রাত এখন নির্জন ১১টা। জানুয়ারির ৭ তারিখ। দু’দিন হলো, নূরাইসা নেই বাড়িতে, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে অবস্থান করছে। রুহান গেছে ২৭ দিন আগে, এই দীর্ঘ সময়টাতে মাত্র দু’বার কথা হয়েছে তার সঙ্গে।জানিয়েছে, সেখানে ভালোই আছে, চিন্তার কিছু নেই।আর ইলহান, চট্টগ্রাম পৌঁছে শেষবার জানিয়েছিল, শিগগিরই বান্দরবনে মিশনে রওনা হতে হবে। তারপর থেকেই চারদিকে নিস্তব্ধতার মতোই তার খবরও অদৃশ্য, নেই কোনো ফোন, নেই বার্তা, নেই আশ্বাসের শব্দ।
দেওয়ান বাড়ি আজ জমাট বরফের মতো স্থির। যেন কেউ নিঃশব্দে সময় থামিয়ে দিয়েছে। বিশাল বাড়িটা পড়ে আছে ফাঁকা বুক নিয়ে, খালি, শূন্য, নিঃসঙ্গ।রুহানটা থাকলে, এই নৈঃশব্দ্য এমন গ্রাস করতে পারত না। হাসি-ঠাট্টায়, উচ্ছ্বাসে, ঝগড়া-দুষ্টুমিতে সে বাড়িটাকে কেমন উষ্ণ রাখত! শীতের রোদে সে বায়না ধরত— "মা, পিঠা বানাও না! আর একটু নারিকেল দাও, আর একটু গুঁড়!" বাড়ির বাগানে ভাইবোনেরা ব্যাটমিন্টন খেলত, পাখিদের ঝটপট ডানার শব্দের সঙ্গে মিলেমিশে উঠত তাদের হাসির ঢেউ। বাতাসও যেন সেই স্মৃতির অংশ হয়ে কেঁপে উঠত। কিন্তু এই শীতে, নেই সেই শব্দ। নেই রুহানের দস্যিপনা, নেই ইলহানের প্রাণবন্ত তর্ক, নেই নূরাইসার গল্পের ফুলঝুড়ি। ঘরের প্রতিটি দেওয়াল আজ স্মৃতির শুকনো পাতার মতো খসখসে।
অজান্তেই, ঠিক আজই নাজনীন বেগম বানিয়ে ফেলেছিলেন রুহানের সবচেয়ে পছন্দের পিঠা। হাঁড়ির ঢাকনা উঠতেই গরম ভাপের সঙ্গে যেন ছড়িয়ে পড়েছিল অতীতের থোকা-থোকা বিকেল, শীতের দুপুরে রুহান হাত বাড়িয়ে বলত, "মা, আরেকটা দাও!"
গন্ধটা আসতেই বুকের ভেতরে যেন হঠাৎই ধারালো ব্যথা জেগে উঠল। তিনি থমকে দাঁড়িয়ে রইলেন। চোখের কোনে জমে থাকা জল চুপিচুপি নামল গালের ধার বেয়ে। হাতে থাকা খুন্তি কেঁপে উঠল মৃদু। চোখ মুছলেন, আবার তাকালেন সেই পিঠার দিকে, যেন সেটার ভাঁজে ভাঁজে রুহানের হাসিমুখ আটকে আছে।
রাতের খাবার শেষ হয়েছে। বড় ডাইনিং টেবিল যেন খাওয়া নয়, স্মৃতি আর নীরবতার সাক্ষী। সবাই ড্রয়িংরুমে বসেছে, আফরিনকে কেন্দ্র করে। ঘরের আলো কম, যেন আলোও আজ বিষণ্ন। পর্দার ফাঁক দিয়ে ঢুকে আসা শীতের রাত আরও কঠিন করে তুলছে পরিবেশকে। দাদা-দাদীও পাশাপাশি বসে আছেন, কিন্তু কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। প্রত্যেকে নিজের চিন্তার ভেতর ডুবে থাকা নিস্তরঙ্গ ঝর্ণা, প্রবাহহীন, জড়। হঠাৎ দাদু ধীরে সোজা হয়ে বসলেন। পরিবেশের নীরবতার উপর দিয়ে তার কণ্ঠ যেন ভারী নিস্তরঙ্গ কণ্ঠ ঘরের নীরবতা ভেদ করে উঠল—
-"আফরিন!"
শব্দটি যেন কারও কাঁধে আলতো হাত রাখার মতো। মেয়েটা ধীরে মাথা তুলে তাকায়। চোখদুটো স্থির, তবু প্রশ্নে পূর্ণ। দাদু এক নিঃশ্বাস নেন, তারপর ধীরে, কিন্তু স্পষ্টভাবে বলেন—
-"তোমার বাবাকে ফোন করেছিলাম। সে বলেছে, তুমি যদি রাজি থাকো, তাহলে বিয়েটা যেন আমরা দিয়েই দেই।"
কথা শেষ হতেই ঘরের হাওয়া আরও ঠান্ডা, আরও ভারী হয়ে নামল। যেন সবাই একসঙ্গে নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে। কারও চোখ পলক ফেলারও শব্দ শোনা যায় না। সবার দৃষ্টি এখন এক বিন্দুতে, আফরিনের মুখে।দাদী উদ্বিগ্নভাবে তাকিয়ে আছেন, ঠোঁটদুটি সাদা শুষ্ক। দাদু আবার ধীরে বললেন—
-"এখন তোমার মতামত কী?"
এই প্রশ্নের ভেতর লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যৎ, অজানা, অনিশ্চিত, কিন্তু উপস্থিত। আফরিনের বুকের ভেতর দুলে উঠল সেই শূন্য বাড়ির নিঃসঙ্গতা, রুহান নেই, ইলহান নেই, নূরাইসা নেই। হঠাৎই সে যেন সেই বিরহজর্জর বাড়ির প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠল। গলা শুকিয়ে আসে তার। বাতাস থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু আফরিন, ভাব লুকানো তার স্বভাবে নেই। কথায় পরোক্ষ মানে রাখার মানুষ সে নয়। মনে যা, মুখে তাই। দাদুর প্রশ্ন শেষ হতেই এক মুহূর্তও নেয় না। বুক সোজা করে, চোখ সরাসরি দাদুর চোখে রেখে অকপটে বলে—
-"রাজনীতিবিদ আমার পছন্দ না দাদু!"
ঘরে এক ঝটকা নীরবতা। কথাটা এত দৃঢ়, এত নিঃসংকোচ, আর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজনই রইল না।
দাদী নিচু স্বরে "হুঁ..." বলে মাথা নাড়লেন, সবাই বুঝে গেল, উত্তর পরিষ্কার। এই নিস্তরঙ্গতার মাঝেই হঠাৎ পাশ থেকে তানভীর মুখ টিপে হাসল, দুষ্টুমি ভরা কণ্ঠে বলল—
-"দাদু, ওকে ওই এমপির সাথেই বিয়া দাও। আমাদের যে জ্বালান জ্বালাইছে, এমপি সব পুষায়ে দিবে!"
তার মুখে এমন ভাব, যেন সে-ই সংসারের সবচেয়ে ভোগান্তির শিকার। আফরিন সেদিকে চোখ ফেরাতেই বোঝা গেল, ঝড় নামছে। তার চোখ দুটো লালচে, জ্বলন্ত, শীতের কুয়াশা বিদীর্ণ করা আগুনের মতো।
-"তুমি চুপ কর! তোমাকেই আগে জ্বালানো লাগবে!"
তানভীর আবার কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই নুহা এগিয়ে আসে। মুখে শয়তানি হাসি, দাদা-দাদীর সামনে এমন ভঙ্গি যেন সংসারের বড়বৌ সে-ই।
-"হ্যাঁ দাদু, একে জলদি বিদায় করেন। অনেক হয়েছে। শশুরবাড়ি পাঠাইয়া দিই!"
কথা শেষ হতেই উত্তেজিত ঝড়ের মতো দাঁড়িয়ে যায় আফরিন। তীক্ষ্ণ আঙুল তুলে বলে—
-"দাঁড়া! তোদের হচ্ছে। আজকে ছাড়বো না!"
বলেই সে ঝাঁপিয়ে এগোয়। তানভীর আর নুহা দুই দিক দিয়ে ছুটে পালায়, যেন বাড়ির ড্রয়িংরুমই যুদ্ধক্ষেত্র।কিছুক্ষণের মধ্যে তিনজনের দৌড়াদৌড়ি, খিলখিল হাসি আর টুকরো টুকরো চিৎকারে ভেঙে যায় জমাট নীরবতা। ঘরের মানুষরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসতে বাধ্য হয়। মুহূর্তেই শীতল ঘর উষ্ণতায় ভরে ওঠে। এমন উষ্ণতা, যা রুহান-নূরাইসা-ইলহানের অনুপস্থিতিতে বহুদিন দেখা যায়নি। আজ সেই নীরব বাড়িটা একটু হলেও প্রাণ ফিরে পেল। হাসির শব্দে আবার দুলে উঠল দেওয়ান বাড়ির দেয়াল।
.
নূরাইসা এখনও পুরোপুরি মিশে উঠতে পারেনি তার দলের বাকি ছয় সদস্যের সঙ্গে। জন্মগত ইন্ট্রোভার্ট, হাঁড়ের ভেতর বাসা বাঁধা নিঃশব্দ স্বভাব। নিজের ঘর, চেনা মুখ আর অল্প কিছু ঘনিষ্ঠ মানুষের বাইরে অপরিচিত কারও সামনে তার জিহ্বা যেন বরফের পাত হয়ে জমে যায়, নাজুক, অচল, কাঁপতে থাকা।অথচ একবার যদি কারও সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা জন্মায়, তাহলে সেই একই নূরাইসা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ, চঞ্চল, দুষ্টু, নির্দ্বিধায় হাসি ছড়ানো উচ্ছল এক রূপ।
সারাদিনের কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে বিছানায় শুয়ে নূরাইসা ভাবছিল, "মানুষজনের সঙ্গে ঠিকভাবে কথা বলা কি এতটাই কঠিন? কিভাবে শুরু হয় বন্ধুত্ব? কোথা থেকে?" মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল সেই ভরা মাঠের অপ্রীতিকর মুহূর্ত, যা তাকে এখনো চোখ তুলে তাকাতে দেয় না কারও দিকে। সেই ভুল তাকে ছোট করে দেয়, অপ্রস্তুত আর ভীষণ বোকা অনুভব করায়। আকাশ তাপাল ভাবতে ভাবতেই কখন যে অচেতন নরম ঘুম নেমে এসেছে চোখের পাপড়িতে, সে টেরই পায়নি।
ভোরের কুয়াশা তখনো ঝুলে আছে ক্যাম্পের আকাশে। এমন সময়,
ট্র্র্র্র্রিং!!!!
অ্যালার্মের তীক্ষ্ণ সাইরেন যেন রাতের সমস্ত নীরবতা টেনে ছিঁড়ে ফেলে। নূরাইসা চমকে উঠে বসে, কয়েক সেকেন্ড তার বোঝাই মুশকিল হয় যে সে ঠিক কোন দুনিয়ায় ছিল। আধো ঘুম, ক্লান্ত পেশী, ঝাপসা চোখ, সব ঝেড়ে ফেলে যেন যুদ্ধে নামার প্রস্তুতির মতো মুহূর্তেই সে বিছানা ছাড়ল, দ্রুত পোশাক পরে দৌড়ে নেমে এলো মাঠে। যেন এক মুহূর্ত দেরি হলে পৃথিবী তার ওপর রোষ ঝাড়বে।
মাঠে পৌঁছাতেই, সকল রিক্রুট ইতিমধ্যেই সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে। শীতের কুয়াশা শরীর ছুঁয়ে গেছে ভেজা সুতোর মতো, প্রতিটি নিঃশ্বাস থেকে ধোঁয়া উঁচু হয়ে ওঠে, ধীর, ভারী, যেন জমে থাকা ভয় আর সংকল্প একসাথে উবে যাচ্ছে। ক্যাম্পের চারপাশে পাহাড় দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে, বিশাল ছায়া ফেলে রেখেছে নিস্তব্ধ ভোরের মাটিতে। দূরে ঝুলছে ট্রেনিং গিয়ার, তাদের ভবিষ্যতের অদৃশ্য সাক্ষী, ক্ষমতা আর সামর্থ্যের নীরব বিচারক।
ঠিক তারপরেই, ঠক... ঠক... ঠক... রিক্রুটদের বুট মাটিকে আঘাত করে ওঠে ধারাবাহিক, দৃঢ়, ছন্দময় শব্দ। কুয়াশা ভেদ করে সেই শব্দ যেন ঘোষণা দেয় শৃঙ্খলার, সাহসের, আসন্ন যুদ্ধের। রোদ উঠেনি এখনো। কিন্তু মাঠ গরম হয়ে ওঠে মানুষের ইচ্ছাশক্তিতে, হৃদস্পন্দন, শ্বাস, পায়ের আওয়াজ, সব মিলিয়ে যেন নতুন দিনের জন্ম। আর এভাবেই প্রতিদিনের প্রশিক্ষণ শুরু হলো। নূরাইসা দাঁড়িয়ে, নিশ্চুপ, শীতল বাতাস বুকে নিয়ে। একটা দিন সামনে, অপরিচিত, ভয়াবহ, তবু সম্ভাবনায় ভরপুর।
আজও বাকিরা চমৎকার করেছে। প্রত্যেকে তাদের সর্বোচ্চটা দিয়েছে, নিখুঁত গতিতে পার করেছে প্রতিটি ধাপ। ট্রেনিং শুরু হলো আজও দৌড় দিয়ে, সবাই দৌড় শেষ করে লাইনে দাঁড়িয়ে, নিঃশ্বাস ভারী, কিন্তু মুখে আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি। কুয়াশা ভেদ করে উঠছে নিঃশ্বাসের ধোঁয়া, আর সেই লাইনের একেবারে ফাঁকে, খানিক দূরে দাঁড়িয়ে শুধু নূরাইসা। এখন তার পালা।চারপাশ নিস্তব্ধ। মনে হয় পুরো সকাল থমকে আছে, সেকেন্ডগুলো তার দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ধরে আছে।দলের বাকি ছয়জন মুখ চাওয়াচাওয়ি করে ফিসফিসায়, চিন্তায় ডুবে—
"প্রতিদিন একই ভুল। আমাদের ভাগ্য এমন কেন?"
প্রশিক্ষকের মুখে বিস্ময়, বিরক্তি, আর সামান্য রাগের ঝিলিক। চোখের ভাষা যেন বলে—
"এই মেয়েটা ট্রেনিং নিতে এসেছে, নাকি সব ভুলের বিশ্বকোষ পরীক্ষায় পাশ করতে?"
হুইসেল বাজল তীক্ষ্ণ সুরে। প্রশিক্ষক চেঁচিয়ে উঠলেন—
-"রিক্রুট ০৭! মার্কে দাঁড়াও। আমি ৩ পর্যন্ত গুনবো। ১.. ২... ৩!"
নূরাইসা বুক সোজা করে দৌড় শুরু করল। প্রথম তিন সেকেন্ড নিখুঁত, চতুর্থ সেকেন্ডেই, হঠাৎ ঠাসাং! হোঁচট।মাটিতে পড়ে যায় এমনভাবে, মনে হয় কেউ যেন তার জুতার সাথে অদৃশ্য দড়ি বেঁধে টেনে ধরেছে। পাশ থেকে চাপা হাসির শব্দ—
-"ও আবার পড়ল!"
-"এইভাবে কি সেনাবাহিনী চলে?"
প্রশিক্ষক চিৎকারে করে বলে উঠলেন—
-"রিক্রুট ০৭! দৌড়াতে এসেছ, নাকি ভেলকি দেখাতে?"
ধুলোমাখা হাঁটু নিয়ে নূরাইসা উঠে দাঁড়ায়, মাথা নিচু, কণ্ঠ উঁচু—
-"স্যার... বাতাস ধাক্কা দিছে।"
আলফা দলের বাকিরা হাসি চেপে মরছে, কেউ কাঁধ কাঁপিয়ে মুখ নিচু করে আছে।
এরপর শুরু হলো বাধা পারাপার। সবাই লাফিয়ে পার এক ঝটকায়, শুইং! বাতাস কেটে চলেছে তারা, যেন ওরাই তৈরি দেশের মেরুদণ্ড হতে। শেষে নূরাইসা দাঁড়ায়। শ্বাস টেনে, চোখ বন্ধ করে বিড়বিড়—
-"আল্লাহ রক্ষা করো..."
লাফ দিল। ফলাফল, বাধার ওপর দিয়ে নয়, বরং সরাসরি বাধার গায়ে ঠাস!, তারপর গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। প্রশিক্ষকের ধৈর্য ভেঙে যায়—
-"বাধা কি তোমাকে আক্রমণ করেছে? তুমি ওর সাথে ধাক্কা খেলে কেনো?"
দলের মুখ গম্ভীর, কারো কপালে ভাঁজ, কেউ আবার ঠোঁট কামড়ে হাসি লুকায়। নূরাইসা নিশ্চুপ, মাথা নত।
সবশেষে সবাই গেল শুটিং রেঞ্জে। নিখুঁত গু লিতে টার্গেটে গর্ত তৈরি করে একে একে অন্যরা। ব ন্দু ক হাতে দৃঢ় ভঙ্গিতে দাঁড়ায় নূরাইসা। ফোকাস... শ্বাস… স্থিরতা... প্যাং! বুলেট টার্গেটে নয়, উপরে ঝুলে থাকা টিনের পাতায় গিয়ে ঠং! শব্দে নিজেই চমকে ওঠে সে, ব ন্দু ক ফেলে দু’হাত দিয়ে কান চেপে ধরে চিৎকার—
-"ও মাগো! বাঁচাও আমাকে! গু লি কোথায় গেল স্যার, কারো গায়ে লাগে নি তো?"
যদিও তার কানে ছিল হেডফোন, তবুও আতঙ্কে কেঁপে ওঠা মেয়েটাকে দেখে মাঠ ফেটে পড়ে হাসিতে।প্রশিক্ষক পর্যন্ত হেসে ফেলেন, কিন্তু মুহূর্তেই সেই হাসি আঁটকে গিয়ে মুখ কঠিন হয়। চোখে এক ঝলক বিষণ্ণতা নেমে আসে তিনি বলেন—
-"কারণ তুমি যেখানে তাকাও না, আর গু লি ঠিক সেখানেই যায়।"
তার কণ্ঠে হতাশা ও মায়ার অদ্ভুত মিশ্রণ। মাঠের বাতাস স্তব্ধ। নূরাইসা দাঁড়িয়ে আছে, হতাশা, লজ্জা, আর নিজের ওপর অবিশ্বাস নিয়ে। দল এবার হাল ছেড়ে দিয়েছে। ছয়জনের মুখে বিরক্তির রেখা, যেন তারা সবাই স্থির করেছে—
-"আজ রাতে এ মেয়েটাকে চা-নাশতা দেবে না।"
তবে নূরাইসা হাল ছাড়ে না। প্রতি হারেই সে মজার অজুহাত দেয়, বাতাস, বুট, রোদ, গাছ, মাটি... সব দোষ তাদের। দলের ছয়জন যখন বিরক্ত, প্রশিক্ষক ক্লান্ত, নূরাইসা তখনো দাঁড়িয়ে বলে—
-"স্যার, কালকে আমি পারবো। কাল হইবে। কাল।"
প্রশিক্ষক শুধু আকাশের দিকে তাকান, মনে হয় তিনি প্রার্থনা করেন—
-"হে প্রভু, কাল যেনো সত্যি কাল হয়!"
আজকের ট্রেনিংয়ে বারবার ভুল করার কারণে অবশেষে নূরাইসার ওপর নেমে এলো শাস্তি। ১০০ ল্যাপ। ট্র্যাক জুড়ে তার ছুটে চলা বাধ্যতামূলক। সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে দিগন্তের নিচে, আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে কমলা-সোনালি মরা আলো। শীতের দিন ছোট, সন্ধ্যা আগেভাগেই নেমে আসে, আর সেই সন্ধ্যার ঠান্ডা বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছে নূরাইসার নিঃশ্বাস। সারাদিনের কঠিন ড্রিল, পুশ-আপ, দৌড়, অ স্ত্র চর্চা, সব মিলিয়ে শরীরের শক্তি প্রায় ক্ষীণ হয়ে এসেছে। তার ওপর আবার শাস্তি হিসেবে ১০০ ল্যাপ! তার দু’চোখে ঝাপসা, বুক উত্তপ্ত, পা যেন আর চলতে চায় না। ১০ ল্যাপ কোনো রকমে পার করেছে। ১১তম ল্যাপের বাঁকে—
ধুপ্!
নূরাইসা মুখ থুবড়ে পড়ে যায় ঠান্ডা কাঁকর-মাটির ওপর। শরীর ভেঙে পড়ার সাথে সাথে নীরব হয়ে যায় ট্র্যাক। এখানে আর কেউ নেই। শুধু অস্তগামী সূর্যের বিস্তীর্ণ রঙিন আলো আর তার হাঁপ ধরা শ্বাস। হাত দিয়ে মাটি ঠেলে ধীরে উঠতে যাচ্ছিল নূরাইসা, ঠিক তখনই সামনে ভেসে ওঠে বুট পরিহিত দু’জোড়া পা।বুটের নিচে মাটির ওপর সোজা ছায়া পড়ে আছে,
যেন বাড়তি চাপ, বাড়তি বিচার। ধীরে মাথা তোলে নূরাইসা, আর দৃষ্টি গিয়ে থামে ইলহানের চোখে। লাল রাগে টগবগে, স্থির, ধারালো।
ইলহানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে বিহান, মুখে অসহায় ভাব যেন সে নিজেও জানে না কীভাবে পরিস্থিতি সামলাবে। আর তাদের পেছনে আরও পাঁচজন শ্যাডো ইউনিটের। সেই পাঁচজনের মাঝে আরিবা, চোখে এক চিলতে কৌতুক, ঠোঁটে টেনে রাখা মুচকি হাসি, নূরাইসার পতন যেন তার কাছে আজকের বিনোদন।নূরাইসা আবার ইলহানের মুখের দিকে তাকায়।
দৃষ্টি মিলতেই অন্তর কেঁপে ওঠে, গলা শুকিয়ে আসে, তার বুকের ভিতর ভয়ার্ত ধুপধুপানি। শুষ্ক এক ঢোক গিলে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে যায় সে। পা টলমল, কিন্তু দৃষ্টি স্থির রাখার চেষ্টা।
এখন তারা দুজন মুখোমুখি।দুজনের শ্বাস, দুজনের উত্তাপ, দুজনের নীরবতা একই বাতাসে ঝুলছে ভার হয়ে। সন্ধ্যার আলো মুছে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, আর তাদের মাঝে জমে উঠছে এক দীর্ঘ, ভারী, অনিবার্য মুহূর্ত।
.
বিকেলের শেষ আলোয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তটা যেন শীতের কুয়াশায় আরও ভারী হয়ে উঠেছে। হালকা বাতাসে শুকনো পাতার রণরণ শব্দ, তার মাঝেই হঠাৎ ভেসে এল গভীর, পুরুষালি কণ্ঠস্বর।
-"শুনলাম, এমপি নাকি বিয়ের প্রপোজাল পাঠিয়েছে?"
কথাটা এমনভাবে বাতাস ভেদ করে এল যে আফরিন ও ফারাহ্ দু’জনই চমকে পেছনে তাকাল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এমরিন, নিঃশব্দ ঝড়ের মতো। তার নীল চোখ দু’টো অদ্ভুতভাবে টলমল করা আলো কেটে আফরিনের মুখে এসে থেমে আছে। ঠান্ডা হাওয়ায় আফরিনের নাকের ডগা লাল হয়ে উঠেছে, আর সেই লালিমায় আটকে আছে এমরিনের চোখ। যেন দৃষ্টি দিয়ে স্পর্শ করছে।
ফারাহ্ হালকা ঝুঁকে আফরিনের কানে ফিসফিস করে বলল—
-"কে রে এই বিদেশী? দেখছিস? কী সুন্দর! ঐ নীল চোখ দু’টো, উফফ, মানুষ না নাকি অন্য কিছু!"
আফরিন সঙ্গে সঙ্গে কনুই দিয়ে তাকে খোঁচা দিল, দাঁত চেপে বলল—
-"চুপ। লোকটার মতিগতি মোটেও সুবিদার না। কথা বলতে দে আমাকে!"
বাতাস থমকে গেল যেন। আফরিন মাথা উঁচু করে সোজা এমরিনের চোখে চোখ রাখল। তার কণ্ঠ রুক্ষ, তীক্ষ্ণ—
-"আচ্ছা, আপনি কোন দেশের প্রাণী বলবেন তো?"
এমরিনের ভ্রু ধীরে ধীরে কুঁচকে উঠল। চোখে বিপজ্জনক এক হাসির রেখা—
-"কোন দেশের... প্রাণী? আমাকে দেখে প্রাণী মনে হয় তোমার?"
আফরিন দু'কদম তার দিকে এগিয়ে এলো। বাতাসে তার চুল উড়ে এমরিনের কাঁধ ছুঁয়ে গেল।
-"অবশ্যই! না হলে দেখুন, আমাকে চেনেন না, জানেন না, অথচ বিয়ে করতে চাইছেন! আবার কে আমাকে বিয়ে করতে আসছে সেই খবর আপনিই আগে জানেন! নজর রাখছেন? লোক লাগিয়েছেন আমার পিছে?"
এমরিন হালকা মাথা নাড়ল, একটা ধীর, নেশামাখা হাসি তার ঠোঁটের কোণায়। হাওয়া যেন ঠান্ডা থেকে আরও ধারালো হয়ে উঠল। সেও দু’দম এগিয়ে এল।দুইজনের মাঝের দূরত্ব গলে গেল নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়।
এমরিনের ছায়া আফরিনকে ঢেকে ফেলল। হঠাৎ সন্ধ্যার নামতে থাকা অন্ধকারে এমরিনের কণ্ঠস্বর ছুরির মতো কেটে এলো, হাওয়া থমকে দাঁড়াল—
-"You are mine, carino... তোমার আশেপাশের বাতাসের খবর পর্যন্ত আমার কাছে পৌঁছায়। সেখানে তুমি অন্য পুরুষের সামনে যাবে, আর আমি জানবো না, এটা কীভাবে সম্ভব, বলো তো?"
আফরিন নাক ছিটকালো, চোখ কুঁচকে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল—
-"Stalker! দূরে থাকবেন আমার থেকে। ভিনদেশী প্রাণী!"
এমরিনের ঠোঁটে নেশামাখা হাসি—
-"তোমার ভিনদেশী প্রাণী!"
-"আমি কোনো প্রাণী পালি না। প্রাণীর প্রতি এলার্জি আছে আমার!"
-"একবার ছুঁয়ে দিলে সব এলার্জি চলে যাবে!"
-"ছুঁয়ে দেখুন, মাটিতে পুঁতে ফেলব!"
-"মাটিতে না, নিজের বুকের মধ্যে পুঁতে ফেলব, কথা দিলাম।"
-"স্বপ্ন দেখা ভালো। তবে জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা ভালো না, ডাক্তার দেখান!"
-"বেশি বলছ না?"
-"ওমা তাই নাকি? শুনছেন কেন? চলে যান তবে!"
এমরিন তীব্র, নরম, অন্ধকারে ডুবানো গলায় বলল—
-"চলে যাওয়ার জন্য তো আসিনি।"
-"খু ন করতে এসেছেন নাকি তবে?"
এই কথায় এমরিনের মুখ বদলে গেল। তার চোখে হঠাৎ এক শীতল ছায়া। চুপ। স্থির। বাতাস ভারী হয়ে উঠল। আফরিন থমকে গেল, এটা কি খুব বেশি বলে ফেলল? সে তো মজা করেই বলল। অস্বস্তি লুকাতে আবার বলল—
-"আপনার বডিগার্ডগুলো কোথায়? না মানে, যার নিজের সুরক্ষার জন্য এত লোক লাগে, সে-ই আবার কি করে খু ন করবে!"
এবার ভেসে এল এক শীতল, হাড় জমিয়ে দেওয়া কণ্ঠস্বর, ধীরে, অন্ধকারে ডুবে—
-"সময় হলে সব বুঝতে পারবে, carino..."
কথা শেষ করে এমরিন হঠাৎ পিছন ফিরল। তার কোটের কোঁচড়ে বাতাস ঝাপটা মারল। আর সে দূরে চলে গেল লম্বা ছায়া টেনে। আফরিন তার পিঠের দিকে তাকিয়ে রইল, ভ্রু কুঁচকে, বুকের ভেতর অদ্ভুত কাঁপুনি নিয়ে। এতক্ষণে ফারাহ্ পাশে এসে দাঁড়াল।
-"কিরে ভাই! এত সুন্দর একটা ছেলেকে এভাবে অপমান করলি!"
আফরিন বিরক্ত হয়ে সোজা উত্তর দিল—
-"বুঝবি না তুই। এটার মধ্যে ঘাপলা আছে। চল, বাড়ি যাই। এই বেটার প্যাঁচাল শুনতে শুনতে সন্ধ্যা হয়ে গেল!"
.
রাত ঠিক ১২টা। নুহা একা দাঁড়িয়ে আছে নিজের রুমের বারান্দায়, বাইরে পুরো পৃথিবী যেন কুয়াশার ধবধবে সাদা চাদরে ঢেকে গেছে। শীত হাড়ে কাঁপন ধরাচ্ছে, কিন্তু তার গায়ে নেই কোনো গরম জামা।সে দাঁড়িয়ে আছে স্থির, নিঃশব্দ। মাথা একটু উঁচু, দৃষ্টি নিবদ্ধ আকাশের অদৃশ্য কোনও বিন্দুতে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু, নীরব, ধীরে, ভারী। যেন প্রতিটা ফোঁটা চার বছরের অদৃশ্য ক্ষত থেকে জোর করে ছিঁড়ে আসছে। আজ ৯ জানুয়ারি। এই দিনটি নুহার কাছে যন্ত্রণার, আবার স্মৃতির, দু’টোই। চার বছর আগে ঠিক এই দিনের দুপুরে প্রথম বিহানকে দেখে সে আলাদা কিছু অনুভব করেছিল। বিহান সেদিন নীল রঙের পাঞ্জাবি পরে জুম্মার নামাজ শেষে ইলহানের সঙ্গে তাদের বাড়িতে এসেছিল। আর সেদিনই, অদৃশ্য কারও ইশারায়, নুহার হৃদয় নীরবে, নিঃশব্দে খু ন হয়ে গিয়েছিল বিহানের প্রেমে। চার বছর হলো ওই একতরফা ভালোবাসা বয়ে বেড়াচ্ছে সে। না বলা কথা, না পাওয়া আশা, না ফেরা দৃষ্টি, একতরফা প্রেম, যার ব্যথা বোঝে কেবল সেই হৃদয়, যে জানে প্রার্থনা করলেও উত্তর ফেরত আসে না।
নুহা বুঝতে পারে না এই যন্ত্রণা আর কতদিন বহন করতে হবে। কিন্তু একটাই জিনিস সে পরিষ্কার জানে, বিহান ছাড়া অন্য কোনো পুরুষ তার জীবনের পাতায় কখনো জায়গা পাবে না। তার পৃথিবী, তার ভাঙন, তার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস শুধু এক নামেই বাঁধা, বিহান।
কুয়াশা আর অশ্রুর মাঝেই নুহা টেরই পায় না, কখন যে আফরিন এসে তার পেছনে দাঁড়িয়েছে। আফরিন আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখতেই সে চমকে উঠে তাকায়। অশ্রুসিক্ত নুহাকে দেখে আফরিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। উতলা গলায় জিজ্ঞেস করে—
-"কি হয়েছে? কাঁদছিস কেনো? এত রাতে এখানে! ঠান্ডায় তো জমে গেছিস, তোর চাদর কোথায়?"
নুহা মুখ ফেরায়, আবারও তাকায় আকাশের দিকে, যেন তার যন্ত্রণা ওই অসীম কালো আকাশই বুঝতে পারে। মলিন, ভাঙা, কাঁপা গলায় বলে—
-"তুই কখনো কাউকে ভালোবাসিস নি, আপু?"
আফরিন স্তব্ধ হয়ে যায়।
-"হঠাৎ এই প্রশ্ন?"
নুহা আরেকবার চোখ মুছে, হালকা হাসার ব্যর্থ চেষ্টা করে—
-"বল না... আচ্ছা... ভালোবাসলে এত যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়?"
শেষ কথাটির সঙ্গে সঙ্গে যেন পুরো কুয়াশা আরও ঘন হয়ে নেমে এল। একতরফা ভালোবাসার নিঃশব্দ আর্তনাদ বাতাস ভেদ করে তাদের দু’জনের মাঝখানে ভারী হয়ে ঝুলে রইল। আফরিন অবাক হয়ে সামনে ঝুঁকে আসে। নুহার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুর রেখা তাকে আরও ব্যথিত করে তোলে।
-"কি হয়েছে, নুহা?"
নুহা ধীরে, ভাঙা গলায় বলল—
-"আমি বিহান ভাইকে ভালোবাসি, আপু, ভুলতে চেয়েও ভুলতে পারিনি। এই একতরফা ভালোবাসা আমায় বড্ড কষ্ট দিচ্ছে। তুই... তুই কি আমার এই কষ্ট একটু কমিয়ে দিতে পারবি?"
তার কণ্ঠে এমন এক যন্ত্রণা, এমন এক নীরব অনুনয়, যেন বুকের মাঝখান ফেটে বের হওয়া দীর্ঘশ্বাসের ভাষা। আফরিন এক পা এগিয়ে এলো। আলতো করে নুহার মাথায় হাত রাখল। তার কণ্ঠ নরম, স্নিগ্ধ, ঠান্ডা রাতে উষ্ণতার স্পর্শের মতো—
-"এভাবে বলছিস কেনো, নুহা? তোর এত কষ্ট... আমাদের কাউকে বুঝতে দিস নি কেনো? বিহান ভাই এখানে থাকতে কেনো বলিস নি আমাকে? আমি, আমি যেভাবেই হোক তোর করে দিতাম বিহান ভাইকে..."
নুহা হালকা মাথা নাড়ল। তার মুখে এক মলিন, হৃদয়ফাটা হাসি ফুটে উঠল, যে হাসি প্রেমে মরতে থাকা মানুষের শেষ শক্তি। সে ধীরে আকাশের দিকে তাকাল।
কুয়াশা ভেদ করে চাঁদের ম্লান আলো তার চোখে ঝলকে উঠল। তারপর নিঃশ্বাসের সঙ্গে ভেসে এল তার ব্যথার কবিতা—
-"সে মনে রাখে না... আর আমি ভুলতে পারি না। সে হাসাতে পারে না... আর আমি কাঁদাতে পারি না।আমার এত সুন্দর প্রেম, সে জানতে পারে না... আর আমি বলতে পারি না...
আমার এত নিখাদ, এত নির্ঝরী প্রেম, সে বুঝতে পারে না... আর আমি বোঝাতে পারি না। তার কাছে আমি প্রয়োজন নই... আর তার অভাবেই আমার পুরো পৃথিবী থেমে থাকে।"