সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ৩৩

🟢

#সুর্যস্নাত_ভালোবাসা

-"ইসা, দেখো! তোমার নামে একটি লাল গোলাপ, আর চিরকুট। কেউ দরজার সামনে রেখে গেছে!"

মাহিরার কণ্ঠে হালকা উত্তেজনা। নূরাইসা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো শক্ত করে বাঁধছিল। আর মাত্র কিছুক্ষণ পরেই মাঠে নামতে হবে ট্রেনিংয়ের জন্য।ঘামে, রোদের তাপে, প্রত্যাশার ভিড়ে জমে ওঠা সেই মাঠের কথা মাথায় রেখেই সে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মাহিরা, দলের প্রাণবন্ত মেয়েটি, গোলাপ আর চিরকুট হাতে দাঁড়িয়ে তার পেছনে। নূরাইসা একটু থেমে এগিয়ে এল। ভ্রু কুচকে তাকিয়ে ফুল ও চিরকুট হাতে নিলো। চিরকুট খুলতেই চোখে পড়ল লাল কালিতে মোটা অক্ষরে লেখা, অক্ষরগুলোতে অদ্ভুত এক আগ্রাসী কোমলতা, যেন কেউ মমতার ছদ্মবেশে নিজের অধিকার ফলাচ্ছে।

-"শুভ সকাল, সেনোরিটা। কাল আমার ভালোবাসা তুমি প্রত্যাখ্যান করেছ... তাতে কী আসে যায়? আমি আবার আসব। আবার বলব। যতদিন না তুমি ফিরে তাকাও আমার দিকে। দেখা হচ্ছে মাঠে। আজ শুধু লাল গোলাপের ভালোবাসা জানালাম।

—ইতি, আর্সলান দেহরান।"

কেমন যেন ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল নূরাইসার মেরুদণ্ডে।এই প্রথম কেউ তাকে এত নিখুঁতভাবে, এত নাটকীয় ভঙ্গিতে ভালোবাসা জানাল। একটি নির্মল সকাল,তবুও তার বুকের ভেতর অস্বস্তির ধুকধুকানি। যেখানে বেশিরভাগ মেয়েই এমন নিবেদন পেলে আবেগে গলে যেত, সেখানে নূরাইসার মনে জমল অচেনা এক ভীতি।অনুশোচনা তার মনে টোকা দিল, গতকাল হয়তো সে একটু বেশিই বলে ফেলেছিল। মানুষ মানুষকে ভালোবাসতেই পারে, এতে দোষ নেই... কিন্তু আর্সলানের সেই দৃষ্টি, সেই কথাগুলো, অস্বস্তিকর তীব্রতায় নূরাইসাকে বিব্রত করেছে। আর সে, ইলহানকে নিয়ে তর্ক করেছে নিজের সীমা পেরিয়ে, না হলে এতটা তীক্ষ্ণ আচরণ করত না কখনো।

মাহিরা চিরকুটটি নিয়ে এবার উৎসাহে উজ্জ্বল হয়ে বলে উঠল—

-"বাহ ইসা! আর্সলান দেহরান তোমায় ভালোবাসা জানাচ্ছে? সেনাবাহিনীর বেস্ট স্নাইপার! কিন্তু আফসোস... তুমি তো বিবাহিত!"

নূরাইসা হালকা এক নিঃশ্বাস ফেলে ম্লান হাসল। মাহিরা একটু ঝুঁকে চাপা নিচু কন্ঠে হেসে বলল—

-"করবে নাকি প্রেম? যদিও A-nova বেস্ট, দেহরান স্যারও কিন্তু কম না! ওনার ওই বাবরি চুল আর বাদামি চোখ, উফ! জানো, সাইফার এক্স, A-nova আর স্টিল স্প্যারো, ওনাদের তিনজনের বন্ধুত্ব নিয়ে এখনো সেনাবাহিনীতে গল্প চলে।"

নূরাইসার উৎসুক দৃষ্টি ঘুরে গেল তার দিকে। কৌতুহলী কন্ঠে বলল—

-"মানে? ওনাদের বন্ধুত্ব কি বিশেষ ছিল?"

তার কণ্ঠে কৌতূহল হলেও চোখে লুকিয়ে ছিল অন্য এক প্রশ্ন, আর্সলান দেহরানের এই অদ্ভুত, দাবিদার ভালোবাসার পেছনে কি সেই বন্ধুত্বেরই কোনো ছায়া আছে? মাহিরা চোখ উজ্জ্বল করে বলল—

-"হ্যাঁ, তুমি জানো না? আচ্ছা শোনো... পুরো গল্পটাই বলি। ওনারা তিনজন, সাইফার এক্স, A-Nova আর স্টিল স্প্যারো, এক কলেজে পড়তেন। তখন থেকেই তিনজন প্রাণের বন্ধু। যদিও সাইফার এক্স আর A-Nova একটু বেশি ঘনিষ্ঠ ছিল, তবে স্টিল স্প্যারোও কম ছিল না। সব সময় তিনজন একসাথেই থাকত।একসাথে আর্মিতে এসেছে এবং রাজত্ব করেছে। এখনো করছে। কিন্তু চার বছর আগে কোনো একটা বিষয় নিয়ে তিনজনের মধ্যে ভয়ংকর ঝামেলা বাঁধে।সে ঝামেলা এত কুরুচিপূর্ণ জায়গায় পৌঁছেছিল যে পুরো হেডকোয়ার্টার থমকে গিয়েছিল। A-Nova আর্সলানকে এমন মার দিয়েছিল যে তাকে বাঁচানোই মুশকিল হয়ে গিয়েছিল। আর্সলান ও মেরেছিল, A-nova ও আহত হয়েছিল গুরুতর। তারপর দীর্ঘ ট্রিটমেন্ট আর প্রায় দেড় বছরের ছুটি,শুধু সুস্থ হওয়ার জন্য।A-Nova-কেও সাসপেন্ড করা হয়েছিল। আর সাইফার এক্স? সে তো দুজনকে থামাতে গিয়ে উল্টো নিজেই আহত হয়েছিল! কোনো দোষ না থাকলেও, ঘটনাস্থলে থাকার কারণে তাকেও সাসপেন্ড করা হয়।"

নূরাইসা বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—

-"তুমি এতসব জানলে কীভাবে?"

মাহিরা গর্বের হাসি দিল—

-"আরে, সেনাবাহিনীতে সবাই জানে এসব। এই গল্প সবার মুখে মুখে!"

নূরাইসা শুধু হালকা "ওহ..." বলে চুপ করে রইল।মাহিরা আবার বলল—

-"জানো, আজও যদি সাইফার এক্স, A-Nova আর স্টিল স্প্যারো, এই তিনজনকে একসাথে কেউ দেখে... সবাই ভয় পায়। আফসোস করে, ইস! যদি তাদের পুরোনো বন্ধুত্বটা আবার ফিরে আসত!"

নূরাইসা আর কিছু বলল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।মাহিরা তখন তার হাতে ধরা গোলাপটির দিকে তাকিয়ে নরম কণ্ঠে বলল—

-"জানো, আর্সলানকে আমার খুব ভালো লাগে... আমার ক্রাশ!"

নূরাইসা মুচকি হেসে বলল—

-"তাহলে ফুলটা তুমি রাখো।"

মাহিরা অবাক হয়ে বলল—

-"সত্যি?"

-"হ্যাঁ। আমি আমার স্বামী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের কাছ থেকে ফুল নিই না।"

মাহিরা খুশিতে ঝলমল করে উঠল। নূরাইসা তার হাসি দেখে মৃদু হাসল। সে মনে মনে ভাবল, হয়তো বন্ধুত্বের কোনো রাগই আর্সলানকে এসব করতে উসকে দিয়েছে। ইলহানকে রাগানোর জন্যই হয়তো এই নাটক। ভাবনাটা তাকে সামান্য স্বস্তি দিল। কিন্তু নূরাইসা বুঝতেই পারল না, এটা কোনো বন্ধুর অভিমান নয়। এর নিচে রয়েছে আরও অন্ধকার, আরও গভীর, আরও ভীতিকর একটি সত্য, যার ছায়া তার জীবনে নেমে আসতে আর বেশি দেরি নেই।

.

শীতের দুপুর। জানুয়ারির শেষ দিকের সেই বিষণ্ন, নরম রোদ পাতলা পর্দার মতো ছড়িয়ে আছে ছাদের প্রান্তে। রুহান দাঁড়িয়ে আছে বাতাসের দিকে মুখ করে। শীতল হাওয়া তার গায়ে ধাক্কা দিচ্ছে তীক্ষ্ণ, ঠাণ্ডা আলিঙ্গনে। মনে বারবার ভেসে উঠছে গতকালের দৃশ্য, উপমার ঘরের দেয়াল। গতকাল উপমার ঘরের দেয়ালের এক পাশে দাঁড়িয়ে রুহান নিজেকে দেখেছে, শত শত ছবিতে আটকে আছে তার প্রতিটি মুহূর্ত। সেই দেয়ালে এক পাশে সারি সারি ছবি... যেন সময়কে হাতকড়া পরিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। প্রতিটি ছবির নিচে লেখা দিন, তারিখ, সময়, আর উপমার নিঃশ্বাস মাখা কবিতা, উক্তি, স্বীকারোক্তি। মনে হচ্ছিল ছবিগুলো চুপচাপ, নিঃশব্দে তীক্ষ্ণ তর্জনী তুলে চিৎকার করছে, কতদিন, কত গভীরভাবে উপমা তাকে দেখেছে, ভেবেছে, ভালোবেসেছে।

কাল থেকে রুহান উপমাকে পরখ করছে। কিন্তু উপমা? তার সামনে দাঁড়ালে সে একদম অন্য মানুষ, মাথা নিচু, নরম, বিনয়ী, শান্ত। সেই অন্ধ আবেশভরা ভালোবাসার একটুও ছাপ নেই তার চোখে-মুখে। কি আশ্চর্য দ্বৈততা!

রুহান কখনোই উপমাকে ঠিকমতো দেখার চেষ্টা করেনি। সে এমনিতেই দুষ্টুমি করে, অল্প কথায় ফ্লার্টও করে, কিন্তু যাদের প্রতি সে সম্মানবোধ রাখে, যাদের সাথে কাজ করে, তাদের সঙ্গে কোনোদিনই সীমা ছাড়িয়ে যায়নি। তাই উপমার মুখ দেখার ইচ্ছেও কোনোদিন জাগেনি তার ভেতর। কিন্তু গতকাল... এক অদ্ভুত টান, অজানা কোনো ঘূর্ণাবর্ত, তাকে বারবার বাধ্য করছিল উপমার মুখখানি দেখার চেষ্টা করতে।আর প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে। মেডিক্যাল রুমে সবসময় মাস্ক, চশমা, খাবারের সময় চুল নামিয়ে রাখে, যা তার মুখশ্রী সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়।

রুহানের মাথায় যেন কিছুই কাজ করছে না। এমন obsessed রমণী সে জীবনে কখনো দেখেনি। উপমা তার সমবয়সী, তবুও এখনো বিয়ে করেনি, আর দেয়ালের সেই বক্তব্য, সেই নিবেদনগুলো স্পষ্ট করেছে, উপমার আর্মিতে আসার মূল কারণ রুহান নিজেই। দূরের আকাশ ফুঁড়ে ভেসে আসা রোদের নিচে দাঁড়িয়ে রুহান গভীর চিন্তায় ডুবে ছিল। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো এক চিকন, নরম, মেয়েলি কণ্ঠ। রুহান চোখ কুঁচকে ঘুরে দাঁড়াল—

আর ঠিক সেই মুহূর্তে সময় থমকে গেল। এক মুহূর্তে তার নিশ্বাস যেন আটকে গেল। হৃদয় থমকে গেলো। চোখের কুচকানো ভাঁজ মুছে গিয়ে জায়গা নিল মুগ্ধতা, বিস্ময়, অবাক হওয়া। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে উপমা। আজ কোনো চশমা নেই, নেই সেই অভেদ্য মাস্ক। খোলা চুল শীতের বাতাসে যেন ধীরে উড়ছে। গায়ে ডাক্তারের সাদা পোশাক, নির্মল, স্বচ্ছ, নিষ্পাপ। তার টানা চোখ, ঘন পাপড়িতে ঘেরা, যেন জন্মগত কালি মাখা। ছোট, গোলগাল মুখে শীতের কামড়ে দু’পাশে হালকা লাল আভা। নাকের ডগা পর্যন্ত ঠান্ডায় রাঙা। আর সেই গাঢ় গোলাপি, ভরাট অধর, যেন কিছু বলার আগেই ধাক্কা মেরে রুহানের বুকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছিল।

উপমা ধীর পায়ে এগিয়ে আসে। ছাদের শীতল নীরবতা ভেঙে তার পায়ের প্রতিটি শব্দ ঘন হয়ে ওঠে। তার হাতের ক্ষীণ নড়াচড়াও স্পষ্ট শোনা যায়, এমনভাবে যেন পুরো পরিবেশ তাকে ঘিরে শ্বাস নিচ্ছে। একেবারে রুহানের সামনে এসে দাঁড়ায় উপমা। তার ঠোঁট কেঁপে ওঠে। শীতল বাতাসে তার স্বর যেন আরও স্বচ্ছ, আরও ধারালো, আরও গভীর—

-"ভালোবাসি তোমায়, রুহান ইয়াসির দেওয়ান!"

এক মুহূর্তে সেই শব্দের অগ্নি রুহানের বুক ভেদ করে ঢুকে গেল। তার হুশ ফিরল। চোখ সোজা করে, দৃষ্টিতে নির্দয় কঠোরতা এনে, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে রুহান বলে উঠল—

-"কত দিন ধরে স্টক করেছ আমায়?"

এক মুহূর্তে উপমার মুখের রঙ বদলে গেল। তার চোখ, ঠিক আহত হরিণের মতো বড় হয়ে উঠল, ভরা বিস্ময়, অভিমান, আর গভীর যন্ত্রণার কম্পনে। "স্টকিং", শব্দটা যেন তার ভালোবাসার মর্মমূলে ছুরি চালিয়ে দিল। ঠাণ্ডা হাওয়ার নিচে তার ঠোঁট কেঁপে ওঠে। সে বলল—

-"আমার ভালোবাসাকে স্টক করা বলছ তুমি? আমি জানি, তুমি সব জেনে গেছ। কাল আমার রুমে গিয়েছিলে। বিশ্বাস করো রুহান, আমি স্টক করি নি। আমি শুধু তোমার আশেপাশে থাকার চেষ্টা করেছি, তুমি যেখানে, আমি সেখানে থাকতে চেয়েছি। তোমার কাছে আসতে পারিনি, তাই দূর থেকে শুধু ছবি তুলেছি।"

তার কথার শেষে চারপাশের বাতাসও যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল, উদাস, নীরব, ভারী।রুহান ভ্রু কুঁচকালো। তার গলায় কঠোরতা, রুক্ষতা, তীক্ষ্ণ ধার—

-"এটাকেই স্টক করা বলে, উপমা মাহতাব রুচিকা!"

উপমা থমকে থাকে। তার চোখ বিস্ময়ে আরও বড় হয়ে যায়। স্বরে কুয়াশার মতো অবিশ্বাস—

-"তুমি... তুমি আমায় চিনতে পেরেছো, রুহান?"

রুহানের চোখে ক্ষণিকের আগুন ঝলকে ওঠে—

-"চিনতে যাতে না পারি, তার জন্যই তো এই মাস্ক-চশমা, এই লুকোচুরি খেলা খলেছো রুচিক!"

উপমা মাথা নিচু করে ফেলে। শীতল বাতাসে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। গলা নরম, কেঁপে যাওয়া, প্রায় ফিসফিসে—

-"আমি দেশে এসেই তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চেয়েছিলাম... কিন্তু তোমাকে... ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন মেয়ের সঙ্গে দেখতাম। তাই... তাই আমি আর তোমার সামনে আসি নি।"

রুহানের কণ্ঠ এবার আরও শীতল হয়ে উঠল, যেন শীতের বাতাসও তাতে জমে যায়—

-"কবে থেকে স্টক করছ আমায়?"

ছাদের নীরবতা মুহূর্তেই শ্বাসরুদ্ধ আঁধারে ভরে উঠল।হাওয়া থেমে গেছেআকাশের দৃষ্টি নেমে এসেছে দু’জনের উপর। উপমার ঠোঁট ধীরে ফাঁক হলো, কিন্তু তার আগে পরিবেশ জমে উঠল অস্বস্তি, ব্যথা, আকাঙ্ক্ষা, আর বহুদিনের চেপে রাখা আবেগের ঘন ধোঁয়ায়। উপমা দীর্ঘ, ক্লান্ত নিঃশ্বাস ফেলল। তার চোখের গভীরে বহু বছরের চাপা রাখা ভালোবাসা অবশেষে আজ বাঁধভাঙা বন্যার মতো উঠে এলো—

-"আমি তোমায় স্কুলজীবন থেকেই ভালোবাসি রুহান।

কিন্তু বাবা–মা আমেরিকায় শিফট করায় তোমার সাথে যোগাযোগ পুরোপুরি ছিন্ন হয়ে যায়। ওখানে পড়াশোনা শেষ করে বাবার সাথে যুদ্ধ করে আমি বাংলাদেশে ফিরি... শুধু তোমার জন্য। এরপর তোমাকে খুঁজে বের করি। ঢাকা মেডিকেলে ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি হই। কিন্তু প্রতিবার তোমাকে ভিন্ন ভিন্ন মেয়ের সঙ্গে দেখতাম বলে আমি তোমার সামনে আসতে পারিনি। একদিন এক জুনিয়র তোমায় প্রোপোজ করল, তুমি তাকে রিজেক্ট করলে... তখন বুঝলাম তুমি শুধু ফ্লার্ট করো, করো সাথেই সম্পর্কে জোড়াও না! সেদিন আড়াল থেকে সবই দেখেছি। আর তারপর... আজ এখানে তোমার সামনে।"

রুহান থমকে দাঁড়িয়ে রইল, তার চোখে অস্ফুট বিস্ময়, বিভ্রান্তি, আঘাতের রেখা, আর কোথাও এক অদ্ভুত দহন। উপমা ধীরে, খুব ধীরে তার চোখের দিকে তাকায়, যেন কোনো অদৃশ্য বাঁধ ভেঙে সত্যি আজ প্রথমবার তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়েছে। উপমার কণ্ঠ আরও ভেঙে গেল—

-"হ্যাঁ, আমি তোমাকে স্টক করেছি। কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি। তার থেকেও বড় কথা, তুমি আমার অবসেশন। বিশ্বাস করো, আমেরিকায় থেকেও তোমাকে ভুলতে পারিনি.... কতবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সফল হইনি।"

এক মুহূর্ত থেমে তার চোখের ভেতর জমে থাকা সব ভাঙাচোরা আবেগ ছড়িয়ে দিয়ে বলে—

-"রুহান... তুমি কি আমায় গ্রহণ করবে? আমি আমার একতরফা ভালোবাসার পূর্ণতা চাই তোমার কাছে। হ্যাঁ, আমি ভুল করেছি, স্টক করে। কিন্তু তোমার প্রতি আমার অবসেশন প্রতিদিন আরও বাড়ছে, একফোটাও কমছে না!"

কথাগুলো বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে রুহান নীরবে পাশ কাটিয়ে হাঁটা শুরু করল। উপমার ভেতর থেকে অসহায়, ডুবে যাওয়া কণ্ঠে চিৎকার বেরিয়ে এলো—

-"ফিরিয়ে দিও না আমায়, রুহান! তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না!"

রুহান থামল না। প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে, পেছনে না তাকিয়েই সে শান্ত, অদ্ভুত এক সুরে বলল—

-"তোমাকে দেখে আমার হৃদয় থমকে গেছে... রুচি ঝাল চানাচুর।"

উপমা হতভম্ব—

-"মানে?"

রুহান হালকা, খুনসুটিমাখা হাসিতে বলে—

-"আড়াল থেকে তো সব কথাই শুনেছিলে, রুচি ঝাল চানাচুর।"

কথার গভীর মানে উপমার চোখে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক চুপচাপ, উজ্জ্বল হাসি, একটা স্বস্তির, একটা স্বীকৃতির, একটা জয়ের হাসি।

ঠিক পরের মুহূর্তেই, যেন বরফঢাকা শীতের দুপুরে হঠাৎ নরম রোদ নেমে আসে, উপমা এক নিশ্বাসে দৌড়ে আসে, বাতাসের বুকে ভর দিয়ে ছুটে আসে,

আর পিছন থেকে রুহানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পুরো শরীর দিয়ে জড়িয়ে ধরে—

-"ভালোবাসি!"

সেই শব্দটি শুধু উচ্চারিত হয় না, রুহানের পিঠ, কাঁধ, শিরায়-ধমনীতে ঝরে পড়ে। তার হৃদয়ে ধাক্কা মেরে ঢুকে যায়। শীতের হাওয়ায় দু’জনের নিশ্বাস এক হয়ে ওঠে।রুহানের চোখ ধীরে বন্ধ হয়ে আসে, মুখের কোণে নরম, স্বীকারোক্তিমাখা হাসি।

এইবার সে ঘুরে দাঁড়ায়, ধীরে, খুব ধীরে। আর তার দু’হাত উপমার কোমরে উঠে আসে, একটি নিঃশ্বাসের দূরত্বে, খুব কাছে, এই ভালোবাসাটাই যেন এতদিন তার অপেক্ষায় ছিল।

.

নূরাইসা মাঠের এক কোণে ঘাসের ওপর নিথর হয়ে বসে আছে। শীতল বাতাসে তার কাঁধ ঝিমঝিম করছে।ক্লান্তি যেন তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু চেপে ধরেছে।আজও কোনো টাস্কই ঠিকমতো করতে পারে নি।প্রতিবারই পড়ে যাচ্ছে। প্রতিবারই ভুল করছে। আর প্রতিবারই তার খাতায় নতুন করে পানিশমেন্ট যোগ হচ্ছে। মুখ নিচু করে নিঃশব্দে বসে ছিল সে, নিস্তব্ধ, ভাঙা, অসহায়। ঠিক তখনই পাশে কারও উপস্থিতি অনুভব করল। মাথা কাত করে তাকাতেই দেখল, তাদের প্রশিক্ষক দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে কঠোরতা, অথচ মুখে অদ্ভুত এক নরম, স্থির করা হাসি। প্রশিক্ষক নিচু স্বরে বললেন—

-"এখানে কেন এসেছ, ভুলে গেছো?"

নূরাইসার কণ্ঠ ভেঙে গেল—

-"না স্যার..."

প্রশিক্ষক এবার একটু ঝুঁকে তার চোখে সরাসরি তাকালেন। সেই দৃষ্টি, তীক্ষ্ণ, দৃঢ়, ভিতর ভেদ করা।

বিজ্ঞাপন

-"তুমি এখানে এসেছো তোমার স্বামীর জন্য। কিন্তু তুমি যদি এভাবে ট্রেনিং করো, তাহলে কখনো সফল হতে পারবে না। তোমার হাতে সময় নেই, ইসা। নিজের স্বামীকে হারাতে না চাইলে, এখনই উঠে দাঁড়াও।একবার ভাবো, তুমি তাকে কতটা ভালোবাসো। প্রমাণ করার এটাই তোমার শেষ সুযোগ!"

কথাগুলো ছিল বুকের গভীরে ঢুকে যাওয়া তীরের মতো। প্রশিক্ষকের পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে দূরের দিকে মিলিয়ে গেল... আর নূরাইসার ভেতরে কোথাও যেন কিছু ভেঙে আবার গড়ে উঠল। সে বুঝল, এভাবে আর চলবে না। ইলহানের জন্য, তাকে পারতেই হবে।যেভাবেই হোক, হার মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই। ধীরে ধীরে মাটিতে হাত রাখল নূরাইসা। কম্পমান শরীর সোজা করল। তার চোখে এখন নতুন এক আগুন, দৃঢ়তা, প্রতিজ্ঞা, এবং ভালোবাসার দহন।

সোজা দাঁড়িয়েই সে দৌড়াতে দৌড়াতে আবার মাঠের দিকে ছুটে গেল। সূর্য তখন ঢলে পড়ছে। সোনালি আলো মাঠজুড়ে লম্বা ছায়া ফেলে দিচ্ছে, যেন আকাশ নিজেই তাকে পথ দেখিয়ে দিচ্ছে। সবার পালা শেষ, এবার নূরাইসার পালা। মাঠের চারপাশ থেকে গর্জে উঠল চিৎকার—

"তুমি পারবে ইসা!"

"Go for it! Do it for your husband!"

"ইলহানের জন্য করে দেখাও!"

নূরাইসার চোখে ভয় নেই আর, শুধু আগুন, শুধু বিশ্বাস। সে গভীর নিঃশ্বাস নেয়। হৃদয়ের ভিতর থেকে সমস্ত ভাঙা আত্মবিশ্বাস জড়ো করে বলে—

-"আল্লাহ... তুমি আছো আমার সঙ্গে। সাহায্য করো আমায়!"

দড়ির নিচ দিয়ে দ্রুত ক্রল করতে হবে। আগে বারবার আটকে গিয়েছিল সে। কিন্তু এবার? হাত-পা ছুটে চলল যেন খাঁচা থেকে বের হওয়া বাঘিনী। মাটি ছিটকে উড়ে গেল। পাথর, ঘাস, ধুলো, নূরাইসাকে থামাতে পারল না। সে পার হয়ে গেল, একটুও থামল না। একটুও পেছনে তাকাল না। কারণ আজ, তার ভেতরের নূরাইসা আর ভীতু মেয়ে নয়, ইলহানের জন্য দৌড়ানো এক যোদ্ধা।

এরপর এলো উঁচু দেয়াল। যে দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে নূরাইসা আগে কতবার হার মেনেছিল, আজ তার সামনে দাঁড়ানো সেই মানুষটা যেন অন্য কেউ। সে দু’হাত শক্ত করে গাঁথল, পা ঠেলল... আর এক ঝটকায় দেয়ালের ওপরে উঠে গেল। দাঁড়িয়ে শ্বাস নেওয়ারও সময় নিল না, সোজা নিচে লাফ দিল। যেন ভয় নামের শব্দটা তার অভিধান থেকেই মুছে গেছে।ঝুলন্ত রশির সেতু হাওয়ায় দুলছে, মনে হচ্ছে অল্প বাতাসেই ভেঙে পড়বে। নূরাইসা এগিয়ে গেল। চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল—

-"মোলটেন হার্ট... আপনার জন্য।"

তারপর নিখুঁত ভারসাম্যে রশির ওপর পা রাখল।বাতাসের দোলায় মাঝপথে একবার টলে গেলেও অদ্ভুত এক দৃঢ়তায় নিজেকে সামলে নিল সে। যেন প্রতিটি দুলুনি তাকে আরও শক্ত করে তুলছে। রশির সেতু শেষে এলো সর্বশেষ পরীক্ষা, ভারী স্যাক। ওটা কাঁধে তুলতেই শরীর কেঁপে উঠল। শ্বাস দ্রুত, বুক ওঠানামা করছে, কিন্তু পায়ের গতি কমছে না। সে দৌড়াচ্ছে। দৌড়াচ্ছে। যেন প্রতিটি পদক্ষেপে শুধু একটাই নাম প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—

ইলহান... ইলহান... ইলহান...

শেষ লাইন পার করতেই সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। এক সেকেন্ড... দুই সেকেন্ড... তারপর, সফল। সে সব টাস্ক পেরিয়েছে। সবগুলো। মাঠজুড়ে হঠাৎ করেই বিস্ফোরণের মতো করতালির ঝড় উঠল। চিৎকারে আকাশ কেঁপে উঠছে—

-"নূরাইসা! নূরাইসা! নূরাইসা!”

কেউ দৌড়ে এসে তাকে তুলে ধরল। কেউ উল্লাসে চিৎকার করল—

-"তুমি সত্যিই পারেছো, ইসা!"

ঘাম, মাটি, অশ্রু, সব মিলিয়ে তার মুখে এমন দীপ্তি, যেন যুদ্ধ জিতে ফেরা কোন যোদ্ধা। ভালোবাসা, তাকে হারতে দেয়নি। ভালোবাসাই আজ তার সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস।

মাঠজুড়ে করতালির শব্দ এখনও থামেনি। নূরাইসা হাঁটু গেড়ে বসে আছে, তার নিঃশ্বাস দ্রুত, কিন্তু চোখে জ্বলছে দীপ্ত আগুন। তার চারপাশের মানুষজন তাকে ঘিরে ধরলেও, হঠাৎ ভিড়ের সমস্ত শব্দ, উত্তেজনা, উচ্ছ্বাসকে ছাপিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি ভেসে উঠল তার ভেতরে।

দৃষ্টি। কারও নয়, দু’জনের দৃষ্টি। সে ধীরে মাথা তুলল। চারিপাশে খুঁজলে কোথাও কাউকে পেলো না।

মাঠের দুই কোণে দাঁড়িয়ে আছে দুই ব্যক্তি, আর তাদের চোখ দুটি নূরাইসার ওপর স্থির। প্রথম জোড়া চোখ, উষ্ণ বাদামি। মাটির মতো কোমল, গভীর, স্থির।

সেখানে বিস্ময় আছে, অনুরাগ আছে, যেনো নূরাইসাকে নতুন চোখে দেখছে সে মানুষটি। তার প্রতিটি ব্যথা, প্রতিটি পতন আর আজকের এই বিজয়, সব যেন সেই চোখ দুটিকে নরম করে দিয়েছে। কিন্তু গভীরে কোথাও লুকানো আছে নীরব ভয়। এক নিঃশব্দ আতঙ্ক, যেনো সে বুঝতে পারছে, নূরাইসার এই জ্বলে ওঠা শক্তির পেছনে কতটা তীব্র যন্ত্রণা, কতটা অদম্য সংগ্রাম জমে আছে।

মাঠের অন্য পাশে আরও এক জোড়া চোখ, ঠিক বিপরীত। গা ছমছমে বাদামি, ক্ষীণ আলোতেও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছে। যে দৃষ্টি মানুষের বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দেয়। নূরাইসার সাফল্য যেন ওই চোখের মালিকের অহংকারে ছুরি মেরে দিয়েছে। হিংস্রতা সেখানে এতটাই ঘনীভূত, দূর থেকেও মনে হয় যেন বাতাসে ধারালো কণার মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

ভিড়, করতালি, চিৎকার, সব যেন মিইয়ে যায়। শুধু রয়ে যায় সেই দুই জোড়া চোখ, একটিতে ভালোবাসার মুগ্ধতা আর নীরব ভয়, অন্যটিতে অন্ধকার হিংস্রতা আর দহনকারী ক্রোধ।

.

আগুনের আলোয় চারপাশের মুখগুলো চকচক করছে। শীতের রাত, হিমেল হাওয়া দহন শিখাকে একেকবার দুলিয়ে দিচ্ছে, আর আলফা টিমের হাসির রোল পুরো মাঠজুড়ে গর্জে উঠছে। নূরাইসা আজ যেন অন্য মানুষ, প্রতিটা টাস্কে দারুণ করেছে, আর বহু দিনের পরাজয়ের পর আজ আলফা টিম প্রথম হয়েছে। সেই আনন্দে যেন হঠাৎই ওদের মধ্যে এক অদ্ভুত বুনো উচ্ছ্বাস জাগল। সবাই মিলে আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে আছে। ক্যান্টিন থেকে বিশেষ ভাবে অনুরোধ করে খাবার নিয়ে এসেছ। পার্টি করবে তারা আজ। বিজয়ের আনন্দ। খাওয়াদাওয়া শেষ হতেই সবাই ট্রুথ এন্ড ডেয়ার খেলতে বসলো। আজ ট্রুথ নেই, শুধু ডেয়ার। কারণ সবার মুখেই একই কথা—

-"সেনাবাহিনীতে এসে ডেয়ার নিতে ভয় পাইলে চলবে?"

তারপর শুরু হলো ইতিহাসের সবচেয়ে বিশ্রী, সবচেয়ে পাগলাটে, আর সবচেয়ে মজার ডেয়ার নাইট। ডেয়ার, এক এক করে টিমের সর্বনাশ। প্রথমেই সাদিক, তাকে এই শীতে ঠান্ডা পানিতে গোসল করতে হবে। সাদিক এই শীতের রাতে, ঠান্ডা পানি, ৩০ মিনিট গোসল করেছে। দাঁত কাঁপছে, কিন্তু মুখে দম্ভের হাসি... আর আড়াল থেকে বাকি সবাই ভিডিও করছে।

এরপর আয়ান, তাকে দেওয়া হয়েছে প্রপোজাল করার ডেয়ার, তাও ফিমেল মেজরকে। ফিমেল মেজরদের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আয়ান, হাত বুকে রেখে ঘোষণা দিচ্ছে—

-"ম্যাম, আমি আপনাকে... লাইক করি!"

পরের সেকেন্ডেই বন্দুকের বাট তার পিঠে এসে পড়েছে। সবাই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

এরপর লুবনা, তাকে গান গাওয়ার ডেয়ার দেওয়া হয়েছে। কারণ যার গানের গোলা সব চেয়ে বাজে। যে ডেয়ার দেয়, তার ভাগ্যও সেধে আসে, প্রশিক্ষকের রুমে গিয়ে গান শুনিয়েছে আর জুতার ঝাঁপটা খেয়েছে। চোখে পানি, তবে হাসির না শ্রবণের, কেউ বুঝতে পারছে না।

মাহিরাকে পাঠিয়েছে আর্সলান দেহরানের রুমে।আড়াল থেকে পাঁচজন, নূরাইসা, আয়ান, কায়ান, লুবনা, সাদিক, সবাই দেওয়ালের কোণা থেকে বিরাট ষড়যন্ত্রকারী দলের মতো উঁকি দিচ্ছে। মাহিরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। দম যাচ্ছে আর আসছে, হাত কাঁপছে। সাহস করে নক করে, টক টক টক। ভেতরে ভারী পায়ের শব্দ। দরজা খুলতেই, আর্সলান দেহরান। চোখে ঠাণ্ডা দৃষ্টি, মুখে এক ফোঁটা অভিব্যক্তি নেই। চুল ভেজা, দেখে মনে হয় সদ্য গোসল শেষ করেছে। বলিষ্ঠ শরীর, ধারালো দৃষ্টি, মাহিরার বুক ধক করে উঠল। মাহিরা বড় করে নিঃশ্বাস নিল, চোখ শক্ত করে বন্ধ করল, তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলে ফেলল—

-"ভালোবাসি আপনাকে, আর্সলান দেহরান!"

শব্দটা যেন রাতের নির্জনতাকে কাঁপিয়ে দিল।আর্সলান কপাল কুঁচকে তাকাল। চোখে বিরক্তির ক্ষীণ রেখা।

নির্লিপ্ত, ঠান্ডা কণ্ঠে বলল—

-"এই কথা বলার জন্য এত রাতে আমার রুমে আসতে হলো তোমায়?"

মাহিরা কচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইল, মুখ নিচু, শ্বাস আটকানো। আর্সলান দু’কদম এগিয়ে এল। দীর্ঘ ছায়াটা মাহিরার ওপর ঢেকে গেল। হাত বাড়াল, মাহিরার কাঁধ স্পর্শ করবে এমন মুহূর্তে, হঠাৎ পেছনে টুপটাপ শব্দ। আর্সলান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, চারদিকে অন্ধকার, বাতাস, নিস্তব্ধতা। কেউ নেই। যেন কেউ লুকিয়ে শ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। সে চোখ সরালো। মাহিরা তখনো চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে, মনে হয় মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায়। আর্সলান মুহূর্তখানিক তাকিয়ে রইল। মেয়েটি সুন্দর। আর এই রাত, নিঃসঙ্গ, নির্মম, ঠান্ডা।

এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, আজ অন্তত একজন সঙ্গী পেতে পারে সে। কিন্তু পরক্ষণেই নূরাইসার মুখ ভেসে উঠলো তার চোখে, তারপরই আর্সলান তৎক্ষণাৎ হাত গুটিয়ে নিয়ে বলে উঠল—

-"যাও। নিজের রুমে যাও। একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলের রুমে এভাবে আর আসবে না!"

কথার সাথে সাথে দরজা ধাম করে বন্ধ। ভেতর থেকে আর্সলানের বিরক্ত গর্জন—

-"এই বা লের আর্মিতে আসলেই প্রতিটা রাত একা থাকতে হয়। যাও, আগে সাথী মিলতো, এবার এই সেনোরিটার চক্করে তাও হলো না!"

মাহিরা ভয়ে ভিরমি খেয়ে দৌড়ে পালালো। আর আড়াল থেকে পাঁচজন, নূরাইসা, কায়ান, আয়ান, লুবনা, সাদিক, হাসি চেপে শ্বাস আটকে ফেলেছে।এরপর পালা কায়ানের তাকে দেয়া হলো তুলনামূলক সহজ ডেয়ার, জেনারেলের কক্ষে গিয়ে গালে একটা চুমু দিয়ে আসতে হবে। যেই বলা সেই কাজ। কায়ান বিড়ালের মতো নরম পায়ে গিয়ে টক করে চুমু দিয়ে চলে এলো। জেনারেল ঘুমজড়ানো চোখে দরজা খুলেছিল। কিছুই বুঝতে পারে নি। অস্পষ্ট শব্দ বেরোলো শুধু—

-"কে..?"

কায়ান তখন টর্নেডোর গতিতে পগারপার।

সবশেষে সবাই রাইসার দিকে সবার দৃষ্টি একসাথে উঠে গেল। রাতের শরীরে হঠাৎই অদ্ভুত চাপা উত্তেজনা। ডেয়ার ঘোষণা হলো—

-"তুমি ইলহান স্যারের রুমে যাবে... সিঁড়ি দিয়ে নয়, জানালা দিয়ে!"

নূরাইসার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সাথে সাথে বলে উঠলো—

-"না! আমি পারব না! অন্য কিছু দাও! পড়ে গেলে ব্যথা পেলে উনি আবার আমাকে মারবেন!"

তার কথা শেষ হতেই চারদিক থেকে শোরগোল—

-"আরে কিছুই হবে না! চলো! আমরা আছি, আমরাই তোমাকে তুলব!"

হাওয়া ঠান্ডা। রাত গভীর। দলের মুখে দুষ্টুমি ভরা হাসি, চোখে অদ্ভুত ঝিলিক। ইলহান থাকে দ্বিতীয় তলায়, জানালাটা বড়, আর নূরাইসার ভয় আরও বড়। তার বুক ধড়ফড় করছে যেন শরীরের ভেতর দৌড় শুরু হয়েছে। অন্যদিকে আলফা টিম প্রস্তুত, এ রাত তাদের কিংবদন্তিতে লেখা থাকবে, সবচেয়ে পাগলাটে ডেয়ারের সূচনা হতে যাচ্ছে।

সবাই মিলে এগিয়ে গেল ইলহানের রুমের নিচে।নূরাইসার গলা শুকিয়ে আসছে। লজ্জা, ভয়, অনিশ্চয়তা, সব মিলে বুকটা ভার হয়ে উঠেছে। তবু, পালানোর উপায় নেই। সবাই তাদের ডেয়ার পূরণ করেছে, সে একা না করলে তারা মানবে কেন?

অবশেষে, নূরাইসা ইলহানের জানালার নিচে দাঁড়ালো।

মাথা নিচু, চোখে আতঙ্কের ঘন ছায়া। প্রথমে কায়ান, তারপর সাদিক, তারপর আয়ান, একজনের পর একজন কাঁধে উঠে দাঁড়িয়ে মানুষের তৈরি সিঁড়ি বানালো তারা। দেখলে মনে হবে নাটকের মঞ্চে সাজানো কোনো উল্টো নকশা, কিন্তু বাস্তবে সেটাই ছিল আজকের সাহসের সোপান। ভীতু কণ্ঠে নূরাইসা ফিসফিস করে বলল—

-"যদি পড়ে যাই?"

মাহিরা কাছে এসে থামল, তার কণ্ঠ দৃঢ়—

-"পড়বে না। উঠ। আমরা আছি।"

তারপর মাহিরা আর লুবনা দু’জন মিলে নূরাইসাকে ধরে তুলল কায়ানের ঘাড়ে রাখা প্রথম পদক্ষেপের ওপর। একেকটা কাঁধ, একেকটা ধাপ, ধীরে ধীরে, কিন্তু শ্বাসরুদ্ধ করা দৃঢ়তায় নূরাইসা ওপরে উঠতে লাগলো।অবশেষে, সবচেয়ে উপরে, আয়ানের ঘাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে নূরাইসা জানালার ফ্রেমটা ধরে ঝুলে রইল।তার বুক এমনভাবে কাঁপছে যেন ভেতর থেকে ঢেউ ধাক্কা দিচ্ছে। সৌভাগ্য, জানালা আধখোলা। গ্রিল নেই। তাই ভেতরে ঢোকা অন্তত সহজ হবে, যদি ভয় তাকে থামিয়ে না দেয়। নিচে থাকা সাদিক ওরা আস্তে আস্তে নেমে দাঁড়ালো। চারদিকে নিস্তব্ধ দমবন্ধ ভাব।

নূরাইসা আতঙ্কে নিচে তাকিয়ে ফিসফিস করল—

-"আরে... আমি নামব কীভাবে?"

নিচ থেকে কায়ানের হুঙ্কার ভেসে এলো—

-"এতদিন ট্রেনিং করেছো। নামা কোনো বিষয় না। যা বলেছি, সেটা করো এখন!"

নূরাইসা শুষ্ক ঢোক গিলে নিল। তারপর ধীরে ঘরে উঁকি দিল। ঘর ফাঁকা। নিস্তব্ধতা এমন ঘন যে নিশ্বাসের শব্দও শোনা যায়। তার সাহস একটু বাড়ল। নিচে তাকিয়ে ফিসফিস করল—

-"ঘর ফাঁকা তো!"

নিচ থেকে সাদিকের উচ্ছ্বাসমিশ্রিত কণ্ঠ ভেসে উঠল—

-"অপেক্ষা করো, সে চলে আসবে!"

রাতের হিমেল বাতাসে নূরাইসার চুল উড়ে যাচ্ছে।জানালার ধারে দাঁড়িয়ে সে অনুভব করল, ভয়, উত্তেজনা, আর দমবন্ধ করা এক রোমাঞ্চ তার বুকের ভেতর কাঁপন তুলছে। চারপাশে অন্ধকার, তবে আড়াল থেকে হাসাহাসি, খোঁচা, আর দুষ্টু উচ্ছ্বাসের ঢেউ যেন বাতাসেই মিশে আছে। হঠাৎ বাথরুমের দরজায় খটকা শব্দ। নূরাইসার শরীর মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল। জানালা থেকে তাকাতেই দেখল, ইলহান শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসছে। এক হাতে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছছে, আর আরেক তোয়ালে কোমর থেকে হাঁটু অব্দি অবহেলায় ঝুলে আছে। ফোঁটা ফোঁটা পানি তার গায়ে ঝলমল করছে। নূরাইসার গলা শুকিয়ে গেল, এক ঢোক গিলতেই বুকের ভেতর চাপা ভূকম্পন। নিচ থেকে কেউ চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল—

-"কী হচ্ছে?"

উত্তর দেবার শব্দ যেন হারিয়ে গেল। লজ্জায় মাথা নামিয়ে নিলো সে, শুধু চোখ ও কপাল দৃশ্যমান। বাকি শরীর ঝুলে আছে বাতাসে। হাতদুটো ঠাণ্ডায় জমে গেছে। নিচ থেকে আবার ডাক—

-"নূরাইসা!"

হিমশীতল আতঙ্কে সে নিচে তাকিয়ে ফিসফিস করল—

-"এসেছে!"

কিন্তু ততক্ষণে নিচের সবার মুখের রং হাঁড়িভাঙা ভোরের মতো ফিকে। কেউ দাঁড়াল না, সবাই দমফাটা ভয়ে একসাথে ছুটে পালাল। নূরাইসা কিছু বুঝতে পারল না, কেন এমন আচমকা সবাই উধাও হয়ে গেল?সে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে সামনে তাকাল, ইলহান দাঁড়িয়ে আছে। কোমরে হাত। ভ্রু কুঁচকানো। দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক মিশ্রণ, রাগের ঝিলিক, বিস্ময়ের ছায়া, আর একেবারে চাপা হাস্যরসের ঝলক।

নূরাইসা ভয়ে বোকা বোকা হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু গলাটা শুকিয়ে আছে। মুখ লাল, হৃদয় ঢিপঢিপ করছে, হাত বরফের মতো ঠাণ্ডা, লজ্জা আর আতঙ্কে শরীরের সব অনুভূতি গুলিয়ে গেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে, ইলহান হঠাৎ খপ করে তার হাত ধরে ফেলল। এক ঝটকায় জানালা থেকে টেনে ঘরের ভেতর নিয়ে এল।

নূরাইসার হৃদস্পন্দন যেন যুদ্ধের ময়দানে ড্রামের মতো বাজতে লাগল। হাত-পা জমে আছে, কথা আটকে গেছে। ঘরে ঢুকতেই বাইরের সব শব্দ নিভে গেল, বাতাস থমকে রইল। ইলহানের দৃষ্টি ভারী। নূরাইসার লজ্জা আরও গভীর। রাতের নিস্তব্ধতা হঠাৎই যেন অন্যরকম হয়ে উঠল, ঘন, স্পর্শযোগ্য, প্রায় শ্বাসরুদ্ধকর। এই নীরবতার ভেতরেই দু'জনের মাঝের অদৃশ্য উত্তাপ নরম, নিবিড় আলো হয়ে জ্বলে উঠল।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প