ না নূরাইসা... একটা টাস্কও পারছো না ঠিকই, কিন্তু তাই বলে তুমি দুর্বল নও। দুর্বল তুমি নও, দুর্বল তোমার আশেপাশের মানুষ। যারা তোমাকে ভেঙে ফেলতে চায়, যারা তোমাকে বোঝে না।তুমি কেনো এই নরক যন্ত্রণার মধ্যে নিজেকে ফেলছো?"

নূরাইসা ঠোঁট কামড়ে ফিসফিস করল—

-"বলেছি তো... আমার ব্যক্তিগত কারণ আছে।"

আর্সলান ধোঁয়া ছড়িয়ে মুচকি হেসে—

-"ব্যক্তিগত কারণটা কি নুহান ইলহান দেওয়ান?"

নূরাইসা নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।

-"হ্যাঁ!"

আর্সলানের চোখে হালকা বিদ্রুপের ঝলক—

-"তার জন্য এত কষ্ট করছ? সে কি সত্যিই এইসবের যোগ্য? তুমি র ক্ত ঝরাচ্ছ, আহত হচ্ছ... আর সে? তোমাকে এখানেই ফেলে রেখেছে! বলেও না, চলে যেতে। তুমি আঘাত পেলে তার কি কিছু হয়? আর আমাকে দেখো... তোমাকে এইভাবে ভেঙে পড়তে দেখা আমার ভেতরের সবকিছু ছিঁড়ে যায়। ফিরে যাও ঢাকা, সেনোরিটা!"

নূরাইসা ধীরে ঘুরে তাকায় আর্সলানের দিকে। তার চোখে দাউ দাউ আগুন। এক মুহূর্তেই দাঁড়িয়ে পড়ে। গলার স্বর ধারালো—

-"সে যোগ্য কি না সেটা বলার আপনি কে? কোন অধিকারে আমার স্বামীকে নিয়ে এমন কথা বলছেন? আমি কষ্ট পেলে আপনার কি? আর আমাকে এইসব নামে ডাকছেন কেনো? আপনাকে আমার থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। আপনি কেনো আমার চারপাশে ঘুরছেন?"

নূরাইসা রাগে তপ্ত, আর আর্সলান তার সেই রাগে অদ্ভুত এক মোহ খুঁজে পায়। সে-ও দাঁড়িয়ে পড়ে।সিগারেট মাটিতে ফেলেই নূরাইসার দিকে দু’পা এগিয়ে আসে। কণ্ঠটি এবার গভীর, দাহ জ্বালানো, যেনো বুকের ক্ষুধিত সত্য বেরিয়ে আসছে—

-"রিল্যাক্স, সেনোরিটা... শান্ত হও। আমি তোমাকে ভালোবাসি। তাই তোমার কষ্ট আমার সহ্য হয় না। ভালোবাসার মানুষের সামান্য ব্যথাও হৃদয় ছিন্নভিন্ন করে দেয়। আমি তোমাকে দেখতে পারি না এমন ভাঙা অবস্থায়।"

নূরাইসা পিছিয়ে যায় এক পা। তার হাতে শিরা ফুলে ওঠে রাগে। গলার স্বর শীতল, তীক্ষ্ণ, দৃঢ়—

-"খবরদার! মুখ সামলে কথা বলবেন। আপনি ভুলে যাচ্ছেন, আমি বিবাহিত। আমি আপনার কোনো এক কালের বন্ধুর স্ত্রী। আমার সম্পর্কে সম্মান নিয়ে কথা বলবেন। আর কথা বলা বা কাছে আসা, দুটোরই আর কোনো দরকার নেই। দূরে থাকবেন আমার থেকে।"

আর্সলান তাচ্ছিল্যের হাসি নিয়ে বলল—

-"তার জন্য এত কষ্ট? তুমি গড়িয়ে পড়ো, র ক্ত ঝরাও। আর সে? তাকিয়ে থাকে দূর থেকে! তোমার এই কষ্টে কখনো কি তার চোখে এক বিন্দু ব্যথা দেখেছ?তোমাকে কি একবারও বলেছে, ‘থাক, আর দরকার নেই’? বলে নি! তুমি ভেঙে পড়লে আমার বুক ফেটে যায়, সেনোরিটা। আমি অনুভব করি, তোমার প্রতিটা ব্যথা। আমি চাই তুমি ফিরে যাও ঢাকা। নিরাপদে থাকো। বেঁচে থাকো।"

বিজ্ঞাপন

নূরাইসার ভেতরে তীব্র ঝড় উঠে। সে ঘুরে দাঁড়ায়, চোখ দুটো জ্বলছে—

-"আমার স্বামীকে নিয়ে আপনার এত কথা বলার সাহস আসে কোথা থেকে, আর্সলান?"

আর্সলান থমকে যায়।

নূরাইসা এগিয়ে আসে, গলার স্বর নিখুঁত বরফ হয়ে ওঠে—

-"আমি কষ্ট পাই, কারণ আমি তাকে ভালোবাসি। তার জন্য লড়াই করি, কারণ সে আমার। আপনার তাচ্ছিল্য, আপনার মন্তব্য... এগুলোর কোনো মূল্য নেই আমার কাছে। আমার স্বামী কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, বা কতটুকু বলে, সেটা আমার আর তার বিষয়। আপনি কে যে তার যোগ্যতা বিচার করবেন?"

আর্সলান নিঃশ্বাস ফেলে। তার কণ্ঠ এবার কর্কশ—

-"তোমার কষ্ট আমি দেখতে পারি না। আমি তোমাকে ভালোবাসি। এতোটা যে, যখন তুমি একটা ছোট আঘাত পাও, মনে হয় আমার শরীরেই কেউ ছুরি বসালো। তুমি কেনো বুঝতে পারছো না আমাকে?"

নূরাইসা গর্জে উঠল—

-"কারণ আমি আপনার কেউ নই!"

আর্সলান মুখ খুলতে গিয়েও শব্দ খুঁজে পায় না।নূরাইসা এক পা পিছিয়ে কঠোর চোখে তাকায়—

-"দূরে থাকবেন। এটাই শেষবার বললাম।"

এরপর অপেক্ষা না করেই নূরাইসা তীব্র মেজাজে স্থান ত্যাগ করে। তার চলে যাওয়ার পথে বাতাস যেনো কেঁপে ওঠে। আর্সলান দাঁড়িয়ে থাকে স্থির, তার দৃষ্টি নূরাইসার অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পথের উপর আটকে।

ঠিক তখনই, একটা ভারী, পুরুষালি হাসির শব্দ ভেসে আসে। আর্সলান পেছনে ঘুরতেই দেখে দেয়ালের আড়াল থেকে ইলহান বেরিয়ে আসছে, ঠোঁটে কুটিল হাসি। আর্সলানের চোখ সরু হয়ে যায়। সে দাঁত চেপে বলে—

-"তুই এখানে কখন এলি?"

ইলহান সোজা হয়ে দাঁড়ায়। দুই হাত পকেটে গুঁজে এমন এক দৃষ্টিতে তাকায়, যেনো পুরো পৃথিবীর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ। তার কণ্ঠ নীচু, ধীর, ঠান্ডা—

-"ইলহান যেখানেই থাকুক, তার দৃষ্টি নূরাইসার ওপরেই থাকে। সে কতবার পলক ফেললো, কতবার শ্বাস নিল, সেটার হিসাবও আমি রাখি। আমার বউকে আমি চোখের আড়াল হতে দিই না।"

আর্সলান হেসে ফেলে, তাচ্ছিল্যের তীব্র সুরে—

-"এতই যখন নজর রাখিস... তাহলে কোন ভয়ে বউকে এখানে রেখেছিস?"

ইলহান ভ্রু তোলে। ঠোঁটের কোণে হালকা ব্যঙ্গ—

-"তোর ভয়ে যে না, তা নিশ্চিত থাক। আর একটু আগেই আমার বউ তোকে খুব সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে... তুই তার কে, আর কে নস না।"

আর্সলান এগিয়ে এসে গর্জে ওঠে—

-"তাহলে ওকে এখানে কেনো এনেছিস? কত আঘাত পেয়েছে দেখেছিস? কি ধরণের স্বামী তুই?"

কথাটা শেষ হতেই, ইলহানের চোখে ঝলসে ওঠে ঝড়।এক পলকের মধ্যে সে আর্সলানের কাছে পৌঁছে যায়, একটা সোজা, নির্মম ঘুষি বসিয়ে দেয়।

ধাম!

আর্সলান দুলে ওঠে, মুখের পাশ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। সে জিহ্বা দিয়ে রক্তটা মুছে নিয়ে, হঠাৎ মাথা পেছনে ফেলে জোরে হেসে ওঠে। হাসিটা এমন, যেনো সে ব্যথাকে আমোদ করে। ইলহানের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। তার গলা গভীর, দমিয়ে রাখা আগ্নেয়গিরির মতো—

-"শুন দেহরান। আমার বউকে নিয়ে না ভেবে, যাকে নিয়ে ভাবার তাকে নিয়েই ভাব। কারণ আমার বউকে নিয়ে ভাবার অধিকার শুধু একজনের, নুহান ইলহান দেওয়ানের।"

সে আরো এক পা এগিয়ে এসে চোখে চোখ রেখে বলে—

-"অনেক কসরত করে, অনেক চালাকি করে যাকে জুটিয়েছিস। তাকে নিয়ে ভাব, তাকে ভালবাস। অন্যের বউকে ভালোবাসিস বলতে লজ্জা করে না?"

আর্সলানের মুখ শক্ত, কিন্তু চোখে আগুন। ইলহানের কথা থামে না, কণ্ঠ বিষাক্ত, ধারালো, তবুও শীতল নিয়ন্ত্রণে—

-"তোর চরিত্র কবে ঠিক হবে, হ্যাঁ? অন্যের জিনিসেই কেনো তোর চোখ যায়? নিজের কাছে যা নেই, তা জোর করে কেড়ে কেনো আনতেই হবে তোকে? মনে রাখিস... যার জিনিস কেড়ে নিয়েছিস সে তোকে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু এই ইলহানের জিনিসে হাত দিলে, আমি তোকে ছিঁড়ে ফেলতেও দ্বিধা করব না।"

ধীরে ঝুঁকে ফিসফিস করে—

-"তুই খুব ভালোভাবেই জানিস... নুহান ইলহান দেওয়ান দয়ালু না। আর নূরাইসাকে নিয়ে খেলা,

তার পরিণতি খুবই খারাপ হবে।"

আর্সলান ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি টেনে ধীর পায়ে ইলহানের দিকে এগিয়ে আসে। হাওয়া যেন থমকে যায়। সে দু’হাত তুলেই ইলহানের কাঁধে রাখে, একটা দুঃসাহসী, উস্কানিমূলক স্পর্শ। এরপর মাথা একটু ঝুঁকিয়ে, গলা নিচু করে, গভীর ধাতব কণ্ঠে বলে—

-তোর বউকে তো আমার লাগবেই, ইলহান। এত সুন্দর একটা পুতুল... এতবছর কিভাবে লুকিয়ে রাখলি?আমার চোখ তো শেষমেশ পড়েই গেছে তার উপর। দেওয়ান, যাকে আমি চাই, তাকে আমি একদিন না একদিন পেয়েই ছাড়ি।"

ইলহানের শিরা ফুলে ওঠে। তার চোখে রক্তমাখা দৃষ্টি, যেনো সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে এখানেই ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে। সে এগিয়ে এসে আর্সলানের হাতটা কাঁধ থেকে সরিয়ে দেয় নির্মম শক্তিতে। তারপর কণ্ঠটা নীচু, অশুভভাবে শান্ত, প্রতিটি শব্দ ছুরির মতো—

-"একটা কথা কানে ঢুকিয়ে নে, দেহরান... আমার নূরেজানের দিকে যে চোখ অপবিত্রভাবে তাকাবে, সেই চোখের মালিককে আমি গোড়া থেকে উপড়ে ফেলব।"

এক পা সামনে এসে দাঁড়িয়ে, চোখে চোখ রেখে—

-" আমার নূরেজানের ওপর এক নিঃশ্বাস অপবিত্র দৃষ্টি, এক মুহূর্ত কুমন্ত্রণা, এক বিন্দু অশান্তির ঝড়, কেউ ঢুকতে পারবে না। আমি দেব না।"

তার কণ্ঠ এখন অগ্নিগিরির গর্জন, আর চোখে প্রজ্বলিত ক্রোধের লেলিহান শিখা—

-"কারণ সে আমার স্ত্রী। ইলহান দেওয়ানের ইজ্জত, ইলহানের নিশ্বাস। আর যেদিন কেউ তাকে ছুঁতে চাইবে, র ক্তের বন্যা বয়ে যাবে সেদিন!"

ইলহান ঠান্ডা হয়ে যায় আচমকা। ঠোঁটে এক নির্মম, নিয়ন্ত্রণহীন হাসি—

-"তুই তো খুব ভালো ভাবেই জানিস দেহরান... আমি হুমকি দিই না। আমি করে দেখাই!"

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প