সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ২১

🟢

।

-"কোথায় যাচ্ছেন আপনি?"

নূরাইসার কণ্ঠে আতঙ্ক মিশে আছে। প্রশ্নটা যেন নিঃশব্দ রাতের বুক চিরে বেরিয়ে আসে। চোখের কোণে জমে থাকা জল এবার গড়িয়ে পড়ে। নূরাইসা চায় ইলহানের সান্নিধ্য, চায় তার বুকের ভেতর আশ্রয় পেতে, কিন্তু এইভাবে নয়... এই হঠাৎ, ঝড়ের মতো ছুঁয়ে যাওয়া স্পর্শে নয়। আজকের রাতের ইলহানকে সে চেনে না। যে ইলহান তাকে একফোঁটা চোখের জল ফেলতে দেয় না, আজ সেই মানুষটা যেন অন্য কেউ, অচেনা, ক্ষতবিক্ষত, ভেতরে দগ্ধ এক আগুন।নূরাইসার বুকের ভেতর একটা আশঙ্কা দোলা দেয়। সে বুঝতে পারে, ইলহানের ভেতরে কিছু একটা ঘটেছে। সে সজ্ঞানে থাকলেও কখনওই নূরাইসাকে জোর করে না।সে অনুভব করেছে, ইলহান নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে সেই যন্ত্রণায়, সেই অদৃশ্য আকর্ষণে।

ইলহানের সেই আকুল কণ্ঠস্বর, সেই অসহায় অনুরোধ, নূরাইসার বুকে তীরের মতো বিধেছে। তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য তার নেই, ইচ্ছে তো নয়ই। তবু যখন সে ভয়ে শব্দ করে কেঁদে ফেলেছিল, ইলহান যেন হঠাৎ নিজেকে শাসন করল, তারপর নূরাইসাকে ছেড়ে উল্টো ঘুরে চলে যেতে লাগল। নূরাইসার বুক কেঁপে উঠল। তাই তো সে উক্ত প্রশ্নটি করেছে।

ইলহান তার ভয়ার্ত কন্ঠস্বর শুনে থামল। বাতাসে তখন নিস্তব্ধতা, জানালার বাইরে কুয়াশায় ঢাকা চাঁদের আলো মৃদু হয়ে ঘরে পড়ছে। তার কাঁধের রেখা কঠিন, নিঃশব্দ ঝড়ে জমে থাকা রাগ আর আত্মনিয়ন্ত্রণের ভারে ভারী। সে ঘুরে তাকায় না। শুধু স্থির দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ, যেন নিজের ভেতরের যুদ্ধ থামাতে চেষ্টা করছে। সজ্ঞানে সে নিজেকে বহু কষ্টে সামলেছে,

নূরাইসার কাছে যাওয়া থেকে নিজেকে আটকে রেখেছে অগণিতবার। কারণ সে জানে, নূরাইসা ভীতু, নরম, কাচের মতো ভঙ্গুর। সে চায় নূরাইসা তার ভয় কাটিয়ে নিজে থেকে তাকে আপন করুক, ভালোবাসুক নিজের ইচ্ছায়, কোনো ভয় ছাড়া। আর তাই, নূরাইসার প্রশ্নের জবাবে ইলহান কেবল মৃদু স্বরে বলল—

-"ড্রা গ দেওয়া হয়েছে আমাকে! নিজেকে শান্ত করা জরুরি এখন। নয়তো কোনো ভুল হয়ে যেতে পারে!"

নূরাইসা বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে রইলো ইলহানের দিকে। মুহূর্তের মধ্যেই ইলহান বাথরুমে ঢুকে দরজাটা জোরে বন্ধ করে দিল। ধাতব শব্দটা যেন বুকের ভেতর ঢুকে নূরাইসাকে কাঁপিয়ে দিলো। নিস্তব্ধ ঘরে সেই শব্দের প্রতিধ্বনি বাজতে লাগল, তার অন্তরের ভেতর পর্যন্ত। সে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। চোখ ভিজে উঠল অজান্তে। নিজের মনেই বলতে লাগল—

-"আমার স্বামীর যখন আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখন আমি ভয়ে গুটিয়ে গেলাম? সে তো একটু সন্নিধ্যই চেয়েছিল... তার হোক সেটা, আমারও হোক, ভালোবাসার প্রকাশ তো তা-ই ছিল। আমি কি তাকে বঞ্চিত করলাম?"

তার বুকের ভেতর হাহাকার জমে উঠলো।

-"আমার সঙ্গে কিছু হওয়া মানে সেটা ভুল কিছু হওয়া? তাহলে আরিবা আপু ভুল বলেনি? সত্যিই কি আমি ইলহানের যোগ্য নই?"

চোখের সামনে ইলহানের সেই মুখ, অসহায় আর ব্যথায় ভরা। ইলহানের সেই করুন সুরে করা অনুরোধ মনে পড়তেই বুকের ভেতর কাটা বিধলো।

-"যোগ্য হলে তো বুঝতাম কেন সে এমন করল। সে তো এমন মানুষ নয়! উল্টো আমিই কি না তাকে ভয় পেয়ে আরও যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দিলাম..."

নূরাইসা হঠাৎই দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরলো, পাগলের মতো নাড়াতে লাগলো। যেন নিজের ভেতরের সেই কান্না, অপরাধবোধ, বিভ্রান্তি ঝেড়ে ফেলতে চায়।দেয়াল ঘেঁষে মাটিতে ধপ করে বসে পড়লো। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে, বুকের ভেতর চলেছে যুদ্ধ, ভালোবাসা, অপরাধবোধ আর অক্ষমতার। মনে হলো, সে যেন নিজের অস্তিত্বকেই ক্ষমা চাইতে চাইছে, নিজের কাছেই। নূরাইসা ক্রদনরত কন্ঠে বিড়বিড় করতে লাগলো—

-" আমি তো পারতাম আপনার যন্ত্রণা কমাতে। কিন্তু না, আমি আপনাকে আরও কষ্টে ঠেলে দিলাম। আমি কেমন স্ত্রী! এত ভীতু হয়ে কিভাবে আমি সেই সৈনিকের যোগ্য হতে পারি, যার জীবনটাই যুদ্ধের প্রতীক?"

অন্যদিকে, বাথরুমের ভেতর নীরবে গলে যাচ্ছিল ইলহান। টবের পানিতে তিন ঘণ্টা শুয়ে থাকার পরও শান্তি মিলছিল না। শরীর জলে ডুবে থাকলেও তার আত্মা যেন আগুনে পুড়ছিল। অবশেষে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে নিজের মাথায় বর্ষা নামিয়ে দিল।একটানা দেড় ঘণ্টা, পানি পড়ছে, অথচ সে স্থির, নির্বাক। তার মুখের রেখায় অনুতাপ গাঢ় হয়ে উঠছে। মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল—

-"কি করে পারলাম আমি? আমি তো সৈনিক... যুদ্ধক্ষেত্রে শত আঘাত সহ্য করতে পারি, অথচ এই সামান্য যন্ত্রণা পারলাম না বহন করতে? এত অত্যাচার সহ্য করেছে আমার শরীর, প্রতিটি আঘাত চিহ্ন সাক্ষী সেই লড়াইয়ের। অথচ আজ, নিজের ড্রা গ প্রভাবিত অচেতনে, আমি একজন মেয়েকে, আমার স্ত্রীকে, অসম্মান করেছি!"

তার ঠোঁট কেঁপে উঠল, গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে গেল।

-"বৈধ অধিকার থাকলেই কি সবকিছু জোর করে নিতে হয়? সে তো আমার নয়নের শ্রদ্ধা, আমার গৌরব। আর তার সাথেই কি না আমি... আমি কিভাবে এই মুখ নিয়ে দাঁড়াব তার সামনে?"

শাওয়ারের পানির সঙ্গে মিলেমিশে গেল তার চোখের জলের ফোঁটা। তার মনে ভয়—

-"নূরাইসা যদি আমাকে ভুল বোঝে? যদি দূরে সরে যায়? আমি কি তবে তার ভয় হয়ে উঠেছি আবারও?"

বাইরে তখনও নিস্তব্ধতা। দরজার ওপাশে দুইটি হৃদয়, একে অপরের কাছে থেকেও অদৃশ্য দেয়ালে বন্দি।

নিজের ওপর প্রচণ্ড ক্ষোভে ইলহান হঠাৎ বাথরুমের দেয়ালে সজোরে এক ঘু ষি মেরে বসল। ঠাস্! মুহূর্তেই দেয়ালের টাইলস ফেটে গেল, তার মুঠো থেকেও র ক্ত ঝরতে লাগলো ফোঁটা ফোঁটা করে। সেই র ক্তের সঙ্গে গড়িয়ে পড়ছে তার ভিতরের ক্রোধ, লজ্জা আর অপরাধবোধ। শাওয়ারের নিচে পানি পড়ছে একটানা, ঝরঝর শব্দে মিশে আছে এক সৈনিকের আত্মসমর্পণের নীরব আর্তনাদ।

বাইরে বসে নূরাইসা সেই শব্দ শুনছে। হৃদয় কেমন কেঁপে উঠছে বারবার। "এতক্ষণ হয়ে গেল... এখনো বের হয় না কেন?" তার বুকের ভেতরটা হু হু করছে। এক অজানা আশঙ্কা গ লা চেপে ধরছে তাকে।

অবশেষে দরজা খুলে ইলহান বেরিয়ে এলো। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, চোখের নিচে ক্লান্তি, শরীরের ওপর এখনো টলটল করে পড়ে আছে পানির ফোঁটা। পরনে শুধু একটি তোয়ালে। নীরবে কাবার্ড খুলে সে কালো রঙের টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে নিলো। কোনো কথা না বলে পোশাক পরে নিল। হাতের র ক্ত শাওয়ারের পানিতে ধুয়ে গেলেও, তার ভিতরের ক্ষ ত যেন আরও গভীর হয়ে উঠল। তোয়ালেটা চেয়ারের ওপর রেখে ইলহান ধীরে ধীরে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। তার শরীর নিস্তব্ধ, নিঃশ্বাস ভারী। লজ্জা, অনুশোচনা, আত্মঘৃণায় সে আর নূরাইসার দিকে ফিরেও তাকাতে পারল না।

নূরাইসা ঝাপসা চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।

ইলহানের মুখের অভিব্যক্তি পড়তে পারছে না সে।ভাবছে, ইলহান হয়তো রেগে আছে, হয়তো তাকে ঘৃণা করছে, হয়তো আর কখনো তার সঙ্গে কথা বলবে না।অথচ সে বুঝতেই পারল না, ইলহান নিজের ভেতর এক ভয়াবহ যুদ্ধে লিপ্ত, নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে, নিজের হৃদয়ের বিরুদ্ধে।

নূরাইসার বুক ভারী হয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা বলতে হবে, কিছু একটা করতে হবে। তার ভেতরের কষ্টটা যেন শরীর ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চায়।কোনো চিন্তা না করেই, সে উঠে দাঁড়াল। বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। বিছানার ওপর উঠে ইলহানের বুকে আছড়ে পরলো। আকস্মিক এইভাবে তার বুকে পড়ায় ইলহান হকচকিয়ে উঠলো, ততক্ষণে নূরাইসা তার বুকের ওপর মুখ লুকিয়ে ফেলেছে। তার আঙুলগুলো ইলহানের টিশার্টে আঁকড়ে ধরেছে, যেন সেই কাপড়ের ভাঁজে আশ্রয় খুঁজছে।নূরাইসা কান্নাভেজা কণ্ঠে মুখ তুলে তাকালো ইলহানের দিকে। তার চোখ লালচে, ঠোঁট কাঁপছে, আর বুকের ভেতর হাহাকার জমে আছে। কণ্ঠ কেঁপে উঠছে, কান্না চেপে আসছে, আর সেই ভাঙা গলায় বলে উঠলো—

-"আমি খুব সরি... আমি বুঝতে পারিনি, আপনার এতটা কষ্ট হচ্ছিল। বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে ফিরিয়ে দিইনি। আমি তো আপনাকে এইভাবে কখনও দেখিনি, আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম... আমি তো অনেক ভীতু মানুষ। আজ সত্যি... আজ সত্যি আরিবা আপুর কথা সত্যি হলো। আমি আপনার যোগ্য নই, প্রমাণ হলো। আপনার পথে আমি বাধা, আমি আপনাকে কোনোভাবেই সাহায্য করতে পারি না। এই যে আজ একটু আগে আপনার আমাকে কত প্রয়োজন ছিল, অথচ আমি... আমি ভয়ে আপনার যন্ত্রণা বোঝার চেষ্টাও করিনি... আমাকে মাফ করে দিন, প্লিজ! আমি খুব, খুব সরি..."

তার কণ্ঠ ভেঙে গেল শেষ কথাগুলোতে। নূরাইসা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো, আর ইলহানের বুকের ওপর মুখ লুকিয়ে ফেলল। তার চোখের জলে ভিজে উঠছে ইলহানের টিশার্ট, কাঁপছে নূরাইসার কাঁধ।

ইলহান কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তার ভেতরটা হঠাৎ থমকে গেল, তার নূরেজান... সে নিজেকেই দোষী ভাবছে। সে জানেই না ইলহান নিজের ভেতরে কত বড় যুদ্ধে লড়ছে। ইলহান ধীরে হাত তুলল। এক নিঃশ্বাসে, কাঁপা আঙুলে আলতো করে নূরাইসার মাথায় হাত রাখল। সেই স্পর্শে নূরাইসা একটু থেমে গেল, তবু কান্না থামল না। ধীরে ধীরে ইলহান তাকে বুকে টেনে নিয়ে উঠে বসল। তার বুকের ধকধক শব্দে মিশে আছে লজ্জা, ভালোবাসা, অনুশোচনা আর এক অদ্ভুত শান্তি।

নূরাইসা এবার আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরলো, যেন পৃথিবীর সব ভয়, সব কষ্ট তার বুকের ভেতর গলে যেতে চায়। সে ভেবেছিল, ইলহান হয়তো তাকে ঠেলে দেবে দূরে, হয়তো মুখ ফিরিয়ে নেবে। ইলহান তার ভীতু বউয়ের বাচ্চামী দেখে মৃদু হাসলো। ভালোবাসায়, ব্যথায়, কোমলতার মিশ্রণে। তার চোখে একটুকরো কোমল দৃষ্টি, ঠোঁটে নরম রেখা। ইলহান দুহাত বাড়িয়ে নূরাইসাকে আরও কাছে টেনে নিয়ে বলল গভীর, মোহনীয় কণ্ঠে বলল—

-"আমি একটুও রেগে নেই, নূরেজান... একটুও না। আমি আপনাকে এইভাবে পেতে চাই না। আমার অসংলগ্ন ব্যবহারের জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমি চেষ্টা করেছি... কিন্তু নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারিনি।"

তার কণ্ঠে অনুতাপের ভার, তবু তাতে লুকিয়ে আছে এক স্নেহময় প্রশান্তি। নূরাইসা ভেজা চোখ তুলে তাকালো তার দিকে, ইলহানের চোখে তখন কোনো রাগ নেই, কেবল এক গভীর, অপরাধবোধে ভরা ভালোবাসা। নিঃশব্দে আবারও মাথা নামিয়ে নিলো নূরাইসা।

ইলহান থেমে গেল। নিঃশব্দে মুখ নামিয়ে তাকালো নিজের বুকের দিকে, সেখানে তার ছোট্ট ব্লাডমন, তার নূরাইসা, মুখ গুঁজে কাঁদছে নিঃশব্দে। তার কাঁধ কেঁপে উঠছে, চোখের জল ভিজিয়ে দিচ্ছে ইলহানের বুকে থাকা কালো টিশার্ট। সেই কান্নার শব্দ যেন ইলহানের হৃদয়ের ভেতর ছুরি চালিয়ে যাচ্ছে। ইলহান গভীর এক নিঃশ্বাস নিল, তারপর আলতো করে নূরাইসার মাথায় হাত রাখল। তার কণ্ঠে ছিল শান্ত অথচ অটল দৃঢ়তা—

বিজ্ঞাপন

-"আমি সেদিনও বলেছি, আজ আবার বলছি,আমার জন্য যে যোগ্য, আল্লাহ তাকেই আমাকে দিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং এই নিয়ে আমি আর কোনোদিন কিছু শুনতে চাই না। আর শুনলে তার ফলাফল হবে, খুব বাজে, খুব জঘন্য রকমের খারাপ।"

তার গলায় কোনো রাগ নেই, কিন্তু এক ধরনের গভীর সতর্কতা আছে, ভালোবাসার আড়ালে লুকানো কঠোর স্নেহ। নূরাইসা মুখ আরও গুঁজে নিল ইলহানের বুকে। তার কণ্ঠ প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে কান্নার মাঝে, তবু ফিসফিস করে বলল—

-"আর কখনও বলব না..."

ইলহানের ঠোঁটে তখন এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল, ভালোবাসা আর শান্তির মিশেলে গঠিত এক মৃদু তৃপ্তির হাসি। সে নিচু হয়ে নূরাইসার মাথায় চুমু খেল, ধীরে, স্নেহে, যেন সেই চুমুতেই ক্ষমা, আশ্বাস আর সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি লুকানো আছে। সে নূরাইসাকে বুকে আগলে রেখেই বিছানায় শুয়ে পড়ল। বাইরে তখন হালকা বাতাস বইছে, জানালার বাহিরে কুয়াশা সব ঘিরে রেখেছে। ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা, শুধু তাদের নিঃশ্বাসের মিলেমিশে থাকা শব্দ। ইলহান তার বুকে মুখ গুঁজে থাকা নূরাইসার মাথায় হাত রেখে মৃদু স্বরে বলল—

-"আমি আপনাকে চাই সজ্ঞানে, কোনো ভয় ছাড়া, এইভাবে জোর করে, নেশায় বুদ হয়ে নয়। আপনি আমার অনেক সখের, অনেক ভালোবাসার একটি মাত্র বউ। আপনাকে আপন করে নেওয়ার জন্য, অনেক আয়োজন এখনো বাকি, ব্লাডমুন।"

নূরাইসা চুপচাপ শুনতে থাকে। তার ভেতরের ভয়, অপরাধবোধ, অনুশোচনা, সব গলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে সেই কণ্ঠের উষ্ণতায়। ইলহানের বুকের ওপর মাথা রেখে সে প্রথমবারের মতো গভীর, শান্ত এক নিঃশ্বাস ফেলল, যেন পৃথিবীর সব ঝড় শেষে সে অবশেষে আশ্রয় পেয়েছে নিজের মানুষটার বুকে।

.

কালো বাইকটি বজ্রপাতের ন্যায় মাইক্রোবাসের সামনে এসে দাঁড়াল, টায়ারের ঘর্ষণে বাতাস কেঁপে উঠল, চারপাশে ধুলোর ঝড় উঠল মুহূর্তেই। চালক আকস্মিকভাবে ব্রেক কষতেই মাইক্রোবাসের ভেতরকার সবাই সামনে দিকে ছিটকে পড়ল। সিটের সাথে সংঘর্ষে এক মুহূর্তের জন্য পুরো পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে গেল।

নুহার কপালের পুরোনো ক্ষত আবারও ফেটে গেল।ব্যথার তীব্রতায় তার চোখে আগুন জ্বলে উঠল, তারপর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে সে অচেতন হয়ে পড়ল।

বাইকের আরোহী রাজকীয় ভঙ্গিতে হেলমেট খুলে ধীরে ধীরে নামল। শরীর জুড়ে দৃপ্ত আত্মবিশ্বাস, দৃষ্টিতে ঝড়ের মতো তেজ। মাইক্রোবাসের ভেতরে থাকা লোকদের দিকে তাকিয়ে সে যেন নীরব এক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল।

মুহূর্তেই গর্জে উঠল গাড়ির দরজা, চোখেমুখে ক্রোধ আর আগ্রাসন নিয়ে বাইরে ঝাঁপিয়ে পড়ল মুখোশধারীরা। হাতে ঝকঝকে অ স্ত্র, চোখে হ ত্যার আগুন। বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। পাঁচজন মুখোশধারী ঘিরে ধরল একা বাইকারকে, আর তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কালো বাইকটা যেনো নিজেও যুদ্ধে নামার প্রস্তুতিতে টানটান।

চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসছে ধুলোর গন্ধ, অনিশ্চয়তার গর্জন। পরের মুহূর্তেই শুরু হলো তাণ্ডব, একজন ঝাঁপিয়ে পড়ল বাইকারের দিকে। সে দ্রুত নিচু হয়ে ঘুরে দাঁড়াল, কনুইয়ের এক ঝটকায় আঘাত করল আক্রমণকারীর বুকে। আরেকজন ছু রি হাতে ঝাঁপিয়ে এলো, বাইকার তার কব্জি মুচড়ে মাটিতে ফেলে দিল। ধাতব অস্ত্রের ঠোকাঠুকিতে রাতের নীরবতা ভেঙে খানখান হয়ে গেল। তিনজন একসাথে ঘেরাও করতেই বাইকার বাতাসের মতো লাফিয়ে উঠল, একজনকে লাথি মেরে দূরে ছিটকে দিল, আরেকজনের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলল এক ঝটকায়। মুখোশের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো আতঙ্কে কাঁপতে থাকা চোখ, যেন তারা বুঝে ফেলেছে, ভুল শিকার বেছে নিয়েছে আজ রাতে।

মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশে নেমে এলো গাঢ় নিস্তব্ধতা।পাঁচজন মুখোশধারী মাটিতে লুটিয়ে কাতরাচ্ছে কেউ যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে, কেউ নিঃশব্দে নিস্তেজ। ধুলোমলিন বাতাসের ভেতর বাইকারের কালো পোশাক ঝলমল করে উঠল, তার নিঃশ্বাস ভারী, কিন্তু চোখে জ্বলছে শিকারীর বিজয়ী প্রশান্তি। ধীরে ধীরে সে মাইক্রোবাসের দিকে এগিয়ে গেল। ভারী বুটের প্রতিটি পদক্ষেপে বাতাসে ধাতব প্রতিধ্বনি বাজতে লাগল, ঠাস, ঠাস, ঠাস। গাড়ির দরজার হাতল ঘুরিয়ে খুলে তাকাতেই তার দৃষ্টি থেমে গেল। সামনে অচেতন নুহা, মুখে শুকিয়ে যাওয়া র ক্তের দাগ, নিঃশ্বাস প্রায় অদৃশ্য।এক মুহূর্তের জন্য সেই দৃপ্ত মুখের কোণে নেমে এলো অচেনা এক কম্পন, যেনো ভেতরের কঠোরতা ভেঙে পড়ল মুহূর্তে। বাইরে যুদ্ধ শেষ, কিন্তু তার অন্তরে শুরু হলো এক নতুন ঝড়।

সে দ্বিধা না করে নুহাকে কোলে তুলে নিল। অচেতন দেহটা নিথর হয়ে পড়ে আছে তার বুকে, যেন সমস্ত পৃথিবীর ভার সে নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। ধীরে ধীরে সে পা বাড়াতেই বাতাস চিরে এল হঠাৎ এক তীব্র শব্দ, পেছন থেকে এক মুখোশধারী, র ক্তে ভেজা, তবু শেষ চেষ্টা নিয়ে হকিস্টিক উঁচিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার দিকে। আঘাতটা পড়ার আগেই সামনে এসে দাঁড়াল আরেকজন, দৃপ্ত, অদম্য, র ক্তা ক্ত মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক সিংহের মতো। এক বাহু দিয়ে সে আঘাতটা ঠেকিয়ে দিল, হকিস্টিকটা মুহূর্তেই ভেঙে দুই টুকরো হয়ে ছিটকে পড়ল মাটিতে। তারপর কর্কশ অথচ দৃঢ় কণ্ঠে গর্জে উঠল সে—

-"নুহাকে নিয়ে যাও, বিহান ভাই!"

বাতাস থমকে গেল। ধুলোয় মিশে গেল তীব্র র ক্তের গন্ধ, আর সেই চিৎকারে রাত যেনো জেগে উঠল যুদ্ধের নতুন অধ্যায়ের সূচনায়। বিহান এক মুহূর্তের জন্য থমকে তাকাল তার দিকে, রুহান! চোখে চিনে নেওয়ার সেই ঝলক যেনো এক ঝড়ের মতো বয়ে গেল দুজনের মাঝে। তারপরই আবার শুরু হলো তাণ্ডব। ডান দিক থেকে আরেক মুখোশধারী আক্রমণ করতে আসতেই তানভীর ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল সামনে। র ক্তে ভেজা মুখে তার কণ্ঠ ফেটে বেরোল—

-"যাও, বিহান ভাই! এখনই যাও!"

বিহানের দ্বিধা মিলিয়ে গেল মুহূর্তেই। নুহাকে বুকে শক্ত করে চেপে ধরে সে ছুটে গেল বাইকের দিকে। পেছনে তখন গর্জে উঠেছে মৃ ত্যু র মঞ্চ, ঠোকাঠুকি, আর্তচিৎকার, ধুলো আর র ক্তের গন্ধে ভরে গেছে বাতাস। যেনো রাতের আকাশ পর্যন্ত সেই গর্জনে কেঁপে উঠছে। বাইক স্টার্ট দিতে দিতে বিহান নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল, কণ্ঠে এক অচেনা যন্ত্রণা—

-"চোখ খোল, নীলপদ্ম... প্লিজ, চোখ খোল..."

কিন্তু নুহা নিশ্চুপ। তার ঠোঁট নিস্তেজ, মুখে শুকিয়ে যাওয়া র ক্তের রেখা, দেহে কোনো সাড়া নেই। বিহানের বুকের ভেতর হঠাৎ জমে উঠল এক অসহ্য নীরবতা, যেনো পৃথিবী থেমে গেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে, পেছন দিক থেকে ছু রি হাতে আরেক মুখোশধারী লাফিয়ে এলো, আঘাতের লক্ষ্য বিহান। কিন্তু ছু রিটা পৌঁছাতে পারল না। আকাশ কাঁপিয়ে এক দেহ এগিয়ে এলো সামনে, ছু রির ধার থামল তার হাতে। র ক্ত ছিটকে পড়ল বাতাসে লালচে ফোঁটাগুলো ধুলোর সঙ্গে মিশে গেল।

তার তালু কে টে গিয়েছে গভীরভাবে, কিন্তু তবুও সে হাত ছাড়ল না। দাঁত চেপে ধরে, চোখেমুখে বজ্রের মতো কঠোরতা নিয়ে সে দাঁড়িয়ে রইল, যেনো নিজের র ক্ত দিয়েই সেই আঘাত থামিয়ে দিতে চায়। বাতাস ভারী হয়ে উঠল, যুদ্ধে, ত্যাগে, আর এক অমোঘ নিয়তির উপস্থিতিতে। তার নীল চোখের চারপাশে র ক্ত জমে যেনো অগ্নি জ্বলে উঠল, দৃষ্টিটা এমন, যেনো রাতের অন্ধকার ভেদ করে আগুন ছুটে যাচ্ছে।মুখোশধারীটি সেই চোখের দিকে তাকাতেই কেঁপে উঠল, ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। সেই নীল চোখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল মৃ ত্যুর আগমনবার্তা, এক নীরব প্রতিশোধের ঘোষণা। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল সামনে, রক্তচক্ষু নিয়ে। প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল প্রতিশোধের গর্জন, যেনো বাতাসও তার ক্রোধে থরথর কাঁপছে।

ঠিক তখনই ধুলোর ভেতর দৌড়ে এলো আফরিন। হাঁপাতে হাঁপাতে বিহান আর নুহার সামনে এসে থামল। নিঃশ্বাস কাঁপছে, চোখে আতঙ্ক, কান্না আর অবিশ্বাসের ছায়া। সে চিৎকার করে উঠল—

-"বিহান ভাই! কী হয়েছে ওর? বলুন, কী হয়েছে নুহার?"

চারপাশের র ক্তাক্ত হাহাকার, ধুলোময় বাতাস আর ভাঙা নিশ্বাসের শব্দের মধ্যে সেই কণ্ঠটা যেনো হারিয়ে গেল। বিহান কোনো কথা বলল না, শুধু স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল নুহার মুখের দিকে। তার চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা, যেনো মুহূর্তটার ভেতরেই পৃথিবী থেমে গেছে। তারপর ধীরে ধীরে সে মুখ তুলল আফরিনের দিকে। আতঙ্কে, কান্নায় আর ধুলোর ঝাপটায় আফরিনের ফর্সা, গোলগাল মুখটা লালচে হয়ে উঠেছে। চোখের কোণ ভেজা, ঠোঁট কাঁপছে। বিহানের কণ্ঠ তখন দৃঢ়, অথচ তাতে একটা কাঁপা সুর—

-"নুহার গলা থেকে ওড়নাটা খুলে দাও। আমার কোমরের সঙ্গে ওকে পিছনে বেঁধে দাও। তারপর তুমি ওর পেছনে বসে শক্ত করে ধরে রাখবে। বাকিটা হাসপাতালে বলব, সময় নেই, আফরিন।"

আফরিন কোনো প্রশ্ন করেনি। শুধু কাঁপা হাতে নুহার ওড়নাটা খুলে নিল, নিস্তেজ দেহটাকে সামলে নিয়ে বিহানের কোমরে শক্ত করে বেঁধে দিল। তারপর নিজেও পিছনে উঠে বসল, দুহাতে জড়িয়ে ধরল নুহাকে, যেনো প্রাণপণে বাঁচিয়ে রাখতে চায় প্রিয় ছোট বোনকে।

ধুলোয় ভরা বাতাসে বাইকের ইঞ্জিন গর্জে উঠল। র ক্তের গন্ধে, মৃ ত্যুর প্রতিধ্বনিতে আর নীল চোখের আগুনে ভরে উঠল সেই রাত, যেখানে জীবন, মৃ ত্যু আর ভালোবাসা একসঙ্গে দৌড়ে চলেছে অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে।

বিহান একবার পেছন ফিরে তাকাল, র ক্তে ভেজা সেই পথটা যেন যুদ্ধক্ষেত্রের পরিত্যক্ত অধ্যায়। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা অস্ত্র, ধুলো, আর কুয়াশায় ঢাকা নিস্তব্ধতা যেন মৃ ত্যুর পরও লড়াইয়ের প্রতিধ্বনি বয়ে আনছে। তারপর গর্জে উঠল বাইকের ইঞ্জিন, এক গভীর, তীব্র শব্দ, যেন জীবনের শেষ ঘোষণা। চাকা ঘুরতেই ধুলো উড়ে আকাশ ঢেকে গেল, হেডলাইটের আলো ছিঁড়ে ফেলল ধোঁয়া আর কুয়াশার মোটা পর্দা। মুহূর্তের মধ্যেই তারা মিলিয়ে গেল দূরের ধূসর কুয়াশার ভেতরে, শুধু বাতাসে রয়ে গেল পো ড়া গন্ধ, র ক্তের ধাতব স্বাদ, আর নুহার নিঃশব্দ নিঃশ্বাসের মৃদু প্রতিধ্বনি।

পেছনে রয়ে গেল রুহান, তানভীর, আর সেই নীলচোখের মানুষ, এমরিন রাহাফ। তাদের চারপাশ এখন এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধক্ষেত্র, আকাশ ভারী, বাতাস র ক্তে ও ধুলায় ঘন। পাঁচজন মুখোশধারী অস্ত্রধারী ঘিরে রেখেছে তাদের, প্রতিটি আঘাতের সঙ্গে মাটি কাঁপছে, ধাতব শব্দে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে প্রতিশোধের ভাষা। রুহান ও তানভীরের দেহ ক্ষতবিক্ষত, পোশাক ছিঁড়ে র ক্তে ভিজে গেছে, তবুও তাদের চোখে নিভে যায়নি দৃঢ়তা।

প্রতিটি শ্বাস যেন লড়াইয়ের প্রতিজ্ঞা, প্রতিটি আঘাত যেন শপথের পুনরাবৃত্তি, পিছু হটা নয়, কখনও নয়।

হঠাৎ দূর থেকে শোনা গেল এক ইঞ্জিনের শব্দ, গম্ভীর, ধাতব, ভয়াল। পাঁচজনের একজন সুযোগ বুঝে মাইক্রোবাসে উঠে বসেছে। এক মুহূর্তে ইঞ্জিন স্টার্ট, গাড়ি গর্জে উঠল, বাতাস চিরে সামনে ছুটে গেল। বাকি চারজন মুহূর্তেই রুহান, তানভীর ও এমরিনকে ধাক্কা দিয়ে পিছু হটে, ঝাঁপিয়ে উঠল সেই গাড়িতে।মাইক্রোবাসটা তাদের সামনে দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দে ছুটে গেল, যেন অন্ধকারের বুক চিরে পালিয়ে যাচ্ছে কোনো দানব, রেখে যাচ্ছে র ক্ত আর ধুলোর ঝড়।

ঠিক তখনই এমরিন নিচু হয়ে মাটিতে পড়ে থাকা একটি পি স্ত ল তুলে নিল। তার নীল চোখে জ্বলছে শীতল ক্রোধের আগুন, চোখদুটি যেন কুয়াশা ভেদ করে রাতকে বিদ্ধ করছে। সে পি স্ত লটি নিশানায় রাখলো। ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিল সে। তার দৃষ্টি স্থির, নিঃশব্দ প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞায় জমে থাকা বজ্রপাতের মতো। আঙুল ছুঁলো ট্রিগার।

"ঠাস!"

রাতের নীরবতা ছিঁড়ে এক বজ্রধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো, র ক্তমাখা বাতাসে সেই শব্দ যেন ভাগ্যের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা লিখে দিল। প্রথম গু লি ছুটল গাড়ির ডিজেল ট্যাংকের দিকে, ধাতব শব্দে রাত কেঁপে উঠল।

দ্বিতীয় গু লি সোজা গিয়ে বিধল টায়ারে।

তারপরই—

"বুম্‌!"

এক বিকট বিস্ফোরণে চারপাশ যেনো কেঁপে উঠল, বাতাসে ছিটকে গেল আগুনের ফোঁটা, ধোঁয়ায় ঢেকে গেল আকাশ। মাইক্রোবাসের ভেতরে মুহূর্তেই দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল, লালচে শিখা গ্রাস করে নিল প্রতিটি কোণ। ভেতরের পাঁচজন মুখোশধারীর চিৎকার ছিন্নভিন্ন হয়ে মিলিয়ে গেল আগুনের গর্জনে। নিমিষের মধ্যেই পুরো এলাকা রক্তাভ শিখায় আচ্ছন্ন। আগুনের লেলিহান নাচে কুয়াশাও যেন ভয়ে সরে দাঁড়াল।তানভীর আর রুহান বিস্ময় ও আতঙ্কে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল এমরিন রাহাফের দিকে। তার চোখে নেই কোনো অনুশোচনা, শুধু এক শীতল দৃষ্টি, যেখানে প্রতিশোধের আগুন নিঃশব্দে জ্বলছে। সেই নীলচোখে যেনো লেখা—"ন্যায়ের নামেই এই দহন।"

আকাশ রক্তিম আগুনে রঞ্জিত হয়ে উঠল, ধোঁয়া, কুয়াশা আর আগুন মিলে তৈরি করল এক পরাবাস্তব দৃশ্য, যেনো নরকের দ্বার খুলে গেছে এই নির্জন প্রান্তরে। সেই দাউদাউ আগুনের পর্দা ভেদ করে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো তিনজন মানুষ, রুহান, তানভীর, আর এমরিন রাহাফ। তাদের শরীরে র ক্ত, পোশাকে ছাই, তবুও দৃষ্টিতে অনমনীয় দৃঢ়তা। আর সেই মুহূর্তে বাতাসে ভেসে উঠল পো ড়া লোহা, র ক্ত, আর প্রতিশোধের গন্ধ, তাদের পদক্ষেপে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল এক নিঃশব্দ ঘোষণা— এই লড়াই এখানেই শেষ নয়।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প