বিকেলের রোদে ভার্সিটির মাঠটা যেন সোনালী আলোয় ধোয়া। হালকা বাতাসে গাছের পাতা উড়ছে। ক্লাস শেষে নূরাইসা, আফরিন আর ফারাহ্ ধীরে ধীরে মাঠের ঘাসে হাঁটছে, তিনজনের হাতেই গলে যাওয়া আইসক্রিম। হাসি-ঠাট্টা, গল্প আর বন্ধুতার সহজ উষ্ণতায় জমে উঠেছে বিকেলটা।
আফরিন আইসক্রিমে এক কামড় দিয়ে বলল—
-"তোর বয়ফ্রেন্ডের কি খবর, ফারাহ্ বেবি?"
ফারাহ্ ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি এনে জবাব দিল—
-"আছে, ভালোই!"
আফরিন দুষ্টু হেসে জিজ্ঞেস করল—
-"বিয়ে করছিস কবে?"
ফারাহ্ চোখ টিপে বলল—
-"চাকরিটা পাক, তারপরই বিয়ে করে ফেলব!"
ফারাহ্ মুখ ঘুরিয়ে নূরাইসার দিকে তাকাল—
-"কিরে, রিদওয়ান ভাই নাকি তোকে প্রোপোজ করেছে?"
নূরাইসা একটুখানি চুপ থেকে আইসক্রিম কামড়ে বলল—
-"হ্যাঁ... ভাবতেও পারিনি জানিস! এতদিন শুধু এই জন্যই আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে!"
ফারাহ্ অবাক চোখে তাকিয়ে মাথা নাড়ল—
-"ওহ! আচ্ছা, ইলহান ভাইয়ার সাথে তোর এখন সম্পর্ক কেমন? মেনে নিয়েছিস সব?"
নূরাইসা চোখ নামিয়ে নরম স্বরে বলল—
-"আর্মি ছেড়ে দেবে, এই কথাটা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে গিয়ে ওনার চোখ দিয়ে অস্রু গড়িয়ে পড়েছিল। আমি সহ্য করতে পারিনি সেই অশ্রু!"
ফারাহ্ কৌতূহল ভরে জিজ্ঞেস করল—
-"এখন কি সব ঠিকঠাক?"
আফরিন হেসে উঠে বলল—
-"ঠিকঠাক না আবার! ভাইয়া সেদিন এত খুশি ছিল যে, তার হাসির শব্দ আমরা নিচে থেকেও শুনেছি! তাহলে বোঝ!"
ফারাহ্ অবাক হয়ে হেসে বলল—
-"বাহ! এত দূর!"
নূরাইসা মাথা নিচু করে ফিসফিসিয়ে বলল—
-"কোথায় আর কত দূর! রাতে আমি ঘুমিয়ে পড়ার পর আসে, আর সকালে আমি ওঠার আগেই চলে যায়। কোথায় যায়, আল্লাহই জানে!"
আফরিন আবার বলল—
-"ভাইয়া আর বিহান ভাইয়ের কোম্পানি, আবার আমাদের কোম্পানির পেন্ডিং কাজ আছে না। সেই কাজগুলোতেই ব্যস্ত দু’জন। এখন ছুটিতে এসেছে তো!"
হাঁটতে হাঁটতে সবাই গেটের বাইরে এসে দাঁড়ালো। দূরে কালো চকচকে বিএমডব্লিউটি স্থির হয়ে আছে, তার পাশেই ইলহান, আর তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে এক অপরূপা তরুণী। ফারাহ্ চোখ কুঁচকে তাকাতেই বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল—
-"আরে, ওটা ইলহান ভাই না?"
আফরিন ও নূরাইসা দুজনেই একসাথে তাকালো। মুহূর্তেই তাদের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। ইলহানের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি, একেবারে ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতে। দু’জনের মুখে মৃদু হাসি, কথা বলার ফাঁকে মেয়েটি বারবার হাত রাখছে ইলহানের বাহুতে, যেন তার ওপর নিজের অধিকার প্রকাশ করছে। দূর থেকে দৃশ্যটা দেখলে যে কেউ বলবে, প্রেমিক-প্রেমিকার যুগল।
হঠাৎ ছপ্ শব্দে সবাই চমকে উঠল। নূরাইসার হাত থেকে আইসক্রিম পড়ে মাটিতে গলে যাচ্ছে। আফরিন ও ফারাহ্ দুজনেই ঘুরে তাকালো, নূরাইসার চোখে জল টলমল করছে, সামান্য পলক ফেললেই অশ্রু গড়িয়ে পড়বে। আফরিন দৌড়ে গিয়ে তার হাত ধরল।
-"ইসা, কাঁদছিস কেনো?"
নূরাইসা স্থির। চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে, যেন চোখ বন্ধ করলেই দৃশ্যটা হারিয়ে যাবে। অশ্রু গড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায় কাঁপছে তার দৃষ্টি। তখন আফরিন দাঁত চেপে বলল—
-"তোর জামাইর গায়ে কেউ হাত দিচ্ছে, আর তুই দাঁড়িয়ে কাঁদছিস? যা, গিয়ে দু’ঘা মেরে আয়! নিজের অধিকার তোকে আদায় করে নিতে হবে, এইভাবে চোখ ভিজিয়ে কিছুই পাবি না।"
বলে দুই হাতে ধাক্কা দিল আফরিন। নূরাইসা টলে গিয়ে কয়েক পা এগিয়ে গেল। সেই মুহূর্তে চোখের কোণা গড়িয়ে অশ্রুগুলো টুপটাপ করে পড়ে গেল মাটিতে। সে তাড়াতাড়ি হাতের পেছন দিয়ে চোখ মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
একবার পেছনে তাকালো, আফরিন ও ফারাহ্ দুজনেই দৃঢ় চোখে তাকিয়ে আছে, সাহস দিচ্ছে নিঃশব্দে। নূরাইসা গভীর নিঃশ্বাস নিল, বুক ভরে সাহস জোগাড় করল, তারপর দৃঢ় পায়ে ইলহানের দিকে এগিয়ে গেল।তার প্রতিটি পদক্ষেপে বুকে ঢেউ খেলছে কষ্ট আর ভালোবাসার ঝড়, তবু সে থামল না।
ধুপধাপ পায়ের শব্দে থেমে গেলো চারপাশের সব কথাবার্তা। নূরাইসা এসে দাঁড়াল ইলহান ও সেই অচেনা মেয়েটির সামনে। মুহূর্তেই সময় যেন থমকে গেল।
মেয়েটি সত্যিই অতুলনীয় সুন্দরী, গায়ের রঙ তুষারের মতো উজ্জ্বল, চোখ দুটি টানা টানা, ঘন কাজলে মোড়া, ঠোঁট দুটো স্ট্রবেরির মতো টলটলে গোলাপি। একবার তাকালেই চোখ ফেরানো দায়।
নূরাইসা তাকিয়ে রইল স্থির দৃষ্টিতে, নিঃশ্বাস আটকে গেল তার। ভেতরটা শূন্য হয়ে গেল এক মুহূর্তে। মনে হলো, নিজের ভেতরের সব আত্মবিশ্বাস যেন ভেঙে পড়ছে একে একে। "এই মেয়েটি যদি তার স্বামীর দিকে কুনজর দেয়?" ভাবতেই বুক কেঁপে উঠল তার। "আমি তো ওর মতো নই... এমন সুন্দরও না..." বুকের ভেতরটা কেমন ভারি হয়ে উঠল। নিজের অস্তিত্বটাই যেন ম্লান হয়ে গেল সেই মেয়েটির দীপ্ত সৌন্দর্যের সামনে।
নূরাইসাকে চিন্তায় হারিয়ে যেতে দেখে ইলহান তার দিকে তাকিয়ে বলল—
-"তুই এখানে কী করছিস?"
চমকে উঠল নূরাইসা। ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে কিছুক্ষণ পর ধীরে বলল—
-"এটা... এটা আমার ভার্সিটি।"
ইলহান হালকা হেসে বলল—
-"ওহ, আমার খেয়াল ছিল না। ক্লাস শেষ? বাসায় যা তাহলে।"
ঠিক তখনই পাশ থেকে মেয়েটি হালকা ভঙ্গিতে ইলহানের এক বাহু ধরে মিষ্টি কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
-"এই মেয়েটা কে, মনোহর?"
তার কণ্ঠে ছিল কৌতূহল, চোখে অবহেলা, আর ঠোঁটে মাপা হাসি, যেন এক নিঃশব্দ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে নূরাইসার দিকে।
নূরাইসা বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে রইল মেয়েটির দিকে। "মনোহর?" — শব্দটা যেন কানে আগুন ধরিয়ে দিল। ডাকনামও রাখা হয়ে গেছে! বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠল, রক্ত যেন তেতে উঠল তার শরীরে। মুহূর্তেই সে জানে না কী হলো, শুধু জানে, আর এক পা পেছনে যাবে না।
চোখের আগুনে পুরো দেহ যেন জ্বলে উঠেছে। এক নিমেষে এগিয়ে গিয়ে ইলহান ও মেয়েটির মাঝখানে এসে দাঁড়াল নূরাইসা। মেয়েটির হাতটা ঝটকা মেরে সরিয়ে দিল, তারপর ইলহানের বাহু দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল—
-"বউ হই। আপনি কে?"
শব্দগুলো ঠাণ্ডা অথচ ধারালো, যেন রেশমে মোড়া খঞ্জর।
ইলহান হতবাক। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে নূরাইসার দিকে। "এই মেয়েই কি সেই মেয়ে, যার বুকে মাথা রেখে ঘুমাই বলে সে লজ্জায় আমার চোখের দিকে তাকাতে পারে না। আর সেই মেয়ে আজ রাস্তার মাঝে আমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে, এতটা ঘনিষ্ঠভাবে?" তার মনে হচ্ছে, চোখের সামনে এক অপরিচিত অথচ অপূর্ব দৃশ্য ঘটছে। বাকরুদ্ধ হয়ে শুধু মুগ্ধ ও অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে রইল সে।
ওদিকে মেয়েটি হকচকিয়ে গেল। কণ্ঠে সামান্য রাগ মিশিয়ে বলল—
-"বউ মানে? কী বলছে ও, মনোহর? তুমি বিয়ে করেছ কবে?"
ইলহান কিছু বলার আগেই নূরাইসা স্পষ্ট কণ্ঠে উত্তর দিল—
-"চার মাস হলো। অনুষ্ঠান হয়নি বলেই হয়তো আপনি জানেন না। এখন বলুন, আপনি কে?"
এক নিঃশব্দ ধাক্কা খেল মেয়েটি। মুখে বিশ্বাসের ছায়া নেই, চোখে বিস্ময় আর হালকা অপমানের রেশ। তার ঠোঁট কেঁপে উঠল, যেন শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না।
আর ঠিক তখনই তার দৃষ্টি গেলো ইলহানের দিকে, যার দৃষ্টি নূরাইসার মুখে থেমে রয়েছে। ইলহান আপন মনে ভেবে চলেছে হাজারো কথা, যে মেয়েটাকে সে নরম, ভীতু, নিরীহ ভাবত, সেই মেয়েটিই আজ তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক দৃপ্ত নারী হয়ে। চোখে আগুন, ঠোঁটে দৃঢ়তা, অথচ মুখভরা ভালোবাসা।
ইলহানের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক স্নিগ্ধ, তৃপ্তির হাসি। একটা এমন হাসি, যেখানে গর্ব, ভালোবাসা, আর বিস্ময় সব একসাথে মিশে আছে।
মেয়েটি সেই হাসি দেখে থমকে গেল। তারপর মৃদু কণ্ঠে, প্রায় আহত স্বরে বলল—
-"তুমি... সত্যিই বিয়ে করেছ, মনোহর?"
ইলহান কোনো উত্তর দিলো না। সে নূরাইসাকে দেখতে ব্যস্ত। নূরাইসা আবারও জিজ্ঞাসা করলো—
-"আপনি কে?"
মেয়েটি গলায় হালকা অহংকার মেশানো ভদ্রতার সুরে বলল—
-"আমি আরিবা। ইলহানের সাথে কাজ করি।"
নূরাইসা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে দিল। সেই হাসিটা এত শান্ত, এত নিরীহ ছিল যে আরিবার চোখে যেন সেটা ব্যঙ্গের মতো লাগল। মুখের কোণে এক টান পড়ে গেল তার। সেই কখন থেকে নূরাইসা ইলহানের বাহু আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে, দৃশ্যটা আরিবার চোখে সহ্য হচ্ছিল না। ঠোঁটে কটাক্ষ মিশিয়ে সে বলল—
-"তুমি বোধহয় ওর বোন, তাই না? আমার সঙ্গে প্র্যাঙ্ক করছ? মনোহর একটু আগেই তোমাকে 'তুই' সম্বোধন করল। বউ হলে কি আর স্বামী 'তুই' বলে ডাকে?"
নূরাইসা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। হালকা হোঁচট খেল তার ভাবনার ভেতর। বোন তো, কিন্তু এখন বউও! কিন্তু নূরাইসা বোন পরিচয়টা প্রকাশ করতে চাইলো না। কেনো সে নিজেও জানে না। গোলা একটু ভারি হয়ে এলো, কিন্তু কণ্ঠে দৃঢ়তা নিয়ে বলল—
-"বোন হতে যাব কেনো? আমরা স্বামী-স্ত্রী।"
আরিবা ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে মাথা নাড়ল, তবু চোখে একরোখা সন্দেহের ঝিলিক—
-"না, তুমি ওর বোনই হবে। দেখে তাই মনে হচ্ছে!"
এই "বোন" শব্দটা নূরাইসার কানে বারবার বাজছে, একটা অদ্ভুত তিক্ততা জেগে উঠছে বুকের ভেতর। কেন এমন লাগছে সে নিজেও জানে না। মনে হচ্ছে, কেউ তার নিজের অস্তিত্বে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে। হঠাৎই নূরাইসা ইলহানের বাহু থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিল। চারপাশের বাতাস যেন থেমে গেল। সোজা হয়ে দাঁড়ালো সে, ইলহানের মুখোমুখি। চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা, ঠোঁটে নীরব আগুন।
হাত ছাড়িয়ে নেওয়ায় ইলহান ভ্রু কুঁচকালো। মুখে অল্প বিরক্তি, যেন বলতে চায়, "হাত কেনো ছাড়লি?" কিন্তু কিছু বলার আগেই নূরাইসা এগিয়ে এলো এক ধাপ। দুই হাতে ইলহানের মুখ টেনে নিল নিজের দিকে।
নূরাইসা পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, গোড়ালি সামান্য উঁচু, ভারসাম্য যেন অনুভূতির তালে দুলছে। পায়ের পাতায় নরম ভর, মনে হচ্ছে মাটি ছুঁয়েও সে যেন ভাসছে, ভালোবাসার এক অদৃশ্য স্রোতে।
আরিবা স্থির হয়ে গেছে। অবিশ্বাসে তার চোখ বড় হয়ে উঠেছে, ঠোঁট সামান্য ফাঁক। ইলহানও বাকরুদ্ধ, এই নূরাইসাকে সে কখনো দেখেনি। এই মেয়েটি, যে চোখ মেলতেও লজ্জা পায়, আজ তার চোখে ঝলক দিচ্ছে অনির্বচনীয় সাহস।
ইলহান ভাবল, এখনই হয়তো নূরাইসা পিছিয়ে যাবে। কিন্তু না, তাকে ভুল প্রমাণ করে নূরাইসা এক মুহূর্তের জন্য চোখ তুলল, ইলহানের চোখে চোখ রাখল। সেই দৃষ্টিতে ছিল অজস্র প্রশ্ন, অগাধ মায়া, আর এক অনন্ত অধিকারবোধ।
তারপর, আলতোভাবে সে নিজের অধর মেলালো ইলহানের ওষ্ঠজোড়ায়। নিঃশব্দে, কিন্তু তীব্রতায়। যেন সেই চুম্বনে মিশে গেল জমে থাকা অভিমান, ভয়, আর ভালোবাসার অনন্ত উষ্ণতা।
ইলহান কিংকর্তব্যবিমুঢ়। সময় থেমে গেল, বাতাস ভারী হয়ে উঠল তাদের চারপাশে। তার বুকের ভেতর ধকধক করে বাজতে লাগল এক অচেনা সুর, যা শুধু নূরাইসার ছোঁয়াতেই জেগে উঠেছে।
আরিবা মুখ ফিরিয়ে নিল, চোখ বন্ধ করে ফেলল যেন কিছুই দেখতে চায় না আর।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আফরিন আর ফারাহ্ প্রথমে হাঁ হয়ে গেল, তারপর দু’জনেই একসাথে উল্লাসে চিৎকার করে উঠল। দুই হাত দিয়ে চোখ ঢেকে রেখেছে বটে, কিন্তু আঙুলের ফাঁক গলে ঠিকই উঁকি মারছে, চোখে বিস্ময়, মুখে প্রশংসার হাসি।
হাওয়ায় যেন এক অদ্ভুত গন্ধ, অভিমান পোড়া ভালোবাসার, ভয়ের ভেতর জন্ম নেওয়া সাহসের।
ইলহান যেই আবেশে চোখ বন্ধ করে নূরাইসার কোমর ধরার জন্য হাত বাড়ালো, তখনই নূরাইসা সরে এলো। ইলহান কিছুক্ষণের জন্য স্থবির হয়ে দাঁড়ালো, বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকিয়ে।
নূরাইসা আরিবার দিকে দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
-"ভাই-বোন একে অন্যকে চুমু খায় না, আপু!"
বলেই সে এক দৌড়ে চলে গেল। আরিবা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। ইলহান ঠোঁট প্রসারিত করে হাসল, এক রকম ধীর, মুগ্ধ ও খুনসুটি মিশানো হাসি। তার বউ জেলাস। অন্য মেয়ের সামনে নিজের অধিকার প্রকাশ করেছে। নিজের আধিপত্য দেখিয়েছে, আর ইলহান সেটা নিঃসন্দেহে উপভোগ করছে।
নূরাইসা তখন লজ্জায় লাল হয়ে আফরিন ও ফারাহ্-এর দিকে চলে আসে। দুইজন মিলে হাসছে, মিটমিট করছে, নূরাইসার লজ্জা আরও বাড়াচ্ছে।
আরিবা তখনও কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। চারপাশের পরিস্থিতি তাকে স্তব্ধ করে রেখেছে।
ইলহান নূরাইসার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসল, তার কণ্ঠে মৃদু ব্যঙ্গের ছোঁয়া—
-"ধন্যবাদ তোমাকে। আমার বউ যে আমাকে নিয়ে এত পসেসিভ, জানতাম না। তোমার জন্য আজকে জানতে পারলাম। আর নেক্সট টাইম আমাকে 'ইলহান' বলেই ডাকবে। তোমাকে বহুবার বলেছি, আমাকে কোনো নিকনেম দিবে না।"
আরিবা চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল, অবিশ্বাস্য, স্তব্ধ, যেন এই মুহূর্তে সবকিছু তার ধারণার বাইরে।
.
নূরাইসা ভার্সিটি থেকে ফিরেই আফরিনের ঘরে এসে ঘাপটি মেরে বসেছে। নিচে নেমে নাস্তা পর্যন্ত খায়নি।ইলিনা বেগম প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চেঁচামেচি করেছেন এই নিয়ে। শেষে নাজনীন বেগমের কড়া ধমকে থেমে গেছেন তিনি।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা। আফরিন বিছানার কোণে বসে ফোন টিপছে, ঠোঁটের কোণে খেলা করছে দুষ্টু হাসি।নূরাইসা কোণায় বসে কাঁপছে অজানা ভয়ে, আঙুলের নখ কামড়ে ফেলেছে প্রায় অর্ধেক।
তখনই দরজা ঠেলে ঢুকলো নুহা। কলেজ থেকে এসে ফ্রেশ হয়ে, নাস্তা সেরে তারপর এলো। কৌতূহলভরা মুখে সে বসল আফরিনের পাশে। চোখ কুঁচকে একবার তাকাল নূরাইসার দিকে, তারপর আফরিনের দিকে। নুহা কপালের ভাঁজ আরও গভীর করে বলল—
-"কি হয়েছে তোদের?"
আফরিন মুখ তুলে তাকালো, ঠোঁটে সেই আগের দুষ্টু হাসি। আর নূরাইসার মুখ ফ্যাকাশে, চোখে ভয় আর লজ্জার ছায়া।আফরিন নির্বিকার গলায় বলল—
-"কি হবে কিছু হয়নি তো!"
নুহা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে বলল—
-"কিছু তো হয়েছে। তুই ফোন দেখে হাসছিস, আর ইসা আপু ভয়ে নখ কামড়াচ্ছে কেন?"
আফরিন একবার নূরাইসার দিকে তাকাল। তারপর ফিক করে হেসে ফেলল। নূরাইসা সেই হাসি দেখে চোখ রাঙিয়ে তাকাল, আফরিনের মুখের হাসি থামানোর চেষ্টা করে আর জোরে হেসে উঠলো। ধাতস্ত হয়ে বলল—
-"আয় তোকে দেখাই কেন হাসছি!"
নুহা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। আফরিন ফোনটা তার হাতে ধরিয়ে দিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো এক ছবি, নূরাইসা ইলহানকে চুমু দিচ্ছে।
নুহা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। চোখের পলক ফেলতেও যেন ভুলে গেল সে। বোনের দিকে তাকিয়ে রইল, স্তব্ধ, অবিশ্বাসে, বিস্ময়ে।
নূরাইসা তখন কাঁপা গলায় বলল—
-"আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি... কিভাবে যেন কি হয়ে গেল... সব দোষ ওই রিন পাউডার আর ফারাহর।ওরাই আমাকে পাঠিয়েছিল!"
তার কণ্ঠে আতঙ্ক, চোখে অপরাধবোধ, আর নিঃশব্দে কাঁপছে পুরো শরীর। নুহা ধীরে ধীরে উঠে এলো নূরাইসার পাশে। তার কাঁপা কাঁধে আলতো করে হাত রাখল। চোখে একরাশ দুষ্টুমি, ঠোঁটে টেনে আনল একখানি তীক্ষ্ণ হাসি—
-"বোন আমার!" সে বলল টেনে টেনে।
-"ওটা কিন্তু তোর আপন জামাই, ধার করা না! যা খুশি করিস, তাতে সমস্যা নাই, কিন্তু এত সাহসী হইলি কবে, আপু?"
নূরাইসা অসহায় মুখে তাকাল, চোখ দু’টো ভিজে উঠেছে, ঠোঁট কাঁপছে। মুহূর্তেই যেন কান্না গলার কাছে এসে আটকে গেছে। তার কণ্ঠে তখন আতঙ্ক, করুণ আবেদন মেশানো এক হাহাকার—
-"আমাকে খুন করে ফেলবে বাসায় এলে...! রাস্তা-ঘাটে আমি কি সব করে এসেছি, আল্লাহ আমাকে বাঁচাও!"
তার এই ভয়মাখা আর্তনাদে ঘরের পরিবেশটা এক মুহূর্ত থমকে গেলেও, পরের মুহূর্তেই আফরিন আর নুহা হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল।
আফরিন তো পেট ধরে হাসছে, নুহার চোখে পানি চলে এসেছে হাসতে হাসতে, আর নূরাইসা মুখ ঢেকে বসে আছে, মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত লজ্জা যেন আজ ওর কপালেই এসে জমেছে।
ঘরের কোণে তখনো ফোনের স্ক্রিনে ঝলমল করছে সেই ছবিটা, এক নিষ্পাপ ভুল, যা এখন তিন বোনের হাসি-ঠাট্টার মধ্যে পরিণত হয়েছে এক স্মরণীয় বিকেলবেলার গোপন নাটকে।
.
রাত তখন ঠিক বারোটা। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ, চারদিকে শুধু দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ, আর দূরে কোথাও কুকুরের একঘেয়ে ডাক। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, শুধু আফরিনের ঘরটায় এখনো আলো জ্বলছে।
নূরাইসা এখনো সেখানে বসে আছে, চাদর মুড়ি দিয়ে, কাঁপা চোখে দরজার দিকে চেয়ে। নুহা আর আফরিন বহুক্ষণ ধরে বোঝাচ্ছে—
-"যা, ঘরে যা!"
কিন্তু এই ভীতু মেয়েটি কিছুতেই উঠছে না।
আফরিন অবশেষে বিরক্ত হয়ে বলল—
-"এই যা তো, তোর ঘরে যা! আমি ঘুমাবো এখন!"
নূরাইসা কাঁদো কাঁদো মুখে বলল—
-"এমন করছিস কেন? এমনিতেও তো রাত জেগেই থাকিস!"
আফরিন চোখ পাকিয়ে উত্তর দিল—
-"আরে ভাই! জামাইকে চুমু খেয়েছিস, অন্য কোনো ছেলেকে না! যা না ভাই, জামাইকে গিয়ে জালা!"
নূরাইসা এবার মুখ গোমড়া করে, গলায় কান্নার সঙ্গে রাগ মেশানো সুরে বলল—
-"তোদের জন্যই তো সব হয়েছে! এখন আমি কোন মুখে যাবো ওনার সামনে? ছিঃ! ছিঃ! রাস্তার মাঝে আমি কি করে ফেললাম! লজ্জায় শেষ হয়ে যাচ্ছি আমি!"
আফরিন আর নুহা একে অপরের মুখের দিকে তাকাল, এই মেয়েকে বোঝানো মানে দেওয়ালে মাথা ঠোকা।নুহা এবার হাল ছেড়ে দিয়ে নূরাইসার হাত ধরে টানতে টানতে বলল—
-"চল, ভাইয়া ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি নিজে দেখে এসেছি। যা, গিয়ে ঘুমিয়ে পড়। ভাইয়া ওঠার আগেই সকালে বেরিয়ে যাস, কিছু হবে না।"
নূরাইসা থমকে গেল, নুহার কথায় যেন কিছুটা সাহস পেল। চোখে এখনো ভয়, কিন্তু তাতে মিশে গেছে একটু নিশ্চিন্ততা। তারপর নিঃশব্দে দরজার দিকে পা বাড়ালো। পথে বাতাসে দোল খাচ্ছে পর্দা, বাড়ির কোণে কোণে ছায়া গা ঘেঁষে আছে।
ইলহান নিশ্চিন্তে সোজা হয়ে শুয়ে আছে, যেন দুনিয়ার কোনো চিন্তা নেই। নূরাইসা দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখে, ইলহান ঘুমোচ্ছে। তার বুকের ভার যেন হালকা হয়ে গেল। আস্তে করে দম ছাড়ল সে, তারপর গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে থামল।
চারদিক নিঃশব্দ। বাতিটা নেভানো, কেবল জানালার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলো ঘরটাকে ধূসর করে রেখেছে। নূরাইসা ধীরে ধীরে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল, ইলহানের পাশেই, নিঃশব্দে।
তার মনে একরাশ স্বস্তি, ভালোই হয়েছে, ইলহান ঘুমিয়ে আছে। এখন অন্তত কোনো কথা বলার ভয় নেই। চোখ খুলে একবার চুপিচুপি তাকালো ওর দিকে,
তারপর হালকা হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটে, নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করলো সে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ইলহান চোখ খুলে ফেলল। সে ঘুমায়নি, শুধু ঘুমের ভান ধরে ছিল। নূরাইসা চোখ বন্ধ করতেই, ইলহান ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল তার দিকে, চোখে রহস্যময় দীপ্তি, ঠোঁটে খেলছে এক দুষ্টু হাসি। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই, সে নূরাইসার ওপর উঠে পড়ল।
নূরাইসা তড়াক করে চোখ মেলে তাকাল, চোখ দুটো বিস্ফারিত, নিঃশ্বাস গলা অবধি আটকে গেছে। এক মুহূর্তে দুজনের চোখ এক হয়ে গেল, নীরব, অথচ তীব্র এক টান।
ইলহানের ঠোঁটের কোণে তির্যক হাসি, আর নূরাইসার চোখে ভয়, লজ্জা, বিস্ময়ের মিশ্র ছায়া। তার গলা শুকিয়ে গেছে, কণ্ঠ কাঁপছে, তবু সাহস জুগিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল—
-"আমি... খুব সরি... আসলে তখন কি হয়েছিল জানি না... রাস্তার মধ্যে এত মানুষের সামনে..."
কথা শেষ করতে পারল না সে। ভয়ে আর লজ্জায় চোখ মুখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল, হৃদস্পন্দন যেন কান পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে।
ইলহান নীরব। এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল ওর মুখের দিকে, তারপর অধরে আরও গভীর হলো সেই বাঁকা, দুষ্টু হাসি।
সে ধীরে ধীরে মুখটা এগিয়ে নিল নূরাইসার কানের কাছে, চাঁদের আলোয় মৃদু ঝিলিক দিচ্ছে তার চোখে এক অজানা রহস্য। ইলহান ফিসফিস করে বলল—
-"যেটা পারিস না, সেটা করতে যাস কেন?"
নূরাইসা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। চোখে প্রশ্নের ঝিলিক।
ইলহান ধীরে মুখ তুলে চাইল নূরাইসার অধরের দিকে।
চোখে তখন এক তীব্র দৃষ্টি, অধরে ক্ষীণ হাসি। নরম স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল—
-"ওষ্ঠ দিয়ে ওষ্ঠ স্পর্শ করলেই সেটা চুমু হয় না... কীভাবে চুমু খেতে হয়, আমি তোকে দেখাচ্ছি।"
বলেই ইলহান ধীরে ধীরে এগিয়ে আনল নিজের মুখ, নূরাইসার মুখের একেবারে কাছে। ভয় আর লজ্জায় নূরাইসা চোখ বন্ধ করে ফেলল, দুই হাতের আঙুলে খামচে ধরল বিছানার চাদর। এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা, অতঃপর ইলহানের উষ্ণ নিশ্বাস ছুঁয়ে গেল নূরাইসার মুখমণ্ডল। সেই নরম উষ্ণতার মধ্যে ইলহান আলতো করে স্পর্শ করল নূরাইসার ওষ্ঠ। চুম্বনের কোমলতা ছড়িয়ে পড়ল নিঃশব্দ রাতের বাতাসে।
ইলহান আর কোনো অগ্রসরতা দেখাচ্ছে না দেখে নূরাইসা ধীরে ধীরে চোখ মেলল। আর ঠিক তখনই, ইলহান দখল নিল তার ওষ্ঠের সমস্ত আবেদন। সেই চুম্বন প্রথমে ছিল স্নিগ্ধ কোমল, তারপর ধীরে ধীরে গাঢ় হলো, গভীর হলো অনুভূতিতে। ইলহানের প্রতিটি নিশ্বাসে মিশে আছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার আকুলতা, যেন তৃষ্ণার্ত পথিক অবশেষে পেয়েছে কাঙ্ক্ষিত জলের প্রথম স্বাদ। নূরাইসার ওষ্ঠে নিজের অনিবার্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করছে ইলহান, নিজের ভালোবাসার রাজত্বে ঘোষণা দিচ্ছে অবিচ্ছেদ্য উপস্থিতি।
নূরাইসা ক্রমে হাপিয়ে উঠছে, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। ইলহান অনুভব করল সেই ছটফটানি, তবু ছাড়লো না নূরাইসার অধর। ইলহানের চুম্বনের সাথে সাথে তার হাতের উষ্ণ স্পর্শ ঘুরে বেড়াচ্ছে নূরাইসার দেহরেখা, আলতো, মুগ্ধকর, এক রহস্যময় ছোঁয়া। সেই স্পর্শে নূরাইসা কেঁপে উঠছে, হৃদস্পন্দন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে স্পর্শের গভীরতা... কামিজের ফালি দিয়ে হাত দেওয়ার আগেই, ফোনের হঠাৎ রিংটোন ভেঙে দিল সেই নিবিড় নীরবতা।
ইলহান থেমে গেল। নিজের মুখ সরিয়ে আনল কিছুটা দূরে। দুজনেরই বুক ওঠানামা করছে দ্রুত নিঃশ্বাসে।নূরাইসা লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিল অন্যদিকে, চোখ বন্ধ রেখেই নিচ্ছিল বড় বড় শ্বাস। লজ্জায় মুখশ্রী লাল বর্ণ ধারণ করেছে।
ইলহান নেমে এলো নূরাইসার ওপর থেকে, মাথা বালিশে রেখে নিজেকে সামলে নিলো কষ্টেসৃষ্টে। এক হাতে ফোন তুলে কানে দিল, ওপাশ থেকে বিহানের কণ্ঠ ভেসে এলো, তার কণ্ঠে মৃদু বিস্ময়—
-"এই, ভাই! তোর নিশ্বাস এত ভারী কেন? তুই এমন হাঁপাচ্ছিস কেন?"
ইলহান এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তার ঠোঁটে এখনও লেগে আছে নূরাইসার গরম নিশ্বাস, আর বুকের ভেতরে ধকধক করছে এক অচেনা নেশা, যেনো ভালোবাসারও নিজস্ব গোপন যুদ্ধ আছে। ইলহান গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলল—
-"শ্লা, একবার তোর বিয়ে করিয়ে দেই, তারপর বুঝবি কেন হাঁপাচ্ছি!"
ওপাশে মুহূর্তের নীরবতা। তারপর বিহান কেশে উঠল, বলল—
-"আসলে বিয়ে হয়নি তো, তাই বুঝিনি, বিবাহিত বন্ধুদের রাতে ফোন দেওয়া পাপ!"
ইলহান কপালে ভাঁজ ফেলে গম্ভীর গলায় বলল—
-"শ্লা, কি জন্য ফোন দিয়েছিস বল!"
বিহান হাসল, একটু রসিক কণ্ঠে বলল—
-"শ্লা হলে তুই আমার শ্লা হবি, আমি তোর শ্লা না!"
ইলহান হেসে ফেললেও মুখ গম্ভীর রেখেই কটাক্ষ করল—
-"আমার একটা বোনকেও তোর সাথে বিয়ে দিব না, শ্লা।"
বিহান এবার হো হো করে হেসে উঠল। হাসির ফাঁকে থেমে বলল—
-"একটা হিন্ট পেয়েছি, এখনই যেতে হবে। তুই বেরিয়ে আয়, আমি নিচে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।"
ইলহান দ্রুত উঠে বসে বলল—
-"আসছি, পাঁচ মিনিট অপেক্ষা কর।"
বলেই উঠে পড়ল তাড়াহুড়োয়। আলমারি খুলে দ্রুত জামা-কাপড় বদলাতে লাগল।
ওদিকে নূরাইসার বুকের ভেতর এখনো তীব্রভাবে ধুকপুক করছে হৃদয়। মুহূর্তটা পেরিয়ে গেছে, কিন্তু তার শরীর যেনো এখনও সেই উত্তাপের ভেতর ডুবে আছে।
সে চোখ বন্ধ রেখেই নিঃশব্দে শুয়ে আছে, যেনো না দেখলে ঘটনার বাস্তবতা একটু কমে যাবে।
ইলহান পোশাক পরে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল তার দিকে। বিছানার পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসলো। অধর প্রসারিত করে নিঃশব্দে হাসলো। অতঃপর আলতো করে হাত রাখল নূরাইসার মাথায়, আঙুলে বুলিয়ে দিল চুলের ফাঁকে।
নরম গলায় বলল—
-"চোখ খুলুন, আমি বাহিরে যাচ্ছি একটু। কাজ আছে আমার, যেতে হবে আমাকে! ভয় পাবেন না, ফিরে আসব দ্রুত। "
নূরাইসা তড়াক করে চোখ মেলে তাকালো। নিঃশব্দ ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ থমকে গেল। কিছু বলার আগেই ইলহান গভীর অথচ নরম স্বরে বলে উঠলো—
-"অসমাপ্ত কাজ এসে সমাপ্ত করবো, ততক্ষণ অপেক্ষা করুন জান আমার!"
বলেই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো সে। পদক্ষেপে যেন এক অদ্ভুত টান, ভারী হয়ে উঠছে প্রতিটি নিঃশ্বাস। নূরাইসা দ্রুত উঠে বসে তাকিয়ে রইলো দরজার দিকে, চোখে এক অনির্বচনীয় আকুলতা।
ইলহান দরজা পর্যন্ত গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। এক মুহূর্ত ভাবলো, তারপর ঘুরে দাঁড়ালো ঝড়ের মতো। ফিরে এসে নূরাইসার ঘাড়ে হাত রাখলো, এক ঝটকায় টেনে নিল নিজের কাছে, এত কাছে যে দু’জনের নিঃশ্বাস মিশে গেল এক সুরে।
পরের মুহূর্তে, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই, ইলহান গাঢ়ভাবে মেলালো ওষ্ঠ নূরাইসার ওষ্ঠে। নিঃশব্দ ঘরে কেবল হৃদস্পন্দনের আওয়াজ। নূরাইসা তাল সামলাতে না পেরে ইলহানের শার্ট খামচে ধরেছে, চোখ বন্ধ, শরীর থরথর করছে অজানা আবেগে। হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিছানায়, যেন সময় থেমে গেছে ঠিক এই মুহূর্তে।
ইলহান কিছুটা পর ধীরে ধীরে তাকে ছেড়ে দিল। নূরাইসার কপালের সঙ্গে নিজের কপাল রেখে নিঃশব্দে ফিসফিস করে বলল—
-"ভালোবাসি নূরেজান!"