সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ২৬

🟢

-"চলো, বিয়ে করে ফেলি!"

হঠাৎ করেই এমরিনের গম্ভীর অথচ স্থির কণ্ঠে উচ্চারিত বাক্যটি বাতাস চিরে ছুরি কেটে যাওয়ার মতো ঝনঝনিয়ে উঠল। অপ্রত্যাশিত এই প্রস্তাব শুনে আফরিনের চোখ বিস্ফোরিত হয়ে উঠল, মুহূর্তেই চারপাশের পৃথিবী থমকে দাঁড়াল। এমরিনের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো প্রতিক্রিয়া সে দিতে পারল না। বুকের ভেতর ধপধপ শব্দ, জিভ শুকিয়ে কাঠ, এই অবাস্তব পরিস্থিতিতে ঠিক কেমন আচরণ করা উচিত, তা বুঝতে পারছিল না সে। জীবনে প্রেমের প্রস্তাব পেয়েছে, কিন্তু বিয়ের প্রস্তাব আজই প্রথম।

ঠিক তখনই এমরিন হাত উঁচিয়ে আফরিনের সামনে তুরি বাজাল। তীক্ষ্ণ সেই সুরে আফরিনের বিষ্ময়ের বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেল। অপ্রস্তুতভাবে সে দৃষ্টি সরিয়ে নিল, আবার ধাতস্ত হয়ে তাকাল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির দিকে। তার পুরো অবয়বটাতে যেন অদ্ভুত এক ছায়ার আবরণ, কালো শার্ট, কালো প্যান্ট, কালো জুতো, কালো ঘড়ি, কালো চশমা। শীতল কাচের আড়ালে নীল চোখ দুটিতে কী রহস্যময় খেলা চলছে, কোনোভাবেই ধরতে পারল না আফরিন। অবশেষে সে কঠিন, কাঠখোট্টা গলায় বলে উঠল—

-"মাথা খারাপ হয়েছে আপনার? আপনাকে বিয়ে করতে যাবো কোন দুঃখে?"

এমরিনের ঠোঁটে ধীরে ধীরে এক অমায়িক, প্রায় শিশুসুলভ হাসি ফুটে উঠল। আত্মবিশ্বাসে মোড়া তার কণ্ঠে শব্দগুলো নরম অথচ দৃঢ়ভাবে ভেসে এল—

-"নারী-লোভ আমার নেই। তোমাকে ভালো লেগেছে বলেই বিয়ের কথা বলেছি। নইলে প্রেমের কথা বলতাম।"

আফরিন এবার বিরক্ত ভঙ্গিতে ভ্রু কুঁচকে বলল—

-"দেখুন, মিস্টার রাহাফ, আজকে নিয়ে আপনাকে মোটে তিনবার দেখেছি আমি। আপনার নাম ছাড়া আপনাকে নিয়ে আমি কিছুই জানি না। যেখানে আপনার সাথে বন্ধুত্বই করবো না, সেখানে বিয়ে তো অসম্ভব!"

এমরিন ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বুক টানটান, যেন নিজের সিদ্ধান্তের ওজনেই জমাট বাঁধা। দুই হাত স্বচ্ছন্দে পকেটে গুঁজে, সেই পরিচিত দৃঢ়স্বরে আবার উচ্চারণ করল—

-"তোমাকে আমাকেই বিয়ে করতে হবে। আর একে-অপরকে জানার কথা বললে, সময় নাও। আমি তোমাকে জানতে চাই, তুমিও আমাকে জানতে পারো। কিন্তু... বিয়ে তোমাকে আমাকেই করতে হবে।"

শেষ কথাটুকু তার গলায় এমন এক অটল দৃঢ়তায় ঝরে পড়ল, যেন সিদ্ধান্তটি বহু আগেই নেয়া হয়েছে, আজ কেবল তা ঘোষণার করা হলো।

মুহূর্তেই বাতাস ভারী হয়ে উঠল। অসম্ভবের সীমানায় দাঁড়িয়ে আফরিন অনুভব করল, এই কথাগুলো শুধু বলা নয়, দাবি নয়, বরং এক অদ্ভুত, অস্বস্তিকর ভবিষ্যদ্বাণীর মতো। এমরিনের নীল চোখের গভীরের কোন ঝড় ঘূর্ণায়মান, তা বুঝতে না পারলেও, তার দৃঢ়তার সামনে আফরিনের নিঃশ্বাস অজান্তেই কেঁপে উঠল। এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না সে। ভেতরে জমতে থাকা রাগটা আচমকাই বিস্ফোরিত হলো। এসব কী ধরনের কথা? এত আধিপত্য? এত দাবি? তাকেই বিয়ে করতে হবে, এটা কেমন যুক্তি? মনে হলো, এমরিন যেন কোনো মালিকানা ঘোষণা করছে!দৃষ্টি জ্বলে উঠল আগুনে, কণ্ঠে ছেয়ে গেল তীব্র ক্ষোভ—

-"মামা-বাড়ির আবদার পেয়েছেন? আপনার মতো ডমিনেটিং ছেলে আমার একদম পছন্দ না। নেক্সট টাইম আমার সামনে আসবেন না। এরপর সামনে পড়লে হাড়গোড় ভেঙে রেখে দেব! বোকা পেয়েছেন আমাকে? আমি বোকা নই!"

চোখের কোণে দাউ দাউ করে জ্বলা ক্রোধ নিয়ে সে আরও বলে উঠল—

-"আমার ভাইদের তো বলে দিয়েছেন, আপনি নাকি ডিটেক্টিভ! কিন্তু কোনো ডিটেক্টিভ এত বডিগার্ড নিয়ে ঘুরে বেড়ায় কি? আমার ভাইরা আপনাকে সেদিন দেখেনি বলে বিশ্বাস করেছে। আমি করিনি। মিথ্যেবাদী! উপকার করেছেন বলেই থাপ্পড় দিলাম না। কিন্তু পরের বার এটাও পেয়ে যাবেন!"

শেষ বাক্যটুকু ছুঁড়ে দিয়ে আফরিন ঝড়ের বেগে হাঁটা দিল। মাথার ভেতর গরম হাওয়ার মতো দপদপ করতে থাকা বিরক্তি আর ক্ষোভ নিয়ে। এতদিন পর ভার্সিটিতে এসেছে, সেই সামান্য আনন্দটুকুও নষ্ট করে দিল বজ্জাত লোকটা!

তার চলে যাওয়া পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল প্রস্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তৃত, নীরব বিকেলের বাতাসে।পেছনে এমরিন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কালো চশমার আড়ালেও বোঝা যাচ্ছিল, ঐ নীল চোখ দুটি এখনো নিবদ্ধ আফরিনের ওপর। ধীরে, প্রায় নিঃশ্বাসের সমান ক্ষীণ স্বরে সে বিড়বিড় করল—

-"এই জন্যই তো তোমায় আমার মনে ধরেছ, দুষ্টু রাণী। জীবনে প্রথম কোনো নারী আমাকে আকৃষ্ট করেছে, দুষ্টু রাণী। তোমাকে আমার চাই, যে কোনো মূল্যে।"

তার কণ্ঠের নিচু, গম্ভীর গর্জনে সেই অব্যক্ত দৃঢ়তা প্রতিধ্বনিত হলো, এক ভয়ংকর প্রতিজ্ঞা, যার লক্ষ্য একটাই—আফরিন।

.

বাড়িতে ফিরেই আফরিনের মুখভঙ্গি দেখে নুহা আর নূরাইসা একঝলকেই বুঝে গেল, কিছু একটা ঘটেছে, এবং সেটা মোটেও সাধারণ কিছু নয়। আফরিন সোফায় বসতেই দু’জন যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার দিকে এগিয়ে এলো। হালকা আলোয় ভরা বসার ঘরটায় এক অদ্ভুত উত্তেজনা জমে উঠল, যেন তিনজনের নিঃশ্বাসই ভারী হয়ে গেছে। নূরাইসা চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—

-"কি হয়েছে, আফরিন?"

আর ধরে রাখতে পারল না আফরিন। হৃদয়টা যেন এতক্ষণ ধরে আটকে থাকা ভার ছেড়ে এক নিঃশ্বাসে উগরে দিল সবকিছু, এমরিনের বিয়ের প্রস্তাব, তার অদম্য দাবি, তার আচরণ, আর রাগের মাথায় নিজের ঝড়ের মতো সেখান থেকে বেরিয়ে আসা, সব। কথা শেষ হতেই বসার ঘরটায় নীরবতা নেমে এলো। নূরাইসা ধীরে সোজা হয়ে বসল। মুখে গভীর চিন্তার ছায়া, কণ্ঠে স্পষ্ট মৃদু কঠোরতা—

-"লোকটা আমাদের সাহায্য করেছে ঠিক আছে, কিন্তু তাই বলে তার সব কথাই মেনে নিতে হবে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না। এর পর থেকে ওর সাথে দূরত্ব বজায় রাখবি, বুঝলি?"

ওর কথায় নুহা ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণভাবে বলল—

-"তোরা সবকিছুতেই বেশি বাড়াবাড়ি করিস। একজন মানুষের আরেকজনকে ভালো লাগা দোষের নয়।বিয়ের প্রস্তাব দেওয়াও ভুল নয়। উল্টো তুই লোকটাকে এমন অপমান করে এলি, অযথাই।"

আফরিন এতে আরও বিরক্ত হলো। চোখ জ্বলতে লাগল, অগ্নিশিখার মতো।

-"তুই ছোট, এইসব বুঝবি না। সেদিন হাসপাতালে যে অবস্থায় ছিলাম, ভাইয়াদের সামনে কিছুই বলার পরিস্থিতি ছিল না। ওই লোক মিথ্যে বলেছে! নিজেই চিন্তা কর, একজন ‘ডিটেক্টিভ’ এতো গাড়ি, এত বডিগার্ড নিয়ে ঘুরবে কেন?"

নুহা তখন থমকে গেল। চেহারায় ভাবনার ছায়া জমে উঠল। ঘরের হালকা আলোয় তার ভ্রু কুঁচকে ওঠা আরও গভীর মনে হলো।

-"হুম... এটা সত্যিই ভাবার বিষয়।" সে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল।

-"যা-ই হোক, বাদ দে। যে অপমান করেছিস, তোর সামনে আর আসবে বলে মনে হয় নাহ।"

আফরিন বিরক্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল—

-"না, এলেই ভালো!"

কথাটা শেষ হওয়া মাত্রই ঘরটা যেন আরও নীরব হয়ে গেল। বাতাসে কিছু একটা থমকে রইল। নুহা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল, আর নূরাইসা অস্থির হয়ে উঠল।আফরিনের ভেতর যেন চাপা ঝড় বয়ে যেতে লাগল, ধীরে ধীরে সব দিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

কিন্তু তিনজনই তখনও জানে না, যে মানুষটিকে আফরিন এড়াতে মরিয়া, সে ছায়ার মতোই তাদের পথের আশেপাশে ঘুরছে, চুপচাপ, অদৃশ্য, এবং অব্যক্ত পরিকল্পনায় বদ্ধপ্রায়।

.

ভোরের হালকা শীতল বাতাসে আজ বাড়িটা যেন অন্যরকম নীরব। জানালার কাচ বেয়ে গড়িয়ে পড়া শিশিরবিন্দুগুলো যেন এই সকালের অদ্ভুত স্থিরতা আরও গভীর করে তোলে। আঙিনার গাছগুলোয় অনায়াসে দুলছে বাতাস, অথচ ঘরের ভেতর প্রতিটি মানুষ যেন নিঃশব্দ অপেক্ষায় সময়কে স্থির করে রেখেছে। কারণ, আজ রুহান আর্মিতে যাবে। একজন ডাক্তার হিসাবে। প্রয়োজনীয় সব ফরম্যালিটিস পূরণ করেছে। অবশেষে আর্মিতে যাওয়ার তারিখ পড়েছে।

রুহান নিজের ব্যাগ গুছোচ্ছে, ব্যাগের চেইন খুলছে–বন্ধ করছে বারবার, যেন কোনো অদৃশ্য উত্তেজনা আর দায়িত্ববোধ তার আঙুলের ডগায় কাঁপন তুলছে। নুহা অবশেষে বিরক্তিতে বলে উঠল—

-"ভাই, পাঁচবার চেক করেছো! আর কত?"

রুহান পিছন ফিরে হাসল, নুহার মাথায় হালকা চাপড় দিয়ে বলল—

-"আরে যাত্রার আগে হাত-পা নাড়িয়ে নিচ্ছি আর কি। তোর ভাই তো সৈনিক হতে যাচ্ছে।"

তার চোখের কোণে খেলল দুষ্টু ঝিলিক। নুহা ভুরু কুঁচকে বলল—

-"তুমি না ডাক্তার, তাহলে সৈনিক কিভাবে হবে?"

-"আরে ডাক্তাররাও সৈনিক, জীবন বাঁচানো কম যুদ্ধের নাকি!"

ঠিক তখন নূরাইসা এগিয়ে এসে ব্যাগটা ঠিকমতো ধরিয়ে দিল। তার কণ্ঠ নরম, চোখে নিঃশব্দ মায়া—

-"হ্যাঁ, একদম ঠিক বলেছো।আচ্ছা সব ঠিকমতো নিয়েছো তো? মেডিকেল কাগজ, ফর্ম, আইডি, কিছু বাদ পড়েনি তো?"

রুহান এবার নাটুকে ভঙ্গিতে বুক টান টান করে দাঁড়াল। যেন সে সত্যিই কোনো প্যারেড গ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে আদেশ গ্রহণ করছে—

-"স্যালুট, ম্যাডাম! সব ঠিক আছে। আমি পুরো প্রস্তুত।"

তানভীর পাশে দাঁড়িয়ে হেসে বলল—

-"তোর চোখে তো এখনো ঘুম। এই ঘুম নিয়েই আর্মিতে যাবি?"

রুহান চোখ ছোট করে তানভীরকে তাকিয়ে বলল—

-"আর্মিতে গিয়ে প্রথম কাজ হবে ঘুম ভাঙানোর ট্রেনিং। তাই আগে ঘুম জমিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।"

নুহা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—

-"তাইলে এখনই শুয়ে পড়ো, আমি আলমারি খুলে তোমাকে ভরে রেখে দেব। আর্মি এসে নিয়ে যাবে!"

রুহান তিনজনের দিকে তাকিয়ে নাটকীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলল—

-"হায় আল্লাহ, এদের নিয়ে যুদ্ধ জিততে হবে!"

সবাই হেসে উঠল, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে চাপা একটা বিষণ্ণতা থেকে গেল, যেন প্রতিটি হাসির রেশের নিচে জমে থাকা উদ্বেগ কেউই স্বীকার করতে চাইছে না। তখনই নাজনীন বেগম ধীরে এগিয়ে এসে তার কলার ঠিক করে দিলেন। হাতে মায়ার কাঁপন, চোখে অদ্ভুত ঝিলমিল, স্নেহ, গর্ব আর লুকোনো ভয়ের মিশ্র আলো। চোখ টলমল করছে, তবু শক্ত হয়ে বললেন—

-"সব ঠিক আছে তো, বাবা?"

তার কণ্ঠে এমন নরম কম্পন, যেন তিনি কথার ভাঁজে ভাঁজে নিজের অশ্রুই লুকিয়ে রাখছেন। নাজনীন বেগমের কণ্ঠে শীতের সকালের মতোই কাঁপন, কিন্তু তার ভেতরে মায়ার উষ্ণতা ছড়িয়ে আছে পুরো ঘর জুড়ে।

-"ভালো করে চলবি। শরীর খারাপ করিস না। ফোন দিবি মাঝে মাঝে।"

রুহান মায়ের দু’টি হাত নিজের হাতে নিয়ে আলতো করে চেপে ধরল।

-"এতো কান্নাকাটি করো না মা, আমি কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছি না। আর গেলে তো আগে আমার তিন ডাইনি শাকচুন্নি বোনের নাম বলবো, যাতে শত্রুরা ভয় পেয়ে পালায়।"

এই কথা বলতেই হাসির ঢেউ বয়ে গেল। যথারীতি আবারো হাসাহাসি, আবারো সেই দুষ্টুমি। সবাই জানে, এই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে সত্যিকারের বিদায়ের ব্যথা, অস্থির এক ভবিষ্যতের অপেক্ষা। আফরিন সামনে এগিয়ে এসে বলল—

-"জানুয়ারিতে ইসাও চলে যাবে!"

রুহান চোখ টিপে বলল—

-"তাই তো আমি আগে যাচ্ছি পরিবেশ ঠিক করে রাখবো কেমন?"

সবাই হেসে উঠলো। হাসির ভেতরেও যেন চাপা উত্তেজনা, তবু পরিবেশটা খানিক হালকা হয়ে গেল। ঠিক তখন ইকবাল দেওয়ান সামনে এসে রুহানের কাঁধে দৃঢ় হাত রাখলেন—

বিজ্ঞাপন

-"সাহস নিয়ে চল, বাবা। মানুষ যে পথ ধরে চলে, সেই পথেই তার সম্মান। কাজটা বড়, দায়িত্বটা আরও বড়। আল্লাহ তোমার সহায় হোক।"

নাহিদ দেওয়ান রুহানের কাধে আলতো করে হাত রেখে বললেন—

-"এত ছোটবেলা থেকে দেখছি, ধমক দিলে হাসে, বকা দিলে গল্প বানায়। এখন সেই ছেলে আর্মিতে ডাক্তার! খোদা তোমার পথ খুলে রাখুক, বাবা।"

ইলিনা বেগম চোখ মুছতে মুছতে হাসলেন—

-"এত দুষ্টুমি করেও যে এতো বড় দায়িত্ব নিতে পারিস, তাই ভাবি তোকে নিয়ে। তুই চলে যাবি বাড়িটা শূন্য হয়ে যাবে। ইলহান ও নেই। আবার ইসাও যাবে।

তানিয়া বেগম হালকা ঠাট্টার সুরে বললেন—

-"এত চিন্তা করো না ছোট বউমনি, ওরা আবার ফিরে আসবে তো। আরও দেশের জন্য যাচ্ছে গর্ব করো।"

দাদা হেঁসে বললেন—

-"আমার নাতিরে চিনি, যেখানে যাবে, অগোছালো করে রাখবে, পরে নিজেই গুছাবে। কিন্তু মনটা পরিষ্কার থাকবে। যাও বাবা, গিয়ে সবার উপকার করো।"

দাদী দোয়া করতে করতে বললেন—

-"ফিরে আসবি আল্লাহর রহমতে। কপালে চুমু দিলি না..."

রুহান এগিয়ে গিয়ে দাদীর কপালে আলতো চুমু দিল।

-"এই নাও দাদী, দোয়া দিও আমার জন্যে।"

অবশেষে বিদায়ের মুহূর্ত এসে গেল। গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। ইঞ্জিনের আওয়াজ যেন সকালের শান্তিকে চিরে উঠে দাঁড়ালো। রুহান ধীরে ধীরে সবার দিকে তাকাল, মুখে আগের মতো চপল হাসি, কিন্তু চোখে সবার প্রতি গভীর টান, অদৃশ্য এক আকুলতা। সে বলল—

-"চললাম, সবাই দোয়া করো। আর প্লিজ, আমার রুমে ঢুকে কেউ কিছু ছুঁবে না। বিশেষ করে নুহা, সব আমার তদন্তে থাকবি যখন ফিরবো।"

নুহা তৎক্ষণাৎ চিৎকার করল—

-"এতোই যদি তদন্ত করার ইচ্ছা, তাহলে ডিটেক্টিভ হওয়া উচিত ছিল তোমার!"

রুহান হাসল, চোখে চিকচিক করা দুষ্টু উজ্জ্বলতা—

-"বাদরামির ডিপ্লোমা আছে আমার, সেটাই যথেষ্ট।"

শেষবারের মতো সবার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল সে।চোখে দৃঢ়তা, ঠোঁটে পরিচিত হাসি, আর বুকভরা অদৃশ্য সাহস নিয়ে রুহান গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যেতে লাগল। ইঞ্জিনের শব্দও ম্লান হয়ে এলে উঠোন জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল অদ্ভুত এক শূন্যতা, যেন সকালের আলোটা এক মুহূর্তে কিছুটা নিভে গেল। তবু সবার মনে একই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে, রুহান যেখানে থাকবে, তার দুষ্টুমি আর আলো, ওখানেও সবাইকে হাসিয়ে রাখবে তো?

.

জানুয়ারির কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। পাহাড়ঘেরা চট্টগ্রাম আর্মি ক্যাম্পের ওপর পড়েছে নরম সোনালি রোদ। বাতাসের গায়ে এখনো শীতের ছোঁয়া, আর দূরের পাইনগাছের ফাঁক গলে ভেসে আসছে সামান্য কুয়াশা, যা পুরো ক্যাম্পটিকে এক রহস্যময় ঘোমটার মতো ঢেকে রেখেছে। ট্রেনিং গ্রাউন্ডে ইতোমধ্যে লাইনবদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে রিক্রুটদের একটি দল, সবাই গম্ভীর মুখ, দৃঢ় কাঁধ, চোখে শৃঙ্খলার কঠোর ছাপ। বুটের নিচে থমথমে মাটির শব্দ যেন একসাথে প্রতিটি পদক্ষেপে কঠোরতার ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে।

গেস্ট ব্যারাকের সামনে নূরাইসা দাঁড়িয়ে। তার বুকের ভেতর উত্তেজনা আর ভয় মিলেমিশে ঢেউ তুলছে।ব্যাগের স্ট্র্যাপ শক্ত করে ধরেছে যেন এটাই তার সাহসের শেষ অবলম্বন। আজ তার নাম প্রথমবারের মতো যুক্ত হলো SCRC তালিকায়, এই বাস্তবতাই হঠাৎ করে চারপাশের নীরবতাকে আরও ভারী করে তুলেছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে দূর থেকে শব্দ করে থামল একটি কালো SUV। গাড়ির আগমনে ক্যাম্পের বাতাস এক মুহূর্তে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল, কারণ দরজা খুলে নেমে এলেন যিনি, তিনি শুধু উচ্চপদস্থ অফিসার নন, বরং ঢাকা সেনানিবাস থেকে বিশেষভাবে চট্টগ্রাম ক্যাম্পে আসা আর্মির জেনারেল আশরাফ কাজী।

তার উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে পুরো পরিবেশে নেমে এলো নিরব, সাংঘাতিক এক গাম্ভীর্য। সাদা দাড়ি, ইস্পাতের মতো ধারালো চোখ, তবুও গলায় অদ্ভুত শান্ততার টান।তার পদচারণার শব্দে মনে হলো পুরো মাঠ যেন শ্বাস ধরে আছে। তিনি সোজা নূরাইসার সামনে এসে থামলেন।

-"তুমি নূরাইসা?"

নূরাইসা পিঠ সোজা করে, বুক ভরে সাহস টেনে নিয়ে দাঁড়াল।

-"স্যার, জি, স্যার।"

আশরাফ মাথা নেড়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করলেন, দৃষ্টি যেন এক মুহূর্তে ভেদ করে গেল তার অস্থিরতা, তার লুকানো সাহস, তার অনিশ্চয়তা। তার দৃষ্টিতে এমন এক তীক্ষ্ণতা, যেন তিনি বিচার করছেন নূরাইসার মধ্যে আদৌ একজন সৈনিকের মানসিক শক্তি আছে কিনা।তারপর তিনি শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—

-"ভয় পেয়ো না। এখানে কেউ তোমাকে আলাদা চোখে দেখবে না। তুমি কেনো এসেছো সেটা তো জানোই।কিন্তু এখানে কেউ তোমার পরিচয় বা তোমার এই এক মাসের চুক্তি সম্পর্কে জানে না। তুমি কোনো অফিসিয়াল দায়িত্বে যাবে না। সবাই জানবে তুমি নতুন রিক্রুট, কিন্তু সত্যতা কেউ জানবে না। তাই সবাই যেভাবে ট্রেনিং হয়, তোমাকেও সেইভাবেই হতে হবে।"

তার গভীর, স্থির গলায় নূরাইসার বুকের অস্থিরতা একটু কমে গেল। এমন কণ্ঠে নির্দেশ পেলে নিজের ভরসাও কিছুটা শক্ত হয়ে ওঠে।

-"জি স্যার... বুঝেছি।"

আশরাফ মাথা নেড়ে সায় দিলেন। হালকা শীতল হাসি ফুটল তার ঠোঁটে, যে হাসি সাধারণ কেউ বুঝবে না, কিন্তু নূরাইসা বুঝল এটা আশ্বাসের ভাষা। এক মুহূর্তের জন্য যেন আশরাফের কঠোর মুখে অদৃশ্য কোমলতার ছায়া ফুটে উঠল, কারণ তিনি শুধু জেনারেল নন, তিনি ইকবাল দেওয়ানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আর এই মেয়েটাকে তিনি নিজের দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখেন।ইকবালের অনুরোধেই তিনি আজ এখানে, এই ক্যাম্পের মধ্যেই নূরাইসার সুরক্ষায় নিজের অদৃশ্য ছাতার মতো দাঁড়িয়ে আছেন।

দূরে ট্রেনিং গ্রাউন্ডের বাঁশি বেজে উঠল, নতুন দিনের, নতুন শৃঙ্খলার, নতুন সংগ্রামের সূচনা ঘোষণা করে।

আশরাফ হাঁটা শুরু করলেন। নূরাইসা নীরবে তার পাশে পা মিলিয়ে চলল। পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পে সকালের হালকা কুয়াশা ভেসে আছে এখনো, আর দূরে দেখা যাচ্ছে, কোথাও রিক্রুটদের দৌড়ানোর শব্দ, কোথাও অবস্ট্যাকল কোর্সে লাফঝাঁপ, আরেকদিকে কেউ স্ট্রেচিং করছে প্রশিক্ষকের নির্দেশে। প্রতিটি পদক্ষেপে শোনা যাচ্ছে শৃঙ্খলার প্রতিধ্বনি—

"Left! Right!", বুটের ঠকঠক শব্দ, আর ঠান্ডা বাতাসে ঘামে মেশা নতুন দিনের তীব্রতা।

আশরাফ সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই পুরো পরিবেশ হঠাৎ থমকে গেল। সৈনিকরা তার উপস্থিতি টের পেয়ে মুহূর্তে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল, কারণ তিনি কোনো সাধারণ অফিসার নন। তিনি সেনাবাহিনীর প্রধান আশরাফ কাজী, ঢাকা সেনানিবাস থেকে বিশেষভাবে আগত।তার গলা গভীর, প্রতিটি শব্দে কর্তৃত্ব—

-"রিক্রুটস! এ হলো নূরাইসা ইনায়া দেওয়ান। নতুন রিক্রুট। তাকে তোমাদের মতোই ডিসিপ্লিন শিখতে হবে।

কিন্তু মনে রাখবে, কেউ তাকে অপমান করবে না বা হেয় প্রতিপন্ন করবে না। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শক্তির জায়গা হলেও, এর প্রথম নিয়ম, সম্মান।"

তার কণ্ঠে যে দৃঢ়তা, তা মাঠের বাতাস কাঁপিয়ে দেয়ার মতো। রিক্রুটদের মুখে কোনো অবজ্ঞা নেই। এমন বক্তব্য শুধুই একজন জেনারেলের কণ্ঠে গ্রহণযোগ্য হয়, উপস্থিত সবার চোখে সম্মান, আনুগত্য, আর একরাশ কৌতূহল।

এরপর আশরাফ নূরাইসাকে নিয়ে ক্যাম্প বিল্ডিংয়ের ভেতরে গেলেন। দায়িত্বরত ইনস্ট্রাক্টর, অফিসার, ট্রেইনার, সবাই অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। কেউ ক্যাপ্টেন,

কেউ লেফটেন্যান্ট, বেশ কয়েকজন সার্জেন্ট, আর প্রশিক্ষণের মূল দায়িত্বে ওয়ারেন্ট অফিসার, এরা-ই নূরাইসার আগামী এক মাসের কঠোর বাস্তবতার শিক্ষক। আশরাফ বললেন—

-"মোসলেম সে এসেছে Special Civilian Resilience Course, এক মাসের প্রশিক্ষণ নিতে। তবে বয়স, যোগ্যতা, শিক্ষাগত মানদণ্ড। মেডিক্যাল পরীক্ষা। শারীরিক পরীক্ষা। ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন। সব নিয়ম কমপ্লিট করেছে এবং উত্তীর্ণ হয়েছে। তাই তাকে বাকি সৈনিকের মতন দেখবে।

তারপর তিনি নূরাইসার দিকে তাকালেন, চোখে স্নেহ, মুখে আগের মতো কঠোরতা—

-"আজ তোমার প্রথম দিন। আমি ঢাকার হেডকোয়ার্টার থেকে এসেছি, শুধু তোমার ওরিয়েন্টেশন personally দেখার জন্য। তারপর এখানকার ইনস্ট্রাক্টররা তোমাকে নিয়ে নেবে।"

নূরাইসা বিনয়ের সাথে মাথা নত করল। মিহি কণ্ঠে বলল—

-"ধন্যবাদ আংকেল।"

আশরাফ একটু থমকে তারপর মুচকি হেসে নূরাইসার মাথায় হাত রাখলেন। ইকবাল দেওয়ান তার বাল্যবন্ধু। তার বাবা ও ইকবাল দেওয়ানের বাবাও ঘনিষ্ঠ বন্ধু।সেই ছোটবেলা থেকে দেওয়ান বাড়ির সবার সাথেই তার এক অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতা, আপনজনের মতো মায়া।

এই স্পর্শে নূরাইসার বুকের ভয় আরও একটু কমে গেল। যেন বুঝল, এই অপরিচিত কঠোর পরিবেশেও, কোথাও না কোথাও তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কেউ, নীরবে, শক্তভাবে, পর্দার আড়ালে।

ভেতরের প্রশিক্ষণ এলাকায় পা রাখতেই আশরাফের পাশে পাশে নীরবে হাঁটতে লাগল নূরাইসা। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে, কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ অবস্ট্যাকল কোর্সের দেয়াল টপকাচ্ছে, কেউ স্ট্রেচিং করছে। প্রতিটি চলন, প্রতিটি টান, প্রতিটি শ্বাসে যেন শৃঙ্খলার গাম্ভীর্য আর দৃঢ়তার গর্জন। এক প্লাটুন ইনস্ট্রাক্টর তাদের দেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল ও দ্রুত সালাম ঠুকল।

-"স্যার! মেয়েটি কি আজ থেকেই নিয়মিত রুটিন শুরু করবে?"

আশরাফ দৃঢ় অথচ শান্ত কণ্ঠে বললেন—

-"আজ শুধুই ওরিয়েন্টেশন। আগামীকাল ভোর ০৫:০০-এ তার PT শুরু হবে।"

ইনস্ট্রাক্টর সঙ্গে সঙ্গে নোটপ্যাডে কিছু লিখে নিল, যেন প্রতিটি শব্দ নির্দেশ নয়, আদেশ। নূরাইসা চারদিকে তাকিয়ে সৈনিকদের কর্মকাণ্ড দেখছিল। কেউ পড়ে গিয়ে কনুই ছুঁইয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে, কেউ কাঠের বক্স টপকে সামনের দিকে দৌড়ছে, এই দৃশ্যগুলো তার ভেতরে কোনো ভয় তৈরি করল না। বরং এক অদ্ভুত শক্তি, এক নতুন দৃঢ়তা তার বুকে ধুকপুক করতে লাগল। ধীরে ধীরে সে বলল—

-"আংকেল... আমি পারব তো?"

আশরাফ থেমে তার দিকে তাকালেন। তার চোখে স্নেহ আছে, আশ্বাস আছে, আবার সামরিক কঠোরতাও আছে।

-"কেউই জন্মগতভাবে শক্তিশালী না, নূরাইসা। শক্তি শেখা যায়। যেভাবে আমরা সবাই শিখেছি।"

তিনি একটু থামলেন, কণ্ঠ আরও নরম হলো।

-"তুমিও পারবে। শুধু তোমাকে তোমার জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। মনে রেখো একজন সৈনিক যুদ্ধ করে দেশের মাটি আর দেশের মানুষ বাঁচাতে। আর তুমি নেমেছ নিজের স্বামী সংসার বাঁচাতে। তাই পিছুপা হওয়া যাবে না। তুমি একজন সৈনিকের স্ত্রী... সেই সৈনিকের, যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সবচেয়ে দক্ষ সৈনিক।"

নূরাইসা হালকা হাসল, চাপা ভয়ের দেয়ালটা যেন একটু ভেঙে আলো ঢুকল। হাতঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে আশরাফ বললেন—

-"আজ তোমার প্রথম দিন। রুমে গিয়ে বিশ্রাম নাও।আগামীকাল সকাল হবে তোমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সকাল। কঠিন জিনিসগুলোই মানুষকে বদলে দেয়, এটা মনে রাখবে।"

নূরাইসা সালাম দিল। ভঙ্গি এখনও কাঁচা। আশরাফ এগিয়ে এসে তার হাত ঠিক করে দিলেন।

-"ডান হাতটা সোজা, হ্যাঁ। এবার ঠিক আছে।"

এরপর তিনি গম্ভীর অথচ উষ্ণ কণ্ঠে বললেন—

-"ওয়েলকাম টু চট্টগ্রাম ক্যাম্প, নূরাইসা ইনায়া দেওয়ান।"

সেই মুহূর্তে নূরাইসার মনে হলো, জানুয়ারির এই ভোর, হালকা কুয়াশা আর শীতের নিশ্বাসে ভেজা বাতাস, তার জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের দরজা নিঃশব্দে খুলে দিল।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প