সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ২৩

🟢

দেওয়ান বাড়ির পরিবেশ আজ অস্বাভাবিকভাবে নিস্তব্ধ। বাতাসে যেন চাপা ক্রোধ আর অজানা আশঙ্কা মিশে আছে। বড়সড় ডাইনিং রুমে সকালের সূর্যের আলো ঢুকছে ভারী পর্দার ফাঁক গলে, টেবিলজুড়ে সাজানো হরেক রকম নাস্তা, পরোটা, হালুয়া, ডিম, ফল, দুধ, সবকিছুই আছে, অথচ কারো মুখে রুচি নেই। টেবিলের এক পাশে গম্ভীর মুখে বসে আছেন নাহিদ দেওয়ান ও ইকবাল দেওয়ান, পাশে দাদু-দাদী। তাদের মুখে নীরব অনুশাসন। অন্য পাশে বসে আছে তিন মেয়ে, নূরাইসা, আফরিন ও নুহা। নাজনীন বেগম স্নেহে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, মেয়েদের মুখে নিজ হাতে খাবার তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু তাঁর চোখে আজ এক কঠিন কঠোরতা। যেন প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে শাসনের আগুন লুকিয়ে আছে।

আর ঠিক সেখানেই, ডাইনিং টেবিলের কয়েক ধাপ দূরে, ঘরের দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে আছে দেওয়ান বাড়ির তিন ছেলে, ইলহান, রুহান ও তানভীর। দুই হাত কানে দিয়ে, এক পা তুলে, দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে, অসহায়, লজ্জিত, আর কিছুটা ভীত চেহারা নিয়ে। যেন ছোট্ট ভুলে ধরা পড়া তিন অপরাধী। তাদের দিকে তাকিয়ে ঘরের অন্যরা একবার চুপিচুপি চোখ তোলে, আবার দ্রুত দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। টেবিলের অপর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তানিয়া বেগম ও ইলিনা বেগম। মুখে উদ্বেগ, চোখে লজ্জা। দু’জনেই কিছু বলতে গিয়ে থেমে যাচ্ছেন, মাঝে মাঝে একে অন্যের মুখের দিকে তাকাচ্ছেন, যেন শব্দ খুঁজে পাচ্ছেন না।

হঠাৎ নীরবতার মাঝে রুহান একরাশ কৌতুকমিশ্রিত অসহায় কণ্ঠে বলে উঠলো—

-"ও মা, খিদে পেয়েছে তো!"

তার কণ্ঠে কষ্টের চেয়ে বেশি ছিল বালকসুলভ সরলতা। মুহূর্তেই ঘরে এক নিস্তব্ধ অস্বস্তি নেমে এলো। নাজনীন বেগম নির্বিকার, যেন কিছু শোনেনইনি। তিনি তখনও ব্যস্ত মেয়েদের মুখে খবর তুলে দিতে। ইলিনা বেগমের মন কেমন করে উঠলো রুহানের মুখ দেখে। তিনি আর চুপ থাকতে পারলেন না—

-"আপা, দোষ তো শুধু ওদের না। তুমি ওদের একা শাস্তি কেন দিচ্ছ? ওরাও তো আঘাত পেয়েছে।"

বলতে বলতেই যেন তাঁর মায়া রূপ নিলো রাগে। তিনি হঠাৎ এগিয়ে গেলেন নূরাইসা আর নুহার দিকে, দুজনের মাথায় হালকা চাটি মেরে বলে উঠলেন—

-"তোদেরও বলি, হারী! এত উড়নচণ্ডী হতে হবে কেন? ছোটবেলা থেকে ভাইদের পিছে ঘুরিস, যেন ওদের ছায়া। ওরা যেখানে যাবে, তুই-তোরা সেখানেও যাবি? রাতবিরেতে এই বদভ্যাস বাইক রাইডে যাওয়ার! এখন দেখ, এক এক জন মাথায়-হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে বসে আছিস! ভাইদের লেজ ধরে ঝুলে থাকলো মেয়েগুলো সারাজীবন!"

ইলহান আতঙ্কিত হয়ে এগিয়ে এলো, কণ্ঠে করুণ আবেদন—

-"ছোট মা, নুহার মাথায় মেরো না। ও সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছে।"

মুহূর্তেই যেন বজ্রপাত হলো। নাজনীন বেগমের চোখ জ্বলে উঠলো, মুখে তীব্র ক্রোধের ছায়া। তিনি হাতের স্যান্ডেল খুলে ছুঁড়ে মারলেন ইলহানের দিকে, আর গর্জে উঠলেন—

-"একদম দরদ দেখবি না!"

তিন ভাই একসঙ্গে চুপসে গেল, মাথা নিচু, মুখে নীরব অপরাধবোধের ছায়া। ঘরের বাতাসে চাপা গুমোট ভাব, যেন প্রতিটি নিঃশ্বাসে কাঁপন লেগেছে। নাজনীন বেগমের চোখ রক্তাভ হয়ে উঠেছে, সেই দৃষ্টিতে রাগ আর মাতৃত্বের ঝড় একসঙ্গে মিশে গেছে। তিনি জায়ের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকালেন। ইলিনা বেগম ভয়ে তানিয়ার পাশে গিয়ে কচুমাচু করে দাঁড়িয়ে পড়লেন, যেন মেঝের ধুলোতেই লুকিয়ে পড়তে চান। নাজনীন বেগমের কণ্ঠ গর্জে উঠল—

-"তোর সাহস তো কম না রে ছোট! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার মেয়েদের মারিস? আর ওদেরই আবার দোষ দিচ্ছিস? ওরা বাহিরের কারো সঙ্গে যায়নি, নিজেদের ভাইদের সঙ্গে গিয়েছিল। বেশ করেছিল! ওদের হুশ ছিল না, যে মেয়েগুলোকে নিয়ে গেছে তারা কি গাড়ি চালাতে জানে না? লাফাঙ্গাদের মতো গাড়ি চালালে ডাইরেক্ট স্বর্গের টিকিট তো কাটা থাকবেই! আমার তিনটে মেয়েকে আধমরা করে এনেছো ঘরে, আর এখন ইসাকে বকছিস? ওইদিকে তাকা দেখ, ওর অকর্মা, গুণধর স্বামী দাঁড়িয়ে আছে। সে-ই বলেছে দেখে ইসা গিয়েছিল, নইলে ইসার মতো ভীতু মেয়ে কোনোদিন যেতো না!"

শেষ বাক্যে তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। ঘরের ভেতর যেন বাতাস জমে গেল। কেউ সাহস পেল না মুখ খোলার। উপস্থিত সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কেউ তাকাচ্ছে মেঝেতে, কেউ দেয়ালের ফ্রেমে ঝুলে থাকা ইকবাল দেওয়ানের ছবির দিকে। ঘরে এখন শুধু নাজনীন বেগমের ক্রোধ আর নুহার যন্ত্রণার শ্বাসের শব্দ। ইশ, নুহার মাথা পুরো ব্যান্ডেজে মোড়ানো, অচেতন, নিস্তব্ধ। মেয়েদের শরীরে ফুলের টোকা লাগলেও নাজনীন বেগমের সেটা সহ্য করতে পারেন না। আর তিন ভাই, তিন বাদর, এক্সিডেন্ট করে এসেছে! মেয়েদের নিয়ে নাজনীন বেগম খুব সেনসেটিভ, তাদের কিছু হলে তার রাগ বারুদ হয়ে যায়, তখন কেউ সাহস পায় না কিছু বলার।

ঠিক তখনই নাজনীন বেগম তানিয়ার দিকে ফিরে তীব্র কণ্ঠে বললেন—

-"আর তুই, তানিয়া! তোর ছেলে তানভীরকে কিছু বলছিস না কেন?"

তানিয়া বেগম একটু থমকে গেলেন, মুখে মৃদু হাসি টেনে ধীরে ধীরে বললেন—

-"ভাবী, আমি কি বলবো? তোমার ছেলে তুমি যা খুশি কর। আমি তো শুধু জন্ম দিয়েছি, মানুষটা তৈরি করেছো তুমি। ওর সব গুণ, সব খারাপ, সবই তোমার কাছ থেকে শিখেছে। আমার ছেলে বলে চালিয়ে দিলেই তো হবে না! তোমার ছেলে-মেয়েরা যা খুশি করুক, আমাদের তাতে কিছু বলার নেই।"

তার কণ্ঠে ছিলো দায়সারা ভাব। ঘরের বাতাসে যেন একটা অদৃশ্য সংঘর্ষ লেগে গেল। নাজনীন বেগম বাড়ির সমস্ত ছেলে-মেয়েদের নিজ হাতে মানুষ করেছে। ইলিনা বেগম ও তানিয়া বেগম তো মানেই তাদের সন্তান নাজনীন বেগমেরই। তারা তো শুধু জন্ম দিয়েছি, তাই অধিকারও নাজনীন বেগমের বেশি।

রুহান দাঁত চেপে রাগে ফিসফিস করে বলল—

-"সব দোষ ওই নুহার। ও যদি কিডন্যাপ না হতো, আমাদের আজ এই অবস্থা হতো না, মিথ্যা বলতেও হতো না।"

ইলহান, যে এতক্ষণ নিশ্চুপ ছিল, ঠান্ডা কিন্তু হিমেল কণ্ঠে বলল—

-"চুপ কর। কাল রাতের ব্যাপারে একটা শব্দ মুখ দিয়ে বের করলে তোকে টুকরো করে ফেলব। আর নুহাকে কিছু বললে গান পয়েন্টে ফেলে ডাইরেক্ট শুট করে দেব।"

রুহান থতমত খেয়ে তাকাল তার দিকে। তানভীর মুখ টিপে হেসে ফেলল, একটা বিষাক্ত হাসি, যেন আগুনে ঘী ঢালল। নাজনীন বেগম ততক্ষণে নুহার মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁপা গলায় বললেন—

-"সব দোষ তোর বড় বাবার!"

ইকবাল দেওয়ান তখনই আঁতকে উঠলেন। সবার হাতের খাবার থেমে গেল। ঘরের একমাত্র আওয়াজ, থালায় চামচ পড়ার টুং শব্দ। ইকবাল দেওয়ান স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন—

-"আমি আবার কি করেছি?"

নাজনীন বেগম তীক্ষ্ণ স্বরে গর্জে উঠলেন—

-"কি করোনি? এই বাইক-বাতিক শুরু করল কে? তোমার সেই আদরের বড় ছেলের জন্য বাইক কিনে দিলে, তারপর বাকি দুই বাদর কান্না জুড়ে দিলো বাইকের জন্য। তোমাদের এই সখের চোটে আমার মেয়েরা আজ আধমরা!"

ইকবাল দেওয়ান বিরক্ত কণ্ঠে বললেন—

-'আমি কিনে না দিলে কি তোমার বড় ছেলে কিনতে পারত না? যে ছেলে বারো বছর বয়স থেকে নিজের ফটোগ্রাফিক মেমোরি কাজে লাগিয়ে ইনকাম করে, তার বাইক কেনার টাকা হতো না?"

এই কথায় নাজনীন বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে গেলেন। ঠোঁটের কোণে টান, চোখে দ্বিধা, বুঝলেন, যুক্তি আছে, কিন্তু মায়ের মন তো যুক্তিতে চলে না। তিনি ছেলের দিকে তাকিয়ে গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন—

-"এত ইন্টেলিজেন্ট ছেলে জন্ম দিয়ে লাভই বা কি হলো, যদি হুশটাই না থাকে? হারে মাসে জ্বালিয়ে খেলো আমাকে!"

নূরাইসা আড়চোখে তাকালো ইলহানের ভোতা মুখটার দিকে। ইশ, বেচারা কি বকুনিটাই না খেলো! নাটেরগুরু তো সেই, অথচ আজ যেন নেতা নয়, একেবারে মুষড়ে পড়া সৈনিক। ওনার জায়গায় যদি আজ রুহান ভাই থাকতো, তবে এতক্ষণে খুন্তি, বেলন, কিছুই অবশিষ্ট থাকতো না রান্নাঘরে!

ইলহান মুখ তুলে তাকাল নূরাইসার দিকে। দেখলো, ঠোঁটের কোণে মিটিমিটি হাসি খেলে যাচ্ছে তার।মুহূর্তেই তার মেজাজ বিগড়ে গেল। সবাইকে আহত করলো, কিন্তু তাকে ছাড়া। আর সেই দেখো, তার জামাইবাবুকে ছেড়ে দিব্যি নাস্তা করছে! একবারও বলেনি, "খাওয়ার কিছু দেব?"

ইলহানকে চোখ গরম করে তাকাতে দেখে নাজনীন বেগম হঠাৎ বলে উঠলেন—

-"এই কাকে চোখ রাঙাচ্ছিস তুই? তোর বাপ-দাদারও সাহস হয়নি বউয়ের দিকে এমনভাবে তাকানোর! আর তুই আমার সামনে বউকে চোখ রাঙাচ্ছিস? একদম চোখ তুলে পেঁয়াজ দিয়ে ভুনা করে খাইয়ে দেব তোকে, বুঝলি?"

ইলহান দ্রুত চোখ খিচে বন্ধ করে ফেললো। তা দেখে নুহা, আফরিন আর নূরাইসা ফিক করে হেসে ফেললো। ইকবাল দেওয়ান যেনো আকাশ থেকে পড়ল সেই দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন স্ত্রীর দিকে। তার চোখে অবিশ্বাস, মুখে স্থিরতা নেই। দাদু এবার গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন—

-"বউমা, কি সব বলছো তুমি? আমি তোমার শাশুড়িকে চোখ রাঙাই না, ভালোবেসে তাকাই। চোখ রাঙানোর জন্য আবার সাহস লাগে নাকি?"

দাদী ভ্রু কুঁচকে, সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন—

-"তাই নাকি? তাহলে বুঝি আমাকে চোখ রাঙানোর সাহস তোমার আছে?"

দাদু হকচকিয়ে এদিক-ওদিক তাকালেন। কণ্ঠে অনুতপ্ত মিনতি—

-"না মানে... ওই আরকি..."

দাদু-দাদীর এই নাটকীয় দৃশ্য দেখে সবাই মিটিমিটি করে হাসছে। নাজনীন বেগম আঁচলে মুখ চেপে হাসতে হাসতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। রুহান হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো—

-"ও মা খোদায়! পেটে কুত্তা দৌড়াচ্ছে তো!"

তানভীর পাশ ফিরে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে বলল—

-"ইঁদুর হবে ওটা।"

রুহান চোখ বড় বড় করে বলল—

-"আরে মোগা! ইঁদুরের পেট ছোট, কুত্তার পেট বড়, ওই সমান খুদা লাগছে আমার! তাই কুত্তা দৌড়াইতাছে!"

তানভীর হতাশ মুখে বলল—

-"তুই আর তোর লজিক!"

রান্নাঘর থেকে নাজনীন বেগমের বজ্রকণ্ঠ ভেসে এলো—

-"বাঘ দৌড়ালেও খাবার পাচ্ছিস না তোরা! আজ থেকে তোদের তিনজনের খাওয়া বন্ধ দেওয়ান বাড়িতে!"

রুহান ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। চোখে রক্তচোখা আগুন—

-"তাহলে বিয়ে করিয়ে দাও! বউ নিয়ে আলাদা খাবো! খেলাম না তোমার দেওয়ান বাড়ির খাবার!"

বলতে দেরি রান্নাঘর একটি জুতো থেকে উড়ে আসতে দেরি হলো না। জুতোটা সোজা গিয়ে লাগল রুহানের নাকে! মুহূর্তেই চারদিক স্তব্ধ। উপস্থিত সবাই হতভম্ব।

রুহান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে, যেন বজ্রাঘাতে পাথর।নাজনীন বেগম এবার অন্য হাতে তুলে নিলেন আরেকটি জুতো। চোখ-মুখ লাল, রাগে সারা শরীর কাঁপছে। তিন ছেলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি।

মুহূর্তেই তিনজন উল্টো ঘুরে দৌড়ে পালাল, যে যেদিকে পারে!

পেছন থেকে নাজনীন বেগমের গর্জন ভেসে এলো—

বিজ্ঞাপন

-"বাঁদরের দল! আমার মেয়েদের আহত করে আবার খাবার খাবি? এখন পালাস কেনো? দাঁড়া, আজ এমন খাওয়াবো যে মনে থাকবে!"

নূরাইসা তখন হেসে ফেলে একটু উঁচু গলায় বলল—

-"ও বড় মা, তোমার বড় ছেলেকে একটু কম মেরো! না হলে ঘরে গিয়ে সব রাগ আমার ওপর ঝারবে।"

ইলহান দৌড়াতে দৌড়াতে পেছনে তাকাল। নূরাইসার মুখে হাসি দেখে সে চেঁচিয়ে উঠল—

-"তুই আজ ঘরে আয়, নূরাইসা! তোর একদিন কি আমার যত দিন লাগে!"

নাজনীন বেগমের জুতোর বৃষ্টিতে শেষমেশ তিন ভাই সদর দরজার বাইরে এসে শ্বাস নিল একসাথে।নাজনীন বেগম দরজায় এসে দাঁড়ালেন, হালকা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,

-"যতসব দুষ্টু শয়তান... তিনজনেই একেকটা বাদর!"

.

বিহান ধীর পায়ে, ভারাক্রান্ত মনে দেওয়ান বাড়ির গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকল। বিকেলের নিস্তব্ধ আলোয় চারদিক যেন অচেনা লাগছিল, গার্ডেনের নরম ঘাসে তার পায়ের আওয়াজ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল। সদর দরজার কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ চমকে গেল, রুহান, তানভীর আর ইলহান তিনজনই দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে উঁকি দিচ্ছে। বিহানের ভ্রূ কুঁচকে গেল, চোখে ফুটে উঠল কৌতূহল আর সন্দেহ। স্বরটা ভারী করে জিজ্ঞেস করল—

-"নিজের বাড়িতে উঁকি দিচ্ছিস কেনো তোরা?"

তিনজনই চমকে উঠল। যেন চোর ধরা পড়েছে! মুহূর্তেই পিছন ফিরে তাকাল তারা, আর বিহানকে দেখে বুকে থুতু মেরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ইলহান চিবিয়ে চিবিয়ে বলল—

-"এইভাবে কেউ আসে? ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি!"

বিহান ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে জিজ্ঞেস করল—

-"কেনো? কি হয়েছে এমন?"

রুহান বিরক্ত গলায় গজরাল—

-"দেওয়ান বাড়ির দেওয়ানিরা আহত হয়েছে দেখে, আমাদের তিনজনকে জুতো পেটা করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে নাজনীন বেগম!"

বিহান কপাল চাপড়ে হেসে ফেলল, কিন্তু হাসির আড়ালে মিশে ছিল ক্ষোভ।

-"আমাকেও মা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। ধুর! নুহা ছাড়া কেউ আঘাত পায়নি। আর আমরা এখানে মরতে মরতে বেঁচেছি। তাও আমাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। বাড়িতেও আমাদের মূল্য নেই ভাই! চল, সবাই বনবাসে যাই আজই!"

তানভীর সঙ্গে সঙ্গেই গম্ভীর মুখে বলল—

-"হ্যাঁ, চলো! জীবনটাই বদনা হয়ে গেছে!"

রুহান হাত তুলে থামিয়ে দিল দুজনকে—

-"আরে দাড়া আগে খেয়ে নিই!"

বিহান ভ্রূ উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল—

-"কে দেবে তোকে খাবার?"

ইলহান ঠোঁটে এক চতুর হাসি টেনে মৃদু স্বরে উত্তর দিল—

-"আমার শাশুড়ি!"

বলতে বলতেই ইলিনা বেগম দৌড়ে এসে হাজির হলেন। মুখে অস্থিরতা, চোখে মমতা। ছেলেদের গায়ে হাত বুলিয়ে আদরে ভরিয়ে ভেতরে নিয়ে গেলেন তিনি। সবাইকে বসিয়ে দিলেন ড্রইংরুমের বড় সোফাটায়। তারপর নিজেই দৌড়ে রান্নাঘরে গেলেন, হাতভর্তি গরম খাবার নিয়ে ফিরে এলেন যেন এক পরম মমতাময়ী মা। টেবিলে থালা সাজিয়ে তিন ছেলের মাঝে বসলেন। পরম যত্নে একে একে মুখে খাবার তুলে দিতে লাগলেন। কণ্ঠে স্নেহের কোমল সুর—

-"আপার ওপর রাগ করিস না তোরা। তোরা তো জানিস, আপা মেয়েদের কত পছন্দ করে। যখন ইলু হবে, আপা ভেবেছিল মেয়ে হবে, কী খুশিই না ছিল তখন! কিন্তু হলো ইলু। আপা নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে তোদের। তবে মেয়েদের প্রতি তার আলাদা টান আছে। মেয়েদের কিছু হলে তার দুনিয়া দুলে উঠে। মা’কে ভুল বুঝিস না সোনা বাচ্চারা!"

রুহান মুচকি হেসে আলুর পরোটা মুখে পুরে বলল—

-"ওইসব আমি কিছু মনে করি না। জুতো পেটা তো আমাদের জন্মগত অধিকার! জন্মের পর থেকেই খাচ্ছি!"

কথাটা হেসে বললেও, ইলিনা বেগমের মুখের রঙ ম্লান হয়ে গেল। চোখে চিকচিক করছে জল। রুহান খাওয়া থামিয়ে তাকাল তার দিকে, তারপর হঠাৎ এগিয়ে এসে তার গলা জড়িয়ে ধরল।

-"এক মা মারে, বাকি দুই মা সেই আঘাতে মলম লাগায়। যেই মা মারে, সেই মা-ই রাতে এসে মাথার কাছে বসে কান্না করে। তিন মায়ের ভালোবাসা পাওয়া সন্তান আমরা। আমাদের কিসের কষ্ট? মা যেমন মেয়ে বাচ্চা ভালোবাসে, তুমিও তো ছেলে বাচ্চা ভালোবাসো, ছোট মা! তাই মা ইসাদের আদর বেশি করলেও আমাদের হিংসে হয় না, কারণ তুমিও তো আমাদের ইসাদের চেয়ে বেশি আদর কর!"

ছেলের কথায় ইলিনা বেগমের চোখ বেয়ে নেমে এলো দু’ফোঁটা আনন্দাশ্রু। মুখে টেনে নিলেন মমতার হাসি, তারপর এক টানে তিন ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।বিহান একটু দূরে বসে ছিল, চুপচাপ, নরম আলোয় মুখটা শান্ত। ইলিনা বেগম চোখের ইশারায় তাকেও কাছে ডাকলেন। মুহূর্তেই চার ছেলে, এক মায়ের কোলে মিলেমিশে একাকার।

সেই দৃশ্যটা যেন স্বর্গীয়, একফালি ভালোবাসার আশ্রয়। ইলিনা বেগম একে একে সবার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন। এর মাঝেই কত রঙ্গ, কত হাসাহাসি, বিহান ইলহানের থালা থেকে লুচি টেনে নিচ্ছে, তানভীর রুহানের পরোটা কেড়ে নিচ্ছে। কেউ ঠাট্টা করছে, কেউ ঠেলাঠেলি। কে আগে খাবে, সেই নিয়ে চলছে প্রতিযোগিতা। হাসির ফোয়ারা ছুটে গেল দেওয়ান বাড়ির আঙিনায়, দুঃখ ভুলিয়ে, ক্লান্তি মুছে, এক দুপুরে যেন চারটি হৃদয় আবার এক মায়ের ভালোবাসায় গলে গেল।

দূর থেকে নাজনীন বেগম ও তানিয়া বেগম নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন, চোখে টলমল অশ্রু, মুখে প্রশান্ত এক হাসি। সামনের দৃশ্যটা যেন তাদের বুকের ভিতর গভীর কোথাও ছুঁয়ে যাচ্ছে। ড্রয়িংরুমের ভেতর চারটি ছেলে হাসছে, খুনশুটি করছে, মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে খাচ্ছে। সেই দৃশ্য দেখে দুজনের চোখেই জল টলমল করে উঠল। যতই রাগারাগি করুক, যতই ধমক দিক, মায়ের হৃদয় তো রক্তে লেখা একেই কথায়, ছেলের এক ফোঁটা কষ্ট মানেই মায়ের শত আঘাতের যন্ত্রণা।

নাজনীন বেগম নিঃশ্বাস ফেললেন বললেন না কিছু, তবু মুখের অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছিল, তিনি বুক ভরে এই দৃশ্যটা উপভোগ করছেন। তানিয়া বেগম পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ তাকিয়ে ছিলেন কিছুক্ষণ, তারপর বড় ভাবির দিকে ফিরলেন। চোখের কোণে অশ্রু, কিন্তু ঠোঁটে হালকা এক উজ্জ্বল হাসি। তিনি এগিয়ে এসে ভাবীকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলেন। কণ্ঠটা কেঁপে উঠল মমতায়—

-"আমার ভাইদের ভাগ্য সত্যিই অনেক ভালো, ভাবি। তোমার আর ছোট ভাবির মতো জীবনসঙ্গী পেয়ে ওরা আশীর্বাদ পেয়েছে। আর আমাদেরও ভাগ্য যে এমন সন্তান পেয়েছি, যাদের হাসিতে পুরো বাড়ি ভরে ওঠে।"

নাজনীন বেগম চোখ মুছে হেসে ফেললেন—

-"তোমার মতো ননদ-কাম-বোন পাওয়াও কম ভাগ্যের কথা নয়, নোনোদিনী রায়বাঘিনী!"

তানিয়া হেসে উঠল, কিন্তু চোখের জল থামাল না কেউই। হাসি আর কান্না মিলেমিশে তৈরি করল এক স্নিগ্ধ আবেশ, একটা দৃশ্য, যেখানে ভালোবাসা নীরবে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।

দূরে দাঁড়িয়ে ইকবাল দেওয়ান, নাহিদ দেওয়ান, দাদু-দাদী, নূরাইসা, আফরিন আর নুহা চুপচাপ তাকিয়ে আছে। তারা দেখছে, নাজনীন ও তানিয়া বেগমের চোখে মাতৃত্বের কোমলতা, আর ঘরের ভেতর রসিকতায় ভরা ইলহান-রুহানদের পাগলামি। এক মুহূর্তের জন্য দেওয়ান বাড়ির সব দ্বন্দ্ব, অভিযোগ, ক্ষোভ যেন মিলিয়ে গেল। রইল শুধু, ভালোবাসার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

.

নূরাইসার মুখে এখনো একফোঁটা মৃদু হাসি লেগে আছে। নুহাকে ওষুধ দিয়ে মাত্রই নিজের ঘরে ফিরেছে সে। সকালের সেই তীব্র তাণ্ডবের পর দুপুরের খাবার টেবিলে অদ্ভুত শান্ত এক পরিবেশ নেমে এসেছিল। সবাই এখন যার যার ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে। সকাল থেকে নিজের রুমে ফেরার সুযোগই হয়নি নূরাইসার। ভাবল, এবার নিশ্চিন্তে একটু লম্বা ঘুম দিবে। গতরাতেও চোখে ঘুম ছিল না। এইসব ভাবতে ভাবতেই দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে।

ঠিক সেই মুহূর্তে, ইলহান যেন ওত পেতে বসেছিল।

নূরাইসা ঢুকতেই দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল ঠাস শব্দে। চমকে উঠে পেছনে তাকাতেই চোখে পড়ল ইলহানের ঠোঁটে খেলা করা এক বাকা, বিদ্রূপভরা হাসি। মুহূর্তেই নূরাইসার মনে ভেসে উঠল সকালের ঘটনার প্রতিটি দৃশ্য। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল তার।

ইলহান এক পা করে সামনে এগিয়ে আসে, আর নূরাইসা দু’পা করে পেছায়। ঘরের নিস্তব্ধতায় কেবলই শোনা যায় দু’জনের নিঃশ্বাসের ভারী শব্দ। ইলহানের গলা নিচু, অথচ তাতে এমন এক হুমকি মিশে আছে যা কানে কাঁপন ধরায়—

-"স্বামী অভুক্ত, আর তুই কী সুন্দর আয়েশ করে খেয়ে নিলি, জান?"

নূরাইসার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, মুখে অসহায় এক সুর—

-"না... মানে আমি তো খেতে চাইনি। বড়মা জোর করে খাইয়েছেন..."

ইলহান আরও এক পা এগিয়ে আসে। চোখে অদ্ভুত তেজ। ঠোঁটে অমায়িকতার বদলে ঝুলছে হুমকির ছায়া।

-"আর কী যেন বলছিলি সকালে? আমাকে কম মারতে? নইলে তোর ওপরই রাগ ঝারবো আমি?"

নূরাইসা আমতা আমতা করে পেছোয়। গলার স্বর এখন প্রায় ফিসফিস—

-"কই না তো... আমি কিছু বলিনি... আপনি ভুল শুনেছেন..."

ইলহান ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার চোখে এক অদ্ভুত নীরব আগ্রহ। নূরাইসা এক পা, দু’পা পিছু হটল, কিন্তু হঠাৎই ভারসাম্য হারিয়ে বিছানায় দপাস করে পড়ে গেল। মুহূর্তেই ইলহান ঝুঁকে পড়ল তার ওপর, শরীরের অর্ধেক ভার ছেড়ে দিলো তার ওপর। ভারে নূরাইসার মুখমণ্ডল কুঁচকে গেল, শ্বাস হালকা কেঁপে উঠল। ইলহান ধীরে নূরাইসার কানের পাশে এসে পড়ে যাওয়া চুলগুলো গুঁজে দিতে দিতে নরম কণ্ঠে বলল—

-"ছেলে বাচ্চা চাস, নাকি মেয়ে বাচ্চা?"

অপ্রস্তুত নূরাইসা তড়াক করে চোখ মেলে তাকাল। বিস্ময় মেশা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—

-"মানে?"

উত্তর না দিয়ে ইলহান নূরাইসার গ্রীবায় মুখ গুঁজে দিল। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুমুতে ভরিয়ে তুলল তার কোমল ত্বক। কেঁপে উঠল নূরাইসার সমগ্র সত্তা, বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন কান পর্যন্ত পৌঁছাল। শরীর বিক্ষিপ্ত হয়ে এলো, মন কাঁপল অপরিচিত আবেশে। আজকের ইলহান যেন অন্যরকম, না কোনো উগ্রতা, না কোনো জোর, না কোনো দাবি। সে যেন নূরাইসাকে পেতে চাইছে গভীর, শান্ত, নিঃশব্দ ভালোবাসায়। নূরাইসার কণ্ঠলতায় মুখ গুঁজে রেখে ইলহান ফিসফিস করে বলল—

-"চট্টগ্রাম যেতে হবে আমাকে। মিশনের পরবর্তী কাজ সেখান থেকেই শুরু হবে। কবে ফিরব জানি না।যাওয়ার আগে তোকে কিছু দিয়ে যেতে চাই, আমার অংশ, আমার অস্তিত্ব।"

কথাগুলো শুনে নূরাইসা কেঁপে উঠল। লজ্জায় চোখ বুজে ফেলল সে। মুহূর্তেই তার ফর্সা মুখশ্রী লাল হয়ে উঠল, কান যেন আগুনে পুড়ছে। ইলহানের অনবরত স্পর্শে দিশেহারা নূরাইসা কোনো কথা খুঁজে পেল না, বলার শক্তিও যেন হারিয়ে ফেলল। ইলহান মুখ তুলে তাকাল তার দিকে। চোখে এক অদ্ভুত কাতরতা নিয়ে বলল—

-"আপনার কাছে নিজেকে ধরে রাখা বড় কষ্টের, ব্লাডমুন। লজ্জায় লাল হয়ে আসা আপনার মুখ, আমার স্পর্শে কেঁপে ওঠা আপনার এই শরীর, সবকিছুই আমায় বেসামাল করে তোলে।"

বলতে বলতেই নিমেষে নূরাইসার কপোলদ্বয়ে বলিষ্ঠ হাতদ্বারা আবদ্ধ করে নিল। কেঁপে ওঠল নূরাইসার কোমল ঠোঁটজোড়া। সে কাঁপা দৃশ্য দীর্ঘসময় নিয়ে দেখার ধৈর্য্য হলো না ইলহানের। নিজের পুরু ওষ্ঠাধর ফাঁক করে সন্তর্পণে নরম অধর আবৃত করে নিল। এঁটে দিল হৃদয়স্পর্শী উত্তপ্ত গাঢ় চুম্বন। উষ্ণত্ব ওষ্ঠাধর স্পর্শে কাতর নূরাইসা।ইলহানের ওষ্ঠ চুম্বন ক্রমান্বয়ে গাঢ়ত্বে পরিণত হতেই তার হাতজোড়া বেসামাল হয়ে খামচে ধরল ইলহানের বলিষ্ঠ পৃষ্ঠদেশ। ইলহান কয়েক পল পরেই সহসা ছেড়ে দিলো আঁকড়ে রাখা অধর । নূরাইসার হৃৎস্পন্দনের প্রবল বেগে মাথা ঝিমিয়ে ওঠল।ইলহান এক পলক তাকিয়ে দেখল, নূরাইসার ব্যগ্র দৃশ্য। ফর্সা মুখটা ব্লাড মুনের মতো রক্তিম হয়ে আছে।বদ্ধ চোখ বেয়ে নোনা পানির বর্ষণে সিক্ত করে তুলছে গালদুটো। সন্তপর্ণে চোখ বুজে এক ঢোক গিলে নিলো ইলহান। কয়েক পল ঘনঘন নিঃশ্বাস ছেড়ে আবারও তাকাল। তারপর ভারী নিঃশ্বাস ছেড়ে আবারও তাকাল নূরাইসার দিকে। শান্ত অথচ গভীর কণ্ঠে বলল—

-"আই ওয়ান্ট টু টেস্ট ইউ, জান... আই ওয়ান্ট টু ব্রিদ ইন ইউর সেন্‌ট... আই ওয়ান্ট টু টেস্ট এভরি বিট অফ ইউ, মাই ব্লাডমুন... মে আই, জান? লেট মি গেট লস্ট ইন ইউ ফর আ হুইল... জাস্ট ওয়ান ব্রিদ, ওয়ান টাচ, অ্যান্ড আই'ল বিলং টু ইউ ফরএভার..."

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প