সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ৩০

🟢

#সুর্যস্নাত_ভালোবাসা

নূরাইসার সেনাবাহিনীতে ট্রেনিয়ের ১৭ দিন পূর্ণ হলো।এই ১৭ দিনে সে একটি টাস্কও সম্পূর্ণ করতে পারেনি।ফলস্বরূপ, দিনের পর দিন তাকে পানিশমেন্ট নিতে হয়েছে। আজকের ট্রেনিং শেষ হলে পুরো একদিন ছুটি। ওপর মহলের সবাই নাকি এক জরুরি কাজে বাইরে যাবে, তাই আগামীকাল ট্রেনিং বন্ধ থাকবে।

এখন নূরাইসা মাঠে। দূর থেকে ইলহান তাকে দেখছে, মুখ গম্ভীর, চোখ দুইটা ধূসর মেঘের মতো স্থির। রাগে আর অস্থিরতায় তার বুক কেমন যেন চাপা পড়ে আছে। নূরাইসা বারবার হোঁচট খাচ্ছে, আর প্রতিবারই সেই হোঁচট যেন ইলহানের বুকে কাঁটার মতো বিঁধছে।তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে বিহান। আজই তাকে বান্দরবন পাঠানো হবে, সব ধরনের গোপন কার্যক্রমের ওপর নজরদারি রাখার জন্য পুরো এক মাস। শ্যাডো ইউনিটের বাকি সদস্যদেরও ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে প্রমাণ সংগ্রহের মিশনে।

বিস্তীর্ণ প্রশিক্ষণমাঠ। শীতের দুপুর হলেও রোদটা অস্বাভাবিক তীব্র। বিস্তীর্ণ প্রশিক্ষণমাঠ যেন শুকনো ধুলোয় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দমবন্ধ উষ্ণতার মধ্যে দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ নূরাইসা পড়ে যায়। ধুলো হুহু করে উড়ে উঠে তার চারপাশে এক মুহূর্তে স্থির নিস্তব্ধতা তৈরি করে। ইলহান আর বিহান দৌড়ে যাওয়ার আগে, ঝট করে কেউ একজন ছুটে এসে নূরাইসাকে ধরে দাঁড় করিয়ে দেয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে বিহান ও ইলহানের মুখের রঙ বদলে যায়। দু’জনের দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ, দাঁতে দাঁত চাপা। দূর থেকেও বোঝা যায়, রাগ, অস্বস্তি আর দমিয়ে রাখা হিংস্রতা তাদের শিরায় শিরায় টগবগ করছে।

নূরাইসা চোখ মেলে তাকাতেই দেখতে পায়, আর্সলান দেহরান। সূর্যের আলোয় তার বাদামি চোখ দুটো ঝলমল করছে, মুখে হালকা মিষ্টি হাসি। মুহূর্তে নূরাইসার ভেতর দিয়ে বিস্ময়ের শীতল স্রোত বয়ে যায়। সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। আর্সলান আপাদমস্তক তাকে লক্ষ্য করে নরম, সুরেলা কণ্ঠে বলে—

-"ঠিক আছো? কোথাও লাগে নি তো?"

নূরাইসা একটু লজ্জা, একটু বিষণ্নতা গিলে উত্তর দেয়—

-"আমি ঠিক আছি... কিন্তু আপনি এখানে?"

আর্সলান সোজা হয়ে দাঁড়ায়। বুক টানটান। কণ্ঠে এক ধরনের বিশুদ্ধ গর্ব—

-"আর্সলান দেহরান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নাম্বার ওয়ান স্নাইপার।"

নূরাইসা নিজের চোখ–কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারে না। আপাদমস্তক তাকিয়ে দেখে, সেনাবাহিনীর ইউনিফর্মে তাকে অসম্ভব তীক্ষ্ণ আর শক্তিশালী লাগছে। বুকের বাম পাশে ঝকঝক করছে তার নাম, কাঁধের ব্যাজগুলো সূর্যের আলোয় রূপালি রেখার মতো চিকচিক করছে। তারপর, হঠাৎই আর্সলানের পেছন দিক থেকে ভেসে আসে এক রাগে থরথর কণ্ঠস্বর, যেন আগুনের শিখা গর্জে উঠলো—

-"ওর গায়ে থেকে হাত সরা, দেহরান!"

এক মুহূর্তে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। পুরো মাঠ যেন নিঃশব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখে, এক আসন্ন ঝড়ের প্রথম দমকা হাওয়া।এক বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠস্বর প্রশিক্ষণমাঠের নীরবতাকে ছিন্ন করে দিল। নূরাইসা ও আর্সলান দু’জনেই একই সাথে তাকালো সেই দিকটায়। ইলহান চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে দাউ দাউ আগুন। তার পাশে বিহান, জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর্সলানের হাতের দিকে। নূরাইসা তৎক্ষণাৎ খেয়াল করলো, আর্সলানের হাত এখনও তার কাঁধে।

সে এক ঝটকায় সরে গিয়ে দূরে দাঁড়াল। তার এই আকস্মিক আচরণে আর্সলান ভ্রু কুঁচকে তাকাল, একটু অবাক, একটু প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে। নূরাইসা মাথা নিচু করে থাকে, অস্বস্তিতে, লজ্জায়, আর অদ্ভুত এক বিভ্রান্তিতে কাঁপতে থাকে তার নিশ্বাস।

ইলহান ও বিহান দুজনই এগিয়ে এলো। আর্সলান তাদের দেখে হালকা হাসল, সেই চেনা, আত্মবিশ্বাসী অভ্যাসগত হাসি।

-"এত দিন পর দেখা... কুশলবিনিময় করবি না?"

বলেই আর্সলান ইলহানের দিকে এগোতেই, ইলহান হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। ঠাণ্ডা, ধারালো কণ্ঠে বলে—

-"বন্ধু ছাড়া আমি কাউকে জড়িয়ে ধরি না।"

আর্সলান হেসে মাথা নাড়ল।

-"কি বলছিস তুই? সেই কলেজ জীবন থেকে আমরা বন্ধু। আর তুই আমাকে আজ অস্বীকার করছিস?"

ইলহানের কণ্ঠ আরও গভীর হলো, ভারী হলো—

-'তোর সাথে বন্ধুত্ব চার বছর আগে শেষ হয়েছে। আর সেটা তুই নিজেই শেষ করেছিস। কি করেছিস তুই, ভুলে গেলি এত সহজে?"

আর্সলান থমকে দাঁড়াল। চোখে এক মুহূর্তের সংকোচ নেমে এলো, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সে নিজেকে সামলে নিল। আবার হাসল, সেই পুরনো, আত্মতুষ্ট ভঙ্গিতে।

-"এই কি তোর সেই বউ? জন্মের পর যার সাথে তোর বিয়ে ঠিক হয়েছিল?"

ইলহানের কন্ঠস্বর আরও কঠিন হলো—

-"সেটা জেনে তুই কি করবি?"

আর্সলান নূরাইসার দিকে এগোতেই, ইলহান দেয়ালের মতো তার সামনে দাঁড়িয়ে গেল। রাশভারী, শীতল কণ্ঠে বলল—

-"ট্রেনিংয়ে ফেরত যা।"

নূরাইসা যেন এই অনুমতির অপেক্ষাতেই ছিল।হৃদস্পন্দন দ্রুত ছুটছে, সে দ্রুত মাঠের অন্য পাশে চলে গেল। তার চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আর্সলান উচ্চস্বরে হেসে উঠল—

-"শুনেছি তুই বিয়ে করেছিস। তোর বউ ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের দিকে তুই তাকাস না! আর আমি অন্য মেয়ের সাথে কি করি না করি, এতে তোর কিছু আসে যায় না। এখন যেহেতু যায়-আসে... তার মানে এই মেয়েটাই তোর বউ!"

এই সময় বিহান এগিয়ে এসে দাঁড়াল। চোখে কঠিন, তীক্ষ্ণ সতর্কবার্তা।

-"বুঝে যখন গেছিস... তাহলে ওর থেকে দূরে থাকবি।ওর আশেপাশেও তোকে দেখলে... জীবন নিয়ে ফিরতে পারবি না।"

আর্সলান তার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত নরম হাসি হেসে বলল—

-"তোদের এই বন্ধুত্বটা... আমি বড্ড হিংসে করি রে।একজনের জন্য অন্যজন জীবন দিতে ব ন্দু কের সামনে দাঁড়াতেও তোরা দু’বার ভাবিস না!"

ইলহান বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বরফের মতো ঠাণ্ডা গলায় বলল—

-"তুই এখানে কি করছিস? তোকে তো মেডিক্যাল গ্রাউন্ডে দেড় বছরের ছুটি দেওয়া হয়েছে।"

আর্সলান কাঁধ ঝাঁকাল।

-"এখন পুরো ফিটফাট। তাই জয়েন করেছি। এইসব বাদ দে, এত সুন্দরী বউ পেলে বড় করেছিস... সেই জন্যই বোধয় কোনো মেয়ের দিকে তোর নজর যায়নি কখনো। যাবে কীভাবে? ঘরেই যদি অপ্সরার মতো সুন্দরী মেয়ে ঘুরঘুর করে, বাইরে কার নজর যাবে বল!"

আর্সলানের ঠোঁটে ব্যঙ্গমিশ্রিত হাসি। চোখে তীক্ষ্ণ কটূক্তির ঝিলিক। এক মুহূর্ত। তারপরেই, ইলহান তেড়ে এসে আর্সলানের কলার মুঠো করে টেনে ধরল। রাগে তার চোখ লাল, নিঃশ্বাস ভারী, দাউ দাউ করে জ্বলছে যেন ভিতরের আগুন।

-"একদম চোখ তুলে তাকাবি না ওর দিকে... একদম জানে মে রে ফেলব।"

কলার টানাটানিতে আর্সলানের গলায় শার্টের কাপড় কুঁচকে গেল। বাতাসে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ল, মাঠের নীরবতা হঠাৎ ছুরির ধার মতন টানটান। পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ দিকে যাচ্ছে দেখে বিহান ঝট করে এগিয়ে এলো। সে ইলহানের কব্জি ধরে শক্ত টানে আর্সলান থেকে দূরে সরিয়ে নিল। কণ্ঠে অভিজ্ঞ সৈনিকের কঠোর সতর্কতা—

-"বাদ দে। ওর সাথে কথা বলে সময় নষ্ট করার মানে নেই। ভুলে যাস না, আমরা ক্যান্টনমেন্টে।"

ইলহান এখনও রাগে কাঁপছে। তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে, মনে হচ্ছে যেন একটু আগেই থামিয়ে দেওয়া হয়েছে আসন্ন বিস্ফোরণ। বিহানের শক্ত দমনেই সে একটু পিছু হটে। দু’জন ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল, হাওয়ার মধ্যে চাপা উত্তেজনা রেখে।

দূরত্ব যত বাড়ে, আর্সলানের চোখ তত সরু হয়ে আসে। তাদের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে এক বাকা, বি ষ ম য় হাসি, যেন অন্ধকারের মধ্যে জন্ম নিল নতুন কোনো পরিকল্পনার বীজ। এর পরই তার দৃষ্টি সরে যায় দূরে ট্রেনিং করতে থাকা নূরাইসার দিকে। মাত্র এক মুহূর্তে সেই চতুরতা মিলিয়ে যায়, তার চোখে ভাসে ভোরের শিশিরের মতো কোমল মুগ্ধতা। সূর্যের আলোয় ঘামে ভেজা নূরাইসা, দৌড়াচ্ছে, হাঁপাচ্ছে, আবারও উঠছে। পরিশ্রমে ক্লান্ত শরীর, তবু হাল ছাড়া নয়, তার প্রতিটি পদক্ষেপে জেদ, সাহস আর অদম্য আগুন। আর্সলান স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে। মনে হয় যেন চারপাশের শব্দ, আলো, বাতাস, সবকিছু থেমে গেছে। শুধু নূরাইসা। শুধু তার গতি।শুধু তার শ্বাস। এবং নিজের ভিতরের অনুচ্চারিত ভাঙন।তার ঠোঁটে ভেসে আসে নরম, কিন্তু গভীর গলায় উচ্চারিত এক অস্ফুট স্বীকারোক্তি, যেন নিজের কাছেই ধরা পড়ে গেল—

-"তোমাকে খু ন করতে এসে নিজেকেই হারিয়ে ফেললাম... নিজ অস্তিত্বসহ। সূর্যস্নাত এক সন্ধ্যার আলোয়, তোমার ভালোবাসার নিঃশব্দ স্পর্শে

আমি নিজেই খু ন হয়ে গেলাম, নীরবে... অনিঃশেষে।"

.

রাতের খাবারের পর দেওয়ান বাড়ির ড্রয়িংরুমে নেমে এসেছে এক ধরনের মোলায়েম শান্তি। প্রশস্ত রুমে ঝুলে থাকা হলুদ আলো দুলছে হাওয়ার মৃদু ছোঁয়ায়, আলো-ছায়ার সেই নরম খেলায় যেন পুরোনো দিনের গল্পগুলো আরও আপন হয়ে উঠছে। দাদা-দাদী আজ যেন স্মৃতির পুরোনো দরজা ভেঙে ঢুকে পড়েছেন অতীতের উঠোনে, নদীর ধারে হারিয়ে যাওয়া দিন, যুদ্ধের সময়কার পালিয়ে বাঁচার গল্প, বৃষ্টিভেজা ছেলেবেলার দুঃসাহসিকতা... সব মিলিয়ে পরিবেশটা উষ্ণ, আরামদায়ক, গল্পে ভরা এক টাইম-ট্রাভেলের মতো।

এক কোণে নুহা আর আফরিন নিজেদের ছোট্ট দুনিয়ায় মশগুল। হালকা হাসাহাসি, চাপা গল্প, মাঝে মাঝে রায়হানের নাম আসছে আর দু’জনের মুখে অর্থহীন হাসি ফুটে উঠছে। ঠিক তখনই নুহার মুখ থমকে গেল, কলেজের সেই নোটিশ হঠাৎ মাথার ভেতর বজ্রপাতের মতো নেমে এলো। সে আফরিনের কাঁধে ঠেলে তাড়াতাড়ি বলল—

-"কলেজ থেকে বান্দরবন পিকনিকে নিয়ে যাবে।আমাদের সবাইকে যেতেই হবে, বাধ্যতামূলক!"

আফরিন ভ্রু কুঁচকে তাকাল—

-"তোদের না সামনে পরীক্ষা? তাহলে এই সময়ে পিকনিক কিসের? এই বছর তোদের তো কোনো পিকনিক হওয়ার কথা না!"

নুহা মুখটা বিষণ্ণ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল—

-"হ্যাঁ, আমিও তো সেটাই বলছি। পুরো কলেজ যাবে ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের যাওয়ার তো কথা না। কোন গাঁ জা খেয়ে প্রিন্সিপাল এই নোটিশ দিলো বুঝলাম না!"

আফরিন ঠোঁট বাঁকা করে, হেসে-রাগে বলল—

-"দেখ বউ মনে হয় রাতে বাহিরে ঘুমোতে বলেছিল, তাই তোদের ওপর রাগ ঝারছে!"

নুহা মুহূর্তেই সায় দিয়ে মুখ বিকৃত করল—

-"একদম ঠিক বলেছিস! আর তাছাড়া, ওই পেট মোটা টাকলা পারে কি!"

আফরিন হেসে হাত নাড়ল—

-"আচ্ছা বাদ দে এসব। মামুকে বল গিয়ে, কবে যেতে হবে?"

-"তিন দিন পর!"

এই বলে দু’জন একসাথে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল।নিচতলায় বড়দের হাসাহাসি আর গল্পগুজব আরও ঘন হয়ে উঠেছে, চা-বাসনা, পিঠার গন্ধ, আর হাসির ঝনঝনিতে পুরো রুমটা উষ্ণ, আপন। নুহা আর আফরিন এসে চুপচাপ বসতেই দাদা-দাদীরা কৌতূহল ভরা দৃষ্টিতে তাকালেন। কিছুক্ষণ নীরবতা ভেঙে নুহা ধীরে ধীরে, পুরো ঘটনাটাই খুলে বলল, এতক্ষণকার হালকা পরিবেশ হঠাৎ একটু টানটান হয়ে উঠল, যেন সবাই আগাম কোনো অদ্ভুত ইঙ্গিত অনুভব করলো।

এক মুহূর্তে ঘরে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা, ঠিক সেই নীরবতা, যখন হাসির ঝড় থেমে যায়, আর কথার ভিড়ের মাঝেও কিছু অদৃশ্য প্রশ্ন ভেসে বেড়াতে থাকে। ড্রয়িংরুমের হলুদ আলো যেন হঠাৎ একটু নিস্তেজ হয়ে উঠল। সবাই চোখাচোখি করল, যেন কেউই বিশ্বাস করতে পারছে না খবরটাকে, এই সময়ে পিকনিক?

বিজ্ঞাপন

কলেজের নিয়মে, এটা প্রায় অসম্ভব। তারপরও, বয়স্কদের অভিজ্ঞ চোখে এক মৃদু, অদৃশ্য ঝলক দেখা দিল। যেন তারা এমন কিছু বুঝল যা তরুণরা এখনো বোঝে না। হয়তো, শেষবারের মতো কলেজ তাদের হাতে স্মৃতির একটা থোকা তুলে দিতে চাইছে। হয়তো, অতীতের দিকে ফিরে যাওয়ার একটা দরজা খুলে দিতে চাইছে এই কঠিন সময়ে। হয়তো, জীবনের ব্যস্ততা শুরু হওয়ার আগেই, আনন্দের শেষ ফোঁটাটুকু তরুণদের মুঠোয় তুলে দিতে চাইছে কেউ। নীরবতার মেঘ ভেদ করে হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস এক দিক থেকে ভেসে এল। তারপর ধীরে ধীরে, একে একে সবাই মাথা নাড়ল। অতীতের দিকে ফিরে তাকানোর খিদেটা যেন সবাই মিলে অনুভব করল, শেষবারের মতো চলে যাওয়া দিনগুলোকে জড়িয়ে ধরার জন্য, সবাই রাজি হয়ে গেল।

.

উপমা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে রুহানের দিকে।তার ঘরের দেয়ালে ঝুলে থাকা রুহানের অসংখ্য ছবি, ঢাকার মেডিক্যাল কলেজের ধুলো ভেজা দিন থেকে সেনাবাহিনীর উজ্জ্বল পথচলা পর্যন্ত, সবই যেন নিঃশব্দে সাক্ষ্য দিচ্ছে কত বছরের মুগ্ধতার, কত বছরের চুপচাপ ভালোবাসার। রুহানের প্রতিটা সাফল্য, প্রতিটা ক্লান্ত মুখ, বিজয়ের দীপ্তি কিংবা পরাজয়ের ছায়া, কোথাও না কোথাও ক্যামেরার ফ্রেমে ধরে রেখেছে উপমা। তার বাড়িতেও আছে এমনই একটি দেয়াল, রুহানকে কেন্দ্র করে সাজানো এক ব্যক্তিগত জগৎ। শুধু একটাই তফাৎ, বাড়ির দেয়ালটি উন্মুক্ত, সকলের জন্য দৃশ্যমান, কিন্তু সেনাবাহিনীর এই রুমের দেয়ালটি থাকে পর্দার আড়ালে, গোপন সম্মোহনের মতো।

সারাদিন একসাথে কাজ করেও উপমার মন ভরে না।এ যেন কোনো অদৃশ্য তৃষ্ণা যা রুহানের এক ঝলক দেখলেই আরও বেড়ে ওঠে। এই চঞ্চল, বেপরোয়া যুবকটি নিঃশব্দেই তার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। রুহান এখনো তাকে চিনতে পারেনি। কারণ উপমা রুহানের সামনে সবসময় মাথা নিচু করে থাকে, নীরব, সংযত, যেন নিজের উপস্থিতিকে আড়াল করে রাখাই তার একমাত্র কাজ। সেই কারণে রুহান কখনোই তার চেহারা ঠিকমতো দেখার সুযোগই পায় না, উপমা যেন তার চোখের সামনেই অদৃশ্য হয়ে থাকে।

রুহান অবশ্য এখানেও থামে না। মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করা তার কাছে যেন তিন বেলার খাবারের মতোই স্বাভাবিক ব্যাপার। সেদিনই তো এক ট্রেইনি মেয়ে ট্রিটমেন্ট নিতে এলো, আর রুহান এক মুহূর্ত দেরি না করে তার পুরোনো অভ্যাসে ঢুকে পড়ল। দূর থেকে উপমা দেখেছে, চোখের কোণে দাহ জ্বলা ব্যথা নিয়ে, ঠোঁট কাঁপা কামড়ে, বুকের গভীরে কিছু একটা নীরবে ভেঙে পড়ার শব্দ শুনে। তবুও সে কিছুই বলেনি। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল সেইদিনের দৃশ্য—

রুহান হালকা হাসিতে মেয়েটিকে বলছে—

-"ব্যথার জন্য মুখ লাল হয়েছে, নাকি আমার দিকে তাকিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে গেছো?"

ট্রেইনি মেয়েটি বিরক্তি চেপে বলল—

-"স্যার! আমি লাল হইনি!"

রুহান হাসি টিপে উত্তরে বলল—

-"হুম, তাহলে এই গরমটা কোথা থেকে এল? ঘামছ কেনো? এখন তো শীত!"

মেয়েটি চুপ। রুহান ব্যান্ডেজ করে দিয়ে থেমে থাকা হাসিটা আবার ছাড়ল—

-"দেখো, ব্যথা লেগেছে ঠিক আছে... কিন্তু ব্যান্ডেজ করার সুযোগ আমাকেই দিলে, এটা একটু সন্দেহজনক না?"

-"স্যার, আপনি তো ডিউটিতে ছিলেন!"

রুহান ঠোঁটের কোণে সেই দুষ্টুমিভরা হাসি টেনে বলল—

-"ডিউটিতে ছিলাম... কিন্তু তোমার হাসি দেখে মনে হচ্ছে আমাকেই খুঁজছিলে!"

মেয়েটা একচুল হেসে ফেলতেই, রুহানের চোখে সেই বেপরোয়া, আত্মবিশ্বাসী ঝিলিক।

-"হাসলে ভালো লাগছে। আর্মিতে হাসি খুব কড়া জিনিস, কম দেখা যায়। সাবধানে ব্যবহার করো... নাহলে মানুষ প্রেমে পড়ে যেতে পারে।"

মেয়েটা লজ্জা আর বিরক্তির মাঝামাঝি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—

-"স্যার, আপনি সবসময় এমন কথা বলেন?"

রুহান আবার মাথা ঝাঁকিয়ে দুষ্টু ভঙ্গিতে—

-"না... সবার সাথে না। সুন্দরী, হেলমেট খুলতেই যার চুল উড়ে সিনেমার হিরোইনের মতো লাগে... শুধু ওদের সাথেই বলি।"

মেয়েটা হঠাৎ লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলল। হাওয়া যেন মুহূর্তে একটু উষ্ণ হয়ে উঠল। রুহান ব্যান্ডেজ শেষ করে নির্মম নাটকীয় সুরে বলল—

-"আচ্ছা, ব্যান্ডেজ শেষ। তবে সাবধান, খুলতে গেলে আমার নাম মনে পড়বে। এটা সাইড ইফেক্ট।"

মেয়েটা ক্ষীণ বিরক্তি নিয়ে তাকাল—

-"স্যার! আপনাকে কেউ পেটায় না?"

রুহান বুক ফুলিয়ে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সিক্রেট জানাচ্ছে—

-"অনেকে চায়।কিন্তু হাসি দেখালে তারা মুগ্ধ হয়ে যায়।

বাইচা গেছি!"

উপমা সব নিঃশব্দে দেখেছে। সে জানে রুহান শুধু ফ্লার্ট করবে এর বেশি কিছু না। রুহান ভালোবাসার নজরে আজ অব্দি কাউকে দেখে নি।

.

আজ সিনিয়র সব অফিসার ঢাকায় জরুরি মিটিংয়ের জন্য রওনা দেওয়ায় ক্যান্টনমেন্ট জুড়ে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা, শান্ত, গম্ভীর, আবার অদ্ভুতভাবে প্রশান্তিদায়কও। চট্টগ্রামের শীত এমনিতেই হাড় কাঁপানো, আর সন্ধ্যার পর নেমে আসা কুয়াশা পুরো ক্যান্টনমেন্টকে তুলোর মতো নরম ধোঁয়াশায় মুড়ে দিয়েছে। দূরে লাইটপোস্টগুলো নিভু নিভু আলোয় কাঁপছে, মনে হচ্ছে যেন রাত আর আলো পরস্পরকে ছুঁয়ে আবার সরে যাচ্ছে। আজ bonfire, অনেকদিন পর। তাই পুরো ক্যান্টনমেন্ট যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

কঠোর রুটিন, শাসন, শাস্তির বাঁধন ছিঁড়ে আজ সবাই একটু হেসে নিতে চাইছে... একটু নিঃশ্বাস ফেলতে চাইছে।

মাঠের এক পাশে ছেলেরা ফুটবল খেলছে। হুইসেলের চিকচিক শব্দে ঠাণ্ডা বাতাস কেঁপে উঠছে। অন্য পাশে ব্যাডমিন্টনের কোর্টে শাটলকক ওঠানামা করছে, টপ... টপ... টপ... শব্দগুলো কুয়াশার ভেতর রিনরিনে হয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। আজ সবার মুখে যেন আলোর রেখা। দীর্ঘ ট্রেনিংয়ের ক্লান্তি, শাস্তির ধকল, কঠোর মুখভঙ্গি, সব ছাপিয়ে উঠেছে প্রাণখোলা হাসি আর হালকা উচ্ছ্বাস।

আলফা টিম আজ নূরাইসাকে নিজেদের কাছে টেনে নিয়েছে, যত টাস্ক ফেল করুক, যত শাস্তি পাক, তাদের কাছে নূরাইসা আজ টিমেরই একজন। নূরাইসা প্রথমে অবাক হয়েছিল, কিন্তু তাদের টান আর আধখানা অভিমানের ভেতর থাকা স্নেহ, সেটা সে ফিরিয়ে দিতে পারেনি। ধীরে ধীরে সে তাদের সাথে এমনভাবে মিশে গেল যে, মনে হলো সে তো এখানেই ছিল সবসময়।

মাঠের ওপাশে বড় বড় কড়াই বসানো। আগুনের শিখা উঠছে টুকটুক করে, মশলার ঘ্রাণ বাতাসে ছড়িয়ে পড়তেই পুরো মাঠ উষ্ণ হয়ে উঠল, মনে হচ্ছিল শীতটা যেন আগুনের আঁচে গলে যাচ্ছে। খেলা শেষে bonfire হবে, সবাই গোল হয়ে বসবে, আগুনের আলোয় গল্প, স্বীকারোক্তি, হাসি আর খাবার ভাগাভাগি। একটা স্বাধীন, উষ্ণ, সফেদ রাত।

ব্যাডমিন্টনের কোর্টে হঠাৎ তোলপাড়। মেয়েরা একসাথে ছেলেদের খেলার মাঝখানে ঢুকে পড়েছে,

দুষ্টুমি, চিৎকার, হাসাহাসি, মাঠ যেন মুহূর্তে জীবন্ত হয়ে উঠল। শেষে সিদ্ধান্ত হলো, ছেলে বনাম মেয়ে ম্যাচ।খেলা শুরু হতেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।ছেলেরা পয়েন্টে এগিয়ে,।মেয়েদের মুখে হাসি আছে ঠিকই, কিন্তু চোখের কোণে লুকোনো দুশ্চিন্তা স্পষ্ট।

ফুটবল খেলা সেরে আসা ছেলেরা এখন গ্যালারি তৈরি করে বসে গেছে। চিৎকার, সরবতা, খোঁচা,।মনে হচ্ছিল পুরো ক্যান্টনমেন্টের ধুকপুকানি এই এক ম্যাচেই বন্দি।এর মধ্যেই কেউ বাজি ধরল— যে দল জিতবে, হেরে যাওয়া দলকে যা বলবে, তাই করতে হবে! মেয়েদের বুকের ভেতর ঠক করে একটা শব্দ পড়ল। কারণ তারা অনেকটাই পেছনে।

হাসি–ঠাট্টা, খেলা, উত্তেজনার ধাক্কায় ক্যান্টনমেন্টের শীতল রাত এক অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরে উঠেছিল ঠিক তখনই, দূর আকাশে এক নিমেষে ভেসে উঠল হেলিকপ্টারের গর্জন—

ফটা—ফটা—ফটা—ফটা—

শব্দটা যেন রাতের শান্তিকে ছুরি দিয়ে কেটে দু’ভাগ করে দিল। দরজা মুহূর্তেই খুলে গেল, কয়েক সেকেন্ড পুরো মাঠ নিঝুম। হাসি–ঠাট্টায় সরব পৃথিবীটা যেন মুহূর্তে শ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর, আকাশভরা সেই হেলিকপ্টারের গর্জনের ওপর দিয়ে ঝড়ের মতো ছড়িয়ে পড়ল খবর—

"সিনিয়ররা ফিরে এসেছে!"

ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার করে আসায় একদিনেই ফিরে এসেছে তারা। ক্লান্ত চোখ, ধুলো লাগা মুখ, শীতের ধাক্কা, সবকিছুই আছে, তবু কারও মুখে ক্লান্তির ছাপ নেই। কারণ আজ ক্যান্টনমেন্টে উৎসবের রাত। সীমান্ত পাহারা, সংঘর্ষ, টানা টাস্ক, তদন্ত, রাতে না ঘুমানো, দিনে বিশ্রাম না করা, যে জীবন তাদের, তার ভিড়ে এই একদিনের হাসি তাদের কাছে যেন সবচেয়ে দামী সম্পদ। এই এক সন্ধ্যাই তাদের জন্য, শ্বাস নেওয়ার অবসর, জমে থাকা কষ্ট ভুলে থাকার সুযোগ, জীবনকে কাছ থেকে স্পর্শ করার অনুমতি।

সিনিয়রদের বেশিরভাগই পরিবারের মুখ দেখতে পারে না বছরের পর বছর। ঈদে, উৎসবে, রোজায়, সব জায়গাতেই অনেকে ডিউটিতে থাকে। তাই আজকার রাতটা তাদের হৃদয়ে ছোট্ট আনন্দের আলো হয়ে জ্বলে উঠেছে। ট্রেইনিরা যখন জোরাজুরি করে তাদের মাঠে ডাকল, কেউ কাপড় পাল্টাতে গেল না, কেউ কম্বল গায়ে জড়াল না, কেউই বিশ্রাম নিল না। সবাই সরাসরি চলে এলো মাঠে, শীত, কুয়াশা, ক্লান্তি ভুলে, মনে যেন শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস। আজ ক্যান্টনমেন্টে শুধু একটাই নিয়ম, হাসা যাবে। উল্লাস করা যাবে। আর ভুলে যাওয়া যাবে সব দুঃখ, সব বোঝা।

এই হাড়কাঁপানো শীতেও ব্যাডমিন্টনের উত্তাপ চারদিকে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। শীতের কুয়াশা ভেদ করে শাটলককের ‘টপ-টপ’ শব্দ

মনে হচ্ছে রাতের বুকের ভেতর ছোট ছোট তারা ঝলসে উঠছে। সবাই হাসছে, চিৎকার করছে,

উল্লাস করছে, যেন বহুদিনের জমাট দুঃখ গলে গলে নিচে পড়ছে খেলাধুলোর মাটিতে। মাঠের একটু দূরে বসে আছে ইলহান।তার আশেপাশে কয়েকজন সৈনিক, কারণ তাদের পছন্দের লে. কর্নেল। তার কথা শোনা, তার কাছে বসা,।সৈনিকদের কাছে একপ্রকার সম্মান, নিরাপত্তা, গর্ব। তবুও, ইলহানের মন অন্য কোথাও। তার দৃষ্টি ছুটে যাচ্ছে মাঠের এক কোণে,

মেয়েদের দলে একটু আড়ালে, নিজেকে যতটা সম্ভব ছোট করে রাখা নূরাইসার দিকে।

নূরাইসা গুটিয়ে আছে, কথা বলছে না, হাসছে না,

চোখ তুলে তাকাচ্ছে না, তবু সে অনুভব করছে ইলহানের দৃষ্টি তার চামড়া ছুঁয়ে ভেতর পর্যন্ত নেমে যাচ্ছে। ইলহানও চায় না তাকাতে, কিন্তু তার দৃষ্টি ফিরছেই না। এক অদ্ভুত আকর্ষণ, অদম্য টান,

যা সে নিজেও ব্যাখ্যা করতে পারে না। সেইদিনের পর ইলহান কথা বলে না তার সাথে। কারণ, নূরাইসাই তাকে অনুরোধ করেছিল না বলতে। নির্মল ভয়, সরল আতঙ্ক, কেউ যেন কিছু বুঝে না ফেলে। ইলহান সেই কথা রেখেছে। দূরে থেকেছে। গোপনে আগলে রেখেছে। কাছাকাছি যায় না... তবু চোখ তাকে খুঁজে বেড়ায় অবিরত।

শীতের রাত যত গভীর হচ্ছে, তাদের নীরব দূরত্বও যেন ততটাই গভীর হয়ে উঠছে। এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা দুই মানুষ, যারা একে অপরকে ছুঁতে পারে না, তবু ছাড়তেও পারে না।

আকস্মিকভাবেই সবাই মিলে নূরাইসাকে কোর্টে পাঠিয়ে দিল। ভাইবোনদের সঙ্গে সে খেলেছে ঠিকই, কিন্তু এভাবে প্রোফেশনালদের মতো খেলায় নামা তার জীবনে এই প্রথম। নূরাইসা বারবার না বলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কেউই শোনেনি, তাকে জোর করেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। নেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে, কাঁপা হাতে র‍্যাকেট চেপে ধরে। মুখে চোখে স্পষ্ট অস্বস্তি, লজ্জা, নার্ভাসনেস আর খানিক অনিশ্চয়তার মেঘ। ছেলেদের পক্ষ থেকে যে প্লেয়ার এসেছে, সে এমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যেনো প্রথম বলেই নূরাইসাকে হারিয়ে দম নেবে। নূরাইসা শুকনো গলায় এক ঢোক গিলে নিল। ঠিক তখনই, তার ফেদার সার্ভ করার মুহূর্তে, ইলহান উঠে দাঁড়াল। এক ঝটকায় ছেলেটির হাত থেকে র‍্যাকেট কেড়ে নিল সে। চারপাশে হালকা শোরগোল উঠে গেল, অবাক বিস্ময়ের ঢেউ। কারণ এতক্ষণ জোরাজুরি সত্ত্বেও ইলহান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল যে সে খেলবে না।

নূরাইসার ভেতরটাই দপ করে উঠলো। তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল আলতো রোদের মতো। অন্তত এইটুকু নিশ্চিত,।তার আর হারতে হবে না। ইলহান তো নিজেই হেরে যাবে, শুধু তাকে জেতাতে।

ইলহান বউয়ের মতিগতি বুঝে গেলো এক ঝলকেই।

তার চোখে ভেসে উঠল বাকা, দুষ্টুমিভরা হাসি,।যে হাসি নূরাইসার বুকের ধুকপুকানি আরও বাড়িয়ে দিল।এরপর সে এক নিখুঁত ভঙ্গিতে ফেদার ছুঁড়ে দিল আকাশে, র‍্যাকেট উঁচিয়ে খেলায় নামল। প্রথম কয়েক মিনিট দুজনেই তাল মিলিয়ে খেলল,।মসৃণ, ছন্দময়, যেনো কোর্টের বাতাসও তাদের গতিতে রোমাঞ্চিত।চারদিকে থাকা সবাই নিঃশ্বাস আটকে দেখছিলো, দুজনের এই অদ্ভুত রসায়ন, ব্যাট-ফেদারের নিচে লুকিয়ে থাকা চেনা প্রেমের নীরব দোল। কিন্তু ছেলেরা পেছন থেকে ইলহানকে বারবার আওয়াজ দিচ্ছে—

-"ফাস্ট!"

-"পয়েন্ট নিতে হবে!"

তাদের গলা চওড়া হচ্ছিল, উত্তেজনা বাড়ছিল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে নূরাইসা অনুভব করছিল, যেনো পুরো কোর্টের আলো এক অদৃশ্য রেখায় এসে তাদের দুজনকে বেঁধে ফেলেছে, খেলায় নয়, দুটি হৃদয়ের ধ্বনিতে। ব্যাডমিন্টন কোর্টের শীতল বাতাসে মিশে গেল রোমাঞ্চের উষ্ণতা, আর নূরাইসা বুঝে গেল,।এই খেলায় জয়-পরাজয় কোনো ব্যাপারই নয়। কারণ তার ওপর দিকের মানুষটা, ইলহান,।ঠাণ্ডা সন্ধ্যাকে পর্যন্ত প্রেমে ভরিয়ে দিতে পারে।

হঠাৎই টক্ শব্দে নেটের মধ্যে ফেদার লেগে বেজে উঠল। সেই ধাক্কা সামলানোর আগেই ইলহান আবার সার্ভ করল,।এবার আর আগের মতো নরম নয়, পুরো গতিতে, ধারালো ছুটে আসা এক যুদ্ধের মতো। নূরাইসা চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। শটগুলো যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই তার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। কোর্টের বাতাসে ইলহানের ঠোঁটের বাকা হাসি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, একটা দুষ্টু, আত্মবিশ্বাসী খেলা, যেন সে লুকিয়ে লুকিয়ে নূরাইসার প্রতিক্রিয়া উপভোগ করছে।

পরপর বেশ কয়েকটা পয়েন্ট নিয়ে নিল সে। শেষ শটটা তো পুরো শক্তিতে,।ফেদার সোজা উড়ে নূরাইসার একদম মুখের ওপরে পড়ল। নূরাইসা স্থির দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার চোখ দুটো রাগে চকচক করছে, নিঃশ্বাস ভারী। সে তাকাল ইলহানের দিকে, তীক্ষ্ণ, ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে। আর বিপরীতে, ইলহানের ঠোঁটে সেই বাকা হাসিই খেলা করছে। যেটা দেখে নূরাইসার ভেতরের সব রাগ এক মুহূর্তে গর্জে উঠল।

সে হঠাৎ র‍্যাকেটটা সজোরে ছুঁড়ে মারল মাটিতে। চোখ টলমল করতে শুরু করেছে, রাগে, অভিমানে, আর খানিক অপমানবোধে। কোনো কিছু না ভেবেই দৌড়ে কোর্ট ছেড়ে বেরিয়ে গেল নূরাইসা। চারদিকে একঝাঁক নীরবতা। সবাই হতভম্ব, কি হলো এটা!

ইলহানের মুখ থেকে হাসি এক সেকেন্ডেই উধাও। তার চোখে আতঙ্ক, অপরাধবোধ, আর দুশ্চিন্তার ছায়া ভেসে উঠল। সে তৎক্ষণাত নিজের র‍্যাকেটটাও ফেলে দিল মাটিতে। নেটের নিচ দিয়ে বেরিয়ে দৌড় দিলো নূরাইসার পেছনে। দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করে উঠল—

-"নূরেজান! সরি! দ্বারা, ব্লাডমুন!"

তার কণ্ঠে তাড়াহুড়ো, ভয়, আর ভালোবাসার কাঁপা উত্তাপ।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প