সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ২৫

🟢

বিকেলের নরম রোদ ড্রয়িংরুমের পর্দা ভেদ করে আলো-ছায়ার মৃদু খেলা ফেলে রেখেছে চারপাশে। নাজনীন বেগম, তানিয়া বেগম ও ইলিনা বেগম সোফার তিন কোণে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে গল্পে মশগুল। বাইরে আঙিনায় দাদু–দাদীর ধীর হাঁটার শব্দ, আর হালকা বাতাসে বাগানের ফুলের গন্ধ মিশে ঘরটাকে আরও স্নিগ্ধ, প্রশান্ত করে তুলছিল। ঠিক সেই শান্ত পরিবেশটাকেই আচমকা ঝড়ের মতো ভেঙে দিল তিন তরুণীর আগমন। নূরাইসা, আফরিন ও নুহা, তিনজনেই যেন তীব্র ঝোড়ো হাওয়ার মতো প্রবেশ করল ঘরে। নূরাইসার মুখ রাগে টকটকে লাল, তাকালেই বোঝা যায় ভিতরে ভিতরে আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। আফরিন ও নুহাও বিরক্ত মুখে এসে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। তাদের আচরণের এমন হঠাৎ পরিবর্তন দেখে নাজনীন বেগমের শান্ত দৃষ্টিতে দুশ্চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। তিনি কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—

-"কি হয়েছে তোমাদের? রাস্তায় কেউ কিছু বলেছে?"

এক মুহূর্তের নীরবতার পর তিনজনই ঘুরে তাকালো তার দিকে। তারপর নূরাইসা যেন আটকে থাকা ক্ষোভের ঢাকনা সরিয়ে এক ঝটকায় বলে উঠল—

-"কি হবে আর! তোমাকে আর বড় বাবাকে এত সুন্দর ছেলে জন্ম দিতে কে বলেছে, হ্যাঁ? তোমার সুদর্শন ছেলের জন্য আমার জীবন তো পুরো তেজপাতা হয়ে গেছে!"

নাজনীন বেগম স্তম্ভিত। বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বললেন—

-"কি হয়েছে? ইলহান কিছু করেছে?"

নূরাইসা নিঃশ্বাস না নিয়েই উগরে দিল তার জমে থাকা অভিযোগ—

-"কি করবে সে আর! করার মতো কিছু বাদ রেখেছে নাকি? এত সুদর্শন হতে কে বলেছে ওনাকে? তার পিছনে মেয়েদের লাইন লেগে থাকে সবসময়। আমি শান্তি পাই না! সব দোষ দাদুর, এত হ্যান্ডসাম ছেলের সাথে কেন বিয়ে দিলো আমাকে? একটা কালো-কালো ছেলেকে বিয়ে করলেই ভালো ছিল, অন্তত এসব জ্বালা সহ্য করতে হতো না! তুমি-ও কম নও বড় মা, এত সুদর্শন ছেলে কেন জন্ম দিলে? রুহান ভাই, তানভীর ভাই, এদের বিয়ে হলে এদের বউদেরও শান্তি থাকবে না। কোথা থেকে কোন মেয়ে এসে বউয়ের সাথে ঝামেলা বাধিয়ে দেবে, এই ভয়েই থাকতে হবে!"

নূরাইসার কথার রাগ, অভিমান আর দুঃখ, সব মিলিয়ে মুহূর্তেই এক অদ্ভুত তীব্রতা ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে।ড্রয়িংরুমের বাতাস যেন ভারী হয়ে এলো, আক্ষেপ, ভালোবাসা আর তির্যক ঈর্ষার মিশ্র গন্ধ ছড়িয়ে রয়ে পড়েছে প্রতিটি কোণে।

নাজনীন বেগম, তানিয়া বেগম এবং ইলিনা বেগম অবাক দৃষ্টিতে নূরাইসার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তাদের মুখে হতভম্ব নীরবতা। মুহূর্তটা যেন নিঃশব্দ ঢেউয়ের মতো ঘরটাকে আছড়ে গেল। অবশেষে নাজনীন বেগম ও তানিয়া বেগম অসহায় গলায় পরস্পরের দিকে তাকিয়ে বললেন—

-"আমরা কি করবো? আল্লাহ যদি এত সুদর্শন ছেলে আমাদের দেয়, এতে আমাদের কি করার আছে বল!"

কিন্তু নূরাইসার রাগ তখনও দপদপ করছে আগুনের মতো। তার কণ্ঠে অভিমান গাঢ় হয়ে উঠল—

-"কিছু করার নেই তোমাদের। রুহান ভাই আর তানভীর ভাইকে বিয়ে দিবে না। সুদর্শন ছেলে বিয়ে করার জ্বালা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি, আর কোনো মেয়েকে টের পেতে দেব না।"

তার কথা শেষ হতেই যেন ভাগ্যের অদ্ভুত সংযোগে সেই মুহূর্তেই বাড়ির ভিতরে পা রাখল রুহান ও তানভীর।নূরাইসার শেষ বাক্য তাদের কানে যেতেই দুই ভাই একসাথে থমকে দাঁড়াল, চোখ-মুখে বিস্ময়ের ছাপ।রুহান দ্রুত কাঁধের ব্যাগ এক পাশে ছুড়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে এলো, কণ্ঠে আতঙ্কের কাঁপুনি—

-"তোর জামাইর দিকে অন্য মেয়ে নজর দিছে, এতে আমাদের দোষ কোথায়? আমাদের কেন বিয়ে দিবি না? না না, এটা হতে পারে না, আমাকে বিয়ে দিতেই হবে! প্রয়োজনে সারাদিন মুখোশ পরে ঘুরবো বাইরে, তাও বিয়ে দিতেই হবে!"

নূরাইসা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ক্ষেপে উঠল—

-"না দিব না! সুদর্শন ছেলে বিয়ে করলে চিন্তার কোনো শেষ থাকে না!"

রুহান তখন সরাসরি মায়ের দিকে ফিরে আর্তস্বরে বলল—

-"ওমা, আমি বিয়ে করব! এই ইসার বাচ্চা আমাকে বিনা দোষে শাস্তি দিতে চাচ্ছে। ও ছোট মা, কিছু বল না!"

এতক্ষণ নীরব থাকা তানভীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বিরক্ত গলায় বলল—

-"বিয়ের জন্য এত ছেসরামি করছিস কেন? জানিস না, ইসা রেগে গেলে আবোল-তাবোল কি বলে নিজেও বুঝে না। ওর বাচ্চামিতে এত সিরিয়াস হচ্ছিস কেন? আগে তো দেখ কি হয়েছে।"

রুহান তখনও থামার কোনো লক্ষণ দেখাল না। তার কণ্ঠে অনুনয় আর মরিয়া আকুতির মিশেল—

-"আমি বিয়ে করব ভাই!"

এইবার নাজনীন বেগম আর সহ্য করতে পারলেন না। ধমক দিয়ে উঠলেন—

-"চুপ কর! লজ্জা করে না, বিয়ের কথা এভাবে বলছিস?"

মায়ের ধমকেও রুহানের মুখে বিন্দুমাত্র সংকোচ নেই। অবাক হয়ে বলল—

-"লজ্জা কেনো করবে? বিয়েই তো করতে চাই! বিয়ে ছাড়া বাসর করার জন্য তো কাঁদছি না!"

বাক্যটি শেষ হতেই ঘরজুড়ে কেশে ওঠার শব্দ, তানিয়া বেগম মুখ চেপে হাসি আটকান, নাজনীন বেগম চোখ বড় করেন, আর আফরিন-নুহা নিজেদের সামলে নিতে ব্যস্ত। তানভীর আর স্থির থাকতে পারল না। ধাম করে রুহানের পিঠে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল। রুহান ব্যথায় ‘আহ্’ করে উঠতেই তানভীর সুযোগ পেয়ে তির্যক স্বরে বলে উঠল—

-"এইডা কি কথা হলো? বাসর না করলে নাকি মরেই যাবি!"

রুহান চোখ কুঁচকে তানভীরের দিকে তাকাল—

-"এই ভাই, তুই থাম! আমি তো শুধু বিয়ে করার কথা বলছি! বিয়ে করলে মানুষ বাসর করবেই, এ তো খুব নরমাল কথা!"

তানভীর ঠোঁট বাঁকিয়ে কটাক্ষ ছুঁড়ল—

-"নরমাল কথা!? তুই যে হারে উত্তেজিত হয়ে বললি, শুনলে মনে হয় একদিনে সাতটা বিয়ে করে ফেলবি তাড়াহুড়া করে!"

রুহান হাত দুটো কোমরে রেখে দাঁড়িয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে বলল—

-"হয়ত সাতটাও করতে পারতাম, কিন্তু দোষ তো আমার নয়, আমার ওপর বিয়ে-নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাখছে ইসা!"

তানভীর দু’হাত নাটকীয় ভঙ্গিতে তুলে আকাশের দিকে তাকাল—

-"ও আল্লাহ! বিয়ে-নিষেধাজ্ঞা! এখন রাজ্যের দুঃখ রুহান ভাইয়ের! বিয়ে করতে না পারলে দেখছি দেশটাই নষ্ট হয়ে যাবে!"

তানভীরের কথা শুনে আফরিন আর নুহা হেসে লুটোপুটি। ইলিনা বেগম, তানিয়া বেগম, মুখ চেপে হাসি আটকে রাখার যুদ্ধ লড়ছেন। নাজনীন বেগমের মুখেও অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাসির ক্ষীণ রেখা ফুটে উঠল।এদিকে রুহান একেবারে মেঝেতে বসে পড়ল—

-"এইভাবে মজা নেবার টাইম না ভাই! আমার জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে! আমি চাই ঘরে ঘরে বউ দৌড়াবে, আমার শার্ট হাতে নিয়ে ঘুরছে, আমার হাতে পানি দিচ্ছে... তা না! ইসা আমাকে সন্ন্যাসী বানানোর চেষ্টা করছে!"

তানভীর তালি দিয়ে উঠল—

-"সন্ন্যাসী রুহান! বাহ! ভাবতেই ভালো লাগে। মাথায় চুল নেই, গলায় মালা, হাতে লাঠি, আর মুখে গম্ভীর কথা, ভাইরা, বিয়া হারাম, কারণ ইসা বলছে!"

ঘর ফেটে পড়ল হাসিতে। নুহা হেসে সোফায় লুটিয়ে পড়ে, আফরিন চোখ মোছে, তিন বেগম মুখ চেপে উচ্চহাসি থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। রুহান ক্ষেপে উঠে তানভীরের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তানভীর পাশ কাটিয়ে হেসে বলল—

-"আগে বউ ধর, তারপর আমাকে ধরিস!"

এই কথায় রুহান আরও ফুঁসে উঠল—

-"তোরে আমি ছাড়মু না আজ!"

দু’জনেই দৌড়-ঝাঁপ শুরু করে দিল ড্রয়িং রুমজুড়ে।

একজন দৌড়ায়, আরেকজন পিছনে, সারাটি ঘর হাসি-তামাশায় কাঁপতে লাগল। সোফার কুশন নড়ছে, পর্দা দুলছে, ফুলদানির পানি থরথর করে কাঁপছে।

বাড়ির শান্ত বিকেল এখন একেবারে কানফাটা হৈচৈ।এমন সময় নাজনীন বেগমের চেঁচানো কণ্ঠ ঝড়ের মতো ছুটে এলো—

-"ওই দাঁড়া! একদম থাম দু’জন! এরা দুই ভাই না নাকি ব্যাঙ? ব্যাঙের মতো লাফালাফি করছে!"

দু’জন ঝট করে থেমে গেল, কিন্তু মুখে দুষ্ট হাসি, আগের মতোই উজ্জ্বল। এমন মুহূর্তে, পেছন দিক থেকে ভেসে এলো গভীর, ভারী, কর্তৃত্বময় কণ্ঠ—

-"কি হচ্ছে এখানে?"

কণ্ঠটি ঘরজুড়ে যেন মুহূর্তে নীরবতা নামিয়ে দিল।

হইচই থেমে গেল। বাতাসে যেন দাঁড়িয়ে রইল চমকে ওঠা নিঃশ্বাসের আওয়াজ। ইলহানকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নূরাইসার রাগ যেন আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল পুরো দেহ জুড়ে। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে, কোনো চিন্তা না করেই, কাঁধের লেডিস ব্যাগটা সোজা তার দিকে ছুঁড়ে মারল।

ইলহান হকচকিয়ে গেলেও মুহূর্তের মধ্যে নিখুঁত দক্ষতায় ব্যাগটি ক্যাচ করে নিল। তার চোখে বিস্ময়ের ছাপ, ঘরে ঠিক কী ঝড় বয়ে গেছে, সে বুঝতে পারছে না। চারপাশের সবার চেহারা একেক রকম টেনশন আর অস্বস্তিতে গুমোট হয়ে আছে। ঠিক তখনই ইলিনার মুখমণ্ডলে কালো মেঘ নেমে এলো। তিনি ধীরে, গম্ভীর ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন। তার চোখ জ্বলজ্বল করছে কঠোরতায়। তারপর বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠে ধমক দিলেন—

-"নূরাইসা, বাড়াবাড়ি করছ! ইলহানের যদি লেগে যেতো? এত কিসের রাগ তোমার, হ্যাঁ? যাও ঘরে যাও, বেয়াদব মেয়ে!"

ইলিনার সেই ধমক যেন বজ্রপাতের মতো নেমে এলো নূরাইসার ওপর। মুহূর্তেই সে কেঁপে উঠল। এত জোরে ধমক পেয়ে চোখ দুটো পানি জমেছলছল করে উঠল।কথা বলার শক্তি না থাকায় ঠোঁট কামড়ে সে মাথা নিচু করে সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল। তার চলে যাওয়ার পর ঘরটি নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নীরবতা এত ঘন যে মনে হলো কেউ কথা বললে সেই শব্দ ছিঁড়ে যাবে বাতাস। কেউ কাউকে দেখছে, কেউ চোখ নামিয়ে নিচ্ছে, কারও মুখে একটি শব্দও নেই।

নূরাইসার পিছু নিতে কেউ আগ্রহ দেখানোর আগেই ইলহান এগিয়ে এলো।ইলহানের চোখে তখন রাগ নয়, এক ধরনের অটল দৃঢ়তা, এক ধরনের অধিকারবোধ। সবার সামনে দাঁড়িয়ে সে গম্ভীর স্বরে বলল, তার সতর্ক, শক্ত, গভীর কণ্ঠ ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো—

-"আজকে বলেছ, বলেছ ছোট মা। এর পর যেন আর কোনোদিন নূরাইসাকে এসব বলতে না শুনি। ও এখন আমার বউ। ও রাগ দেখাক, জিনিস ভাঙুক, আমাকে মারুক, যা খুশি করুক... তোমরা কেউ কিছু বলবে না ওকে। আমি সহ্য করব না এইসব।"

তার কণ্ঠে এমন শক্তি, এমন নিরাপত্তা ছিল, যা মুহূর্তেই ঘরের বাতাস বদলে দিল। কেউ কথা বলার সাহস পেল না। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করেই ইলহান ঘুরে দাঁড়াল। ভারী পায়ের গটগট শব্দে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল সে। তার চলে যাওয়ার পর ঘরে অদ্ভুত এক থমথমে নীরবতা নেমে এলো।

ইলিনা বেগম নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, চোখে অবাক বিস্ময়, ঠোঁটে থমকে থাকা শব্দ, আর বুকজুড়ে কষ্টের ভার। মুহূর্ত আগের দৃশ্য যেন পুরো শরীরকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। ঠিক তখনই আফরিন ও নুহা ধীরে এগিয়ে এলো। দু’জনের মুখেই উত্তেজনা নেই, বরং গভীর উদ্বেগ, গুরুত্ব। আফরিন মৃদু কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

-"কাজটা ঠিক করো নি মামনি। আজকে আরিবা আপু ওকে হুমকি দিয়েছে, ইলহান ভাইকে কেড়ে নেওয়ার। এইসব শুনে কোনো স্ত্রী ঠিক থাকতে পারে?"

নুহা মাথা নেড়ে যোগ করল—

-"আজকে মার্কেটে যা হয়েছে, সবই ওকে চিন্তায় ফেলেছে, রাগিয়েছে। যে কোনো মেয়েরই মাথা গরম হয়ে যেত।"

এরপর দু’জন মিলে মার্কেটে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি উত্তেজনা, প্রতিটি অপমান, সবকিছুই বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে বলল। ইলিনা বেগম নীরবে শুনলেন। তার চোখ ধীরে ধীরে ছলছল হয়ে উঠল,রাগ নয়, বরং অনুশোচনা। মেয়ের কষ্ট ঠিকমতো বুঝতে না পারার গ্লানি তার দৃষ্টি আরও ভারী করে তুলল।

বিজ্ঞাপন

এদিকে নাজনীন বেগম আলতো করে এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। তার কণ্ঠে স্নেহ, আশ্বাস, আর মমতার ঢেউ—

-"ও তো ছোট মানুষ। জানিস তো, ও সহজে রাগে না, আর না কোনো কিছু নিয়ে জেদ করে। কিন্তু যখন রাগে, তখন পাগলামি করে। কি বলে, কি করে, ওর কোনো লজিক থাকে না। তখন বুঝে-শুনে কিছুই বলে না। ওর এই স্বভাব আমরা জানি, বুঝি। তুই শুধু শুধু ধমক দিলি... এখন দেখ, কথা বলা বন্ধ করে দেয় নাকি।"

ইলিনা বেগম অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলেন জায়ের দিকে, একটা ধমকের আঘাত কতটা গভীরে লাগতে পারে নূরাইসার মতো কোমল মেয়ের মনে। তানিয়া বেগম এগিয়ে এসে স্থির কণ্ঠে বললেন—

-"স্বামীর ব্যাপারে এইসব কেউ সহ্য করবে না ছোট বৌমনি। তাই ইসার রাগ, জায়েজ।"

.

নূরাইসা খাটের কিনারায় বসে হেঁচকি তুলে কাঁদছে।

চোখদুটো লাল, শ্বাস কাঁপছে, এলোমেলো চুলে যেন অস্থিরতার ঝড় বয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, পুরো পৃথিবী যেন হঠাৎ করেই তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে।

দরজার পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ইলহান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে নেমে এলো এক দীর্ঘ, দমবন্ধ করা দীর্ঘশ্বাস। তারপর নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে এসে নূরাইসার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, যেন পৃথিবীর সব উচ্চতা মাটিতে নামিয়ে কেবল তার জন্য ছোট হয়ে থাকে সে। ফিসফিসে, কোমল কণ্ঠে বলল—

-"কি হয়েছে, নূরেজান?"

নূরাইসা কোনো উত্তর দিল না। শুধু মুখ ঘুরিয়ে আরও জোরে কাঁদতে লাগল, সেই কান্না যেন বুকে গিয়ে কাঁপন তোলে। ইলহান দু’হাত বাড়িয়ে আলতোভাবে তার গাল দুটো আগলে নিলো। আঙুলের ডগা স্পর্শ করতেই টের পেল, রাগ আর কান্নার তপ্ত মিশ্রণে নূরাইসা কী ভয়াবহ অস্থির অবস্থায় আছে। আরও নরম স্বরে বলল—

-"কি হয়েছে বল আমায়?"

এইবার নূরাইসা কাঁপা, ক্ষিপ্ত স্বরে বলে উঠল—

-"আপনি এত সুদর্শন কেনো? রাস্তা-ঘাটে মেয়েদের নিজের রূপ দেখিয়ে বেড়ান, ভালো লাগে তাই না?"

ইলহান থমকে গেল। ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল তার দিকে। বুঝতে পারল বউয়ের পাগলামির স্যুইচ পুরোপুরি অ্যাক্টিভ হয়েছে। অসহায় ভরা স্বরে বলল—

-"আমি তো ইচ্ছে করে সুন্দর হইনি, বউ। আল্লাহ বানিয়েছে। এখন কি, মেয়েদের মতো বোরকা-নিকাব পরে ঘুরবো?"

নূরাইসা মুখ ঘুরিয়ে রইল। কথা বলল না। ঠোঁট কাঁপছে, চোখ টলমল, নাক লাল, রাগ আর কষ্ট মিশে এক ধরনের শিশুসুলভ অভিমান হয়ে জমাট বেঁধে আছে তার মুখে। ইলহান নীরবে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তার বউটা এতটাই রেগে আছে যে নাকের পাটা পর্যন্ত কাঁপছে, সেটা দেখে তার মুখে বিরক্তি নয়, বরং একরকম ভালোবাসার নিঃশব্দ হাসি ফুটে উঠল।হঠাৎ সে ফটাফট এগিয়ে এসে নূরাইসার নাকে, ঠোঁটে পরপর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুমু এঁকে বলল—

-"সকালে চলে যাব, ব্লাডমুন, এখন আবার রাগ দেখাবি? এবার গেলে কবে ফিরতে পারবো তার কোনো ঠিক নেই। মিশন শেষ না হলে এবার আর ফিরে আসতে পারবো না।"

ইলহানের এই কথাটা শুনে মাত্রই নূরাইসার বুকটা ভারী হয়ে গেল, এক নিঃশ্বাসে যেন সব রঙ ফিকে, সব শব্দ নিস্তব্ধ। সে ধীরে ধীরে তাকালো ইলহানের দিকে, সেই পরিচিত মুখ, কিন্তু আজ তার চোখে বিদায়ের অসংলগ্ন অসহায় কুয়াশা। মনে হলো, বিদায়ের আগেই ব্যথা দুজনকেই গ্রাস করে ফেলছে। নূরাইসা তাড়াতাড়ি নিজের চোখ–মুখ মুছে নিল, যেন কাঁদা দুর্বলতার পরিচয়। তারপর জোর করেই একটা কোমল, আপোষহীন হাসি ফুটিয়ে বলল—

-"ঠিক আছে... আর করবো না রাগ, ও করব না।"

এক মুহূর্ত দেরি না করে ইলহান এগিয়ে এসে তার কপালে নিভৃত, গভীর এক চুমু আঁকল। তারপর শক্ত করে বুকে টেনে নিল, যেন বিদায়ের আগে বউটাকে নিজের ভেতর লুকিয়ে রাখতে চায়, পৃথিবীর সব বিপদ থেকে সরিয়ে। ভালোবাসায় ভারী কণ্ঠে বলল—

-"তোর স্বামীর ওপর কোনো মেয়ে নজর দিলে, একদম চোখ উপড়ে ফেলবি। বাকিটা সামলাবে তোর স্বামী।

কিন্তু এইভাবে বসে বসে কান্না করবি না, মনে থাকবে?"

নূরাইসা ইলহানের বুকে মুখ গুঁজে ধীরে, প্রায় শ্বাসের মতো ক্ষীণ স্বরে বলল—

-"ঠিক আছে!"

ইলহান হেসে উঠল, সেই হাসিতে ছিল আশ্বাস, অপরিসীম স্নেহ, আর বিদায়ের ব্যথায় মেশানো উষ্ণতা। সে আরও জোরে জড়িয়ে ধরল নূরাইসাকে, যেন এই মুহূর্তটাই তার একমাত্র নিরাপদ ঠিকানা, এবং এখনই ছাড়লে হয়তো চিরদিনের মতো হারিয়ে যাবে।

.

রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে। সবাই রাতের খাবার শেষ করে যার যার ঘরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই মাঝে ইলহান একে একে সবার সঙ্গে আলতো হাসিতে বিদায় নিলো। ভোরে সবাই ঘুম থেকে ওঠার আগেই তাকে বেরিয়ে যেতে হবে, তাই এই নৈঃশব্দ্যময় মুহূর্তটুকুই ছিল শেষ দেখা। বিদায় সেরে সে ধীরে ধীরে নিজের ঘরে ফিরে এলো। ছোট্ট আলোয় তার ছায়াটা লম্বা হয়ে পড়েছে মেঝেতে। সে আলমারি খুলে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস ব্যাগে ভরতে শুরু করল, একধরনের অদৃশ্য চাপা তাড়াহুড়ো তার প্রতিটি নড়াচড়ায় ফুটে উঠছিল।

নূরাইসা তখনও নিচের ঘরেই। দাদুর ঘরে বসে আছে, বাকি সবাইও এখনো সেখানেই। নূরাইসা দাদুর দু’হাত শক্ত করে ধরে সব কথা খুলে বলল, শান্ত গলায়, কিন্তু ভিতরের অস্থিরতা লুকানো যাচ্ছে না। নূরাইসার আর্মিতে যাওয়া নিয়ে কেউই রাজি নয়। সে তো জন্ম থেকেই ভীতু, সরল, স্নিগ্ধ। তার নরম হৃদয় আর মায়াবী স্বভাবের সঙ্গে কঠোর সেনাজীবনের কোনো মিল নেই। সবাই চিন্তিত সে সেখানে টিকে থাকতে পারবে কি না। কিন্তু নূরাইসার চোখের ভেতরকার তীব্র আকুতি, অস্থির জেদ, সবাইকেই নরম করে দিলো।শেষে তারা অনুমতি দিল, অনিচ্ছা নিয়ে, দুশ্চিন্তায় ভরা হৃদয় নিয়ে।

ইলহান অবশ্য কিছুই জানে না। জানলে তো সে কোনোদিন যেতে দিত না। উল্টো আরিবার ব্যবস্থা অন্যভাবে করত, যেটা নূরাইসা মোটেও চায় না। সে নিজের লড়াইটা নিজেই লড়তে চায়, নিজের মত করে আরিবার বন্দোবস্ত করতে চায়। সব কথা শুনে দাদু একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর গভীর, ভারী কণ্ঠে বললেন—

-"ঠিক আছে। তুমি বিহানকে জানিয়ে রেখো। আমি আমার বন্ধুর ছেলে আশরাফকে বলে দিবো, ও সেনাবাহিনীর জেনারেল। ও তোমাকে এক মাসের জন্য এলাও করবে। বাকিটা তোমাকেই করতে হবে। তোমার লড়াই আমি আশরাফকে তোমাকে সাহায্য করতে বলতে পারব না। ও শুধু তোমাকে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে। আর আরিবা যেহেতু ইলহানের টিমের, তাই তোমাকে ওর সামনেই সব করতে হবে। তখন পিছিয়ে এলে চলবে না কিন্তু!"

নূরাইসার দৃষ্টি শানিত হলো, বুকের উঠে আসা ভয়টাকে সে জেদের নিচে চাপা দিল। তারপর মাথা উঁচু করে দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

-"আমি দেওয়ান বাড়ির মেয়ে। হেরে যাওয়া শিখিনি দাদু। আমি লড়াই করলে জিতেই ফিরে আসব, ইনশা আল্লাহ!"

এই কথার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভেতর যেন অদৃশ্য কোনো শক্তির স্পন্দন ছড়িয়ে পড়ল, এক মেয়ের জেদ, তার লড়াইয়ের আগুন, আর অন্ধকার রাতের নিস্তব্ধতা মিলে তৈরি হলো নতুন এক প্রতিজ্ঞার মুহূর্ত।

দাদুর সাথে কথা শেষ করে নূরাইসা ঘরে ফিরতেই দেখল, ইলহান তখনও ব্যাগে কিছু ভরছে। সে নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। ইলহান হাতের কাজ থামাল না, মৃদুস্বরে বলল—

-"এত দেরি হলো আসতে?"

-"গল্প করছিলাম সবার সাথে।"

ইলহান এবার নূরাইসার হাত ধরে তাকে আলগা করে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করাল। তারপর হঠাৎ শক্ত টানে তাকে টেনে নিল নিজের বুকের মাঝে। গভীর অভিমান মেশানো কণ্ঠে বলল—

-"আর আমি যে চলে যাব, সেটা ভেবে আমাকে একটুও সময় দেওয়ার কথা মাথায় এলো না?"

-"এই তো এলাম!"

-"কী লাভ? এখন তো অনেক দেরি হলো!"

কথা বলতে বলতে ইলহানের হাত ধীরে ধীরে নূরাইসার পিঠে বিচরণ করতে লাগল, উষ্ণ, অস্থির এক স্রোত যেন তার আঙুলের ডগা বেয়ে বইছে। সেই স্পর্শে নূরাইসার সারা শরীর কেঁপে উঠল বারবার, প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে ধরা পড়ছে ভেতরের আলোড়ন। ইলহান ঝুঁকে তার কানের লতিতে নরম করে চুমু খেলো , তারপর ধীর লয়ে নামতে লাগল, সরুগ্রীবা বেয়ে কোমল কন্ঠদেশে, আরও নিচে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুমু আর কামড়ে নূরাইসার পুরো সত্তাটাই বেসামাল হয়ে উঠতে লাগল। হঠাৎই সে নূরাইসাকে কোলে তুলে নিঃশব্দে বিছানায় শুইয়ে দিল। রুমের বাতিটা নিভিয়ে সামনে এগিয়ে এলো ধীর, ভারী পদক্ষেপে, যেন কোনো অদৃশ্য আকর্ষণ তাকে টেনে আনছে নূরাইসার দিকে। বিছানার ধারে এসে নূরাইসার ওপর ঝুঁকে পড়তেই মুহূর্তটা আরও গাঢ় হয়ে উঠল। পুরুষ মানুষ, তার ভেতরের অনুভূতির স্রোত থামানো কি সহজ? গতরাতের অশেষ সুখের দিগন্ত যেন আজ আবার তাকে ডেকে বলছে, আরও একবার... আরও গভীরভাবে... তার অন্তরের প্রতিটি কোণে উথলে উঠছে উষ্ণ দহন।গত রাতে যে সুখের দিগন্তে পৌঁছেছিল, সেই মধুময় অনুভূতির টান আজ আবার তাকে চৌম্বকের মতো ফিরিয়ে এনেছে নূরাইসার কাছে। প্রণয়ের উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে যেতে।

তার সমগ্র দেহে ছড়িয়ে পড়তে লাগল দহন, অনুভূতির আগুন টগবগিয়ে উঠল রন্ধ্রে রন্ধ্রে। উথাল-পাথাল সেই আবেগ দমন করতে চেয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে সে। নূরাইসাকে ছুঁতে এগিয়ে এল আরও গভীরভাবে, আর নূরাইসাও নিঃশব্দে, নিভৃত এক সম্মতিতে সাড়া দিল। দ্বিতীয়বারের মতো তাকে কাছে পাওয়ার আকুলতায় ইলহানের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস নূরাইসার সমস্ত সত্তাকে কাঁপিয়ে তুলছিল। নূরাইসাও সমান আগ্রহে তার স্পর্শে সাড়া দিচ্ছিল। ধীরে ধীরে ইলহানের বলিষ্ঠ হাতটি নূরাইসার পরা বস্ত্র সরাতে উদ্যত হলো।পৃথিবীর আর কেউ কখনো ইলহানকে এমন দেখেনি। কিন্তু নূরাইসা দেখেছে। রাগী, কঠিন, একরোখা, যোদ্ধার সেই হাতও যে এমন কাঁপতে পারে, তার গলাও যে কখনো শুকিয়ে আসে, এই গভীর সত্যটি অনুভব করার সৌভাগ্য কেবল নূরাইসারই হয়েছে। মানুষটা তার কাছে কতটা দুর্বল, কতটা নিঃশর্ত, কতটা আত্মসমর্পিত।

ইলহানের ঘন ঘন নিঃশ্বাস, বুকের গভীর থেকে উঠে আসা উত্তেজনার আগুন, সব মিলিয়ে যেন তাকে ঘিরে এক অদৃশ্য আলোকরেখা তৈরি করে ফেলল। সেই তীব্রতার মধ্যেও নূরাইসা আস্তে করে হেসে উঠল, নরম, আশ্বস্ত করার মতো হাসি। তার স্বামীর অস্থিরতা বুঝে সে হাত বাড়িয়ে দিল, ধীরে, নিশ্চিন্ত এক ভঙ্গিতে। খুলে ফেলল নিজের পরনের কামিজ, যেন চারদিকে ছড়িয়ে থাকা অন্ধকার নীরবতার আস্ত পর্দা আলতো করে সরিয়ে দিচ্ছে। ইলহানের তখন আর কিছু ভেবে দেখার শক্তি নেই।সে পুরোটা জুড়ে ভেসে যাচ্ছে অনুভূতির ঘূর্ণাবর্তে।নূরাইসাকে আদরে ভরিয়ে দিতে চাইছে, গতরাতের সেই স্মরণীয়, নরম, দ্যুতিময় মুহূর্ত যেন আবার হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকছে। এক পলক তাকাল সে, বদ্ধ চোখে, কম্পিত ঠোঁটে, বক্ষতলে শুয়ে থাকা নূরাইসার দিকে। তার মুখের ভরসাময় শান্তি, বুকের উপর ওঠানামা করা নিঃশ্বাস, সব মিলিয়ে যেন ইলহানকে শ্বাসহীন করে দিল। এক মুহূর্তের জন্য সে নিজেই বুঝতে পারল না, সে যোদ্ধা, নাকি নিঃস্বার্থ প্রেমিক।

ধীর ভঙ্গিতে সে ঝুঁকে এল তার দিকে। নূরাইসার ছোট্ট, নরম বক্ষ-বিভাজনে ইলহান সন্তর্পণে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। কোমলতার সেই ক্ষুদ্র বিভাজনের ওপরে ঠোঁট ছোঁয়ানোটা ছিল না কামনা, ছিল আত্মসমর্পণ, গভীর ভালোবাসার, স্পর্শে মিলিয়ে যাওয়া এক মূহুর্তের শান্তি। সেই মুহূর্তে ইলহান খুঁজে পেল ইহজন্মের সমস্ত সুখ, সমস্ত পূর্ণতার মর্মস্পর্শী স্বাদ।

.

ইলহান পুরো ইউনিফর্ম পরে একদম প্রস্তুত। মুখ ঢেকে রেখেছে কালো মাস্কে, শুধু তার তীক্ষ্ণ বাদামি চোখ দুটোই দেখা যায়। বউয়ের নির্দেশ অমান্য করার সাধ্য বুঝি ইলহানের আছে? না, নেই। তাই তো নূরাইসার বলা মতোই মুখে মাস্ক পরে নিয়েছে। নূরাইসা দাঁড়িয়ে আছে, হাতে কালো সানগ্লাস। ইলহান সোজা তার সামনে এসে ভ্রু নাচিয়ে বলল—

-"ঠিক আছে, জান?"

নূরাইসা এক পা এগিয়ে এসে সানগ্লাসটা আলতো করে ইলহানের চোখে পরিয়ে দিল। মুচকি হেসে বলল—

-"একদম পারফেক্ট।"

ইলহান তাকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে মাস্কের ওপর দিয়েই কপালে নরম চুমু খেলো। মুহূর্তটা যেন থমকে ছিল, হালকা বাতাস, গায়ে ইউনিফর্মের শব্দ, দু’জনের নিঃশ্বাসের অদৃশ্য উষ্ণতা। হঠাৎই তার কিছু মনে পড়ল। এক ঝটকায় নূরাইসাকে নিজের থেকে সরিয়ে নিয়ে চোখের চশমা খুলে ফেললো। নূরাইসার দুই কাঁধে হাত রাখল। চোখ দুটোতে তখন অদ্ভুত এক তীব্রতা, কেমন যেন দাবিদার, কেমন যেন অভিমানী।

-"তুই কাঁদছিস না নূরেজান!"

নূরাইসা কপাল কুঁচকে বলল—

-"আপনি তো শরীর নিয়ে যেতে পারবেন, কিন্তু আপনার মন-মস্তিষ্ক তো আমার সাথেই থাকবে!"

ইলহান তাও গভীর স্বরে টেনে টেনে বলল—

-"গতবারও তুই কেঁদেছিলি!"

-"আপনি কি চান আমি এখনই কাঁদি?"

ইলহান মাথা ওপর-নিচ করে আবার সেই টানা স্বরে বলল—

-"হ্যাঁ... আমি চাই তুই শুধু আমার জন্য, আর শুধু আমার কারণেই তুই কাঁদবি। সেখানে আমি চলে যাচ্ছি... আর তুই একফোঁটা অশ্রুও ফেলছিস না!"

নূরাইসা অসহায় বিস্ময়ে বলল—

-"আপনি সব সময় এই কথাটা বলেন কেন?"

ইলহান গভীর ভরাট কণ্ঠে—

-"এখন যে কান্নাটা করবি... সেটা শুধু আমার জন্য!"

এইটুকু বলে সে নূরাইসার দিকে ঝুঁকে পড়ল। মুখটা নিয়ে গেল তার কানের একদম কাছে, নিঃশ্বাসের উত্তাপ স্পর্শ করা যায় এমন দূরত্বে।

-"আর আমার কারণেই কেন কান্না করবি, সেটা কি ব্যাখ্যা দিতে হবে? দু’ রাতে কান্না করার কারণ নিশ্চয়ই বুঝে গেছিস!"

নূরাইসার কান লজ্জায় তপ্ত হয়ে উঠল। গাল দুটো রক্তিম হয়ে গেলো, হৃদস্পন্দন পর্যন্ত শুনে ফেলা যায় এমন। ইলহান মুখ সরিয়ে এনে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার লাল হয়ে ওঠা মুখের দিকে। নূরাইসা একবার তার চোখে তাকায়, আবার দৃষ্টিটা সরিয়ে ফেলে, যেন তার লজ্জা সামলানোই কঠিন।

ইলহান সেই লজ্জামাখা মুখশ্রী দেখে নরম হাসি দিয়ে বলল—

-"মাই লাভলি ব্লাডমন!"

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প