খোলা মাঠটি আজ অদ্ভুত এক নীরব উত্তেজনায় থমকে আছে। বাতাসে শব্দ নেই, অথচ প্রতিটি নিঃশ্বাসে জমে আছে অপেক্ষার ভার। চারপাশে মানুষের চোখে কৌতূহলের ঝিলিক, ঠোঁটে চাপা উৎকণ্ঠা, বহুল প্রতীক্ষার পর অবশেষে সেই দিনটি এসে গেছে। আজ নূরাইসা ও আরিবা মুখোমুখি হবে।এটি কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, বহুদিন ধরে জমে থাকা, উচ্চারণহীন এক দ্বন্দ্ব আজ দৃশ্যমান রূপ নিতে চলেছে।
গত রাতেই সম্পূর্ণ শ্যাডো ইউনিট ক্যান্টনমেন্টে এসে পৌঁছেছে। তাদের নীরব উপস্থিতি পরিবেশকে আরও ভারী, আরও সংযত করে তুলেছে। শুধু বিহান আসেনি, এই অনুপস্থিতিটুকুও যেন আলাদা করে চোখে পড়ছে।কিন্তু আজ সেও আসবে, এই খবরটুকু বাতাসে ভাসছে, ফিসফিসিয়ে, নিঃশব্দে উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢেলে দিচ্ছে।
মাঠের চারপাশে সবাই ঘিরে আছে। কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ আবার অস্থির পায়ে এক জায়গায় স্থির হতে পারছে না। সবার ভেতরেই কাজ করছে এক অদৃশ্য চাপ। নিজের স্বামীর প্রতি কতটা তীব্র ভালোবাসা থাকলে কোনো মেয়ে এমন একটি স্টেপ নিতে পারে, আর সেই ভালোবাসা তাকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে, এই প্রশ্নের উত্তর দেখার অপেক্ষায় আজ সবাই। মাঠের ঠিক কেন্দ্রে নূরাইসা ও আরিবা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। দুজনের দৃষ্টি যেন দুটি ধারালো তলোয়ার, নিঃশব্দে একে অপরের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে।কারও চোখে পলক নেই, কারও মুখে দ্বিধা নেই।
সৈনিকদের ভিড়ের মাঝেই এক পাশে ইলহান, অন্য পাশে আর্সলান। দুজনেই রক্তচক্ষু নিয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন শুধু মানুষ নয়, একেকটি অবস্থান, একেকটি দাবিও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।যদি দৃষ্টির তাপে মানুষ ভস্ম হয়ে যেতে পারত, তবে আজ এই মাঠেই দুজন মানুষ ছাই হয়ে যেত।
দোতলার করিডোরে সিনিয়ররা দাঁড়িয়ে আছেন, নীরব, সংযত, অথচ প্রতিটি নড়াচড়ার ওপর তীক্ষ্ণ নজর। নিচে প্রশিক্ষণার্থীদের ভিড়ে চাপা ফিসফিস, ভারী নিঃশ্বাস, বুকের ভেতর লুকোনো উত্তেজনার ধাক্কা। হঠাৎই, একটি শব্দ। প্রশিক্ষকের হাতের বন্দুক থেকে শূন্যে ছোড়া গুলির আওয়াজ আকাশ কাঁপিয়ে দিলে, সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই যেন সময় ভেঙে পড়ে।
শুরু হয়ে যায় দুই নারীর লড়াই।
আরিবা লড়ছে শুধুই নূরাইসাকে হারানোর জন্য, জয় তার কাছে লক্ষ্য, প্রমাণ তার কাছে অহংকার। আর অন্যদিকে নূরাইসা লড়ছে ভিন্ন এক তাগিদে। সে লড়ছে তার স্বামীর প্রতি গভীর ভালোবাসা নিয়ে, এই প্রমাণ করতে যে সে কোনো দুর্বলতা নয়, সে শক্তি। সে শুধু পাশে থাকা একজন নয়, সহযোদ্ধা হওয়ার ক্ষমতাও সে রাখে। প্রয়োজনে জীবন দিয়েও আজ সেই সত্যটাই প্রমাণ করবে সে। মাঠ নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে। মাঠ নিজেই যেন সাক্ষী হতে চায়, এই লড়াইয়ের, এই ভালোবাসার, এই অদৃশ্য দ্বন্দ্বের দৃশ্যমান বিস্ফোরণের।
প্রথমেই শুরু হয় দুজনের শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা। দৌড়, বাধা টপকানো, ভারসাম্য রক্ষা, একটির পর একটি স্তর। নূরাইসা ও আরিবা সমানতালে এগিয়ে চলে, যেন কেউ কাউকে এক ইঞ্চিও ছাড় দিতে রাজি নয়। ঘামে ভিজে যায় শরীর, পেশিগুলো টানটান হয়ে ওঠে, শ্বাস ভারী হয়, তবু চোখে ক্লান্তির ছায়া নেই।দুজনের চোখেই জ্বলছে এক অদ্ভুত আগুন, যা ক্লান্তিকে হার মানাতে জানে। দ্বিতীয় ধাপে আসে অস্ত্রচালনা। কৌশল, নিখুঁত লক্ষ্যভেদ, প্রতিটি মুহূর্ত নিখুঁত হিসাবের দাবি করে। গুলির শব্দে শব্দে মাঠ যেন ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্রের রূপ নেয়। প্রতিটি ট্রিগার টানার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত সবার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে যায়। এখানে এক মুহূর্তের ভুলই সব শেষ করে দিতে পারে। ইলহান দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছে, মনে হচ্ছে যেন নিজের হৃদপিণ্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। প্রচণ্ড কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। না হলে এই মুহূর্তেই ছুটে যেত নূরাইসাকে আগলে নিতে, আঘাতের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে।
এরপর আসে কৌশলগত প্রশিক্ষণ। হঠাৎ আক্রমণ, আত্মরক্ষা, প্রতিপক্ষের দুর্বলতা খুঁজে বের করার নির্দয় লড়াই। এখানে আর শুধু শক্তির পরীক্ষা নয়, এটা মস্তিষ্কের যুদ্ধ। চোখের ভাষা, শরীরের ভঙ্গি, এক সেকেন্ডের সিদ্ধান্ত, সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। নূরাইসার চোখে অনড় দৃঢ়তা, আরিবার প্রতিটি ভঙ্গিতে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। কেউ কাউকে এক চুলও ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। সবশেষে আসে সেই মুহূর্ত, মুখোমুখি সংঘাত।কোনো প্রটেকশন নেই, কোনো নিরাপত্তার বর্ম নেই।শুধু শরীর, ইচ্ছাশক্তি আর বছরের পর বছর জমে থাকা প্রশিক্ষণের ওপর ভরসা। চারপাশের শব্দ হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়। বাতাস ভারী হয়ে নামে, সময় যেন ধীরে হাঁটতে শুরু করে। প্রথম আঘাত পড়ার সঙ্গেই জমে থাকা উত্তেজনা বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
ঘুষি, ধাক্কা, পাল্টা আক্রমণ, প্রতিটি আঘাতে ইলহানের বুক কেঁপে ওঠে। নূরাইসা মাটিতে পড়েও আবার উঠে দাঁড়ায়, চোখে অদম্য জেদ, হার না মানার দৃঢ় শপথ।আরিবা এক মুহূর্তের জন্য পিছিয়ে গিয়েও আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে আরও হিংস্র শক্তি নিয়ে। এটি শুধু শক্তির লড়াই নয়, এটি আত্মসম্মানের, অবস্থানের, নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের লড়াই।
ইলহান দাঁড়িয়ে তার চোখে গভীর উদ্বেগ, বুকের ভেতর অস্থিরতার ঝড়। নূরাইসা তার স্ত্রী, তার জীবনের গভীর ভালোবাসা। প্রতিটি আঘাতে যেন ইলহানের নিজের শরীরেই আঘাত লাগে। অথচ সে কিছু করতে পারছে না। শুধু তাকিয়ে আছস, দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে ধরে রেখেছে। নূরাইসার কথা ভেবেই সে বারবার এক পা এগিয়ে নিতে গিয়েও থেমে যায়, কারণ আজকের এই লড়াইটা নূরাইসার নিজের, তার প্রমাণের, তার শক্তি হয়ে ওঠার।
অন্যদিকে আর্সলান চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে।তার চোখে আগুন, মুখে কঠিন এক নীরবতা, যে নীরবতার ভেতরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য না-বলা কথা।নূরাইসার প্রতি তার অনুভূতি গভীর, নিঃশব্দ অথচ তীব্র। সে জানে, সে ইলহানের জায়গায় নেই, কখনো ছিল না, কখনো হবেও না। তবু প্রতিটি মুহূর্তে তার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে। নূরাইসার শক্তি তাকে গর্বিত করে, আবার সেই শক্তিই ভেতরে ভেতরে জাগিয়ে তোলে হিংস্র এক ঈর্ষা। কারণ এই যোদ্ধা নূরাইসা, এই অদম্য, অপ্রতিরোধ্য নূরাইসা, হয়ে উঠেছে শুধুই ইলহানের জন্য। ইলহানকে সে এতটাই ভালোবাসে যে আজ এখানে আসতে তাকে দু’বার ভাবতে হয়নি।
মাঠের মাঝখানে সংঘাত যখন চরমে পৌঁছায়, তখন চারপাশের সবাই শ্বাস আটকে রাখে। কে জিতবে, কে হারবে, এই প্রশ্নটাও গৌণ হয়ে যায়। তার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মুহূর্তটির টানটান উত্তেজনা। মনে হয়, এই দৃশ্য কেবল দেখা নয়, এ অনুভব করার। যারা সেখানে উপস্থিত, তারাও যেন আর দর্শক নয়, তারাও এই লড়াইয়ের অংশ হয়ে গেছে, হৃদয়টাকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে আছে। ঘামের গন্ধ, ধুলোর রং, দৃষ্টির সংঘর্ষ আর ভালোবাসা-বিদ্বেষের অদৃশ্য টানাপোড়েনে আজকের এই লড়াই ধীরে ধীরে ইতিহাস হয়ে উঠছে।
দীর্ঘ দ্বন্দ্বের শেষে, টানটান উত্তেজনার সুতো হঠাৎ করেই ছিঁড়ে যায়। এক মুহূর্তেই। নূরাইসা শেষ আঘাতটি সামলে নিয়ে পাল্টা আঘাতে আরিবাকে পরাস্ত করে। কিছুক্ষণের জন্য সময় যেন থমকে থাকে। তারপর দুজনেই মাটি থেকে উঠে দাঁড়ায়। মাঠের মাঝখানে দুই নারী, হাঁপাচ্ছে, ঘামে ভেজা শরীর, বুক অনিয়ন্ত্রিত ছন্দে ওঠানামা করছে। সেই দৃশ্যের ভেতরেও আছে এক ধরনের নীরব মর্যাদা। কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতার পর হঠাৎ করেই চারদিক ফেটে পড়ে উল্লাসে। একযোগে অসংখ্য কণ্ঠ চেঁচিয়ে ওঠে— "নূরাইসা... নূরাইসা..." ধ্বনিতে ধ্বনিতে মাঠ কেঁপে ওঠে, বাতাস ভরে যায় বিজয়ের উচ্চারণে।
আরিবা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। গভীর, ভারী শ্বাস নিচ্ছে সে, পরাজয়ের ভার যেন ফুসফুসে আটকে আছে। তার চোখে রাগ নেই, বিদ্বেষ নেই, আছে শুধু এক ধরনের নীরব স্বীকারোক্তি। হার মানার নয়, বরং সত্য মেনে নেওয়ার স্বীকারোক্তি।
নূরাইসা ধীরে ধীরে মাথা তোলে। তার দৃষ্টি গিয়ে থামে ইলহানের চোখে। সেও জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে, বুক ওঠানামা করছে অস্থির ছন্দে, তবু তার চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। ক্লান্তির আড়াল ভেদ করেও সেখানে জ্বলে উঠেছে বিজয়ের আলো। কোনো শব্দ নয়, কেবল চোখের ভাষায় সে বলে ওঠে, আমি পেরেছি। নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছি। ইলহান সেই দৃষ্টি বুঝে। তার চোখে জমে থাকা উৎকণ্ঠা এক মুহূর্তে গলে যায়। মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তির এক গভীর, অপরিসীম হাসি, যেন বুকের ওপর থেকে পাহাড় সরে গেছে। সে পেরেছে। নূরাইসা পেরেছে। সে দুর্বল নয়, কখনো ছিল না।
অন্যদিকে আর্সলান জমাট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে ক্ষোভের আগুন, চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরা। নূরাইসা একবারও তার দিকে তাকায় নি। যেন তার অস্তিত্ব নূরাইসার জগতে নেই, যেন সে দৃষ্টি দিয়েই জানিয়ে দেয়, এই যুদ্ধে, এই জীবনে, তার অবস্থান কোথাও নেই, কোথাও ছিল না।
কিছুক্ষণ পর আরিবা ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে এগিয়ে আসে। পরাজয়ের ক্লান্তি সত্ত্বেও তার মুখে একটি মৃদু, অদ্ভুতভাবে শান্ত হাসি। নূরাইসার সামনে দাঁড়িয়ে সে বলে—
-"অভিনন্দন। আমাকে হারিয়েছ তুমি। আমি স্বীকার করছি, তুমি দুর্বল নও। তুমি স্যারের যোগ্য সহধর্মিনী।"
নূরাইসা ঘুরে তাকায় তার দিকে। বুকের ভেতর হঠাৎ করে এক অস্বস্তিকর ঢেউ উঠে আসে। কয়েক মাস আগেও যে মেয়েটি তাকে হিংসে করত, তার স্বামীকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল, আজ সে এত শান্ত, এত স্বচ্ছ কেন? এই প্রশ্নটাই মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে। উত্তর খোঁজার আগেই চারপাশ ঘুরে ওঠে। আকাশ, মাঠ, মানুষ, সবকিছু একসঙ্গে অন্ধকার হয়ে আসে। নূরাইসা ঢলে পড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে আরিবা হাত বাড়িয়ে তাকে ধরে ফেলে। কিন্তু পরের সেকেন্ডেই দুই দিক থেকে ছুটে আসে দুটো ছায়া, ইলহান আর আর্সলান।
ইলহান এক ঝটকায় নূরাইসাকে কোলে তুলে নেয়। তার চোখে আতঙ্ক, গভীর উদ্বেগ। আর্সলানের দিকে একবার শক্ত, শীতল দৃষ্টিতে তাকায়, যেন স্পষ্ট করে সীমারেখা টেনে দেয়। তারপর আরিবার দিকে ফিরে গম্ভীর কণ্ঠে বলে—
-"ধন্যবাদ তোমাকে, আরিবা। ফর এভরিথিং।"
আরিবার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। চোখে জমে ওঠে একরাশ ক্লান্তি আর চাপা অপরাধবোধ। নিচু গলায় সে বলে—
-"আমার বোন যে অন্যায় করেছে, তার বিনিময়েই আমি এই কাজটা করলাম স্যার। আশা করি... আমার বোনের কৃতকর্মের শাস্তি আমি পাবো না।"
ইলহান নূরাইসাকে বুকে শক্ত করে ধরে ঘুরে দাঁড়ায়। হাঁটতে হাঁটতে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে—
-'তোমার বোন যা করেছে, তার শাস্তি সে পাবে।একজনের পাপের ফল অন্যজন পায় না, আরিবা। আমি কখনোই তোমাকে তোমার বোনের জন্য দোষী করিনি।"
ইলহান ও নূরাইসার চলে যাওয়া শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে আর্সলান। তাদের পিঠের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে তার চোখে জমে ওঠে অজানা এক অস্বস্তি।কিছুক্ষণ পর সে আরিবার দিকে তাকায়। কিসের শাস্তি? কিসের পাপ? ইলহানের কথাগুলো মাথার ভেতর প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। আর্সলান গভীর চিন্তায় ডুবে যায়, কারণ এই লড়াই শেষ হলেও, অদৃশ্য আরেকটি সত্য এখনো প্রকাশের অপেক্ষায়।
.
নুহাদের আগামীকাল ঢাকা ফিরবে। আজ তাদের বান্দরবনে আসার ছয় দিন পূর্ণ হয়েছে। এই ক’দিনে পাহাড়, ঝরনা, আঁকাবাঁকা পথ, সবই ঘুরে দেখেছে তারা। আজ সারাদিনের হাঁটা আর ঘোরাঘুরিতে সবাই বেশ ক্লান্ত। সন্ধ্যা নামার আগমুহূর্তে দলটি এবার জঙ্গলের দিকেই এগোচ্ছে। নুহা আর রিজভী পাশাপাশি হাঁটছে। সামনে দলের অনেকেই আগেই এগিয়ে গেছে। হঠাৎ রিজভীর কয়েকজন বন্ধু ছবি তোলার জন্য তাকে ডাক দেয়। রিজভী এক মুহূর্ত নুহার দিকে তাকিয়ে বলে—
-"আমি ছবি তুলে আসছি। এখানেই দাড়াও একটু!"
নুহা মাথা নাড়ে। নুহা একা হয়ে পড়ে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো কিন্তু রিজভী এলো না। তাই সে একাই হেঁটে সামনে এগোতে লাগলো। সন্ধ্যার নরম আলো ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। জঙ্গলের ভেতর অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, এমন অন্ধকার, যা শুধু চোখে নয়, মনের ভেতরেও নেমে আসে। এই কয়েকদিন ধরে নুহা একের পর এক বিহানের নম্বরে কল করেছে, খোঁজ নিয়েছে, কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি। সেই বিষণ্নতা বুকে চেপে ধরে মাথা নিচু করে সে হাঁটতে থাকে। কখন যে মূল পথ ছেড়ে অন্য পথে গেছে, নিজেও টের পায় নি।
চারপাশে তাকিয়ে নুহা শিউরে ওঠে। অন্ধকারে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। আশপাশে মানুষের কোনো চিহ্ন নেই। আতঙ্কে ফোনের টর্চ জ্বালাতে গিয়ে সে দেখে, ফোনে চার্জ নেই। বুকের ভেতর ধক করে ওঠে তার।ভীত কণ্ঠে সে চারদিকে ডাকতে থাকে—
-"রিজভী... রিজভী..."
কিন্তু জঙ্গলের নিস্তব্ধতা তার ডাক গিলে ফেলে। কোনো সাড়া নেই। শুধু অচেনা শব্দ, ঝোপের ফাঁক থেকে আসা অজানা নড়াচড়া। খুঁজতে খুঁজতে একসময় সে রাস্তার ধারে এসে দাঁড়ায়। চারপাশ শুনশান। এই পথে কোনো গাড়ির চলাচল নেই বললেই চলে। তবু নুহা সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো, মনে মনে নিজেকে বোঝায়, নিশ্চয়ই কোনো গাড়ি আসবে। আর ঠিক তখনই দূরে আলো দেখা যায়। একটি আর্মি জিপ এগিয়ে আসছে।জিপের সামনের শক্তিশালী হেডলাইট অন্ধকার ছিঁড়ে পথ বানিয়ে নিচ্ছে। আলো পড়তেই নুহার চোখ ঝলসে ওঠে। তাড়াতাড়ি সে তার পরনের ওড়না হাতে তুলে জোরে জোরে ঘোরাতে থাকে।
জিপটি ধীরে এসে তার সামনে থামে। ইঞ্জিনের শব্দ থামতেই জিপ থেকে একজন পুরুষ নেমে আসে।জিন্স, টি-শার্ট আর জ্যাকেট পরা, বলিষ্ঠ দেহ, প্রশস্ত কাঁধ।অন্ধকারের মধ্যেও তার উপস্থিতি আলাদা করে চোখে পড়ে। সে কয়েক পা এগিয়ে এসে নুহার সামনে দাঁড়ায়।গম্ভীর, কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে সে বলে—
-"তুমি এখানে কী করছ, নীলপদ্ম?"
কণ্ঠটা শুনেই নুহার বুকের ভেতর জমে থাকা সব ভয় একসাথে ভেঙে পড়ল। সে আর কিছু না ভেবে, এক লাফে বিহানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। অন্ধকার, জঙ্গল, নিঃসঙ্গতা, সব যেন এক মুহূর্তে গলে গেল।হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে, এমন কান্না, যা থামানোর ক্ষমতা তার নিজেরও নেই। বিহান কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। হঠাৎ এমন কিছুর জন্য সে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। নুহাকে এই সময়ে এখানে দেখে সে বেশ অবাকই হয়েছে। সে নুহার কাঁধে হাত রেখে শান্ত করার চেষ্টা করল। একটু পর নুহা নিজেকে সামলাল। চোখ মুছল, কণ্ঠে কাঁপুনি নিয়েই বলতে শুরু করল—
-"রিজভীকে... ওর বন্ধুরা ছবি তুলতে ডাকল। ও একটু দূরে গেল। আমি ভাবলাম এখানেই দাঁড়াই। কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই অন্ধকার হয়ে গেল... আমি হাঁটতে হাঁটতে বুঝতেই পারিনি পথ হারিয়ে ফেলেছি। ফোনে চার্জ ছিল না। কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। রিজভীর নাম ধরে ডাকলাম... কেউ শোনেনি। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, বিহান ভাই..."
কথাগুলো বলতে বলতে আবার তার চোখ ভিজে ওঠে।সবটা শুনে বিহানের চোখ কঠিন হয়ে যায়। সে চারপাশ একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে—
-"জিপে ওঠো। আমি চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে যাচ্ছি।সেখান থেকে ইসার সাথে তুমি ঢাকায় ফিরবে।রিজভীকে আমি কল করে সব জানিয়ে দিচ্ছি।"
নুহা আর কোনো প্রশ্ন করল না। কোনো প্রতিবাদও নয়। নাক টানতে টানতে, নিঃশব্দে বিহানের পিছু পিছু জিপে উঠে বসল। জিপ চলতে শুরু করল। কিন্তু জঙ্গলের গভীরে, গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কয়জোড়া চোখ অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে উঠল। সেই দৃষ্টিতে ছিল ক্ষোভ, ছিল ব্যর্থতার আগুন। যেন তারা কোনো পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল, আর সেই পরিকল্পনাই আজ ভেস্তে গেছে।
জিপ কিছুদূর এগোতেই বিহানের চোখ সাইড মিররে আটকে যায়। পেছন থেকে আরও কয়েকটি গাড়ি আসছে। কালো রঙের দুটো গাড়ি ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়ে বিহানের জিপকে দুই দিক থেকে ঘিরে ফেলল।বাতাস ভারী হয়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই এক কালো গাড়ির জানালা দিয়ে মুখোশধারী এক লোক হাত বাড়িয়ে নুহাকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল। একই সময়ে অন্য পাশের গাড়ি থেকে আরেকজন ছুরি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল, সরাসরি বিহানের দিকে। লোহার ঝনঝন শব্দ, হঠাৎ ব্রেকের কষাঘাত, নুহার চিৎকার, সব মিলিয়ে রাতের নীরব জঙ্গল রণক্ষেত্রে রূপ নিল। নুহা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল—
-"বিহান ভাই... বাঁচাও আমাকে..."
নুহার কণ্ঠটা ভয়ে কেঁপে উঠল। সেই কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্ব, ছিল প্রাণ বাঁচানোর আর্তি। মুহূর্তেই বিহানের শরীরের প্রতিটি স্নায়ু সজাগ হয়ে উঠল। সে এক হাত দিয়ে স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে রাখল, অন্য হাত দিয়ে নুহাকে নিজের দিকে টেনে নিল। বিহান দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
-"ভয় পেও না, আমি আছি।"
জিপ ছুটে চলছে অন্ধকার পাহাড়ি রাস্তায়। চারপাশে শুধু গভীর জঙ্গল, নিচে খাদ, একটু ভুল মানেই মৃত্যু।পেছন থেকে কালো গাড়িগুলো হিংস্র কুকুরের মতো ধাওয়া করছে। হেডলাইটের আলো অন্ধকার ছিঁড়ে ছুটে আসছে, যেন তারা শিকার হাতছাড়া করতে চায় না। হঠাৎ আবার ঝাঁকুনি। এক মুখোশধারী জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে। বিহান ব্রেক কষে, হঠাৎ স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দেয়। গাড়ি কেঁপে ওঠে। ভারসাম্য হারিয়ে এক কালো গাড়ি রাস্তার ধারে ছিটকে যায়, মুহূর্তের মধ্যেই গভীর খাদে তলিয়ে যায়।
কিন্তু হামলা থামে না। আরেকটি গাড়ি পাশ থেকে ধাক্কা মারতে উদ্যত হয়। বিহান গতি বাড়ায়, চোখে তখন আর কোনো দ্বিধা নেই, শুধু হিসাব। ঠিক সময়ে সে হ্যান্ডব্রেক টানে। জিপ ঘুরে দাঁড়ায়, আর কালো গাড়িটি নিজের গতির ভারে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি খাদে গিয়ে পড়ে। শেষ গাড়িটি যেন মরিয়া হয়ে ওঠে। পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। নুহা চোখ বন্ধ করে চিৎকার করে ওঠে। বিহান দাঁতে দাঁত চেপে স্টিয়ারিং আঁকড়ে ধরে।হঠাৎ সে রাস্তার বাঁকটা কাজে লাগায়, এক ঝাঁকুনি, এক তীক্ষ্ণ মোড়, ধ্বংসের শব্দে কেঁপে ওঠে জঙ্গল।
তৃতীয় গাড়িটিও খাদে পড়ে যায়।
চারপাশে আবার নেমে আসে ভয়ংকর নিস্তব্ধতা। শুধু জিপের ইঞ্জিনের শব্দ, আর নুহার কাঁপা শ্বাস। বিহান গাড়ির গতি কমায়। একবার নুহার দিকে তাকায়। নুহা তখনও আতঙ্কে জমে আছে, কিন্তু চোখে এখন ভয়ের চেয়েও বড় কিছু, ভরসা। আজ রাতে, এই অন্ধকার জঙ্গলে, মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে হারিয়ে দিয়ে তারা বেঁচে ফিরেছে।
হঠাৎই রাতের নীরবতা ছিন্ন করে গুলির শব্দ ফেটে পড়ল। এক মুখোশধারী হামলাকারী জানালা দিয়ে শরীর বের করে বিহানের জিপের চাকায় নিশানা করল। মুহূর্তের মধ্যেই আরেকটি গুলি, ধাঁই!
চাকার ভেতর থেকে বিকট শব্দ উঠল। জিপ হঠাৎ দুলে উঠল, নিয়ন্ত্রণ হারাতে লাগল। পাহাড়ি সরু রাস্তার ওপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে গাড়িটি পাশের দিকে হেলে পড়ল।
-"বিহান ভাই...!!"
নুহার চিৎকার শেষ হওয়ার আগেই সবকিছু ঘটে গেল।জিপটি রাস্তা ছেড়ে পাহাড়ি জঙ্গলের দিকে গড়িয়ে পড়তে শুরু করল। গাছের ডাল ভাঙার শব্দ, লোহার গায়ে পাথরের আঘাত, সব মিলিয়ে চারপাশ এক ভয়ংকর তাণ্ডবে ভরে উঠল। এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে বিহান সিদ্ধান্ত নিল। সে স্টিয়ারিং ছেড়ে দিয়ে নুহাকে টেনে নিজের বুকে শক্ত করে চেপে ধরল।নিজের শরীর দিয়ে তাকে আড়াল করে ফিসফিস করে বলল—
-"চোখ বন্ধ করো... ভয় পেও না। আমি আছি।"
জিপটা গড়াতে গড়াতে আরও নিচে নামছে। অন্ধকার জঙ্গল তাদের গিলে নিচ্ছে। চারপাশে শুধু ভাঙচুরের শব্দ আর মৃ ত্যুর নিঃশ্বাস। বিহান নুহার মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে রাখে। নিজের সব শক্তি, সব সাহস এক বিন্দুতে এনে তাকে আগলে রাখে, যেন এই এক মুহূর্তে পুরো পৃথিবীর দায়িত্ব তার কাঁধে। আর অন্ধকার পাহাড়ি জঙ্গলের বুকে, সময়টা থমকে যায়।
.
আফরিন ভার্সিটি থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। শরীরটা অবসন্ন, মাথার ভেতর এখনো প্রশ্নপত্রের লাইনগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। আজ হুট করেই টানা সাত ঘণ্টার এক্সাম নেওয়া হয়েছে, নাম মাত্র ক্লাস টেস্ট, কিন্তু চাপটা ছিল পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষার মতোই। আরও অদ্ভুত বিষয়, ফেব্রুয়ারির একেবারে শুরুতেই পরীক্ষা। সাধারণত এই সময়ে তো এমন কিছু হয় না।অথচ আজ প্রতিটা স্যার যেন ঠিক করেই রেখেছিলেন পরীক্ষার নেওয়ার।
ঘড়িতে তখন ঠিক সাতটা বাজে। ভার্সিটির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আফরিন চারপাশে তাকায়। রাস্তায় লোকজন আছে, গাড়ি আছে, কিন্তু একটাও রিকশা নেই। মিনিটের পর মিনিট অপেক্ষা করেও কোনো লাভ হয় না। অকারণ একটা অস্বস্তি বুকের ভেতর চেপে বসে। সন্ধ্যার পর একা কোথাও যেতে ইলহান ভাই কড়া নিষেধ করেছে, সেই কথাটা মনে পড়তেই আফরিন আর দেরি করে না। ফোনটা বের করে তানভীরকে কল দেয়। দু’বার রিং হতেই ওপাশ থেকে কল রিসিভ হয়। আফরিন একটু চাপা গলায় বলে—
-"ভাইয়া আমাকে এসে নিয়ে যা।৭ ঘণ্টা ধরে পরীক্ষা নিয়েছে, ক্লাস টেস্ট। আমি একটা রিকশাও পাচ্ছি না। ইলহান ভাই সন্ধ্যার পর একা যেতে নিষেধ করছে কোথাও। তুই একটু আয় না, কষ্ট করে!"
ওপাশ থেকে এক মুহূর্তও দেরি না করে তানভীর বলে—
-"একটু অপেক্ষা কর, আমি ৩০ মিনিটের মধ্যেই আসছি!"
-"আচ্ছা!"
কথা শেষ হতেই আফরিন ফোন নামিয়ে চুপচাপ রাস্তার এক পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। চারপাশের কোলাহল তার কানে ঢুকছে না। সে আবার ফোনটা হাতে নেয়।গ্যালারিতে ঢুকে নুহার পাঠানো ছবিগুলো খুলে দেখে।খুব সুন্দর সুন্দর ছবি। পাহাড়, আলো-ছায়া, আর নুহার মুখে সেই চেনা কিন্তু বহুদিন পর ফেরা হাসি।আফরিনের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা হালকা হাসি ফুটে ওঠে। মনে মনে ভাবে, যাক, অবশেষে মেয়েটার মুখে হাসি ফিরেছে।
সন্ধ্যার ধূসর আলোয় দাঁড়িয়ে, ফোনের পর্দার সেই হাসিটাই যেন আফরিনের ক্লান্ত দিনটাকে একটু হলেও সহনীয় করে তোলে। আফরিন তখনও নিজের ভাবনায় ডুবে ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে হঠাৎ কালো একটি কাপড় তার মুখ চেপে ধরল।
"উঁহ!"
আফরিন ছোটফোট করে উঠল। হাত-পা ছুড়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু লোকটার হাত ছিল পাথরের মতো শক্ত। শ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগল। বুকের ভেতর বাতাস আটকে আসছে। চোখের সামনে ঝাপসা অন্ধকার নেমে এলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার শক্তি ফুরিয়ে গেল। আফরিন ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ল। লোকটি আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। অজ্ঞান শরীরটা কাঁধে তুলে নিয়ে দ্রুত কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।দরজা খুলে তাকে ভেতরে ছুড়ে ফেলে, মুহূর্তের মধ্যেই গাড়িটি সেখান থেকে সরে গেল, যেন কিছুই ঘটেনি।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল যে, আফরিনের জন্য গোপনে রাখা বডিগার্ডরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দৃশ্যটা শেষ। তারা ছুটে আসে, চারপাশ তন্নতন্ন করে খোঁজে। রাস্তায় ছুটে বেরিয়ে আসে, কিন্তু ততক্ষণে গাড়ি অনেক দূরে চলে গেছে। শুধু বাতাসে রয়ে গেছে আতঙ্কের রেশ। একজন বডিগার্ড দেরি না করে ইলহানকে কল করল। রিং বাজছে, কিন্তু কেউ ধরছে না। সঙ্গে সঙ্গে বিহানকে কল করা হলো। সেখানেও একই নীরবতা। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। শেষ ভরসা হিসেবে ফোন গেল তানভীরের কাছে। ঠিক তখনই তানভীর হাসপাতাল থেকে বের হয়েছে। দিনের সব ক্লান্তি নিয়ে সে গাড়ির দিকে এগোচ্ছিল। ফোনটা ভাইব্রেট করতেই কপাল কুঁচকে দ্রুত কল রিসিভ করল। ওপাশ থেকে ভেসে এলো ভয়ার্ত, কাঁপা কণ্ঠ—
-"স্যার... আফরিন মামকে তুলে নিয়ে গেছে। আমরা গাড়ি ধরতে পারিনি!"
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই, তানভীর কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছন থেকে সজোরে তার মাথায় আঘাত এসে পড়ল। সবকিছু হঠাৎ ঘুরে গেল। আরেক মুহূর্তেই তানভীরের শরীর ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ফোনটা হাত থেকে ছিটকে গেল, তবু কল কেটে যায়নি। ফোনের ওপাশে বডিগার্ডের ভয়ার্ত চিৎকার ভেসে আসছে—
-"স্যার! তানভীর স্যার! স্যার কথা শুনছেন? স্যার...!"
কিন্তু ওপাশে তখন নিস্তব্ধতা। শুধু পড়ে থাকা ফোনটা, আর ক্রমশ ঘনিয়ে আসা অশুভ অন্ধকার, যেন একসাথে বহু জীবনকে গ্রাস করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।