গাড়ির ভেতর পিনপতন নীরবতা। কেবল ইঞ্জিনের ক্ষীণ গুঞ্জন আর রাতের বাতাসের ফিসফিস শব্দ।
ইলহান স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে ড্রাইভ করছে, কিন্তু মন তার অন্য কোথাও। চিন্তিত বদনে বারবার চোখ ফেরাচ্ছে পাশের আসনে বসে থাকা নূরাইসার দিকে।নূরাইসা নির্বাক। মুখে একফোঁটা শব্দ নেই। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে নি সে, বরং অনেকক্ষণ লুকিয়ে ছিল ওয়াশরুমে। রাতের অন্ধকারে একা বেরোনোর সাহস হয়নি তার। ইলহান বহুক্ষণ ডাকাডাকি করার পর অবশেষে বেরিয়ে আসে সে, কিন্তু ইলহানের হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও কোনো কথা আদায় করতে পারেনি।
পেছনের সিটে বসে আছে আফরিন, রুহান, তানভীর আর নুহা। অদ্ভুত ব্যাপার, সবচেয়ে চঞ্চল নুহা আজ অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ। রুহান, তানভীর আর আফরিন একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু কেউ কোনো শব্দ উচ্চারণ করছে না। গাড়ির ভেতর নেমে এসেছে এমন এক ভারী নীরবতা, যেন কোনো অদৃশ্য ঝড় বয়ে যাচ্ছে সবার অন্তরে।
দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালানোর পর দেওয়ান বাড়ির সামনে এসে থামলো সেই নীরব গাড়ি। এক এক করে সবাই নামলো, কেউ কিছু বলল না। আফরিনের ইচ্ছে ছিল নুহাকে জিজ্ঞাসা করবে কিছু, কিন্তু তার আগেই নুহা তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। দরজার আওয়াজে ঘুমন্ত রাতও যেন চমকে উঠলো। আফরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো।
নূরাইসা নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। ইলহান তখন ফোনে ব্যস্ত ছিল। বারান্দা থেকে ঘরে ফিরে দেখে, নূরাইসা ইতিমধ্যে পিঠ ফিরিয়ে শুয়ে আছে। চুপচাপ। নিঃশব্দে। ইলহান লম্বা লম্বা পা ফেলে ফ্রেশ হতে চলে যায়। ফিরে এসে তার পাশে শুয়ে পড়ে।বারবার তাকায়, তার নূরেজান এত নীরব কেন? কী হয়েছে তার? অসংখ্য প্রশ্ন জেগে ওঠে মনে, কিন্তু কোনো উত্তর নেই। ইলহান অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয়, আজ আর কিছু জিজ্ঞাসা করবে না। যা বলার, সে নিজেই বলুক, সময় মতো।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে আছে। দুজনেই শুয়ে আছে, কিন্তু কারো চোখে ঘুম নেই। রাত অনেক গভীর। চাঁদের আলো জানালা পেরিয়ে এসে পড়ছে ঘরের মেঝেতে।ইলহান মাথার ওপর ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে, চিন্তায় ডুবে। ঠিক তখনই, নূরাইসার মৃদু কণ্ঠ ভেসে এলো নিঃশব্দ রাত ভেদ করে, একটি বাক্য, যা ঘরের স্থির বাতাসকে হঠাৎ কাঁপিয়ে দিলো—
-"আমি কি আপনার বউ হওয়ার যোগ্য নই?"
অচমকা প্রশ্নটা বাতাস চিরে এলো, ইলহান চমকে উঠলো। দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকালো নূরাইসার দিকে! নূরাইসা ও ঘুরে তাকিয়ে আছে ইলহানের দিকেই। ইলহান ধীরে ধীরে কাত হয়ে শুয়ে পড়লো, মুখোমুখি হলো নূরাইসার। রুক্ষ অথচ গভীর পুরুষালি কণ্ঠে বলল—
-"আমি বলেছি এই কথা কখনও?"
নূরাইসা কোনো উত্তর দিলো না। শুধু সোজা হয়ে শুয়ে পড়লো। ছাদের দিকে তাকিয়ে, নিঃশব্দে ফিসফিস করে বলল—
-"সব কথা বলতে হয় না। আমি খুব সাধারণ দেখতে, মর্ডান নই। অনেক ভীতু, সবকিছুতেই আমার ভয়।আপনি একজন যোদ্ধা, জীবনে অনেক লড়াই করেছেন। আমি তো ওসব পারবো না। আপনার একজন সাহসী মেয়ে বিয়ে করা উচিৎ ছিল... যে আমার চেয়ে অনেক গুণ বেশি সুন্দর, সাহসী।"
ইলহান থমকে গেলো কিছুক্ষণ। তারপর কণ্ঠে হালকা কঠোরতা, চোখে তীব্র দীপ্তি—
-"আরিবাকে বিয়ে করা উচিৎ ছিল আমার, তাই তো?"
নূরাইসা হঠাৎ চমকে উঠলো। নিঃশ্বাস আটকে গেল তার। ইলহান তার সেই ভীত দৃষ্টির গভীরে তাকিয়ে হালকা হাসল, একটা স্নিগ্ধ, অথচ প্রগাঢ় হাসি।
-"তোর জন্ম হয়েছে আমার জন্য, ব্লাডমুন। তুই ভীতু? আমি সাহসী বানিয়ে নেবো! আমি থাকতে তোর কেনো লড়াই করতে হবে? সমস্ত বিপদ থেকে তোকে আড়াল করবো আমি... যতদিন বেঁচে আছি।"
ইলহান ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। নূরাইসার বিস্মিত মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল সে। নূরাইসার চোখের পাতা কেঁপে উঠল, হৃদপিণ্ড যেন দ্রুত বেগে ছুটে চলেছে কোনো অদৃশ্য আতঙ্কে, কোনো অচেনা স্নিগ্ধতায়। তার মনের ভেতর তখন ঢেউ তুলছে অগণিত সংশয়, নিজেকে নিয়ে, নিজের যোগ্যতা, নিজের রূপ নিয়ে, সব কিছু এখন তার কাছে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন।
ইলহান বুঝল। তার চোখে ভাসা সেই অসহায়তার প্রতিটি রেখা সে পড়ে ফেলল নিঃশব্দে। মোহনীয় অথচ দৃঢ় কণ্ঠে ইলহান বলল—
-"চাদের গায়ে দাগ আছে জানিস? তাও তার সৌন্দর্য এক বিন্দু কমে নি, আর না তার উজ্জ্বলতা। তুই অনন্য, তোর সৌন্দর্যে কোনো দাগ নেই। আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে তুই। নিঃসন্দেহে আরিবা সুন্দর, কিন্তু তার চেয়েও বেশি সুন্দর আমার ব্লাডমুন। তুই সুন্দর এই নূহান ইলহান দেওয়ানকে নিজের রূপে বিমোহিত করার মতো সুন্দর। তোর সৌন্দর্য আমাকে নেশায় বুঁদ করে ফেলে... নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি আমি।
মানুষের যোগ্যতা বিচার করে কে? তুই যদি আমার যোগ্য না হতি, তাহলে আল্লাহ তোকে আমার জন্য সৃষ্টি করতেন না। তোর সৃষ্টি আমার বুকের পাঁজরের হাড় দিয়ে। আমার জন্য তোর জন্ম, তোকে আমার জন্য বানানো হয়েছে।"
নূরাইসা বাকরুদ্ধ। তার কণ্ঠে কোনো শব্দ নেই, শুধু চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অনিয়ন্ত্রিত অশ্রু। যাকে সে সারাজীবন ভয় পেয়েছিল, যার সামনে নিজেকে অযোগ্য মনে করত, সেই মানুষটাই আজ নিখুঁতভাবে বুঝে ফেলেছে তার সমস্ত অনিশ্চয়তা, প্রকাশের আগেই দিয়ে দিয়েছে সব প্রশ্নের উত্তর।
ইলহান ধীরে নিঃশব্দে এগিয়ে এসে মুছে দিলো তার চোখের জল। তারপর নূরাইসার বক্ষ বিভাজনে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল—
-"তোকে কাঁদানোর হোক শুধু আমার। তুই কাঁদবি শুধু আমার কারণে, আর আমার জন্য।"
রাত নিস্তব্ধ। বাতাস থমকে আছে। তাদের নিঃশ্বাসের শব্দই যেন সাক্ষী, ভালোবাসার সবচেয়ে নির্মম অথচ পবিত্র প্রকাশের।
.
-
-"মামা, এই লিস্টে যতগুলো জিনিস লেখা আছে, সবগুলো ১০ গ্রাম করে কম দেবেন!"
দোকানদার চোখ কুঁচকে তাকাল, মুখে বিরক্তি জমে উঠলো।
-"এমনে মাপ হয় না মিয়া! হয় কেজি নেন, নাইলে আধা কেজি নেন। ১০ গ্রাম কম মাইপা দিমু কেমনে?"
রুহানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কণ্ঠে স্পষ্ট দৃঢ়তা—
-"ওই ১০ গ্রামের টাকা কি আপনি দিবেন?"
দোকানী হতভম্ব।
-"আমি দিমু কেন? আপনে দিবেন!"
রুহান নির্বিকার মুখে বলল—
-"আমার কাছে টাকা নাই দেইখা তো বলতাছি ১০ গ্রাম কম দিতে!"
দোকানী একরকম বিরক্ত-হাসি মিশিয়ে রুহানের হাতে থাকা লিস্টটা টেনে নিল। বিড়বিড় করতে করতে বাজার মেপে দিল সব। রুহান খুশিতে বাকি টাকা মানিব্যাগে গুঁজে নিলো, খুশিতে বাকবাকুম করতে করতে বাড়ি ফিরে গেলো।
বাড়িতে ঢুকেই ব্যাগগুলো ধরিয়ে দিল নাজনীন বেগমের হাতে। তিনি কোনো কথা না বলে বাজার নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলেন। তার এক অদ্ভুত অভ্যাস,বাজার যতবারই আনুক না কেন, প্রতিটি জিনিস তিনি দ্বিতীয়বার মাপেন।
রান্নাঘরের নিস্তব্ধতায় হঠাৎ মাপযন্ত্রের শব্দ, আর সঙ্গে সঙ্গে মুখের ভাঁজ গভীর থেকে গভীরতর। প্রতিটা জিনিসেই ১০ গ্রাম কম! কিছুক্ষণ পরেই নাজনীন বেগম ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলেন। রুহান তখন সোফায় বসে দাদা-দাদীর সঙ্গে গল্পে মেতে আছে। নাজনীন বেগম নিরবে এগিয়ে এসে রুহানের কান টেনে ধীরে দার করালেন—
-"এই ছেলে! তুই বাজারে ১০ গ্রাম কম করে আনছিস কেন রে?"
রুহান কানে টান খেয়ে যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে উঠল—
-"আহ্ মিসেস দেওয়ান! লাগছে, ছাড়ো না!"
নাজনীন বেগম মুহূর্তেই রেগে গেলেন।
-"চুপ বেয়াদব ছেলে! মাকে মিসেস দেওয়ান বলে ডাকছিস? বল, ১০ গ্রাম কম কেনো সব কিছুতে?"
রুহান চোখ-মুখ কুঁচকে ব্যথা চেপে বলল—
-"আমি কিভাবে জানবো কম কেনো!"
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে আফরিন, তানভীর ও নূরাইসা। আফরিন ঠোঁটে ব্যাঙ্গাত্মক হাসি নিয়ে বলল—
-"মামনি, তোমার ছেলে হলো বাংলা সিনেমার কাজের লোক!"
নাজনীন বেগম ছেলের কান ছেড়ে দিলেন। কপাল কুঁচকে তাকালেন আফরিনের দিকে। রুহান রাগে ফেটে পড়ল—
-"রিন পাউডারের বাচ্চা, একদম চুপ! কথা বলবি না!"
নাজনীন বেগম ছেলের মাথায় হালকা গাট্টা মেরে বললেন—
-"তুই চুপ থাক! বল তো, আফরিন, কী হয়েছে?"
আফরিন এগিয়ে এসে সোফার সামনে দাঁড়াল। নূরাইসা ও তানভীরও পাশে এসে দাঁড়ালো। আফরিন ঠোঁটে এক চিলতে হাসি টেনে বলল—
-"বাজারের টাকা মারার ধান্দা ওর। ধরা না খেতে এই বুদ্ধি এঁটেছে। অথচ প্রথম দিনেই ধরা খেল!"
তানভীর ফিক করে হেসে উঠল—
-"ভাই, কিভাবে ধরা পরলিলি?"
নূরাইসা মুখ টিপে হেসে বলল—
-"ভাইয়া তো জানে না, বড় মা সব জিনিস বাজার থেকে এনে আবারও নিজে মাপে।"
রুহান ঠোঁট কামড়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। চোখ নিচু, মুখে অপরাধীর ভাব। হঠাৎ গুটি গুটি পায়ে পেছনের দিকে সরে যাচ্ছে, ঠিক তখনই খপ! করে নাজনীন বেগম তার টিশার্টের কলার চেপে ধরলেন। পলকের মধ্যে হাতে উঠে এলো পায়ের জুতো! দুম করে বসিয়ে দিলেন পিঠে এক ঘা—
-"এই শিক্ষা দিয়েছি তোকে? এখন চুরি, মিথ্যে বলা শিখেছিস?"
রুহান ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠল, তারপর কেমন করে যেন মায়ের হাত ছাড়িয়ে ভোঁ দৌড়! ড্রয়িংরুম কাঁপিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ছুটে গেল সে। নাজনীন বেগম পিছনেই দৌড় দিলেন জুতো হাতে, মুখে ধমকের ঝড়—
-"আজ তোকে আমি ছাড়ব না রে!"
তানভীর, আফরিন, আর নূরাইসা তখন হেসে কুঁকড়ে পড়েছে! দাদা-দাদীও হাসি চেপে রাখতে পারছেন না, ড্রয়িংরুম জুড়ে হাসির রোল উঠেছে, আর নাজনীন বেগমের সেই কিংবদন্তি 'জুতো অভিযান' সেদিনও হয়ে উঠল পরিবারের এক অমর কৌতুককাহিনি।
.
নূরাইসা বসেছিল বন্ধুদের সঙ্গে ভার্সিটির বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠে। বিকেলের কোমল আলো পড়েছে চারপাশে, হালকা বাতাসে ওড়ছে ওর চুলের গোছা। মুখটা তার ক্লান্ত, তবু চোখে অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা। আজ সে সব খুলে বলেছে, বিহানের জন্মদিনে যা ঘটেছে। সব শুনে ফারাহ্ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর গভীর দৃষ্টিতে নূরাইসার মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
-"তুই কি... ইলহান ভাইয়াকে ভালোবাসিস?"
নূরাইসা চমকে উঠল। ঠোঁট কাঁপল তার, চোখে এক মুহূর্তে ভেসে উঠল লজ্জা, কষ্ট আর স্বীকারোক্তি, নিঃশব্দে মাথা নাড়ল সে। ফারাহ্ একটু ঝুঁকে তার দিকে এগিয়ে এলো। দৃঢ় গলায় বলল—
-"যেহেতু তুই ভালোবাসিস, তবে এই ভালোবাসা ধরে রাখার জন্য তোকে লড়তে হবে, নূরাইসা। শক্ত হতে হবে। কেউ যদি তোকে অপমান করে চলে যায়, তুই চুপ করে বসে থাকবি? তোর চোখের সামনে কেউ যদি ইলহান ভাইকে কেড়ে নিতে চায়, তখনও কি চুপ করে দেখবি? এইভাবে তো চলবে না। তোর ভালোবাসার মর্যাদা রাখতে হলে তোকে আগুন হতে হবে!"
নূরাইসা মাথা নিচু করে বসে রইল। চোখের কোণে জলের রেখা। কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু শব্দ বেরোল না। পাশে বসা আফরিন তখন বলল—
-"দেখ, তুই যেমন আছিস, তেমনি ঠিক আছিস। আমাদের দেওয়ান বাড়ির মেয়েরা মাথা নিচু করে বাঁচে না। ভাইয়া এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না বটে, কিন্তু তোর নিজের অবস্থান তোকেই তৈরি করতে হবে। আমরা বা ভাইয়া সবসময় তোর পাশে থাকব না। একসময় তোকেই নিজের লড়াই লড়তে হবে। আর কেউ যদি তোর চোখের সামনে এসে তোর স্বামীর জন্য নিজেকে 'বেটার অপশন' বলে দাবি করে, সেটা সহ্য করা মানে নিজেকে হেরে যেতে দেওয়া। তোর তখনই জবাব দেওয়া উচিত ছিল, ইসা।"
মৃদু স্বরে নূরাইসা বলল—
-"জীবনে প্রথমবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছি আমি। বুঝি না কীভাবে কী করব। আমার মাথা একদম কাজ করে না, আফরিন..."
আফরিন গম্ভীরভাবে বলল—
-"তোর ভালোবাসা, তোর স্বামী, তোর সংসার, এই তিনটার জন্য তুই সব করতে পারবি। কাউকে এক চুল ছাড়বি না। সেদিন যেমন নিজের অধিকার দেখিয়েছিলি, ঠিক সেইভাবেই। নরম মন ভালো, কিন্তু সময়ে ঢাল হতে জানতে হয়।"
চারপাশে তখন সূর্য ঢলে পড়ছে, মাঠে লালচে আভা পড়েছে। নূরাইসা নিরব, ভাবনায় হারিয়ে গেছে। তার চোখে ভেসে উঠছে ইলহানের মুখ, কানে বাজছে বন্ধুদের কথাগুলো। ভালোবাসা, মর্যাদা, আত্মসম্মান, এই তিন শব্দ যেন নতুন করে গেঁথে যাচ্ছে তার হৃদয়ে।বন্ধুরা হাসতে-খেলতে কথার স্রোতে ভেসে গেলেও, নূরাইসার ভেতরে তৈরি হচ্ছিল এক নীরব প্রতিজ্ঞা। সে আর আগের মতো থাকবে না। সে শিখবে, নিজেকে রক্ষা করতে, নিজের ভালোবাসাকে সম্মান দিতে, আর প্রয়োজনে আগুন হতে। প্রাণবন্ত আড্ডার ঠিক মাঝখানে, হঠাৎই পেছন থেকে ভেসে এলো এক মিষ্টি অথচ বিদ্রূপে মাখা কণ্ঠস্বর—
-"নিজে জবাব দিতে পারোনি বলে স্বামীকে দিয়ে জবাব পাঠালে?"
মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেলো চারপাশ। সকলেই একযোগে ঘুরে তাকালো পেছনের দিকে। পিছনে দাঁড়িয়ে আছে আরিবা। তার দুই গালে পাঁচ আঙুলের দাগ স্পষ্ট। ফর্সা গাল দুটো লালচে হয়ে উঠেছে, রক্ত যেন জমে আছে ত্বকের নিচে। বাতাসের ভেতরেও যেন একটা কাঁপন ছড়িয়ে পড়লো। সবাই একসাথে উঠে দাঁড়ালো। নূরাইসার মুখের রঙ পাল্টে গেলো। আরিবা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে থেমে দাঁড়ালো নূরাইসার সামনে। চোখে চোখ রেখে বলল—
-"সামান্য কয়টা কথা বলেছিলাম তোমায়। তাতেই তুমি স্বামীর কানে তুলে দিলে? এই তোমার সাহস? তোমার যোগ্যতা? নিজের খারাপ লাগার জবাব তুমি নিজে দিতে পারতে, আমায় যা খুশি বলতে পারতে। কিন্তু না, নিজের পক্ষে দাঁড়ানোর বদলে স্বামীকে ঢাল বানালে! অথচ বলে, পুরুষের সাফল্যের পেছনে থাকে নারী। কিন্তু তোমার বেলায় ঠিক উল্টো, নিজের দুর্বলতা ঢাকতে তুমি স্বামীকে ব্যবহার করো। আর আমি?"
আরিবা বুক সোজা করে দাঁড়ালো, ঠোঁটে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি।
-"আমি নিজের জন্য লড়তে পারি। নিজের মান রাখার জন্য আমাকে কারো প্রয়োজন হয় না। আর যদি কখনও ইলহানের বিপদ আসে, আমি মাঠে নেমে তার জন্য লড়বো, তাকে বাঁচাতে পারবো। কিন্তু তুমি? তুমি কি পারবে? তুমি তো এক মাইল দৌড়াতেও পারবে না! তাহলে আমি ভুল কী বলেছিলাম, যে জন্য আমাকে এই শাস্তি দিলে? দেখো নূরাইসা, এটাই তোমার বিচারের ফল!"
বলে নিজের গালে আঙুল ছুঁয়ে দেখালো সে দাগগুলো। চারদিক নিস্তব্ধ। বাতাস যেন জমে গেছে। কেউ কোনো কথা বলার সাহস পেলো না। ইলহান তো মেয়েদের গায়ে হাত তোলার মানুষ না। আরিবা সোজা হয়ে বলল—
-"ইলহান গতরাতে তার নারী বন্ধুকে ডেকে এনে আমাকে মার খাইয়েছে। এক-দুইটা নয়, নূরাইসার চোখ দিয়ে যতগুলো অশ্রুকণা ঝরেছে, ঠিক ততবার সে আমাকে আঘাত করেছে!"
নিঃশব্দে নেমে এলো বজ্রপাতের মতো স্তব্ধতা। কেউ নিঃশ্বাস ফেলতেও ভয় পাচ্ছে। আর ঠিক তখনই, মেঘ মুখ ফসকে বলে ফেলল—
-"কিরে ইসা, কত ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দিয়েছিলি? কয় ঘণ্টা কেঁদেছিলে? ইলহান ভাই তবে ফোঁটা গুনে গুনে শাস্তি দিলেন নাকি?"
নূরাইসা হতবিহ্বল অবস্থায় চোখ ম্লান করে বলল—
-"রেস্টুরেন্টে এক ঘণ্টা আর বাড়িতে দুই ঘণ্টা কেঁদেছিলাম।"
আফরিন অবাক কণ্ঠে, এখনও বিষ্ময়ের আবহ কাটাতে পারছে না—
-"কতগুলো থাপ্পড় খেয়েছেন আপু?"
আরিবা রাগান্বিত কণ্ঠে, গলায় জোর দিয়ে বলল—
-"৩,৬০০টা।"
ফারাহ্ চেঁচিয়ে বলল—
-"কি বলছেন? যে থাপ্পড় মেরেছিল, তার হাত ব্যথা করলো না?"
আরিবা নির্দ্বিধায় উত্তর দিলো—
-"মেয়েবন্ধু আর ছেলে বন্ধুর সব বউকে নিয়ে এসেছিল সে!"
কথাটি বলে আরিবা রাগান্বিত গজগজ করতে করতে উল্টো ঘুরে চলে গেল। তার অপমানে এরা আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে। আরিবা চলে যাওয়ার পর, কিছুক্ষণ পর স্তব্ধতা ভেঙে সবাই উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। কিন্তু নূরাইসা মলিন মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আফরিন তাকে দেখে মৃদু হাসি দিয়ে বলল—
-"আরে ভাই, হাসলে পাপ হবে না। উনি নিজের কৃতকর্মের শাস্তি পেয়েছেন।"
নূরাইসা অসহায় মুখ করে ফিসফিস করে বলল—
-"তাই বলে ৩,৬০০টা থাপ্পড়?"
ফারাহ্ পাশ থেকে বলল—
-"ভাই, মনকে শক্ত কর। এত ভালো মানুষ দুনিয়াতে টিকে থাকতে পারে না। উনি এটারই যোগ্য ছিলেন।”
নূরাইসার মন তবুও ব্যথিত হলো, আরিবার জন্য। অন্যরা হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠেছে। সবার মজা-হাসির মধ্যে নূরাইসা মাথা নীচু করে এগোচ্ছে। হঠাৎ, সে কারো সাথে ধাক্কা খায়। যার সাথে ধাক্কা লাগলো, তার হাতে থাকা সমস্ত বই মাটিতে ছিটকে পড়ে। নূরাইসা সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ে, যত দ্রুত সম্ভব বইগুলো তুলতে তুলতে বলে উঠে—
-"আমি খুবই দুঃখিত। আসলে আমি নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটছিলাম, তাই দেখতে পাইনি।"
লোকটি বইগুলো হাতেই ধরে, মৃদু কণ্ঠে উত্তর দিল—
-"ইটস ওকে, আমিও আপনাকে দেখি নি।"
নূরাইসার জীবনে এমন মধুর, গভীর আর কোমল কণ্ঠস্বর সে আগে কখনো শোনেনি। মনে হলো শব্দগুলো যেন সরাসরি হৃদয়ে ঢুকে, চেতনার কোণে কোণে নেমে এসেছে। স্বরে এক অদ্ভুত টান, যা একদিকে স্নিগ্ধ আর একদিকে শক্তিশালী, প্রতিটি শব্দে ভেসে আসে সাহস, সৌজন্য, আর কোমলতায় ভরা আত্মবিশ্বাস।
নূরাইসা চোখ উঠিয়ে দেখলো সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক সুদর্শন পুরুষ। চোখে চোখ পড়তেই মনে হলো পৃথিবীর সব রঙ একসাথে তার চোখে ভাসছে। বাদামি চোখ, সূর্যের আলোয় টা সোনালী রঙ ধারণ করেছে। একটিমাত্র দর্শনে মনকে মুগ্ধ করে। চোখে হাসির ঝলক, আর সেই হাসি পুরো মুখে ছড়িয়ে পড়েছে, ঠোঁটের উপর প্রসারিত কোমল হাসি। বাবরি চুল, হালকা উঁচু ঢেউয়ের মতো, ছড়িয়ে পড়েছে কপালে আর গাল বরাবর, যা তার পুরো মুখকেই আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। সৌন্দর্য তার প্রাকৃতিক, জায়গাজায়গায় ছড়ানো আলোর মতো, কোনো জোর নেই, অথচ দৃষ্টিকে বাধ্য করে দীর্ঘক্ষণ তাকাতে।ধবধবে ফর্সা, সূর্যের আলোতে হালকা দীপ্তিময়, যেন সোনালী রোদ আর হালকা দুধের মিশ্রণ। এমন উজ্জ্বলতা যে শুধু চোখই নয়, মনকেও আলোকিত করে।
নূরাইসা স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকলো। যেন মুহূর্তটি সময়ের ভিতর থেমে গেলো। এই পুরুষটির চোখও বাদামি, সে সেই রঙ চেনে। রোদে পড়লেই বাদামির ভিতর সোনার পলক জ্বলে ওঠে, যেন চোখের গভীরে কোথাও সূর্য এক ফোঁটা গলন্ত আগুন জমিয়ে রেখেছে। ধাতব উজ্জ্বলতার মতো এক ক্ষুদ্র দীপ্তি সেখানে টিম টিম করে নড়ে। এতটা সুশ্রী, এতটা প্রাণোচ্ছল চোখ, নূরাইসা জীবনে খুব কম দেখেছে। হ্যাঁ দেওয়ান বাড়ির প্রতিটি পুরুষের চোখ বাদামি। তবে ইলহান ও এই পুরুষের চোখে এক রকম মিল। যা দেওয়ান বাড়ির করো চোখে নেই।
তবু, ইলহানের চোখের সৌন্দর্য এই পুরুষের থেকেও এক ধাপ ঊর্ধ্বে। ইলহানের চোখে সোনালী রঙ শুধু আলোয় জন্ম নেয় না, তার ভেতর যেন এক অব্যক্ত গভীরতা, এক অস্পষ্ট দহন, এক নীরব কথা লুকিয়ে থাকে। সেটা যেন কোনো অতল সমুদ্রের স্রোত, যার নিচে পাথরের মতো ভারী অনুচ্চারিত ইতিহাস জমা আছে। তার চোখের ভেতর এক এমন প্রাণ আছে, এক এমন শক্ত সমাহিত আগুন আছে, যা দেখলে মনে হয় চোখ নয়, চোখের ভিতর সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে থাকা পৃথিবীর molten heart।
এই পুরুষটির চোখ সুন্দর। নির্দ্বিধায় সুন্দর। কিন্তু ইলহানের চোখ, সেটা সৌন্দর্যের আলাদা কোনো সংজ্ঞা দাবি করে। শব্দের মধ্যে যার যথার্থ অনুবাদই নেই।
নূরাইসাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, লোকটি ধীরে ধীরে মৃদু হাসি ছড়িয়ে বলল—
-"আর্সলান দেহরান আমার নাম। আর আপনার নামটি?"